তিন – ডিনা ব্র্যান্ড
ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে অ্যালবারি নামের এক অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যাশিয়ারকে পাকড়াও করা গেল। আমি কী কাজ করি এবং কেন এসব জানতে চাই সেটা বুঝিয়ে বলায় ছেলেটি মুখ খুলল।
‘উইলসনের চেকটা আমিই সার্টিফাই করেছিলাম। পাঁচ হাজার ডলার। ডিনা ব্র্যান্ডের নামে।’
‘সে কে?’
‘সে অনেক কথা। কিন্তু এখন অত সময় আমার হাতে নেই যে।’
সেদিন সন্ধে সাতটায় অ্যালবারিকে আমার সঙ্গে ডিনার করার ব্যাপারে রাজি করিয়ে, বিনিময়ে ‘অনেক’ কথা শুনতে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করে আমি সিটি হলের দিকে এগোলাম। তবে অ্যালবারির কাছ থেকে পাওয়া একটা তথ্য আমার মাথায় গেঁথে গেছিল।
ডিনা ব্র্যান্ডের ঠিকানা ১২৩২ হারিকেন স্ট্রিট।
পুলিশ চিফ নুনানের স্থূল শরীর, থলথলে মুখ, সবজেটে চোখ, এসব দেখে লোকটাকে বেশ হাসিখুশিই মনে হল। তবে দেখাটাই যদি সব হত…! আমার পরিচয় এবং উদ্দেশ্য জেনে করমর্দন করে নুনান বলল, ‘তাহলে বলুন তো, কাজটা কে করেছে।’
‘ওইরকম গোপন তথ্য কি সবার সঙ্গে ভাগ করা যায়?’
‘নিশ্চিন্ত থাকুন।’ হাত তুলে আমাকে আশ্বস্ত করতে চাইল নুনান, ‘আপনার আন্দাজ যাই হোক না কেন, আমি আর কাউকে সেটা বলব না।’
‘আমি আন্দাজের ব্যাপারে রীতিমতো কাঁচা, তার ওপর তথ্যও তো সব জানি না।’
‘যা জানেন না সেটা জানাতে বেশিক্ষণ লাগবে না।’ নুনান বলে চলল, ‘গতকাল ব্যাঙ্ক বন্ধ হওয়ার ঠিক আগেই উইলসন ডিনা ব্র্যান্ডের নামে কাটা পাঁচ হাজার ডলারের একটা চেক সার্টিফাই করান। গতরাতে ডিনা ব্র্যান্ডের বাড়ি থেকে এক ব্লকেরও কম দূরত্বে উইলসন চারটে গুলি খেয়ে ধরাধাম ত্যাগ করেন। আজ সকালে ব্যাঙ্ক খোলামাত্র ডিনা ব্র্যান্ড নিজের অ্যাকাউন্টে চেকটা জমা করে। এর থেকে কী বুঝলেন?’
‘ডিনা ব্র্যান্ড কে?’
ডেস্কের মাঝে রাখা অ্যাশট্রেতে সিগারের ছাই ঝাড়ল নুনান। তারপর বলল, ‘একটি লক্কা পায়রা। ‘যেখানে দেখিবে সোনা, খুঁজে দেখো প্রতি কোনা’ নীতিতে বিশ্বাসী। ছেলেদের মাথা চিবিয়ে মালকড়ি কামানোয় ওস্তাদ একেবারে।’
‘এর বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিয়েছেন?’
‘না। তার আগে কয়েকটা ব্যাপার একটু দেখেশুনে নিতে হবে, নইলে কপালে ভোগান্তি আছে। আপনাকেও যা বললাম, সেটা দয়া করে কাউকে বলবেন না।’
‘বেশ। এবার আমার গপ্পোটা শুনুন।’ বলে আমি গতরাতে ডোনাল্ড উইলসনের বাড়ি গিয়ে দেখা-শোনা সব কিছু নুনানকে জানালাম।
আমার কথা শুনে নুনান নড়েচড়ে বসল। তারপর বলল, ‘ইন্টারেস্টিং! তাহলে আপনি বলছেন, মিসেস উইলসনের স্লিপারে রক্ত লেগে ছিল? আর উনি বলেছিলেন যে ওঁর স্বামী সেই রাতে বাড়ি ফিরবেন না?’
‘প্রথম প্রশ্নের উত্তর, আমার তাই মনে হয়েছিল। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর, হ্যাঁ।’
‘মহিলার সঙ্গে তারপর আর কথা হয়েছে আপনার?’
‘সেরকম ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আজ সকালে ওই বাড়িতে আমার আগেই ম্যাক্স থ্যালার নামের এক নওজোয়ানকে ঢুকতে দেখে ইচ্ছেটা বাতিল করতে হল।’
‘মানে?!’ নুনান চেয়ার ছেড়ে, ওই বিশাল চেহারা নিয়েও, প্রায় লাফিয়ে উঠল। ‘আপনি বলছেন, হুইস্পার ওখানে ছিল?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘আপনি তো কামাল করে দিয়েছেন!’ বেড়ালের আদুরে ঘড়ঘড়ের মতো আওয়াজ তুলে বলল নুনান। ‘হুইস্পারের ‘‘একান্ত আপন’’ হল ডিনা ব্র্যান্ড। অথচ সে মিসেস উইলসনের সঙ্গে দেখা করতে গেছিল! চলুন, স্রেফ আপনি আর আমি মিলে স্বামীহারা অসহায় মহিলাটিকে একটু সান্ত্বনা দিয়ে আসি।’
ডোনাল্ড… না, আপাতত শুধু মিসেস উইলসনের বাড়ির দরজার সামনে নুনান একটু থমকে গেল। কলিং বেলের পাশে ঝোলানো কালো ক্রেপটা আমাদের দু-জনেরই নজরে পড়েছিল। তারপর নুনান হয়তো নিজেকেই বলল, ‘এসব ভেবে লাভ নেই। কাজটা সেরে ফেলাই ভালো।’
গৃহকর্ত্রী আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইছিলেন না। কিন্তু পুলিশ চিফ জোরাজুরি করলে, আর নুনান বিলক্ষণ জোরাজুরি করেছিল, ‘না’ বলাটা কঠিন হয়ে যায়। লাইব্রেরিতে বসে আমরা মুখোমুখি হলাম। মিসেস উইলসনের কালো পোশাক আর বরফের মতো ঠান্ডা চোখ জোড়া আমাদের বেরিয়ে যেতে বলছিল। কিন্তু এসব কাজে গায়ের চামড়া একটু মোটা না হলে চলে না। জড়ানো গলায় শোকজ্ঞাপন করেই নুনান কাজের কথায় এল।
‘আমাদের কয়েকটা প্রশ্ন আছে। যেমন, কাল রাতে আপনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় গেছিলেন?’
আমার দিকে একটা জ্বালাময়ী দৃষ্টি দিয়ে নুনানের দিকে ফিরলেন মিসেস উইলসন, তারপর বললেন, ‘জানতে পারি কি, কেন আমায় এভাবে জেরা করা হচ্ছে?’
মনে মনে ভাবলাম, আজ অবধি কতবার এই প্রশ্নটা, অবিকল এক সুরে, একইরকম মুখে, কতজনের মুখে শুনেছি, তার লেখাজোখা নেই। ইতিমধ্যে নুনান প্রশ্নটাকে পাশ কাটিয়ে, খুব নরম গলায় বলল, ‘তারপর ধরুন, আপনার জুতোয় কিছু একটার দাগও লেগেছিল। কীসের দাগ ছিল বলুন তো ওটা?’
মহিলার ঠোঁটের কোণে একটা পেশি তিরতির করে কাঁপতে শুরু করল। তার মধ্যেও মহিলা বললেন, ‘আর কিছু?’
‘আর কিছু?’ আমার দিকে ঘুরে প্রশ্নটা করল নুনান। আমি উত্তর দেওয়ার আগেই ও ঘুরে মহিলার দিকে তাকিয়ে, মুচকি হাসি মিশিয়ে বলল, ‘ও, হ্যাঁ। ভুলেই গেছিলাম প্রায়। আপনি কীভাবে জেনেছিলেন যে আপনার স্বামী গতরাতে বাড়ি ফিরবেন না?’
মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। টলমল করতে করতে চেয়ারের পেছনটা ধরে বললেন, ‘মাফ করবেন। আমি আজ ঠিক…’
নুনান খুব দরাজ ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল, ‘অবশ্যই। আমরা স্রেফ এই ক’টা জিনিস জেনেই চলে যাব। আপনি কোথায় গেছিলেন? আপনার জুতোয় কীসের দাগ লেগেছিল? আপনি কীভাবে জানলেন যে আপনার স্বামী কাল রাতে বাড়ি ফিরবেন না? আর… হ্যাঁ, আরও একটা প্রশ্ন। ম্যাক্স থ্যালার আজ সকালে এখানে কী করছিল?’
মিসেস উইলসন চেয়ারটায় আবার বসে পড়লেন। একটু পর, তাঁর কাঁধের পাথুরে ভাবটা একটু কমলে, চেহারাটা আবার একটু ঝুঁকে পড়লে, আমি যথাসাধ্য নরমভাবে বললাম, ‘আপনি দয়া করে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন। এগুলো স্পষ্ট না করলে বিপদ আছে।’
‘আপনারা কী মনে করেন? আমার কিছু লুকোনোর আছে?’ কেটে কেটে বলছিলেন মহিলা, ‘আমি বেরিয়েছিলাম। আমার জুতোয় রক্তের দাগ লেগেছিল। আমি জানতাম, আমার স্বামী আর বেঁচে নেই। ম্যাক্স থ্যালার আজ সকালে আমার সঙ্গে আমার স্বামীর ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিল। হয়েছে?’
‘হয়নি।’ আমি বলতে বাধ্য হলাম, ‘এগুলো সবই আমরা জানি। আমরা এদের ব্যাখ্যা চাই।’
মহিলা আবার উঠে দাঁড়ালেন। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘আপনাদের আচরণ অত্যন্ত অভদ্র ঠেকছে আমার। এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।’
‘তাতে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই, মিসেস উইলসন।’ শান্ত গলায় বলল নুনান, ‘তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে আমাদের সঙ্গে সিটি হলে যেতে হবে।’
মিসেস উইলসন আবার বসে পড়লেন। তারপর আমার দিকে ঘুরে, প্রায় থুতু ছেটানোর মতো করে উগরে দিলেন কথাগুলো।
‘কাল রাতে আমরা যখন ডোনাল্ডের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন আমি একটা ফোন পাই। যে ফোন করেছিল সে পুরুষ। নিজের নাম বলেনি। তার বক্তব্য ছিল, ডোনাল্ড পাঁচ হাজার ডলারের একটা চেক নিয়ে ডিনা ব্র্যান্ড নামের একটি মেয়ের কাছে গেছে। লোকটা আমাকে একটা ঠিকানা দিয়ে সেখানে যেতে বলে। আমি সেই ঠিকানায় গিয়ে, কিছুটা দূরে গাড়িতে বসেই ডোনাল্ডের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
কিছুক্ষণ পর আমি ম্যাক্স থ্যালারকে দেখি। আমি ওকে আগেও দেখেছি, তাই চিনতাম। থ্যালার ওই মেয়েটির বাড়ির কাছে গেল, কিন্তু ভেতরে ঢুকল না, বরং বেরিয়ে গেল। একটু পরেই ডোনাল্ড বেরিয়ে এসে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। ও আমাকে দেখেনি। আমিও নজরের আড়ালে থাকতে চাইছিলাম। আমার ইচ্ছে ছিল ও বাড়ি ফেরার আগেই ফিরে আসা। সবে গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছি, তখনই গুলির শব্দ শুনে চোখ তুললাম। আমার সামনেই ডোনাল্ড পড়ে গেল। আমি গাড়ি থেকে নেমে ওর কাছে ছুটে গেলাম। বুঝতে পারলাম, ও মারা গেছে। আমি উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম, কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তখনই থ্যালার ওখানে এল। ও আমাকে বোঝাল, পুলিশ ওখানে এসে আমাকে পেলে বলবে, আমিই ডোনাল্ডকে খুন করেছি! ওর কথাতেই আমি শেষ অবধি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, গাড়ি চালিয়ে, বাড়িতে ফিরে আসি।’
মহিলার চোখ সজল হয়ে উঠেছিল। মুশকিল হল, আমি বুঝতে পারছিলাম, চোখের জলের মধ্য দিয়েও মিসেস উইলসন আমাদের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছেন। তাই আমিও চুপচাপ ছিলাম।
‘আপনারা কি এটাই শুনতে চেয়েছিলেন?’
‘প্রায়।’ নুনান মহিলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, ‘আজ থ্যালার কী বলল?’
‘থ্যালার বলল, আমি যেন মুখ না খুলি।’ মহিলার গলার আওয়াজটা ক্রমেই কমে আসছিল, ‘ও বলল, ডোনাল্ড যেহেতু ওই মহিলাকে টাকা দিয়ে ফেরার পথে খুন হয়েছিল, আমরা ওখানে ছিলাম জানলে পুলিশ আমাদের দু-জনকেই সন্দেহ করবে।’
‘গুলি কোত্থেকে এসেছিল, দেখেছিলেন?’
‘আমি জানি না। আমি কিছু দেখিনি। শুধু… ডোনাল্ডকে পড়ে যেতে দেখেছিলাম।’
‘গুলি কি থ্যালার চালিয়েছিল?’
‘না।’ খুব চটজলদি, মানে না ভেবে কিছু বলার সময় আমাদের যতটুকু সময় লাগে ততটুকু নিয়েই বললেন মিসেস উইলসন। তবে তারপরেই তিনি থমকে গেলেন। থেমে থেমে বললেন, ‘আমি জানি না। আমার মনে হয়, না। থ্যালার কোথায় ছিল আমি জানি না। কিন্তু আমার মনে হয়… আমি জানি না!’
আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল নুনান। তারপর মিসেস উইলসনকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনাকে কে ফোন করেছিল, আপনি জানেন?’
‘লোকটা তার নাম বলেনি।’
‘আওয়াজটা চিনতে পেরেছিলেন?’
‘না।’
‘কীরকম আওয়াজ ছিল লোকটার?’
‘নীচু স্বরে কথা বলছিল লোকটা। মনে হচ্ছিল, লোকটা ভয় পাচ্ছে যে ওর কথাগুলো কেউ শুনে নেবে। আমাকে খুব কষ্ট করে ওর কথাগুলো বুঝতে হচ্ছিল।’
‘লোকটা কি ফিসফিস করে কথা বলছিল?’ নুনানের চোখের তারায় লোভ ঝকমকিয়ে উঠল।
‘হ্যাঁ। একটা খসখসে, অথচ নীচু আওয়াজ।’
নুনান মুখ খুলেও বন্ধ করে ফেলল। নিজের কথাগুলো গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘আপনি তো ম্যাক্স থ্যালারের আওয়াজ শুনেছেন, তাই না?’
মহিলা চমকে উঠলেন। বিস্ফারিত চোখে আমাদের দু-জনকে দেখে বললেন, ‘ওই ছিল! ফোনটা করেছিল ম্যাক্স থ্যালার।’
গ্রেট ওয়েস্টার্ন হোটেলে ফিরে দেখলাম, ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যাশিয়ার রবার্ট অ্যালবারি লবিতে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমার ঘরেই বসা গেল। অনুপান সহযোগে পানীয়র গ্লাস অ্যালবারির হাতে তুলে বললাম, ‘এইবার আমাকে মহিলাটির সম্বন্ধে ‘‘অনেক’’ কথা শোনাও।’
‘আপনি কি মহিলাকে দেখেছেন?’ জানতে চাইল অ্যালবারি।
‘এখনও না।’
‘তাঁর সম্বন্ধে কিছু শুনেছেন?’
‘এটুকুই যে মহিলা নিজের লাইনে একজন এক্সপার্ট।’
‘সত্যবচন।’ ও একমত হল। ‘আপনি যখন মহিলাকে প্রথম দেখবেন, বেশ হতাশ হবেন। তারপর, একদম ‘কী হইতে কী হইয়া গেল’ স্টাইলে আপনি আবিষ্কার করবেন, আপনার জীবনের যাবতীয় কথা, ব্যথা, ইতিহাস, ভূগোল, আপনি ওকে বলতে শুরু করেছেন। আর সেই যে আপনি ফাঁসলেন…!’
‘সাবধানবাণীর জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু, তুমি এত কথা কীভাবে জানলে?’
লাজুক মুখে হাসল অ্যালবারি। তারপর স্বীকার করল, ‘আমিও মহিলার হাতে বরবাদ হওয়া এক হতভাগ্য।’
‘কতটা বরবাদ? যা শুনেছি তাতে মনে হয় মহিলা প্লেটে কিছু অবশিষ্ট রাখেন না।’
‘ঠিকই শুনেছেন। তবে ওটা ফ্যাক্টর নয়। শুনতে অদ্ভুত লাগবে, কিন্তু ওর ওই লোভী আর চশমখোরি দিকটা ও লুকোনোর চেষ্টাই করত না, তাই আমারও খারাপ লাগত না।’
‘তাহলে?’
‘আমার যা কিছু ছিল, সব ফুরিয়ে গেল একসময়।’
‘ডিনা’র কাছে তুমি তখনই পুরোনো খেলনা হয়ে গেলে বুঝি?’
‘না।’ অ্যালবারির মুখ লাল হয়ে উঠল। ‘এটা আপনাকে বলছি, কারণ ডিনা’র চরিত্রের এই দিকটা কম লোকই জানে। আমার নিজের টাকাপয়সা ফুরিয়ে গেছিল বলে আমি ব্যাঙ্ক থেকে… নিইনি, কিন্তু ভাবছিলাম। ডিনা সেটা বুঝে ফেলে। ওর কাছ থেকে কিচ্ছু লুকোনো যেত না। বুঝতে পেরেই ও আমার সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ করে দেয়।’
‘সেটা কি শুধুই নীতিগত কারণে?’ ছোকরার রোমান্টিক হাবভাব আমার গায়ে জ্বালা ধরাচ্ছিল। ‘হয়তো ডিনা ভেবেছিল, তুমি ওর জন্য ব্যাঙ্কের তহবিল তছরুপ করলে ওর কপালেও দুঃখ আছে।’
‘হতে পারে।’ অ্যালবারি একমত হল। ‘তবে সেটাই একমাত্র কারণ নয়।’
‘তাই কি? আমি তো শুনেছি, ডিনা-র দরবারে কঠোরভাবে ‘‘ফেলো কড়ি, মাখো তেল’’-ই একমাত্র নীতি।’
‘আপনি ড্যান রল্্ফ-এর নাম শুনেছেন?’
‘না। সে কে?’
‘ডিনা’র ভাই, বা সৎ ভাই, বা ওইরকম কিছু বলে লোকে ভাবে। আদতে লোকটা ওর কেউ নয়, কিন্তু ডিনা ওকে আশ্রয় দিয়েছে।’
‘আর কেউ?’
‘এক ইউনিয়ন লিডারের সঙ্গে মাঝে ও বেশ কিছুদিন ঘোরাঘুরি করেছে। তার কাছ থেকে পয়সা পাওয়ার কোনো আশাই ছিল না।’
‘ইউনিয়ন লিডার?’
‘হ্যাঁ। বাইরে থেকে এসেছে। কুইন্ট। লোকে বলে, ডিনা-র টানেই ও ফিরে যায়নি। এখানেই থেকে গেছে।’
‘অ। ওদের দু-জনের মধ্যে মাখো মাখো ব্যাপারটা এখনও আছে বুঝি?’
‘না। ডিনা আমাকে বলেছিল, ও কুইন্টকে ভয় পায়। কুইন্ট নাকি ওকে শাসিয়েছিল, বেচাল দেখলে মেরে দেবে!’
‘বাব্বা! এ মেয়ে তো শহরের মোটামুটি সবাইকেই কখনো-না-কখনো নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে মনে হচ্ছে। এর লেটেস্ট ‘‘শিকার’’ কে ছিল? ডোনাল্ড উইলসন?’
‘জানি না।’ চিন্তিত মুখে বলল অ্যালবারি, ‘পুলিশ চিফ আমাদের বলেছিলেন খুঁজে দেখতে, এর আগে উইলসন ডিনা-র নামে আর কোনো চেক কেটেছিল কি না। কিন্তু আমরা কিচ্ছু পাইনি।’
‘বেশ। তুমি যতটুকু জান তার ভিত্তিতেই বলো, ডিনা-র শেষ কাস্টমার, বা আশিক, কে ছিল?’
‘ম্যাক্স থ্যালার। এই শহরে বেশ কয়েকটা জুয়ার আড্ডা চালায় ও। লোকে ওকে ‘‘হুইস্পার’’ বলে ডাকে। আপনি হয়তো ওর কথা শুনেছেন।’
রাত সাড়ে আটটায় অ্যালবারি ঘরমুখো হল। আমি ফরেস্ট স্ট্রিটে মাইনার্স হোটেলের দিকে হাঁটলাম। হোটেল থেকে কিছুটা আগেই বিল কুইন্টের সঙ্গে দেখা হল।
‘কী খবর?’ আমি ওকে ডাকলাম। ‘আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতেই যাচ্ছিলাম তো।’
‘আপনি টিকটিকি?’ আমার সর্বাঙ্গে চোখ বুলিয়ে কাশি আর গর্জনের মাঝামাঝি গলায় বলল কুইন্ট।
‘কোনো মানে হয়!’ আমি হতাশ হওয়ার অভিনয় করলাম। ‘আমি আপনাকে ঠকানোর জন্য কত কিছু ভেবে এলাম, আর আপনি তার আগেই সব ধরে ফেললেন?’
‘আপনি আমার কাছে কী জন্য আসছিলেন?’
‘ডোনাল্ড উইলসন। আপনি তো তাকে ভালোই চিনতেন, তাই না?’
‘ভালো না। চিনতাম।’
‘কেমন ছিল মানুষটা?’
ছাই-রঙা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ফস্ করে কিছুটা বাতাস ছেড়ে কুইন্ট উত্তর দিল, ‘একটা ফালতু লিবারাল।’
‘ডিনা ব্র্যান্ডকে চেনেন?’
‘চিনি।’ কুইন্টের চেহারাটা আগের দিনের চেয়ে ঘাড়ে-গর্দানে ঠেকছিল। চোখের ভুল নয়। আমি বুঝলাম, ও আমার সঙ্গে হাতাহাতির মওকা খুঁজছে।
‘আপনার কী মনে হয়? উইলসনকে ওই খুন করেছে?’
‘অবশ্যই।’
‘আপনি খুনটা করেননি তাহলে?’
‘অবশ্যই করেছি।’ আমার দিকে এক পা এগিয়ে বলল কুইন্ট। ‘আমরা দু-জনে মিলেই তো খুনটা করলাম। আপনার আর কোনো প্রশ্ন আছে?’
‘আছে। তবে,’ আমি ব্রডওয়ের দিকে ঘুরে বললাম, ‘আপনাকে সেগুলো জিজ্ঞেস করা বৃথা। আপনি এখন শুধুই মিথ্যে বলবেন।’
ব্রডওয়েতে এসে আমি একটা ট্যাক্সি নিয়ে ড্রাইভারকে গন্তব্যের ঠিকানাটা বললাম। ১২৩২ হারিকেন স্ট্রিট।
