দুই – পয়জনভিলের পাদশাহ্
‘মর্নিং হেরাল্ড’ ডোনাল্ড উইলসন ও তার অপমৃত্যুর পেছনে দু-পাতা খরচ করেছিল। ছবির মানুষটিকে দেখে হাসিখুশি, বুদ্ধিদীপ্ত এবং সুদর্শন বলেই মনে হচ্ছিল। রিপোর্ট মোতাবেক হারিকেন স্ট্রিটের এগারোশো নম্বরের ব্লকে, গতরাত দশটা চল্লিশে, ডোনাল্ডের উদ্দেশে .৩২ ক্যালিবারের পিস্তল থেকে মোট ছ-টা গুলি ছোড়া হয়। তার মধ্যে চারটে তার তলপেট, বুক, আর পিঠে ঢোকে, বাকি দু’টো ফসকে পাশের দেওয়ালে লাগে। সেই গুলির গতিপথ হিসেব করে পুলিশ বুঝেছে, গুলি এসেছিল একটু দূরের একটা সরু গলি থেকে। গুলির আওয়াজ পেয়ে ওই ব্লকের বাসিন্দারা বেরিয়ে আসেন। কয়েকজন দেখেন, মানুষটির ওপর ঝুঁকে রয়েছে একটি নারী ও একটি পুরুষ। তাদের চেহারা দেখার মতো আলো ওখানে ছিল না। অন্যরা কাছাকাছি আসার আগেই সেই দু-জন পালিয়ে যায়।
সম্পাদকীয়-তে ডোনাল্ড উইলসনের কাজকর্মের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হয়েছিল। একেবারে চাঁচাছোলা ভঙ্গিতে এও বলা হয়েছিল যে সততা আর আইনের হয়ে লড়তে গিয়েই মানুষটির মৃত্যু হল। অতঃপর সেই মানুষটির খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পারলেই বোঝা যাবে, পুলিশ চিফ কাদের পক্ষে আছেন।
কফি শেষ করে আমি প্রয়াত ডোনাল্ড উইলসনের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। কিন্তু ওখানে ঢোকার একটু আগেই পরিকল্পনাটা বদলাতে হল। যাকে আমি রাস্তা পার হয়ে ওই বাড়িতে যেতে দেখলাম তাকে চিনতে অসুবিধে হয়নি। লোকটা ম্যাক্স থ্যালার, ওরফে হুইস্পার!
ডাইরেক্টরি থেকে এলিহু উইলসনের নম্বর পেতে অসুবিধে হল না, তবে ফোনে মানুষটির নাগাল পাওয়া যে বড়োই কঠিন তা টের পেলাম একটু পরেই। শেষ অবধি ওঁর সেক্রেটারিকে বলতেই হল, ডোনাল্ড উইলসন আমাকে এই শহরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু সম্বন্ধে আমি যা জানি তা আমি শুধু তাঁর বাবাকেই বলব। ওতেই চিচিং ফাঁক হল। আমাকে অবিলম্বে ওই ঠিকানায় হাজিরা দিতে বলা হল।
বয়স্ক মানুষটির নিটোল গোল মাথা, পুঁচকে নাক, চওড়া গলা, চাদর থেকে বেরিয়ে থাকা ছোটো হাতের ভোঁতা আঙুল দেখে কারও মনে হতেই পারে, মানুষটি নিতান্ত নিরীহ। কিন্তু কুতি কুতি নীলচে চোখ জোড়া দেখে আমার মনে হল, লোকটা পাক্কা ডাকাত। মোদ্দা কথা, এলিহু উইলসনের পকেট মারতে গেলে নিজের আঙুলের ওপর অগাধ ভরসা থাকা দরকার।
‘আমার ছেলের ব্যাপারে আপনি কী জানেন?’
কর্কশ গলা, আর মুখের বদলে বুক থেকে বেরোনোর ফলে প্রশ্নটা আমার কানে গর্জনের মতোই শোনাল। বুঝলাম, সময় নষ্ট করে লাভ নেই।
‘আমি কন্টিনেন্টাল ডিটেকটিভ এজেন্সির সানফ্রানসিস্কো ব্রাঞ্চের একজন অপারেটিভ।’ সত্যি পরিচয়টাই দিলাম আমি। ‘ক’দিন আগে আপনার ছেলে আমাদের কাছে একটা চেক আর একটা চিঠি পাঠান। চিঠিতে বলা ছিল, কয়েকটা কাজের জন্য তাঁর একজন লোকের দরকার। তেমন কাউকে যেন এখানে পাঠানো হয়। আমিই সেই লোক। উনি আমাকে গতকাল রাতে ওঁর বাড়িতে যেতে বলেন। আমি যাই, কিন্তু উনি ছিলেন না। ফেরার পথে আমি জানতে পারি, উনি খুন হয়েছেন।’
‘তো?’ বুড়োর চোখে সন্দেহ ঘন হতে শুরু করল।
‘আমি যখন আপনার ছেলের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন আপনার পুত্রবধূ একটা ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে যান। ফোনটা এসেছিল দশটা কুড়িতে। উনি ফিরে আসেন রাত এগারোটা পাঁচে। তখন ওঁর স্লিপারে একটা কিছুর দাগ লেগে ছিল যেটা রক্ত হতে পারে। উনি বলেন, সেই রাতে ওঁর স্বামী বাড়ি ফিরবেন না। আপনার ছেলে খুন হন দশটা চল্লিশে।’
বুড়ো খাটে একেবারে সিধে হয়ে বসল। তারপর মিসেস উইলসনের উদ্দেশে একরাশ গালাগাল দিল। স্টক মোটামুটি খালি হলে আমার দিকে তাকিয়ে চেঁচাল লোকটা, ‘মেয়েটা কি জেলে আছে?’
আমার ‘না’ উত্তরটা বুড়োর পছন্দ হল না। আরও একপ্রস্থ বিষাক্ত বাক্যবাণ যত্রতত্র নিক্ষিপ্ত হল, যার শেষে আমার উদ্দেশে একটা প্রশ্ন ছিল, ‘তুমি আর কী পেলে ব্যাপারটা পুলিশকে জানাবে?’
‘প্রমাণ।’
‘আর কী প্রমাণ চাও তুমি? যা দেখেছ সেটাই তো যথেষ্ট।’
‘বাজে বকবেন না।’ কড়া গলায় বলতে বাধ্য হই আমি। ‘আগে আমাকে বোঝান, মিসেস উইলসন আপনার ছেলেকে কেন খুন করবেন?’
‘কারণ মেয়েটা নষ্টা! কারণ মেয়েটা…’
উইলসনের সেক্রেটারি বসের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বগ্নি হয়ে পড়েছিল। সে ভয়ে ভয়ে দরজা দিয়ে ভেতরে মুখ বাড়াতেই পরবর্তী হুংকারটা তার দিকে ধেয়ে গেল, ‘বেরোও!’
‘চেঁচাবেন না।’ আমি বললাম, ‘আমার কানের পটহটা বেশ সরেস আছে। আস্তেই বলুন।’
‘আমি যত বুড়ো বা রুগ্্ণই হই না কেন,’ বুড়ো চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, ‘ইচ্ছে করছে তোমাকে লাথিয়ে ঘর থেকে বের করে দিই।’
‘আপনার পুত্রবধূ কি কোনো কারণে ঈর্ষাকাতর ছিলেন?’ লোকটার কথায় পাত্তা না দিয়ে আমি কথা চালিয়ে গেলাম।
‘ছিল।’ শান্ত গলায় বলল বুড়ো। ‘ঈর্ষাকাতর, পায়াভারী, দাম্ভিক, সন্দেহপরায়ণ, লোভী, অভদ্র, স্বার্থপর, চোর… মানে একেবারে জঘন্য টাইপের মেয়ে যাকে বলে!’
‘এই ঈর্ষার কি কোনো কারণ ছিল?’
‘আমি মনে-প্রাণে চাই যেন তেমন কোনো কারণ, বা কেউ থাকে।’ তেতো গলায় বলল বুড়ো। ‘আমার ছেলে ওইরকম একটি বদ মেয়ের প্রতি বিশ্বস্ত হবে, এটা ভাবলেই গায়ে জ্বালা ধরে। তবে ওর পক্ষে সবই সম্ভব।’
‘কিন্তু কেন মহিলা তাঁর স্বামীকে খুন করতে বা করাতে পারেন, সেটা নিয়ে আপনি কিছু জানেন কি?’
‘মানে?’ বুড়ো আবার চেঁচাল, ‘এতক্ষণ ধরে আমি কী বলছিলাম তোমাকে? তুমি কি কালা?’
‘না। আমি কালা নই। কিন্তু এতক্ষণ আপনি যা বললেন তার মধ্যে কংক্রিট কিছু নেই। ওগুলো শুনলে ছেলেমানুষি বলেই মনে হয়।’
বুড়ো আর থাকতে পারল না, পায়ের ওপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে তারস্বরে চেঁচাল, ‘স্ট্যানলি!’
দরজা খুলে সেক্রেটারিটি ঢুকল।
‘এই হারামজাদাকে ঘাড় ধরে বের করে দাও!’ আমাকে দেখিয়ে আদেশ দিলেন পয়জনভিলের অধিপতি।
সেক্রেটারি ভ্রূ কুঁচকে আমাকে দেখল। লোকটা আমারই বয়সি, কিন্তু ওজনে হালকা। আমার চেহারায় চর্বি আছে ঠিকই, তবে সবটাই চর্বি নয়। আমি আলতো করে মাথা নেড়ে বললাম, ‘লোক ডাকুন।’ একটা ক্লিষ্ট হাসি উপহার দিয়ে সেক্রেটারি বেরিয়ে গেল। আমি নিজের কথা চালু রাখলাম।
‘আমি আজ সকালে আপনার পুত্রবধূর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ম্যাক্স থ্যালারকে ওই বাড়িতে ঢুকতে দেখে আমি পরিকল্পনা বাতিল করি।’
এলিহু উইলসন সযত্নে নিজের গলা অবধি কম্বল দিয়ে ঢাকা দিলেন। বালিশে মাথা দিয়ে, সিলিঙের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে বললেন, ‘অ! তাহলে এই ব্যাপার।’
‘আপনি এর থেকে কিছু বুঝলেন?’
‘এটাই বুঝলাম যে আমার ছেলেকে ওই… মেয়েছেলেটাই খুন করেছে।’
আমি হল ঘরে পায়ের শব্দ পেলাম। ভারী পায়ের শব্দ। সেক্রেটারির চেয়ে ভারী পা। সেগুলো যখন দরজার ঠিক বাইরে এসে পড়েছে, আমি তখনই প্রশ্নটা শুরু করলাম।
‘আপনি আপনার ছেলেকে দিয়ে…’
‘দূর হও!’ এবারের গর্জনটা দরজার দিকে ধেয়ে গেল। ‘আর দরজাটা আমি না বলা অবধি যেন বন্ধই থাকে।’
জ্বলন্ত চোখজোড়া আমার ওপর নিবিষ্ট হল। প্রশ্নও এল, ‘আমি আমার ছেলেকে দিয়ে কী করাচ্ছিলাম?’
‘থ্যালার, ইয়ার্ড আর ফিনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করাচ্ছিলেন।’
‘মিথ্যুক!’
‘এটা আমার বানানো গপ্পো নয়। গোটা পার্সনভিলে এটা ছড়িয়েছে।’
‘সব বানানো। আমি আমার কাগজ দুটো ওকে চালাতে বলেছিলাম। ও যা খুশি তাই করেছে কাগজ নিয়ে।’
‘এটা আপনার ‘‘নিজের লোকেদের’’ বোঝানো উচিত ছিল। তারা হয়তো আপনাকে বিশ্বাস করত।’
‘তারা কী ভাবল তাতে আমার কিস্সু যায় আসে না। আমি তোমাকে যেটা বলছি সেটাই সত্যি।’
‘হয়তো।’ আমি নির্বিকারভাবে বলি, ‘হয়তো আপনি যেমন বলছেন, সেভাবে মিসেস উইলসনই তাঁর স্বামীকে খুন করেছেন বা করিয়েছেন। কিন্তু আপনি পার্সনভিলের রাজনীতি আমার চেয়ে ভালো বোঝেন। আপনার কি মনে হয় না যে এই ব্যাপারটার সবকটা অ্যাঙ্গল খুঁটিয়ে দেখা দরকার?’
‘আমার মনে হয়,’ বুড়ো আবার চেবানো গলায় ফিরে গেছিল, ‘তোমাকে আর তোমার মোটা মাথার মোটা তত্ত্বগুলোকে অবিলম্বে বস্তাবন্দি করে সানফ্রানসিস্কোতে ফেরত পাঠানো উচিত।’
উঠে পড়লাম। তেতো গলায় বললাম, ‘আমি গ্রেট ওয়েস্টার্ন হোটেলে আছি। ঠান্ডা মাথায় কিছু বলার থাকলে খবর পাঠাবেন। নইলে জ্বালাবেন না।’
ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলাম। স্ট্যানলি নামের সেক্রেটারিটি আমার দিকে এবার একটা অসহায় হাসি উপহার দিল।
‘খেঁকুটে বুড়োর মেজাজটা একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন রয়েছে দেখছি!’ আমি বললাম।
‘প্রাণশক্তিতে ভরপুর, যাকে বলে।’ মাথা নেড়ে সায় দিল স্ট্যানলি।
‘হেরাল্ড’-এর দপ্তরে গিয়ে খুন হওয়া মানুষটির সেক্রেটারিটিকে খুঁজে বের করলাম। বাচ্চা মেয়ে। ছোটোখাটো চেহারা। বয়স উনিশ-কুড়ি হবে। বড়ো বড়ো বাদামি চোখ আর হালকা খয়েরি ঢেউখেলানো চুল মেয়েটার মিষ্টি মুখটাকে আরও সুন্দর করে তুলেছে। নাম লুইস।
‘মিস্টার উইলসন আমাকে এই নিয়ে কিচ্ছু বলেননি।’ আমাকে পার্সনভিলে কেন ডেকে আনা হয়েছিল, এই প্রশ্নের উত্তরে বলল লুইস। তারপর একটু ভেবে যোগ করল, ‘তবে উনি সব কিছু একেবারে শেষ মুহূর্ত অবধি গোপন রাখতেই চাইতেন। উনি এখানে কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন না।’
‘আপনাকেও না?’
মেয়েটার ফর্সা মুখে লালের ছোঁয়া লাগল। ‘না। তবে উনি এখানে এতই কম সময় হল এসেছিলেন যে আমাদের কাউকেই সেভাবে চেনার সুযোগ পাননি।’
‘এর মধ্যে আরও কিছু আছে, লুইস। আপনি জানেন, কিন্তু বলছেন না।’
মেয়েটা নিজের ঠোঁট কামড়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। আনমনে আঙুল দিয়ে টেবিলের ধারগুলো ঘষল। আমি জানতাম, এগুলো কথা বলার প্রস্তুতি। তাই চুপ করে রইলাম। অবশেষে ও বলতে শুরু করল।
‘মিস্টার উইলসনের বাবা ডোনাল্ডের এই… এই কাজগুলোকে সমর্থন করছিলেন না। যেহেতু মিস্টার এলিহু উইলসনই কাগজগুলোর মালিক, ডোনাল্ড ভাবতেন, তাঁর কর্মচারীরা তাঁর বদলে এলিহুর প্রতিই বেশি বিশ্বস্ত হবেন। তাই উনি এখানে কাউকেই ঠিক বিশ্বাস করতেন না।’
‘এলিহু উইলসন ছেলের ‘‘স্বচ্ছ শহর অভিযান’’-এর সমর্থক ছিলেন না? তাহলে ডোনাল্ডের কাছ থেকে কাগজগুলো নিয়ে নিলেন না কেন?’
‘শেষবার এলিহু উইলসন যখন অসুস্থ হন, তখন ডক্টর প্রাইড তাঁকে বলেন, কাগজগুলো চালানোর দায়িত্ব তাঁকে স্বাস্থ্যের কারণেই অন্য কাউকে দিতে হবে। তখন এলিহু ডোনাল্ড আর তাঁর স্ত্রীকে প্যারি থেকে নিয়ে আসেন। ডোনাল্ড ইউরোপে সাংবাদিকতা করেছিলেন, তাই কাগজের দায়িত্ব পেয়ে তিনি দারুণ খুশি হন। প্রথম দিন থেকেই শহরে চলা দুর্নীতি আর অনাচারের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে লেগে পড়েন ডোনাল্ড। আসলে উনি সত্যিটা জানতেন না। জানতেন না যে…’
মেয়েটার কথা দম ফুরোনো পুতুলের মতো থেমে গেল। আমিই বাক্যটা সম্পূর্ণ করলাম, ‘জানতেন না যে এইসব অকাজ-কুকাজের হোতা তাঁর বাবা নিজেই!’
মেয়েটা একটু কুঁকড়ে গেল। তারপর বলে চলল, ‘এলিহু আর ডোনাল্ডের মধ্যে বিরাট ঝগড়া হয়। এলিহু হুমকি দিয়েছিলেন, ডোনাল্ড এই অভিযান না থামালে উনি কাগজগুলো ওঁর হাত থেকে সরিয়ে দেবেন। হয়তো দিতেনও, কিন্তু তারপর এলিহু আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে যেমন চলছিল তেমনই চলতে থাকে।’
‘ডোনাল্ড উইলসন আপনাকে বিশ্বাস করতেন না?’
‘না।’ প্রায় ফিসফিস করে উত্তরটা এল।
‘তাহলে আপনি এসব কীভাবে জানলেন?’
‘দেখুন। আমি…’ মেয়েটা ঢোঁক গিলে বলে উঠল, ‘আমি শুধু আপনাকে সাহায্য করতে চাইছি, যাতে ডোনাল্ড উইলসনের খুনি ধরা পড়ে।’
‘আর সেটা আপনি সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারবেন যদি আপনি বলেন, কে আপনাকে এসব বলত।’
‘আমার বাবা।’ আবার ফিসফিস শুনলাম। ‘উনি এলিহু উইলসনের সেক্রেটারি।’
‘গতরাতে ডোনাল্ড উইলসন আমাকে তাঁর বাড়িতে আসতে বলেছিলেন। তাহলে ওইসময় তিনি হারিকেন স্ট্রিটে কী করছিলেন?’
লুইস জানাল, সে জানে না। আমি ওকে গতদিন আমার ফোন করার পর থেকে যা যা হয়েছিল, সব মনে করতে বললাম।
‘আপনি দুটো নাগাদ ফোন করেছিলেন, মানে যদি ওটা আপনিই হয়ে থাকেন। ডোনাল্ড আপনাকে রাত দশটায় ওঁর বাড়ি আসতে বলেছিলেন। তারপর উনি কয়েকটা চিঠি ডিকটেট করলেন, একটা পেপার মিলে, একটা সেনেটর কিফারের উদ্দেশে, পোস্ট অফিসের নতুন নিয়ম নিয়ে। তারপর… ও, হ্যাঁ! তিনটের একটু আগে উনি মিনিট কুড়ির জন্য বেরিয়েছিলেন। তার আগে উনি একটা চেক কেটেছিলেন।’
‘কার নামে?’
‘জানি না। তবে চেকটা কাটতে দেখেছিলাম।’
‘চেকবইটা কোথায়?’
‘এই যে।’ ডোনাল্ড উইলসনের টেবিলের একটা ড্রয়ার টেনে বলল লুইস, ‘লকড তো!’
একটা তার আর ছুরি দিয়ে কারিকুরি করে ড্রয়ারটা খুলে ফেলতে আমার বেশি সময় লাগল না। ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের একটা চেকবই ওপরেই ছিল। লিফ থেকে নাম না পেলেও এটুকু বুঝলাম যে চেকটা পাঁচ হাজার ডলারের ছিল।
‘চেকটা নিয়ে বেরিয়ে উনি আবার কতক্ষণ পরে ফিরেছিলেন? কুড়ি মিনিট?’
‘হ্যাঁ।’ ভ্রূ কুঁচকে বলল লুইস। ‘কিন্তু ব্যাঙ্কে গিয়ে কাজটা সেরে ফিরতে পাঁচ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়।’
‘চেকটা লেখার আগে আর কিছু হয়েছিল? আর কিছু এসেছিল? কোনো চিঠি? বা ফোন?’
‘দাঁড়ান। উনি ডিকটেশন দিচ্ছিলেন। তখন…’ মনঃসংযোগ করার জন্য বন্ধ করা চোখ জোড়া হঠাৎ খুলে বলল লুইস, ‘একটা ফোন এসেছিল। আমি একতরফের কথাই শুনেছিলাম। উনি বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি দশটায় ওখানে থাকতে পারব। তবে আমাকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে।’ অন্য দিকের কথা কিছুক্ষণ শুনে উনি আবার বলেছিলেন, ‘বেশ। তাহলে দশটায়।’ ব্যস, এই বলেছিলেন উনি, মাঝে মাঝে ‘‘হ্যাঁ’’ বলা ছাড়া।’
‘ফোনের ওদিকে কে ছিল? কোনো পুরুষ, না মহিলা?’
‘আমি কী করে বলব?’
‘ভেবে দেখুন। নারী-পুরুষ ভেদে কথা বলার ভঙ্গি বদলে যায় কিন্তু।’
একটু ভেবে লুইস বলল, ‘তাহলে… কোনো মহিলার ফোনই এসেছিল।’
‘আপনাদের মধ্যে কে আগে অফিস থেকে বেরিয়েছিলেন?’
‘আমি আগে বেরিয়েছিলাম। এলিহু-র সেক্রেটারি, মানে আমার বাবার সঙ্গে ডোনাল্ডের কিছু আলোচনা ছিল কাগজ নিয়ে। বাবা এলেন পাঁচটার একটু পরে। ওঁদের দু’জনের একসঙ্গে ডিনার করার কথা ছিল। আমি তারপরেই বেরিয়ে যাই।’
লুইস-এর কাছে এর থেকে বেশি আর কিছু জানা গেল না। হারিকেন স্ট্রিটের এগারোশো নম্বর ব্লকে ডোনাল্ড উইলসনের উপস্থিতির কারণ ওর জানা ছিল না। মিসেস উইলসনের সম্বন্ধেও দেখলাম, ও কিছুই জানে না। আমি টেবিলটা হাতড়ে কিছু পেলাম না। সুইচবোর্ডে বসা মেয়েগুলোকে খুঁচিয়েও ফোন কে করেছিল, সেটা বের করতে পারলাম না। অফিসের বাকি লোকজনের পেছনে ঘণ্টাখানেক বরবাদ করেও শেষ অবধি একটাই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম।
ডোনাল্ড উইলসন বিশেষ কাউকে বিশ্বাস করতেন না।
