Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

নয় – ছুরির ধার

পরদিন সকালে মাথার মধ্যে একটা আইডিয়ার গুঁতোগুঁতি নিয়ে ঘুম ভাঙল। পার্সনভিল মেরেকেটে চল্লিশ হাজার লোকের শহর। সেখানে খবর ছড়াতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। দশটার মধ্যেই ফিল্ডে নেমে পড়লাম। শহরের যেকোনো জায়গায় জনা দু-তিন লোক আড্ডা মারছে বা টাইমপাস করছে দেখলেই আমি সেখানে থেমে যাচ্ছিলাম। তারপর যা বলছিলাম তা এরকম,

‘দেশলাই আছে?… ধন্যবাদ… আজ রাতের ম্যাচ দেখতে যাচ্ছেন নাকি?… শুনলাম বুশ নাকি ষষ্ঠ রাউন্ডেই কাত হবে… খবরটা জেনুইন হওয়াই উচিত। আমি হুইস্পারের কাছেই শুনলাম… যা বলেছেন! এরা সব এক টাইপের।’

লোকে ‘ভেতরের খবর’ পছন্দ করে। হুইস্পারের নাম জড়িয়ে থাকলে পার্সনভিল তাকে ভীষণরকম ভেতরের খবর বলেই নেবে। যাদের বললাম তাদের অর্ধেক আমার মতোই নিষ্ঠাভরে খবরটা প্রচার করল স্রেফ এটা বোঝাতে যে তাদের কাছেও গোপন খবর-টবর থাকে। যা হওয়ার তাই হল। আমি কাজ শুরু করার সময় ইকি বুশের পক্ষে দর ছিল সাত-চার। বেলা দুটোর মধ্যে অবস্থা দাঁড়াল যে বুশের পক্ষে টাকা লাগালে লাভ হবে না। সাড়ে তিনটের মধ্যে কিড কুপার দুই-এক মার্জিনে ফেভারিট হয়ে দাঁড়াল।

একটা লাঞ্চ কাউন্টারে পেট ভরানোর ফাঁকে ওয়েটার আর জনা দুই কাস্টমারকে ‘খবর’ দিয়ে আমি বেরোলাম। একটা লোক দরজার বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। বেঁকা পা, চিবুকটা ছুঁচোলো। একটা টুথপিক চিবোতে চিবোতে, আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে লোকটা আমার সঙ্গ নিল। রাস্তার কোণে পৌঁছোনোর পর লোকটা বলল, ‘আমি জানি, আপনার কথাটা ঠিক নয়।’

‘কোন কথাটা?’

‘ইকি বুশ ফ্লপ করার কথাটা। আমি জানি, কথাটা ঠিক নয়।’

‘তাহলে আপনার তো এই নিয়ে মাথা ঘামানোই উচিত নয়। তবে বুদ্ধিমান লোকজন কুপারের ওপর বাজি ধরছে। বুশ সদয় না হলে কি এটা হয়?’

টুথপিক মুখ থেকে ছিটকে গেল। হলুদ দাঁতগুলো থুতুর সঙ্গে আমার দিকে একপ্রস্থ কথা ছুড়ে দিল।

‘ও নিজে আমাকে বলেছে! গত রাতে। কুপার ওর হাতের পুতুল। তারপর এমন কিছু ও করতেই পারে না। অন্তত আমার সঙ্গে তো নয়ই।’

‘আপনার বন্ধু বুঝি?’

‘বন্ধু নয়। তবে ও জানে… কিন্তু একটা কথা বলুন! হুইস্পার কি সত্যিই আপনাকে কথাটা বলেছে? মানে ইয়ার্কি মেরে নয়, সত্যিই?’

‘সত্যি।’

একপ্রস্থ গালাগাল দিল লোকটা। তারপর বলল, ‘আর আমি কি না ওর কথায় ভরসা করে নিজের শেষ টাকাক’টা ওর ওপর লাগালাম! আমি! যে আমি চাইলে ওকে গারদে ভরার ব্যবস্থা করতে পারি।’

‘কীসের জন্য?’

‘না।’ লোকটা নিজেকে সামলাল, ‘কিছু না।’

‘আপনার কাছে যদি মালমশলা থাকে, তাহলে আমাদের বোধ হয় কথা বলা দরকার।’ আমি লোকটাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ‘দেখুন, বুশ জিতলে আমার কোনো অসুবিধে নেই। যদি আপনার কাছে এমন কিছু থাকে যা দিয়ে এটা ম্যানেজ করা যাবে, তাহলে ক্ষতি কী?’

লোকটা থেমে গেল। নিজের পকেট হাতড়ে আর একটা টুথপিক বের করে দাঁতে গুঁজল। আমাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলল, ‘আপনি কে?’

আমি ওকে একটা নাম বললাম। হান্টার, হান্ট, হান্টিংটন… এমন কিছু একটা হবে। ওর নাম জানতে চাইলাম। লোকটা বলল, ওর নাম বব ম্যাকসোয়েন, আর সেটা আমি শহরের যাকে-খুশি-তাকে জিজ্ঞেস করে মিলিয়ে নিতে পারি। ওকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মেনে নিয়ে আমি জানতে চাইলাম,

‘তাহলে কী বলেন? আমরা বুশকে চেপে ধরব?’

‘না।’ লোকটা ঢোঁক গিলে বলল, ‘আমি ওরকম লোক নই। আমি কখনো…’

‘আপনি কখনো কিছু করেননি, শুধু লোকেরা আপনাকে ঠকালে সেটা মেনে নিয়েছেন। আপনাকে ওর পেছনে লাগতে হবে না মিস্টার ম্যাকসোয়েন। যা বলার আমাকে বলুন। যদি তার জোরে কিছু করা যায়, আমিই করব।’

লোকটা কিছুক্ষণ ভাবল। ঠোঁট চাটল। ওর মুখ থেকে টুথপিকটা পড়ে শার্টের সামনে লেগে রইল।

‘আমি যে আপনাকে এগুলো বলেছি, সেটা আপনি কাউকে বলবেন না তো?’ লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে এখানেই থাকতে হবে। এই কথাটা জানাজানি হলে আমার রক্ষে নেই। আর… আপনি ওকে জেলে পাঠাবেন না তো? স্রেফ এটা দেখবেন তো, যে ও আজ লড়বে আর… আর জিতবে?’

‘একদম।’

আমার হাত ঝাঁকিয়ে ও ঈশ্বরের নামে শপথ করাল। তারপর উত্তেজিত হয়ে বলতে শুরু করল,

‘ওর আসল নাম অ্যাল কেনেডি। দু-বছর আগে ফিলাডেলফিয়া শহরে কিস্টোন ট্রাস্ট লুঠ হয়েছিল, মনে আছে? তাতে ও জড়িত ছিল। সিজার্স ম্যাগার্টি-র দল দু-জন মেসেঞ্জারকে খুন করেছিল। অ্যাল খুন করেনি, তবে ওই দলে ছিল। বাকিরা ধরা পড়ে। অ্যাল এখানে পালিয়ে আসে। সেইজন্যই ওর ফটো কাগজে ছাপা হয় না। সেজন্যই এত ভালো বক্সার হলেও ওকে লুকিয়ে থাকতে হয়। আপনি বুঝতে পারছেন তো ব্যাপারটা?’

‘খুব ভালো বুঝতে পারছি। এবার তাহলে ওর সঙ্গে একবার দেখা করতে হয়। কোথায় পাব ওকে?’

‘ইউনিয়ন স্ট্রিট, ম্যাক্সওয়েল হোটেল। ও আজকের ম্যাচের জন্য নিশ্চয় ওখানেই এখন বিশ্রাম নিচ্ছে।’

‘কীসের বিশ্রাম? ও থোড়াই লড়বে। তবে হ্যাঁ, আমাদের একটা চেষ্টা তো করতেই হবে।’

‘আমাদের!? এই ‘‘আমাদের’’ শব্দটা আপনি পাচ্ছেন কোত্থেকে? আপনি কথা দিয়েছেন আমি এর মধ্যে কোথাও থাকব না। যা করার আপনিই করবেন!’

‘তা তো বটেই।’ আমি ওকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম, ‘ওকে দেখতে কেমন?’

‘একমাথা কালো চুল। রোগাটে। একেবারে সোজা ভ্রূ। খাড়া কান। জানি না এই দিয়ে আপনি ওকে চিনতে পারবেন কি না…’

‘ওটা আমার ওপর ছেড়ে দিন। আপনাকে পরে কোথায় পাব?’

‘মারি’জ। আমি ওখানেই থাকব। কিন্তু আপনি আমার কথা কাউকে বলবেন না! আপনি কথা দিয়েছেন।’

ম্যাক্সওয়েল হোটেল, ইউনিয়ন স্ট্রিট এই এলাকার আরও একগাদা সস্তা, জীর্ণ, রংচটা হোটেলের মধ্যে একটা। আমি যখন পৌঁছোলাম তখন কাউন্টারে কেউ ছিল না। নোংরা একটা রেজিস্টার উলটে আমি ইকি বুশ, সল্ট লেক সিটি, ২১৪ খুঁজে পেলাম। পেছনের রাকে ওই ঘরের চাবি ঝুলছিল না। আমি সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় পৌঁছে দরজা নক করলাম। কেউ খুলল না। বেশ কিছুক্ষণ আওয়াজ তুলেও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নীচে যাচ্ছিলাম। দেখলাম, সিঁড়ি দিয়ে কেউ উঠে আসছে। আলো কম হলেও লোকটাকে দেখতে পেলাম।

রোগাটে চেহারা। আর্মি শার্ট, নীল সুট, ধূসর ক্যাপ। ওর চোখের ওপর কালো ভ্রূজোড়া একটা সরলরেখা তৈরি করেছিল।

আমি বললাম, ‘হ্যালো।’

ছেলেটা থামল না। স্রেফ মাথা ঝুঁকিয়ে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল।

‘আজ জিতছেন তো?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘আশা করি।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর ভেসে এল।

আমি ওকে আরও চার কদম এগোতে দিলাম। তারপর বললাম, ‘আমিও আশা করছি। তোমাকে ফিলাডেলফিয়া ফেরত নিয়ে যেতে আমার ভালো লাগবে না, অ্যাল।’

আর এক পা এগিয়ে থেমে গেল ছেলেটা। খুব ধীরে আমার দিকে ঘুরে, আমার দিকে ঢুলু ঢুলু চোখে তাকিয়ে গলার মধ্য থেকে ‘হুঁহ্‌!’ টাইপের একটা আওয়াজ করল ও।

‘কিড কুপার বা ওর মতো কোনো ফালতু বক্সারের মার খেয়ে তুমি যদি ছ-নম্বর রাউন্ডেই পড়ে যাও, তাহলে আমার খুব খারাপ লাগবে।’ আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘ওসব কোরো না, অ্যাল। তোমাকে ফেরত নিয়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।’

মাথা নীচু করে আমার দিকে এগিয়ে এল ছেলেটা। ওর দু-হাত শরীরের দু-দিকে ঝুলছিল। আমার হাত ওভারকোটের পকেটে ছিল। সেভাবেই বললাম, ‘কথাটা মাথায় রেখো। আজ রাতে ইকি বুশ না জিতলে কাল সকালে অ্যাল কেনেডি পুবমুখো রওনা হবে।’

ছেলেটা বাঁ-কাঁধ ইঞ্চিখানেক তুলল। আমি পকেটে বন্দুকটা সামান্য নাড়ালাম। সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। গজগজ করে বলল ছেলেটা, ‘আমি জিতব না, এসব ফালতু কথা আপনাকে কে বলেছে?’

‘শুনতে পেলাম আর কি। আমারও মনে হয়, কথাটা ফালতু, তবে আজকাল কিছুই বলা যায় না।’

‘চোয়ালটা ভেঙে দিলে কিছু বলার অবস্থাই থাকবে না আপনার!’

‘যা করার তাহলে এখনই করো।’ আমি পরামর্শ দিলাম, ‘আজ রাতে তুমি জিতলে তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না। আজ তুমি হারলে দেখা হবে, তবে তোমার হাত খোলা থাকবে না।’

মারি’জ নামের একটা ব্রডওয়ে পুল রুমে ম্যাকসোয়েন আমার অপেক্ষায় ছিল।

‘ওকে বোঝাতে পারলেন?’

‘হ্যাঁ। ওই নিয়ে আর ভাববেন না। সব ঠিক হয়ে গেছে… যদি না ও শহর ছেড়ে পালায়, বা ওর পেছনে যারা আছে তাদের কিছু বলে, বা আমার কথা না শোনে, বা…’

‘আপনি বরং সাবধান থাকুন।’ ম্যাকসোয়েন দারুণ নার্ভাস হয়ে বলল, ‘ওরা আপনাকে পথের কাঁটা ঠাওরালে বিপদ আছে। আমি… আমাকে একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে।’

ও কেটে পড়ল।

শহরের প্রান্তে একটা পুরোনো অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ছিল। তার পরিত্যক্ত ক্যাসিনোটা পয়জনভিলের এক নম্বর বক্সিং রিং হয়ে গেছিল। মোটা টাকা হাতবদল হয় এমন বক্সিং ম্যাচগুলো ওখানেই হত। আমি রাত সাড়ে আটটায় যখন পৌঁছোলাম তখন এমনি আসন তো বটেই, ব্যালকনি আর বেঞ্চও সব ভরতি। আমার বসার জায়গা ছিল রিং থেকে তিন নম্বর সারিতে। কিছুটা দূরের একটা আসনে ড্যান রল্্ফ বসে ছিল। ওর পাশেই ছিল ডিনা ব্র্যান্ড। দেখলাম, মেয়েটা অবশেষে নিজের চুল ছেঁটেছে। একটা ফার কোটে ওকে দেখে বেশ রানি রানি লাগছিল।

প্রাথমিক ‘ভালো তো?’ বিনিময়ের পরেই ডিনা জানতে চাইল, ‘কুপারের ওপর বাজি ধরেছেন তো?’

‘না। আপনি কি ওর ওপরেই সব লাগিয়েছেন নাকি?’

‘যতটা লাগাতে চেয়েছিলাম ততটা পারিনি। ভেবেছিলাম দর বাড়বে, কিন্তু সে তো আরও নেমে গেল পরের দিকে!’

‘শহরে বোধ হয় আর কেউ বাকি নেই যে বুশের ‘‘শীঘ্রপতন’’ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নয়।’ আমি গোমড়া মুখে বললাম, ‘কিছুক্ষণ আগেই দেখলাম, কুপারের ওপর চার লাগিয়ে জিতলে এক পাওয়া যাবে এই দরেও মোটা টাকা লাগাল একজন।’

রল্্ফকে পাশ কাটিয়ে ওপাশে গিয়ে আমি মুখ নীচু করলাম। মুখটা যখন ডিনা-র ফার কোটের কলারের আড়ালে গেল তখন চাপা গলায় বললাম, ‘কেস ঘুরে গেছে। এখনও সময় আছে। নিজের ক্ষতি যতটা পারেন পুষিয়ে নিন।’

মেয়েটার বড়ো বড়ো লালচে চোখগুলো আরও বড়ো হয়ে গেল। আশঙ্কা, লোভ, কৌতূহল আর সন্দেহ সেগুলো ছাপিয়ে উপচে পড়ছিল।

‘সত্যি বলছেন?’ খসখসে, ভারী গলায় বলল মেয়েটা।

‘একদম।’

নিজের লাল ঠোঁটজোড়া কিছুক্ষণ চিবোল মেয়েটা। তারপর আমার উদ্দেশে প্রশ্ন এল, ‘কোত্থেকে জানলেন?’ আমি উত্তর দিলাম না। তখন আবার প্রশ্ন এল, ‘ম্যাক্স জানে?’

‘আমি জানি না। ওকে দেখিনি। ও কি এখানে এসেছে?’

‘নিশ্চয় এসেছে।’ অন্যমনস্কভাবে বলল মেয়েটা। ওর ফাঁকা চোখ আর নড়তে থাকা ঠোঁট দেখে বুঝলাম ও গভীর হিসেবনিকেশে ডুবে গেছে। দেরি না করে আমি আবার বললাম, ‘আপনি যা ভালো বোঝেন তাই করুন। তবে আমার কথাটা সত্যি।’

মেয়েটা ধারালো চোখে আমাকে দেখল। দাঁতে দাঁত ঘষে ব্যাগ খুলে নোটের একটা বিশাল মোটা বান্ডিল বের করল। তারপর তার একটা অংশ রলফের দিকে বাড়িয়ে বলল, ‘ড্যান, এটা বুশের ওপর লাগাও তো। এমনিতেও দরের ওঠানামা দেখার জন্য তোমার কাছে ঘণ্টাখানেক আছেই।’

রল্্ফ উঠে গেল। আমি ওর সিটে বসে পড়লাম। আমার হাতে হাত রেখে মিষ্টি করে বলল মেয়েটা, ‘টাকাটা জলে গেলে আপনাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।’

বড়ো ম্যাচের আগের লড়াইগুলো হয়ে গেল। আমি থ্যালারকে খুঁজছিলাম, কিন্তু ওকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। ডিনাও যে আদৌ খেলায় মন দেয়নি সেটা বুঝতেই পারছিলাম। রিঙের দিকে তাকানোর বদলে আমাকে খোঁচানো আর হুমকি দেওয়াতেই ও ব্যস্ত ছিল। রল্্ফ ফিরে এলে আমি নিজের সিটের দিকে এগোলাম। চোখ কুঁচকে একতাড়া টিকিট দেখার ফাঁকেও ডিনা বলল, ‘শেষ হলে বাইরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবেন।’

সিটে নিজেকে গুঁজছিলাম, তখনই কিড কুপার রিঙে ঢুকল। ছোকরার চেহারা সলিড, মুখটাও ভাঙাচোরা, কিন্তু ল্যাভেন্ডার রঙা ট্রাঙ্কসের ওপর মাংস বড্ড বেশি মনে হল। সেই তুলনায় উলটো কোণের ইকি বুশ ওরফে অ্যাল কেনেডির চেহারাটা দেখে ভালো লাগল। সরু, খাঁজ কাটা চেহারায় একটা সর্পিল ভাব আছে ছোকরার। তবে ওর মুখ দেখে বুঝলাম, ছেলেটা চিন্তায় আছে।

ওদের পরিচয় দেওয়া হল। রিঙের মাঝে নিয়ে গিয়ে নিয়ম-টিয়ম বোঝানো হল। আবার কোণে পাঠানো হল দু-জনকেই। সেখানে গিয়ে রোব খুলে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হল। ঘণ্টা বাজল। লড়াই শুরু হল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম, কুপার একটি লজঝড়ে ট্রাক। ওর দু’হাতের সুইং যদি জায়গামতো লাগে তাহলে চাপ আছে। কিন্তু নড়তে-চড়তে পারে এমন যে কেউ ওগুলো এড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে বুশ হল জেনুইন আইটেম। দ্রুত সরতে পারে ও। বাঁ-হাত চলে মসৃণভাবে। ডান হাত অনুরাগের ছোঁয়া দিয়েই সরে যায়। এমনিতে বুশ আর কুপার এক রিঙে থাকলে দ্বিতীয়জনের পতন ও মূর্ছা গ্যারান্টিড ছিল। কিন্তু বুশ উলটোটাই করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছিল।

কুপার রিং জুড়ে ঘুরছিল। ঝুলন্ত লাইট থেকে শুরু করে কোণের পোস্ট, সবই ওর মার খাচ্ছিল। বুশ এগিয়ে-পিছিয়ে কুপারকে মাঝেমধ্যে মারছিল, কিন্তু সেই মারে দম ছিল না। প্রথম রাউন্ডেই দর্শকদের গালাগাল ভেসে আসা শুরু হল। দ্বিতীয় রাউন্ড একইভাবে কাটল। ব্যাপার মোটেই ভালো ঠেকছিল না। আশঙ্কা হচ্ছিল, বুশ আমাকে পাত্তা দেয়নি। চোখের কোণে দেখছিলাম, ডিনা হাত নেড়ে আমার নজর কাড়তে চাইছে। ওর মেজাজ কেমন হতে পারে সেটা বুঝে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলাম অন্যদিকে তাকাতে।

তিন নম্বর রাউন্ডেও একই জিনিস চলছিল। দর্শকাসন থেকে ‘দুটোকেই বের করে দাও!’ ‘এত পিরিত যখন, তাহলে চুমু খাচ্ছ না কেন?’ ‘হাত চলছে না বুঝি?’ ইত্যাদি চিৎকার ক্রমেই বাড়ছিল। দুই মুষ্টিযোদ্ধার নাচ তাদের আমার কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল। এক মুহূর্তের জন্য চিৎকার থামল। আমি সেই সুযোগে নিজের দু-হাত কাছে এনে একটা চোঙা বানিয়ে চেঁচালাম, ‘ফিলিতে ফেরত অ্যাল!’

বুশ আমার দিকে পিছন ফিরে ছিল। ও এক ঝটকায় কুপারকে সরিয়ে আমার দিকে ঘুরল। তখনই অন্য কোনো কোণ থেকে চিৎকার ভেসে এল, ‘ফিলিতে ফেরত অ্যাল!’

হয়তো ম্যাকসোয়েন, হয়তো অন্য কেউ। জানি না। ইয়ার্কি মেরে, বা হতাশা থেকে ভিড়ের মধ্যে অন্য এক মাতালও গলা মিলিয়ে চেঁচাল। লোকে এটাকে কি কোনো ঠাট্টা ভাবল? নাকি বুশকে বিরক্ত হতে দেখে তারা খুশি হল? জানি না। কিন্তু চিৎকারটা ছড়িয়ে গেল বিশাল জায়গাটার এদিক থেকে ওদিকে।

কালো রেখার মতো ভ্রূ-র নীচে বুশের চোখগুলো ঘুরতে শুরু করল। কুপারের একটা ওজনদার হাত ওর মুখের একপাশে এসে পড়ল। ইকি বুশ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। রেফারি দু-সেকেন্ডে পাঁচ অবধি গুনে ফেলল। কিন্তু তার বেশি এগোল না, কারণ রাউন্ড শেষের ঘণ্টা পড়ে গেল।

আমি ডিনা ব্র্যান্ডের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলাম। ডিনা হাসল না। ওকেও ড্যান রল্্ফের মতো অসুস্থ দেখাচ্ছিল, তবে ওর চোখজোড়া একেবারে আগুন ঝরাচ্ছিল।

বুশের লোকেরা আলগাভাবে ওর গা-হাত-পা ঘষে ওকে দাঁড় করাল। বুশ নিজের পা-র দিকে তাকিয়ে সোজা হল। ঘণ্টা বাজল।

কিড কুপার নিজের ট্রাঙ্কস-এর ইলাস্টিক টেনে রিঙের মাঝে এল। ঠিক সেই মুহূর্তে বুশ ওর দিকে এগিয়ে এল। আমরা দেখতে পাওয়ার আগেই রোগা ছেলেটার বাঁ-হাত কুপারের পেটে ছোবল মারল। কুপার ‘উফ!’ শব্দ তুলে পেট চেপে পিছিয়ে গেল। বুশ ওর মুখের ডানদিকে একটা হালকা গোছের খোঁচা দিল। আবার ‘উফ্‌!’ বলে কুপার টলমল করতে শুরু করল।

মাথার দু-পাশ দেখে দুটো মার কুপারকে সোজা করে দিল। বাঁ-হাতের একটা মার খেয়ে কুপার সোজা হয়ে ঠিক সেই জায়গায় এসে গেল যেখানে বুশ ওকে পেতে চাইছিল। বুশের ডান হাত ছোবল মারল।

আমরা, মানে দর্শকরাও পাঞ্চটা টের পেলাম।

কুপার মেঝেতে আছড়ে পড়ল। একবার লাফাল, তারপর ওখানেই পড়ে রইল। এবার দশ গুনতে রেফারির আধ মিনিট লাগল। আধ ঘণ্টা লাগলেও কিছু আসত-যেত না। কিড কুপারের খেল খতম হয়ে গেছিল। গোনা শেষ হওয়ার পর রেফারি বুশের হাত ওপরে তুলল। দু-জনের কারো মুখ দেখেই মনে হচ্ছিল না তারা খুশি।

অনেক উঁচুতে কিছু একটা ঝিকমিক করে উঠল। ধারের একটা ছোট্ট ব্যালকনি থেকে একটা রুপোলি ঝলক নেমে এল।

কোথাও কোনো মহিলা আর্তনাদ করে উঠলেন। রুপোলি ঝলকটা রিঙে এসে, গেঁথে যাওয়ার মতো একটা আওয়াজ তুলে থেমে গেল।

রেফারির হাত ছাড়িয়ে ইকি বুশ কিড কুপারের ওপর সপাটে পড়ল। ওর ঘাড় থেকে একটা ছুরির কালো হাতল বেরিয়ে ছিল।