Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ১৩

১৩

কিছুক্ষণ আমাদের দেখলেন ভদ্রলোক, তারপর মৃদু হেসে বললেন, ‘এমনভাবে ঢুকে পড়লাম বলে দুঃখিত। মিস্টার গাইগার কি আছেন?’

‘না।’ আমি বললাম, ‘আমরাও ওঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। দরজা খোলা ছিল, তাই ঢুকে পড়েছিলাম।’

‘খোলা ছিল…’ গম্ভীরভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে মার্স বললেন, ‘ওঁর সঙ্গে আপনাদের সম্পর্কটা কীরকম? মানে গাইগার কি আপনাদের বন্ধু?’

‘না, না। একটা বই নেওয়ার জন্য ওঁর কাছে আসতে হল।’

‘বই?’ ঈষৎ কৌতূহল আর ব্যঙ্গ মিশিয়ে বললেন মার্স।

‘আমরা বরং এগোই।’ আমি কারমেনের একটা হাত ধরলাম।

‘গাইগার ফিরে এলে তাঁকে কিছু বলতে হবে?’ বিনীতভাবে জানতে চাইলেন মার্স।

‘আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।’ আমিও নরম স্বরে বললাম।

‘তাহলে তো মুশকিল।’ মার্সের ধূসর চোখগুলো একবার জ্বলে উঠেই পাথুরে হয়ে গেল, ‘মহিলা যেতে পারেন। কিন্তু আপনার সঙ্গে যে একটু আলাপ করতে ইচ্ছে হচ্ছে।’

আমি কারমেনের হাত ছেড়ে দিয়ে ফাঁকা চোখে ওঁর দিকে তাকালাম।

‘মাথা গরম করবেন না।’ মৃদু হেসে বললেন মার্স, ‘বাইরে আমার দু-জন লোক আছে। আমি রেগে গেলে ওরা আবার হাত-টাত চালিয়ে দেয়।’

কারমেন দরজা খুলে স্রেফ ভাগলবা হল। ওর পায়ের শব্দ বাড়ির পেছনদিকে মিলিয়ে গেল। নির্ঘাত ও পেছনের রাস্তায় গাড়িটা রেখেছিল।

‘এখানে কিছু একটা হয়েছে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন মার্স, ‘কী হয়েছে, সেটা আমার বোঝা দরকার। এর মাঝে ঝামেলা পাকালে আপনারই বিপদ।’

‘ভয় দেখাচ্ছেন?’ আমি হাসলাম।

‘সৎ পরামর্শ দিচ্ছি।’

দেখলাম, ইতিমধ্যেই মার্সের নজর আমার থেকে সরে ঘরের এদিক-ওদিক ঘুরতে শুরু করেছে। নীচু টেবিলে রাখা গ্লাস আর পাশের ভারী পাত্রটা দেখে ওদিকে এগিয়ে গেলেন ভদ্রলোক। তরলটা শুঁকে, বিকৃতমুখে গাইগারকে গালাগাল দিয়ে এবার উনি এগোলেন ক্যামেরা স্ট্যান্ডের দিকে। তার পেছনের ছোটো গোলাপি কার্পেটটা দেখার জন্য হাঁটু মুড়ে ডেস্কের ওপাশে বসলেন মার্স। তারপরেই ভদ্রলোক সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। দেখলাম, তাঁর হাতে একটা কালো লুগার এসে গেছে!

‘রক্ত!’ মার্স বললেন, ‘এখানে রক্ত লেগে আছে। একটু নয়, অনেকটা।’

‘তাই নাকি?’ আমি কৌতূহলী হলাম।

মার্স আমাকে কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর ডেস্কের ওপাশের চেয়ারটায় বসলেন। ফোনটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে ভ্রূ কুঁচকে কিছু একটা ভেবে বললেন, ‘মনে হচ্ছে পুলিশ ডাকতে হবে।’

‘এ তো শুকিয়ে গেছে।’ বিজ্ঞের মতো বললাম, ‘মানে এখনকার নয়। আগের কোনো ঘটনা, বা দুর্ঘটনার ফল বলে মনে হচ্ছে।’

‘তাও, পুলিশকেই ডাকা যাক।’

‘খুব ভালো।’

মার্সের মুখ থেকে শেষ পালিশটুকু খসে পড়ল। চিবিয়ে চিবিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘তালেগোলে আপনার পরিচয়টাই জানা হয়নি।’

‘আমার নাম মার্লো। আমি একজন ডিটেকটিভ।’

‘নাম শুনিনি। মেয়েটা কে ছিল?’

‘ক্লায়েন্ট। গাইগার ওকে ব্ল্যাকমেইল করার তাল করছিল। আমরা ওর সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করতে এসেছিলাম।’

‘চমৎকার।’ মার্সের গলা থেকে ব্যঙ্গ একেবারে ঝরে পড়ছিল, ‘এসে দেখলেন, দরজা খোলা। তাই দিব্যি বাড়িতে ঢুকে পড়লেন।’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। ভালো কথা, আপনার কাছে এই বাড়ির চাবি এল কোত্থেকে?’

‘বেশি কৌতূহল আপনার স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়, মিস্টার মার্লো।’

‘চটছেন কেন? এ সব প্রশ্ন করা আমার কাজেরই অঙ্গ।’

‘তাই নাকি?’ একটা তির্যক হাসি ফুটে উঠল মার্সের ঠোঁটের কোণে, ‘তাহলে তো উত্তর দিতেই হচ্ছে। এই বাড়িটা আমার। গাইগার আমার ভাড়াটে।’

‘এইরকম লোকেদের আপনি বাড়ি ভাড়া দেন?’

‘অত বাছবিচার করলে চলে না। তা, আপনার কী মনে হয়, মিস্টার ডিটেকটিভ? এখানে কী হয়েছিল?’

‘অনেক কিছুই হয়ে থাকতে পারে। কেউ গাইগারকে খুন করেছে। গাইগার কাউকে খুন করেছে। গাইগার একটা কাল্ট চালাচ্ছিল, যার অঙ্গ হিসেবে টোটেম পোল– মানে এই স্ট্যান্ডের সামনে– রক্ত ঝরাতে হয়। অথবা ডিনারে মুরগির কোনো ডিশ থাকলে সেটা এই ঘরেই কাটা হয়। আরও বলব?’

মার্স ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, ‘ভাঁড়ামো না করে সোজাসুজি উত্তর দিন। পুলিশ এলে বুঝবেন…’

‘আমার আর বুঝে কাজ নেই, মিস্টার মার্স।’ আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘লাস ওলিন্ডাস-এ সাইপ্রেস ক্লাবটা আপনি চালান। তাসের সঙ্গে ওখানে কী লেভেলে জুয়োখেলা হয়, আমরা অনেকেই জানি। পুলিশের সঙ্গে দহরম-মহরম না থাকলে যে এটা হয় না, এও আমরা বুঝি। এই কবচকুণ্ডলের আড়ালে আপনার ভাড়াটে যেভাবে ব্যাবসা জমিয়ে নিয়েছিল, সেটা আপনিই বরং পুলিশকে বোঝাবেন।’

‘ব্যাবসা?’ মার্সের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, ‘কোন ব্যাবসা?’

‘পর্নোগ্রাফিক বইয়ের ব্যাবসা।’

মার্স প্রায় মিনিটখানেক আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর থেমে থেমে বললেন, ‘ওর কিছু হয়েছে। আপনি সেটা জানেন। আজ ও দোকানে যায়নি। দোকানে কেউ জানে না ওর কী হয়েছে। ও ফোনও ধরেনি, তাই বাধ্য হয়ে আমাকে এখানে আসতে হল। আমি এসে দেখলাম কার্পেটের নীচে রক্ত লেগে আছে। আর হ্যাঁ, আপনি আর ওই মেয়েটিও এখানে ছিলেন। তাই আমার বদলে আপনাকেই গল্পটা বুঝিয়ে বলতে হবে, তাই না?’

‘আপনি একটা জিনিস বাদ দিলেন যে।’ আমি চিন্তিত মুখে বললাম, ‘আজ গাইগারের দোকান থেকে কেউ ওর ধনসম্পত্তি– মানে ওই ঝলমলে বইগুলো– সরিয়ে ফেলেছে। পুলিশকে তো এটাও বলতে হবে, তাই না?’

‘এটাও আপনি জানেন?’ মার্সের গলা নরম হল, ‘এখানে ঠিক কী হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?’

‘আমার ধারণা, ওটা গাইগারের রক্ত। ওকে খুন করা হয়েছে। গাইগারের পর্নোগ্রাফিক বই দিয়েই এখন অন্য কেউ ব্যাবসা করতে চায়। কিন্তু সেটা দাঁড় করানোর জন্য কিছুটা সময় লাগবে। গাইগারের লাশ পুলিশ এখনই পেলে সেই সময়টা সে পাবে না। তাই লাশ লুকিয়ে রাখা হয়েছে।’

আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জোরে একবার শিস দিলেন ভদ্রলোক। বাইরে গাড়ির দরজা খোলা আর বন্ধ হওয়ার শব্দ পেলাম। একটু পর ঘণ্টি বাজল। লুগার বের করে আমার দিকে তাক করে মার্স বললেন, ‘দরজাটা খুলে দিন।’

‘আমি আপনার চাকর নই।’ নির্বিকার মুখে বললাম, ‘আপনিই দরজাটা খুলুন।’

আমার দিক থেকে লুগারটা না সরিয়ে দরজার কাছে গেলেন মার্স, তারপর দরজাটা খুলে দিলেন। এক বিপুলদেহী কিন্তু সুদর্শন বক্সার, আর নির্লিপ্ত মুখের এক সোনালিচুলো– এই দু-জন ঘরে ঢুকল।

‘দেখো তো,’ মার্স বললেন, ‘এর কাছে কোনো অস্ত্রশস্ত্র আছে কি না।’

সোনালি চুলের রোগা লোকটা একটা শটগান গোছের বন্দুক বের করে আমার দিকে তাক করল। বক্সারটি আমার তল্লাশি নিয়ে সংক্ষেপে বলল, ‘নেই।’

‘ওর নাম-ধাম কিছু জানা যাবে?’

‘ফিলিপ মার্লো।’ আমার ওয়ালেট বের করে ডেপুটির ব্যাজটা দেখল লোকটা, ‘ফ্র্যাঙ্কলিনের হোবার্ট আর্মস-এ থাকে। প্রাইভেট ডিটেকটিভ।’

‘বেরোও।’ সংক্ষেপে বললেন এডি মার্স। আমার ওয়ালেট যথাস্থানে রেখে, গালে একটা আলগা চাপড় দিয়ে বেরিয়ে গেল বক্সার আর তার সঙ্গী। ওরা গাড়িতে উঠল, তারপর ইঞ্জিন চালু করে বসে রইল।

‘এবার বলুন।’ মার্স সংক্ষেপে বললেন।

‘বিশেষ কিছু বলার নেই।’ আমি বললাম, ‘হতেই পারে যে পর্নোগ্রাফিক বইয়ের ব্যবসা হাতানোর জন্য গাইগারকে খুন করা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। গাইগারের বইগুলো যে হাতিয়েছে, সে জানে কেন ওকে মারা হয়েছে। গাইগারের দোকানের ওই মহিলাও কিছু জানেন, কারণ তিনি ভয়ে একেবারে থরহরি কম্পমান হয়ে আছেন। আর হ্যাঁ, আমি জানি বইগুলো কে নিয়েছে।’

‘কে?’

‘আপনাকে কেন বলতে যাব?’

‘এইজন্য!’ লুগারটা ডেস্কে রেখে বললেন মার্স, ‘আর আপনার পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য ধরে দেওয়ার ক্ষমতা আমি রাখি বলে।’

‘পথে আসুন। বন্দুকটা সরিয়ে রাখুন। ওতে কাজের কাজ হয় না। বরং বলুন, কত দেবেন?’

‘কীসের জন্য?’

‘আপনি আমার থেকে কী চান?’

‘ইয়ার্কি মারছেন?’ হিংস্রভাবে বললেন মার্স, ‘গাইগারের কী হয়েছে, সেটা আমার জানা দরকার। ওর ব্যাবসায় আমার কোনো ভাগ ছিল না। আমি ওকে প্রোটেকশনও দিইনি। কিন্তু এই বাড়িটা আমার, তাই আমার চিন্তা হচ্ছে। আপনার কথা শুনে বুঝতে পারছি, এখনও পুলিশ এই বিষয়ে কিছু জানে না। নইলে এতক্ষণে মেলা বসে যেত। কিন্তু আপনিও বিশেষ কিছু জানেন বলে মনে হচ্ছে না। সেজন্যই আমার সঙ্গে কথার মারপ্যাঁচ করছেন।’

আন্দাজে হলেও ভদ্রলোক তির একেবারে নিশানাতেই বিঁধিয়ে দিয়েছিলেন। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘আপনি ঠিক বলেছেন। যদি গাইগারের কিছু হয়ে থাকে, তাহলে আমি যা জানি তার সবটাই পুলিশকে বলতে বাধ্য হব। আপনার সময় নষ্ট করে লাভ নেই। এবার, যদি আপনি অনুমতি দেন, তাহলে আমি আসি?’

মার্সের মুখের চেহারা অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল। ওঁর হাত বন্দুকের দিকে এগোচ্ছে দেখে আমি আলগাভাবেই বললাম, ‘ভালো কথা, মিসেস মার্স কেমন আছেন?’

প্রশ্নটা করেই আমার মনে হল, বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। ভদ্রলোকের বন্দুক-ধরা হাতটা কাঁপছিল। অতি কষ্টে নিজেকে সামলে মার্স বললেন, ‘বেরিয়ে যান। যে চুলোয় খুশি যান। যাকে যা ইচ্ছে তাই বলুন। তবে আমাকে এর মধ্যে জড়াতে চাইলে আপনার সত্যিই আটলান্টিকের ওপাশে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করবে।’

‘আপনার এক বন্ধু ওখান থেকেই এসেছিলেন, তাই না?’ সহজ ভঙ্গিতেই বললাম। মার্স উত্তর না দিয়ে, একেবারে নিষ্পলক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম, তারপর হলিউডের দিকে চললাম।