মরণ ঘুম – ১৫
১৫
ঘণ্টির আওয়াজে ব্রোডি চমকে উঠেছিল। একটু একটু করে আশঙ্কার মেঘ জমে ওর মুখটাকে কালচে করে দিল। আমারও মনে হচ্ছিল, এটা কোনো সেলসম্যানের ভিজিট নয়। ব্রোডির চেয়েও খারাপ অবস্থা দেখলাম অ্যাগনেসের। ও উঠে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে কিছু একটা বলতে চাইছিল। ব্রোডি আমার দিক থেকে চোখ না সরিয়ে একটা ড্রয়ার খুলল। সেখান থেকে একটা ছোট্ট বন্দুক বের করে ও অ্যাগনেসকে কাছে ডেকে বলল, ‘এটা নিয়ে ওঁর পাশে বোসো। হাতটা নীচু রাখবে। উনি উলটোপালটা কিছু করার চেষ্টা করলে যা ভালো মনে হবে, তাই করবে।’
অ্যাগনেস আমার পাশে বসল। ভয়ে ওর হাত যেভাবে কাঁপছিল তাতে আমার মনে হচ্ছিল, ‘উলটোপালটা’ না করেও গুলি খেতে হবে।
ঘণ্টিটা চুপ করে গেল। এবার কারো অধৈর্য হাত দরজায় চড় চাপড়, তারপর একেবারে কিল মারতে শুরু করল। ব্রোডি ডান হাত কোটের পকেটে ঢুকিয়ে বাঁ-হাত দিয়ে দরজা খুলল। কারমেন স্টার্নউড ওকে ঠেলে ঘরে ঢুকল। কারমেনের হাতেও একটা পিস্তল ধরা ছিল। তার নলটা ব্রোডি-র ঠোঁটের ওপর চেপে বসেছিল।
ব্রোডি পিছিয়ে এল। ও কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু ভয়ে ওর মুখ থেকে কিছু বেরোচ্ছিল না। কারমেন আমার বা অ্যাগনেসের দিকে তাকালও না। ও ব্রোডির দিকেই তাকিয়ে ছিল। ওর জিভটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে মাঝেমধ্যে বেরিয়ে এসেই আবার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। ব্রোডি দু-হাতই এবার ওর সামনে তুলে এনে কিছু একটা বোঝাতে চাইল। কারমেন কী বুঝল জানি না, তবে অ্যাগনেস ওর বন্দুকটা কারমেনের দিকে ঘোরাল। আমিও দেরি না করে ওর হাতটা চেপে ধরলাম, যাতে বুড়ো আঙুলটা সেফটি ক্যাচের ওপরেই বসে। কিছুক্ষণ টানাটানি করে বন্দুকটা নিজের হাতে নিতে পারলাম। অ্যাগনেস একপাশে এলিয়ে পড়ল— হয়তো উদ্্বেগে, হয়তো হতাশায়। তবে এসব নিয়ে কারমেন মাথা ঘামায়নি। ও স্থির গলায় ব্রোডিকে বলল, ‘আমার ফটোগুলো দাও, জো।’
‘দেব।’ চিঁচিঁ করল ব্রোডি, ‘অবশ্যই দেব। মাথাটা একটু ঠান্ডা রাখো।’
‘তুমি আর্থার গাইগারকে গুলি করেছ।’ কারমেন সেই স্থির গলাতেই বলল, ‘আমি দেখেছি। ফটোগুলো দাও।’
ব্রোডির মুখটা কেমন সবজেটে হয়ে গেল। আমি বাধ্য হয়ে চেঁচালাম, ‘এক মিনিট!’
অ্যাগনেস মাথা নীচু করে আমার ডান হাত কামড়ে ধরল। আমি ওকে ঝাঁকিয়ে সরানোর চেষ্টা করলাম।
‘শোনো।’ ব্রোডি কাতর গলায় বলল, ‘আমার কথাটা শোনো একবার…’
অ্যাগনেস এবার আমার পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে সেখানে কামড় বসানোর চেষ্টা করল। আমি ওর মাথায় পিস্তলটা দিয়ে এক ঘা দিলাম— তবে খুব বেশি জোরে নয়। মেয়েটা গড়িয়ে পড়ে আমার দু-পা জড়িয়ে টানল। আমি সোফাটার ওপর চিত হয়ে পড়লাম। অ্যাগনেসের গায়ে এত জোর কোত্থেকে এল, সেটাই ভাবছিলাম। ভালোবাসা, ভয়, নাকি পাগলামো? কে জানে।
ব্রোডি এক ঝটকায় কারমেনের পিস্তলটা ধরার চেষ্টা করল। পারল না। শক্ত কিছু আছড়ে পড়ার মতো একটা শব্দ তুলে গুলি বেরিয়ে গেল। একটা জানলার কাচ ভাঙল। ব্রোডি আহত হওয়ার ভান করে মেঝেতে পড়ে কারমেনের পা ধরে টানল। কারমেন পড়ে গেল, পিস্তলটাও ওর হাত থেকে ছিটকে ঘরের এক কোণে চলে গেল। ব্রোডি লাফিয়ে উঠে কোটের পকেটে হাত ঢোকাল।
আমি আবার অ্যাগনেসের মাথায় বন্দুকের বাঁট দিয়ে মারলাম, তবে এবারের মারটা বেশ জোরেই ছিল। ও একটু শান্ত হলে আমি পায়ের ঝটকায় ওকে সরালাম। ব্রোডি আমার দিকে তাকিয়েছিল বলে দেখতে পেল, এবার ও-ই নিশানায় রয়েছে।
‘ও আমাকে মেরে ফেলবে!’ ব্রোডি আর্তনাদ করল। অ্যাগনেস হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে মুখ হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছিল। কারমেন দেখলাম হামাগুড়ি দিয়ে ওর পিস্তলটার দিকে এগোচ্ছে। আমি ব্রোডিকে বললাম, ‘যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন।’
দ্রুত এগিয়ে পিস্তলটা তুলে পকেটে ভরলাম। কারমেন আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। আমি সস্নেহে ওকে বললাম, ‘আপনি তো এখন যথেষ্ট বড়ো হয়ে গেছেন, তাই না? হামাগুড়ি দিচ্ছেন কেন? উঠে পড়ুন।’
ব্রোডি-র পিঠে বন্দুক ঠেকিয়ে ওর পকেট থেকে কোল্টটা বের করে নিলাম।
ভেবে দেখলাম, তখনও অবধি যে ক-টা বন্দুক ওই ঘরে দেখা দিয়েছিল, তারা সবাই ততক্ষণে আমার কাছে এসে গেছিল। ব্রোডি-র দিকে হাত বাড়িয়ে বললাম, ‘দিন।’
দেখলাম, ব্রোডি-র মুখ থেকে রাগ আর ভয় সরে গিয়ে অসহায় ভাবটা ফিরে আসছে। আবার কোটের ভেতর হাত দিয়ে ও একটা পুরু খাম বের করে আনল। পিস্তলটা হাতে রেখেই খামটা খুললাম— ভেতরে একটা ফটোগ্রাফিক প্লেট আর পাঁচটা গ্লসি প্রিন্ট ছিল।
‘আর নেই তো?’
ব্রোডি মাথা নেড়েই ‘না’ বোঝাল। আমি খামটা নিজের কোটের ভেতর নিয়ে পিছিয়ে গেলাম।
অ্যাগনেস আবার সোফায় ফেরত গেছিল। নিজের এলোমেলো চুল ঠিক করার ফাঁকে ও কারমেনকে দেখছিল। বিশুদ্ধ ঘৃণা ছাড়া তাতে আর কিচ্ছু ছিল না। কারমেন আমার দিকে এগিয়ে একগাল হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘এবার কি আমি ফটোগুলো পেতে পারি?’
‘এখন নয়। আপনি বাড়ি যান।’
‘বাড়ি?’
আমি দরজা খুলে বাইরেটা দেখে নিলাম। করিডোরের অন্য প্রান্তের খোলা জানলা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছিল। কিন্তু কোনো লোকজন চোখে পড়ছিল না। ভেবে দেখলাম, একটা ছোটো পিস্তল গর্জেছে আর একটা জানলার কাচ ভেঙেছে। এই নিয়ে এখানকার লোকজন মাথা ঘামাবে বলে মনে হয় না। কারমেনের দিকে ঘুরে বললাম, ‘বাড়ি যান। আমার জন্য অপেক্ষা করুন।’
‘আমার বন্দুকটা?’ হাত বাড়িয়ে, খেলনা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল কারমেন।
‘পরে।’
আমার পাশ কাটিয়ে বেরোনোর সময় কারমেন একটু দাঁড়াল। নিজের বুড়ো আঙুলে আলতো কামড় দিয়ে বলল, ‘আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। খুব ভালো লেগেছে।’
করিডোরে দৌড় লাগাল কারমেন। ওকে দেখে স্কুল ছুটির পর বেরোনো কোনো বাচ্চা মেয়ের কথাই মনে হচ্ছিল আমার। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামার আগে ও ঘুরল, আমার দিকে হাত নাড়ল, তারপর চোখের আড়ালে চলে গেল।
আমি আবার ব্রোডি-র অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলাম।
