Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ১৭

১৭

ইউক্যালিপটাসের মাথায় লেগে থাকা আবছা কুয়াশার মধ্য দিয়ে চাঁদটাকে কেমন যেন ভূতুড়ে দেখাচ্ছিল। গাইগারের বাড়ির সামনে গাড়িটা থামাল ক্যারল। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল ও, তারপর দরজা খুলে নীচে নামল। আমিও নেমে বললাম, ‘দরজা খোলো। ভেতরে যেতে হবে।’

‘আমার কাছে চাবি আছে— এটা আপনাকে কে বলল?’ ছেলেটার দাঁতগুলো আধো-অন্ধকারে বড্ড সাদা দেখাচ্ছিল।

‘আমাকে অতটা বোকা ভেবো না, বৎস। এই বাড়িতে তোমার একটা ছোট্ট, ছিমছাম, পুরুষালি ঘর আছে। যখন গাইগারের সঙ্গে মহিলারা দেখা করতে আসতেন, তখন তোমাকে বেরিয়ে আসতে হত। গাইগারের ব্যাপারটা আমি বুঝেছি। ও ছিল, যাকে বলে, সিজার— মহিলাদের জন্য স্বামী, আর পুরুষদের জন্য স্ত্রী। তাই না?’

অটোমেটিকটা তখনও ওর দিকে তাক করে রেখেছিলাম। তাও ও হাত চালাল। শক্তপোক্ত কারো মার ওভাবে লাগলে আমি টলে যেতাম। কিন্তু ছেলেটা দেখতে শুনতে ভালো হলেও ওর গায়ে জোর ছিল না, তাই আমি শুধু পিছিয়ে গেলাম। ওর পায়ের কাছে বন্দুকটা ছুড়ে দিয়ে বললাম, ‘গায়ের জোরে কুলোবে না। বরং ওটা নাও।’

এক ঝটকায় বন্দুকটা তোলার জন্য নীচু হল ক্যারল। আমিও ওর ওপর লাফিয়ে ওর গলাটা হাতের ভাঁজে চেপে ধরলাম। তারপর বেশ কিছুক্ষণ আমরা রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে, উবু হয়ে, হাঁটু মুড়ে যেসব পোজে ধস্তাধস্তি করলাম, তাদের বিবরণ দিয়ে কাজ নেই। তবে শেষ অবধি ক্যারল আমার সঙ্গে পেরে উঠল না। আগে ড্যাশবোর্ড থেকে হাতকড়া বের করে ওর হাতগুলো অকেজো করতে হল। পিছমোড়া, অজ্ঞান শরীরটাকে ঝোপের পেছনে শুইয়ে আমি গাড়িটাকে শ-খানেক ফুট এগিয়ে পার্ক করলাম। ফিরে এসে, বাড়ির দরজা খুলে, ওকে টেনেহিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে গেলাম। তারপর আলো জ্বালালাম।

ততক্ষণে ছেলেটার জ্ঞান ফিরে এসেছিল। ওকে উপুড় করে শোয়ালাম। তারপর বললাম, ‘ক-দিন পর কুয়েন্টিন-এর গ্যাস চেম্বারে সায়ানাইডের ধোঁয়া টানতে হবে তো। তার আগে বুক ভরে শ্বাস নাও।’

ছেলেটা আবার আমাকে কয়েকটা গালাগাল দিল। আমি নির্বিকারভাবে বললাম, ‘সে যাই বল, ওই গ্যাস চেম্বারই তোমার ভবিতব্য। তবে তোমার বাঁচার একটা রাস্তা আছে। নিজে থেকেই যদি পুলিশকে কথাগুলো বল, মানে আমি তোমাকে যা বলতে বলব শুধু সেইটুকু, তাহলে হয়তো…!’

ছেলেটা কিছু বলল না। ওর মুখের একটা দিক কার্পেটে কিছুটা ঢুকে গেছিল। অন্যদিকের চোখটায় একটা বন্য দীপ্তি জ্বলজ্বল করছিল। আমি বললাম, ‘ভাবো। ভাবা প্র্যাকটিস করো।’

আরও কয়েকটা আলো জ্বালিয়ে আমি প্রথমে গাইগারের ঘরে ঢুকলাম। ওটাতে হাত পড়েছে বলে মনে হল না। উলটোদিকের ঘরটার দরজা তখন খোলা ছিল। আমি সেটাতেই ঢুকলাম।

ঘরে দুটো লম্বা, কালো মোমবাতি তখনও জ্বলছিল। ধূপের ছাই জমেছিল একটা পাত্রে। চন্দনকাঠের মৃদু গন্ধ ছড়িয়ে ছিল ঘরে। খাটের ওপর চিত হয়ে পড়ে ছিল গাইগারের শরীরটা। ওর কালো পাজামা, চাইনিজ কোট— সবই আগের মতো ছিল। শুধু বুকের ওপর রক্তমাখা জায়গায় সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ক্রসের মতো করে রাখা ছিল দু-টুকরো রেশমের কাপড়। ওর হাত দুটো আড়াআড়ি করে রাখা ছিল ওই ক্রসের ঠিক ওপর দিয়েই। আঙুলগুলো ছিল একদম টানটান। মুখ বন্ধ থাকলেও গাইগারের চোখ জোড়া পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। কাচের চোখটা মোমবাতির অল্প আলোতেও ঝিকিয়ে উঠছিল।

আমি গাইগারকে ছুঁলাম না। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ কান পেতে রইলাম। অ্যাগনেস যদি মুখ খুলে থাকে, তাহলে পুলিশ এখানে এসে পড়বে যেকোনো মুহূর্তে। কিন্তু ও যদি পালিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে ব্যাপারটা ঝুলেই থাকবে।

‘উঠে বসবে?’ ক্যারলকে জিজ্ঞেস করলাম। ও ঘুমিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে পড়ে রইল। আমি ডেস্কের কাছে গিয়ে ফোন নিয়ে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি-র অফিসে ফোন করে বার্নি ওল্্স-কে চাইলাম। ভদ্রলোক বাড়ি চলে গেছেন জেনে ওঁকে বাড়িতেই ফোনে ধরলাম।

‘মার্লো বলছি।’ আমি সোজা কাজের কথায় এলাম, ‘ওয়েন টেলরের কাছে কি কোনো বন্দুক পাওয়া গেছে?’

ওল্্স একটু কাশলেন। তারপর নিজের গলা থেকে বিস্ময়ের ভাবটা সরিয়ে বললেন, ‘এটা পুলিশের ব্যাপার, মার্লো। তোমার নয়।’

‘যদি পাওয়া গিয়ে থাকে, তাহলে সেটা থেকে কি তিনটে গুলি ছোড়া হয়েছিল?’

‘তুমি জানলে কী করে?’ ওল্্সের গলাটা খুউব শান্ত শোনাল।

‘৭২৪৪ লাভার্ন টেরেসে চলে আসুন। লরেল ক্যানিয়ন বুলেভার্ড থেকে গলিতে ঢুকতে হবে। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি, গুলিগুলো কোথায় ঢুকেছিল।’

‘তাই বুঝি?’

‘একদম।’

‘জানলা দিয়ে বাইরে লক্ষ রাখো। আমি আসছি। তখনই মনে হয়েছিল, তুমি কিছু চেপে যাচ্ছ।’

‘আপনি আসুন তো।’