মরণ ঘুম – ২২
২২
রাত সাড়ে দশটা নাগাদ মেক্সিকান ব্যান্ডের গাইয়ে-বাজিয়েরা হাল ছেড়ে দিল। তাদের বাজনার সঙ্গে নাচা তো দূরের কথা, কেউ ওদের দিকে তাকাচ্ছিলও না। কোনো এককালে বলরুম হলেও সেটাকে গোলাপি কাঠের প্যানেল, মানানসই কার্পেট আর ঝাড়বাতির আলোয় এখন রুলে খেলার ঘর বানিয়ে ফেলেছিলেন মার্স। আমি তার কাউন্টারে দাঁড়িয়ে একটা গ্লাস হাতে নিয়ে ঘরের ভেতর চোখ বোলাচ্ছিলাম।
ঘরে মোট তিনটে টেবিল ছিল। দু-ধারের দুটো নিয়ে কারো কোনো আগ্রহ ছিল না। যাবতীয় ভিড় ছিল মাঝের টেবিলে। ওখানেই আমি ভিভিয়েন রেগানের কালো চুলে ভরা মাথাটা শুধু মাঝেমধ্যে দেখতে পাচ্ছিলাম।
‘মহিলা আজ ওদের একদম সাফ করে দেবেন।’ বিজ্ঞের মতো আমাকে বলল বারটেন্ডার।
‘উনি কে?’ আমি সরলভাবে জানতে চাইলাম।
‘নাম জানি না।’ ঠোঁট ওলটাল বুড়ো, ‘তবে এখানে প্রায়ই আসেন।’
‘মনে হচ্ছে মহিলাকে বাড়ি অবধি লিফট দেওয়া উচিত।’ সুচিন্তিত অভিমত জানালাম, ‘দেওয়া যাবে?’
‘দেওয়ার জন্য লাইন লেগে আছে।’ ব্যাজার মুখে বলল বুড়ো, ‘পিপীলিকা পাখা মেলে…!’
ভিড়টা দু-ভাগ হয়ে গেল। দুই ক্লান্তপ্রাণ কাউন্টারে হামলে পড়ে সোমরস চাইলেন। তাঁরাও মিসেস রেগানের অশ্বমেধের ঘোড়া এগিয়ে চলা নিয়েই কথা বলছিলেন। তবে ওই সময়টুকুতে আমি মহিলাকে এক ঝলকের জন্য দেখে নিয়েছিলাম। একটা লো-কাট সবুজ রঙের পোশাক পরেছিলেন ভিভিয়েন। স্রেফ জুয়া খেলার পক্ষে পোশাকটাকে বড়ো বেশি শৌখিন মনে হচ্ছিল। অবশ্য আমি এসবের কীই-বা বুঝব?
দুই খেলোয়াড় গ্লাস খালি করে আবার ঝাঁপালেন মাঝের টেবিলের দিকে। একটু পরেই ওখানে ভিড়টা গুঞ্জনের বদলে হট্টগোল তুলল। সেগুলো ছাপিয়ে শোনা গেল ক্রুপিয়ারের গলা, ‘একটু ধৈর্য ধরুন, ম্যাডাম। টেবিলে যা টাকা আছে তাই দিয়ে আপনার বাজির সমান টাকা তোলা যাবে না। মিস্টার মার্স একটু পরেই আসছেন।’
গ্লাস ফাঁকা করে আমি উঠে দাঁড়ালাম। তারপর ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে ঘরের অন্য কোণের একটা ফাঁকা টেবিলের কাছে গেলাম। উদ্দেশ্যহীনভাবে টেবিলের ওপর চাকতিগুলো নাড়াচাড়া করছিলেন একজন ক্রুপিয়ার, তবে তার নজরও ছিল ভিভিয়েন রেগানের দিকেই। এপাশ থেকে আমি মহিলাকে আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পেলাম। অস্বাভাবিক ফর্সা, প্রায় ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল ভিভিয়েনকে। ওঁর সামনে টেবিলে বড়ো আর ছোটো নোট তথা কয়েনে প্রচুর টাকা ছিল। সেগুলোর দিকে হাত নেড়ে মহিলা বলছিলেন, ‘কীরকম সস্তা ক্লাব এটা? এই ক-টা টাকা বাজি রাখার মতো ব্যবস্থাও করা যায় না?’
বরফের মতো ঠান্ডা একটা হাসি ফুটে উঠল ক্রুপিয়ারের চোখে। গলাটা মোলায়েম রেখে ভদ্রলোক বললেন, ‘ওখানে ষোলো হাজার ডলারের বেশি টাকা আছে, ম্যাডাম। অত টাকা এই টেবিলের সবাই মিলেও বাজি রাখতে পারবেন না। আপনি একটু অপেক্ষা করুন।’
‘এগুলো আপনাদেরই টাকা।’ চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন মহিলা, ‘ফেরত চাই না বুঝি?’
পেছন থেকে এক ভদ্রলোক মহিলাকে কিছু একটা বলতে গেলেন। ভিভিয়েন এমনভাবে পেছন ঘুরে তাঁকে সম্বোধন করলেন যে আমার মনে হল, বোধ হয় থুতু ছিটোলেন উনি। বেচারি ভদ্রলোক লাল মুখে ভিড়ে মিলিয়ে গেলেন। তখনই একপাশের একটা দরজা খুলে এডি মার্স ঘরে ঢুকলেন। ভদ্রলোকের হাঁটাচলা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, এই ঘর, এই ক্লাব, হয়তো এখানে থাকা মানুষেরা— সব ওঁর সম্পত্তি!
‘কী ব্যাপার, মিসেস রেগান?’
মার্সের গলায় ভদ্রতার অনুপাতটা ক্রুপিয়ারের তুলনায় কিছু কম ছিল। তাতেই ভিভিয়েন যেভাবে ওঁর দিকে ঘুরলেন তাতে মনে হল, যেন কেউ ওঁকে একটা থাপ্পড় মেরেছে। তবে উনি কিছু বললেন না।
‘আপনি যদি আর না খেলেন, তাহলে আমি কাউকে বলব আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে।’ মার্সের গলাটা নরম থাকলেও তার পেছনে একটা অন্যরকম ভাব ছিল। ঘরময় ছড়িয়ে থাকা টেনশন কমানোর বদলে বাড়িয়ে তুলছিল গলাটা। ভিভিয়েনের মুখের ফ্যাকাশে ভাবটা সরে গিয়ে ক্রমেই লাল রং জাঁকিয়ে বসছিল সেখানে।
‘আর এক দান, এডি।’ আদর আর তেতোভাব মেশানো গলায় বললেন ভিভিয়েন, ‘আমাকে আর এক দান খেলতে দাও। আমি লাল নিয়ে খেলব। লাল রং আমার খুউব পছন্দ। ওটা রক্তের রং তো। প্লিজ, এডি! আমার যা আছে সব দিয়ে আর এক দান খেলব শুধু।’
মৃদু হাসলেন মার্স। তারপর পকেট থেকে নিজের ওয়ালেট বের করে ক্রুপিয়ারকে দিয়ে বললেন, ‘মহিলাকে বাজি ধরতে দিন— হাজারের এককে।’
ঘরের বাকিদের দিকে ঘুরে মার্স বললেন, ‘কারো যদি আপত্তি না থাকে তাহলে এই দানটা স্রেফ মহিলার জন্যই খেলা হোক।’
কেউ আপত্তি জানাল না। ক্রুপিয়ার ওয়ালেট থেকে দুটো বান্ডিল বের করলেন। একটা থেকে কয়েকটা নোট সরিয়ে পার্সে রেখে দিলেন ভদ্রলোক। মার্স ওয়ালেটটা ছুঁলেন না। ক্রুপিয়ার আবার নীচু হয়ে একটা গোটা আর একটা ভাঙা বান্ডিল টেবিলে রাখলেন। ভিভিয়েন হিংস্রভাবে নিজের সামনে রাখা টাকাগুলো ঠেলে দিলেন সেদিকেই। সেগুলো থেকে কিছু ছোটো নোট আর কয়েন সরিয়ে রাখা হল, যাতে দু-দিকের বাজি সমান হয়। তারপর, হাতির দাঁত দিয়ে বানানো বলটা বড়ো চাকার এক ধারে রেখে আলগাভাবে সেটাকে ঘুরিয়ে দিলেন ক্রুপিয়ার।
ঘরের মধ্যে আর কেউ একটা শব্দও করছিল না। ভিভিয়েনের ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে গিয়ে দাঁতগুলো বেরিয়ে এসে ঝাড়বাতির আলোয় ঝিকিয়ে উঠছিল। চাকাটা ঘুরছিল আপন খেয়ালে। বলটা সংখ্যা আর রং লেখা খোপের ওপরের অংশে চলাচল করতে করতে, অনেকক্ষণ পর, হঠাৎ নীচের লেভেলে নেমে এল। তারপর একটা খোপের মধ্যে পড়ে স্থির হয়ে গেল। শূন্য থেকে দু’ধাপ দূরে, ‘পঁচিশ’ লেখা খোপ ছিল সেটা। আর রং…
‘লাল জিতল।’ বোর হওয়া গলায় বললেন ক্রুপিয়ার।
ভিভিয়েন মাথাটা পেছনদিকে ঝাঁকিয়ে গলা খুলে হেসে উঠলেন। টাকাগুলো একদিকে সরিয়ে গুনে-গেঁথে রাখা শুরু হল। পার্সটা নিজের পকেটে রেখে হাসিমুখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন মার্স।
প্রায় ডজনখানেক লোক একসঙ্গে শ্বাস ছেড়ে বারের দিকে ছুটল। ভিভিয়েন উঠে দাঁড়িয়ে টাকাপয়সা ব্যাগে ভরছিলেন। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের কোট আর টুপিটা উদ্ধার করলাম। তারপর লবির দরজা খুলে বাইরে এলাম।
‘আপনার গাড়িটা আনতে বলব, স্যার?’ ডোরম্যান তৎক্ষণাৎ উদয় হল।
‘একটু হেঁটে আসি বরং।’ বলে আমি বেরিয়ে পড়লাম।
সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমে এলাম আমি। ততক্ষণে সমুদ্রের দিক থেকে উঠে আসা কুয়াশা ভিজিয়ে দিয়েছিল সব কিছু। সাইপ্রেস গাছগুলোও হারিয়ে যাচ্ছিল সেই কুয়াশায়। আমি এদিক-ওদিক ঘুরে সমুদ্রের পারে নেমে এলাম। তারপর বাড়িটার পেছনদিকে, যেখানে গাড়ি পার্ক করা থাকে, সেদিকে এগোলাম।
কুয়াশার মধ্য দিয়ে যখন বাড়িটা দেখা যাচ্ছিল, তখন আমি থেমে গেলাম। আসলে কাশির একটা মৃদু শব্দ ভেসে এসেছিল দূর থেকে। ভেজা ঘাসে আমার পায়ের শব্দ শোনা যাবে না এটা নিশ্চিত করে আমি শব্দের দিকে এগোতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই, সাইপ্রেসের ভিড়ে প্রায় হারিয়ে যাওয়া একটা কালচে শরীরের অস্তিত্ব আমি দেখতে পেলাম।
একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে ওই বনের মধ্যে।
লোকটা আবার কাশল, তবে একটা রুমাল দিয়ে মুখ চেপে। আমি নীচু হয়ে লোকটার দিকে এগিয়ে গেলাম। কোনো আওয়াজ হয়নি, তবু লোকটা কিছু বুঝে পেছন ফিরল। ও আমাকে দেখেনি, তবে আমি একটা জিনিস দেখেছিলাম।
কুয়াশার মধ্য দিয়ে আসা জ্যোৎস্নায় ওর মুখটা সাদাটে দেখানো উচিত ছিল। কিন্তু সেটা কালোই ছিল। অর্থাৎ, লোকটা মুখোশ পরে আছে।
আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম।
