মরণ ঘুম – ২৪
২৪
অ্যাপার্টমেন্টের লবিটা শুনশান দেখে ভালো লাগল। এত কিছুর পর আবার কোনো বন্দুকধারীকে সামলাতে হলে সময় নষ্ট ও বড়ো কষ্ট— দুইই হত। লিফটে চেপে ওপরে উঠলাম। ঘরে ঢুকে আলো না জ্বালিয়ে আগে কিচেনের দিকে এগোলাম। শরীর আর মন মদের জন্য একেবারে হাহাকার করছিল। কয়েক পা এগিয়েই আমি থমকে গেলাম।
কিছু একটা গোলমাল লাগছিল। না, কোনো শব্দ নয়। কিন্তু একটা গন্ধ আমার নাকে ঢুকছিল। একটা ভারী, মিষ্টি গন্ধ। অন্ধকারে চোখটা সয়ে আসতেই বুঝতে পারলাম, আমার সামনে এমন কিছু রয়েছে যা এখানে এখন থাকার কথা নয়। দ্রুত কয়েক পা পিছিয়ে এসে আলোর সুইচটা খুঁজে নিলাম। আলো জ্বলে উঠল।
আমার খাটটা পাতা ছিল। সেখান থেকে ভেসে আসা খিলখিল হাসিটাই আগে শুনলাম। তারপর দেখলাম বালিশের ওপর ছড়িয়ে থাকা সোনালি চুলগুলো। একে একে ধরা পড়ল দুটো সুন্দর হাত, ছোটো ছোটো ধারালো দাঁত, একজোড়া ভাসা-ভাসা চোখ।
‘আমাকে কেমন লাগছে?’ জানতে চাইল কারমেন স্টার্নউড।
‘অসাধারণ।’ দাঁতে দাঁত ঘষে সরে এলাম আমি। একধারের রিডিং ল্যাম্প জ্বালিয়ে আমি বড়ো আলোটা নেভালাম। কোটটা খুলে একধারে রাখতে গিয়ে চোখ পড়ল সামনের ছোটো টেবিলের ওপর সাজানো দাবার বোর্ডের দিকে। দেখলাম, কালো ঘুঁটি বেশ বেকায়দায় আছে বোর্ডে। ঘোড়াটা এগিয়ে দিতে দিতে ভাবলাম, খাটে শুয়ে থাকা বিপদটিকে কীভাবে সামলানো যায়।
‘আপনি ভাবতেও পারবেন না, আমি কীভাবে ঢুকেছি।’ কারমেন বলল।
‘চাবির ফুটো দিয়ে বোধ হয়।’ ধপাস করে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম এবার, ‘যেভাবে পিটার প্যান ঘরে ঢুকত।’
‘সে কে?’
‘আমার এক পুরোনো আলাপি।’
একটা সিগারেট ধরিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। কারমেন নিজের বুড়ো আঙুলটা কিছুক্ষণ চুষল, তারপর আবার খিলখিলিয়ে উঠে বলল, ‘চাদরের নীচে আমি কিন্তু কিচ্ছু পরিনি।’
‘আমারও তাই মনে হচ্ছিল।’
আরও কিছুক্ষণ আমরা এভাবেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর কারমেন চাদরটা সরিয়ে আড়মোড়া ভাঙল। অল্প আলোতেও ওর নগ্ন শরীরটা মুক্তোর মতো ঝিকিয়ে উঠছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম, জেনারেলের দুই মেয়েই আজ রাতে আমার একেবারে অগ্নিপরীক্ষা নিচ্ছে!
‘আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে।’ ঠোঁটের ওপর ওর ছোট্ট ছোট্ট দাঁতগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম।
গম্ভীরভাবে বললাম, ‘খুব ভালো। কিন্তু আপনি আমাকে নতুন করে কী দেখাচ্ছেন? মনে নেই? আপনাকে জন্মদিনের পোশাকে বার বার, নানা জায়গায়, আমিই তো দেখি। এবার বলুন তো, ফ্ল্যাটে ঢুকলেন কীভাবে?’
‘আমি ভিভিয়েনের কাছ থেকে আপনার কার্ডটা চুরি করেছিলাম।’ চাদরটা আবার গলা অবধি টেনে নিয়ে বলল কারমেন, ‘সেটা দেখিয়ে এই অ্যাপার্টমেন্ট হাউসের ম্যানেজারকে বললাম, আপনিই আমাকে এসে অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমি বেশ একটু … রহস্য রহস্য ভঙ্গিতে আপনার কথা বলেছিলাম। ম্যানেজার তারপরেই আপনার ফ্ল্যাটটা খুলে দিলেন।’
‘চমৎকার।’ আমি মাথাটা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছিলাম, ‘ফ্ল্যাট থেকে বেরোনোর জন্য অবশ্য এত মাথা খাটাতে হবে না আপনাকে।’
‘ফ্ল্যাট থেকে এক্ষুনি বেরোব না আমি।’ ঠোঁটটা আবার কামড়ে ধরল কারমেন, ‘অনেকক্ষণ থাকব এখানে।’
‘শুনুন।’ সিগারেটে একটা বড়ো টান দিয়ে সেটা কারমেনের দিকে তুলে আমি বললাম, ‘আমি ক্লান্ত। এই অবস্থায় আপনাকে আবার জামা কাপড় পরাতে আমার ভালো লাগবে না। দয়া করে নিজেই সাজগোজ করে নিন। উঠে পড়ুন।’
খিলখিল করে হেসে মেয়েটা মাথা নাড়ল। আমি ছাইদানির খোঁজ না করে সিগারেটটা মাটিতে ফেলেই পিষলাম। তারপর বললাম, ‘আপনি আমাকে যা দিতে চাইছেন, তা পেলে আমারও ভালো লাগত। কিন্তু আসলে আপনি বোঝাতে চাইছেন, কতটা ‘‘দুষ্টু’’ আপনি। এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই নেই। তা ছাড়া আমার সামান্য হলেও আত্মসম্মান আছে, অহংকার আছে। আপনার বাবা আমাকে একটা কাজ দিয়েছেন। আপনার সঙ্গে এসব করলে সেটা ওঁর প্রতি অন্যায় হবে। আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন, কারমেন?’
মেয়েটা মাথা নাড়ল। তারপর বলল, ‘আপনার নাম ডগহাউস রাইলি নয়। আপনি ফিলিপ মার্লো।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীচে, দাবার বোর্ডটার দিকে তাকালাম। ঘোড়া এগিয়ে দেওয়াটা ভুল চাল ছিল। ঘোড়া দিয়ে এই যুদ্ধ জেতা যাবে না। এখানে গজের প্রয়োজন। চেয়ারে বসে পড়লাম আবার। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কারমেনও আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ওর দৃষ্টিটা বদলাতে শুরু করল। সেখানে একটা সংশয়ের মেঘ দ্রুত জমে উঠল।
কিচেনের দিকে এগোলাম। মাথার ভেতরে টিপটিপ করে একটা ব্যথা তৈরি হচ্ছিল। কারমেনকে বললাম, ‘আমি ড্রিঙ্ক বানাতে চললাম। যদি তার মধ্যে আপনার পোশাক পরা হয়ে যায়, তাহলে এক পাত্র আপনিও পাবেন। নইলে নয়।’ কারমেন উত্তর দিল না, বরং ওর ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটা অদ্ভুত হিস…স ধ্বনি বেরিয়ে এল।
চুপচাপ রান্নাঘরে গিয়ে দুটো গ্লাসে ড্রিঙ্ক বানালাম। ঘরে ফেরামাত্র কারমেন হাত বাড়িয়ে দিল। দেখলাম, চাদরটা যথাস্থানে গেলেও ওর জামাকাপড়গুলো তখনও চেয়ারে আর সোফায় ছড়িয়ে আছে। মাথা নেড়ে বললাম, ‘পোশাক পরে ভদ্রসভ্য না হলে এটা পাবেন না। আমি আগেই বলেছিলাম।’
চেয়ারে বসলাম। দুটো গ্লাসই সামনে নামিয়ে রাখলাম। কারমেনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওর মুখটা কেমন যেন কঙ্কালের মতো হয়ে উঠেছে— নিষ্প্রাণ, অস্থিসর্বস্ব, ক্ষুধার্ত! ও আমাকে একটা গালি দিল। গালিটা অন্য কোথাও, অন্য কোনো সময় শুনলে আমার কিছুই মনে হত না। কিন্তু নিজের ঘরে, নিজের সামান্য বিষয়সম্পত্তির মাঝে বসে থাকা অবস্থায় ওই গালিটা বড্ড গায়ে লেগে গেল। আমি আবার উঠে দাঁড়ালাম।
‘আপনাকে ঠিক তিন মিনিট সময় দেব।’ ঠান্ডা গলায় বললাম আমি, ‘তার মধ্যে ভদ্রস্থ না হতে পারলে যেভাবে আছেন সেভাবেই আপনাকে ঘর থেকে টেনে বের করে দেব। তারপর আপনার জামাকাপড় ছুড়ে দেব বাইরে, করিডোরে। আপনি কী পরলেন, কী করলেন— সেসব নিয়ে ভাবব না, বরং দরজাটা বন্ধ করে দেব।’
আমি বসে পড়লাম। গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়েছিলাম, তখনই কারমেন আরেকবার ওই হিস…স আওয়াজটা করল। কেন জানি না, আমার রোম খাড়া হয়ে উঠল শব্দটা শুনে। ওর দিকে ঘুরে স্থির চোখে তাকালাম। ওই হাড়ের মতো চোয়াল আর গর্তের মতো অন্ধকার চোখজোড়া নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল কারমেন। তারপর ও উঠে, ঈষৎ টলমল অবস্থা সামলে পোশাক পরতে শুরু করল। আমি ওর দিকে তাকিয়েই রইলাম। ঘড়ি দেখেছিলাম বলে জানি, ঠিক দু-মিনিটে কারমেনের সাজসজ্জা সম্পূর্ণ হয়েছিল।
একটা বেঢপ সবুজ ব্যাগ হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কারমেন। একটু পর লিফট আসার ‘টিং’ শব্দটা, তারপর শ্যাফটে ওটার নেমে যাওয়ার আওয়াজ পেলাম। দরজা বন্ধ করে, গ্লাস হাতে জানলায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পর নীচের সদর দরজা খুলে গেল। ফুটপাথ ধরে একটা হালকা পায়ের এগিয়ে যাওয়া, একটু দূরে রাখা একটা গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন, তারপর হিংস্র গিয়ার বদলানোর শব্দ শুনলাম। গাড়িটা দূরে চলে গেলে খালি গ্লাসটা টেবিলে রাখলাম। তারপর বিছানার কাছে এলাম।
আমার বিছানায় তখনও লেপটে ছিল কারমেনের শরীরের ভারী, মিষ্টি গন্ধ। বালিশটা চেপটে ছিল ওর হালকা মাথার মাপে। চাদর-বালিশ সব টেনে মেঝেতে ফেলে দিলাম আমি। তারপর রুক্ষ ম্যাট্রেসে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুজলাম।
