Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ২৫

২৫

পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, একটা ছাইরঙা পর্দার মতো চরাচর ঢেকে রেখেছে বৃষ্টি। ঘুম থেকে উঠেও নিজেকে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত লাগছিল। দু-কাপ কড়া কফি খেয়েও মুখ থেকে তেতো ভাবটা সরাতে পারছিলাম না। তাও সাজগোজ সেরে অফিসের উদ্দেশে বেরোলাম। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বেরিয়ে দেখলাম, উলটোদিকের ফুটপাথের পাশে কোনাকুনি, শ-খানেক ফিট দূরে সেই ধূসর রঙা প্লিমাউথ সেডানটা দাঁড়িয়ে আছে। গ্যারেজ থেকে আমার গাড়িটা বের করে রওনা হলাম।

বৃষ্টির মধ্যে অনুসরণ করতে হচ্ছে বলেই বোধ হয় গাড়ির চালক বেশ সাহসী হয়ে উঠেছিল। পুরো রাস্তাটা আমার কাছাকাছিই রইল গাড়িটা। অফিস যে বাড়িতে তার সামনে আমি গাড়িটা দাঁড় করলাম। উলটোদিকের ফুটপাথের পাশে ওই গাড়িটা দাঁড়াল। কনকনে বৃষ্টির ছাঁট মুখে নিয়েই আমি পেছনদিকে গিয়ে রাস্তা পেরোলাম, তারপর চালকের জানলার পাশে উদয় হলাম।

কয়েক সেকেন্ডেও কেউ বেরোল না দেখে আমি হ্যাঁচকা টানে দরজা খুলে ভেতরে তাকালাম। একটা বেঁটে লোক স্টিয়ারি-এর পেছনে ঈষৎ কুঁকড়ে ছিল। ওর হাতে ধরা সিগারেটের পাকানো ধোঁয়ার পেছনেও উজ্জ্বল চোখজোড়া দেখা যাচ্ছিল। আমার পিঠে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বিঁধছিল একেবারে। বিরক্ত মুখে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ঠিক করলেন? নামবেন, না যাবেন?’

‘আমি তো আপনাকে চিনি না।’ নীচু, খসখসে গলায় বলল লোকটা।

‘আমার নাম মার্লো। গত ক-দিন ধরে আপনি আমাকে অনুসরণ করছেন।’

‘কিছু একটা ভুল হচ্ছে আপনার। আমি কাউকে অনুসরণ-টরন করছি না।’

‘তাহলে আপনার এই গাড়িটা নিজে নিজেই করছে বোধহয়।’ আমার মাথাটা গরম হচ্ছিল, ‘আপাতত আমি ওই রেস্তরাঁয় ব্রেকফাস্ট করতে যাব। তারপর যাব আমার অফিসে, যেটা আপনার উলটোদিকের বাড়ির সাততলায়। যদি ইচ্ছে হয়, আসতে পারেন।’

লোকটা চোখ পিটপিট করতে করতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি ব্রেকফাস্ট সেরে মিনিট কুড়ি পর অফিসে ঢুকলাম। যে মহিলা সাফ-সাফাই করেন তিনি বেরিয়ে গেলে ডাকে আসা জিনিসপত্র নিয়ে বসলাম। একটা পুরু খামের ওপর খুব সুন্দর, সেকেলে হাতের লেখায় সরু আর খোঁচানো হরফে আমার নাম-ধাম লেখা ছিল। ওটা খুলে দেখলাম, ভেতরে পাঁচশো ডলারের একটা চেক আছে। তার সঙ্গে একটা সংক্ষিপ্ত নোটও ছিল, যাতে গায় ডে স্টার্নউডের তরফে ভিনসেন্ট নরিস আমাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। মেজাজটা একটু শরিফ হল স্বাভাবিকভাবেই।

ঘণ্টি শুনে বুঝলাম, অফিসের রিসেপশনে কেউ ঢুকেছে। উঠে দরজা খুলে দেখলাম, প্লিমাউথে বসে থাকা লোকটা ঘরে ঢুকে এদিক-ওদিক চাইছে। দরজা খুলে ওকে ভেতরে আসতে বললাম। লোকটা আমার পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে কোট আর টুপি খুলে সতর্কভাবে বসল। অগোছালো পোশাক, কড়া হতে চেয়েও আধখোলা চোখ— এগুলো সবই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, লোকটা প্রবল চাপে আছে।

‘আমার নাম হ্যারি জোনস।’ এগিয়ে দেওয়া সিগারেটের টিন থেকে একটা তুলে নিয়ে বলল লোকটা, ‘একসময় চোরাই মদের কারবার করতাম। ওই জিনিস সম্বন্ধে বোধ হয় আপনার কোনো ধারণা নেই, তাই না? পুলিশ, অন্য দল, নিজের দল— কাদের সামলাতে হয়নি তখন! এখনও খুচরো দু-একটা কাজ করি, তবে ওইরকম বিপজ্জনক কাজের পর আর কিছু ভালো লাগে না।’

‘অ।’ আমি হাবিজাবি চিঠি পড়া, ছেঁড়া আর ডাস্টবিনে ফেলা চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

‘আপনার বোধ হয় আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই না?’ লোকটা কায়দা করে সিগারেটের ছাই ঝাড়তে গিয়ে নিজের টাইয়ে সেটা ফেলল।

‘আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কী আসে যায়?’ ছাইদানিটা এগিয়ে দিলাম, ‘ব্যাপার হল, গত দু-দিন ধরে আপনি আমাকে অনুসরণ করছেন। কেন? আপনি কি বিমার দালাল? নাকি আপনি জো ব্রোডির চেনা কেউ?’

‘আপনি কী করে জানলেন?’ লোকটা সত্যিই চমকে উঠল।

‘আমি সাইকিক। আপাতত কাজের কথায় আসুন। আমার কাছে কী চান?’

লোকটার চোখজোড়া ছোটো হতে-হতে ভ্রূর আড়ালে চলে গেল প্রায়। তারপর ও বলল, ‘আপনাকে আমি কয়েকটা জিনিস বেচতে চাই। বেশি না, শ-দুয়েক ডলার দিলেই হবে। কিন্তু আগে বলুন, ব্রোডি আর আমার কোনো সম্পর্ক আছে— এটা বুঝলেন কীভাবে?’

‘আপনি পুলিশ নন। এমনকী এডি মার্সের দলের কেউও আপনি নন— আমি কাল ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাহলে রইল বাকি…’

‘এডি মার্স!’ লোকটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, ‘আপনি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন?’

‘একদম।’ আমি আরও গোটাকয়েক চিঠি ডাস্টবিনে ফেললাম, ‘অ্যাগনেস ছাড়া পেয়েছে, তাই না?’

‘হ্যাঁ। ও-ই আমাকে বলল, আপনার কাছে আসতে।’

‘ও দেখতে শুনতে ভালোই, কিন্তু ঠিক আমার টাইপের নয়।’

‘ধুত!’ লোকটা চটে গেল, ‘ওসব নয়। যে রাতে ব্রোডি মারা গেল, সেই রাতে আপনি ওকে আর অ্যাগনেসকে বলেছিলেন, ব্রোডি নিশ্চয় স্টার্নউডদের ব্যাপারে কিছু জানে। নইলে ও ওই ফটো পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার ঝুঁকি নিত না।’

‘তাহলে ও সত্যিই কিছু জানত? কী জানত?’

‘সেটা জানতে গেলে যে শ-দুয়েক খসাতে হবে, মশাই।’

আমি আবর্জনা সরিয়ে টেবিল সাফ করলাম। ধীরেসুস্থে একটা সিগারেট ধরালাম। লোকটা ইতিমধ্যে সিটে প্রায় ছটফট করছিল। আর থাকতে না পেরে ও বলেই ফেলল, ‘আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে। আমার আর অ্যাগনেসের সব কিছু নতুন করে শুরু করতে গেলে অন্তত ওটুকু চাই। আপনি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করুন।’

‘বুঝতে পারছি।’ লোকটার চোখে চোখ রেখে বললাম, ‘জিনিসটা কী, তার একটু আভাস দিন।’

‘আপনি টাকা দেবেন তো?’

‘জিনিসটা আদৌ আমার কাজে লাগবে কি না, সেটা আগে বুঝি।’

‘ওটা দিয়ে আপনি রাস্টি রেগানকে খুঁজে পাবেন।’

‘আমি রাস্টি রেগানকে খুঁজছি না।’

‘আহা! ওটা তো আপনার কথার কথা। এটুকুও কি বুঝি না আমি?’

‘তাই নাকি?’ আমি হেসে ফেললাম, ‘তাহলে বলুন। কে জানে, কোথাও-না-কোথাও ব্যাপারটা কাজে লেগে যাবে হয়তো। তবে শ-দুয়েক ডলার দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায়— এটা মাথায় রেখে বলবেন।’

‘এডি মার্স রাস্টি রেগানকে খুন করিয়েছে।’

আমি স্থির চোখে লোকটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘এই নিয়ে আপনার সঙ্গে তর্ক করে সময় নষ্ট করব না। আপনি বরং আসুন।’

হ্যারি জোনস উঠে দাঁড়াল। ওর পাতলা ঠোঁটজোড়া তিরতির করে কাঁপছিল। সিগারেটটা ছাইদানিতে ঘষে ঘষে দুমড়ে দিয়ে বলল বলল, ‘আমি এখানে ইয়ার্কি মারতে আসিনি। যা বলতে এসেছি, সেটা শুনুন।’

‘বলুন।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছনে হেলান দিলাম। জোনস বসে পড়ল চেয়ারে।

‘আমি রেগানকে চিনতাম। ‘পরানসখা বন্ধু হে আমার’ বলার মতো নয়, কিন্তু চিনতাম। ও ভালো লোক ছিল। রাগী, শক্ত, কিন্তু ভালো। মোনা গ্র্যান্ট বলে একটা মেয়ে বারে গান গাইত। রেগান ওকে পছন্দ করত। তারপর মোনার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর ওর নতুন পদবি হল মার্স। ব্যাপারটা রেগান ঠিক সহজভাবে নেয়নি। ও তার জবাব দিতে গিয়েই এমন এক মহিলাকে বিয়ে করে ফেলল, যাকে আপনি বিলক্ষণ চেনেন। সবাই জানে, ওই মহিলার সঙ্গে শান্তিতে ঘর করা অসম্ভব। সবাই ভাবে, রেগান জেনারেলের টাকার লোভে বিয়েটা করেছে। কিন্তু রেগানের কাছে টাকাপয়সা কোনো ব্যাপারই ছিল না। আমার মতো একটা ফালতু লোক এটা যতটা বেশি বোঝে, আপনি হয়তো ততটা বুঝবেন না। কিন্তু রেগান সম্পত্তি বা ওর ওই বউকে নিয়ে ভাবছিল না। ওর লক্ষ্য ছিল অন্য কিছু, বা অন্য কেউ।’

মানতে বাধ্য হলাম, লোকটার কথায় কিছু সারবত্তা আছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, এগুলো বানিয়ে বানিয়ে বলার মতো বুদ্ধি ওর হবে না। তবে মুখটা ব্যাজার রাখলাম, নইলে ও দর বাড়িয়ে দিত। বললাম, ‘তাহলে রেগান পালিয়ে গেছে?’

‘ও পালাতে চেয়েছিল, এটা জানি।’ জোনস বলল, ‘মোনার সঙ্গে মার্সের বিয়েটা ঠিক সুখের হয়নি। ব্যাবসার পাশাপাশি এডি মার্স যেসব কারবার চালায়, জুয়া, ব্ল্যাকমেইল, চোরাই গাড়ি এদিক-ওদিক করা, গুন্ডা-বদমাইশদের আশ্রয় দেওয়া— এগুলো ও মেনে নেয়নি। তাই মোনা আলাদা থাকত। রেগান এগুলো জানত। ও মার্সকে একবার শাসিয়েছিল, যদি মার্সের কোনো দু’নম্বরি কারবারে মোনাকে জড়ানো হয়, তাহলে তার ফল ভালো হবে না।’

‘এগুলো অনেকেই জানে হ্যারি।’ আমি কাঁধ ঝাঁকালাম, ‘এর জন্য দু-শো ডলার দেওয়া যাবে না?’

‘জানি। আমাকে কথা শেষ করতে দিন। রোজ বিকেলে ভার্ডি-র ওখানে রেগানের সঙ্গে আমার দেখা হত। ও চুপচাপ হুইস্কি খেত। কথা খুব বেশি না বললেও পুরোনো আলাপের খাতিরে আমাকে মাঝেমধ্যে টিপস দিত ও। আমি পাস ওয়ালগ্রিনের হয়ে জুয়াতে টাকা লাগাই তো।’

‘অ্যাঁ? আমি তো ওকে বিমার দালাল বলেই জানতাম।’

‘সাইনবোর্ডে সেরকম লেখা থাকলেও আসলে ও জুয়াড়ি। যাই হোক, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি একদিন থেকে রেগানকে আর দেখলাম না। আমি অত ভাবিনি। কিন্তু ক-দিন পরেই লোকেদের বলাবলি করতে শুনলাম, এডি মার্সের বউকে নিয়ে রেগান ভাগলবা হয়েছে। অথচ মার্স এমন ভাব করছে যেন ও বরকর্তা! ব্রোডিও এগুলো শুনেছিল। ওর কিন্তু বেশ বুদ্ধি ছিল।’

‘তা তো বটেই।’

‘মানে পুলিশি বুদ্ধি নয়, চালাক ভাব যাকে বলে। ব্রোডি ভাবল, এই ব্যাপারটা নিয়ে কিছু জানতে পারলে ও দু’জনের কাছ থেকেই কামাতে পারবে। দু-জন— মানে মার্স আর মিসেস রেগান। ব্রোডি স্টার্নউডদের ব্যাপারে খোঁজখবর রাখত।’

‘তাই দিয়েই তো বছরখানেক আগে ও স্টার্নউডদের থেকে পাঁচ হাজার ডলার বাগাল।’

‘পাঁচ হাজার?’ হ্যারি জোনস সত্যিই চমকে গেল, ‘দেখেছেন! অ্যাগনেস আমাকে কিচ্ছু বলেনি। যাইহোক, আমি আর ব্রোডি খবরের কাগজ পড়ে কিছুই বের করতে পারলাম না। বুঝলাম, জেনারেল স্টার্নউড ব্যাপারটা ম্যানেজ করে ফেলেছেন। তখনই একদিন ভার্ডি-র পাবে ল্যাশ ক্যানিনো-কে দেখলাম। ওকে চেনেন?’

আমি মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝালাম। জোনস বলে চলল।

‘ও এডি মার্সের হয়ে কাজ করে। ‘‘কাজ’’ মানে… যেগুলো ওর রোজকার লোকেরা করতে পারে না, সেগুলো। হাসতে হাসতে মানুষ খুন করতে পারে ও। ক্যানিনো লস এঞ্জেলস-এ থাকে না। ওকে সেদিন দেখে আমার মনে হল, কিছু একটা কাজের জন্য মার্স ওকে আনিয়েছে। ব্যাপারটা ব্রোডিকে বললাম। এবার, আমি যে পিছু নেওয়ার ব্যাপারে একেবারে বেকার, সেটা তো আপনি দেখেইছেন। কিন্তু জো ব্রোডি ওরকম ছিল না। ও জানত, কীভাবে পিছু নিতে হয়। সেভাবেই ও ক-দিন ক্যানিনোর পিছু নিল। এক রাতে ক্যানিনো স্টার্নউডদের বাড়ির বাইরে পৌঁছে গাড়ি পার্ক করল। তখন উলটোদিক থেকে একটা গাড়ি এল। সেটা চালাচ্ছিলেন মিসেস রেগান। তাঁর আর ক্যানিনোর মধ্যে কিছু কথাবার্তা হল। তারপর মিসেস রেগান ক্যানিনো-র হাতে একটা খাম তুলে দিয়ে ঝটপট উধাও হলেন। ক্যানিনো-ও শহরে ফিরে গেল।’

‘তো?’

‘এর থেকে ব্রোডির আর আমার মনে হয়, ক্যানিনো মার্সের হয়ে নির্ঘাত কোনো কাজ করেছে। সেটা কাজে লাগিয়ে এখন ও স্টার্নউডদের থেকেও কিছু জোগাড় করছে।’

‘ক্যানিনোকে দেখতে কেমন?’

‘বেঁটে। ভারী শরীর। খয়েরি চুল, খয়েরি চোখ, খয়েরি জামাকাপড়, খয়েরি টুপি, খয়েরি গাড়ি, খয়েরি রেইনকোট— মানে ভিড়ের মধ্যেও চিনে নিতে কোনো সমস্যাই হবে না।’

‘বেশ। তারপর কী হল?’

‘ওটা মুফতে হবে না। দু-শো ডলার লাগবে।’

‘এর জন্য দু-শো ডলার দেওয়া যাবে না, হ্যারি। ব্যাপারটা ভেবে দেখুন। ভিভিয়েন স্টার্নউড রেগানের অতীত পরিচয় জেনেই তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। যদি রেগান নিরুদ্দেশ হয়, তাহলে তিনি সবচেয়ে আগে কার কাছে সাহায্য চাইবেন? তাঁর আর এক বন্ধুর কাছে। এখানেই আসছেন এডি মার্স। তাঁর হয়ে গোপনে কোনো খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজ কে করতে পারে? ল্যাশ ক্যানিনো! এই জিনিসের জন্য দু-শো ডলার?!’

‘মিসেস মার্স এখন কোথায় আছেন, এটা জানার জন্য কি দু-শো ডলার দেওয়া যাবে?’ নীচু গলায় বলল জোনস।

অনেক চেষ্টা করেও নিজের মুখ থেকে সবটুকু উত্তেজনা সরিয়ে রাখতে পারলাম না। চেয়ারের হাতল দুটো শক্ত করে চেপে ধরে সোজা হয়ে বসলাম।

‘যদি মহিলা একাই থেকে থাকেন?’ জোনসের গলায় বিষ মিশে যাচ্ছিল, ‘যদি মহিলা আদৌ রেগানের সঙ্গে পালিয়ে না থাকেন? যদি ওকে এই শহর থেকে চল্লিশ মাইল দূরের একটা ডেরায় লুকিয়ে রাখা হয় স্রেফ পুলিশকে এটা ভাবানোর জন্য, যে উনি রেগানের সঙ্গে পালিয়েছেন? তাহলে? এই খবরের জন্য দু-শো ডলার দেওয়া যাবে, মিস্টার প্রাইভেট ডিটেকটিভ?’

‘যাবে।’ শুকনো ঠোঁট চেটে বললাম, ‘কোথায় আছেন উনি?’

‘অ্যাগনেস ওকে দেখে ফেলে।’ শক্ত মুখে বলল জোনস, ‘কপালজোর, আর কিচ্ছু নয়। কিন্তু দেখার পর ও মহিলাকে অনুসরণ করে ওই জায়গাটা দেখে এসেছে। জায়গাটার কথা শুধু ও-ই আপনাকে জানাবে, যখন আপনার দেওয়া ওই দু-শো ডলার ওর হাতে থাকবে।’

‘আপনি জানাতে পারবেন না?’ আমি বললাম, ‘পরে কিছু হলে অন্তত অ্যাগনেস বেঁচে যেত তাহলে।’

মুচকি হেসে লোকটা আমার সিগারেটের টিন থেকে একটা সিগারেট বের করল। তারপর বারতিনেকের চেষ্টায় সেটা ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘ভয় দেখাচ্ছেন? না লোভ? আমরা সব্বাই ফালতু লোক, মিস্টার মার্লো। আমাদের কারো কোনো দাম নেই। কিন্তু কথার দাম আছে। আপনি কথা দিচ্ছেন তো?’

‘দিচ্ছি।’ আমি মাথা ঝাঁকালাম, ‘এইরকম খবরের জন্য দু-শো ডলার দিতে আমি রাজি আছি। তবে আগে টাকাটা জোগাড় করি।’

‘বেশ।’ উঠে দাঁড়াল হ্যারি জোনস, ‘ওয়ালগ্রিনের অফিসটা চেনেন নিশ্চয়? সব বিমার দালাল যেখানে ঘর নেয় সেখানেই ওরও অফিস। ওয়েস্টার্ন আর সান্টা মনিকা ক্রসিং-এ ফুলওয়াইডার বিল্ডিং— চারশো আঠাশ নম্বর ঘর। আপনি ওখানেই আসুন টাকা নিয়ে। তারপর আমি আপনাকে অ্যাগনেসের কাছে নিয়ে যাব।’

হ্যারি জোনসের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল। আমি উঠে ব্যাঙ্কে গিয়ে স্টার্নউডের চেকটা জমা দিলাম। তারপর দু-শো ডলার তুলে অফিসে ফিরলাম। বসে বসে ভাবতে থাকলাম, যে গল্পটা আমাকে শোনানো হল, তার কতটা সত্যি, আর কতটা মিথ্যে হতে পারে। মিসেস মার্স যদি সত্যিই শহর থেকে মাত্র চল্লিশ মাইলের মধ্যে লুকিয়ে থাকেন, তাহলে মিসিং পার্সনস ব্যুরো তাঁকে এতদিনে পেয়ে যেত। তারা পায়নি মানে ক্যাপ্টেন গ্রেগরি মাইলসকে পেতে দেওয়া হয়নি। তাঁর ‘বন্ধু’ এডি মার্স কি তাঁকে আটকে দিয়েছে?

আমি সারাদিন অফিসে বসে এইসব ভাবলাম। কোনো ফোন বাজল না। কেউ এল না। বাইরে বৃষ্টি হয়ে গেল। হয়েই গেল!