Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ২৭

২৭

‘টাকাটা দিন।’

প্লিমাউথের ইঞ্জিনের গজরানি আর গাড়ির ছাদে বৃষ্টির আছড়ে পড়ার শব্দ ছাপিয়ে অ্যাগনেসের গলা আমার কানে এসে পৌঁছোল। বুলক’স বিল্ডিং-এর মাথায় জ্বলানেভা বেগুনি আলোটা অনেক উঁচুতে দপদপ করছিল। তবু জানলা দিয়ে বেরিয়ে আসা কালো দস্তানা-পরা হাতটা দেখতে আমার অসুবিধে হল না। দু-শো ডলার গুঁজে দিলাম তাতে।

মেয়েটা ঘাড় গুঁজে টাকাগুলো গুনল, তারপর সেগুলো ব্যাগে ভরল। মুখ তুলে আমার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমি চলে যাচ্ছি। এখনই। আপনি এটা না দিলে খুব বিপদে পড়তাম। হ্যারি কোথায়?’

‘পালিয়েছে। ক্যানিনো যে ওর পেছনে লেগেছে, এটা ও টের পেয়েছিল। কিন্তু যে খবরের জন্য আমি টাকাগুলো দিলাম, সেটা পাব না?’

‘পাবেন।’ দাঁতের ফাঁক দিয়ে একটা শ্বাস ছাড়ল অ্যাগনেস, ‘গত রোববারের আগের রোববার আমি আর জো ফুটহিল বুলেহার্ড দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন সবে সন্ধে হচ্ছে, আলোগুলো জ্বলে উঠছে একে একে। ওই সময় ওই জায়গাটায় মারাত্মক জ্যাম হয়, সেদিনও তাই হয়েছিল। তার মধ্যে আমরা একটা খয়েরিরঙা গাড়ির পাশে এসে পড়েছিলাম। গাড়িটা যে মহিলা চালাচ্ছিলেন, তাঁকে আমি চিনি— মিসেস মোনা মার্স। তাঁর পাশেই বসে ছিল ওই খয়েরি রঙের পোশাক পরা লোকটা, ক্যানিনো! জো গাড়িটার সামনে-পেছনে থেকে ওটাকে অনুসরণ করে। রিয়াল্টো থেকে পুবদিকে মাইলটাক গেলে রাস্তাটা বেঁকে পাহাড়ের দিকে চলে যায়। ওদিকে একটা সায়ানাইড প্ল্যান্ট আছে— যেখানে ওই জীবাণুনাশক-টাশক বানানো হয়। সেটা পেরিয়ে গেলে একটা গ্যারেজ পড়ে। ওটা চালায় আর্ট হাক নামে একজন, আসলে গাড়ি মেরামতের আড়ালে ওটা চোরাই গাড়ি পাচারের জায়গা। তার লাগোয়া একটেরে ফার্মহাউস গোছের একটা বাড়ি আছে। জো ওসব ছাড়িয়ে অরেঞ্জ কাউন্টির দিকে গাড়ি নিয়ে গেছিল। পরে একপাক ঘুরে ও যখন গাড়িটা ওই রাস্তায় ফিরিয়ে আনল, তখন খয়েরি রঙের গাড়িটা ওই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা কিছুটা ওপরে উঠে একটা ক্রসিং-এর কাছে অপেক্ষা করি। আরও বেশ কয়েকটা গাড়ি যাতায়াত করলেও ওই বাড়িতে আর কেউ আসেনি, খয়েরি গাড়িটাও আর বেরোয়নি। রাত নামলে জো চুপিচুপি ওই বাড়িটার কাছে গেছিল। ফিরে এসে ও আমাকে বলেছিল, ভেতরে আলো জ্বলছে আর রেডিয়ো চলছে— ব্যস।’

‘এতদিনে বোধ হয় ওঁকে অন্য কোথাও সরিয়ে দিয়েছে।’ আমি বললাম, ‘আপনি নিশ্চিত যে ওটা মিসেস মার্সই ছিলেন?’

‘ওই মহিলাকে একবার দেখলে আপনি ভুলবেন না।’ জানলার কাচ তুলতে তুলতে বলল অ্যাগনেস, ‘আমার কপালটা একেবারে ফাটা, বুঝলেন! এখানে থাকলে আর কী কী হবে, জানি না। আসি তাহলে?’

আমি প্লিমাউথের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে একটাই কথা ভাবলাম। গাইগার, ব্রোডি, জোনস— এরা সব গতাসু হয়ে গেল। আর শরীরে একটিও আঁচড় না লাগিয়ে, ব্যাগে দু-শো ডলার ভরে, গাড়ি চেপে বৃষ্টির মধ্যে রওনা হওয়া মেয়েটা বলছে, তার কপাল ফাটা!

একটা রেস্তরাঁয় গিয়ে পেট আর মন ভরিয়ে ডিনার করলাম। একে তো বৃষ্টি মাথায় নিয়ে চল্লিশ মাইল যাওয়া মানেই বিশাল হ্যাপা, তার ওপর এইরকম অ্যাডভেঞ্চার করার আগে মনে অতৃপ্তি থাকা উচিত নয়।

নদী পেরিয়ে পাসাডেনায় ঢুকলাম। একটু পরেই অরেঞ্জ কাউন্টি শুরু হয়ে গেল। মুষলধার বৃষ্টিতে চরাচর সাদা হয়ে ছিল। ওয়াইপারগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করেও সামনের কাচটা পরিষ্কার রাখতে পারছিল না। উলটোদিক থেকে আসা গাড়িগুলো নোংরা জলের ছিটে তুলে হুশ করে বেরিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার দু-ধারে সারি সারি কমলার বাগান শেষ হয়ে প্রথমে একটা নোংরা শহর, তারপর রেললাইন আর রাস্তার চোর-পুলিশ খেলা, তারপরেই নিয়ন ঝলসানো একটা দৈত্যাকৃতি হোর্ডিং দেখা দিল। সেটা রিয়্যাল্টোয় আমাকে স্বাগত জানাচ্ছিল। ছাড়া ছাড়া বাড়ি, কিছু দোকানপাট, একটা ব্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে উত্তেজিতভাবে আলোচনা করা ক-জন মানুষ— এসব ছাড়িয়ে আমি এগিয়ে চললাম। বুঝতে পারছিলাম না, ঠিক কোথায় সেই গ্যারেজ আর তার লাগোয়া বাড়ি দেখেছিল জো ব্রোডি আর অ্যাগনেস। ভয় হচ্ছিল, যদি এই বৃষ্টিতে আমি বাড়িটাই খুঁজে না পাই?

কপাল আর কাকে বলে! রিয়্যাল্টো ছাড়িয়ে মাইলটাক এগোনোর পরে রাস্তাটা বাঁক নিল। বৃষ্টি আর আলো মিশে আমার হিসেবটা একটু গুলিয়ে দিল, ফলে গাড়িটা রাস্তার একেবারে ধারে চলে গেল। সামনের ডান দিকের টায়ারটা ফাটল তৎক্ষণাৎ। আমি ব্রেক কষার আগেই পেছনের চাকাটাও ওখান দিয়ে পার হয়ে জবাব দিল। বেসামাল গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে টর্চ হাতে নামলাম। দুটো জিনিস বুঝতে পারলাম।

প্রথমত, রাস্তার ধারে একগাদা ভারী আর মজবুত পেরেক ছড়িয়ে আছে।

দ্বিতীয়ত, আমার গাড়ির দুটো টায়ার গেছে, অথচ স্পেয়ার আছে মাত্র একটা।

মুষলধার বৃষ্টির মধ্যেও দেখতে পেলাম, একটা টাল-খাওয়া জীর্ণ ঘরগোছের জিনিস রয়েছে রাস্তা থেকে শ-খানেক গজ দূরে। টর্চ নিভিয়ে দেখলাম, ওটার স্কাইলাইটে আলোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মনে হল, হতেই পারে যে ওই ঘরটা গ্যারেজ, সেটা হয়তো আর্ট হাক নামের কেউ চালায়। আর সেক্ষেত্রে তার পেছনেই থাকতে পারে সেই বাড়িটা, যেখানে এডি মার্স বিনা কারণে লুকিয়ে আছেন।

গাড়ির স্টিয়ারিং-এর নীচে একটা জীর্ণ টুলব্যাগ রাখা ছিল। তাতে গাড়িতে লাগে এমন ক-টা জিনিসের সঙ্গে দুটো বন্দুকও ছিল— একটা আমার, একটা মার্সের ওই গুন্ডা লেনি-র। ভাবলাম, লেনি-র অস্ত্রটা আমার চেয়ে বেশিই ব্যবহার করা হয় হয়তো। ওটাকেই পকেটে ভরে, টর্চ হাতে এগোলাম।

রাস্তা থেকে ঘরটার একপাশের দেওয়াল দেখা যাচ্ছিল। সামনে গিয়ে টর্চের আলো জ্বালতেই দুটো জিনিস দেখতে পেলাম।

এক, দরজার ওপর একটা রংচটা বোর্ডে লেখা ছিল, ‘আর্ট হাক— গাড়ি সারাই।’ দরজাটা বন্ধ থাকলেও তার ফাঁক দিয়ে আলোর একটা রেখা বাইরের কাদামাটিতে এসে পড়েছিল।

দুই, ওখান থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে একটা ফার্মহাউস। সেটার দুটো জানলার পেছনে আলো জ্বলছে। বাড়িটার সামনে একটা খয়েরি রঙের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, যেটার মালিককে আমি বিলক্ষণ চিনি।

টর্চের পেছনদিকটা দিয়ে দরজায় দুমাদ্দুম পেটালাম। কিছুক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না, তবে ভেতরের আলোটা নিভে গেল। কপাল বেয়ে নামা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সরাতে সরাতে বুঝতে পারছিলাম, আমি একদম ঠিক জায়গায় এসেছি। টর্চ জ্বালিয়ে তার আলোটা দরজার মাঝামাঝি জায়গায় স্থির করলাম।

‘কী চাই?’ একটা বিরক্ত গলা এল ভেতর থেকে।

‘হাইওয়েতে আমার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। দুটো টায়ার গেছে। কিছু করুন, প্লিজ।’

‘মাফ করবেন। আমাদের গ্যারেজ এখন বন্ধ। মাইলটাক গেলেই রিয়্যাল্টো, ওখানে চেষ্টা করুন।’

কথাটা শুনতে মোটেই ভালো লাগল না। আমি দরজাটা পেটালাম, লাথালাম, মানে আওয়াজ করেই চললাম। তারপর ভেতর থেকে একটা ভারী, ঘড়ঘড়ে, দানাদার গলা ভেসে এল, ‘ভদ্রলোক বড়ো অধীর হয়ে পড়েছেন দেখছি। দরজা খুলে দাও আর্ট।’

দরজাটা সামান্য ফাঁক হল। এক মুহূর্তের জন্য একটা সরু, বিরক্ত মুখ আমার টর্চের আলোয় উদ্ভাসিত হল। তারপরেই একটা চকচকে কিছু ওপর থেকে নেমে এসে এক ধাক্কায় টর্চটা নীচে ফেলে দিল।

‘আলোটা নেভান।’ বিরক্ত গলাটা বলে উঠল। দেখলাম, একটা বন্দুকের নলের ধাক্কায় আমার টর্চ ধরাশায়ী হয়েছে। নীচু হয়ে টর্চটা নেভালাম। দরজাটা আরেকটু ফাঁক হল। এবার গ্যারেজের ভেতরের আলোটা জ্বলে উঠল। ওভার-অল পরা একটা রোগা, খেঁকুটে চেহারার লোক আমার দিকে বন্দুক তুলে বলল, ‘ভেতরে এসে দরজাটা বন্ধ করুন।’

চুপচাপ ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করলাম। গাড়ির রঙের গন্ধে ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে ছিল। একটু দূরে অন্ধকার ওয়ার্কবেঞ্চের ওপর কেউ একজন কোলকুঁজো হয়ে বসে ছিল। আমি তার দিকে না তাকিয়ে সামনের ওই খেঁকুটে লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আমার গাড়িটা…?’

‘আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে?’ লোকটা খিঁচিয়ে উঠল, ‘আজ সন্ধেতেই রিয়্যাল্টোতে একটা ব্যাঙ্ক লুঠ হয়েছে। তার লোকজন এখনও ধরা পড়েনি। এই অবস্থায় অন্ধকারে আপনি কোত্থেকে উদয় হলেন?’

আমার খেয়াল হল, একটা ব্যাঙ্কের সামনে ভিড় দেখেছিলাম বটে। বললাম, ‘আমি এসবের কিছুই জানি না। আমি এখানকার লোক নই।’

‘লোকে বলছে, কয়েকটা বদ ছোঁড়া এইসব কীর্তি করে এদিকেই লুকিয়েছে নাকি।’ লোকটা গজগজ করল।

‘তাহলে তাদের ফেলে যাওয়া পেরেকেই গাড়ির এই অবস্থা হয়েছে!’ ব্যাপারটা বুঝলাম, ‘আমি তো ভেবেছিলাম, ব্যাবসাপত্র বাড়ানোর জন্য আপনিই ওই কম্মোটি করেছেন।’

‘আপনার কি মার খাওয়ার সাধ হয়েছে?’ লোকটার গলাটা বিরক্তি থেকে রাগের দিকে বেঁকল।

‘ছাড়ো তো, আর্ট।’ অন্ধকার থেকে দাপুটে, ঘড়ঘড়ে গলাটা বলে উঠল, ‘তুমি গ্যারেজ চালাও। ভদ্রলোক বিপদে পড়েছেন। ওঁকে সাহায্য করো বরং।’

‘ধন্যবাদ।’ আমি ওদিকে না তাকিয়েই বললাম। আর্ট নামের লোকটা বিরক্ত মুখে নিজের ঢোলা আলখাল্লার বেল্ট টাইট করে যন্ত্রপাতি খুঁজতে লাগল। এইবার গ্যারেজটা দেখলাম ভালো করে।

অনেকটা বড়ো জায়গা জুড়ে যন্ত্রপাতি ছড়িয়ে আছে। পেছনে, আলোর বৃত্তর বাইরে একটা নতুন সেডান দাঁড়িয়ে আছে। সেটার ফেন্ডারে একটা স্প্রে-গান রাখা আছে। ওই রঙের গন্ধই ছড়িয়ে আছে গ্যারেজের ভেতরে। তার পাশে বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে আছে একটা ছোটোখাটো চেহারার, চওড়া কাঁধের, গঁাট্টাগোট্টা লোক। তার পরনে একটা বৃষ্টিভেজা খয়েরি রেইনকোট। মাথার খয়েরি টুপিটা কাত হয়ে আছে। লোকটার কালো দু-চোখের ঠান্ডা, নিষ্পৃহ দৃষ্টি আমাকে মাপছিল।

একটা সিগারেট ধরিয়ে লোকটা বলল, ‘একসঙ্গে দুটো টায়ার গেল? কপাল খুব খারাপ বলতে হবে। কিন্তু রাস্তাটা সাফ করা হয়েছিল বলে শুনলাম যেন কার থেকে।’

‘পেরেকগুলো সরানো হয়েছিল।’ আমি মানলাম, ‘কিন্তু আমি একটু পিছলে গেছিলাম বাঁকের মুখে।’

‘আপনি এখানে নতুন? কোথায় যাচ্ছিলেন?’

‘লস এঞ্জেলস। এখান থেকে কত দূরে হবে?’

‘চল্লিশ মাইল, তবে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে চালানোর সময় অনেক বেশি দূর বলে মনে হবে। আপনি আসছেন কোত্থেকে?’

‘সান্তা রোসা।’

‘সে তো অনেক দূর! কোন পথে এলেন?’

‘রেনো হয়ে কারসন সিটি।’

‘অনেকটা পথ সেটাও।’

‘ওই পথে চলা বারণ আছে বুঝি? জানতাম না তো।’

‘আরে না না!’ গলাটা ঘড়ঘড় করে উঠল, ‘আপনি ভাবছেন, আমরা এমনি এমনি নাক গলাচ্ছি আপনার ব্যাপারে? আসলে এই ব্যাঙ্ক ডাকাতগুলো এখনও ধরা পড়েনি তো। তাই সাবধানে থাকা আর কি। আর্ট, ওঁর গাড়ির টায়ারগুলোর ব্যবস্থা করো।’

‘পারছি না।’ দাঁত খিঁচিয়ে বলল আর্ট, ‘এই রং করার কাজটা আজকের মধ্যে সারতেই হবে।’

‘এই আবহাওয়ায় রং শুকোবে না। বরং দুটো জ্যাক নিয়ে গিয়ে দেখো ওঁর গাড়ির কী অবস্থা।’

‘ডান দিকের চাকা— সামনে আর পেছনে, দু-জায়গাতেই।’ আমি যোগ করলাম।

‘বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে!’ আর্ট ঘাঁড় গোঁজ করে বলল, ‘এখন আমি ওসব পারব না।’

বেঞ্চে বসা লোকটা কিচ্ছু বলল না, শুধু আর্টের দিকে তাকিয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমার মনে হল, আর্ট একটা ইলেকট্রিক শক খেল যেন। আর একটা কথাও না বাড়িয়ে, জিনিসপত্র নিয়ে, ও ওই বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে গেল।

দরজাটা খোলা রেখেই বেরিয়ে গেছিল আর্ট। বৃষ্টির জল আর কনকনে হাওয়া ঢুকছিল ঘরটায়। লোকটা উঠে দরজাটা বন্ধ করে বেঞ্চে আবার এসে বসল। আমার দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ও। তারপর সিগারেটটা মাটিতে পিষে বলে উঠল, ‘এই আবহাওয়ায় এক পাত্তর চড়ালে মন্দ হয় না, কী বলেন?’

পেছন থেকে একটা বোতল নিয়ে দুটো গ্লাসে ও অনেকটা করে তরল ঢেলে একটা এগিয়ে ধরল। আমি পুতুলের মতো হেঁটে গিয়ে গ্লাসটা নিলাম। শুঁকে বাদামের গন্ধ পেলাম না। লোকটা কয়েকটা চুমুক দিল। ওকে দেখে আমিও সামান্য অংশ নিয়ে মুখে এদিক-ওদিক করে বুঝলাম, এতে সায়ানাইড নেই। গ্লাস খালি করে ওটা সামনের বেঞ্চে নামিয়ে রেখে আমি নিজের জায়গায় ফিরে গেলাম।

‘আর্ট হল টিপিক্যাল মেকানিক, বুঝলেন।’ খয়েরি মানুষটা বলে উঠল, ‘যে কাজটা ওর গত সপ্তাহে করার কথা, সেটা ও এখন করছে। তা আপনি কি কোনো কাজে বেরিয়েছিলেন, না এমনিই?’

‘কাজই বলতে পারেন।’ আমার কথা বলতে ভালো লাগছিল না। অর্ধেক রং হওয়া সেডানটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরে থেকে বৃষ্টির শব্দ আর আর্টের চোখা চোখা গালাগাল ভেসে আসছিল। আমি গাড়িটাকে দেখছিলাম।

‘প্রথমে একটু-আধটু মেরামত করতে বলেছিল গাড়ির মালিক।’ পেছন থেকে খয়েরি লোকটা ঘড়ঘড়ে গলায় বলছিল, ‘কিন্তু তারপর আর একটু বেশি পয়সা দিল। বলল, একেবারে অন্যরকম করে দিতে। বোঝেনই তো।’

‘বুঝি।’ মাথা নাড়লাম আমি, ‘সবচেয়ে পুরোনো পেশার মধ্যে দ্বিতীয়টাই তো চুরি।’

ঘরের অন্যদিকে দাঁড়িয়ে থাকা খয়েরি মানুষটা আর আমার মাঝে অদৃশ্য হয়ে বসে থাকা হ্যারি জোনসের কথা ভেবে গলাটা শুকনো ঠেকছিল। একটা সিগারেট ধরিয়ে আর্টের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। একটু পরেই দরজা খুলে দুটো কাদামাখা ফ্ল্যাট টায়ার ঠেলতে ঠেলতে আর্ট ঢুকল।

‘টায়ার ফাটানোর জন্য আপনি জায়গাও বেছেছিলেন বটে!’ একটা তেলচিটে কাপড় দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল আর্ট।

‘কঠিন কাজটা তো করেই ফেলেছ।’ পকেট থেকে একটা সরু নল বের করে বলল খয়েরি মানুষটা, ‘আর ঘ্যানঘ্যান না করে এবার টায়ারগুলো সারিয়ে ফেলো দেখি।’

আমি লোকটার হাতের নলের মধ্যে একগাদা নানা রঙের খুচরোর মসৃণ ওঠানামার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আর্ট ইতিমধ্যে রিম বরাবর টায়ারগুলো খুলে ফেলছিল। একটা বালতিতে রাখা নোংরা জল ছেঁচড়ে এনে তার ভেতরে টিউবটা চুবিয়ে ও এদিক-ওদিক তাকাল। উঠল, দেওয়ালে টাঙানো হাওয়া ভরার পাইপটা নিয়ে বালতির দিকে এগিয়ে এল। তারপর আমি বুঝলাম এডি মার্সের লোকজন কতটা পেশাদারি দক্ষতায় কাজ করে।

এক লাফে আমার পেছনে এল আর্ট। সেই একই ভঙ্গিতে পাইপটা আমার ওপর ফেলে ও নিজের পুরো ওজনটা তাতে ছেড়ে হ্যাঁচকা টান দিল। আমার হাত দুটো শরীরের সঙ্গে লেগে গেল, বন্দুকটা বের করার কোনো উপায় রইল না। এবার খয়েরি মানুষটা প্রায় নাচের ভঙ্গিতে আমার দিকে এগিয়ে এল। আমি সামনে ঝুঁকে আর্টকে সরানোর চেষ্টা করলাম।

টিউবটা সপাটে নেমে এল আমার মাথায়। এক ঝটকায় আমার চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে গেল। তখনও আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। টিউবটা আবার উঠল আর নামল। আলোটা হঠাৎ ভীষণ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তারপর সব অন্ধকার হয়ে গেল। অন্ধকার, আর হু-হু বাতাসের শব্দে ভরে গেল আমার পৃথিবী।