Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ৪

লা পামা বুলেভার্ডের উত্তর দিকে একটা বাড়ির সামনের অংশটাই এ জি গাইগারের দোকান। প্লেট গ্লাসের দরজা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে কিছু দেখা গেল না, কারণ দোকানটা একেবারে অন্ধকার হয়ে ছিল। দু-পাশের জানলা চাইনিজ স্ক্রিন আর নানারকম ঘর সাজানোর জিনিস দিয়ে একেবারে ঢাকা পড়ে গেছিল। দোকানের একপাশে মূল বাড়িতে ঢোকার একটা দরজা। অন্যপাশে একটা গয়না ধার দেওয়ার দোকান। দোকানদার মানুষটি রোগা, লম্বা, সাদাচুলো, কালো পোশাক পরা, আর হাতে আন্দাজ ন-ক্যারাট হিরের আংটি শোভিত। আমাকে গাইগারের দোকানে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখে তার মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

আমি দোকানে ঢুকলাম। দরজা থেকে দেওয়াল অবধি গোটা মেঝে একটা নরম নীল কার্পেটে ঢাকা ছিল। নীল রঙের গদিমোড়া বেশ কয়েকটা চেয়ার ঘরের এদিকে-ওদিকে ছড়ানো ছিল। সামনের পালিশ করা টেবিলে সুন্দরভাবে বাঁধানো কয়েকটা বই দেখে মনে হল, ডেকরেটররা নির্ঘাত এইরকম বই-ই লট ধরে কিনে ঘর সাজায়। একটা কাঠের পার্টিশনে দরজা বানিয়ে ঘরটা দু-ভাগ করা ছিল। পার্টিশন আর দেওয়ালের কোণে একটা ছোট্ট ডেস্কে এক মহিলা বসে ছিলেন।

আমাকে ঢুকতে দেখে মহিলা উঠে দাঁড়ালেন, তারপর এগিয়ে এলেন। ওঁর সামান্য হেলেদুলে এগিয়ে আসার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যেটা আমি বইয়ের দোকানে বিশেষ দেখিনি। মহিলার পরনের কালো পোশাকটা সব আলো শুষে নিচ্ছিল। লম্বা থাই, ঢেউ-খেলানো ধূসর সোনালি চুল, সবজেটে চোখের ভ্রূতে কারুকার্য, রুপোলি নখ– সব মিলিয়ে বইয়ের বদলে অন্য কিছুর কথাই মনে হচ্ছিল। আমার কাছে এসে মহিলা ঘাড় কাত করে একটা আলগা চুল জায়গামতো আনলেন, তারপর হাসলেন। কাজের খাতিরে আমি হাসিটাকে সুন্দর বলেই ধরে নিলাম।

‘কী লাগবে?’

আমি মোটা ফ্রেমের সানগ্লাসটা চাপিয়ে নিয়েছিলাম। তার সঙ্গে মানানসই, কিঞ্চিৎ সরু গলায় বললাম, ‘১৮৬০ সালের বেন হুর পাওয়া যাবে?’

মহিলা নির্ঘাত ‘কী?’ বলতে চেয়েছিলেন। বেশ কষ্ট করে নিজেকে সামলে উনি বললেন, ‘প্রথম সংস্করণ?’

‘তৃতীয়।’ আমি বললাম, ‘যাতে ১১৬ নম্বর পাতায় ভুল ছাপা আছে।’

‘এখন নেই। দুঃখিত।’

‘শেভালিয়ার অডোবন ১৮৪০– পুরো সেটটা পাওয়া যাবে?’

‘না।’ মহিলার হাসিটা এখন কোনোক্রমে দাঁতে লেগে ছিল, ‘এই মুহূর্তে পাওয়া যাবে না।’

‘আপনারা বই-ই বেচেন তো?’ আমি নম্রভাবে জানতে চাইলাম।

মহিলা আমার আপাদমস্তক দেখলেন। হাসি নেই, চোখের দৃষ্টিকে আর মোহিনী বলা যাচ্ছে না, দাঁড়ানোর ভঙ্গি একেবারে সিধে। দেওয়ালে কাচের পেছনে রাখা সারি সারি বইয়ের দিকে আঙুল নেড়ে উনি বললেন, ‘ওগুলো দেখে কী মনে হয়?’

‘আরে দুর!’ আমি গলায় বিরক্তি ফোটালাম, ‘ওই বইয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। নির্ঘাত স্টিলের এনগ্রেভিং, মামুলি রঙিন প্লেট, সাদা কাগজ– এইসব সস্তা জিনিস দিয়ে ভরা ওগুলো। মাফ করবেন। ওসব চাই না।’

‘ও।’ মুখে হাসিটা ফেরাতে মহিলার এত কষ্ট হল যে বলার নয়, ‘মিস্টার গাইগার হয়তো আপনাকে সাহায্য করতে পারতেন। কিন্তু উনি তো এখন নেই।’

মহিলা আমাকে মাপছিলেন। বুঝতে পারছিলাম, দুর্লভ বই সম্বন্ধে ওঁর জ্ঞানের আসল গভীরতা জানলে আমি বোধ হয় অজ্ঞানই হয়ে যাব।

‘মিস্টার গাইগার কি আজ আসবেন?’

‘আসতে দেরি হবে।’

‘মুশকিল।’ আমি সখেদে মাথা নাড়লাম, ‘খুব মুশকিল। তাহলে আমি বরং এখানেই বসে ওঁর জন্য অপেক্ষা করি। এমনিতেও আজ বিকেলে আমার কোনো কাজ নেই।’

‘আ-আচ্ছা।’ মহিলা বললেন, ‘বেশ।’

আমি একটা চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসলাম। সিগারেট ধরালাম। শান্তভাবে ঘরের আবহাওয়া দূষিত করলাম। মহিলা বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েই রইলেন, তারপর বাধ্য হয়ে বসলেন। ডেস্কে রাখা টেবিল ল্যাম্পের পেছন থেকে উনি আমাকে দেখতে থাকলেন। একবার ফোনের ওপর হাত দিলেন, তারপর কী ভেবে হাত সরিয়ে নিলেন। আমি হাই তুললাম। মহিলা নখ দিয়ে টেবিলে টরেটক্কা করতে লাগলেন।

মিনিট পাঁচেক এভাবেই কাটল। তারপর দরজা খুলে খেঁকুরে চেহারার, লম্বা নাকওয়ালা, যাচ্ছেতাই রঙের সুট পরা একটা ঢ্যাঙা লোক ঢুকল। নিঃশব্দে দরজাটা আবার ভেজিয়ে সে ডেস্কের কাছে গিয়ে মহিলাকে একটা পার্সেল দেখাল। তারপর ওয়ালেট বের করে আরও কিছু দেখাল। মহিলা মাথা ঝাঁকিয়ে একটা বোতাম টিপলেন। পার্টিশনের মাঝের দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে গেল। লোকটা সেখান দিয়ে ওপাশে চলে গেল।

আমি বসে সিগারেট টেনে চললাম। বাইরে থেকে শহরের নিজস্ব শব্দগুলো ভেসে আসছিল। মহিলা আঙুল দিয়ে নিজের চোখ আড়াল করে তার পেছন থেকে আমার ওপর কড়া নজর রেখেছিলেন। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর লোকটা পার্টিশনের ওপার থেকে বেরিয়ে এল। ওর হাতে অন্য একটা পার্সেল ধরা ছিল। পার্সেলটা দেখে মনে হচ্ছিল, তার মধ্যে একটা বড়ো বই আছে। লোকটা ডেস্কের কাছে গেল, মহিলাকে কিছু টাকা দিল, আমাকে কড়া চোখে দেখল, তারপর প্রায় দৌড়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। আমিও উঠে দাঁড়ালাম।

দোকানের মহিলাটির উদ্দেশে নড করে আমি লোকটার পিছু নিলাম। লোকটা হাতের ছড়ি দোলাতে দোলাতে পশ্চিম দিকে যাচ্ছিল। ওইরকম উৎকট রঙের পোশাক পরা ছড়িওলা লোককে অনুসরণ করা খুবই সহজ। প্রায় দেড় ব্লক পেরোনোর পর হাইল্যান্ড অ্যাভিনিউ ট্র্যাফিক সিগনাল এল। ওখানে আমি লোকটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। লোকটা প্রথমে আলগাভাবে আমায় দেখল, তারপরেই ওর দৃষ্টিটা খর হয়ে উঠল।

সিগনাল সবুজ হল। একসঙ্গে রাস্তা পেরোনোর পর লম্বা লম্বা পা ফেলে লোকটা আমার চেয়ে এগিয়ে গেল। আমি সুস্থভাবেই হাঁটছিলাম। একটা কোণ পেরোনোর পর লোকটা সিগারেট ধরানোর জন্য দাঁড়াল। কিন্তু গজ বিশেক দূরে আমাকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লোকটার আর সিগারেট খাওয়া হল না। প্রায় দৌড়ে লোকটা আমাকে অনেক পেছনে ফেলে দিল। এদিক-ওদিক করে আমি যখন একটা সরু, গাছে ছাওয়া রাস্তায় পৌঁছোলাম, তখন লোকটাকে আর ত্রিসীমানায় দেখতে পাচ্ছিলাম না।

রাস্তার একদিকে দেওয়াল, আর অন্যদিকে গাছে প্রায় ঢাকা পড়ে যাওয়া তিনটে বাংলো ছিল। হাঁটার সময় ‘দ্য লা বাবা’ নামের বাংলোটার দিকে নজর পড়ল। বাংলোর বাইরে দু-সারি ইটালিয়ান সাইপ্রেস গাছকে ছেঁটে-কেটে তেল রাখার পেটমোটা পাত্রের মতো আকার দেওয়া হয়েছিল। বুঝলাম, আলিবাবা আর চল্লিশ চোরের উপাখ্যানের হলিউড সংস্করণ দেখছি। তবে ওসব নয়, গাছের সারির মধ্যে আমি উৎকট রং আর ডিজাইনের একটা ঝলক দেখতে পেয়েই থমকে গেছিলাম।

রাস্তার অন্যদিকে একটা গাছে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি ভয়ে ভয়ে নেমে এল। বাতাসের ভারী আর স্থির ভাব আমাকে জেনারেল স্টার্নউডের গ্রিনহাউসের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

গাছের আড়াল থেকে প্রথমে একটা হাত, তারপর একটা লম্বা নাক, অবশেষে অর্ধেকটা মাথা আর একটা চোখ বেরোল। আমাদের চোখাচোখি হল। সবকিছু আবার অদৃশ্য হল। আরও মিনিট পাঁচেক কাটল। তারপর পুরো শরীরটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। লোকটা একবার চেনা গান ভুলভাল সুরে শিস দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে আমার ফিট দশেকের মধ্য দিয়েই ছড়ি দোলাতে দোলাতে হেঁটে গেল। এবার আর ওর মধ্যে কোনো নার্ভাস ভাব ছিল না। বুঝলাম, হাতের বিপজ্জনক জিনিসটিকে বিদায় করে লোকটা আবার ‘নিরাপদ’ বোধ করছে।

লোকটা নজরের আড়াল হলে আমি এগিয়ে গেলাম। গাছের পেছন থেকে পার্সেলটা তুলে বগলদাবা করলাম, তারপর হাঁটা দিলাম।