Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ৫

টেলিফোন ডাইরেক্টরি থেকে শ্রীযুক্ত আর্থার গুইন গাইগারের বাড়ির ঠিকানা আর নম্বর পাওয়া গেল। ভদ্রলোক লরেল ক্যানিয়ন বুলেভার্ডের কাছে লাভার্ন টেরেসে থাকেন। ওই নম্বরে ফোন করলাম, কিন্তু কেউ ধরল না। ওঁর দোকান থেকে কয়েক ব্লক দূরত্বের মধ্যে আরও কয়েকটা বইয়ের দোকানের ঠিকানা বের করলাম।

প্রথম দোকানটা বিশাল, কিন্তু স্টেশনারি আর অন্য হাবিজাবিতে ভরতি। ওটা ছেড়ে আরও দুটো ব্লক এগিয়ে একটা সরু দোকান পেলাম। মেঝে থেকে ছাদ অবধি বইয়ের পাহাড়ের মধ্যে কিছু দুঃসাহসী অভিযাত্রী কিছু খুঁজছে। আমি ঠেলেঠুলে দোকানের আরেক প্রান্তে গেলাম। সেখানে একটা টেবিলে এক ছোটোখাটো মহিলা আইন বিষয়ক একটা মোটা বই পড়ছিলেন। মহিলার সামনে গিয়ে ওয়ালেট খুলে ধরলাম। ভেতরের পরিচয়পত্রটা খুঁটিয়ে দেখে মহিলা চোখ থেকে চশমা খুলে আমাকে আপাদমস্তক দেখলেন, কিন্তু কিচ্ছু বললেন না। মহিলার বুদ্ধিদীপ্ত মুখ-চোখ দেখে মনে হল, এঁকে দিয়েই আমার কাজ হবে।

‘আমার একটা উপকার করবেন?’

‘কী উপকার?’ মহিলার গলায় একটা ভারী, মসৃণ ভাব ছিল।

‘এখান থেকে দু-ব্লক পশ্চিমে গাইগারের দোকানটা চেনেন নিশ্চয়?’

‘রাস্তা পার হওয়ার সময় দেখেছি বোধ হয়।’

‘ওটা বইয়ের দোকান।’ আমি বললাম, ‘তবে আপনার দোকানের মতো নয়। আপনি জানেন।’

উত্তরে মহিলার ঠোঁটটা সামান্য বেঁকল শুধু। আমি বললাম, ‘আপনি গাইগারকে দেখেছেন নিশ্চয়?’

‘দুঃখিত। আমি মিস্টার গাইগারকে চিনি না।’

‘তাহলে, উনি কেমন দেখতে সে-ব্যাপারে আপনি কিছু বলতে পারবেন না?’

মহিলার ঠোঁটটা আরও বেঁকল। প্রশ্ন এল, ‘বলব কেন?’

‘কোনো কারণ নেই। আপনি যদি বলতে না চান, তাহলে আমি আপনাকে বাধ্য করতে পারব না।’

মহিলা একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে গুঁজলেন। আমি দেশলাই জ্বেলে ধরলাম। উনি আমাকে ধন্যবাদ দিলেন, চেয়ারে হেলান দিয়ে ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে আমাকে দেখলেন, তারপর বললেন, ‘আপনি জানতে চান গাইগার কেমন দেখতে? তাহলে ওঁকেই জিজ্ঞেস করছেন না কেন?’

‘উনি ওখানে নেই।’

‘কখনো-না-কখনো তো আসবেন। ওটা তো ওঁরই দোকান।’

‘আমি এখনই ওঁর মুখোমুখি হতে চাইছি না।’

মহিলা কিছু না বলে খোলা দরজা দিয়ে বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি বললাম, ‘দুর্লভ বইয়ের ব্যাপারে কিছু জানেন?’

‘পরীক্ষা প্রার্থনীয়।’

‘আপনার কাছে বেন হুর-এর ১৮৬০ সালের সেই সংস্করণটা আছে, যার ১১৬ নম্বর পাতায় একই লাইন দু’বার ছাপা হয়েছিল?’

মহিলা আইনের বইটা সরিয়ে রাখলেন। টেবিলের এক মাথায় রাখা একটা মোটা হলদে বই বের করে সেটা ঘাঁটলেন। বেশ কিছুক্ষণ পড়ে আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, ‘নেই। কারো কাছেই থাকা সম্ভব নয়, কারণ ওরকম কিছু আদৌ নেই।’

‘ঠিক।’

‘আপনি কী বলতে চাইছেন?’

‘মিস্টার গাইগারের দোকানে যে মহিলা ছিলেন, তিনি কিন্তু এই তথ্যটা জানতেন না।’

‘তাই নাকি?’ বলে মুখ থেকে ধোঁয়ার একটা নিটোল রিং ছাড়লেন মহিলা। নিজেই আঙুল দিয়ে সেটাকে ছড়িয়ে দিলেন চারপাশে। তারপর বললেন, ‘গাইগারের বয়স চল্লিশের কোঠায় বলেই মনে হয়। মাঝারি উচ্চতা, একটু মোটার দিকে ধাত। সত্তর কিলো মতো হবে ওজন। গোল মুখ, ছোটো গোঁফ, ভারী ঘাড়, আবার চেহারায় একটা নরম সরম ভাবও আছে। কেতাদুরস্ত পোশাক পরে, তবে টুপি পরতে দেখিনি। দাবি করে যে অ্যান্টিক সম্বন্ধে অনেক কিছু জানে, আসলে কিছুই জানে না। আর হ্যাঁ, বাঁ-চোখটা কাচের।’

‘আপনি পুলিশ হলে অনেক দূর উঠতেন কিন্তু।’ আমি বললাম।

‘রক্ষে করুন।’ বলে চোখের ওপর চশমা চাপিয়ে মহিলা আবার আইনের বইটা খুললেন। আমি মহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছিল। তার মধ্য দিয়েই দৌড়ে গাইগারের দোকানের উলটোদিকে রাখা আমার গাড়িটা অবধি যেতে যেতে ভিজে ন্যাতা হয়ে গেলাম। গাড়িতে বসে হাত আর পার্সেল– দুটোই ভালো করে মুছে কাগজের মোড়কটা সরালাম।

খুব উঁচুদরের চামড়া দিয়ে বাঁধানো ছিল ভারী বইটা। ভেতরে দামি পাতায় হ্যান্ডসেট করে ছাপানো ছিল পাতাজোড়া রঙিন ফটোর পর ফটো। ফটোগুলোর বিষয়বস্তু অবশ্য শুধু ভদ্রসমাজ নয়, অধিকাংশ অভদ্রসমাজেরও অনুপযুক্ত। বইটা নতুন নয়। সামনের পাতায় লাগানো কার্ড দেখে বুঝলাম, ওটা বার বার নেওয়া হয়েছে, আবার ফিরিয়েও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বইটা খুব উঁচু বা নীচু স্তরের পর্নোগ্রাফির সংকলন যেটা নিয়মিত ভাড়া দেওয়া হয়।

আমি বইটা কাগজে মুড়ে গাড়ির সিটের পেছনে ভরে রাখলাম। তারপর সিগারেট ধরিয়ে, বৃষ্টির শব্দ শুনলাম অনেকক্ষণ ধরে। ভাবছিলাম, ওরকম একটা জায়গায় বুক ফুলিয়ে এমন ব্যাবসা চালাতে গেলে কতটা লম্বা হাত দরকার হতে পারে।