Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ৬

বৃষ্টিটা হয়েই চলল। রাস্তার ধারের নালা উপচে এবার রাস্তাতেও জল জমতে শুরু করল। তবে তুমুল বৃষ্টির মধ্যেও রাস্তার ধারে মায়াবনবিহারিণীদের কারবার চলছিল। তাদের নিয়ে পুলিশেরাও বড়োই ব্যস্ত হয়ে ছিল বলে আমার গাড়ির দিকে কেউ তাকাল না। এই বৃষ্টিতেও, হয়তো-বা বৃষ্টি বলেই, গাইগারের দোকানে ব্যাবসাপত্তর ভালোই চলছিল। সুন্দর সুন্দর গাড়ি এসে দাঁড়াচ্ছিল। সেখান থেকে সুবেশ, সুদর্শন মানুষরা নামছিলেন এবং কিছুক্ষণ পরে পার্সেল বগলদাবা করে চলে যাচ্ছিলেন। আজ্ঞে হ্যাঁ, মানুষরা– শুধু পুরুষরা নন।

বিকেল চারটে নাগাদ একটা ক্রিমরঙা গাড়ি এসে দাঁড়াল। গাড়ির সওয়ারি বৃষ্টি এড়ানোর চেষ্টায় দৌড়ে দোকানে ঢুকলেও তার ভারী মুখ আর ছোটো গোঁফটা আমি দেখে ফেললাম। দোকান থেকে একটি লম্বা, সুদর্শন ছেলে বেরিয়ে এসে গাড়িটাকে চালিয়ে নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ছেলেটা হেঁটে ফিরল। আরও ঘণ্টাখানেক কাটল। কালো রাস্তা আর কালো আকাশের মাঝে জ্বলে ওঠা আলোগুলো নিষ্প্রভ ঠেকছিল। সোয়া পাঁচটা নাগাদ ওই লম্বা ছেলেটা একটা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে এল। ও গাড়িটা আবার চালিয়ে আনার পর গাইগার দোকান থেকে বেরিয়ে তাতে সওয়ার হল। ছেলেটা দোকানে ঢুকল। আমি গাইগারের পিছু নিলাম।

গাড়িটা বুলেভার্ড ধরে পশ্চিমে চলল। আমি মোটামুটি দু-ব্লক দূরে থেকে গাড়িটাকে অনুসরণ করলাম। দেখলাম, আমার আন্দাজটা ঠিকই ছিল। গাইগার নিজের বাড়িতেই ফিরছিল বটে। একটা সরু রাস্তায় ঢুকল ওর গাড়ি। রাস্তার একদিকটা ঢালু হয়ে উঠে গেছে। অন্যদিকে ছাড়া ছাড়া কয়েকটা বাড়ি। ছোটোবড়ো গাছ আর ঝোপে বাড়ির সামনের জানলাগুলো ঢাকা পড়ে গেছিল। চারদিকে শুধু ভিজে গাছ দেখছিলাম।

গাইগারের গাড়িতে আলো জ্বললেও আমি আলো জ্বালাইনি। ওর গাড়িকে পাশ কাটিয়ে কিছুটা এগিয়ে রাস্তার শেষ মাথায় একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ালাম। ও ইতিমধ্যেই গাড়ি থামিয়েছিল। ওর গাড়ির আলোয় একটা গ্যারেজের দরজা দেখলাম। গাইগার নেমে গ্যারেজ খুলল, তারপর গাড়িটা সেখানে ঢোকাল। ওর হাঁটাচলা দেখে মনে হচ্ছিল, ওকে কেউ অনুসরণ করতে পারে এমন আশঙ্কা ও করছে না। এবার ও নিজের বাড়িতে ঢুকল। ভেতরে আলো জ্বলে উঠল।

গাইগারের প্রতিবেশীর বাড়িটা ফাঁকা আছে বলে মনে হচ্ছিল। তার সামনেই নিজের গাড়িটা পার্ক করলাম। কাচ নামিয়ে দিলাম। হুইস্কির বোতল বের করে তাতে কয়েক চুমুক দিলাম। আমি ঠিক কীসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, বুঝতে পারিনি। তবে মন বলছিল, আমার অপেক্ষা করা উচিত।

অনেকটা সময় কাটল। এর মধ্যে মাত্র দুটো গাড়ি ওই রাস্তা দিয়ে যেতে দেখলাম। সেটা বৃষ্টির জন্য, নাকি পাড়াটাই শান্ত– জানি না। ছ-টার একটু পরে, তখন ঘুটঘুট্টে অন্ধকার হয়ে গেছে, একটা গাড়ির আলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে দেখলাম। গাইগারের বাড়ির সামনে থামল গাড়িটা। হেডলাইট নিভে গেল। টুপি আর রেইনকোটে ঢাকা একজন ছোটোখাটো মহিলা বেরিয়ে এসে দরজার ঘণ্টি বাজালেন। আলো জ্বলল, দরজা খুলল, বন্ধ হল। চারপাশে নৈঃশব্দ্য নেমে এল আবার।

আমি গাড়ি থেকে একটা টর্চ বের করে সামনের গাড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। গাড়িটা প্যাকার্ড কনভার্টিবল, রং মেরুন বা গাঢ় বাদামি। বাঁ-দিকের জানলার কাচ নামানো ছিল। যেখানে লাইসেন্স আটকানো থাকে, সেটা হাতড়ে বের করে আলো ফেললাম। গাড়ির মালিকের নাম কারমেন স্টার্নউড, ধাম ৩৭৬৫ অল্টা ব্রিয়া ক্রেসেন্ট, পশ্চিম হলিউড। গাড়িতে ফিরে গিয়ে বসে রইলাম। ছাদ থেকে জল চুইঁয়ে আমার হাঁটু ভিজিয়ে দিল। হুইস্কি আমার পেটের ভেতর জ্বালা ধরিয়ে দিল। আর কোনো গাড়ির সাড়াশব্দ পেলাম না। মনে হচ্ছিল, বদ নেশা করার পক্ষে এর চেয়ে ভালো এলাকা পাওয়া কঠিন।

তখন ঠিক সাতটা কুড়ি। গাইগারের বাড়ির ভেতর একটা উজ্জ্বল সাদা আলোর ঝলক দেখলাম। তার রেশ মিলিয়ে আগের মতো সব অন্ধকার হওয়ার আগেই একটা ক্ষীণ চিৎকার শুনলাম। শব্দটা এসেছিল বাড়িটা থেকেই। বৃষ্টিভেজা গাছের ভিড়ে আর রাতের অন্ধকারে শব্দটা হারিয়ে গেল।

আমি গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম।

চিৎকারটার মধ্যে কোনো ভয় ছিল না। বরং মাতালের নির্বোধ আনন্দের একটা ভাব ছিল তাতে। তবু, আওয়াজটা আমার ভালো লাগেনি। ঝোপের ফাঁক দিয়ে দরজার সামনে পৌঁছে গেছিলাম। একটা সিংহর মুখে আংটা বসিয়ে কড়া নাড়ার ব্যবস্থা ছিল। আমি ওটা ধরার সঙ্গেসঙ্গে তিনটে গুলির আওয়াজ ভেসে এল বাড়ির ভেতর থেকে। একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ হল, তারপর একটা নরম জিনিস থপ করে মাটিতে পড়ার শব্দ পেলাম। একজোড়া পায়ের শব্দ দ্রুত দূরে সরে গেল।

বাড়ির সদর দরজার এপাশে দেওয়াল। সেখান থেকে একটা পাটাতনের মতো তক্তা বেরিয়ে রাস্তার ওধারের ঢালু জমি অবধি চলে গেছিল। বাড়িটার ধার দিয়ে পেছনদিকে যাওয়ার মতো কোনো রাস্তা ছিল না। তবে পেছনদিক দিয়ে বেরিয়েই বোধ হয় সিঁড়ি আছে, যেটা দিয়ে নীচে অন্য একটা রাস্তায় নামা যায়। এটা বুঝলাম, কারণ আমি সিঁড়ি দিয়ে কারো দ্রুত নেমে যাওয়ার শব্দ পেয়েছিলাম। তারপরেই একটা গাড়ি সগর্জনে বেরিয়ে গেল। মনে হল যেন আরও একটা গাড়ি তার পরেই স্টার্ট নিল। সব চুপচাপ হয়ে গেল আবার।

পর্দাটানা ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে ভেতরে তাকালাম। একটা বুককেসের একপাশে একটা আলো জ্বলছে– এটুকু ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না। ধাক্কা মেরে সদর দরজাটা খুলতে গিয়ে কাঁধে ব্যথা হয়ে গেল, কিন্তু কাজের কাজ হল না। বাধ্য হয়ে ওই ফ্রেঞ্চ উইন্ডোটাই লাথিয়ে ভাঙলাম। আমার টুপিটাকে দস্তানার মতো করে ব্যবহার করে নীচের পাল্লার ভাঙা কাচের টুকরোগুলো সরালাম। সেখান দিয়ে হাত ঢুকিয়ে জানলা খুলে, পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।