মরণ ঘুম – ৭
৭
ঘরটা বিশাল– বাড়ির এক মাথা থেকে অন্য মাথা অবধি ছড়ানো। তার খয়েরি দেওয়ালে ঝোলানো ছিল কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো জাপানি প্রিন্ট আর নকশা-কাটা সিল্কের চাদর। মেঝেতে পাতা গোলাপি রঙের নরম কার্পেটে ছড়িয়ে ছিল কুশন। নীচু বুকশেলফের ওপর রাখা ছিল কারুকাজ করা ল্যাম্প। একটা হালকা সুগন্ধও ছিল ঘরের বাতাসে, তবে সেটা ছাপিয়ে উঠেছিল অন্য দুটো গন্ধ– কর্ডাইট আর ইথার!
একটা নীচু ডিভানে স্তূপাকারে জামাকাপড়, এমনকী হালকা গোলাপি রঙের অন্তর্বাস রাখা ছিল। সেখান থেকে কিছুটা দূরে, কমলা রঙের শাল বিছানো একটা মজবুত চেয়ারে বসে ছিলেন কারমেন স্টার্নউড। খাড়া পিঠ, চেয়ারের হাতলে দু-হাত, খাড়া চিবুক, ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ঝকঝক করা দাঁত, খোলা চোখের প্রায় সবটা জুড়ে থাকা শ্লেটরঙা কনীনিকা– এগুলো দেখে কোনো মিশরীয় দেবীর কথাই মনে হচ্ছিল। তবে ছন্দপতন ঘটাচ্ছিল দুটো জিনিস।
প্রথমত, মহিলা সম্পূর্ণ শূন্যদৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে ছিলেন। বুঝতে পারছিলাম, মহিলার জ্ঞান নেই। সেই অবস্থাতেও তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিল একটা অদ্ভুত শব্দ– অনেকটা বুদ্ধিহীন হাসির মতো।
দ্বিতীয়ত, একজোড়া জেড-বসানো লম্বা কানের দুল ছাড়া ওঁর পরনে আর কিচ্ছু ছিল না।
ঘরের অন্য মানুষটি, অর্থাৎ গাইগার, কার্পেটের একধারে চিত হয়ে পড়ে ছিল। ওর পায়ের নরম সোলের পুরু স্লিপার বা কালো সাটিন পাজামা থেকে আমার নজর পিছলে গেল ওপরদিকে। নকশা করা চীনা কোটের সামনের দিকে রক্ত দিয়ে আঁকা নতুন ডিজাইনটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। বুঝতে পারছিলাম, তিনটে গুলির একটাও ফসকায়নি।
গাইগারের শরীরের সামনেই টোটেম পোলের মতো করে দাঁড়িয়ে ছিল একটা ক্যামেরা স্ট্যান্ড। ক্যামেরার নিশানা ছিল চেয়ারে বসে থাকা নগ্ন মেয়েটির দিকে। তার ঠিক পাশেই ঝুলছিল একটা জ্বলে যাওয়া ফ্ল্যাশ বাল্্ব।
যে সাদা আলোর ঝলকটা আমি দেখেছিলাম, সেটা তাহলে এই বাল্্ব থেকে এসেছিল। নেশায় আচ্ছন্ন মেয়েটা সেই আলোয় চমকে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল। তবে তার পরেই গল্পে অন্য টুইস্ট এসে গেছিল। তিনটে গুলি ছুড়ে, গল্পে নতুন মোচড় এনে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে উধাও হয়ে গেছেন সেই নতুন কাহিনিকার।
পাশে একটা নীচু টেবিলে ট্রে-র ওপর সোনালি নকশা করা তিনটে সরু গ্লাস রাখা ছিল। তার পাশে ছিল কালচে তরলে ভরা একটা ভারী পাত্র। আমি সেটার ঢাকনা খুলে শুঁকলাম। ইথার আর আফিমের মিশ্রণ বলে মনে হল জিনিসটাকে।
এদিক-ওদিক দেখে নিলাম। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া চরাচর নিস্তব্ধ। সাইরেন, গাড়ির হর্ন, চিৎকার– কিচ্ছু নেই। শুধু বৃষ্টি ঝরছে ছাদে, গাছে, রাস্তায়। আমি ডিভানে গিয়ে জামাকাপড়ের স্তূপ হাতড়ে একটা উলের পোশাক পেলাম, যেটা ওপরে ওপরে চাপিয়ে দেওয়া যায়। সেটা নিয়েই কারমেনের দিকে এগিয়ে গেলাম। বেশ কয়েক ফুট দূর থেকেও ওর শরীর থেকে আসা ইথার আর আফিমের গন্ধটা পাচ্ছিলাম। মেয়েটা ফাঁকা চোখে আমার দিকে তাকাল।
‘আসুন।’ আমি খুশিয়াল গলায় বললাম, ‘ঝটপট তৈরি হওয়া যাক।’
আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হাসা ছাড়া মেয়েটার কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আদায় করতে পারলাম না। ওকে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় দিয়েও খুব একটা লাভ হল না। মনেই হচ্ছিল না ও কিছু টের পাচ্ছে। বাধ্য হয়ে, ওই অবস্থাতেই ওকে দাঁড় করালাম, উলের পোশাকটা পরালাম, তারপর ধরে ধরে কিছুটা হাঁটানোর চেষ্টা করলাম। গাইগারের চিত হয়ে পড়ে থাকা শরীরটা দেখে কারমেনের মুখে আবার সেই নির্বোধ হাসি আর আধো আধো কথা ফিরে এল। ওকে ডিভানের কাছে নিয়ে গেলাম। ও বসল না, শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ল।
ক্যামেরাটা খুঁটিয়ে দেখলাম এবার। বাকি সব ঠিকঠাক থাকলেও ক্যামেরার প্লেটহোল্ডারটা খুঁজে পেলাম না। ভাবলাম, গাইগার হয়তো ফটো তোলার পরেই ওটা নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছিল। ওর শরীর, মেঝে, এমনকী ঘরের অন্য অংশেও আমি কিছু খুঁজে পেলাম না। ব্যাপারটা মোটেই সুবিধের ঠেকল না।
বাড়ির অন্য অংশগুলো যত দ্রুত সম্ভব দেখে এলাম। ডানদিকে একটা বাথরুম। তার পাশে একটা তালাবন্ধ ঘর। পেছনদিকে একটা রান্নাঘর। রান্নাঘরের দরজাটা দেখলাম জোর করে খোলা হয়েছে। পর্দাটা সরে গেছে, তার হুকটা দেওয়াল থেকে খসে নীচে পড়েছে। পেছনের দরজাটা খোলা ছিল, আমি ওটাকে আর ছুঁইনি।
বাঁ-দিকের ঘরে ঢুকলাম। টিপটপ সাজানো ঘরেও ড্রেসিং টেবিলটা চোখ টানল। তিনটে আয়না-বসানো ওরকম টেবিল আর তার সামনে রাখা নানা পারফিউমের শিশি – এগুলো মহিলাদের ঘরেই সচরাচর দেখা যায়। আবার দেওয়াল-আলমারিতে পুরুষের পোশাক আর বিছানার একপাশে পুরুষের স্লিপারও দেখতে পাচ্ছিলাম। টেবিলে কিছু আলগা টাকা, রুমাল আর চিরুনির পাশে একটা চাবির গোছা ছিল। ওটা নিয়ে আমি বড়ো ঘরটায় গেলাম, তারপর ডেস্কটা ঘাঁটলাম। ড্রয়ারের পেছনদিকে স্টিলের একটা বাক্সের মধ্যে নীল রঙের একটা নোটবই পেলাম। তার ভেতরের হাতের লেখাটা জেনারেল স্টার্নউডের কাছে আসা চিঠির সঙ্গে মিলে গেল। বইটাতে পাতার-পর-পাতা জুড়ে কিছু দুর্বোধ্য কোড লেখা ছিল। আমি নোটবইটা পকেটস্থ করলাম। স্টিলের বাক্সের যে জায়গাগুলো ছুঁয়েছিলাম সেগুলো মুছলাম। দেরাজ বন্ধ করলাম। ফায়ারপ্লেসের গ্যাস লক বন্ধ করলাম। চাবির গোছা পকেটে ভরে নিজের ওভারকোটটা চাপিয়ে নিলাম।
কারমেনকে ডাকতে গিয়ে মুশকিল হল। ওকে ঘুম থেকে তুলতেই পারছিলাম না। রেইনকোট আর টুপি দিয়ে ওকে ঢাকাঢুকি দিয়ে ওর গাড়ি অবধি নিয়ে গেলাম। অবশিষ্ট জামাকাপড় নিজের পকেটে ভরে নিলাম, আলো নেভালাম, দরজা বন্ধ করলাম, সদর দরজায় তালা দিলাম। কারমেনের ব্যাগ থেকে চাবি নিয়ে গাড়ি চালালাম। আলো জ্বালাইনি, বরং ঢাল বরাবর গাড়িটা নামিয়ে অল্টা ব্রিয়া-র দিকে চললাম।
পুরো রাস্তাটা আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েই কাটাল কারমেন স্টার্নউড।
