Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রবি পথ – আবুল হায়াত
রবি পথ – আবুল হায়াত
0/35
রবি পথ – আবুল হায়াত

১৫. এলেম নতুন দেশে

এলেম নতুন দেশে….

জীবনে প্রথম বিদেশ যাত্রা। এর শানে নজুল বর্ণনা করা হয়েছে ইতিমধ্যে। সকাল ৮টায় বাংলাদেশ বিমানের ভাড়া করা উড়োজাহাজে চড়ে রওয়ানা হলাম দুই শতাধিক বঙ্গ সন্তান। সাতজন প্রকৌশলী চারজন সার্ভেয়ার আর দুই শতাধিক শ্রমিক।

গন্তব্য: লিবিয়া। মোয়ামের আল কাজ্জাফী (গাদ্দাফি)র দেশ। উত্তর আফ্রিকার তেল সমৃদ্ধ দেশ লিবিয়া চলেছি, আমরা সদলবলে। দেশের বিমান হওয়াতে সুবিধে ছিল অনেক। খাওয়া দাওয়া, আদর-যত্ন নিয়মের চেয়ে বেশি। তাছাড়া বিমানের পাইলট, প্রকৌশলী সবাই পালা করে এসে আমাদের প্রকৌশলীদের দলে বসে আড্ডা চালিয়ে গেছেন ঘণ্টায় ঘণ্টায়।

দুবাইতে ঘণ্টাখানেকের বিরতি দিয়ে আবার ছুটলো রাত দশটা (বাংলাদেশ টাইম) অবধি সোজা গিয়ে থামলো ত্রিপলী বিমানবন্দরে। ওরা ত্রিপোলীকে বলে ত্রাবোলাস, পরে জেনেছি।

তখন সেখানে সন্ধে নামছে কেবল, মরুভূমির ধূ ধূ বালুর চিহ্নমাত্র দেখলাম না ওপর থেকে। যেদিকে তাকাই দেখি সবুজ আর সবুজ। গাদ্দাফির রাজনৈতিক দলের রঙ ছিল সবুজ। লিবিয়ার পতাকা সবুজ, বই লিখেছেন গাদ্দাফি তার নানা সবুজ বই (Green book) যে মাঠে বক্তৃতা করেন তার নাম সবুজ মাঠ (ময়দানে আখদার)। যে গাছ গুলো ওপর থেকে দেখেছি। তার সবই জলপাই (জয়তুন) গাছ। সারিবদ্ধভাবে মাইলকে মাইল গাছ লাগানো। এগুলো ছিল গাদ্দাফির ‘লিবিয়াকে ‘সবুজ করো’ পরিকল্পনার অংশ।

সকালে তেজগাঁও বিমানবন্দরে বেশ বেদনাবিধূর একটি বিদায় দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল বলা যায়। শিরী দুই বাচ্চা নিয়ে উপস্থিত তো ছিলই, সঙ্গে আরও দুচারজন আত্মীয় স্বজন (বিশেষ করে দুই ছোটবোন) ও ছিল বিদায় জানাতে।

নানান ঝামেলা করে মনটন খারাপ করে লিবিয়া যেতে রাজী হয়েছিলাম— তাই আমার মানসিক অবস্থা ভীষণ ডাউন ছিল। আর বিমানবন্দরের কর্মীরা যখন আমাকে যেতে দেবে না বলে সবাই একটা স্লোগান তুললো— তখন বুঝলাম-শিল্পী জীবনের স্বার্থকতা— মনটা ভাল হলো— কিন্তু কান্নায় চোখ ভাসলো। প্লেনে ওঠার সময় বিমানবালারা পর্যন্ত পথ আগলে রাখলো কিছুক্ষণ। আপনাকে তো যেতে দেবো না স্যার।

বুঝতেই পারছেন, এমন একটা আনন্দ-বেদনা নিয়েই চড়েছিলাম বিমানে। মনটা ভাল হলো যখন ফ্লাইট প্রকৌশলী এসে ঘণ্টাখানেক আড্ডা দিয়ে গেলেন— তারপর স্বয়ং পাইলট সহকারির হাতে বিমান ছেড়ে দিয়ে এসে আমাদের সাথে মধ্যাহ্নভোজ করলেন— আর বাঙালি শ্রমিক ভাইরা তো কিছুক্ষণ পরপর এসে আমার সাথে আলাপে মেতেছিল। আশ্চর্য লাগে কি এদের মধ্যে অনেকে জীবনে ঢাকা শহরেই আসেনি কোনোদিন-এখন লিবিয়া যাচ্ছে। ত্রিপলী বিমানবন্দরে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার এটাশি জনাব ফজলুর রহমান আমাদের রিসিভ করে সমস্ত কাগজপত্র (immigration ইত্যাদি) সম্পন্ন করালেন। এতগুলো মানুষের ইমিগ্রেশন অনেক সময় নিল বটে তবে ফজলুর সাহেবের তৎপরতায় খুবই সহজ ও সুন্দরভাবে কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছিল।

আমার মনে হয় স্থানীয় সময় রাত দশটা-এগারোটার দিকে আমরা ছাউনীওয়ালা ট্রাকে উঠলাম। দুতিনটে গাড়ি ছিল বোধহয়। কিন্তু কাবু হলাম শীতে। ওরে বাপরে ঠান্ডা-ঢাকায় ৩০ ডিগ্রির মত ছিল আর ওখানে তখন বড় জোর দশ ডিগ্রি হবে। পূর্ব নির্দেশ অনুযায়ী শীতের প্রয়োজনীয় কাপড় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে রক্ষে।

ঘণ্টা দেড় দুয়েকের মধ্যে পৌঁছালাম গন্তব্যে মশরুয়া বীর আত তারফাজ। প্রকল্প বীর আত তারজাফ। কৃষির সেচ প্রকল্প, সেখানেই আমাদের কাজ। আমরা সাত প্রকৌশলী, চার সার্ভেয়ার আর শ’খানেক শ্রমিক এখানে নামলাম, বাকীরা চলে গেল অন্য প্রকল্পে।

রাত তখন গভীর, প্রচণ্ড ঠান্ডা, পেটে ভয়ংকর ক্ষিধে। ওরা সব আরবিতে কথা বলছে, বুঝি না কিছু। ফজলুর রহমান চলে গেছেন বিমানবন্দর থেকেই। তবে ভরসা পেলাম ওদের অফিস কেরানি ইব্রাহীমকে দেখে। সুদানী যুবক। চোস্ত ইংরেজি বলে। সে সব দেখাশোনা করছে। মোটামুটি আমাদের রাতে থাকার ব্যবস্থা নিয়ে ওরা দৌড়াদৌড়ি লাগিয়েছে। খাওয়ার কথা কেউ বলে না।

না, খাওয়া তৈরিই ছিল, প্রকল্প রেস্টুরেন্টে। ইব্রাহীম নিয়ে গেল আমাদের। শ্রমিকদের আলাদা শেডে খাবার ব্যবস্থা, প্রকৌশলীদের আলাদা। কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে বসলাম খাবার টেবিলে। একটা করে ফ্রেঞ্চ রুটি আমাদের সামনে এল। একটা প্লেটে বিশাল একটুকরা মাংস আর ঝোল-ছোলাসিদ্ধসহ।

তাই গলাধঃকরণের চেষ্টা হলো। রুটি শুকিয়ে কাঠ। মাংস ছিল উঁটের। বিরাট বিরাট রোঁয়া ওয়ালা। ছিঁড়তে সময় লাগে। খিদে বলে কথা। যা পেলাম, কিছু মুখে দিয়ে উঠে পড়লাম। ব্যাটারা প্রচুর ঝাল খায় সেটা বুঝতে দেরি হলো না আদৌ।

ছোট ছোট কটেজ রয়েছে প্রকৗশলীদের জন্যে। ব্যাচেলরস এবং ফ্যামিলির জন্য ভিন্ন রকমের। একটি ফ্যামিলি কোয়ার্টারে আমরা ক’জন যায়গা পেলাম। রাত ভালই কাটলো। নতুন সব বিছানা, নতুন কম্বল-আনকোরা ইটালীর মাল। খাট পালংও তাই। ঘুম খারাপ হয়নি, এখনও মনে পড়ে।

পরদিন শুরু হলো অফিস। যদিও প্লেনে ওঠামাত্র আমার চাকরি সময় শুরু হয়ে গিয়েছিল। প্রথমদিনেই একটা শিক্ষা হলো সক্কালবেলা। গোসল টোসল সেরে সেজেগুঁজে রেস্টুরেন্টের দিকে বেরুলাম প্রাতরাশের উদ্দেশ্যে। রেস্টুরেন্টের বাইরে কয়েকজন লিব্বি (লিবিয়বাসী) বসে রোদ পোয়াচ্ছে আর গল্পগুজবে মেতে আছে। কাছে গিয়ে সালাম দিলাম,

আসসালামালেকুম।

ওরা উত্তর না দিয়ে কী যেন বলা বলি করলো। ঘটনাক্রমে ইব্রাহীম হাজির হওয়ায় সমস্যা বোঝা গেল! শুনে তো আশ্চর্য হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

সকালে (বেলা ১২টা পর্যন্ত) ও দেশে সালাম দেয়ার রেওয়াজ নেই। বলতে হবে— সুবা খায়ের (সুপ্রভাত)।

এরপর সারা দিন সালাম দেন অসুবিধা নেই। ইচ্ছা হলে মাসা আল খায়ের (শুভ বিকাল), আশা আল খায়ের (শুভরাত্রি) এগুলো বলতে পারেন, তবে সকালেরটা ম্যান্ডেটরি, মনে মনে শুধু বললাম-হায়রে বাঙালি!

ক’দিন পর এটাও শিখলাম, ওরা আল্লাহ হাফিজ বা খোদা হাফিজ কখনো বলে না। ওদের বিদায় সম্ভাষণ হচ্ছে মাআ সালামা।

অর্থাৎ আল্লা তোমাকে শান্তিতে রাখুন।

শেখা মাত্র শুরু, আরও কত কিছু শিক্ষা লাভ হলো তিন বছরে!

রেস্টুরেন্টে খাওয়াটা মনমত হলো, কারণ ওখানে ফ্রেস গরম ফ্রেঞ্চ ব্রেড পাওয়া গেল, সঙ্গে মাখন, জেলি— আবার দুম্বার মাংসের ঝোল-খারাপ বলা যায় না।

সেদিনই আমাদের পোস্টিং হয়ে গেল। কপালটা বোধহয় আমার ভাল। এই বীর আত আরফাজেই আমি বহাল, অন্যরা সব আবু শেবা, কেউবা বীর আল গনম ইত্যকার সব প্রকল্পে। যে শ’খানেক শ্রমিক এসেছিল আমার সাথে তারাও এখানে বহাল হলো। আক্দ হয়ে গেল আমার! হ্যাঁ আক্দ, মানে Contract সই হলো। আক্দ আল আমল অর্থাৎ Work contract এক বছরের চুক্তি, বছর বছর বাড়ানোর প্রভিশন রইল। অন্যরা একটু মন খারাপ করলো হয়তো, কারণ তাদের প্রকল্প তখনো শুরু হয়নি, এই অফিসেরই একটি কক্ষে বসে প্রাথমিক কাজগুলো তাদের করতে হবে।

আমি বসার চেয়ার টেবিল পেলাম। হাতে কাজও দেয়া হলো, নতুন কাজ। এখানে যে পাঁচটা over ground ১ মিলিয়ন গ্যালন পানির ট্যাংক হবে তার নির্মাণের ব্যবস্থা করাই আমার কাজ। একজন বসও দিল আমাকে, জর্জ, পোলিশ ভদ্রলোক। তার সাথে কাজ করতে হবে আমাকে।

কাজ শুরু করতে না করতেই, অসুস্থ হয়ে পড়লাম। মানসিকভাবে তো খুবই দুর্বল ছিলাম, তার ওপর ঠান্ডা লেগে জ্বর, কাশি, বুকে কফ, খুব করুণ অবস্থা আমার।

কোথায় ডাক্তার, কোথায় হাসপাতাল কিছুই চিনি নাই তখনও। আমাদের বাঙালি শ্রমিক ভাইরা অনেক করিৎকর্মা। তারা নিকটস্থ শহর (১৫ কি.মি দূরত্বে, ভূমধ্যসাগরের পারে যাতায়াত শুরু করে দিয়েছিল ইতিমধ্যে। তাদের কারণে চাউর হয়ে গেয়েছিল আমার আগমন বার্তা। সেই বার্তা ধরে বাসায় এলেন বাঙালি ডাক্তার গফুর সাহেব। চিকিৎসা করলেন আমার। ওষুধের ব্যবস্থাও হলো, কিন্তু আমার মনটা মোটেই ভাল হলো না। আমি অস্থির হয়ে গেলাম বাড়ির জন্যে।

গফুর সাহেবকে বললাম, ভাই আমি থাকবো না, দেশে ফিরে যেতে চাই, কী করতে হবে বলেন তো।

গফুর সাহেব হেসে বললেন-

হায়াত ভাই, এ দেশে আসাটা কঠিন, আর এখান থেকে যাওয়াটা আরো কঠিন।

তারপর ওখানকার সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও অবস্থার নানান বর্ণনা শুনে আমার অবস্থা আরো কাহিল। দুদিন পর কাজে আবার যোগ দিলাম-কারণ দুদিন পর্যন্ত বিমা কোম্পানি আমার অসুস্থতার জন্য খরচ যোগাবে, তারপর নিজেরটা নিজের, বেতনও কর্তন হবে।

মাস খানেকের মধ্যে সবার সাথে, সবকিছুর সঙ্গে, পরিচিত হয়ে পড়লাম। গাদ্দাফি সাহেবের সবুজ লিবিয়া প্রজেক্টের কয়েকটার মধ্যে এটা একটি। ভূমধ্যসাগরের পাড় থেকে ১০০ কি. মি. প্রথমে সবুজ করা হবে, আমাদের প্রকল্প তার অন্যতম। মূলত সেচ ব্যবস্থা এবং দ্বিতীয়ত বৃক্ষরোপণ ও চাষবাস উপযোগী করা। সেচ বলতে নলকূপ দ্বারা পানি সেচ। দু’রকমের নলকূপ, গভীর এবং অগভীর। গভীর মানে ৫০০ মিটারের বেশি গভীর— যার পানি মিষ্টি মানে স্বাভাবিক, অগভীর বলতে ১০০ মিটারের মধ্যেই-যা দিয়ে ফলের বাগানে নোনতা পানি সরবরাহ। নলকূপ বসানো (যা ইতিমধ্যে সমাপ্ত), তার পাম্প হাউজ, ছোট ছোট জলধার নির্মাণ এবং তাদের ১ মিলিয়ন গ্যালন পানির ট্রাঙ্ক তৈরি, আর নানান রকম সব ফিটিংস বসানো— ইত্যাদি সব কাজ আমাদের। আমি নির্মাণ প্রকৌশলী পদে নিয়োজিত হলাম।

পরিচিত হলাম মশরুয়ার (প্রকল্পের) মুদির (পরিচালক), নায়েব মুদির (ডেপুটি পরিচালক) আলী জেরেরী, হিসাব রক্ষক আলী হোসেন, Store keeper খালিফা মাউই, রাইস আল হারাকা (Transport প্রধান) এবং এ ধরনের বিভিন্ন মানুষের সাথে।

খাওয়া নিয়ে সমস্যা দেখা গেল। সাতদিনে একবেলা ভাত দিত, আর অন্যবেলা রুটি, ভেড়া (অথবা গরু)র মাংস। অরুচিকর অবস্থা। একদিন ত্রিপলী গিয়ে মুরগী খেয়ে এলাম সবাই মিলে। এক একটা রোস্ট প্রায় ২ কেজি। প্রত্যেককে ১টি করে খাওয়ালো মজিদ মিঞা, -যে আমাদের Certificate আরবি করতে নিয়ে গিয়েছিল।

এর মধ্যে বুঝে গেছি আমি যাবো বললেই যাওয়া হবে না। সুতরাং পরিবার নিয়ে আসতে হবে। দরখাস্ত করলাম মুদিরের কাছে। অনুমতি পেলাম সঙ্গে সঙ্গে। যদিও আমাদের প্রকল্পে অন্য কোনো প্রকৌশলীর পরিবার থাকে না-ব্যতিক্রম সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মিস্টার ফ্রান্সকোভিয়াক। তাঁর স্ত্রী এলিজা প্রকল্পে ড্রাফটিং এর চাকরি করেন বিধায় সাথে এনেছেন। অন্যেরা কেউ পরিবার আনেন নি। আসলে জেনেছিলাম ইউরোপের গরীব দেশ পোল্যান্ড। ডলার ওখানে খুবই মঙ্গা! হাহাকার বলতে গেলে। ওরা বৌবাচ্চা নিয়ে এসে শুধু শুধু ডলার খরচ করার চেয়ে ডলারটা দেশে নিয়ে গিয়ে উচ্চ মূল্যে ব্যবসা করা পছন্দ করে।

অনুমতির খবরটা দেয়া তো সহজ ছিল না। ওখানের যে সিস্টেম তাতে বাংলাদেশে একটা খবর পাঠানো নূন্যতম ১৫ দিন, অর্থাৎ চিঠি লিখে খবর দিতে হবে। ফোন তো প্রকল্পে ছিল না। ছিল একটা কৃষি বিভাগের সরকারি প্রকৌশল দপ্তরে— আমাদের কাছে, কিন্তু সে ফোন ব্যবহার আমাদের জন্যে ছিল না। অন্য উপায় ছিল ৭৫ কি. মি. ঠেঙ্গিয়ে ত্রিপলীতে আমাদের প্রধান দপ্তরে যাওয়া-তবে সেখান থেকে বাংলাদেশে ফোন করা সম্ভব হয়নি আমাদের কখনো। দেশের দূতাবাসের কথা নাই বলি— কেউ কোনো দিন ওখান থেকে কোনো সেবা ঝামেলামুক্তভাবে পেয়েছে শুনিনি।

দিলাম চিঠি। লিখে দিলাম-তোমাদের আসবার অনুমতি পেয়েছি— শিগগীর অনুমতিপত্র পাঠাবো, তোমরা প্রস্তুতি নাও। চিঠি লিখে অপেক্ষায় আছি, ভাবছি মাসখানেকের আগে তো আর উত্তর পাবো না।

হঠাৎ দেখি আমার নামে এক টেলিগ্রাম। অবাক হবারই কথা— কে দিতে পারে টেলিগ্রাম, আরে এযে বিশাল সারপ্রাইজ, শিরীর টেলিগ্রাম— আমরা এত তারিখে এতটার সময় বিমানের ফ্লাইটে আসছি। এয়ারপোর্টে রিসিভ করো। ‘শিরী’।

নতুন বছর ১৯৭৯ কেবল শুরু হয়েছে— আমার এক মাস পূর্তি কেবল লিবিয়ায়। ধন্দে পড়ে গেলাম। বিষয়টা কি, আমি তো সম্মতিপত্র বা ভিসা কিছুই পাঠাইনি— তাহলে কীভাবে আসবে। বাসাও তো নেয়া হয়নি, মানে চাওয়াই হয়নি।

বিকেলে আর এক চমক। আর একটা টেলিগ্রাম। লন্ডন থেকে। একই ভাষায়। লন্ডন থেকে কেন আসবে? সেটা পড়ে বুঝলাম যে ঢাকারটা যদি না পাই— সেই আশঙ্কায় বিমানের এক স্টুয়ার্ডকে দিয়েছিল London থেকে টেলিগ্রামটা করতে।

দৌড়লাম মুদিরের কাছে। ও হ্যাঁ, এর মধ্যে আমার মুদির পরিবর্তন হয়ে গেছে। নায়ের মুদির আলী জেরেবি মুদির হয়েছে। তরুণ প্রকৌশলী বয়স ২৫/২৬ হবে। সেই পরিচালক আমাদের প্রকল্পের, মন্দ কি! টেলিগ্রামসহ দরখাস্ত পেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই খসখস করে আরবিতে নোট লিখে ষ্টোরকিপার খলিফার কাছে পাঠিয়ে দিল। আমাকে আশ্বস্ত করলো সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। Don’t worry.

সন্ধের মধ্যে বাসা রেডি হয়ে গেল। যেটাতে আমি ছিলাম সেটাই আমার নামে বরাদ্দ হলো। চলে এল খাট, বিছানা, চাদর বালিশ কম্বল। টেবিল চেয়ার, সোফা। কিচেন তো ছিলই, চুলোও রেডিই। খলিফা বলে গেল সকাল ৯টায় সে গাড়ি নিয়ে আসবে আমাকে নিতে। ওই দিন আমার ছুটি, on duty হবে।

পরিবার হাজির পরদিন যথাসময়ে ত্রিপলী বিমান বন্দরে। মহানন্দে বিপাশা (৭ বছর তখন) এসে জড়িয়ে ধরলো। আমি সেই আনন্দ নিয়েই নাতাশাকে (১৪ মাস বয়স তখন) কোলে নিতে গেলাম আর সঙ্গে সঙ্গে সে বিকট চিৎকার করে ছুটে গিয়ে মায়ের কোলে চড়ে বসলো। ঢাকা থেকে যাওয়ার আগে আমি বাসায় থাকলে আমার কোল ছাড়া আর কোথাও তার স্থান হতো না, আর সেই মেয়ে এক মাসে আমাকে ভুলে গেল! কী আশ্চর্য। ত্রিপলী থেকে প্রকল্প প্রজেক্টে আসতে ঘণ্টা খানেকের পথ। এর মধ্যেই কিন্তু সে আমাকে চিনে ফেলেছে— প্রথমে হাত বাড়ায় আর সরিয়ে নেয়। আবার আঙ্গুল দিয়ে খোচা দেয়, আমি তাকালেই হেসে মায়ের কোলে মুখ লুকায়। অবশেষে দয়া হলো। একেবারে লাফ দিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। কী অসাধারণ সে মুহূর্ত। ওরা আসাতে আমার লিবিয়ার দুনিয়াটা সহজ ও সুন্দর হয়ে উঠলো। মনে হলো, নাহ! এরা সাথে থাকলে বোধহয় দেশ ছেড়ে কিছু দিন হলেও থাকা যাবে।

কয়দিনেই ঘরবাড়ি গোছানো হয়ে গেল, বাড়ির সামনেটা সব এবড়ো থেবড়ো পড়েছিল। বাঙালী শ্রমিক ভাইরা সাহায্য করে সমান করে দিল, আমার কার্পেন্টার ছিল মরক্কোর-যাকে সবাই বলে মাগরেবি-অর্থাৎ পশ্চিম দেশের মানুষ— সে প্যাকিং বাক্সের কাঠ কেটে সুন্দর করে বেঞ্চ বানিয়ে দিল-আমরা পুরো পরিবার লেগে গেলাম বাগান বানাতে। কোম্পানি থেকে ফ্রিজ, টেলিভিশন, এসি দিয়ে দিল। ত্রিপলী এবং দূরদুরান্তের মানুষেরা আবুল হায়াতের খোঁজ পেয়ে প্রায় প্রতি শুক্রবার (ছুটির দিন) আসতে লাগলো দল বেঁধে। এক শুক্রবার মনে পড়ে— শ’খানেক মানুষ এসে হাজির-(অনেকেরই সঙ্গে কিছু কিছু খাবার দাবার) সবাই মিলে নিকটস্থ জঙ্গলে গিয়ে পিকনিক হলো। পরে এগুলো প্রায় নৈমিত্তিক হয়ে পড়েছিল।

মিজদা শহর আমার প্রকল্প থেকে ২০০ কি. মি. দূরত্বে, সেখানে ভাগ্নী জামাই বালাদিয়ার (municipality) স্থপতি। আমার আগেই লিবিয়া এসেছে। সে এসে হাজির একদিন। গ্যারিয়ান পর্বতের ওপর এক শহর (১০০ কি. মি. দূরত্বে) সেখানে বন্ধু প্রকৌশলী ইউনুস (বটু) সেও খবর পেয়ে চলে এল, সাথে আব্দুস সেলিম, অধ্যাপক-নাট্যকার সেলিম ও এসেছে শিক্ষক হিসেবে। একে একে জানা মানুষরা তো এল, অজানা কতমানুষ যে এল তার ইয়ত্বা নেই। খায়রুল আলম সবুজ এসে হাজির। হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার।

আপনি এসেছেন, এবার নাটক করবো।

নিশ্চয়, একটা script নিয়ে আয় দেশ থেকে।

কিছুদিন পর সে ব্যবস্থাও হলো।

এভাবেই দিন কাটছিল। সকাল ৮ থেকে অফিস (শীতকালে) বেলা আড়াইটা পর্যন্ত। আটটায় সূর্য ওঠে না, আবার ওদিকে ৪টার পরই অন্ধকার হতে শুরু হয়। সামার টাইমটা ছিল চমৎকার সকাল সাতটা থেকে বারোটা। চার ঘণ্টার টিফিন পিরিয়ড আবার চারটা থেকে সাতটা। দুপুর টাইমটা আমরা গাড়ি নিয়ে চলে যেতাম ভূমধ্যসাগরের পাড়ে (১২-১৫ কি. মি)। ওখানেই বেশিরভাগ দিন গোসল সেরে খাওয়া দাওয়া হতো। বাচ্চা দুটো কিন্তু বেশ আনন্দ পেতো এরকম ব্যাপারে।

মাস ছয়েকের মধ্যে আমার Boss, পোলিশ প্রকৌশলী জর্জ চলে গেল চাকরি ছেড়ে। দায়িত্ব পড়লো আমার ওপর, প্রধান নির্মাণ প্রকৌশলী হয়ে গেলাম প্রকল্পের। দায়িত্ব বেড়ে গেল। যে সব কাজ দেশে কোনোদিন করতে হয়নি সেসব কাজ করছি— সেটা ছিল একটা আনন্দের ব্যাপার। এখানে ছিলাম স্যানিটারি ইঞ্জিনিয়ার ওখানে কাজ করেছি construction ইঞ্জিয়ার হিসেবে। ভাগ্যবান মনে করি নিজেকে। একটা বিশাল বড় প্রকল্পের প্রকৌশলী। আমার দায়িত্ব এল ক্যাটারপিলার excavator, crane, concrete carrying trucks, concreting machine ইত্যাকার সব যন্ত্রপাতির। Barbending workshop, carpentry shop এগুলোতো আগেই ছিল আমার নিয়ন্ত্রনে। বেশ একটা ভাল অবস্থায় চলে এলাম। রুম পেয়ে গেলাম পৃথক, বসার জন্যে।

সেখানে আবার মজার ব্যাপার হতো, হঠাৎ হঠাৎ রুমে চলে আসতো লিবিয়ান কর্মচারিরা। কি হে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব কি করো বসে বসে?

তাদের ধারণা সারাক্ষণ সাইটেই থাকতে হবে। বসে পড়তো টেবিলের ওপর পা ঝুলিয়ে। ঝুঁকে দেখতো কি করছি।

দেশে চিঠি লিখছি কিনা! ড্রাইভার রামাদান ছিল বেশি উৎসুক এসব ব্যাপারে।

একদিন ওয়াটার ট্যাঙ্কের Rod পরীক্ষা করছি ঠিকমত লাগাচ্ছে কিনা, দেখি বাবুর্চি গাদবান আমার পাশে দাঁড়িয়ে।

কি হে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এত রড লাগাচ্ছো কেন? অনেক বেশি মনে হচ্ছে।

এর উত্তর কী হতে পারে!

উত্তর না দিয়ে এক টুকরো হাসি দিয়ে আপ্যায়ন করি। কারণ এই ব্যাটার উপরে নির্ভর করে আমার বাসায় খাবার সাপ্লাইয়ের।

এই খাবার নিয়েও একটু মজার ব্যাপার হয়েছিল প্রথমেই। আলী জেরেবি মানে নতুন মুদির লিখে দিয়েছিল আমার পুরো পরিবার খাবে Restaurant-এ। প্রথমদিকে শিরী আর বাচ্চারা যেতে চাইতো না ওখানে, আমি খেয়ে ওদের জন্যে প্রয়োজনীয় খাবার নিয়ে আসতাম। গাদবান সাহেব হেড অফিসে অভিযোগ করলো আমার ফ্যামিলি খাবার নিয়ে যায়। পরের মাসে দেখি হেড অফিস থেকে আমার বেতন থেকে ৫০ দিনার। খাওয়া খরচ কাটা হলো। আমাকে তিন দিনার ফি এমনিতে দিতে হতো খাওয়া বাবদ।

বেতনের টাকা কম দেখে আলীকে বললাম-তুমি বললে ওরা খাবে, এখন দেখ ওরা বিল কেটেছে। ওকে, আই উইল সী টু ইট।

ত্রিপলী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোকৌশলী সে। ভাংগা ভাংগা ইংরেজি বলতো আমাদের সাথে।

পরের মাসে বেতনে দেখি আমার বেতন ১০০ দিনার বেশি। ব্যাপারটা কী।

আলীর কাছে গিয়ে বললাম ব্যাপারটা। সে বেশ বড় একটা হাসি দিল।

They know how to take, I know how to give.

পরের ব্যাখ্যা-সে আমার কাজে খুশি হয়ে ১০০ দিনার ইনসেনটিভ দিয়েছে। আসলে মুদিরের অসীম ক্ষমতা ওখানে। এইবার সে আমাকে হেড অফিসের একটা চিঠি বের করে দিল। আরবি চিঠি। সেই বুঝিয়ে বলল।

তোমার পরিবার যতদিন থাকবে তারা কোম্পানির গেস্ট হিসেবে থাকবে। তাদের থাকা খাওয়া ফ্রি। এবং খাবারের রেশন তোমার ঘরে প্রতি সপ্তাহে পৌঁছে দেয়া হবে।

দারুণ ব্যাপার। এরপর গাদবান আবার বন্ধুসূলভ ব্যবহার শুরু করে। আমার ফ্রিজ ভর্তি হয়ে যায় প্রতি সপ্তাহে। চাল, ডাল, দুধ, মাখন, ম্যাকরনী, চিনি, ঘি আর মাংস (গরুর তো ছিলই, চিজ পনির কি নয়।

মহা আরামে ছিলাম। কিন্তু ওই যে নাটক!

মনটা পড়ে রয়েছে ঢাকায় TV Studio আর মহিলা সমিতিতে। কীভাবে থাকি! তিন বছর পর বাড়ির ছেলে বাড়ি ফিরলাম।

সে আরো অনেক পরে। আগের গল্প শেষ করে নি।

আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম General Company for Agricultural Projects এটা ওই গাদ্দাফির সবুজ প্রকল্পের অংশ। কোম্পানি কিন্তু সরকারি নিয়ন্ত্রণে। বেতন সরকারিদের চেয়ে বেশি। উপরন্তু থাকা খাওয়া ফ্রি। যে কারণে রেমিট্যান্স ছিল ৯০ শতাংশ। অন্যদের সেটা ৬০%। হাজার হাজার হেক্টর জমি নিয়ে প্রকল্প এলাকা। বিশেষ করে আঙ্গুর, এবং ডুমুর (তীন) চাষ হবে। কমলা ও হতে পারে। আর প্রকল্পে বসবাসকারীদের বাড়ির আশপাশে হবে সবজি চাষ। সেই জন্য দু’রকমের পানির সেচ।

নিকটতম শহর আল-জাওবিয়া। পনেরো কিলোমিটার উত্তরে ভূমধ্যসাগরের তীরে। ওখানকার পাবলিক ওয়ার্কস বিভাগের প্রকৌশলী কাশেম-এর সাথেও আলাপ হলো। আসা যাওয়াও চলতে লাগলো। কেনা কাটা যা হয় সব ওখানেই। Superstore আছে। হঠাৎ করে করে নতুন জিনিস আসে আর মানুষের ভীড় জমে কিনতে। ওরা লট-এ কিনতে পছন্দ করে। একবারে পারলে বছরেরটা কিনে ফেলে।

ত্রিপলী গেলাম এক সময়। একদম ঝকঝকে তকতকে শহর, প্রায় ইউরোপিয় শহরের মত। ওখানে দেখলাম ময়দানে আখদার (সবুজ মাঠ)। যেখানে থেকে বক্তৃতা দিয়ে থাকেন লিবিয়ার অবিসংবাদিত নেতা মোয়াম্মের আল গাদ্দাফি, কিং ইদ্রিসকে হটিয়ে যে তরুণ কর্নেল একদিন সেই ১৯৬৮ সনের পহেলা সেপ্টেম্বর ক্ষমতা দখল করেছিলেন। দেশ চলে রাশিয়ান স্টাইলে। আমেরিকা এক নম্বর শত্রু। প্রায় প্রতিদিন রিগ্যানের অভিনীত সিনেমা দেখানো হয় টিভিতে (Villain চরিত্রে) এটা বোঝানোর জন্যে যে কত খারাপ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। মানুষের মুখ বন্ধ। একটা সমালোচনা করবে তো— লেজনা তৌরিয়া (বিপ্লবি পরিষদ) সদস্য এসে উঠিয়ে নিয়ে চলে যাবে-আর তারপর নিখোঁজ। আমাদের আগেই সাবধান করে বলে দেয়া হয়েছিল—

You have come here to work, please work, eat and sleep-nothing more than that. আমরাও তাই মেনে চলেছি। তারপরও ও বাঙালিদের বুদ্ধি তো কম নয়। তারা গাদ্দাফির নাম দিল রঙিলা। পাকিস্তানি সিনেমার এক কমেডিয়ান ছিল রঙিলা-গাদ্দাফির সাথে তার চেহারা অনেক মিল। বাঙালীরা গাদ্দাফিকে নিয়ে আলোচনা করতো, তবে নাম উচ্চারণ করতো রঙিলা।

মুদির যখন জানলো আমি গাড়ি চালাতে জানি, সে আমার ড্রাইভার সরিয়ে নিল।

You drive yourself.

লাইসেন্স করিয়ে দিল জাওবিয়াতে পাঠিয়ে। ওরা বাংলাদেশি লাইসেন্স দেখে, (অবশ্য আরবি করা হয়েছিল) শুধু চোখ পরীক্ষা করে লাইসেন্স দিয়ে দিল। ওটাই আমার বাতাকা (id card) হয়ে গেল। প্রজেক্টের সব কাজে ছোটাছুটি চলতো সারাক্ষণ। এক সেক্টর থেকে আর এক সেক্টর। প্রথম বছরটায় অবশ্য তেমন তোড়জোড় ছিল না site.-এ তখন নিজের অফিস আর workshoop গুলোয় চলতো কাজ। ত্রিপলী Univercity দৌড়েছি কয়েকবার বালু, সিমেন্ট, পাথর আর পানি পরীক্ষা করে concrete mix design করানোর জন্য। যতবার এগুলো বদলাবে ততবারই নতুন design করাতে হবে। এসব তো এদেশে দেখিনি কোনোদিন, শুনিওনি তখন।

এর মধ্যে আমার আর এক বন্ধু জুটে গেল। আর এক বলতে প্রথম বন্ধু আলী জেরেবি মুদির— এরপর হলো মাবরুক। সে রাজমিস্ত্রি। সে ছিল আমার ভীষণ ভক্ত। কেন জানি না, আমাকে খুবই পছন্দ করতো। সে আমার অনুপস্থিতিতে সাইটে খবরদারি করতো বাঙালী শ্রমিকদের ওপর। শ্রমিক বেশিরভাগ বাঙালি যারা আমার সাথে এসেছে, আর ছিল তিউনিশিয়ান। মিশরীও ছিল কিছু। টেকনিশিয়ান বেশিরভাগই তুর্কী, মাগরেবী, সুদানী লেবার আর টেকনিশিয়ান উভয় ছিল। বেশ একটা কসমোপলিটান ব্যাপার। ইঞ্জিনিয়ার একা আমি বাঙালি, বাকি সব পোলিশ। ফ্রান্সকোভিয়াকের স্ত্রী নাতাশার জন্য প্রথম দিনেই একটি গোসলের গামলা আর মগ দিয়ে গিয়েছিল। বাচ্চাদের সাথে খুব ভাব ছিল ওদের। প্রথম বছরে গাড়ি কিনিনি। যাতায়াতে খুব অসুবিধা ছিল না। বাস সার্ভিস খুবই ভাল ছিল জাওবিয়া যাওয়ার। ওখান থেকে ত্রিপলী যাওয়া আসা। কিন্তু বাজরে গেলে হাঁটাহাঁটি করা, ব্যাগ হাতে নিয়ে সে মহা কষ্টের ছিল। দেশে পদে পদে গাড়ি ব্যবহার আর এই রিকসা যাবে— এ দুটো খুব মিস করতাম।

তবে গাড়ি কেনা সমস্যা ছিল না, সমস্যা ছিল আমার মনে। ধরেই নিয়েছিলাম কোনো রকমে এক বছর থেকে পালাবো। কিন্তু দেখলাম-হিসাব নিকাশ করে যে এখন দেশে ফিরলে পথে বসতে হবে। কিছু নেই দেশে— জিনিসপত্র সব বিলিবাট্টা করে এসেছি। সব নতুন করে খাড়া করতে এক বছরের কামাই শেষ হবে।

সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, আরও এক বছর থাকতেই হবে। সুতরাং গাড়ি প্রয়োজন, কিনে ফেললাম টয়োটা করোলা। এক পাকিস্তানির কাছ থেকে ৬০০ দিনারে। ভাল অবস্থা, গাড়ি চালিয়ে আরাম পেলাম। সব চেয়ে আনন্দ আমার পরিবারের নিজেদের গাড়ির যত্ন নিচ্ছে সবাই মিলে। বাসা থেকে হোসপাইপে, গাড়ি ধুয়ে দল বেঁধে মোছামুছি।

গাড়ি কেনায় জীবন সহজ হয়ে গেল। দূর দূরান্তে বেড়ানোর আনন্দ উপভোগ করাটা হাতের মুঠোয় এল। বৃহস্পতিবার সন্ধেয় চলে যেতাম দূরে কোথাও। শুক্রবার কাটিয়ে শনিবার ভোরে এসে অফিস করতাম।

ওহ, একটা কথা বলা হয়নি। আমার পরিবার ভিসা জোগাড় করলো কীভাবে? আমি আমার চাকরির নিয়োগপত্রের এক কপি বাসায় দিয়ে গিয়েছিলাম, সেটা পুঁজি করে আমার ভাগ্নে দীপু জামান (ট্রাভেল এজেন্সি আছে তার) ভিসার দরখাস্ত করেছিল। সঙ্গে সঙ্গে কেল্লাফতে। এত সহজে কেউ কিন্তু ভিসা পায় না!

ভাষা নিয়ে আমাদের যাতে সমস্যা না হয় সে জন্য এখান থেকে আরবি ভাষার বই কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। দুঃখের বিষয় ওগুলো কোনো কাজেই লাগেনি-কারণ ওরা তাদের আঞ্চলিক আরবি বলে যা বইতে নাই। সুতরাং ঠেকে শেখাটাই ছিল প্রধান কাজ। নতুন শব্দ পেলেই Note book-এ লিখে রাখতাম এভাবে ভোকাবুলারী বাড়ানো হলো— তারপর বলার Style শিখতাম। মোটামুটি ভালই চালাতে পারতাম আরবিয়দের সাথে। লিবিয়ার আবহাওয়াটা বড়ই সুন্দর। অনেকটা ইউরোপের ইটালীর মত। সারা বছরই খুব সহনশীল শীত মরশুম চলে— মাঝে জুন-জুলাইয়ে কিছুদিন গরম। সপ্তাহমত মরুভূমির ঝড় আসে লিবিয়ার আকাশে। তখন বাড়ি থেকে বের হওয়া যায় না। আবার সেই সুন্দর আবহাওয়া। আবার এদিকে ডিসেম্বরে প্রচণ্ড শীত আর আষাঢ়ের বর্ষণ-সেও দিন দশেক। তারপর আবার স্বাভাবিক শীত। ফেব্রুয়ারি থেকে বসন্তের হাওয়া। চমৎকার সবকিছু মিলিয়ে। তারপরও মন বসলো না!

এর মধ্যে দেশ থেকে নাটকের বই আনিয়েছে সবুজ। বিদগ্ধ রমনীকুল মহড়াও শুরু হয়ে গেল। প্রথমে নায়ক নায়িকা যোগাড় করা কঠিন হলেও স্বামী স্ত্রীকে নায়ক নায়িকা বানানোতে সহজ হয়ে গেল কাজ। আমাদের গ্রুপ থিয়েটার স্টাইলে মহড়া দেয়া শুরু করলাম। ঝাড়া মুখস্ত সবার। প্রায় মাস ছয়েক রিহার্সাল হলো। সময় কাটাবার ভাল একটা পথ পাওয়া গেল। এবাড়ি ওবাড়ি মহড়া, রোজকার রাতের খাবার বিভিন্ন বাড়ির। ত্রিপলীতেই বেশিরভাগ মহড়া হতো। একবার আমি অসুস্থ হয়েছি শুনে পুরো নাটকের দল চলে এলো ৭৫ কি. মি. পাড়ি দিয়ে আমার ক্যাম্পে। সারাদিন হই হুল্লোড় আর মহড়া চললো।

মঞ্চস্থ হলো লিবিয়ার মাটিতে প্রথম বাংলা নাটকের শো। আমার পরিচালনায়, অভিনয়ে আমি ছাড়া প্রকৌশলী নুরুল আমিন তার স্ত্রী নিলুফার, খায়রুল আলম সবুজ, নুরুল করিম নাসিম, মিসেস জাহাঙ্গীর, ক্যাপ্টেন ওয়ালি প্রমুখ।

মঞ্চস্থ হলো ত্রিপলীর Scout auditorium এ বা মাসরা কাশশাফ-এ। এক বারই হয়েছিল। বাঙালিরা তো প্রশংসা করেছিল— আমার মুদির আলী জেরেবি নাটক দেখে অবাক! আমাকে বলে-

That old man was really you!

সময় বয়ে চলে। আমাদের সাথে অন্যান্য প্রকৌশলীদেরও প্রায় সবার পরিবার চলে এলো, তারা তাদের প্রকল্পে চলেও গেল এক সময়।

এর মধ্যে আমাদের সব চেয়ে বড় সমস্যা দেখা গেল বাচ্চার পড়াশোনা। বিপাশার স্কুলের বই নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন বোধকরি থ্রি কি ফোরে পড়ে। ওভাবে কি পড়া হয়? তাও পড়ানো হতো যতটা পারা যায়। স্কুল প্রয়োজন, কিন্তু সেটা ত্রিপলীতে। American school অনেক দূর। যাওয়া আসা কীভাবে হবে? অনেকে আবার বাচ্চাদের Malta তে পাঠিয়ে দিয়েছে দেখলাম, পড়াশোনার জন্যে। আমরা থাকবো কিনা সেটারই ঠিক নেই, সুতরাং ও চিন্তা বাদ দিয়ে ভাবলাম এখানে স্কুল করা যায় কিনা।

আমাদের চিন্তার আগেই যাওবিয়া এবং আশেপাশের কিছু পরিবার স্কুল স্থাপনের চিন্তা করে ফেলেছে দেখলাম। তারা সভা আহ্বান করলো এ ব্যাপারে। গেলাম সভায়। নানা জনের নানামত। যা হয় বাঙালিদের। বুঝলাম সহজে এ স্কুল করা যাবে না। আমি তিন বছর ছিলাম, স্কুল হয়নি— শুনেছি সে স্কুলে কম্মিনকালেও আর হয়নি।

তিন বছর পর দেশে ফিরে মেয়েদের এখানে পড়াশুনার বেশ অসুবিধাই হলো। বিশেষ করে বিপাশার। তারপরও যাই হোক ভিকারুননিসায় সুযোগ পেল— কিন্তু এক বছর ক্ষতি করে! আগে পড়েছিল Univercity Labroatory-তে। নাতাশা ভর্তি হলো মালিবাগের মনিমুকুরে।

ফিরে যাই লিবিয়ায়

প্রকল্পের কাজের গতি ইতিমধ্যে বেড়ে গেছে। পাইপলাইনের বিভিন্ন রকম ফিটিংস ফ্রান্স থেকে Container ভরে ভরে আসতে শুরু করলো। বড় ট্যাংক-এর base casting হচ্ছে একটা একটা করে। প্রথম যেদিন সেক্টর তিন-এর ট্যাংক-এর base casting হবে-সেদিন ত্রিপলী থেকে বড় বড় সাহেবরা এসে হাজির। technical director আস সাঈদ আদ দাখিল আর chief engineer নাম মনে নেই, সে ছিল মিশরী। ঢালাই হলো সারা রাত। কারণ দিনে প্রচণ্ড গরম, Concrete ফেটে যাবার সম্ভাবনা থাকে। তাই রাতে

তখন summer, ঢালাই হলো। দাখিল সাহেবের সাথে আমার আগেও দেখা হয়েছে অফিসে নানান মিটিং-এ। আমার বয়েসিই ভদ্রলোক। অত্যন্ত অমায়িক মিষ্টভাষী, লিবিয়ানদের মধ্যে ব্যতিক্রমী মানুষ। আমার সাথে বেশ সদ্ভাব ছিল। সেদিন রাতে যখন ঢালাই হয়— বেশ গভীর রাতে আমরা চা খাওয়ার তেষ্টা অনুভব করলাম। তার ব্যবস্থাও হলো বাঙালি শ্রমিক ভাইদের কল্যাণে। সেই আবসরে দুজনে একটু দূরে বসে আলাপ হচ্ছিল, কথোপকথনটা প্রায় এরকম : মি. হায়াত, লিবিয়া সম্পর্কে আপনার ধারণা কি রকম?

উত্তর দেওয়ার আগে আমি সাবধান হয়ে গেলাম, কারণ আমরা জানি প্রতিটি দশম লিবিয়ান একজন সরকারি গোয়েন্দা। হেসে বললাম-

আমারতো খুবই ভাল লাগছে। আপনারা খুব ভাল আছেন। দশ বছর ধরে চাল, আটা, চিনি, ঘি, দুধের দাম একই আছে। প্রত্যেক লিবিয়ান অর্থবিত্তের মালিক না হলেও স্বচ্ছল। স্বচ্ছলই যদি হবো, তাহলে আমাকে কিউ দিয়ে রুটি কিনতে হবে কেন?

তোমাদের তো গণতন্ত্রী দেশ। সবার সমান অধিকার। কিউ দিতে অসুবিধা কি? গণতন্ত্রী? হা! This is fake democracy, Dictatorial Government. আমি আর কথা বাড়াবার সাহস পাইনি। টেকনিক্যাল ব্যাপার স্যাপার নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম! এরপর বহুবার আমরা এক সাথে হয়েছি। দাখিল সবসময় তার ক্ষোভের কথা বলার চেষ্টা করেছে। আসলে যতো আরামেই থাকুক তারা, জবান-বন্ধ কেউই মেনে নিতে পারে না, আর তারই বহিঃপ্রকাশ হয়েছে শেষ মুহূর্তে। পতনটাও তরান্বিত করেছে দেশের ভেতরের বিদ্রোহীরা।

আমি যখন ইস্তফা দিলাম, আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল থাকবার জন্য। আমার তখন মন কিছুতেই চাইছিল না। দাখিল বলেছিল, যখনই মন চাইবে আসতে আমাকে একটা টেলিগ্রাম করবে। আমি Visa পাঠিয়ে দেব। কিন্তু আমি আর কোনো দিন বোধ করিনি দেশ ছাড়ার।

বছর খানেকের মধ্যে আরবি বলা ধরন রপ্ত করায় অনেকে আমাকে মনে করতে মিসরি, অর্থাৎ মিশরী। আরবি বলা ছাড়া তো কোনো উপায় ছিল না। আর তুর্কিরা ইংরেজিটাও ভাল বলতে পারে না-তাদের সাথেও আরবি (ভাঙ্গা ভাঙ্গা) চালাতে হতো। সবই ভালই চলছিল, হঠাৎ বাঙালী ভাইয়েরা বিদ্রোহ করে বসলেন একবার। দু’বেলা ভাত দিতে হবে। মাছ ও তরকারিও দিতে হবে নইলে খাবে না। হাঙ্গার স্ট্রাইক করে বসলো-দুবেলা রুটি খেয়ে তারা কাজ করতে শক্তি পায় না।

বিদ্রোহের খবর হেড অফিসে চলে গেল, সেখান থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসে! হৈ চৈ বেধে গেল। লিবিয়ায় কেউ কোনোদিন strike দেখেনি তাও আবার হাঙ্গার strike. লেবার এটাশি ফজলুর রহমানসহ ত্রিপলী অফিসের বড় সাহেবরা এসে হাজির প্রকল্পে। তাদের দেখে রীতিমত স্লোগান ঝাড়তে লাগলো বাঙালির। তারপর বিস্তর আলোচনা— আমি মাধ্যম হিসেবে উপস্থিত। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে শেষ পর্যন্ত একবেলা ভাতের অনুমোদন পাওয়া গেল। মাঝে মধ্যে মাছ দেয়া হবে— তবে রান্না হবে না বাঙালীর মত, ভাজা হবে। সবজি সম্ভব নয়, যাই হোক বাঙালিরা রাজি হলো। ঝামেলা মিটলো। তবে বাঙালিরা এর পর থেকে আর রাত্রে রেস্টুরেন্ট-এ খেতে আসতো না। যার যার মত স্টোভ কিনে ভাত রান্না করতো। আর মুরগী জবাই করে নিয়মিত রাতের খাবার খেতো। যদিও আমাদের হার্ডবোর্ডের ঘরে চুলো চালানো নিষেধ ছিল, তারা থোড়াই কেয়ার করল সেই আদেশ। দ্বিতীয় বছরও এভাবেই শেষ হলো। কি. মি. এর পর কি. মি. পাইপ বসছে-নানান রকম ফিটিংস জুড়ে দেয়া হচ্ছে সেগুলোতে, আবার সেগুলোর নিরাপত্তার জন্য RCC বাকস তৈরি করে (Prefabricated) যায়গায় বসানোর কাজও (আমার দায়িত্বে) চলছে। তিনটে ট্যাঙ্কের ভিত ঢালাই হলো। (মোট পাঁচটা সেক্টর ছিল)। প্রথমটির দেয়ালের রড বাঁধার কাজ চলছে— আমি সাটার design করে ওয়ার্কশপে দিয়ে দিয়েছি। পাম্প হাউজের ওয়াল অনেকগুলো শেষ করে ছাদ ঢালাইও চলছে Concrete lifting machine দিয়ে-এমন সময় এক ঘটনা ঘটে গেল। একটা সাইটে ঢালাই শেষ করে আমি আমার ক্যাম্পে এসে কেবল খেতে বসেছি। দরজায় নক্। মাবরুক উত্তেজিত দরজায় দাঁড়িয়ে-

কী হয়েছে মাবরুক?

তোমার এক বাঙালি আমিল (শ্রমিক) আমাকে মেরেছে, মুদির তোমাকে এক্ষুণি ডাকছে। জরুরি। ভাত থুয়ে দৌড়লাম। বুঝলাম ব্যাপার সিরিয়াস। অফিসে ঢুকতেই আলী জেরেবি আমাকে দেখে হেসে বললো-মি. হায়াত I have solved the problem. you can go home now. কি সমাধান করলো জানলাম একটু পরে-যখন দেখি যে, যে বাঙালি ছেলেটার বিরুদ্ধে মারামারির অভিযোগ সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। তার নাক মুখ দিয়ে ঝরছে রক্ত।

ওকে মারলো কে মাবরুক?

মুদিরকে জিজ্ঞাসা করলাম।

না, না। আমি মেরেছি!

তুমি?

হ্যাঁ।

কেন?

দেখ, ও লিব্বির গায়ে হাত তুলেছে, পুলিশ খবর পেলেই ওকে এক্ষুণি ধরে নিয়ে জেলে ভরবে। আর লিবিয়ান জেল খুবই বিপদজনক। হয়তো সারাজীবনে আর বেরুতে পারবে না। তার চেয়ে এই ভাল হলো না, এক ঘুসি মেরে, ওর সমস্যার সমাধান করে দিলাম। মাবরুকও খুশি।

আমি হতবাক। এরপর কোন বাঙালি মারামারি করেনি আমাদের প্রকল্পে, অন্তত আমি থাকতে দেখিনি।

লিব্বিদের চরিত্রের বৈশিষ্টর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো, ওরা একরোখা। গাদ্দাফি জোর করে পড়াশোনা করাচ্ছিলেন। কিন্তু তাদের তাতে মন নেই। ওরা বলে, তেলের পার্টনার আমি, চাকরি কেন করবো, আমাকে মাসে মাসে সরকার শেয়ার দেয়, ওটাই যথেষ্ট। যে কারণে প্রত্যেক লিব্বিই মাতবর।

ওদের মন, মেজাজ, রুচি সবই extreme. ওরা প্রচণ্ড ঝাল খায়, drink করে তাও প্রচণ্ড তেতো (যার নাম Bitter), ঝাল খায় পাগলের মত। চা কফি— যেমন কড়া তেমনি মিষ্টি, আর মেজাজ? একবার যদি কাউকে পছন্দ করে তার জন্য জীবনটা দিয়ে ফেলবে। ওদের সর্বক্ষণের সঙ্গী হলো— পিজো গাড়ি (আগে ছিল উট) যা নিয়ে কারণে অকারণে শুধু ছুটে বেড়াবে। আর এক সাথি চা বানানোর সামগ্রী। ঘরে যদি আগুন লাগে— ও চা-এর কেটলি আর চুলো নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে আসবে।

আমাদের বাঙালি শ্রমিকদের দেখতাম অফিসের পর আর ছুটির দিনগুলোতে প্রাইভেট কাজ জুটিয়ে নিয়েছে অনেকে। কেউ খেতে কাজ করে, কেউ ঘর বানানোর শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। তাদের ভালই সাশ্রয় হতো টাকা। খাওয়া থাকা ফ্রি, এটাই একটা বিশাল সুবিধা। আমরা ছুটির দিন হয় অতিথি আপ্যায়ন করতাম না হয় গাড়ি নিয়ে কোথাও অতিথি হতাম। নয়তো কেনাকাটা তো রয়েছিল। বিশাল বিশাল সব সুপার স্টোর তৈরী করে দিয়েছিল সরকার। ইউরোপ থেকে নানান ধরনের সব Electronics গৃহসামগ্রী, সংসারের নানান টুকিটাকি তৈজস পত্র বিক্রি হতো সুলভমূল্যে। সেসব যায়গায় আমরাও হানা দিতাম, বিশেষ করে remote এলাকার স্টোরে যেতাম-কারণ সেসব যায়গায় ভীড় ছিল না একদমই। ত্রিপোলীও যাওয়া হতো মাঝে মাঝে, সুক বালাদিয়া (মিউনিসিপাল মার্কেট) আর আওয়াল সেপ্টেম্বর রোডে দোকানপাট ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও উন্নতমানের। দামও বেশি। তারপরও যাওয়া হতো, কারণ সুপারস্টোরে-এ সব কিছুতো আসতো না।

লিবিয়ার মানুষজনের মধ্যে দুটো ভাগ। একদল মর্ডান, পোশাক-আশাকে, লেখাপড়ায় কথা বার্তায়— অন্যদল পুরো বেদুইন-হয়তো শহরেই থাকে কিংবা কোনো প্রকল্পে— তাঁরা পুরো গাঁইয়া-ভাষা থেকে শুরু করে চালচলন-ব্যবহার সব কিছু। গাদ্দাফি সাহেব খুব চেষ্টা করছিলেন ওদের লেখাপড়া শেখাতে আর শহুরে করতে। কিন্তু ওরা সেটা পছন্দ করতো না। এমনকি পাহাড়ের গুহাতে Electricity নিয়ে তাতে বাস করতো-গাড়ি চালাতো পিজো। অদ্ভুত রকম একটা সংস্কৃতি দেখেছি লিবিয়ানদের মাঝে।

এদর মধ্যে সবচেয়ে ভাল যেটা লাগতো আমার সেটা এদের জাতীয় পরিচয়। আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন তার জাতীয় পরিচয় সে বলবে-

আনা আরব!

আমি আরব।

কখনোই বলবে না আমি লিব্বি।

যখন বলবেন, কোন দেশি? তখন বলবে-

আনা লিব্বি!

দীর্ঘ হাজার বছরের রোমান সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ভূমধ্যসাগরের তীরেই অবস্থিত এসবের ধংসাবশেষ। লেপ্টিস ম্যাগনা, সাব্রাতা, খোমস, গাদামিস প্রভৃতি বিখ্যাত স্থান ধ্বংসাবশেষের জন্য। একজন সীজারের মুর্তি এখনও দাঁড়িয়ে আছে ত্রিপলীর মিউনিসিপাল মার্কেটের প্রবেশদ্বারে। এখন পর্যন্ত কেউ বলেনি, মূর্তি ভেঙ্গে ফেল, কারণ তারা ঐতিহ্যকে ধারণ করে, লালন করে।

তৃতীয় বৎসরও অনেক দূর এগিয়ে গেল, চিন্তায় পড়ে গেলাম কী করবো, থাকবো না যাবো? শিরীর কথা হলো—

তোমার মন যেটা চাইবে সেটাই হবে, জোর করে থাকার প্রয়োজন নেই। ওরও মন চাইছিল দেশে ফেরার জন্য। আমি দু’মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসতে পারতাম। কিন্তু সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলাম, থাকবো না, সেই ভাবে প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেল। গিন্নি ব্যস্ত হয়ে গেল কেনাকাটায়, বিশেষ করে গিফ্ট কেনার জন্য সময় বেশি বেশি দিল। এতদিন পর দেশে যাবো, সবার জন্য কিছু না কিছু তো নিতেই হবে।

অবসর সময়ে দুজনে বসে ডলারের হিসাবটাও করে ফেললাম। উরে বাপরে এত টাকা আমার! চল চল বাড়ি চলো। আর টাকার দরকার নেই। বাকস প্যাটরা বাঁধো।

এর মধ্যে আবার কয়েকটি অনুষ্ঠানও করা হলো। স্বাধীনতা দিবসের উৎসব। আর একটি বোধকরি পহেলা বৈশাখ নিয়ে জঞ্জুরে সাবেক এমপি ফকরুল ইমামের বাসায়। জমজমাট অনুষ্ঠান। খাওয়া দাওয়া সবই ছিল সেদিন। আবার আর এক অনুষ্ঠানে Platonic love নামক একটা একাঙ্কিকা ও মঞ্চস্থ করা হলো।

সবাই আসবার আগে খাটপালঙ্ক বিক্রি করে, আমার তো সে ঝামেলা ছিল না। বিক্রির জিনিস একটিই ছিল, গাড়ি। গাড়িটি সেকেন্ড হ্যান্ড হলে কি হবে অত্যন্ত ভাল অবস্থায় পেয়েছিলাম। শত শত কিলোমিটার চালিয়েছি। একবারও আমাকে বিব্রত করেনি। ব্যবস্থা হয়ে গেল এক বাঙালি প্রকৌশলীর সাথে। চূড়ান্ত হলো যাবার আগে দিয়ে গেলেই হবে, এমন চুক্তিতে।

তিনটি বছরের তিনসহস্রাধিক স্মৃতি বুকে নিয়ে একদিন পাড়ি দিলাম দেশের পথে। মরুভূমিতে রয়ে গেল আমার পদচিহ্ন। এই বা কম কিসের। একদিন যখন এই প্রজেক্ট চালু হবে, নিশ্চয় তারা একবার হলেও মনে করবে বাঙালি এক প্রকৌশলীর কথা। জানি না, যুদ্ধের পর সেগুলোর অস্তিত্বের বর্তমান অবস্থা কি!

কোনো লিবিয়ান যা করে না, আলী জেরবি সেই কাজটি করলো, আমার পুরো পরিবারকে নিমন্ত্রণ করে এক রাতে বাড়িতে ডিনারে আপ্যায়ন করলো। আমার গাড়ি তখন হস্তান্তর হয়ে যাওয়ায়, আলী নিজের গাড়ি আমাকে দিয়ে রাখল।

You go with my car. I will get it tomorrow in the project.

সত্যিই সে আমাকে খুবই পছন্দ করেছিল।

আমরা চোখের জল ফেলেছি, আসবার দিন। এবং আমার লিবিয়ান স্টোরকিপার খলিফার চোখেও জল দেখেছিলাম সেদিন। মাবরুক তো প্রায় ভ্যাঁ করে কেঁদে দেয় আর কি! আরও একজন কেঁদেছিল, তার কথা বলতেই মনে নেই আমার। লাল বাহাদুর, লাল খান। পাকিস্তানি মেশিন ড্রাইভার। ও ছিল আমার মুদিরের বন্ধু। ওর জন্য বরাদ্দ ছিল একটি বাড়ি। মুদির প্রায় ওর সাথে আড্ডা দিত দেখেছি। আর লাল খান ছিল সব্যসাচী, সব সে একাই করতো। নতুন কাউকে নিয়োগ দিতে দিত না। ক্যাটারপিলার থেকে শুরু করে crane fork lift, mixer machine, concrete lifting machine সে এক হাতে চালাতো। হ্যাঁ, এক হাতে মানে এক হাতে। যখন concrete lifting machine এলো, সে মুদিরকে বললো, সেই চালাতে পারবে, নতুন ড্রাইভারের প্রয়োজন নেই। প্রথম যেদিন টেস্টিং হবে, সেদিন বেশ জাকজমকভাবে, শুরু হলো, mixer machine concrete তৈরি করে concrete lifting machine -এ ঢেলে লাল নিজেই-সেটা চালালো।

কিছুক্ষণ পর মেশিন অচল হযে গেল কংক্রিটসহ।

হাম ঠিক কর দেঙ্গে।

বলে কাজে লেগে গেল লাল খান।

সময় যেতে লাগলো যত, ততই কংক্রিট জমে যেতে থাকলো। তখন সে মেশিনের মুখে হাত ঢুকিয়ে কংক্রিট বের করে ফেলতে শুরু করলো, তাতে কাজ হচ্ছিল, সাথে সাথে উজ্জল হতে থাকল লাল খানের মুখটাও।

বিপদ তো তখন অপেক্ষায়।

মেশিন খানের হাত চেপে ধরলো, আর বের করতে পারে না। প্রায় ঘণ্টা খানেক নানান চিৎকার চেঁচামেচি, চেষ্টা অপচেষ্টা হলো, কিছুই হয় না। কিন্তু অবাক কাণ্ড লাল খান যেন নির্বিকার, কিছুই হয়নি ভাব।

ঘণ্টা খানেক পর হাতটা নিজে নিজেই বেরিয়ে এল। কিন্তু কব্জি থেকে অর্ধেকটা কাটা, ঝুলছে। আরবি ভাষায় লাল কালিতে সাবধান বাণী লেখা ছিল, পাইপের মুখে-হাত দেয়া যাবে না এখানে— এটা ভাকুয়াম চালিত। অটো open-close, যার জোরে concrete উপরে ওঠে। ঘটনা ঘটে গেলে তো আর কিছু করার থাকে না। বিশেষ করে খান যখন মুদিরের অন্তরের বন্ধু। হাসপাতালে নেয়া হলো। সেলাই দিয়ে হাত খানা জোড়া লাগানোও হলো। কিন্তু দিন পনেরো পর বোঝা গেল পচন ধরেছে— সুতরাং কেটে ফেলা হলো। তাতেও হলো না-এর পর দু’দুবার কাটা হলো— কনুই-এর ওপর পর্যন্ত।

আসলে এই মেশিন সম্বন্ধে তার কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু নাম তার বাহাদুর, সব কিছুতেই বাহাদুরি দেখানো চাই-ই। মেশিনে Concrete lift এর-নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাথরের সাইজ ১/২-এর উপর হতে পারবে না, সিমেন্ট বেশি দিতে হবে, কারণ পানি বেশি দিয়ে বেশ নরম কংক্রিট তৈরী করতে হবে— তার সাথে Water-cement ratio ঠিক রেখে rich concert easily work-able হতে হবে।

লাল তো দমবার পাত্র নয়। চাকুরি বহাল থাকলো। এক হাতে দশটা মেশিন চালায় এখন লাল বাহাদুর লাল খান। আমার বিদায়ের দিনে এই শক্ত মনের মানুষটাকেও দেখলাম অন্যরকম। গাড়িতে যখন আমরা উঠতে যাবো সে এসে হাজির। টুপটাপ আমাকে আর শিরিকে পা ধরে সালাম করে ফেললো।

মেরে লিয়ে দোয়া কিজিয়ে গা ভাবিজি।

ওর চোখে তখন পানি টলটল করছিল

লিবিয়ান এয়ারলাইনস-এ ফ্লাইট ছিল করাচি পর্যন্ত

এক গোধূলিতে এসেছিলাম, আর এক গোধূলিতে বেরুলাম গাদ্দাফির দেশ থেকে। বিদায় লিবিয়া।

ভোরে পৌঁছলাম করাচি। কিন্তু ওদের চরিত্র প্লেনেও দেখলাম। দশবার কলিং বেল টিপলে একজন আসে, তাও বিরক্ত হয়ে, গিয়ে দেখি পেছনে দল বেঁধে তাস পিটাচ্ছে স্টুয়ার্টরা। হাসবো না কাঁদবো?

করাচি থেকে পি.আই.এ ফ্লাইটে ঢাকা। এসব অফিস থেকেই ঠিক করে দিয়েছিল।

বেলা ১১টা কি ১২টায় পৌঁছুলাম ঢাকার নতুন বিমান বন্দর কুর্মিটোলায়। ১৯৮১ সনের ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে।

.

আহ, কি আনন্দ।

দেশের মাটিতে পা রাখতেই শরীরটা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলো—

ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা।

গেয়ে উঠলাম মনে মনে।