১৯. মাগো মা ওগো মা আমারে বানাইলা তুমি দিওয়ানা
মাগো মা ওগো মা
আমারে বানাইলা তুমি দিওয়ানা…
আমার আম্মাকে নিয়ে পৃথক একটা পরিচ্ছেদ লেখার তাগিদ অনুভব করছিলাম অনেকদিন ধরে। আমি জানি এই পরিচ্ছেদে আমি এবং আমরা সবাই জড়িত অঙ্গাঙ্গীভাবে। সবার খবরটা পাওয়া যাবে এই অঙ্গনে। সহজসরল মা’টি আমার চিরকালই ছিলেন শান্ত স্বভাবের। আমৃত্যু স্বামী-সন্তান আর সংসার নিয়েই থাকতেন ব্যস্ত— অবশ্য শেষ বয়সে আমাদের ছাড়াও নানান ঝক্কি ঝামেলা সামলাতে হয়েছে এই মহিলাকে। সেটাও মুখ বুজে দায়িত্ব হিসেবে পালন করে গেছেন শুধু সংসারে শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে। এই শান্তিকামী মানুষটারও মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করার ইচ্ছা জাগেনি সেটা বলা মুশকিল।
তাঁর অন্য একটি পরিচয়ও ছিল আমাদের মাঝে। আমার বড় দুলাভাই করম আলী (আসল নাম খোন্দকার আব্দুর রাজ্জাক) আম্মাকে খুবই আদরের সুরে ডাকতেন— সৈয়দের বিটি (সৈয়দ বংশের মেয়ে) বলে। আম্মা যে তাতে বেজার হতেন তা কিন্তু নয়, বরং উপভোগই করতেন যা তাঁর মুখভাবে স্পষ্ট হতো।
আগেই বোধকরি বলা হয়েছে— আম্মার নানা এবং নানি উভয়েই সৈয়দ বংশীয়-সুতরাং কট্টর সৈয়দ বলাই যায়। তার ওপর আবার বিয়ে হলো এক খোন্দকার বংশে— মানে আমার দাদারা ছিলেন পীর উত্তরাধিকারী খোন্দকার। দাদী তো ছিলেন নানীর আপন বোন— সৈয়দ। সুতরাং সব দিক দিয়ে উঁচ্চ বংশীয় বলা যায়!
যাই হোক সৈয়দ বংশীয় পাত্রদের ক’নে পেতে অসুবিধা ছিল না। বংশের ভেতরেই অজস্র সুন্দরী কন্যা ছিল। বয়েস দশ-এগারো হলেই চলতো। বিপরীতে সৈয়দের বেটিদের বিয়ে এত সোজা ছিল না— কারণ স্বভাবতই কনের পিতা মাতা তো মেয়ের বিবাহ উত্তর জীবনের কথা ভেবে শিক্ষিত, অর্থবান, সুদর্শন পাত্রই কামনা করতেন-এবং এতসব গুণের অধিকারী পাত্র বংশের ভেতর পাওয়া খুবই সমস্যার বিষয় হয়ে দাঁড়াতো।
এখানেই হয়ে যেত সমস্যাটা জটিল। কানা খোঁড়া, লুলা, কালা যাই হোক— একটু আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলেই সেই হয়ে যেতো উপযুক্ত পাত্র। শুধু সৈয়দ হওয়া চাই। দোজবররা অধিক উপযুক্ত, কারণ তারা সংসার কর্মে অভিজ্ঞ।
এই দিক থেকে শামু বিবি (আমার মা শামসুন্নাহার বেগমের ডাক নাম) খুবই ভাগ্যবতী। যেভাবেই হোক তাঁর বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজতে বেশি দূর যেতে হয়নি।— পাশের গ্রামেই খালাতো ভাই সালু মিঞা এন্ট্রান্স পাস দিয়ে কলকাতায় রেল কোম্পানীর চাকরি পেয়েছে তখন। (এ গল্প লিখেছি আগে) টালি ক্লার্ক, মাসে বেতন পনেরো টাকা। জজানে (আমার দাদার গ্রাম) প্রচুর জমিজমা, বিশাল ভিটে-তাতে আবার মাটির দোতলা কোঠাবাড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি। চেহারা রাজপুত্রের মত (আসলেই আমার আব্বার চেহারাটা হিংসা করা মতই ছিল)। শামু বিবি কী কারণে যেন ১৫ বৎসর পর্যন্ত (আমার নানির বিয়ে হয়েছিল ১১ বৎসর বয়সে) অবিবাহিত ছিলেন-নানার বাবা তো তখন গাঁয়ের মোড়ল— কার সাহস ছিল এ নিয়ে কয় কথা। তো সেই ১৫ বৎসরের শামু বিবির বিয়ে হলো ২০ বছরের সালু মিঞার (আব্দুস সালাম) সাথে।
মুর্শিদাবাদের গ্রামে বছর ১৫-১৬ বছর ঘর সংসার করার পর এসে পড়লেন চট্টগ্রাম শহরের রেলওয়ে কলোনির পাকা বাড়িতে, টাইগারপাসে।
পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। আম্মা কোনোদিন এর আগে কলকাতা গেছেন কিনা জানি না-তবে ট্রেনে চড়ে পাথরচাপড়ি দরগায় গিয়েছিলেন একবার আমি শুনেছি। এখানে প্রথমেই দেখলেন— বাড়ির পিছনেই পাহাড় (টাইগারপাস ও বাটলি হিল), পাকা বাড়ি, পাকা উঠান, কলের জল আর তার সময় ধরে আসা যাওয়া, সামনে ফুলের বাগান আর তার লাগোয়া পিচঢালা পথ (টাইগারপাস রোড)। সেটা দিয়ে নানান রকম মোটর কার, জিপ, ট্রাক, বাস আর রিকশার নিত্য চলাচল।
শুনেছি কান্নকাটি যেটা শুরু হয়েছিল সালার স্টেশন ছেড়ে আসবার সময় সেটা থামতে প্ৰায় মাসছ’য়েক সময় লেগেছিল। পরেও নিশ্চয় থেকে থেকে উথলে উঠেছে সেটা। তারপর অবশ্য মানিয়ে নিয়েছেন নিজের অবস্থানের পরিবর্তন— গুছিয়ে নিয়েছেন সংসারটাকে। আমি তখন তিন বছরের। মেজো আপা (ইলা) দশ আর বার বছরে ছিলেন বড় আপা (রাণি)। তাঁরা ফোর ফাইভ অবধি পড়েছেন গ্রামে-এখানে এসে আব্বা আর তাঁদের স্কুলে দেননি। এটাই সেই খোন্দকার আর সৈয়দের বংশ গরিমার অংশ, কোরান পড়েছে— সেটাই যথেষ্ট। আম্মাকে দেখেছি কোরান পড়তেন খুবই সুন্দর সুরে। ভাল লাগতো আমার। মনে পড়ে আম্মা যখন দুপুরে যোহরের পর কোরান নিয়ে বসতেন-আমি চুপ করে পাশে বসে শুনতাম। পরে ওস্তাদ রেখে আমাদের তিন ভাইবোনকেও পড়ানো হয়েছে। আরও পরে ছোট বোন দুটোও বাধ্যতামূলকভাবে কোরান পড়েছে।
ও হ্যাঁ, আম্মা পড়াশোনা করেছেন ফোর পর্যন্ত বাড়ির সামনের পাঠশালায়, অবসর সময়ে দেখতাম পত্রিকা-ম্যাগাজিন নিয়ে বসতেন, তবে তার জন্য খুব একটা পেতেন না অবসর। এক সময় দেখেছি নিজেই লিখেছেন চিঠিপত্র-পরবর্তীতে আমরাই কেউ লিখে দিতাম।
আমরা নিতান্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার ছিলাম। কিন্তু আনন্দের কমতি হয়নি কখনো সংসারে। হ্যাঁ, অর্থনৈতিক টানাটানি লেগে থাকতো তাই— তখন ধারদেনা করতে হতো— আমরা তো করতাম না, এটা আব্বা আম্মাই সামলাতেন-আব্বা যখন খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেন— আম্মাকে খুবই মীনমীন করে অনুরোধ জানাতেন— পাড়ারই কোনো খালা, চাচি এঁদের কাছ থেকে দশটা টাকা আনার জন্য।
আর তখনই আম্মার সৈয়দ-এর বেটির চরিত্র প্রকট হতো।
না, ধার করতে হবে না।
চলবে কী করে, মাইনে পেতে তো দেরি আছে।
আমি দেখছি।
ব্যাস, সংসার ঠিকই চললো মাইনে পাওয়া পর্যন্ত ধারদেনা না করেই। কীভাবে? আম্মার লক্ষ্মীর ঝাঁপির কারণে, আমাদের জানা ছিল আম্মার একটি গুপ্ত ঝাঁপি আছে— কিন্তু তার শক্তি সামর্থ কতটুকু সেটা বুঝতে পারতাম না। সেটাকেই আমরা বলতাম লক্ষ্মীর ঝাঁপি’ এ ছাড়া আম্মার ছিল— মুরগি, হাঁস আর রাজঁহাসের পাল-একগুচ্ছ কবুতর, যারা মাসে মাসে বংশ বৃদ্ধি করে চলতো।
বাড়ির সামনের বাগানটাও বিফলে যেত না। আব্বা করতেন ফুলের বাগান-প্রতি বছর মৌসুমী ফুলের বাহারে আলো হয়ে থাকতো আমাদের বাগানটা, কিন্তু তারপরও ছিল যথেষ্ট খালি যায়গা— সেটা ছিল আম্মার দখলে। কোনো না কোনো সবজি সারা বছরই আমাদের খানাখাদ্যের সহযোগী হয়ে যেত। এভাবেই আম্মা তাঁর সৈয়দ বংশীয় ক্ষমতা প্রদর্শন করতেন-আব্বার বিপদে।
একটা বড় ঘটনার কথা বলি-আব্বা যদিও নিজের মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে সৈয়দ ও খন্দকার বংশীয় নিয়ম মেনেছিলেন-ষোলো বছরের মধ্যেই তাদের বিয়েও সেরেছিলেন— কিন্তু তিনিই আবার এক সময় হয়েছিলেন নারী শিক্ষার একজন পথিকৃত। টাইগারপাস রেলওয়ে কলোনিতে বাটালি পাহাড়ের পাদদেশে খালি জমিতে তিনি একটি গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন নিজ উদ্যোগে। এসব কাজে হ্যাপা থাকে প্রচুর। এরপর হলো বেতন সংকট। তখনো পুরো অনুমোদন হয়নি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে। তাই প্রতি মাসে দৌড়তে হতো শিক্ষক কর্মচারির বেতনের অর্থ জোগাড়ে। সেই সংকটে একবার সমস্ত সংগ্রহ-সোর্স ব্যর্থ হলে আব্বা এসে দাঁড়ালেন আম্মার সম্মুখে। আম্মা কিছুক্ষণ আব্বার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেলেন আলমারি খুলতে। নিয়ে এলেন ছোট্ট একটা বোঁচকা।
এই নেন।
সত্যি দিয়ে দিলে?
সত্যি না তো কি? আপনার মান অপমান তো আমাদের মান অপমান।
ভেবো না, সামনের মাসেই দিয়ে দেবো।’
তখন আমি কলেজে পড়ি। সবই মনে আছে আমার।
আসলে এই সময়টায় আমরা সবাই ছিলাম ঘটনাস্থলে— বোন দুটো হয়তো কিছুই বোঝে নি-কিন্তু আমার জানা ছিল আব্বার সমস্যাটা। পাড়ায় একটা কানাঘুষো ছিল। বিপক্ষ দলের তৈরি করা কানাঘুষো যে, এই স্কুল চলবে না, শুধু শুধু সালাম সাহেব এটটার পেছনে দৌড়ান। যাই হোক বাটালি হিলের কোলের সেই স্কুল আজ রমরমা। চট্টগ্রাম শহরের একটি বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান— টাইগার পাস রেলওয়ে এমপ্লয়িজ গার্লস হাইস্কুল।
সেদিন আম্মার গহনা ক’টা বন্ধক দিয়ে রক্ষা হয়েছিল মান। স্কুল থেমে থাকেনি। সেটা তো দেখাই যায় তার গর্বিত অবস্থানে। সৈয়দের বিটির কল্যাণে সালু মিঞার ইজ্জত রক্ষা। তবে এই সালু মিঞার বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে বিদ্রোহও করে বসতেন তিনি। আব্বার মেলা শখ ছিল— তা লিখেছি। সীমিত বেতনের চাকরিজীবি একটি মানুষ— তবে এত শখ কেন হবে? এ ধরনের কথা কখনো কখনো শুনেছি আম্মার মুখে। আব্বা ভাল শিকারি। ৫০০ টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ধার করে আমেরিকান বন্দুক কিনেছিলেন। মাছ ধরার নেশা ভয়ঙ্কর রকমের, কন্ট্রাক্ট ব্রিজের পোকা। রেলওয়ে এমপ্লয়িজ ক্লাবের সেক্রেটারি, স্কুলের সেক্রেটারি, বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজনের কোনো অনুষ্ঠানে কাচ্চি বিরিয়ানীর শখের বাবুর্চি। এদিকে নিজের বাগানটা তো রয়েছেই, তাছাড়া এর-ওর সমস্যা তাঁর বিচার আচারও ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ে। আর সময় কোথায়? মানুষটা একেবারে সময় দিতে পারতেন না বাড়িতে। আম্মা তাঁর সংসার নিয়ে সময় কাটাতেন ঠিকই, তারপরও তো বাড়ির কর্তার একটা অবস্থান বাড়িতে প্রয়োজন, সেই কারণেই আম্মার বড় নিসঙ্গ লাগতো মাঝে মাঝে। আর তাতে তেতে থাকতেন মাঝে মাঝে। এর ওপর আব্বার বাসায় এসেই গল্পের বই পড়া! উহ কি নেশা যে ছিল আব্বার, এই পড়ার!
এর মধ্যে আব্বার তো রোববার এলেই পাখি শিকারে নয়তো মাছ ধরতে যেতেই হবে। কারণ রেলের বড় বড় সব অফিসারদের প্রিয় মানুষ সালাম সাহেব। এই সব বড় সাহেবদের শখ হলেই সালাম সাহেবকে সব জোগাড়যন্ত্র করে তাঁদের নিয়ে যেতে হবে। এর আয়োজন হতো বাসায়। যেমন মাছ ধরতে গেলে পিঁপড়ার ডিম, বোলতার বাসা এসব চলে আসতো বাসায় যা আম্মার ধৈর্য্য হারাবার কারণ হয়ে উঠতো। রাত দশটায় ক্লাব থেকে বাসায় ফিরে আব্বা যখন বলতেন-
শামু, কাল বাগচি সাহেব (ওয়েলফেয়ার অফিসার) মাছ ধরতে যাবেন। একটু চার বানিয়ে দেবে? তখন সৈয়দের বেটি তাঁর আসল রূপ দেখাতেন। চুপ করে শুয়ে থাকতেন। আবা তিনচারবার অনুরোধ করে কোনো জবাব না পেয়ে দেখতাম নিজেই চুলো ধরিয়ে চার ভাজতে বসতেন। কষ্ট হতো আব্বার বুঝতাম, কিন্তু আব্বা কখনো আম্মাকে বলেননি একাজটা করতেই হবে। বোনদের দেখেছি একসময় আব্বাকে সাহায্য করতে।
এরপর ধরেন রাত ১২টা ১টা, মাছ ধরে এসে হাজির, বিরাট এক রুই বা কাতল নিয়ে। আম্মাকে অনুরোধ করলেও উঠতেন না বিছানা থেকে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলতো। আব্বা নিজেই বঁটি নিয়ে বসে যেতেন মাছ কাটতে-ফ্রিজতো নাই— দিনে ধরা হয়েছে মাছ— তাকে কেটে কুটে সব ব্যবস্থা তো করতে হবে। হয়তো কোনোদিন আম্মার দয়া হলে গজগজ করে উঠে এসে সব কাজ করে দিতেন— শিকার করার সময়ও তাই। এসব যে আম্মা পছন্দ করতেন না তা নয়— দেরি হওয়াটাই আম্মার সহ্য হতো না। সময়মতো যাও সময়মতা এসো— তাহলে সব ঠিক আছে— সুন্দর হাসিমুখে আম্মা সব কাজ এক হাতে করে দিতেন। তারপর হাতমুধ ধুয়ে দুটো পান বানিয়ে আব্বাকে একটা দিয়ে অন্যটা আয়েশ করে মুখে দিতেন।
ছেলেমেয়েদের নিয়েই জীবনটা কেটেছে তাঁর। আমার ছোট্টো বেলায় যখন আমরা তিন ভাইবোন ছিলাম— তখনও ডিমটা, মাছের মুড়েটা অনায়াসে চলে আসতো আমার পাতে, তারপরেও আমার দুষ্টুমি ছিল— নিজের ডিমটা খেয়ে নিয়ে আপাদের কারোটা নিয়ে দৌড় দিতাম-আব্বা হাসতেন আর আম্মা ডিম ভাজতে বসতেন।
আব্বাকে কেউ ভয় না পেলেও একটা দূরত্ব থাকতো সব সময়। পয়সা কড়ি, চাইলে আম্মার কাছেই হাত পাততাম— আম্মার ঝাঁপি থেকে ঠিকই আনি দুয়ানি বেরোতো। আর মাঝেমধ্যে একেবারে অপরাধীর মতো আব্বার প্যান্টের বেল্ট ধরে দাঁড়াতাম-
আব্বা দুয়ানা পয়সা দেন না।
এ চাওয়ায় যে কী আনন্দ। তারপর কোনো কোনো দিন আব্বা যখন সিকিটা দিতেন-তখন আর আমাকে কে পায়। আহা কী, আনন্দ আকাশে বাতাসে॥ মমতাজ পুতুলের মাধ্যমেও চাইতাম কখনো। ওরা আমার জন্য এসব কাজ করে আনন্দ পেত যথেষ্ট। আগের সময় Special চাহিদাগুলো-যেমন ফুটবল, ক্রিকেট-এর জন্য চাঁদা-সেখানে তো আধুলি বা টাকা ছাড়া হতো না। সেগুলো আম্মার কাছে বায়না ধরতাম— দিতেন আব্বা-আম্মার মাধ্যমে। ওকালতিটা আম্মাকেই করতে হতো।
আম্মার কথা বলতে গিয়ে বারবার আব্বাকে টেনে আনতে হচ্ছে-কারণ দুজনের রসায়নটাই এখানে গুরুত্ব পায় বেশি।
যেমন আব্বা আর একবার মহা বিপদে পড়লেন। তখন, Office Superintendent, ওয়েলফেয়ার Section –এ, দপ্তরে অনেক কিছুর দায়িত্ব ছিল আব্বার। একবার দায়িত্ব পড়লো Sports-এর পুরস্কার কেনার। আব্বা একজন মানুষ যিনি সবকিছু সহজভাবে নিতে অভ্যস্ত। কোনো জটিলতা মনে আসতো না তাঁর।
অফিস থেকে টাকা দেয়া হলো পুরুস্কার কেনার, কি কি পুরস্কার ক্রয় করতে হবে তার তালিকা প্রণয়ন হয়ে গেছে আগেই। সেদিন সকালে টাকাটা তুলে নিয়ে এসে ড্রয়ারে কেবল রেখেছেন অমনি পিয়ন এসে ওয়েল-ফেয়ার অফিসার সাহেবের কথা বলে সালাম দিল, অর্থাৎ তলব জানালো, পড়ি কি মরি করে দৌড়লেন বসের রুমের দিকে। হয়তোবা মিনিট পাঁচেকের কথাবার্তা সেরে ডেস্কে ফিরলেন-হঠাৎ মনে পড়লো টাকার কথাটা। তড়িঘড়ি করে চলে গেছেন ড্রয়ারে তালাটাও লাগাতে মনে ছিল না।
নাই, টাকা নাই ড্রয়ারে। কোথাও নাই। সারা রুম তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো, অফিস হলো তোলপাড়, থানা পুরিশ হলো না, কেবল ওয়েলফেয়ার অফিসার বাগচি সাহেবের বদান্যতায়, সময় দিলেন দু’দিনের, যেভাবেই হোক টাকাটা এনে দিতে হবে দু’দিনের মধ্যে। সালাম সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, কী করবেন এখন কোথায় যাবেন, কার কাছে পাবেন টাকা ধার!
বাসায় এসে সোজা বিছানায়। আম্মা বুঝতে পারলেন কিছু একটা হয়েছে, না হলে এই মানুষটা অসময়ে শুয়ে থাকার লোক নন। বিস্তারিত শুনলেন আম্মা। এক বছরের বেতনের চেয়ে বেশি অংকের টাকা কোথায় পাবেন এখন আব্বা সেই চিন্তায় ভেঙ্গে পড়লেন। তাঁর চোখে জল, মুছিয়ে দিলেন আম্মা।
এত সহজে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। দুলামিঞাদের (জামাই) ডাকেন, তাদের বলেন-আরে না না, তা কি করে হয়?
বেশ হয়। তারা তো এখন আপনার ছেলে-ওদেরও তো দায়িত্ব আছে এ বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করার।
সাইকেল নিয়ে বেরুলাম আমি। দুই বোনের বাসায় এনায়েত বাজারে বড় আপা থাকেন তখন, দুলাভাই খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক ব্যবসা করতেন বিজ্ঞাপন নির্মাণের, তাঁর বড় ভাই-এর সঙ্গে অংশীদার হিসেবে। আর মেজ দুলাভাই মনিরুজ্জামান থাকতেন জেএম সেন লেনে। তিনি বৃটিশ কোম্পানি Sinclair and Murray-র জেনারেল ম্যানেজার, চট্টগ্রাম শাখার। দোস্ত বিল্ডিং-এ অফিস।
সন্ধ্যের পর সভা বসলো আমাদের বাসায়। আমি থাকতে চাইনি-আম্মা জোর করলেন— না তোমাকেও থাকতে হবে। বড় হয়েছো সব কিছু জানতে হবে।
তখন আমি চট্টগ্রাম কলেজে আইএসসির ছাত্র। যোগ দিলাম পারিবারিক জরুরি সভায়। সিদ্ধান্ত হলো, আপাতত কিছু টাকা দিয়ে ওয়েলফেয়ার অফিসারকে অনুরোধ করে সময় চেয়ে নিতে হবে। তিনি যেহেতু আব্বাকে খুবই পছন্দ করেন নিশ্চয় সাহায্য করবেন। ছোট দুলাভাই বেশ মোটা অঙ্কের টাকা দিবেন বললেন, বড় দুলাভাইয়ের যেহেতু অংশীদারী ব্যবসা অতটা পারবেন না তবে কিছু দেবেন। তাতে আৰ্দ্ধেকও হয় না। আব্বার প্রভিডেন্ট ফান্ডের অবস্থাও খারাপ, দুই মেয়ের বিয়ের পর।
আমার গহনাগুলোও মেয়েদের বিয়ের পর যা আছে সেগুলোই নিয়ে যান।
আম্মার অনুরোধ।
না, না, তা কি করে হয়-
খুব হয় আপনার বিপদে কাজে লাগবে এটাই বড় কথা। গহনা কদিনই বা পরি!
হারানো টাকার অর্দ্ধেক ফেরৎ দিয়ে আপাতত: সমস্যার একটা সাময়িক সমাধান করা গেল— তবে পুরো টাকা কবে কীভাবে আব্বা শোধ করলেন জানি না-কারণ কদিন পর আমিও ঢাকায় চলে আসি বুয়েটে পড়তে।
আমার ঢাকায় পড়ায় খুব একটা খরচ লাগতো না আব্বার। তারপরও খাওয়া, হাত খরচ এগুলো বাবদ শ’খানেক টাকা দিতে হতোই। শুনেছি কোঅপারেটিভের মাধ্যমে একটা জমি কেনার এ্যাকাউন্ট ছিল আব্বার। সেখানকার জমা টাকাটাও উঠিয়ে ফেলেছিলেন ওই সময়।
এ সময় এল আর এক বিপদ। বড় দুলাভাই তাঁর অংশীদার বড় ভাই-এর সাথে ভুলবোঝাবুঝির কারণে ব্যবসা থেকে বেরিয়ে এলেন-নিজে ব্যবসা বা চাকরির চেষ্টা করে কিছু করতে পারছিলেন না-তাঁর সংসারের প্রায় পুরো দায়িত্ব এসে পড়লো আবার ওপর। মানে আম্মারই বলা যায়-সংসার চালানোর দায়িত্ব তাঁর, ম্যানেজ করতে হবে অতিরিক্ত দায়িত্বটা। ঠেলেঠুলে চলছিল সংসার। আম্মার কোনো অভিযোগ শুনিনি আমরা। বরং আম্মা বড় আপার কোলের ছেলেটাকে (কাজল) নিয়ে নিলেন কাছে।
দুলা ভাই-এর রাশিটা খুব খারাপ। কিছুতেই কোন কাজে তিনি সুবিধা করতে পারছিলেন না। বেচারা বিব্রতকর অবস্থায় দিন যাপন করছিলেন— আর প্রতি মুহূর্তে আশায় ছিলেন যদি ভাল কিছু একটা হয়ে যায়। বড় আপা অতি সহজ সরল এক মহিলা। তার কান্না ছাড়া কোনো অভিব্যক্তি যেন নেই। দুই বড় বোনের আমি ছিলাম অতি আদরের। বড় আপার এই সময়ের কষ্ট দেখে মন আমার অনেক খারাপ হতো। কিন্তু করার তো নেই কিছু।
আসলে বড় আপার কপালটাই খারাপ। এত সুন্দর স্বচ্ছল সংসারে বৌ হয়ে গেলেন কিন্তু এই ঝামেলার পর আর কোনোদিন কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেননি। সাতটি ছেলেমেয়ে নিয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে হয়েছিল তাঁকে। শেষ বয়সে আবার শ্বশুরবাড়ি নাটোরেই বাস করতেন। ১৯৯৯ -এ বিপাশার বিয়েতে এলেন আমার বাড়ি। তার কয়েকদিন পরই হার্ট এ্যাটাকে চলে গেলেন চিরতরে। হ্যাঁ, আম্মার কথায় ফিরে যাই— আম্মা যখন সব দিকের হাল ধরে সংসার রথটাকে টানছিলেন একা, তখন ঘটলো আর এক ঘটনা। আমার এক ফুফু-ফুপা সপরিবারে মুর্শিদাবাদ থেকে আমাদের বাসায় এসে হাজির। কেন? না, তারা ভারত ত্যাগ করে এসেছেন, ভিটেমাটি বিক্রি করে একেবারে চলে এসেছেন। তাঁরা কিছু টাকাপয়সা নিয়ে এসেছিলেন নিশ্চয়-তারপরও বাড়তি ছ’সাতজন মানুষ একটা সংসারে-নিশ্চয়ই খুব একটা স্বস্তিদায়ক বিষয় ছিল না। তখন আমি ঢাকায়। শুনেছি ফুপা সবাইকে নিয়ে করাচি চলে গিয়েছিলেন— সেখানে সমস্যা হওয়ায় সোজা চট্টগ্রামে।
সপ্তাহ-দুসপ্তায় একবার চট্টগ্রাম যেতাম আমি তখনও আম্মার মুখটা হাসি ছাড়া দেখিনি। আমার দয়াময়ী মায়াময়ী আম্মার চেহারাটা ভেসে উঠে ক্ষণে ক্ষণে আজো। সর্বংসহা মাতা আমার। কতকিছুই সয়েছেন সারাজীবন।
এবার বলি আর এক কাহিনী। এ কাহিনীও আাম্মা ছাড়া সম্পূর্ণ হবে না কখনো।
ওয়াজিউল্লাহ ইন্সটিটিউটে প্রতি মাসে একটি নাটক মঞ্চস্থ হতো বিধায় আমার আম্মা সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী হিসেবে প্রায় সব নাটকই দেখতেন— আর তাঁর একমাত্র আহ্লাদের পুত্র সন্তান হিসেবে আমি শাড়ির আঁচলটা ধরে সেই সব নাটক দেখতাম। একজন অভিনেতা সেই সময় আমার শিশুমনে ভীষণ দাগ কেটেছিলেন। তিনি আর কেউ নন, যাত্রাসম্রাট অবলেন্দু বিশ্বাস। মানুষটি তখন এনায়েত বাজারের ইন্সটিটিউটের মঞ্চ দাপিয়ে অভিনয় করতেন। তাঁর চেহারা, তাঁর শারীরিক গঠন, কণ্ঠস্বর, মঞ্চে চলাফেরা শারীরিক ভাষা, সবকিছু মুগ্ধ করেছিল আমাকে। আমি হয়েছিলাম আবিষ্ট, কিছু বুঝি আর না বুঝি। কারণ তখন আমার বয়স খুবই কম। সে আবিষ্টতা, সেই মুগ্ধতা আমাকে অনুপ্রেরণা যোগালো অভিনয় করার। এই সময় আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু জামালউদ্দিন হোসেন (মিন্টু) আমার সহযোগী ছিল। সেও পাগল হয়েছিল অভিনয় করার জন্য। তারপর কীভাবে নিজেরাই মঞ্চ নির্মাণ করে নাটক মঞ্চায়ন করেছিলাম সে কাহিনী তো বলা হয়েছে।
আসলে নাটকটির প্রযোজক যদি বলতে হয় তা হলে তিনি ছিলেন আমার আম্মা। আমার জীবনের প্রথম অভিনয়-আজ আমি এখানে-এর সব কিছুই ওই সর্বংসহা মা জননীর কল্যাণে। মরহুমা শামসুন্নাহার বেগম!
আম্মার যুদ্ধ একসময় শেষ হয়েছিল। ১৯৬৭ দিকে বাড়ি প্রায় খালি। বড় দুলাভাই খুলনায় একটি চাকরি পেয়ে (আমার মেজো দুলাভাইদের কোম্পানিতে) পরিবার নিয়ে সেখানে গেলেন। এদিক আমার ফুফাও তার পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে এলেন ঢাকায়। চুয়াডাঙ্গা থেকে এরপর এল এক খালাতো ভাই (কামাই) আমাদের বাসায় অতিথি বসবাসের একটা ভাল চক্র তৈরী হয়েছিল এক সময়। সেই যে মান্নাফ চাচা তাঁর ঘর ছেড়ে চলে যাবার পর-আব্বার এক দুর সম্পর্কের ভাগ্নে ছিলেন বেশ কিছুকাল সস্ত্রীক। তিনিও রেলে চাকরি করতেন-পরে বাসা পেয়ে চলে যান। এলেন মাহবুব হাফিজ মামা, আমার প্রথম নাটকের পরিচালক, তিনি পদোন্নতি পেয়ে চলে এলেন ঢাকায়। এলেন সারোয়ার নামে আব্বার আর এক ভাগ্নে। BSIC এ চাকরি পেয়ে চলে গেলেন ঢাকায়। ফুফুদের কথা তো বলেছি। সর্বশেষ এলো কামাই। এসে থাকতো আমাদের বাসায়, ব্যাংকে চাকরি পেয়ে বেশ সুখেই ছিল— আর চুটিয়ে প্রেম করতো পাশের বাসার বিহারী মেয়ে আক্তারীর সাথে। সে নিয়ে এক কেলেঙ্কারী— পরে আম্মা-আব্বার মধ্যস্থতায় মীমাংসা হয়েছিল। কামাই শেষ পর্যন্ত বিয়ে করেছিল আক্তারীকে।
আব্বার অবসরের সময় হয়ে এসেছিল শুনেছিলাম। একদিন ঢাকায় খবর পেলাম আব্বা অবসকালীন ছুটিতে আছেন। এবং বাড়ির পেছনে এ.কে.খান কোম্পানি অটোমোবাইল সেকসনে এ্যাডমিনিস্ট্রিটিভ অফিসার পদে নিয়োজিত হয়েছিদেন। খুব ভাল লাগলো যে আব্বা কর্মবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন না, তবে ক’দিন পর আমার ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেল। আমি চট্টগ্রামে চলে এলাম। দেখলাম আব্বা আম্মা আর ছোট বোনগুলো সবাই খুব খুশি। সংসারে এমন আন্দময় সময় আসেনি আগে। আব্বা অবসরকালীন ছুটিতে থাকায় বেতন পুরো পাচ্ছেন। ওদিকে এ, কে, খান কোম্পানিতে ভাল বেতন পাচ্ছেন। আমিও Result-টা বেরুলেই ভাল কিছু পরিমাণ টাকা মাসে মাসে পাঠাবো। ব্যাস, আব্বা ধার টার শোধ করে সুন্দর জীবন যাপন করবেন। পেনশনের টাকায় ঢাকায় যায়গা কেনার শখ তাঁর। জমি কিনে পুকুর কাটবেন, আর মাছ ধরবেন প্রাণ ভরে। সবচেয়ে বড় কথা আম্মার জীবনে শান্তি আসবে।
আমার Result হলো। হৈ হৈ ব্যাপার। মিষ্টি বিতরণ সারা পাড়ায়।
আম্মার আনন্দটাই বিশেষ করে লক্ষ্য করার মত ছিল আমার। অশ্রুসজল নয়নে মাথায় হাত দিয়ে যে দোয়া করলেন তা আমার সারা জীবনের পাথেয় হয়ে থাকলো। তারপর নফল নামাজ আদায় করেন। আম্মাকে এই জায়নামাজে সারা জীবন দেখেছি-ওয়াক্ত বাদ গেছে কিনা, আমার নজরে পড়ে নি।
আম্মার এ অশ্রুর অনেক রকম মানে আমার কাছে তখন। আমার পাশ করার আনন্দের কান্না। সারা জীবন যে সংসারের ঘানি টানলেন— হাসিমুখে— সেখানে সুখের ইশারা-সবাই জীবনযুদ্ধে পাশ ফিরে শোয়ার আনন্দটা পাবে। বাঁচবে হাঁফ ছেড়ে।
রেজাল্ট পেয়ে ঢাকা গেলাম। ওয়াসাতে ইন্টারভিউ দিয়ে বাড়ি ফিরেই ক’দিন পর নিয়োগপত্র পেলাম।
এরপর আর কী। হৈ চৈ, আনন্দউৎসব, মিষ্টি বিতরণ কান্নাকাটি ছাপিয়ে রওয়ানা হলাম জীবনের প্রথম কর্মস্থলে যোগ দিতে। যে আম্মাকে সবসময় মনে হতো একটা লুকোনো ব্যথার সাথে বসবাস করতেন তাকে আজ মনে হলো— শুভ্র সুন্দর আনন্দে উজ্জ্বল মুখ। কপালে চুমু দিয়ে দোয়া পড়ে ফুঁ দিলেন।
মহানন্দে শুরু হলো কর্মজীবন। মাসেক দুই পরই খবর এলো আব্বার অসুখের। ছুটে গেলাম চট্টগ্রামে। বিছানায় আব্বা। কোমরের হাড় ভেঙ্গেছে অসটিওপরোসিস থেকে। আর-প্রসটেটে বেঁধেছে মরণ ব্যাধি।
ব্যাস সব শেষ। যত সুন্দর স্বপ্নগুলো নিমেষে আবছা হয়ে এলো। দু’তিন দিন পর চোখ মুছতে মুছতে কর্মস্থলে ফিরে এলাম। এবার আর কী। হসপিটাল বাসা, বাসা-হসপিটাল, রেডিও থেরাপি দিনের পর দিন। শেষ সব শেষ। পেনশনের টাকা শেষ। একে খান কোম্পানির চাকরি শেষ। এখন শুরু হল ধার কর্জ। আমার আম্মার জীবনে বোধকরি সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এল এভাবেই। বয়সটা যেন বেশ বৃদ্ধি পেয়ে গেল রাতারাতি।
এদিকে রেল কোয়ার্টারে থাকার সময় শেষ। অবসর হওয়ার পর বাড়তি সময়ও শেষ। বাসা ছাড়তে হবে। চলে যেতে হবে বাইশ বছরের ঠিকানা T 37/B ছেড়ে।
রেলে এত বছর চাকরির সুবাদে সমস্ত মালপত্র, বাইশ বছরের সংসার, রেলের মালগাড়ি ভর্তি করে চলে এল ঢাকায়। বাসা নিলাম মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে। এতদিন আম্মা সামলেছেন স্বামীর সংসার। এবার সামলাবেন পুত্রের সংসার। টানা হেঁচড়া চলতেই লাগলো। একজন সহকারি প্রকৌশলীর চাকরিতে এতগুলো সদস্য নিয়ে সংসার সহজ সুন্দর গতিতে চলতে পারে না। আব্বার কষ্টগুলো তখন বুঝতে শুরু করলাম আমি।
আব্বা এবং পরিবারের কাউকে আমি আব্বার কর্কট রোগের কথাটা বলিনি। সেই হিসেবে সবার কাছে আব্বা ছিলেন সাধারণ রোগী। মাজার হাড় ভাঙ্গায় নড়তে পারেন না, এই যা। ঢাকার বিভিন্ন ডাক্তার দেখিয়েছি। সব ডাক্তারকেই রোগটা বলে নিয়ে নিষেধ করে দিতাম ক্যানসার উচ্চারণ করতে।
দিন যেতে লাগলো, আব্বার অবস্থার অবনতিও হতে লাগলো সেই সাথে। ৬৯-এর সেপ্টেম্বরে ৬ তারিখ ভোর রাতে আব্বা তাঁর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে ইহলোক ত্যাগ করলেন।
গভীর রাতে আম্মা আমাকে ডেকে তুললেন। আমি চমকে উঠে বসে হকচকিয়ে তাকিয়ে ছিলাম আম্মার দিকে-
আম্মা?
তোমার আব্বা নাই।
ক’ সেকেন্ড কথা বলতে পারিনি। আব্বা নাই, হঠাৎ করে এক মহা শূন্যতা অনুভব করলাম যেন। মনে হলো পায়ের তলায় মাটি ধুপ করে নেমে গেল আর মাথার ওপর থেকে একটা ছত্র সরে গিয়ে মহা শূন্য প্রকট হলো। নাই? আব্বা নাই?
এরপর আবার মমতাজ-পুতুলের কান্নায় সম্বিত ফিরে পেতে দৌড়ে আম্মার ঘরে গেলাম। সটান চিৎ হয়ে শুয়ে, যেমন প্রতিদিনই থাকেন। চোখটা বন্ধ, মুখে একটা অভিব্যক্তি যেন এক্ষুণি কিছু বলবেন। আমার আব্বা সালাম সাহেব, সালু মিঞা, খোন্দকার মোহাম্মদ আব্দুস সালাম পরাজিত সৈনিকের মত অসহায় শুয়ে রয়েছেন।
কত কী করার ছিল মনে, তার কিছুই করা হলো না।
পনেরো দিন আগে কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা শুধু অপেক্ষায় ছিলাম চিরবিদায়ের। আর তো ছিল না কিছু করার। সবকিছু করার উর্দ্ধে পৌঁছেছেন অনেক আগেই। আমার সাথে শেষ কথা ছিল কথা বন্ধ হবার আগের দিন। অফিস যাবার সময় আব্বার পাশে গিয়ে বসলাম।
আব্বা।
চোখ খুললেন আব্বা
—কেমন আছেন আব্বা
—উত্তর দিলেন না। মাথা নাড়লেন শুধু।
আমি একটু গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে উঠতে যেতেই হাত চেপে ধরলেন।
— কিছু বলবেন?
বসে পড়লাম আবার।
—তোমার আম্মার শরীরটা ভাল নেই। কোনো একটা সমস্যা হচ্ছে বোধহয়। একটু ডাক্তার দেখাও।
অনেক কষ্ট করে ধীরে ধীরে বলেলেন কথা ক’টা। ওই শেষ কথা আমার সাথে। আম্মাকে কী বলে গেছেন মৃত্যুর আগে জানি না, আম্মা কোনোদিন কিছু বলেন নি মুখ খুলে। আমরাও জানতে চাইনি কষ্ট পাবেন ভেবে।
ওই দিন থেকে আম্মার জীবনটা নিশ্চয় অন্য রকম হয়ে গেল। বুঝতে পারতাম। বাসার মানুষগুলো আমরা সবাই বেশি বেশি সময় দিতাম আম্মাকে। তাঁর সাথে সহজভাবে কথা বলে তাঁকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু আম্মার কথা যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রায় ৪৫ বৎসরের বিপর্যস্ত জীবনের অবসানে নিশ্চয় অনেক স্মৃতি তাঁকে প্রতি মুহূর্তে বেদনায় কাতর করে তুলতো। সাথী হারা পাখি— চখাচখির বেদনা দেখেছি আমি পাখি শিকারে গিয়ে— আজ তা অনুভব করতে পারি।
কী অসাধারণ জীবন। একজন সাধারণ মানুষও যে কতটা অসাধারণ হয়ে উঠতে পারেন। তা আমার আব্বাকে দেখে বুঝেছি, এখনও যে কাজটিই করতে যাই, আব্বার স্মৃতি ভেসে ওঠে— কারণ যে কোনো কাজই অত্যন্ত যত্নে করতেন তিনি। কাজের প্রতি ভালোবাসা, এবং সৎ ও সরল উদ্যম তাঁকে আনন্দ দিত, তাই নানান ঝক্কি ঝামেলা সত্ত্বেও তিনি হাসি মুখেই জীবনটা কাটিয়ে দিলেন। পরাজিত সৈনিক বললাম এই জন্য-যে বিজয়ের তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন— সেটা সফল হতে দিল না ওই মরণব্যাধি। আসলে তাঁকে বলতে হবে গাজী। তাঁর পরাজয়টা এক ধরনের জয়, নইলে আজ এই গাঁথা আমি কেন করছি রচনা। আব্বাকে দাফন করলাম মোহাম্মদপুর জামে মসজিদের সংলগ্ন কবরস্থানে। রক্ষিত কবরস্থান কেনার ক্ষমতা ছিল না তখন আমার, তাই সাধারণ কবরে দাফন হলো। ওটাই আসলে ভাল, এখন বুঝি। পাঁচ বছর পর আম্মাকেও শুইয়ে এসেছি ওখানেই, আব্বার পায়ের কাছে।
আব্বা নেই, আম্মার দিন কাটে না, কাজল আমার ভাগ্নে তাঁর সময় কাটাবার সহযোগী, আর আব্বার পোষা কুকুরটা ‘মিকি’। আব্বার মৃত্যুতে সেও নীরব হয়ে গিয়েছিল বেশ কিছুদিন। ওর কণ্ঠ যেন রোধ করেছিল এই মৃত্যু।
মমতাজ লালমাটিয়া কলেজে পড়ে, পুতুল সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে, কাজল ভর্তি হয়নি কোথাও। আমি অফিসে-আম্মার সময় কাটে না। ওপর তলায় বিহারী পরিবারের ছোট বাচ্চা আসেম কিছুটা সহায় হলো আম্মার। ওই চট্টগ্রামের রেলকলোনীর অত বড় বাড়ি থেকে হঠাৎ করে মোহাম্মদপুরের ওই নয়শ-হাজার বর্গফুটের উঠান আর বাগানবিহীন বাড়ি তাঁকে দম বন্ধকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল।
এর মধ্যেই হঠাৎ মোহাম্মদপুরে হলো বাঙালী-বিহারী রায়ট। আমার বিহারী বাড়িওয়ালা আমাকে গোপনে পালাতে বললো—
আপ ইঁহাসে চলা যাইয়ে। আপকা মালসামান মায় দেখুঙ্গা।
চলে গেলাম গোপীবাগে আমার মামাশ্বশুবের বাড়িতে, বাড়িঘর সব বাড়িওয়ালার হাতে রেখে-সপ্তাহখানেক পর টেনশন কমে এলে আমার বাড়িওয়ালাই অফিসে ফোন করে জানালো-আব আপ আ সেকতে। সব ঠিকঠাক হায়।
ফিরে এলাম কিন্তু সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেললাম যে বিহারী পাড়ায় আর থাকবো না। চলে এলাম মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় ১৯৬৯-এর নভেম্বরে। গলির ভেতর ১৫০০ বর্গফুটের একতলা বাড়ি। ছাদ আমাদের। মুক্ত আকাশ দেখতে পারি। সামনে খালি যায়গা। একটা ডোবাও আছে। কদিনের মধ্যেই আম্মা হাঁস পুষতে শুরু করে দিলেন। আর খালি যায়গায় পত্তন হয়ে গেল আম্মার মস্ত বাগান।
আব্বার মত আমারও টানা হ্যাঁচড়ার সংসার। আমি, আম্মা, দুটি বোন, এক ভাগ্নে, আবার এর মাঝে বড় আপার বড় ছেলে খোকনও এসে পড়লো আমার এখানে। ওর নাকি খুলনায় কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আর মিকি বাবাজী তো রয়েছেনই। তার মধ্যেও বেশ একটা শান্তির পরিবেশ পেলাম। দু’পাশে সব প্রকৌশলীদের নিজেদের বাড়ি— সেদিক দিয়েও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। আম্মাও যেন অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
উনসত্তুরের গণজোয়ারে ভাসছে দেশ। আমরা ব্যস্ত সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। পথে, মাঠে, শহীদ মিনারে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে রাস্তার মোড়ে নাটক করে বেড়াচ্ছি। আমি জুটেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সংস্কৃতি সংসদ-এ। প্রায় সারা বছর (১৯৬৯) মহড়া দিলাম রক্তকরবী নাটকের। মিলিটারীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত আমরা সে নাটক মঞ্চস্থ করলাম বাংলা একাডেমির মাঠে ১৯৭০-এর জানুয়ারিতে প্রায় দশ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে।
আম্মা নাটক পছন্দ করতেন। ছোটবেলায়ও দেখেছি। এবার রক্তকরবী দেখলেন। কড়া শীতের মধ্যে বাংলা একাডেমির মাঠে খুব মন দিয়ে দেখলেন। খুব পছন্দ হয়েছিল তাঁর। আমার বৃদ্ধ চরিত্রাভিনয় (অধ্যাপক) টাতেই কেবল আপত্তি ছিল আম্মার। বুড়ো কেন করলে? এর জবাবে হাসি ছাড়া আর কিছুই ছিল না আমার।
১৯৬৯-এর জানুয়ারি মাসের ৩১ তারিখ হয়েছিল নাটকটি।
এরকম একটা আনন্দঘন সময়ে দুঃসংবাদ এল— এক ভগ্নদূতের মাধ্যমে। দূত আর কেউ নয়, আমার মামাশ্বশুরের পুত্র খোকন, ভোর বেলা এসে হাজির। আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে বলল— বাইরে আসেন খবর আছে।
বাড়ির সামনের বারান্দায় দাঁড়ালাম দুজন।
— বল কি ব্যাপার।
—মনির ভাই মারা গেছেন!
চমকে উঠলাম।
—কে?
— মনির ভাই। (আমার মেজো দুলাভাই)
— কে বলল?
—খুলনা থেকে ভোর বেলা ফোন এসেছে।
ওদের বাসায় একটা ফোন ছিল তখন। ওদিকে আমার বোনের বাসায় ফোন তো ছিলই। দুলাভাই মনিরুজ্জামান এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে, প্রমোশন পেয়ে খুলনা অফিসের জিএম হয়ে এসেছিলেন।
খবরটা বাসায় ছড়িয়ে পড়লো মুহূর্তে। কান্নার রোল পড়ে গেল। মুশকিল হয়ে গেল আম্মাকে থামাতে। আমি আম্মাকে কোনোরকমে বুঝিয়ে খোকনের মোটর সাইকেলে বেরিয়ে গেলাম আমাদের WASA-র কাকরাইল অফিসে বন্ধুবর নিজাম সাহেবের বাসায়। খুলনায় ফোন করার জন্য।
রিং ঘোরাতেই বোনের মেজো দেওর মঞ্জুরের কণ্ঠ এল ভেসে।
রবি?
হ্যাঁ। কি হয়েছে?
শেষ দেখা দেখলে এসো, মনির ভাই নাই।
খবরের নিশ্চয়তা পাওয়া গেল।
আব্বার মৃত্যুর পরপরই আরেক আপনজন ছেড়ে গেলেন আমাদের।
খুলনায় যাব যে টিকিট তো নেই বিমানের। অফিস এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া গেল না। ব্যর্থ হয়ে যখন বাসায় ফিরলাম পাশের বাড়ির সহকর্মী মেজবাহ্ সাহেবের ছোটভাই সোহরাবের সাথে দেখা। সোহরাব সেই সময় একজন সুদর্শন চনমনে যুবক। পাইলট-এর ট্রেনিং করছিল। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরে বাংলদেশ বিমানে পাইলট হিসেবে যোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ কালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়। সমস্যা শুনে সোহরাবই দুটো টিকিট জোগাড় করে দিল প্লেনের, দুপুর বেলারই।
হুড়োহুড়ি করে আম্মাকে নিয়ে আমি ছুটে গেলাম তেজগাও বিমানবন্দরে। যশোরে নেমে খুলনা পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় বিকেল (যশোর এয়ারপোর্ট থেকে খুলনা শহরের রাস্তা তখনও খুব খারাপ ছিল)।
লাশ দাফন আমাদের অপেক্ষায় ছিল। পাঁচটার দিকে দাফন কার্য সম্পন্ন হলো, শেষ হলো দোয়া খায়ের করে।
মেজো দুলাভাই কোম্পানির সাথে কোনো কারণে ঝগড়াঝাটি করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পাটের ব্যবসা শুরু করেন। প্রখ্যাত ব্যবসায়ী আফিল উদ্দিন সাহেব এ ব্যাপারে তাঁর অন্যতম অনুপ্রেরণাদাতা ছিলেন বলে শুনেছি। শুনলাম, প্রসটেটের সমস্যা ছিল কিছুদিন ধরে। প্রস্রাবের পথে কিছু ব্যধি ধরা পড়ায় জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
খুলনার মত শহরে তখন এসব অপারেশনের তেমন কোনো ভালো ব্যবস্থা না থাকায় post operation টেবিল থেকে আর তাঁর ফেরা হয়নি। মাত্র ৪০ বৎসর বয়সে মৃত্যু হয় সুস্থসবল দুলাভাইয়ের।
মেজো আপা বিধবা হলেন মাত্র ৩৩ বছর বয়সে। ছয়টি ছেলে মেয়ে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। ব্রিটিশ কোম্পানির শান শওকত-এর মধ্যে দীর্ঘদিন জীবন যাপন করেছেন। হঠাৎ করে দুলাভাইয়ের চাকরি ছাড়ায় এবং পাটের ব্যবসায় নেমে মেলা টাকা লগ্নী আর-লস এরপর পথে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিল পরিবারটাকে।
ব্যাপারটা আম্মার এত কিছু জানা ছিল না। দুলাভাই-এর দাফন কাজ শেষ হওয়ার পর বাড়ির সবার সাথে পারিবারিক মিটিং-এ বসে অনেক কিছুই জানতে পারেন। আর তখনই তাঁর শঙ্কা দেখা দেয় মেয়ের ভবিষ্যত জীবন নিয়ে। ইলার এবার কী হবে! দুলাভাইয়ের আব্বা-আম্মা এবং তিন জন দেওর যাঁরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন দুলাভাই-এরই ছত্রছায়ায়, সবার এক কথা— তাঁরাই এ সংসারের দেখাশোনা করবেন।
এমন আশ্বাসে তো আম্মার মন ভরে না। কিছুদিন আগে তিনি বিধবা হয়েছেন, বৈধব্যের যন্ত্রণা তাঁর ইতিমধ্যে বোঝা হয়ে গেছে— তাও তিনি তো অকুল পাথারে পড়েননি— কিন্তু মেজো আপাদের বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদিও তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি এবং দেওররা অসাধারণ মনের মানুষ এক একজন-হঠাৎই আম্মার মাথায় কিছু একটা ঝলক দিয়ে ওঠে তখন।
সভাস্থলে হঠাৎ করেই আম্মা একটা প্রস্তাব দিয়ে বসলেন সবার সামনে। দুলাভাই-এর ছোট দুই ভাইয়ের স্ত্রীরা, বড় বোন, দুলাভাই, ফুপু এবং আরও কিছু আত্মীয়স্বজন, ঢাকার ও খুলনার সবাই ছিলেন উপস্থিত। মানসিক ভাবে সবারই মনের অবস্থা একই রকম। আম্মার কথায় কান খাড়া করলেন।
কাঁদতে কাঁদতেই আম্মা বলেছিলেন আপনারা সবাইতো ইলার মঙ্গল চান, আমি একটা কথা বলতে চাই, যাতে আপনাদের মতামতটা জানতে চাই। আম্মা খুবই অন্তর্মুখী মানুষ ছিলেন। তারপরও ওই সময়ে এমন একটা প্রস্তাব কী করে দিলেন, অবাক লাগে আমার। তিনি এমন আত্মকেন্দ্রিক মানুষ, কোনোদিন আম্মার মুখ তুলে কথা বলতে দেখিনি। আব্বার সাথে বাড়াবাড়িটা যখন হতো, তখনও কাজ করতে করতে অন্য দিকে তাকিয়েই হতো।
সেদিন আম্মা কীভাবে কি করে বলেছিলেন— আমি দেখিনি, শুনেছি মেজো আপাদেরই বন্ধু স্থানীয় খুলনাবাসি হাসিআপার কাছে।
দুলামিঞা এভাবে চলে যাবেন, আমি কল্পনাও করতে পারি না। এখন যত চেষ্টাই করি না কেন, এই দুটো সুন্দর পরিবার ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে-তার চেয়ে এটা কি ভালো হয় না-যদি আমরা রবি আর শিরির (দুলাভাই-এর ছোট বোন) বিয়েটা দিয়ে দেই। সম্পর্কটা থাক আমাদের।
পারিবারিক সভা কিছুক্ষণের জন্যে স্তব্ধ হয়ে গেল— হয়তো বা কয়েক সেকেন্ড, আমি জানি না। আমি জানি না আম্মা কি বলেছিলেন— হয়তো এই কথাগুলোই তাঁর নিজের মত করে বলেছিলেন। হয়তো গুছিয়ে বলা হয়নি— কিন্তু আসল কথাটা প্রকাশ হয়েছিল স্পষ্ট হয়েই। এই যে স্তব্ধতা, তারও একটা বিশেষত্ব ছিল সেই সময়। শিরী আমার দুলাভাইয়ের ছোট বোন। খুলনার বয়রা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছিল তখন। তার সাথে আমার পরিচয় তো শৈশব থেকেই। তারপর কোনো এক সময় চলে এসেছি একে অপরের হৃদয়ের একেবারে কাছে। সেটা দুই পরিবারের গোচরে আসতে দেরি হয়নি খুব একটা। ধরা পড়েছিলাম বড় দুলাভাই-এর কাছে-আর খবরটা রয়টারের মত রকেট স্পীডে দুই পরিবারের কাছে পৌঁছতে লাগেনি সময়।
তখন থেকে দুই পরিবারের মাঝে চলছিল একটা টানাপোড়েন। সেটাও বছর খানেক আগের ঘটনা। তারপর মুখোমুখি হয়নি পরিবার দু’টি। চাপা একটা (কোল্ডওয়ারের মত ক্ষোভ-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন দু’পরিবারের বাবা মা।
আমার আব্বা ঘটনাটা শুনে চুপ ছিলেন। ভাল মন্দ কোনো মন্তব্য করেননি কখনো। যা বলার আম্মাই বলেছিলেন। এখানে তিনি কিছুতেই বিয়ে দেবেন না ছেলের। মুর্শিদাবাদের কোন এক দুরসম্পর্কের ভাই, তাঁর মেয়েকে নেবেন, সাথে বাড়ি জমি, নগদ টাকা ইত্যাদি। তাঁর ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, এত শস্তা নয়। একরকম কথাবার্তাও নাকি আম্মা বলতেন— শুনেছি বোনদের কাছ থেকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো-আব্বা, আম্মা কেউ কোনোদিন আমাকে এ ব্যাপারে একটা কথাও বলেননি। মমতাজ, পুতুল ছিল আমার রয়টার। ওরা খুব চাইতো শিরিকে ভাবি করতে-ওদের সাথে ভাবও ছিল দারুণ যা আজও অটুট।
মমতাজ ছিল শিরির প্রাণের বন্ধু, তার মাধ্যমে চলতো আমাদের খবরাখবর লেনদেন ইত্যাদি। পুতুলও তার ভীষণ ভক্ত তখন থেকেই।
ওদিকের খবর প্রায়ই একই রকম। আমার বোনের শ্বশুর আব্দুস সালাম, আমার আব্বার নামে নাম। আজীবন স্কুল শিক্ষক, নীতিবান মানুষ একজন। তিনিও শুনেছি আমাদের ব্যাপারটা নিয়ে হাঁ, না, কিছুই স্পষ্ট করেননি। কিন্তু শ্বাশুড়ি মোহিতুন নিসা ছিলেন কঠিন— তিনি কখনও এ সম্পর্ক মেনে নেবেন না বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে তো কী হয়েছে— বাড়িঘর ভিটেমাটি নেই, মেয়েকে কি জলে ফেলবেন! তাছাড়া-একই ঘরে দুটো সম্পর্ক তিনি করবেন না।
শিরির মেজো ভাই মাসুদুর রহমানের মতামত জানতে পারিনি। সেজো ভাই মঞ্জুরুর রহমান আমার বন্ধু ছোট বেলা থেকেই। সে নিরপেক্ষ, আর এক ভাই মখলেস (মখলু) সেও আমার খুব ঘনিষ্ঠ— নিরপেক্ষ। বড় বোনের মতামত খুব একটা গোনার মধ্যে ছিল না।
এরকম পরিবেশ পরিস্থিতিতে দুলাভাই হঠাৎ করেই চলে যাওয়ায় ঘটনাক্রমে পরিবর্তন কতটা হতে পারে কে জানে। আম্মা প্রস্তাবটা টেবিলে দিয়েই চুপচাপ দেখছেন সবাইকে। মনোভাব বুঝবার চেষ্টা করছেন সবার। এর পরবর্তী ঘটনা আমার জানা নেই, কারণ আমি তখন আপার বাসার বাইরের বারান্দায় বসে ছিলাম।
হাসি আপার মাধ্যমে খবর এল আমার কাছে—
—এখানে বসে রয়েছেন, আর ওদিকে যে আপনার হয়ে গেল!
— জী?
—যান, ভেতরে ডাকছে আপনাকে।
কিছু না বুঝে ভেতরে গেলাম। সবাই আমার অপেক্ষায় তখন (আসলে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে এর মধ্যে)।
আব্দুস সালাম সাহেব বললেন—
বস। তোমার দুলাভাইয়ের অকাল মৃত্যুতে আমাদের দুটো পরিবারের মধ্যে বিশাল এক ধাক্কা এসেছে। এমন কিছু আমরা ভাবতেও পারিনি কখনো। আমরা দুই পরিবারের সম্পর্কটা রাখতে চাই আগের মত। তোমার আম্মার প্রস্তাব আমরা সবাই একবাক্যে মেনে নিয়েছি।
আমি চুপ করে শুনে গেলাম। হ্যাঁ, না বলার নেই কিছু।
এরপর বিয়ের কথাটা বললেন— তিন তারিখে মনিরের কুলখানি হবে। ৪ তারিখ বাদ মাগরিব আমরা তোমাদের বিবাহটা সেরে ফেলতে চাই। এখন শুধু আকদ্ হবে। বিবাহের দিন পরে ধার্য করা হবে-ইত্যাদি।
বিয়েটা হয়ে গেল ০৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭০ সন্ধ্যায়। খুলনার ময়লাপোতায়। আমার মেজোআপার বাসায়।
অভাবনীয় ঘটনা এই বিয়েটা। দুটো পরিবারের টানাপোড়েন সরে গিয়ে সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হলো সম্পর্কটা। কেটে গেল ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা। কিন্তু একটি জীবনের বিনিময়ে। দুলাভাই আমার অতি প্রিয় মানুষ ছিলেন— শিরী ছোটবেলা থেকে মানুষ হয়েছে আমার ওই বোন-দুলাভাইদের পরিবারের কাছে। তাঁর মৃত্যু আমাদের কাছে হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা অবশ্য। আর আম্মার কথা তো বলেছিই, মেজো মেয়ের বৈধব্যের যন্ত্রণা নিজ হৃদয়ে ধারণ করে যেন একদিনেই অনেক বেশি বার্ধক্যের গহ্বরে পতিত হলেন।
জীবন থেমে থাকে না। আমরাও চলতি পথের পথিক হলাম মুহূর্তের থমকে যাওয়ার ঘটনার পর। ফেরৎ টিকিট পাওয়া গেল একটা, অফিস ধরতে হবে আমাকে। সুতরাং একটি আবেগঘন চুম্বনসহ আলিঙ্গন শেষে বিয়ের পরদিনই বিদায় নিলাম শিরির কাছ থেকে। সুযোগ করে দিয়েছিলেন বড় আপা তাঁর বাসায়।
যশোর এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে গেল শিরী। ঢাকা পৌঁছে ছোট দুই বোনকে খবরটা দিতেই মুখ ভারী হয়ে গেল তাদের। ওদের অনুপস্থিতিতে আমি কী করে বিয়ে করলাম, এই রাগে কদিন কথাই বলল না আমার সাথে। ওরা দু’জনই আসলে মনে মনে খুশি হয়েছিল ভীষণ। কারণ ওরা শিরিকে পছন্দ করতো ভীষণ।
আমার শ্বশুরকুল ৫ জুলাই ১৯৭০ খুলনার ময়লাপোতার বাসায় বেশ জাঁকজমকপূর্ণ এক অনুষ্ঠান করে কন্যার্পণ করলেন আমার হস্তে। সেই রাতেই বৌকে নিয়ে তুললাম খালিসপুরে টেলিফোন কোম্পানীর এক এলাকায়, যার প্রকল্প প্রকৌশলী ছিল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওয়ালিউল ইসলাম। ওখানেই হলো ফুলশয্যা। পরদিন রকেটে চড়ে ঢাকায়।
শুরু হলো নতুন জীবন। আমার আম্মারও নতুন অভিজ্ঞতা। দুই মেয়ে, শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়েছেন কিন্তু এবার একটা অন্যবাড়ির মেয়েকে আনলেন বৌ করে। বৌ শ্বাশুড়ি দু’জনই দুজনের কাছে খুবই পরিচিত কিন্তু নতুন চিত্র চিত্রায়নে তাঁরা কেমন করেন সেটাই ছিল দেখার ব্যাপার। দুজনের জন্যেই ছিল জটিল পরীক্ষা। শিরী সেই ছোট্টবেলা থেকে বড় ভাই ব্রিটিশ কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার, তার বাড়িতে বিত্ত-বৈভবের মাঝে বড় হয়েছে, ভাই ভাবীর সাথে নিয়মিতই খুলনা ক্লাবে যেত বিধায় সেই সংস্কৃতিরও এক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তরুণী। কুটোটি পর্যন্ত কোনোদিন ভেঙ্গে খেতে হয়নি। এসে পড়লো এক নেহায়েতই মধ্যবিত্ত প্রকৌশলীর পরিবারে। সমাজে যার স্থান উঁচুতেই কিন্তু বিত্তবৈভবে নিদারুণ দরিদ্র।
কিন্তু না, কোনো দ্বন্দ্ব হয়নি দু’জনের। মানিয়ে নিয়েছিল সুন্দরভাবে দুপক্ষই। মনে পড়ে শিরী প্রথম সপ্তাহেই ঢুকে পড়েছিল হেঁসেলে— আর সঙ্গে সঙ্গে তার ননদিনীরা হৈ হৈ করে উঠেছিল উদ্বেগে— তাতেও দমেনি শিরী, এক সময়ে সংসারের হালটা ঠিকই ধরেছিল।
বয়ে চলছে সময়। দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা টগবগ করে ফুটছে। একদিকে ছ’দফার আন্দোলন, আবার বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্রের কেস থেকে মুক্ত করার আন্দোলন-সেইভাবে চলছিল আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ওই যে বলেছি, সংস্কৃতি সংসদের সাথে আমি তখন ওতপ্রোতো জড়িত। ওদের প্রতিটি নাটকেই আমি থাকতাম, সাথে থাকতেন ইনামুল হক, গোলাম রাব্বানী প্রমুখ। আমাদের নাটক হতো শহীদ মিনারে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে, মাঠে, টিএসসিতে। ট্রাকেও মঞ্চায়ন করেছি আমরা। সেই সময় আমি ‘আমরা ক’জনা’ এবং সৃজনী লেখক ও শিল্পী গোষ্ঠির’র সাথেও সংযুক্ত ছিলাম তাদের ক্রিয়াকর্মে।
দেশে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। আইয়ুব খান গেল, এল ইয়াহিয়া খান। তারপর নির্বাচনে আওয়ামী লিগের অভূতপূর্ব জয়। পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ জয় আর পশ্চিম পাকিস্তানেও কয়েকটি আসন। এবার সবাই নিশ্চিত হলো শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হবেন। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্ৰী।
মনে পড়ে সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে এক ঘূর্নিঝড় হলো, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এলেন ক্ষয়ক্ষতি দেখতে— ফিরে যাবার সময় তেজগাঁ এয়ারপোর্টে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন— শেখ মুজিব Is your next prime minister— কিন্তু তারপর হলো ষড়যন্ত্র। মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে না দেয়ার ষড়যন্ত্র। ধুয়া তুললেন প্রধান ষড়যন্ত্রকারী জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি দাবি করে বসলেন শেখ মুজিবের দল পূর্ব পাকিস্তানে মেজরিটি আসন পেয়েছে, আমার দল পিপিপিও পশ্চিম পাকিস্তানে মেজরিটি দল। সুতরাং সে হবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আর আমি হবো পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। একেবারে মামাবাড়ির আব্দার আর কি। আগুন জ্বলা শুরু হলো দেশে।
ইয়াহিয়া ভুট্টোর দলে ভিড়লেন-শুরু হলো নানা রকম ষড়যন্ত্র যাতে বাঙালী মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে না পারে। শেখ সাহেবকে এর মধ্যে আন্দোলনের ফলে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হলো কিন্তু পার্লামেন্টে যাতে শেখ সাহেবের দল বসতে না পারে— তাই হঠাৎ করে পার্লামেন্ট শুরুর তারিখ বাতিল করা হলো। ধিকিধিকি যে আগুন জ্বলছিল তা ভীষণ রকমভাবে জ্বলে উঠলো। সারা দেশের মানুষ নেমে পড়লো আন্দোলনে। ইয়াহিয়া এলো, ভুট্টো এলো-শেখ সাহেবের সাথে আলোচনা করতে। শেখ সাহেব দেশের অসহযোগ ঘোষণা করায় তারা ছুটে এলো। ততদিনে এদেশের প্রশাসন চলতে শুরু করেছে শেখ মুজিবের নির্দেশে।
চলছে আলোচনা, সে সময় আন্দোলনও চলছে প্রচণ্ড আক্রোশে পাকিস্তানি প্রশাসনের বিরুদ্ধে। আমরাও সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। ২৩ মার্চ ১৯৭১ আমরা শহীদ মিনার এবং আরও কয়েকটি স্থানে মঞ্চস্থ করবো নাটক ‘রক্ত দিলাম স্বাধীনতার জন্য।” তার রিহার্সাল দিচ্ছিলাম। নির্দেশনায় ছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম, আমার একটু টেনশন চলছিল— প্রতিদিনকার নানান উত্তেজক খবরে— কারণ শিরী তখন অন্তসত্বা। এপ্রিলের শেষে তার ডেট। আম্মাই তার ব্যাপারে সব রকম দায় দায়িত্ব নিয়ে রেখেছেন— তবে শিরীএকাই একশ, সে নিজের সব ব্যবস্থা নিয়মমতই গ্রহণ করছিল।
এইসময় আমি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লাম। নাক দিয়ে প্রচণ্ড রক্তপাত শুরু হলো, কোনো কারণ ছাড়া। হোমিও ডাক্তার ছিল, তাঁর পরামর্শে ওষুধ খেলাম। হাসান ভাই বললেন ঠিক হয়ে যাবে, চালাও রিহার্সাল। চললো রিহার্সাল।
কিন্তু আমার নাকের রক্তপাত বন্ধ হলো না। বাড়ির পাশে একজন ডাক্তার ছিলেন। সরকারি চাকুরে— তার পরামর্শে ওষুধ খেলাম। দু’দিন বন্ধ থেকে আবার যে কে সেই। এবার রক্তপাতের ধারা প্রচণ্ড রকম বেড়ে গেল। হাসান ভাই শঙ্কিত, বললেন— হায়াত এবার না হয় তুমি না করলে, অন্য কাউকে নেই।
বড্ড মন খারাপ করে সম্মতি দিয়েছিলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে সেই নাটকটি ২৩ মার্চ ৭১ মঞ্চায়িত হয়েছিল যথা সময়ে আমাকে বাদ দিয়েই। রক্ত যখন বন্ধই হয় না, গেলাম FRCS specialist চিকিৎসকের দ্বারে।
আরে এতো কিছুই না, আজই ভাল হয়ে যাবে।
তাঁর ওষুধ খেলাম কদিন। লাভ হলো না কোনো। আমার শরীরের রক্ত কমে তখন আমি প্রায় নিস্তেজ হয়ে গেছি অনেকটা। মানসিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়েছি অনেকটা। তখন এসব রক্ত পড়তে দিতাম না নীচে, ব্লিডিং শুরু হতেই চিৎ হয়ে শুয়ে গিলে ফেলতাম রক্ত। এটাও দারুণ ভুল ছিল আমার। আমার পেটের সমস্ত কলকারখানা এই রক্তের কারণে অচল হয়ে উঠলো, আমি মৃত প্রায়। স্পেশালিস্ট ডাক্তারকে খবর দেয়া হলো— তিনি বললেন আসবার সময় নেই তাঁর। আমাকে যেন ঠিকমতো ওষুধগুলো খাওয়ানো হয়।
সারা দেশ তখন উত্তাল। মানুষ ক্ষুব্ধ পশ্চিমাদের বিশ্বাসঘাতকতায়। দেশপ্রেম সকল মানুষকে এক করে ফেললো। অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের ডাকে আজ কিছু একটা করে ফেলবে বাঙালী। হয় ইসপার নয় উসপার। এমনই একটা সময়ে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলো। তার আগেই উঠে গেল শিরীর প্রসব বেদনা। টেনশনে ডেলিভারী পেইন। বেচারা এতদিন নীরবে আমার সেবা করছিল, ভেতরের টেনশনের চাপে আর পারলো না, শেষ মুহূর্তে নিজেই কাবু হয়ে পড়লো। ওর এক মামাতো ভাই খোকন শেষের দিকে আমার শুশ্রুষা করতো। সে-ই গিয়ে শিরীকে হলি ফ্যামিলিতে ভর্তি করালো— ওখানেই ও চেকআপে থাকতো প্রেগনেন্সিকালে।
সেদিনই শুরু হলো আমার ক্রমাগত রক্ত পায়খানা। এবং রক্তবমি। নাকের রক্ত তো বন্ধই হয়নি।
মৃতের মত পড়ে আমি বিছানায়। মনে হচ্ছে দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি শুনছি—
আমার জানালায় টোকা পড়লো। সাড়া দেবার মত শক্তি ছিল না শরীরে। নিঃশেষ প্রাণশক্তি আমার।
রবি ভাই, রবি ভাই।
দু’তিনবার ডাক শুনে মাথাটা জানালার দিকে ফেরালাম।
দেখি জানালার গ্রীলের বাইরে খোকনের মুখ। হাসি মুখ তার। কনগ্রাচুলেশন। শিরীণের মেয়ে হয়েছে।
খোকন শিরীকে শিরীণ বলে ডাকতো।
আলহামদুলিল্লাহ বলার মতো ক্ষমতা তখন আমার নেই। ভেতরে ভেতরে সৃষ্টিকর্তার শোকর গুজার করলাম। শুধু দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা জল। আল্লাহ আমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করেছেন। মেয়ে হয়েছে আমাদের।
আমি বাবা হয়েছি— চিৎকার দেয়াটা হলো না, উল্টে জ্ঞান হারালাম।
পরে জেনেছি, খোকন রাতে আমার কাছেই ছিল, ভোরে বেরিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিল শিরীর খবর নিতে। দেখে এসেছে আমাদের মেয়েকে। ভোর একটা বাজার কয়েক মিনিট পরেই ওর জন্ম হলো।
আমাদের বড় মেয়ে বিপাশার জন্ম ১৯৭১’এর ২৩শে মার্চ ভোর ১.১৭ মিনিটে।
মালিবাগ থেকে মেডিকেল কলেজ যাবার পথে একবার জ্ঞান ফিরেছিল— আশ্চর্য, চোখ খুলে দেখি (আমি গাড়িতে কারো কোলে শায়িত) মৌচাক মার্কেটের ছাদে ওই নাটকটি মঞ্চায়ন হচ্ছে! সত্যি আশ্চর্য, ৫টি স্থান নির্দিষ্ট ছিল আমাদের নাটকের। মৌচাক মার্কেট (এক তলা ছিল তখন) তার একটি। মনের কষ্টটা আর বর্ণনীয় নয়-আবার জ্ঞান হারিয়েছি। শেষবার আবার যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখি আমি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বেডে। একজন ডাক্তার আমার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আমাকে পরীক্ষা করছেন। শুনলাম তিনি বললেন— It is a lost case’
আর কিছু জানি না। ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮ আমি এ জগতের বাইরে ছিলাম। কোমায় আমি। শুনেছি আমার মা এবং শ্বাশুড়ি আমার বেডের দুই পাশে জায়নামাজ নিয়ে বসেছিলেন আমার রোগ মুক্তির প্রার্থনায়। তাদের দোয়ায় আল্লাহ অশেষ রহমতে জ্ঞান ফিরলো ২৭ তারিখে দুপুর বেলায়। চোখ মেলে শুধু খোকনকে দেখলাম মাথার কাছে বসা। আর কিছুই জানি না। না ডাক্তার, না নার্স, না রোগী, কেউ নেই, আমি একলা। পুরোপুরি জ্ঞান ফিরলো ২৯ তারিখ। এই ক’দিনে দেশে কী হয়েছে আমি কিছুই জানি না। কেউ আমাকে পরিস্কার করে কিছু বলেও না। ২৯ মার্চ আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো গোপীবাগ মামা শ্বশুরের বাড়ি। সেখানেই শুনলাম ২৫ শে মার্চের ক্র্যাকডাউনের এর কথা। চিন্তিত হয়ে গেলাম আমার বাসার খবরের জন্যে। তাদের খবর পেলাম, শিরীরও খবর পেলাম। সবাই সুস্থ এবং নিরাপদে আছে। জানলাম আম্মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন-যেহেতু আমি এবং শিরী দুজনেই হাসপাতালে আছি— নিশ্চয় নিরাপদে থাকবো-সুতরাং তিনি আমার বোন, ভাগনা ভাগ্নিদের নিয়ে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বেরাইদে আমার শ্বশুর বাড়িতে আশ্রয় নেবেন। বেরাইদ যাওয়ার কোনো গাড়ি চলার পথ নেই। হয় নৌকায় যেতে হবে নয়তো হেঁটে জমির আল দিয়ে। বর্ষা মৌসুমে নৌকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। আম্মা ওদের নিয়ে হাঁটা পথে রওয়ানা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন-রামপুরা দিয়ে ধান খেতে নেমে একেবারে কোনাকুনি পথ বেরাইদ। আজ তো আমেরিকান এমব্যাসির মোড় থেকে গাড়ি নিয়ে ৫ মিনিটে বাড়ির দরজায় নামতে পারি।
ওদিকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল রাতে গোলাগুলি শুরু হওয়ার পরই মেটার্নিটিতে সব বাচ্চা ওয়ার্ডে নিয়ে মায়েদের কাছে দিয়ে দিয়েছিল এবং বেশি গোলাগুলি হলে কী করতে হবে মোটামুটি বুঝিয়েও দিয়েছিল। শিরী সারারাত বেডের নীচে বাচ্চা আকড়ে শুয়েছিল। সারাদিনও তাই। ২৭ তারিখে সকালে সাময়িকভাবে কারফিউ উঠালে সে নিজ দায়িত্বে রিলিজ নিয়ে ১৫ টাকায় এক রিকশা ভাড়া করে (স্বাভাবিক রিকসা ভাড়া ছিল ১০ আনা) সোজা বাসায় চলে আসে বাচ্চা নিয়ে। রাস্তাঘাটে কেবল মিলিটারি। লোকজন নেই বললেই চলে, ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে সে এই কাজটি করলো।
এইবার ঘটলো নাটকীয় ঘটনা। শিরী রিকশা থেকে নামলো আর সেই মুহূর্তে আম্মা তাঁর দলবল নিয়ে বের হলেন দরজা খুলে বেরাইদ যাবার জন্য। এরপর কান্নকাটি চলল কিছুক্ষণ। তারপর সবাই ৫-৬ মাইল রাস্তা পায়ে হেটে চলে গেলেন বেরাইদ। ৪ দিনের বাচ্চাটাকে এ কোল ও কোল করে নিয়ে যাওয়া হলো। পথে গ্রামের মানুষরা অনেক অনেক সাহায্য সহযোগিতা করেছিল তাদের।
আমি রোগী মানুষ, উঠতে বসতে চলতে অক্ষম। আমাকে ২৯ তারিখেই নৌকায় করে বেরাইদ নেয়া হলো; মাইক্রোবাসে করে রামপুরা ঘাট। ওখানে একটা ভাঙ্গা সেতু ছিল, আর তার নীচেই ছিল নৌকার ঘাট। বিশ্বরোড তখন হয়নি। ঘাটে মিলিটারি দাঁড়িয়ে। সে ধরলো আমাদের, কোথায় যাও। এটা কে?
আমার মামা শ্বশুর খুবই রসিক এবং মিশুকে মানুষ ছিলেন। চোস্ত উর্দুতে বোঝালেন, তাঁর জামাই যাচ্ছে। ভীষণ নাজুক রোগী। তাকে গ্রামে নিয়ে যাচ্ছি হাওয়া বদলের জন্য।
অনুমতি মিললো যাওয়ার।
নৌকায় উঠেই মামার চোখে পড়লো নৌকার গুলই-এ বিরাট করে রং দিয়ে লেখা ‘জয় বাংলা’। গলুইটা কাঠ দিয়ে বাকসর মত তৈরি। তারই এক পাশটায় লেখাটা। বড় বড় লেখা, যাতে দেখা যায় বহু দূর থেকে।
চল বাবা, তাড়াতাড়ি এখান থেকে বেরো, নইলে কখন কি মর্জি হয় ব্যাটার।
মামা তাড়া দিলেন মাঝিকে।
চললাম নৌকায় করে শ্বশুরবাড়ি। সেখানে দেখা হবে আমার প্রথম সন্তানের সাথে— এটাই ছিল আমার মনের প্রতি মুহূর্তের স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা, যাই বলি। মনের সে অবস্থাটা এখন আমার বোঝানো অসম্ভব।
আমার মামা শ্বশুর হাফিজুদ্দিন সাহেব (খোকনের আব্বা) বলেছি না মিশুকে মানুষ। অতি সহজ সরল। কথা বলতে পছন্দ করতেন খুব। আমাকে স্নেহ করতেন ভীষণ রকম। আমরা সবাই পছন্দ করতাম তাঁকে। সারা পথ তিনি আমাকে ভীষণ ভাবে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করলেন নানান কথা বলে। আমার চিকিৎসা হয়েছে ২৩ বা ২৪ তারিখে। করেছেন ডা: রাব্বি (যাকে পাকিস্তানি সেনারা মেরে ফেলে) পেটের সমস্ত রক্ত বের করতে সময় লেগেছে বেশি। নাকের রক্ত বন্ধ করতে বেশি সময় লাগেনি। পেটের ভেতর আলসারেরও রক্তক্ষরণ হয়েছিল। যদিও বন্ধ হয়েছে। কিন্তু আর কিছু করার সময় পাওয়া যায়নি। কারণ মিলিটারি এ্যাকশন নেবে— এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালও খালি হয়ে যায়-রোগী, ডাক্তার, নার্স প্রায় সবাই চলে যায়। আমার মত মরণাপন্ন রোগীরাই পড়েছিল-আর খোকন ছিল আমার সাথে সারাক্ষণ— আমি তো কোমায়।
আরও কত গল্প কথা শোনালেন মামা। নৌকায় চলার সময় মেরাদিয়া, ত্রিমোহনী, বালু নদীর দুই পাড়ের মানুষ নৌকা দেখেই চিৎকার করে ডাক দিয়ে ঢাকার কথা জানতে চায়। মামাই তাদের কথার উত্তর দেন। হ্যাঁ আমাদের সাথে সেদিন নৌকায় ছিলেন মামী শ্বাশুড়ি এবং তাঁদের এক কন্যা ময়না। আমার স্ত্রীর সমসাময়িক মামাতো বোন।
ডাক্তারি পাশ করে বন্ধু ডাক্তার মুস্তাফিজুর রহমানকে বিয়ে করে দুজনেই আজ অবধি ইংল্যান্ডে বসবাস করছেন। মামার অন্য দুই কন্যা ও দুই পুত্র আগেই চলে গেছেন বেরাইদ। সেখান থেকে তাঁরা পুবাইলে আমার নানা শ্বশুরের বাড়িতে যাবেন এই আশায়। রামপুরা খাল দিয়ে নৌকা চলেছে। নৌপথে খাল দিয়ে রামপুরা থেকে বেরাইদ প্রায় চার ঘণ্টার পথ। বহু পুরোন আমলের খাল। দুই ধারে ফসলের খেত। স্থানে স্থানে কেঁচি জাল ফেলা থাকে জেলেদের, আজ সেগুলো দেখা যাচ্ছে না। মেরাদিয়ায় খালের পাড়ে মানুষ জমেছে নৌকা দেখেই চিৎকার করে জানতে চায়-
ঢাকার খবর কি গো?
কারফিউ ছুটছে।
মাঝিই উত্তর দেন।
মিলিটারি তখনও গ্রামের দিকে যায়নি-ওরা ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতেই ব্যস্ত। মাঝে মধ্যে গোলাগুলির যে দুচারটা আওয়াজ আসছে না তা নয়। আওয়াজ পেলেই দু’পাড়ের মানুষগুলো হৈ হৈ করে ওঠে। ঢাকার বেশিরভাগ মানুষ তখন সব আশেপাশের গ্রামে কিংবা কেউবা আরও দূরে চলে গেছে দু-তিন দিনের মধ্যে। কেউ বা বর্ডার পার।
খালের পানি পরিষ্কার। কিন্তু কম পানি, বর্ষায় ভরপুরই থাকে। দু’পাশে নলখাগড়ার বন। পানিতে স্রোতের সাথে ভেসে যাচ্ছে কচুরিপানা। রোদ বেশ চড়া ছিল সেদিন, আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। মেরাদিয়া, কয়েতপাড়া ত্রিমোহনী পার হয়ে এক সময় গিয়ে পড়লাম বালু নদীতে। ডেমরার দিক থেকে ভেসে আসছে সারি সারি নৌকা। নানান সাইজের। তাদের মধ্যে এ ক’দিনের ঘটনা নিয়ে কথা বার্তা চলছে। কোথায় কত মানুষ মেরেছে, কোথায় গ্রাম পুড়িয়েছে, কোথায় দোকান পাট জ্বালিয়েছে নানান খবর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়েছে দিকে দিকে। শহীদ মিনার উড়িয়ে দিয়েছে, আমি কোমায় পড়েছিলাম তাই মেডিকেলের বেডে শুয়েও কিছু বুঝিনি। জানিনি।
বালু নদী সবসময়ই ব্যস্ত জলপথ। বেরাইদ একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। সুলতানী আমলের মসজিদ আছে সেখানে। এখানকার মানুষেরা আর্থিক ভাবে যথেষ্ট স্বচ্ছল। বেশিরভাগই ব্যবসায়ী। গরুর চামড়ার ব্যাপারির সংখ্যা প্রচুর। নদীর পাড়ে খুবই ব্যস্তসমস্ত হাট বসে প্রতি সপ্তায়। অতি নিকটে ইসাপুরা (ইউসুফগঞ্জ), সেটা একটা গঞ্জ। ব্যস্ত ব্যবসা কেন্দ্র। আরও সামনে গেলে টঙ্গি। আর কিছু গেলে পুবাইল শহর।
মামা নানান গল্প বলে আমাদের মন ভাল রাখার চেষ্টায় আছেন। তাঁর চাকরি জীবনের কত কাহিনি শোনালেন এই অবসরে-মিলিটারিদের গল্পও কম শোনাননি। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন এই মানুষটি। পরবর্তীতে তাঁকে আরও অনেক কাছে থেকে দেখেছিলাম, জেনেছিলাম। বালু নদে এসে নৌকার গতি বেড়ে গেল, কারণ এখানে এসে মাঝি পাল তুলে চলতে দিল নৌকাকে তরতরিয়ে। ছুটে চলেছে নৌকা, শুশুকগুলো নৌকার সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। ডুবছে, উঠছে, ডুবছে। কী অসাধারণ দৃশ্য।
প্রায় চার ঘণ্টা পর পৌঁছালাম বেরাইদ। বর্ষকালে এই পথ এক ঘণ্টায় পার হওয়া যায়। তখন তো খাল বা নদীতে যেতে হয় না। বর্ষার পানি চতুর্দিকে থৈ থৈ করে। মাঠ ঘাটের ওপর দিয়ে কোনাকুনি পথে ছোটে নৌকা। মাঝিকে মামা নির্দেশ দিলেন-বাজারের ঘাটে না গিয়ে বাড়ির ঘাটে যেতে।
ওই খানে তো দামে ভরা।
দাম মানে কচুরিপানা।
উপায় নাই, রোগী আছে না। উঠবো কি করে?
অতপর বাড়ির ঘাটে গেল নৌকা। বর্ষায় নৌকা উঠানে ভিড়তো-এখন পানি উঠান থেকে প্রায় পনেরো-কুড়ি ফুট নিচে। অনেক কষ্টে কচুরিপানা ঠেলে নৌকা ঘাটে পৌঁছালো। ঢাকার প্রচুর মানুষ এখন বেরাইদে। ওই রাতেই এসেছে বেশিরভাগ মানুষ। নৌকাটা আসবার খবর পৌঁছাতেই হৈহৈ করে সব নিচে নেমে আসলো। অনেকে পানিতে নেমে নৌকা টেনে ঘাটে ভিড়ালো।
চতুর্দিকে একই আওয়াজ। জামাই আসছে, মাস্টারের জামাই আসছে। হুলস্থুল লেগে গেল যেন। এই ফাঁকে আমার শ্বশুর আব্দুস সালাম সম্পর্কে দুটো কথা বলে রাখি। পরে একটু বিস্তারিত জানাতে চাই। এঁরাও ব্যাপারি গোষ্ঠিরই। বৈরাইদ একটা দ্বীপ। কোনো এককালে কিছু মানুষ এসে এখান মাটি ফেলে টেক (দ্বীপ) বানিয়ে বসবাস শুরু করে। এরা সবাই ব্যবসায়ী ছিল। সেই সুলতানী আমলের একটি মসজিদ এখনো কালের সাক্ষী হয়ে এই গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে।
কয়েকশ বছর ধরে গ্রামটি ঢাকার অতি নিকটে হয়েও বেশ দূরে রয়ে গেছে, শুধু একটি রাস্তার অভাবে। সেই অভাব দূর হয়েছে মাত্র দশক পূর্বে। সময়ের গতির সাথে মানুষের আগমন ঘটেছে প্রচুর, এবং ঢাকার আশেপাশের সব চেয়ে জনবহুল এলাকায় পরিণত হয়েছে এক সময়।
সামেদ ব্যাপারি এমনই একটি মানুষ যাঁর পূর্বপুরুষ পত্তন গেঁড়েছিলেন এখানে। বেশ বড়সড় পাকা দালানও তুলেছিলেন ভবিষ্যৎ বংশধরদের কল্যাণে, যা এখনো ভাঙাচোরা অবস্থায় (একেবারে অবাসযোগ্য নয়) দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই সামেদ ব্যাপারির দুই পুত্রের বড়জন ছিলেন ডানপিটে এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রবণ। ছোট ভাই লেখাপড়া না করলেও তিনি ম্যাট্রিক পাশ করে ঢাকা কলেজ ভর্তি হন Intermediate এ। তারপর অন্য কাহিনি। Isc পরীক্ষার ফরম ফিলআপের টাকা নিয়ে চলে যান বোম্বে ফিল্ম জগতে প্রবেশের জন্যে। সে কঠিন জগতের দুয়ার পর্যন্তও পৌঁছান হয় নাই, বরং হাতে টাকা ফুরিয়ে এলে জাহাজের খালাসির কাজ নিয়ে এক সময় কলকাতায় থিতু হন। তারপর কিছু নাটক দেখেন সেই সময়কার থিয়েটার জগতের। শেষ পর্যন্ত ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসেন সালাম সাহেব। এরপর তাঁর বাবা দেরি না করে চট করে দিয়ে দেন বিয়ে-এবং নিজেদের স্কুলে, আজীবন প্রেসিডেন্ট, মামা জব্বার সাহেবের ব্যক্তিগত স্কুলে শিক্ষকের কাজে যোগ দেন।
.
সেই থেকে তিনি মাস্টার। এক পুরুষ, দুই পুরুষ, তিন পুরুষের মাস্টার সালাম মাস্টার। পুরো রূপগঞ্জ, ডেমরা,পুবাইল, সাঁতারকূল বিশাল এলাকা জুড়ে তিনি সালাম মাস্টার। এই সালাম মাস্টারের চারপুত্র এবং দুই কন্যার মধ্যে আমার স্ত্রী শিরী কনিষ্ঠ কন্যা।
নৌকা যখন ঘাটে পৌঁছায় আমাকে দেখার জন্য কয়েক হাজার লোকের ভীড় ঘাটে। মামা চিৎকার করছেন একটা স্ট্রেচারের জন্য। কিন্তু কে আনবে স্ট্রেচার? কোথা থেকে আনবে? গ্রামে তো কোনো হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বলতে নেই কিছু। কেউ একটা হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ার নিয়ে এসে হাজির করলো। আমাকে বসানো হলো। আর চারজন জোয়ান ছেলে কাঁধে নিয়ে চলল বাড়ির দিকে। সালাম মাস্টারের জন্য সবাই জান দিতে প্রস্তুত। আর আমার অসুখের খবর তো আগেই পৌঁছেছে গ্রামে।
বাড়ির উঠান, ছাদ, ঘর, বারান্দা দহলিজ লোকে লোকারণ্য। আমাকে নিয়ে উঠানের মাঝখানে বসিয়ে দেয়া হলো। কান্নার আওয়াজ পেলাম। আমার আম্মার কান্না বুঝতে পারলাম। তারপর দেখি শাশুড়ি কাঁদছেন, আমার বোনরা এবং শিরীতো বটেই। কেউ ফুঁপিয়ে, কেউ নিশব্দে। বেশ গুরুগম্ভীর একটা পরিবেশ। আমি যে বেঁচে ফিরে আসবো,এটা অনেকে আশা করতে পারেনি।
হঠাৎ দেখি আমার ছোট ফুপুশ্বাশুড়ি (মতি ফুপু) একটা নবজাতক নিয়ে এসে আমার কোলে দিলেন-
লও তোমার বিপাশারে।
আমার আত্মজা,আমার কোলে প্রথম, আহারে, হাত পা ছুঁড়ে কী যেন বলছে-যদি বুঝতাম। জানেও না তার বাবা মৃত্যুর দুয়ার থেকে প্রত্যবর্তন করেছে। বিপাশা,আমার মেয়ে-জন্মের অনেক আগেই নাম রেখেছিলাম। তারাশঙ্করের বিপাশা উপন্যাস পড়ে শিরীকে বলেছিলাম, আমাদের মেয়ে হলে নাম রাখা হবে বিপাশা। সেই নামও ইতোমধ্যে চাউর হয়ে গেছে-আমার কলজের ভেতর থেকে এক কষ্ট আর আনন্দ মিশ্রিত অনুভূতি ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে কান্নার রূপ নিয়ে।
আর পারলাম না। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিলাম। আমার কান্নার শব্দে আপনজনেরাও এবার শব্দ করে কাঁদতে শুরু করে দিল। আর তাতেই এক নাটকীয় ঘটনার অবতারণা হলো ওইখানে। উপস্থিত সকল দর্শক করতালিতে মুখরিত করে তুললো সমগ্র মোড়ল পাড়াকে। এ অভূতপূর্ব ঘটনা আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হয়ে রইল। নাটক আমার প্রাণের সখা, তাই সৃষ্টিকর্তা এতবড় নাটকের মুহূর্ত তৈরি করে দেখালেন আমাকে এই হলো নাটক।
প্রায় তিনটে মাস কেটে গেল আমাদের বেরাইদে। মামাশ্বশুর তাঁর পরিবার নিয়ে দুদিন পরই চলে গেছিলেন পুবাইল, তাঁর দেশে। আমার শারীরিক কারণে সপরিবারে আটকে গেলাম বেরাইদে।
.
বিছানা থেকে উঠে চলা ফেরা করতে আমার সময় লেগে গেল প্রায় মাস খানেক। তারপর হাঁটাচলাতে আরও সময় লাগলো। ইতোমধ্যে বেরাইদে প্রচুর লোক সমাগম হলো। এখানকার মানুষ যারা ঢাকায় চাকরি/ব্যবসা করতো সবাই এখানে। আর আমাদের মতো আশ্রিতের সংখ্যাও প্রায় দ্বিগুন। প্রতিদিনই খবর আসে শহর থেকে। গ্রাম থেকেই গোলাগুলির আওয়াজ পাওয়া যায়। সন্ধের পর শহরের দিক থেকে আগুনের আভা দেখা যায়। কিন্তু সবচেয়ে ভাগ্যের ব্যাপার, এত কাছের একটা গ্রাম বেরাইদ, এখানে মিলিটারি এল একবারে সেই ডিসেম্বরে। এবং সেজন্যই মুক্তিযোদ্ধাদের একটা খুব নিরাপদ খাঁটি হতে পেরেছিল বেরাইদ।
আমি আমার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গীদের সাথে যোগাযোগ করতে পারলাম না। কে কোথায় কোনদিকে চলে গেছে কে জানে—ওয়াসা অফিসের খবর পেলাম-আমার এক সম্বন্ধী ওয়াসাতে চাকরি করতো তার মাধ্যমে। অফিস শুরু করার জন্য রেডিও টেলিভিশনে ভীষণ রকম তোড়জোর করছিল ঘোষণার মাধ্যমে।
না, না এর মধ্যে সংস্কৃতি সংসদের দুই সদস্যর দেখা পেলাম বেরাইদে। আমার এক ফুপু শাশুড়ি বেবী (শিরীর চেয়েও ছোট বয়সে) আর তার বন্ধু কবি জসীমুদ্দীনের পুত্র বাবু, তাদের ভালো নাম আমি আজও জানি না, ওরা বিয়ে করে বিদেশে বসবাস করছে এখন এটুকু জানি।
এমতাবস্থায় আমার কী করা উচিৎ বুঝতে পারছিলাম না। শ্বশুর সাহেবের শরণাপন্ন হলাম। বুঝতে পারতেছি, তোমার সহযোগীরা সব ওপারেই চলে গেছে-তুমি তো পারবা না। এতগুলান ফ্যামিলি মেম্বর, বাচ্চা কোলে, নিজের শরীরের এই অবস্থা। থাকো এইখানে আরও কিছুদিন।
রয়ে গেলাম জুন পর্যন্ত। খবর পেতাম বিভিন্ন দিক থেকে। কিন্তু নিজে আমি অচল। এক সময় মনে হলো এভাবে সময় কাটানো ঠিক হচ্ছে না।
সমস্যাটা হলো আম্মাকে নিয়ে। ছেলের শ্বশুরবাড়িতে এভাবে দিনের পর দিন থাকাটা তাঁর জন্যে বিব্রতকর হয়ে উঠেছে। যদিও আমার শ্বশুর-শাশুড়ি এবং এই বাড়ির সবাই অন্যরকম মনের মানুষ। ওই রকম একটা আপদকালীন সময়েও আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যরের ভালো মন্দ দেখার বিষয়টা তাঁরা তাদের দায়িত্বের মধ্যে তুলে নিয়েছেন। আপন করে নিয়েছেন সবাইকে।
তারপরও আম্মার অস্থিরতা দেখে একদিন আমার সম্বন্ধী কবীরকে (শিরীর চাচাতো ভাই) বললাম, আমার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শফি আলমের সাথে একটু আলাপ করে আসতে। এখন এতদিন পরে যদি আমি অফিসে যোগ দিই, কোনো অসুবিধা হবে কিনা। এই ভদ্রলোক অবাঙালী। উর্দুভাষী। অত্যন্ত সজ্জনব্যক্তি।
.
পরে শুনেছি,আমি যখন কোমাতে ছিলাম উনি আমাকে দেখতে গিয়েছিলেন মেডিকেলে। শফি আলম সাহেবের কাছ থেকে গ্রিণ সিগন্যাল এল। তিনি বলে পাঠালেন-পূর্বাপর আমার অবস্থা বর্ণনা করে চিঠি দিতে। উনি সুপারিশ করে দেবেন।
সেই মোতাবেক খুব সম্ভবত জুনের মাঝামাঝি যোগ দিলাম অফিসে। কাজ তো ঘোড়ার ডিম কিছু ছিল না। কারণ প্রকল্প সব প্রায় বন্ধ। শুধু পানি সরবরাহ আর পয়: ব্যবস্থাপনা চলছিল। আর সেগুলো দেখতো উর্দুভাষি দুচারজন প্রকৌশলী ছিল, তারাই। তারাই তখন রাজা। গাড়ি, বাড়ি, টেলিফোন সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে রাজারহালে খবরদারি করতো সবার ওপরে। আমরা যথাসাধ্য ওদের সঙ্গে মানিয়ে চলতাম। কারণ খুব ভালো করেই জানা ছিল ওদের সামান্য ইশারায় যে কারো জীবনের ক্ষতি হতে পারে।
মালিবাগের চৌধুরীপাড়ার বাসায় চলে গেলাম। আম্মা অন্তত তাঁর বিব্রতকর অবস্থা থেকে পেলেন মুক্তি। ভয়ে ভয়ে কাটতো দিন। কখন কোথায় কোন অঘটন ঘটে যায় সেই আতঙ্ক তো ছিল হরহামেশা। বাড়িতে মিলিটারি এসে হেনন্তা করেছে দু’দুবার। জীবন বেঁচেছে এটাই বড় শোকর আল্লার কাছে। সে কাহিনি অন্যত্র বলবো নিশ্চয়।
এর মধ্যে কোম্পানির অফিস থেকে আম্মার পেনশনের টাকার অনুমোদন এল এবং প্রথম কয়েক কিস্তির পাওনা টাকা নগদ চলে এল মানি অর্ডার মারফত।
বাসায় একটা রেডিও ছিল ফিলিপস। ৬ ব্যান্ড এর। খুবই ভালো মানের কিন্তু পুরোন হয়ে যাওয়ায় তেমন ভালো শোনা যায় না। আম্মা প্রথমেই শিরীর হাতে পুরো টাকা দিয়ে বললেন তোমরা একটা ভালো রেডিও কেনো। আমরা সবাই মিলে ভালো করে স্বাধীনবাংলা শুনবো। সেদিন আমাদের খুশি আর ধরেনা। আমরা আসলেই ভাবছিলাম একটা Transistor কিনবো-আম্মা দেওয়াতে আনন্দটা হয়েছিল খুবই বেশি।
দিন কাটছিল ভয়ে, আতঙ্কে, আশায়–নানান রকম চিন্তাভাবনা নিয়ে। অফিস-বাসা, বাসা-অফিস এই ছিল কাজ। সকালে আম্মা বা শিরী আয়তুল কুরসী পড়ে ফুঁ দিয়ে দিতেন বেরুবার আগে, ফিরলে শোকর করে দোয়া পড়তেন। সকাল শুরু হতো ভয়ভীতি নিয়ে। কিন্তু দিন শেষে যখন খবর আসতো-এতজন পাকসৈন্য নিহত, বা এত যায়গায় বোমা ফেটেছে কিংবা নিজের কানে যখন বোম ফাটার আওয়াজ পেতাম তখন শান্তি নিয়ে ঘুমুতে যাওয়া, এভাবেই দিন চলতো। এছাড়া কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়ও দেখা গেল-যেমন বাড়িভাড়া কমে গেল। বাড়িওয়ালা ভাড়া কমিয়ে দিয়ে আশ্বস্ত হতে চাইলো যাতে ভাড়াটিয়া বাড়ি ছেড়ে চলে না যায়। খাবার দাবারের মূল্য পড়ে গেল। কারণ শহরে দেখা গেল ভোক্তার অভাব।
.
মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় ছিল আমার বাসা। কাছেই ছিল মগবাজার ওয়ারলেস, সেখানে ছিল সেনাবাহিনীর একটা বড়সড় ক্যাম্প। এরা আমাদের বাসার আসেপাশে প্রচুর ঘোরাফেরা করতো। এলাকায় নানান দুর্ঘটনাও ঘটেছে ওদের দ্বারা।
বাড়ির পাশেই মালিবাগ বাজার। সেখানেও এই পাকসেনারা নিয়মিত টহল দিত এবং টোল আদায় করতো। টাকা না দিয়ে বাজার সদাই নিয়ে যেত। এভাবে এক সময় বর্ষা এল, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও এসে গেল। প্রচুর মার খেতে শুরু করলো পাক সৈন্যরা। গ্রামেগঞ্জে শহরেও। ভারতীয় বাহিনীর সাথে মিলে বাঙালীরা পাকিস্তানিদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো।
১৬ই ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশি যৌথবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হলো পাকিস্তান বাহিনী শেষপর্যন্ত। রেসকোর্স ময়দানে সেই পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পনের দৃশ্য দেশবাসী সবাই দেখেছেন নিশ্চয়।
এরমধ্যে আমরা দেখলাম বিমান যুদ্ধ, ঢাকার আকাশে। ঢাকার মানুষ ভয়ে গর্তে না ঢুকে রাস্তায় নেমে, বাড়ির ছাদে উঠে গামছা, ওড়না, শাড়ি উড়িয়ে মিত্র বাহিনীকে স্বাগতম জানিয়েছে। তারপর দেখলাম মুক্তিযোদ্ধারা নানান অংশে ভাগ হয়ে বিভিন্ন দিক দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে রাস্তায় হাঁটছে বীরদর্পে। তাদের সাথে হাজার হাজার জনগণ শ্লোগান দিচ্ছে—’জয় বাংলা’। বিকেলে রমনা রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হলো। আমরা স্বাধীন হলাম। ৩০ লক্ষ বাঙালির রক্তের বিনিময়ে লক্ষাধিক নারীর শ্রেষ্ঠ সম্পদের বিনিময়ে স্বাধীনতা এল আমাদের বাংলাদেশের।
বিমান আক্রমণ যেদিন শুরু হয় (৩ ডিসেম্বর) সেদিনই আমরা উঠে যাই শান্তিনগরে আমার এক মামার বাসায়। কারণ ওই যে বলেছিলাম, মগবাজার ওয়ারলেসে আমির ঘাঁটি, ওরা শেষ মুহূর্তে যা খুশি তাই করার চেষ্টা করতে পারে।
১৬ তারিখে ওই আত্মসমর্পনের ঘটনার পরদিন আমরা নিজ বাসায় চলে এলাম। নতুন সূর্য উঠলো জাতির জীবনে। আমরা নতুন পতাকা পেলাম, পেলাম নতুন মানচিত্র। আমরা স্বাধীন। আমরা বাংলাদেশি। জয় বাংলা।
