Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রবি পথ – আবুল হায়াত
রবি পথ – আবুল হায়াত
0/35
রবি পথ – আবুল হায়াত

২৮. মাঠে প্রান্তরে

মাঠে প্রান্তরে

মাঠে প্রান্তরে শব্দটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় খেলাধুলার ক্ষেত্রে। কিন্তু শিল্পীরাও পথে ঘাটে মাঠে তাদের সৃজনশীল কাজের উপস্থাপনা হরহামেশাই করে থাকেন।

ইদানীং মাঠে ময়দানে খুবই জাঁকজকমের সাথে নানান ধরনের পুরস্কার বিতরণী আর সংগীতানুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে। এটা সাধারণত এক সঙ্গে অনেক অনেক দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্যই হয়ে থাকে। নাট্যমঞ্চায়নও কিন্তু মিলনায়তনের দেয়াল ভেদ করে মাঠে প্রান্তরে নেমে আসে মাঝে মধ্যে।

শুরু হয়েছিল পাহাড়ের ঢালে মঞ্চ আর বসবার যায়গা তৈরি করে উন্মুক্ত আকাশের নীচে, এমফি থিয়েটার যার নাম। সম্ভবত সেই খ্রিষ্টপূর্ব ৭০ সালের দিকে পম্পেই নগরীতে। এক সময় মাঠ-ময়দান থেকে থিয়েটার চলে এলো চার দেয়ালের ভেতর। আবার সে দেয়াল ভেঙ্গে ফিরে এলো মাঠে ময়দানে, অদ্ভুত রকমের যাত্রা বটে।

আমার জীবনের নাট্যভিনয়ও এমনতর বিচিত্র মাত্রায় শোভিত। শুরু করেছিলাম দশ বছর বয়সে বাড়ির পাশে খালি যায়গায় মঞ্চ বানিয়ে উন্মুক্ত আকাশের নীচে।

এরপর যা করেছি তার প্রায় সবই প্রথাগত মঞ্চে, বদ্ধ ঘরে। গ্রামেগঞ্জে যাত্রা হয় খোলা আকাশের নীচে— তা কখনো আমার দেখা হয়নি— বেশ বড় বেলা পর্যন্ত। তবে প্রথম খোলা আকাশের নীচে মঞ্চ নাটক দেখলাম চট্টগ্রামের সেন্টপ্লাসিড স্কুলের মাঠে। ১৯৬১ সনে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শততম জন্মবার্ষিকীতে তাঁরই লেখা নাটক— শেষরক্ষা। প্রচুর দর্শকের মাঝে বসে সে নাটক দেখে খুবই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম। তখন চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র আমি।

আমার নিজের সুযোগ এলো তেমনি এক অনুষ্ঠানে অভিনয় করার। কোনো উপলক্ষ ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়র সংস্কৃতি সংসদের ব্যানারে সৈয়দ হাসান ইমাম-এর নির্দেশনায় রক্ত করবী নাটকের অধ্যাপক চরিত্রে অভিনয় করলাম ঢাকার বাংলা একাডেমি খোলা মাঠে। দশ হাজারের মতো দর্শকের উপস্থিতি ছিল সে প্রদর্শনীতে। এটা হয়েছিল ১৯৭০ সনে। সে বছরই একই ব্যানারে অভিনয় করি একই মাঠের মঞ্চে— ম্যাক্সিম গোর্কির মা নাটকে। এ দুটো নাটকে মঞ্চায়নের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ‘প্রতিবাদ’। পাকিস্তানি শাসক হঠাৎ করেই বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতিকে দমন করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ায় তার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ ছিল নাটকের মাধ্যমে। এবং প্রায় সব নাটকই ছিল মাঠে ঘাটে, পথে এবং বিশেষ করে শহীদ মিনারে।

সেই সময় বিশাল দর্শককুলের সম্মুখে আর একটি নাটকে অভিনয় করেছি— সমরেশ বসুর আবর্তন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের মাঠে। সেই ১৯৭০-এই।

সেই সময় যাঁরা আমার সহযাত্রী ছিলেন— তারা হলেন ইনামুল হক, গোলাম রাব্বানী, ফরিদ উদ্দিন প্রমুখ। এবং প্রায় প্রতিটি নাটক পরিচালনা করেন সৈয়দ হাসান ইমাম। প্রযোজনায় সংস্কৃতি সংসদ।

ছোট ছোট অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছি ছাত্রাবাসের মাঠে, পথের ওপর, শহীদ মিনারে, ট্রাকে। এবং কোথায় নয়। মৌচাক মার্কেটের ছাদেও হয়েছিল একটি নাটক। যাতে আমি অসুস্থতার জন্য শেষ মূহূর্তে নাম উঠিয়ে নিয়েছিলাম শিল্পী তালিকা থেকে।

সে একটা সময় ছিল ৬৮, ৬৯, ৭০, ৭১-এর যুদ্ধ শুরু হবার পূর্ব পর্যন্ত।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনের মোস্তাফা মনোয়ার সাহেব রবি ঠাকুরের মুক্তধারা করেছিলেন রেসকোর্স ময়দানে। সেকি উত্তেজনা আমাদের, এমন একটি নাটক হবে মাঠে। যেখানে একটা নদীর বাঁধ ভাঙ্গা হবে— যার পানি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি থেকে ছাড়া হবে, সবাই উত্তেজনায় টানটান।

বিকেল থেকে এমন বৃষ্টি নামলো, অঝোর ধারায়। থামতে থামতে অনেক রাত। তখন সেট-টেট যা ছিল তা ভিজে একাকার। আমার যতদূর মনে পড়ে সেদিন আর অভিনয় করা যায়নি-মানে ভাঙ্গা হয়নি বাঁধ-ও।

সেদিন আবার ওই মঞ্চেই রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠান ছিল দুই বিখ্যাত শিল্পীর দেব্রত বিশ্বাস এবং সূচিত্রা মিত্র। সেই ঝুম বৃষ্টির পর দর্শক গান শুনেই বাড়ি ফিরেছিলেন।

আরেকবার মনে পড়ে ঝড় বৃষ্টির কবলে পড়েছিলাম আউটডোরে নাটক করতে গিয়ে। সেটা বোধ করি ১৯৭৬ কি ৭৭-এর কোনো এক বৈশাখে। স্থান— টাঙ্গাইল শহর। সেখানকার জেলা প্রশাসকের আমন্ত্রণে বৈশাখী মেলায়, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় গিয়েছিল তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রযোজনা দেওয়ান গাজীর কিসসা নাটক মঞ্চায়নে।

দল নিয়ে দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। স্থানটা মনে নেই, তবে একটা খোলা মাঠ অবশ্যই। সেখানে প্রচুর জনসমাগম। মেলায় আনন্দফূর্তি চলছে। চলছে বেচাকেনা, নাগর দোলা ইত্যাদিতে ভরপুর। এই সবের মাঝে এক বিশাল মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। যার চতুর্দিক ঘেরা চট দিয়ে। পরিচালক আসাদুজ্জামান নূর, মঞ্চ দেখে টেখে তাঁর সেট তৈরি করলেন— আমরা ততক্ষণ প্রশাসক সাহেবের আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজটোজ সেরে ঘোরাঘুরি করলাম মেলায়। ইতিমধ্যে শুনতে পেলাম আমাদের নামগুলো বলে বলে বেশ মাইকিং চলছে— নাটকের জন্য। সন্ধে নামার পরপরই শুরু হলো নাটক। আমরা কেউই খেয়াল করিনি এর মধ্যে আকাশ জুড়ে জমেছে কালো কুচকুচে মেঘের দল। বাতাস বিকেল থেকেই ছিল— তবে তার তেজও বেড়েছে বেশ। পাতলা চটগুলো উড়ছিল বাতাসে। আমরা অভিনয় করতে গিয়ে বুঝতে পারছিলাম বেশ একটা কিছু বর্ষণ হবেই।

নাটক আধাআধি হতেই শুরু হলো বৃষ্টি। তারপর পরই প্রবল মেঘগর্জনও। বাতাসের তেজও প্রচণ্ড আকার ধারণ করলো। এক সময় দেখা গেল চটের দেয়ালগুলো সব উড়ে চলেছে বাতাসে— প্রবল বৃষ্টিতে আমরা অভিনয় মাঝপথে থামিয়ে দৌড়ে ঠাঁই নিলাম কোনো পাকা ইঁটের তৈরী আশ্রয়ে।

বাতাস কতক্ষণ পরে থেমেছে, মনে নেই। তবে মেলা তখন ভাঙ্গা হাট। দর্শকশূন্য। কারেন্ট চলে গেছে সাপ্লাই থেকে। আমরা অর্দ্ধেক নাটক করে জেলা প্রশাসকের বাড়িতে।

দপ্তরে হাজির হলাম।

নাটক হয়নি বলে যে খাওয়া দাওয়া হবে না তাতো নয়। খাওয়া দাওয়ার পালা চুকিয়ে রাত ১১টার দিকে বাসে করে রওয়ানা হলাম ঢাকায়। ঢাকায় তখন রাত বারোটার পর কার্ফিউ চলে। মার্শাল ল’র নিয়ম। জেলা প্রশাসক আমাদের আশ্বস্ত করলেন— তিনি ঢাকার পুলিশ কন্ট্রোলরুমে বলে দেবেন যাতে আমাদের বাড়ি পৌঁছাতে অসুবিধা না হয়।

সারা পথ নির্বিঘ্নে এলেও আমরা ধরা পড়লাম আজিমপুর নিউমার্কেটের মোড়ে। পুলিশের প্লাটুন রাস্তা ব্লক করে আমাদের বাস থামিয়ে জেরা করতে শুরু করে, কেন আমরা কারফিউ ভঙ্গ করলাম। বিশাল অপরাধ আমাদের। কথাবার্তায় জানা গেল টাঙ্গাইলের প্রশাসক মহাশয় কোনো ফোন করেননি— সুতরাং আমরা Arrested. না, ঠিক বন্দী না হলেও আমাদের ঘেরাও করে লালবাগ থানায় নিয়ে প্রত্যেককে পৃথক ভাবে জেরা করে চললেন ওসি সাহেব।

আমাদের কেউ কেউ নানান ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করলেন পুরো ঘটনা, কিন্তু তারা মানতে নারাজ, ওই বাসে কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ডজন খানেক অভিনয় শিল্পী ছিলেন। পুলিশ ভাইয়েরা ভাব করলেন যে তাঁরা এদের কখনো দেখা তো দূরের কথা নামও শোনেননি।

শেষ পর্যন্ত আমরা ছাড়া পেলাম শেষরাতের দিকে-মুচলেকা দিয়ে। প্রত্যেককে স্বাক্ষর দিতে হলো— আমার বিশ্বাস লালবাগ থানার খাতায় আজও বিখ্যাত সেই সব শিল্পীদের অটোগ্রাফ জ্বলজ্বল করছে।

আউটডোরে অনুষ্ঠান করার নানান সমস্যা। আজকাল হয়তো ততটা নেই, তবুও নানান জন নানান স্বার্থের ধান্দায় থাকে— কখন কার মাথায় কি বুদ্ধি চাপে— দাও অনুষ্ঠান বানচাল করে!! সিলেটে গিয়েছি দেওয়ান গাজির কিসসা করতে। ওখানকার নাট্যদলের আমন্ত্রণে। বিকেলে পৌঁছেই চলে গেলাম মঞ্চে। বিরাট চত্বরে, (শহরের মাঝখানে) মঞ্চ বাঁধা। খুবই সুন্দর সব ব্যবস্থা।

সময়মত শুরু হলো নাটক। বেশ তরতরিয়ে চলছিল নাটক। মাঝপথে এসেই বিপত্তি। হঠাৎ করে ধর-ধর মার-সব চিৎকারে দর্শক ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে। আমরা যারা মঞ্চে ছিলাম, এক বিব্রতকর অবস্থায় তখন। আমরা অভিনয় থামিয়ে Freez হয়ে দাঁড়িয়ে। পালাবো কিনা বুঝতে পারছি না।

কিছুক্ষণের মধ্যে সব ঠান্ডা হয়ে গেল। ব্যাপার কি? না একদল মুসুল্লী ক্ষেপে গেছেন হযরত শাহজালালের শহরে নাটক করতে দেবেন না। নানান কথা চালাচালি, শেষে তাঁদের মানানো হলো যে এটা কোনো অন্যায় কাজ করা হচ্ছে না। আমাদের হোস্ট যাঁরা তাঁরাই সব ঠিকঠাক করলেন— এবং আমাদের বললেন নাটক চালাতে।

নাটক চললো। তবে সুর কেটে গিয়েছে ইতিমধ্যে— ভাঙ্গা হাট তখন। নিরাপদে ফিরলাম ঢাকায়। সালটা মনে পড়ছে না-তবে মনে হয় এরশাদের আমলে হবে।

আগেই বলেছি আমি সেই ষাটের দশকের শেষের দিকে একটি বামপন্থী সাংস্কৃতিক দল ‘সৃজনী লেখক ও শিল্পী গোষ্ঠী’র সাথে জড়িয়ে পড়েছিলাম, কেবল নাটক করার লোভে। স্বাধীনতার পরপরই ভাসানী সাহেবের এক বিরাট জনসভা ছিল পল্টন ময়দানে। সৃজনী সেই সভায় নাটক করার সিদ্ধান্ত নেয়। আমিও তাঁদের এক শিল্পী। সরকারি চাকুরে তখনও। ভাসানী সাহেবের জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনলাম মঞ্চের পেছনে গ্রীনরুমে বসে। তাঁর বলার পরই ছিল আমাদের নাটক। সোমেন চন্দের লেখা একটি গল্পের নাট্যরূপ। যতদূর মনে পড়ে নাটকটি লিখেছিলেন দৈনিক সংবাদের মোজাম্মেল হোসেন মন্টু।

হাজার হাজার দর্শক পল্টনে সেদিন। লাল ঝান্ডার দল। আমাদের নাটকও ছিল বামপন্থী প্রলেতারিয়েতের গল্প, ফাটাফাটি প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম আমরা।

মাঠে ময়দানে শেষ করি নিজের অনুপ্রেরণার গল্প দিয়ে। আমার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রাম টাইগারপাস রেল কলোনিতে। বাসার খুব কাছে আমবাগানে ছিল একটি পার্ক, বাড়ির পেছনে বাটালী হিল আর টাইগারপাস পাহাড় তো ছিলই আমাদের খেলাধুলা প্রধান স্থান। তারপরও প্রায় সময়ই আমরা আমবাগান পার্কে খেলতে যেতাম।

এই পার্কটি আমার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান-শুধু একটি বিশেষ কারণে— এখানে প্রতি বছর ডিসেম্বরের শীতে একটি বিচিত্রানুষ্ঠান হতো রেলওয়ে কর্মচারীদের উদ্যোগে। সারা দিনের অনুষ্ঠান, সকালে শিশুদের অনুষ্ঠান, সঙ্গে দৌড় ঝাঁপের প্রতিযোগিতা, আর একটু বেলায় যুবাদের অনুষ্ঠান আর সন্ধ্যায় বড়রা দখল করতেন মঞ্চ। ওই যে সেই উন্মুক্ত আকাশের নীচে বাঁশ -তকতা দিয়ে তৈরি মঞ্চ। তাতে নাটিকা অবশ্য অবশ্য হতোই। আর আমরা মজা পেতাম এটাতেই বেশি। সেখান থেকেই আমার অভিনয়ের প্রতি একটা অনুরাগ জন্মে নিজের অজান্তেই। আর তারপর তো ওয়াজিউল্লাহ ইন্সটিটিউটের প্রথাগত মঞ্চের মাসিক নাটকে-অমলেন্দু বিশ্বাসের অবিশ্বাস্য অভিনয় নৈপুণ্য দেখে।

খুব মনে পড়ে এসব স্থানের অনুষ্ঠানগুলো। এর কারণেই তো আজ আমি এখানে। রেল কোম্পানির প্রতি আমি আজীবন কৃতজ্ঞ— তার সংস্কৃতি প্রীতির জন্য।