Accessibility Tools

শহর খুলনার আদি পর্ব – আবুল কালাম সামসুদ্দিন

আন্ধি পুকুর

পূর্ব ও পশ্চিম বেনেখামারে আন্ধিপুকুর নামে দুটি প্রাচীন দীঘি বা জলাশয় আছে। আন্ধি পুকুরের খননকাল আজও ঐতিহাসিকভাবে নির্ণীত হয়নি। খলিফাতাবাদ (বাগেরহাট) থেকে বারবাজার পর্যন্ত ভৈরবতীর ধরে অনেক গুলো আন্ধিপুকুর নামে প্রাচীন বৃহৎ জলাশয় দেখা যায়। অনেকে আন্ধিপুকুরকে খানজাহান আলীর কীর্তিসমুহের অন্যতম বলে মনে করেন। যশোর-খুলনা মুসলিম কীর্তিসমূহ ঐতিহাসিক তথ্যের সরলীকরণ করে এতদাঞ্চলীয় মুসলিম বসতির ধারাবাহিক বিকাশের সংক্ষিপ্তকরণের প্রয়াশে অনস্বীকার্য খানজাহান এর কীর্তিসমূহের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়েছে। যশোর-খুলনার আঞ্চলিক ইতিহাস প্রণেতাগণ আন্ধিকে অন্ধকার (আঁধার) পুকুর আখ্যায়িত করে ব্যাখ্যায় বলেছেন যে জলাশয়ের গভীরতা ও পাড়ের গাছ পালায় আচ্ছাদিত থাকায় লোকে অন্ধকার পুকুর বলত। অন্ধকার ক্রমে রূপ নিয়েছে আন্ধিতে। অন্য অর্থে আন্ধিকে ফার্সী শব্দার্থে অন্ধকার অর্থ করে আধিপুকুর বলেছেন। কিন্তু যদি একটা বা দুটা অনুরূপ পুকুরের অবস্থান থাকতে। তবে উক্ত অর্থ সরল মনে গ্রহণ করায় কোন দ্বিধা থাকতো না। খলিফাতাবাদ থেকে বারবাজার পর্যন্ত মুসলিম প্রাধান্যপূর্ণ গ্রামগুলোর মধ্যে অনেকগুলো আন্ধিপুকুরের অবস্থান থাকায় ও সর্বত্র একই নামে অভিহিত হওয়ায় উক্ত ব্যাখ্যা গ্রহণে দ্বিধা আসে। বোধগম্য কারণে ভৈরবতীরের অবলুপ্ত প্রাচীন কীর্তি সমূহের অবশেষ ইতিহাসের আলোকে নিয়ে আসার ঐকান্তিকতার অভাবে পূর্ববর্তীদের সরলীকরণে আবর্তিত হয়েছে। যে কারণে অনুমানের উপর নির্ভর করা ছাড়া প্রামাণ্য কোন পরিচয় তথ্যের অভাবে দেয়া সম্ভব নয়।

শব্দার্থেই যদি নামের ভিত্তি ধরা হয় তবে তুর্ক-আফগান আমলের পূর্বে এ অঞ্চলে ফার্সীভাষা বা শব্দের আগমন ঘটেনি। বঙ্গে মুসলিম বিজয়ের পর ভৈরব- তীর ধরে ক্রমাগত মুসলিম বসতি স্থাপন কালে এ জলাশয়গুলি খনিত হয়েছিল। এতদাঞ্চলে খানজাহানের রাস্তা দীঘি খননের ব্যাপকত। সর্বজন স্বীকৃত এবং খানজাহান কর্তৃক খনত দীঘি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। কিন্তু একই নামে দীর্ঘ এলাকায় অনেকগুলো পুকুর তার কীর্তি বলে অনুমিত হয় না। এছাড়াও খানজাহান খনিত কোন জলাশয় পুকুর বলে অভিহিত নয়। সম্ভবতঃ এ অঞ্চলে মুসলিম বসতি বিস্তার লাভ করলে পানীয় জলের অভাব নিবারণের জন্যে খান-জাহানের পূর্বে কোন আঞ্চলিক শাসনকর্তা নিজ নামে বা গভীরভাবে খনিত জলাশয়গুলোর অনুরূপ নামকরণ করেন।

পশ্চিম বেনেখামারের আন্ধিপুকুরটি স্বনামে সাধারণ ব্যবহার্য পুকুর হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। বর্তমান শতকের গোড়ার দিকে ধাপদামে পূর্ণ অব্যবহৃত পুকুরকে অপেক্ষাকৃত ছোট করে পুনঃখনন ও ব্যবহার উপযোগী করা হয়। জেলা বোর্ড বা ব্যক্তিগতভাবে আন্ধি পুকুরগুলো পুনঃখননকালে অধিকাংশ পুকুর থেকে পাকা ঘাটের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অপর আন্ধি পুকুরটি পূর্ব বেনেখামারের মৌলবী পাড়া ও দোলখোলার মধ্যবর্তী জায়গায় বর্তমান দোলখোলা রোডে অবস্থিত ছিল। এ পুকুরটিও অন্যান্য প্রাচীন জলাশয়ের মতো ধাপদামে পূর্ণ হয়ে অব্যবহার্য হয়ে পড়ে ও কালান্তার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। পুকুরটির উত্তর দিকের একাংশ সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী ও দক্ষিণাংশ ভরাট করা হয়। বিভাগোত্তর কালে উত্তর পাড়ের জমিসহ ব্যবহৃত পুকুর ও বিভিন্ন সময় পুব ও পশ্চিম পাড়ের জমি বিভিন্ন লোকের কাছে বিক্রীত হয়। এ শতকের ষাটের দশকের গোড়ার দিকে পুকুর সহ উত্তর পাড়ের ক্রেতা পুকুরের অগভীরতা, জোব ও পেড়ীর জন্যে পুনঃ খননের উদ্যোগ নেন কিন্তু সামান্য কাটার পর সম্পূর্ণ জোবমাটি উঠতে থাকে এবং পাড়গুলোতে ফাটল দেখা দেয়। পাড়ের ফাটলে বাড়ী ঘর ভেঙ্গে পড়া আশংকায় পুকুরের মালিক সহ পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। সাথে সাথে নানা উপকথা ও কিংবদন্তি ছাড়াতে থাকে। ফলে পার্শ্ববর্তী ও শহরের অনেকে উপকথায় আকৃষ্ট হয়ে ঘটনা দেখতে ভীড় জমায়। ভয়ে অনেক খনন শ্রমিক পালিয়ে যায় এবং পুকুরের খনন কাজ পরিত্যক্ত হয়। দর্শনার্থী কেহ কেহ উৎসুক্য বশতঃ পুকুর থেকে ওঠা জোবমাটি নিয়ে যায়। পার্শ্ববর্তী অনেকে এ জোব জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করে। অনুরূপ জোব মাটি জ্বালানীর ব্যবহার দেখা গেছে শিব বাড়ীর দক্ষিণে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নির্মাণে ভূমি ভরাট করার জন্যে পাশে বিলে মাটি কাটার সময় কয়েক হাত নীচে জোবের স্তর থেকে জোবমাটি তুলে রাস্তার পাশে শুকিয়ে জ্বালানী করতে।

আরও একটা প্রাচীন জলাশয় আলোচিত আন্ধি পুকুরের পূবে ও মৌলবী পাড়ার দক্ষিণে জনৈক পৌর কর্মচারীর বাড়ীর সীমনার মধ্যে বড় পুকুর নামে পরিচিত। এই পুকুরটর খনন কাল জানা যায় না, তবে উক্ত কর্মচারীর মতে পুরুষামুক্রমে বড় পুকুর নামে অভিহিত হয়ে আসছে। ঘাটের দশকের শেষের দিকে পুকুরটি সংস্কার ও পুনঃখনন করা হয়। কিন্তু সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চার পাড় দিয়ে লোক নেমে পাড় ভেঙ্গে কয়েক বছরের মধ্যে অস্তিম অবস্থায় পৌঁছেছে। আরও একটি প্রাচীন জলাশয় মাঝিপাড়ার মধ্যে অবস্থিত ছিল। বর্তমান শতকের গোড়ার দিকে ডুমুরিয়ার ভট্টচার্যিরা পুকুর সহ পার্শ্ববর্তী জমি ক্রয় করে পুকুরের একাংশ পুনঃখনন করে বাকী অংশ ভরাট করে ফেলেন। উভয় বেনেখামার মধ্যে কয়েক শ’ বছর বয়সের কয়েকটা তেঁতুল গাছ রয়েছে। সাধারণত তেঁতুল গাছ দীর্ঘজীবী হয় ও লোকালয়ে জন্মায়। প্রাচীন গাছগুলোর বয়সের অনুমানে বসতির প্রাচীনত্ব অনুমানে সহায়ক হয়। লক্ষণীয় বিস্ততে বেনেখামার গ্রাম মধ্যে কোন প্রাচীন মন্দির বা দেবালয়ের অবস্থিতি নেই। দোলখোলা (দোলবেদী) ও শীতলা বাড়ী (শীতলা মন্দির) রায় পাড়ার রায় উপাধিযুক্ত ব্রাহ্মণ হীরালাল রায়ের প্রতিষ্ঠিত। এ সব কারণে ও পরবর্তী বেনেখামারের বসতির পর্যালোচনা করলে পূর্বেও এখানে মুসলিম বসতিপূর্ণ গ্রাম ছিল বলে অনুমিত হয়।