বুড়ো মৌলবী
গল্লামারী থেকে অল্প দূরত্বে বুড়ো মৌলবীর দরগার কয়েক রশি দক্ষিণ পূর্বে বড়ভিটা নামে বিলের মধ্যে একটা ভিটা আছে। পূর্ব-বেনেখামারের দক্ষিণ দিকে মালোভিটা নামে একটা জায়গা চিহ্নিত হয়। এ ধরনের বেশ কয়েকটি ভিটা ময়ুর নদীর দু’পাশে ছিল এবং উক্ত এলাকায় ছোট ছোট বহু ভিটার অবস্থিতি ছিল। পরে চাষাবাদের জন্য অপেক্ষাকৃত ছোট ও নীচু হয়ে গেছে। আলোচিত এলাকা মধ্যে পাকা মসজিদ ও ঈদগাহের সন্ধান পাওয়া যায়। বেনেখামারের প্রবীণ লোকেরা মসজিদ ও ঈদগাহের স্থান নির্দেশ করেন। মসজিদের জায়গা উঁচু ভিটা ছিল এবং কেহ চাষাবাদ করত না। এ জমির পাশের জমি পশ্চিম বেনেখামারের জনৈক আমীর উদ্দীনের ছিল এবং তিনি এ জমি প্রথম চাষাবাদ করেন ও বর্তমানে তাদেরই আছে। ঈদগাহের সম্পর্কে জানা যায় দেয়াল বাড়ীর দক্ষিণে এ ঈদগাহ, ছিল। এলাকা সম্পূর্ণ পতিত হয়ে গেলে জমি ও গাতির মালিক বুড়ো মৌলবী সাহেব জনৈক সাৰ্থক মুচিকে ঈদগাহের পাশের কিছু জমি দান করেন। সার্থক মুচির ছেলে বসন্ত ও মনুর কাছ থেকে এ জমির সাথে ঈদগাহ অন্তর্ভুক্ত করে রাম বাড়ুজ্যে খরিদ করেন।
ডুবির পশ্চিম পাশে ও গল্লামারীর দক্ষিণে অল্পদূরে বাসাবাড়ীতে বুড়ো মৌলবী সাহেবের দরগাহ অবস্থিত। বাসাবাড়ী কোন বসতি এলাকার নাম হওয়া স্বাভাবিক। এ নামের গ্রাম খুলনায় আরও আছে। কেহ কেহ বলেন বুডো মৌলবী সাহেব নিজ বাড়ী ঘূর্ণি দেয়াপাড়া (যশোর) থেকে এখানে এসে মাঝে মাঝে বাস করে থাকতেন বলে জায়গার নাম বাসাবাড়ী হয়। বুড়ো মৌলবী সাহেব সম্পর্কে যতদুর জানা যায়, তিনি খাজনা আদায়ের জন্যে আসতেন এবং বাসাবা টাতেই (বর্তমান দরগাহ অবস্থান করতেন। বেনে খামার ও বানরগাতিতে তাঁর পাইক বরকন্দাজ থাকতো। বানরগাতীর গোপাল বরকন্দাজ ও মহেন্দ্র বরকন্দাজ বুড়ো মৌলবী সাহেবের অধীন বরকন্দাজ ছিলেন। এ সূত্রেই পরিবারের পদবী বরকন্দাজ হয়। অনুরূপ মুসলিম পরিবার দার পদবীতে পরিচিত হয়।
বুড়ে মৌলবী সাহেবের প্রকৃত নাম আবুল বাশার। তিনি জনৈক সুলতান আহমেদ (যশোর) এর কাছ থেকে দেয়ালবাড়ী-হরিনটানা-ডুবি-আলুতলা-কেষ্টনগর-জিনারআবাদ মৌজাগুলি প্রাপ্ত হন এবং অতিশয় বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত এখানে যাতায়াত করতেন। বৃদ্ধবয়স ও ধর্মপরায়ণতার জন্যে লোকে শ্রদ্ধা ভরে বুড়া মৗলবী বলে অভিহিত করতেন। মৗলবী সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল অনুরাগীগণ বাসাবাড়ীর আস্তানা স্মরণীয় করে রাখেন এবং মৌজাগুলি বরদাকান্ত রায়ের অধীন চলে যায়। বুড়ো মৌলবী সম্পর্কে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খান মগ ফিরিঙ্গী দস্যুদের কঠোরভাবে দমন করার আগে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম এলাকা বাকলা (চন্দ্রদ্বীপ) সলিমাবাদ (পিরোজপুর) যশোর (যশোর রাজ্য বর্তমান খুলনা ও যশোর জেলার অধিকাংশ) হিজলী (চব্বিশপরগণা) প্রভৃতি জায়গা তাদের অবাধ লুণ্ঠন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। পর্তুগীজ মিশনারী পাদ্রী ম্যানরিক সাহেবের বিবরণ থেকে জানা যায় ফিরিঙ্গী দস্যুদের যশোরের প্রতি ঝোঁক ছিল অধিক। বাংলা থেকে দস্যুগণ বিতাড়িত হবার বহুকাল পর পর্যন্ত সুন্দরবনে আত্মগোপনকারী দস্যুগণ নিকটবর্তী ___ নদীপথের জনপদগুলির উপর অত্যাচার অব্যাহত রেখেছিল। এ থেকে অনুমান করা যায় সুন্দরবন থেকে পশর নদী হয়ে ময়ূর নদীতে প্রবেশের সহজ ময়ুর নদী মাথাভাঙ্গার কাছে কাজিবাছায় পতিত হয় এবং পশরের এ অংশের নাম কাজিবাছা পথ থাকায় এবং ময়ুর থেকে উত্তরে ভৈরবের অল্প দূরত্বের কারণে উভয় দিক দিয়ে জলদস্যুদের আক্রমণে ময়ুর নদীর তীর ধরে ভৈরবের তীর পর্যন্ত অভ্যন্তর ভাগের জনবসতি বিপর্যস্ত হয়েছিল। পরে অবস্থা পরিবর্তিত হলে ময়ুর নদীর উত্তরে ও ভৈরব তীরের মধ্যবর্তী অংশে পুনঃবসতি সংগঠিত হলেও ময়ুর নদীর দু পাশে আর কোন বসতি গড়ে ওঠেনি।
