শিববাড়ী
মিয়াবাগ শেখপাড়ার পশ্চিমে এবং বয়রা ও খালিশপুরের পুবে উত্তর দক্ষিণ লম্বা বিস্তীর্ণ গ্রাম শিববাড়ী। শিববাড়ী গ্রাম অনেক প্রাচীন ও এখানে অবস্থিত শিবমন্দির থেকে গ্রামের নাম শিববাড়ী হয়েছে। শিববাড়ী গ্রামের কেন্দ্রস্থলে ও উত্তর দিকে নদীর পাড়ে ছ’টি শিবমন্দির আছে। কেন্দ্র স্থলের মন্দির (বর্তমান শিববাড়ীর মোড়ের কাছে) কোন সময়ে ও কার দ্বারা নির্মিত হয় জানা যায় না। এই মন্দিরটি বহু আগে ভগ্ন ও জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থায় তিন রাস্তার মাঝে স্বল্প পরিসরে প্রায় পরিত্যক্ত ছিল। পুর্বে হয়তো এখানে শিব চতুর্দ শীতে জাকজমকপূর্ণ পূজো ও মেলা হোত, কিন্তু গত শতকের শেষের দিকে মন্দিরের পূর্বোক্ত অবস্থার কথা জানা যায়। স্থানীয় কিছু লোক বছরে একবার শিব চতুর্দশীর দিন মন্দিরের সামনের দিকে পরিষ্কার করে পূজা দিতেন। জনশূন্য গ্রামে দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থেকে ঘন্দিরের গায়ে গাছ গাছড়। জন্মে ধ্বংস প্রাক্তিই প্রধান কারণ বলে মনে হয়। বর্তমান শতকের মাঝামাঝি সময়ে মন্দিরটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত ও ভাঙ্গা মন্দিরের বিক্ষিপ্ত ইট বিভিন্নভাবে অপসারিত এবং সাম্প্রতিক শহর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে ভগ্নস্তুপের অবশিষ্ট অপসারিত হয়ে শুধু মন্দির নামে জায়গার পরিচয় বহন করছে।
অপর মন্দিরটি আলোচিত মন্দিরের আধমাইল দূরত্বে মিয়াবাগের উত্তরে ভৈরব নদীর তীরে অবস্থিত। এই মন্দির সম্পর্কে যতদূর জানা যায় বর্তমান মন্দিরের জায়গা ও তার দক্ষিণ পাশের বৃহৎ জলাশয় মিয়াবাগের মিয়াদের অধীন ছিল। এর পশ্চিম পাশ দিয়ে পাল, কুণ্ড, কর্মকার, বারুজীবীদের বাস ছিল। নিকটবর্তী অন্য কোন বড় পুকুর না থাকায় গ্রামবাসী একমাত্র এ পুকুরের পানি ব্যবহার করতেন। একদিন পালদের এক মহিলা পানি নেওয়ার সময় পুকুরের উত্তর পাড়ে পানির কাছে লতাগুল্মের মধ্যে একখানা গোলাকৃতি পাথরের সন্ধান পান। উৎসুক্য বশতঃ পাথরখানা নাড়াচাড়া করতে গেলে গড়ায়ে অথবা পায়ের চাপে পুকুরের মধ্যে পড়ে যায়। কথাটা জানাজানি হয়ে গেলে বহু লোক ঘটনাস্থলে জমা হয় ও পুকুর থেকে পাথরখানা তুলে দেখা যায় একখানা শিবলিঙ্গ। লোক মুখে মূর্তি প্রাপ্তির কথ। চাঁচড়ার (যশোর) জমিদারের কাছে পৌঁছে। সম্ভবত শিবভক্ত চাঁচড়ার রাজারা পুকুরের উত্তর পাড়ে মন্দির নির্মাণ ও মুর্তি পুজার ব্যবস্থা করে দেন। কথিত ভাষ্যে একখানা মূর্তি প্রাপ্তিতে একটা মন্দির নির্মাণ বোঝা যায়, কিন্তু এখানের মন্দির যুগল মন্দির। মন্দিরের অবস্থান ও গঠনশৈলী দেখলে বুঝা যায় মন্দির দুটি একই সময়ে ও একই স্থপতি দ্বারা নির্মিত। প্রাপ্ত প্রতিম। ভিন্ন অপর প্রতিম। সম্পর্কে নানা মত প্রচলিত আছে কিন্তু নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় না।
ভিন্ন মতে বর্তমান মন্দিরের জায়গায় পূর্বে জোড়া মন্দিরের ভগ্নাবশেষ জঙ্গলাবৃত ছিল এবং মন্দির সংলগ্ন দীঘিটি পূর্বে মন্দির দীঘি ছিল। এই জোড়ামন্দির সম্পর্কে অনেক কিংবদস্তি আছে। মগ-ফিরিঙ্গী দস্যুদের আক্রমণে শিববাড়ি গ্রামের বসতি অন্য সরে যায় ও মন্দির পরিত্যক্ত হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এলাকা পরিত্যাগ কালে পূজারীরা মন্দিরের প্রতিমা পুকুরে লুকায়ে রেখে যান। পরবর্তী সময়ে পরিত্যক্ত এই শিববাড়ি গ্রামের উত্তর পূর্বদিকে মিয়াদের বসতি ও পশ্চিম দিকে ক্রমে পাল, কুণ্ডু ও বারুজীবীদের বসতি গড়ে ওঠে কিন্তু তারা কেউ মন্দির সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। পরে আকস্মিকভাবে প্রতিমা পাওয়া গেলে চাঁচড়ার রাজারা পরিত্যক্ত মন্দিরের জঙ্গলাবৃত ভগ্নস্তূপ পরিষ্কার করে পূর্বমন্দিরের ভিতে নতুন ভাবে মন্দির নির্মাণ করে প্রাপ্ত প্রতিমাসহ অপর প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে দেন।
শেষোক্ত মত পূর্বোক্ত মতের পরিপুরক ও অধিক যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয় এবং জনশ্রুতি ভিন্ন কোন প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তবে একই গ্রামে দুটো মন্দিরের অবস্থান দৃষ্টে বুঝা যায় এখানে পূর্বে বর্ণ হিন্দু সমৃদ্ধ বসতি ছিল। রেললাইন বসানোর সময় শিববাড়ি গ্রামের বৃহদাংশ ও মিয়াবাগ হুকুম দখলীকৃত হয়ে মন্দির রেল এলাকাভুক্ত হয়। দীর্ঘ দিনের সংস্কারের অভাবে মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হলে বর্তমান শতকের ত্রিশের দশকে শহরের কিছু ধনীব্যক্তি ও ব্যবসায়ী মেরামত ও নতুন অঙ্গ সৌষ্ঠবে গড়ে তোলেন। এখানে প্রতি বছর শিব চতুর্দশীর দিন জাঁকজমক সহকারে পূজো ও মেলা হত। শোনা যায় রেল কোম্পানী ব্যবসায়ীক স্বার্থে ঐদিন বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা ও ব্যাপক প্রচার দিতেন।
