Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
সর্বংসহ কালীগুণীন – সৌমিক দে

কালীগুণীন বনাম শানিয়াড়ির প্রেত

(১)

ঘটনাটা চাউর হবার পর গোটা শানিয়াড়ি পরগণার ঘরে ঘরে একেবারে ঢি ঢি পড়ে গেল।

শানিয়াড়ি কিন্তু কেবলমাত্র একটা গাঁয়ের নাম নয়, বরং গোটা একটা তালুক বলা যেতে পারে। চন্দনপুরা, কাটিহারি, মোতীগড়, গোপীবল্লভপুর আর কাঠপুল – এই পাঁচ পাঁচটি বৃহতী গ্রাম মিলিয়ে একটিই করতালুক। তার নাম শানিয়াড়ি।

এই এলাকায় আজকের দিনে দেখবার মতো বস্তু তেমন একটা না থাকলেও গোপীবল্লভের রাসমেলা, চন্দনের জঙ্গল, কালীকুয়ো প্রভৃতি একরকম দেখার মতোই বটে। এই কালীকুয়ো হলো একটা ইঁদারা। কে খুঁড়েছে, কবে থেকে রয়েচে, এখনকার কেউই আর মনে করতে পারে কনা। শুধু নামটাই রয়ে গিয়েচে। এর চারপাশের পাড় বেদী করে বাঁধানো কিন্তু জলের বদলে এতে উকি মারলে এক অতল গহ্বর দেখা যায়, যার কোনও শেষ পাওয়া যায় না। এমনকি একখানা ভারী পাথর নিক্ষেপ করলেও তার পতনের শব্দ কানে আসে না। আজও অনেক লোকে এটি দেখতে আসে।

যে সময়ের কথা বলতে চলেছি, সে কালে এই তালুকের জমিদার ছিলেন তারাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন একজন সজ্জন আর মহাশয় ব্যক্তি। তাঁর সুশাসনে কারুর কোনো অভাব, অভিযোগ ছিল না।

তা, এই তালুকে সেবার মহামারীর ন্যায় এক উপদ্রব দেখা দিলো। বহু ঘর থেকে ছোটো ছোটো ছেলেদের কারা যেন চুরি করে নিচ্চিলো। জমিদারের নিজস্ব পাইক বাহিনী তো বটেই, এমনকি গাঁয়ের লোকেরাও তক্কে তক্কে থেকে, অবশেষে মোতীগড়ের প্রান্তরে আশ্রয় নেওয়া এক কাপালিকের আশ্রম থেকে উদ্ধার হয় বহু শিশুর নরকঙ্কাল। আরও তদন্ত করে জানা গেল, এই শিশু হরণের পিছনে রয়েচে গাঁয়েরই এক মেয়ে তরঙ্গিনীর হাত। তরঙ্গিনী হলো সিদ্ধেশ্বর কামারের বিধবা। স্বামী মারা যাবার পর এই কাপালিকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। গাঁয়ের লোকের তা নজর এড়ায়নি, কিন্তু দুটিতে মিলে শিশুদের বলি দিয়ে চিরযৌবন লাভের আহুতি দিচ্ছে, এইটে কেউ ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করেনি।

যা-ই হোক, জেরার মুখে সব জানতে পেরে তারাপ্রসন্ন ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে কইলেন, “তোদের এত বড়ো স্পর্ধা, তোরা আমার তালুকে ঠাঁই নিয়ে নরহত্যা করেছিস। ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুদের তাদের মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়েছিস। এর শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদন্ডই হওয়া উচিৎ, কিন্তু আমি ধর্মবশে অপারগ। কাপালিক ব্রাহ্মণ সন্তান, আর তরঙ্গিনী মেয়েমানুষ। এই মুহূর্তে ঐ ভন্ড কাপালিককে একশত ঘা চাবুক প্রহার করে আশপাশের দশ তালুক থেকে বহিষ্কার করা হোক, আর তরঙ্গিনীর মাথা মুড়িয়ে, ঘোল ঢেলে, তালুক থেকে বের করে দেওয়া হোক। সরকারমশায়, এই মর্মে চতুর্দিকে ট্যাড়া দিয়ে দিন।”

আজ্ঞা পালিত হলো। তরঙ্গিনীকে চুল কেটে, মাথায় ঘোল ঢেলে যখন ছেলে বুড়ো মিলে গালি দিতে আরম্ভ করলে, তখন অপমান সহ্য করতে না পেরে সে ছুটে গিয়ে মোতীগড়ের ইঁদারায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পরে যখন তাকে তোলা হলো, ততক্ষণে প্রাণপাখী তার পাপী শরীরকে পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছে।

কাপালিক ইত্যাবধি একটিও শব্দ উচ্চারণ করেনি, কিন্তু এইবারে সে উন্মাদের ন্যায় হয়ে উঠল। ভয়ানক ভ্রুকুটি আর দাঁত কড়মড় করে, মরণাহত সর্পের ন্যায় হিসহিস করে সে তারাপ্রসন্নর দিকে চেয়ে বললে, “শোনরে মহামূর্খ, তোরা আমার সাধনায় বিঘ্ন ঘটিয়েচিস, আমার গায়ে হাত তুলেচিস, আমি কিচ্ছুটি কইনি, কিন্তু আমার ভৈরবীকে কেড়ে নিয়ে যা পাপ করলি, তার ফল তোদের ভুগতে হবে। আমাকে বড়ো যেমন তেমন মনে করেচিস তোরা! তাই না? আমি তান্ত্রিক ভৈরবনাথ। পিশাচসিদ্ধ ভৈরবনাথ। আজ থেকে তোদের এই তালুক পিশাচগ্রস্ত হবে। শৃগাল, কুক্কুর ব্যাতীত কোনো জীবিত প্রাণী রইবে না। আমার কথার অন্যথা হবে না। তোরা তৈরি হ।”

জমিদারের পাইকরা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ভৈরবাচার্য্যকে বহিষ্কার করে দিলো, আর তরঙ্গিনীর মৃতদেহকে মোতীগড়ের নদীর পাড়ে সৎকার করা হলো। প্রজারা এই ঘটনার আলোচনা, আর ছিঃ ছিঃ করতে করতে যে যার গৃহে ফিরে গেল। এই ঘটনার পরে উপর্যুপরি তিনটে দিন ভালোয় মন্দয় অতিবাহিত হলো, কিন্তু চতুর্থ দিনের দিন ঘটে গেল একটা অঘটন।

গ্রাম চন্দনপুরার এক প্রান্তে ছোটো একখানা ঝুপড়ি ছিল মহিমের। মহিমের বাপ পিতেমো ছিলেন তারাপ্রসন্নের বাপ ভীমপ্রসন্নের লাঠিয়াল, কিন্তু কোম্পানির শাসন কায়েম হবার পরে লাঠিয়ালদের আর বিশেষ আবশ্যকতা না থাকায় মহিম জাত ব্যাবসায়টি বহাল রাখতে পারেনি। জমিদারের তরফে তাকে দুটি নধর মহিষ, আধা বিঘে জমি আর ছইওয়ালা একখানা টানাগাড়ি খরিদ করে দেওয়া হয়। সেই মোষে-টানা গাড়িতে মহিম সদর হাটে ভাড়া খাটে, আবার গাঁয়ের লোকের প্রয়োজনেও ভাড়া যায়। এভাবেই মোটামুটি তার গ্রাসাচ্ছাদন নির্বাহ হয়।

তা, সেই মহিম সেদিন সারাদিনমান হাটে ভাড়া খেটে সন্ধ্যা সন্ধ্যা কাঠপুলের জঙ্গল দিয়ে গাঁয়ে ফিরছিল। জঙ্গলের মধ্যে যেইখানে বামদিকে বড়ো দীঘিটা রয়েছে, সেইখেনে এসে তার মহিযজোড়া পা থামায়। অনেক গুঁতোগুতি সত্ত্বেও যখন তাদের এক পাও নড়ানো গেল না, তখন মহিম ভাবলে নিশ্চয়ই জানোয়ার দুটোর জলপিপাসা পেয়েচে। জলের গন্ধ পেয়ে আর নড়তে চাইচে না। গাড়ি থেকে পশু খুলে তাদের জল খাওয়াতে নিয়ে যাওয়া এক হাঙ্গামা, তাই সে গাড়ির নীচে একখানা বেতচুবড়ির টোকা রেখে দেয়। সেই চুবড়ি হাতে নিয়ে মহিম জঙ্গলের ভিতর দিয়ে দীঘিতে নেমে, জল নিয়ে, যখন ঢালু পাড় বেয়ে উঠছে, ঠিক তখনই একটা অস্পষ্ট আওয়াজ পেয়ে সে ঘুরে তাকালো জলের দিকে। আকাশে আলো না থাকলেও, তার মনে হলো দীঘির ওপারে কেউ যেন একটা খুব অন্ধকারে গা মিশিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আবার সামনে ঘুরে মহিম পাড় বেয়ে উঠতে লাগল, আর ঠিক তখনই তার মন জানান দিলো পিছন দিকের জলের ওপর দিয়ে কে যেন একটা দৌড়ে আসছে।

আতঙ্কে মহিম হাঁচোড়পাঁচড় করে গাড়ির কাছে এসে উঠতে যাবে, এমন সময়ে মনে হলো তার ঠিক পিছনেই কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। মহিম ভয়ে ভয়ে ঘাড় ঘুরিয়েই দেখলো, তার পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েচে সেই কাপালিক। ভৈরব কাপালিক। দেখা মাত্র গাড়ি ফেলে সে পথ ধরে দৌড়াতে শুরু করল এবং বেশ কিছুক্ষণ দৌড়াবার পরে আবিষ্কার করল যে, সে এক পাও এগোয়নি। একই স্থানে দৌড়ে চলেছে। কাপালিক ভয়ানক হাসি হেসে কি একটা মন্তর পড়ে, পিছন থেকে এসে তার ব্রহ্মতালুতে হাত ঠেকালো আর মহিমের প্রাণহীন দেহটা ঝুপ্ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

এইবার কাপালিক একটা খন্তা দিয়ে কিছুটা মাটি খনন করে, মহিমের মাথাটা সেই মাটিতে শুইয়ে দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে কি যেন করল। সেসব সমাপ্ত হলে পর মহিমের মৃতদেহের মুখে একখণ্ড মানুষের অস্থি, আর খানিকটে সুরা ঢেলে, অস্ফুট স্বরে মন্ত্রে কাকে যেন আহ্বান করতে থাকলো—

“আয়য়য়…
আয়য়য়য়য়য়য়…
আয়য়য়…
আয়য়য়য়য়য়য়….”

পৃথিবীর অভ্যন্তরে, রসাতলের গহীনে যে বিপুল অন্ধকারাচ্ছন্ন জলরাশি থাকে, তাতে হঠাৎ একটা অশুভ কম্পন জেগে উঠল যেন। মহাকালের সুড়ঙ্গ বেয়ে যেন একটা জমে থাকা অভিশাপ ধেয়ে এল ভূপৃষ্ঠের দিকে। মাটি ভেদ করে সেই জমাট, নিকষ অন্ধকারের পিন্ডটি ঝাঁপিয়ে পড়ে মিশে গেল মহিমের মধ্যে। মহিমের মৃতদেহ সামান্য নড়ে উঠল।

আরও কিয়দক্ষণ এমনই চলার পর মহিম এক লাফে উঠে মাটিতে থাবা পেতে বসলো আর মুখ থেকে এক তীব্র, জান্তব নিনাদ বেরিয়ে এল, যেন কোনো মহাশক্তি বহু বহু যুগ পরে মুক্তির আস্বাদ পেয়েছে। ২ কাপালিক চাপা কণ্ঠে কইলো, “তোকে আমি মুক্তি দিয়েছি। তুই আমার আজ্ঞাবহ, তোর ধূর্তামি আর কুটিলতায় আমার পূর্ণ আস্থা রয়েচে। আমি আজ্ঞা দিচ্চি, তুই এই পাপিষ্ঠ জমিদারের তালুককে ঊষর শ্মশানভূমি বানিয়ে দে। একটি প্রাণীও যেন তোর পিছনে জীবিত না রয়ে যায়। এই আমার আদেশ। এই আমার আজ্ঞা।”

এই বলে তান্ত্রিক হিংস্রভাবে হেসে আঁধারে মিলিয়ে গেল।

মহিমের মৃতদেহে প্রবিষ্ট পিশাচ জ্বলন্ত চোখে এসে দাঁড়ালো গাড়িখানার কাছে। মহিষদুটো তাকে দেখে ভয়ার্ত স্বরে চিৎকার করে চলছে। তার দিকে তাকিয়ে দড়িদড়া ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করেচে। পিশাচটা নিজের লম্বা, বাঁকানো নখরগুলি দিয়ে এক ঝটকায় গবাদি পশুদুটির কণ্ঠনালী ছিঁড়ে ফেলল। এরপর এক লাফে দীঘির জলে গিয়ে পড়ল এবং খানিকক্ষণ জলে গড়াগড়ি দিয়ে নিলো। আর তারপর লম্বা লম্বা পায়ে দৌড়াতে শুরু করল গাঁয়ের দিকে।

কাঠপুলের গাঁয়ের সীমানায় সে গাঁয়ের ডাকবাবু, গোবিন্দ নাপিত, আরও দু-চারজন বসে কথা কইছিলেন, হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল জঙ্গলের চৌহদ্দি থেকে কে যেন একটা ছুটে এসে আছাড় খেয়ে পড়ে গেল। ধড়মড় করে উঠে এসে তারা সেই স্থানে পৌঁছে দেখলো মহিম মাটিতে পড়ে রয়েচে আর গোঁ গোঁ করছে।

লোকজন ছুটে এসে তাকে ঘিরে ধরল। গোবিন্দ নিজের পুরাতন রবারের চটিখানা তার নাকের সুমুখে ধরলে পর মহিম জ্ঞান ফিরে পেয়ে গোঙাতে থাকলো – বুহ বুহহ্ বুহহহ

এই অস্ফুট এলোমেলো শব্দের মানে আমি তুমি না বুঝলেও পাড়াগাঁয়ের লোকেরা বেশ ভালোভাবেই বুঝতেন।

ডাকবাবু বিস্ময় মিশ্রিত অবজ্ঞার স্বরে কইলেন, “বলিস কী রে ছোটোলোকের ব্যাটা, ভূত দেখলি কোথা!”

মহিম সম্বিৎ ফিরে পেয়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠে কইলো-

“আমি বড়োদীঘির পাশ কাটিয়ে গাড়ি নিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ দেখি জলার থেকে এক ভয়ংকর মূর্তি উঠে আসছে। এই বড়ো হাত, ইয়া ঝড়ো নখ। চোখ তার আঙরার মতো জ্বলচে। সে উঠে এসে আমার জানোয়ার দুটোর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি প্রাণের ভয়ে দুড়দাড়িয়ে দৌড় দিয়ে পালালাম। আমার মোষ দু’খানাকে মেরেই ফেলেচে হয়তো কত্তা।”

এই বলে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করল।

উপস্থিত লোকেরা কিন্তু বিন্দুবিসর্গও বিশ্বাস করলে না। উলটে মহিমকেই বকাঝকা করল যে সে নিশ্চিতরূপে কোনো বুনো হিংস্র জন্তুকেই ভূত ভ্রমে ভয় পেয়েচে। তারা এও বললে যে কান্নাকাটি না করে ঘরে ফিরতে। কাল বরং জমিদারমশায়কে কয়ে আরেকজোড়া মহিষ বা গাই কিনে দেওয়া যাবে’খন।

যে যার ঘরে ফিরে গেল, শুধু মহিম একা একা ঘরে ফেরার পথে কুটিল হাসি হেসে কুটিপাটি হলো। গাড়োয়ানের ছদ্মবেশে সে একবার যখন তালুকের ভিতরবাগে সেঁধিয়ে গিয়েচে, তখন ধীরে সুস্থে একে একে সে সবকয়টি জ্যান্ত প্রাণীকে নিকেশ করে নিজের কাল-ক্ষুধা নিবৃত্ত করবে।

আদিম অন্ধকার পাতালের লক্ষ বৎসরের অপেক্ষার পরে আজ সে উঠে এসেছে জীবিত প্রাণীর জগতে। তাকে ঠেকাতে পারে, তার পৈশাচিক কুটিলতার সাথে পাল্লা দিতে পারে, এমন প্রাণী জগতে অতি দুর্লভ।

সে নিজের হাত তুলে নাকের সামনে নিয়ে সশব্দে নিঃশ্বাস টেনে আঘ্রাণ গ্রহণ করল, আর তারপর গাঁয়ের মাটিতে, গাছে, জলে সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকে এসে পৌঁছালো গাড়োয়ান মহিমের ঝুপড়িতে।

পরের দিন কাছারি থেকে হাট হতে ভালো দু জোড়া গরু খরিদ করে দেওয়া হল তাকে, আর লোকজন দল বেঁধে জঙ্গলে ঢুকে উদ্ধার করে আনলো তার গাড়িটা। দলের লোকজন মৃত মহিষ জোড়াকে দেখে অবাক হলো। তাদের মোটেও খাওয়ার উদ্দেশ্যে বধ করা হয়নি। খুব তীক্ষ্ণ বা ছুঁচলো কিছু বিধিয়ে জন্তু দুটোর কণ্ঠনালী চিরে দিয়েচে কেউ। তবে, এ নিয়ে তেমন কেউ মাথা ঘামালো না। মহিম শরীর খারাপের অজুহাতে কারুর সাথে বিশেষ কথা কয় না, কাজে যায় না। সে রাত্তিরে রাত্তিরে এ পুকুর, ও পুকুরে ডুবে ডুবে শিকার খুঁজে বেড়ায়। দিন দুয়েক শিকারের সন্ধান না পেলেও তৃতীয় রাতে একটা ঘটনায় গ্রামকে গ্রাম তোলপাড় হয়ে উঠল।

চন্দনপুরার বদ্যি চাটুয্যে ফি হাটে জলখাবারের দোকান দেয়। কচুরী, নিমকি, মেঠাই, জিলিপি, কদমা এইসব। তা, বদ্যি চাটুয্যে সেদিন হাট করে ফিরলো অনেক রাত্তিরে। ছালায় বাঁধা বাসী কচুরী, মেঠাই নামিয়ে তার বউ কমলা, আর তার বিধবা বড়ো জা বিষ্ণুপ্রিয়া, একত্রে পিছনের পুকুরে গেল সেই এঁটো বাসনগুলো মাজতে। পুকুরে পা ডুবিয়ে দুই বউ মিলে যখন কাঠের ভারী বারকোশটা ঘষচে, তখন বড়ো জা হঠাৎ বলে উঠলেন, “অ বৌ, আরে অ মুখপুড়ী, ভালো করে দেখ দিকিনি চেয়ে, জলের মধ্যে যেন কী একটা নামলো বলে মনে হলো। খুব আস্তে চুপ করে যেন একটা শব্দ পেলেম।”

“কী যে কও দিদি, শুনে আমি কতো হাসবো। এই রাত্তিরবেলায় কোন কুকুরটা শেয়ালটা জলে নামে শুনি। নিশ্চয়ই কোনো বড়ো মাছ ঘাই মেরেচে জলে, সেই আওয়াজই তুমি শুনেচো।”

বড়ো জা নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে বললে, “তা হবেও বা, কিন্তু জানিস ছোটো, আমার মা কইতেন আত্তিরবেলা গাঙে জলে এইরকম আওয়াজ শুনলে পরে আর জলে রইতে নেই। কেন কইতেন তা জানিনে। তুই উঠে আয়। সকড়ি থালাপত্তর কাল সকালে ধোয়া হবে’খন।

কমলা আবার হেসে কী যেন একটা উত্তর করতে যাচ্চিলো, এমন সময়ে জলের মধ্যে কী যেন একটা শাঁ শাঁ করে ডুবসাঁতারে এগিয়ে এল, আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই জলের থেকে একটা বিশাল বড়ো শ্যাওলা মাখা হাত উঠে এসে, বাঁকা বাঁকা তীক্ষ্ণ তিনখানা নখ কমলার হাঁটুর নীচে এপার ওপার বিঁধে গেল।

আহত কমলা আকাশচেরা চিৎকার করে পাড়ে ওঠার জন্য আঁকুপাঁকু করতে লাগল, কিন্তু সেই জান্তব শক্তিশালী হাত এক ঝটকা মারায় কমলা ছিটকে অর্ধেকটা জলে পড়ে গেল। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে ভয়ার্ত মেয়েটি দু’ হাত দিয়ে ঘাটের রাণা চেপে ধরল। দ্বিতীয় টানে হাত পিছলে চলে গেল জলের অতলে। ঘাটে পড়ে রইলো ধ্বস্তাধ্বস্তিতে চূর্ণবিচূর্ণ শাঁখা আর চূড়ির টুকরো। জল রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।

বড়ো জা ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠে আর্ত চিৎকার করে আছাড় খেয়ে গিয়ে পড়ল ঘরের আঙিনায়। সেই আর্তনাদ শুনে বদ্যি, বদ্যির মেজো দাদা (এ বিষ্ণুপ্রিয়ার স্বামী নয়) আর আশপাশের দু চারজন মানুষ দৌড়ে এসে দেখে পুকুরের জলে রক্ত ভাসছে।

সকালের আলো ফুটলে পর পুকুরে জাল ফেলা হলো আর সেই জালে বদ্যির বউয়ের যে মড়াখানি উঠল, তা দেখে গাঁয়ের সবচাইতে দামাল ছেলেপিলেরাও আঁতকে উঠল।

মৃতদেহের একটা পা টেনে ছেঁড়া হয়েচে। চোখ, নাক, কান, আঙুল খুবলে খুবলে খাওয়া। আর গোটা শরীরের অবশিষ্ট ভুক্তাবশেষের গায়ে নরুনের মতো ধারালো দাঁতের দাগ।

(২)

এইবারে কিন্তু একটি লোকও তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিলে না, অথবা কোনো বন্য জন্তুর আক্রমণ বলেও মনে করল না, কারণ বিষ্ণুপ্রিয়া স্বচক্ষে পুকুর থেকে একখানা মানুষের মতোই হাত উঠতে দেখেচিলেন।

এর পরে এই রকমভাবেই পরপর আরও দুইটি প্রাণ গেল। একজন গোপীপাড়ার হরবল্লভ ছুতার আর অপরজন ঐ গাঁয়েরই নগেন পাটনী। দুইজনকেই জলে টেনে নিয়ে ছিন্নভিন্ন করে খুবলে খাওয়া হয়েছে।

জমিদারের কাছারী সদরে তড়িঘড়ি সভার জন্য ঢ্যাঁড়া দেওয়া হলো দ্বিপ্রহরে গোটা পরগণা ভেঙে প্রজারা এল কাঠপুলের মাঠে। সবার মুখে আতঙ্ক। জমিদারমশায় বিষণ্ণ কণ্ঠে ধীরে ধীরে কইলেন, “আমি এই তালুকের জমিদার। এখেনে ভালোটি মন্দটি কিছু ঘটলে পর আমি সাধ্যমতো তার প্রতিকার করি, এ আপনারা বেশ রকম জানেন, কিন্তু আজ যে উপদ্রব গাঁ-গুলিতে হানা দিয়েছে, এর প্রতিকার করতে আমি অক্ষম। আমার বেশ সন্দেহ হচ্ছে, সেই তরঙ্গিনী নামের মেয়েমানুষটির প্রেতাত্মাই কাপালিকের বলে বলীয়ান হয়ে এই নরহত্যাযজ্ঞ সাধন করছে, কারণ কাপালিককে বহিষ্কারের সময়ে তার বলা শেষ কথাগুলি আমার বেশ মনে পড়চে। এহেন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আপনারা যদি সম্মত হন তবে আমি একজন রোজা ডাকতে ইচ্ছে করছি। এ ব্যতীত অপর কোনো পরিবর্ত উপায় আমার চোখে পড়ছে না, কারণ পরপর এই ভয়ংকর নরহত্যার অপর কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আমি খুঁজে পাচ্চিনে।”

সিদ্ধান্ত হয়ে গেল কথামাত্রই। পরের দিন অপরাহ্নে বেলকুড়িয়া গাঁ থেকে একজন বিরাট নামডাকওলা ভূতের রোজা এসে বহুক্ষণ যাবৎ সরষেপড়া, তেলপড়া, ধুনোপড়া, পাতাচালান, প্রভৃতি করার পরে অবশেষে সগর্বে কইলেন, “আমি গাঁয়ের স্থানে স্থানে মত্তরপড়া লেবু লঙ্কা পুঁতে দিচ্চি। সেই প্রেতাত্মা এই লেবুর উপরে, নিদেনপক্ষে বিঘৎখানেকের মধ্যেও পা রাখলেই বন্দী হবে। যা, যা, আর কোনো উপদ্রব, উতপাৎ হবে না এই ত্রিসীমানাতে। গোটা তালুককে মন্তর পড়ে একেবারে বেঁধে দিয়ে গেলুম।”

রোজা জিনিসপত্তর গুটিয়ে নিজের স্বগ্রামে ফিরে গেলেন।

ফল হলো বিপরীত। সেই সামান্য গুটিকতক মন্তরে মহিম রূপী পিশাচ ভয় পাওয়া তো দূর, বরং আরও হিংস্র, বেপরোয়া হয়ে উঠল। দলের মধ্যে ভিড়ে গিয়ে লেবু পোঁতা স্থানগুলিও বেশ করে চিনে নিলো। – মহিম এও নিশ্চিন্ত হলো যে, সে মুখের সুমুখে ঘোরাফেরা করলেও রোজার বাপের ক্ষমতা নাই তাকে চিনে নেবার। উপদ্রব প্রশম হবার বদলে আরো প্রকট হয়ে উঠল। ইতিপূর্বে যতগুলি হত্যা হয়েচে সবই রাত্তিরের আঁধারে, কিন্তু বেণী দলুই মরলো ভরা দ্বিপ্রহরে, সকলের চক্ষের সামনে

তখন সবে বর্ষা আরম্ভ হয়েচে। চারি পাঁচজন হাটুরে সকাল সকাল সওদাপত্তর সেরে মধ্যাহ্নে গাঁয়ে ফিরচিলো। পথে পড়ল বটনিমের থান। এই স্থানটির দুই পাশে দুইটি করে মোট চারটি বিরাট দেবোত্তর পুকুর। এমনিতেই বর্ষার জল জমে পুকুর ছাপিয়ে পথে এসে পড়েচিলো, তাই এরা জল কাদা বাঁচিয়ে পথ চলছিল। বেণী এদের মধ্যে কিছুটা পিছিয়ে পড়েচিল, তাই এরা পথটা অতিক্রম করে ঐ মাথায় দাঁড়িয়ে বেণীর জন্য প্রতীক্ষা করছিল।

বেণী জল কাদা মাড়িয়ে যখন প্রায় বটনিমের জোড়া গাছ অবধি পৌঁছে গিয়েচে, এমন সময়ে দক্ষিণ দিকের পুকুরের একেবারে কিনারা ঘেঁষে এক বিরাট ঘূর্ণী দেখা দিলো। সকলে যখন হতভম্ব হয়ে সেই ঘূর্ণীর দিকে চেয়ে রয়েছে, এমনি সময়ে সেই জলপিন্ডের মধ্যে থেকে এক বিরাট দীর্ঘ শ্যাওলা মাখা রাক্ষুসে হাত উঠে এসে বেণীর পা চেপে ধরলো। বাকীরা ব্যাপার বুঝে প্রচণ্ড ভয়ে পরিত্রাহী ছুটতে শুরু করল, আর বেণী দমফাটা আতঙ্কে হাহাকার করে প্রাণভয়ে আর্তনাদ করতে লাগল। বাকীরা পালাবার পথে একসময়ে উপলব্ধি করল যে বেণীর কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গিয়েচে।

পরের দিন ছেলে বুড়ো সক্কলে দেখলে যে বেণী দলুইয়ের আধ খাওয়া, ভেসে ওঠা মৃতদেহটা পুকুরের ওপারে জালবেড়ির কাঁটায় আটকে রয়েচে। দিনে দুপুরে সকলের চোখের উপর ঘটে যাওয়া এহেন ভয়াবহ আক্রমণের পর মানুষজন মহা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল।

সমৃদ্ধ শানিয়াড়ির অদৃষ্টে সত্য সত্যই বিভীষীকা নেমে এল। দিনের পর দিন একের পর এক গ্রামবাসীর প্রাণ তো যাচ্ছিলোই, এইবার শুরু হলো জলের অভাব। গাঁগুলির সবচেয়ে সাহসী ছেলেরাও আর মনের ভুলেও পুকুর বা নদীনালার ধার দিয়েও যেতো না। চন্দনপুরা আর কাঠপুল গাঁয়ে জমিদারমশায়ের দুইখানি মাত্র ইঁদারা ছিল, সেই দুখানি সম্বল করেই গোটা তালুকের প্রজা অতি কষ্টে প্রাণধারন করতে লাগল।

এমন সময়ে আরেক নূতন বিপদ এসে উপস্থিত হলো। জমিদার তারাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য নিজের পুত্রের বিবাহ দিয়েচেন এই এক বৎসর হল। নূতন বধূটি নানান কারণে এই বৎসরের মধ্যে আর পিত্রালয়ে যেতে পারেননি। এখন হয়েচে কী, তারাপ্রসন্নের পুত্রবধূর বাপের বাড়ির লোকজন পত্র মারফৎ জানিয়েচেন যে কন্যাকে দেখবার জন্য তাহদের মন বড়োই উতলা হয়েছে, তাই তাঁরা তারাপ্রসন্নের অনুমতিক্রমে তাদের কন্যাকে একটিবার দেখতে আসছেন। ডাকবাবুর মারফৎ এ সংবাদ শ্রবণ করে জমিদারমশায় অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। পুত্রের শ্বশুরকুলের পরিবারটি যারপরনাই সরলসিধে। এ তালুকের হাড়কাঁপানো আতঙ্কের কথা তাঁরা কিছুমাত্র জানেন না। জানবার কথাও নয়। তেনারা এই দূর্গহে এসে পড়লে বিপত্তি বাড়বে বৈ কমবে না, অথচ কুটুম্বদের প্রতি অপর একজন কুটুম্বের কিছু শিষ্টাচার বোধও থাকে বৈকি। বেহাইবাড়ির পত্র কিঞ্চিৎ বিলম্বে পৌঁছেচে। তিনি পত্রে আসবার তারিখ উল্লেখ করেছেন সাতই শ্রাবণ, এবং তা আজই!

তারাপ্রসন্ন নিজের বিশ্বস্ত কয়েকজন প্রজাকে ডেকে এই সমস্যার কথা খুলে কইলেন—

“বৌমার পিতৃকুলের সকলে বড়ো ধার্মিক এবং সম্ভ্রান্ত মানুষ। তাঁরা এ গাঁয়ে এসে কোনও রূপ সঙ্কটে পড়লে আমার মুখ পুড়বে। অথচ তেনারা আজ সন্ধ্যার মুখেই রেলগাড়ী থেকে নামবেন কাঠপুলের ইস্টেশনে। আমার আদেশ নয়, আমার অনুরোধ যে তোমরা বাবাসকল মিলে তাঁদের যে উপায়ই হোক, নির্বিঘ্নে আমার মহলে পৌঁছে দাও। একটু তাড়াতাড়িই বরং যেও। তাঁরা ভিনগাঁয়ের মানুষ। হয়তো বা রেলযাত্রার পরে কোনো পুকুরেই নেমে পড়লেন হাত মুখ ধুতে, অথবা এই ভরা বাদলার সন্ধ্যায় কোথা জল আর কোথা বা ডাঙা চিনতে না পেরে হয়তো…, রক্ষা করো মধুসূদন!”

প্রজারা কেবলমাত্র তারাপ্রসন্নকে সমীহ করতো তাই-ই নয়, বরং মনপ্রাণ দিয়ে ভালোও বাসতো। তারা বিপদ মাথায় নিয়েও রাজী হলো। এই দলে মহিমও ছিল। সে মনে মনে একচোট হেসে নিয়ে মুখে কইলো, “ভয় নাই কত্তা, আমি নিজে আমার গাড়িখানা নিয়ে যাবো। তেনার আসতে কোনোই ক্লেশ হবে না।”

ঠিক অপরাহ্নেই তারা দল বেঁধে রওয়ানা হয়েছিলেন, কিন্তু পথে কেমন করে যেন গোরুগাড়ির চক্র কাদায় বসে যাওয়াতে অনেক বিলম্ব হয়ে গেল। মহিম গাড়িতে বসে গোরুগুলোকে তাড়না করচিল, আর বাকী পাঁচজনই সর্বশক্তি দিয়ে গাড়িটাকে কাদা থেকে ঠেলে তোলার চেষ্টা করচিল, কিন্তু গাড়ি এক চুল নড়লো না। তাদের মনে হলো গাড়ির উপরে একটা পাহাড়ের বোঝার মতো ভারী কেউ যেন চেপে রয়েচে, ফলে গাড়ির ভার শতগুণ বেড়ে গিয়েচে। অবশেষে সন্ধ্যার মুখে চাকা উঠল। ছয়জনা মিলে দুরুদুরু বুকে ইস্টিশানের গায়ের সরু নদীটার পাশে এসে দাঁড়ালো।

নদীটার উপর দিয়ে চলে গিয়েচে একখানা শক্তপোক্ত শালকাঠের সাঁকো। সম্ভবতঃ এই জায়গাটির নামেই কাঠপুল নামটি এসেচে। যাই হোক, মোট কথা এই সাঁকো পার না করে ইস্টিশানে যাওয়া আসার আর পথ নাই। মহিম এদের উদ্দেশ্যে কইলো, “আমি গাড়ি নিয়ে এইখেনেই থাকি কত্তারা। আবার নদীর চড়ায় চাকা বসে গেলেই সব্বোনাশ। আপনারা এগিয়ে দেখুন।”

তা, এরা নদীর নিকটে পৌঁছে দেখল আরেক সমস্যা। প্রবল বর্ষায় নদীর জল বেড়ে সাঁকোর সামান্য উপর দিয়ে বইচে। পেরোতে গেলে হাঁটুর নিম্নভাগ অবধি জলে নিমজ্জিত হবে, আর এইটেই হচ্চে সর্বাধিক বিপদের কথা।

.

এদিকে হয়েছে কী, বধূর বাপের বাড়ির লোকেরা রেলগাড়ি থেকে কিয়দক্ষণ আগেই নেমেচেন। কারুকে কোথাও না দেখে একটু বিস্মিত হয়েচেন বৈকি, কিন্তু বৃথা কালক্ষেপ না-করে নিজেরাই রওয়ানা দিয়েচেন গাঁয়ের দিকে। রাত্তির নামার আগেই পৌঁছনো প্রয়োজন। পথে কারুকে জিজ্ঞাসা করে নিলেই জমিদারমহল দেখিয়ে দেবে’খন।

সাঁকোর জলে কেউ নামতে সাহস পাচ্চে না দেখে, জমিদারের এক যুবা পাইক বলরাম কাঁপা কাঁপা পায়ে জান কবুল করে সাঁকোতে নামলো। নদীপাড়ের ঝোপ ঝাড় থেকে একটানা সাঁজোপাখীর রব আর মধ্যে মধ্যে প্যাঁচার হুটোপাটি আর চ্যাঁ চ্যাঁ শব্দ কানে আসচে। খুব ধীর আর নিঃসাড় পদক্ষেপে আড়ি পেতে চলতে চলতে যখন সাঁকোর মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে, আচমকা পাড়ের দিক থেকে নদীর জলে কি যেন একটা কালো জিনিস হুড়ুম করে ডুব দিলো এবং কিয়দক্ষণের মধ্যেই জলের মধ্যে ভয়ানক ঢেউ তুলে জেগে উঠল একখানা রাক্ষুসে হাত। বলরাম পালানো শুরু করার পূর্বেই সেই ধারালো নখগুলি বজ্রের মতো এঁটে বসলো বলরামের পায়ে আর মারলো এক টান। বলরাম পড়ে গিয়ে শালকাঠের একখানা মজবুত টানা-বরগাকে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে ফেললো। বাকী লোকেরা পাড় থেকেই হায় হায় রব তুললো, আর সেই সঙ্গে বলরামের গোঙানি নিঃস্তব্ধ রাত্রিকে চিরে ফালাফালা করে দিতে লাগল।

আর্তনাদের ভয়াবহ শব্দ আগন্তুকদের কানেও পৌঁছেচে। তাঁরা হনহন করে পা চালিয়ে ঠিক সাঁকো অবধি এসে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। একটি জোয়ান ছেলেকে কুমীর না কিসে যেন ধরেচে ডুবে থাকা সাঁকোর ঠিক উপরে। ছেলেটি প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্চে যুঝবার, কিন্তু প্রতিরোধ কমতে কমতে তার হাত শিথিল হয়ে আসচে। ওপারের লোকগুলি তাঁদের দেখতে পেয়ে পরিত্রাহী চীৎকার করে কী যেন বলে চলেছে, কিন্তু এপার থেকে তার কিছুই বোধগম্য হচ্চে না।

সহজাত কৌতূহলের বশে তাঁরা তড়িঘড়ি সাঁকোর উপরে উঠে এলেন ব্যাপারটা কী দেখতে। ওপাশ থেকে লোকজনের দলটি তখন তারস্বরে চেঁচিয়ে বাধা দেবার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার আগেই দু’জন মিলে বলরামের হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করতে গেলেন আর তখনই টের পেলেন, জলে তলিয়ে থাকা জন্তটা আর যাই হোক কুমীর বা কামঠ হতেই পারে না। এ অন্য কিছু। কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই সেই হিংস্র হাত বলরামের পা ছেড়ে এঁদের একজনের পা ধরে মারলো এক হ্যাঁচকা টান। … ভদ্রলোক ছিটকে পড়ে যেতে যেতে সাঁকোর ঠেকনা ধরে সামাল দিলেন, আর বিস্ময়রুদ্ধ স্বরে চীৎকার করে বললেন, “এটা কী গো? পা টানছে কে! ছাড় বলছি! ছাড়।”

কিন্তু ছাড়ার বদলে আরেকটি হ্যাঁচকা টান তাঁর পা’খানি জলের মধ্যে কিছুটা টেনে নিলে। আচমকা টাল সামলে ভদ্রলোক ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে কিড়মিড় করে কইলেন, “ছাড়বি নে? তবে রে!”

এই বলে এক হাতে শালকাঠ ধরে সামান্য নীচু হয়ে দক্ষিণ হস্তের তর্জনীটি ঠেকিয়ে দিলেন অদেখা সেই দানবীয় হাতের মধ্যে। চিড়িক করে একটা আওয়াজ পাওয়া গেল, আর পরমুহূর্তেই সকলে বিস্ফারিত চক্ষে দেখল, কী যেন একটা বস্তু ঝপাস করে ছিটকে গিয়ে জলের গভীরে ডুব দিলো।

ভদ্রলোক গুটি গুটি পায়ে জলসিক্ত কল্কাপেড়ে ধুতি নিঙড়াতে নিঙড়াতে পাড়ে এসে উঠলেন।

এই আশাতীত এবং অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে পাড়ের লোকগুলি একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েচিলো। তাদের মুখ থেকে বিস্ময়ে কথা সরলো না। একটু ধাতস্থ হয়ে নায়েবমশায় শুধোলেন, “আজ্ঞা আপনি?”

“ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া। আমি এইদিকের জমিদার ভট্টচার্য মহাশয়ের বৈবাহিক।”

“কত্তাবাবার বেহাই! রায়দীঘড়ার কালীপদ মুখুজ্জে! মানে সেই ডাকসাইটে কালীগুণীন?”

“হাঁ বাছা, কেউ কেউ তাই কয়।”

নায়েব মহা আশ্চর্য হয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে কইলেন, “বলেন কী ঠাকুরমশায়! বৌমণির বিবাহের সময় আপনাকে তো দেখিনি, তাই চিনতে পারিনি কর্তাবাবা। আরে আপনার কথা এদিগড়ের কে না জানে! আপনি তো বৌমণির বিয়ের দিন অনুপস্থিত থেকে সেই নেকড়েমারীর ভয়ানক কানাওলাকে জব্দ করেছিলেন। সে কথা কর্তামশায় না জানলেও আমি পরে জেনেচি। তারপর ঐ সোঁদরবনেরই কোথা যেন সেই হাসপাতালের ভূতকে তাড়িয়েছিলেন। আরো কতশত কীর্তি শুনেচি আপনার! তারপর সেই….”

কালীপদ বিব্রত হয়ে তাকে থামতে ইশারা করল। কিন্তু নায়েব বলেই চলল, “আমি যে বিশ্বেসই করতে পারছি নে, আপনি আমাদেরই কর্তামশায়ের….”

অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে নায়েবমশায় কালীপদর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।

“আরে হতভাগা করিস কী, খপর্দার পা ছুঁবিনে।”

একেই বলে ভগবানের করুণা বাবামশায়, যে আপনি খোদ আজ আমাদের গাঁয়ে পা রেখেচেন। এইবারে নিশ্চয়ই আমাদের প্রাণরক্ষে হবে।”

“আহা, সেসব পরে শুনচি’খন। এখন আমাকে ভট্টাচার্যবাড়িতে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করতে পারিস কি তোরা? আমি অচেনা মানুষ, এই আঁধারে বিভূঁইতে ভয়েই সারা হচ্চি।”

চোখের জল মুছে একটু হেসে নায়েব কইলেন, “তবে আর বলচি কি বাবামশায়, আমরা তো আপনাকেই নিতে এয়েছি। ওই দাঁড়িয়ে গো-গাড়ি আপনার জন্যিই এনেচি বৈ তো নয়। আসুন আসুন।”

গোরুর গাড়িতে ততক্ষণে মহিম এসে বসে রয়েচে। ক্ষোভে ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়চে তার। গাড়িতে ওঠার মুখে কালীপদ সামান্য থমকে দাঁড়ালো। নিবিষ্ট চক্ষে নদীর পাড়ের দিকে চেয়ে চেয়ে কি যেন একটা দেখলো, আর নিজের মনেই বলল, “আশ্চর্য্যি তো! ভারী আশ্চর্যি!”

“কী দেখচেন ঠাকুরমশায়?”

“ও তোরা বুঝবি নে। আমিই ছাই বুঝচি নে।”

এই বলে সবাই গাড়িতে চেপে বসলো। গাড়ি ক্যাঁচ কোঁচ করে চলতে শুরু করল।

(৩)

কালীপদ এসে ভিতরবাড়ির বৈঠকখানায় কৌচের উপর বসলো, আর তার পিছনে গাঁ ভেঙে লোক এসে দাঁড়িয়ে তাকে দেখার জন্য। তারাপ্রসন্ন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বেহাইকে খাতির সম্ভাষণ করতে। কুশল বিনিময় হবার পর জমিদারমশায় কইলেন, “আমাদের বড়ো ভাগ্যি বেহাইমশায় যে আপনি সুস্থ ভাবে পৌঁছে গিয়েচেন। আমরা তো ভয়েই সারা হই যে ওই প্রেতিনীর হাতে আপনার কোনো অনিষ্ট না হয়।”

“প্রেতিনী?”

“আজ্ঞা হাঁ বেহাইমশায়। এক ভয়ংকর প্রেতিনীর উপদ্রবে আমার বাপ পিতেমোর তালুক আজ উজাড় হতে বয়েচে।”

কতক গ্রামবাসীরা আর কতকটা জমিদারমশায় মিলে কাপালিকের সব কথা কালীপদকে শোনালেন। সব শুনে কালীপদ মুখ নীচু করে যেন নিজের মনে মনেই কইলেন, “মেয়েমানুষ নাকি এ? প্রেতিনী? উঁহু, মিলচে না। আমি নদীর বাঁধে যা দেখলুম তবে তা কি মিথ্যা?”

“কী দেখলেন বেহাই?”

কালীপদ মাথা তুলে কইলেন, “ও কিছু নয়।”

তারাপ্রসন্ন কিন্তু এত সহজে প্রসঙ্গান্তরে যেতে রাজী নয়। তিনি বিস্মিত ভাবে সব ঘটনা শুনে বললেন, “সে কী বেহাইমশায়!! আপনি তো দেখচি বড়ো সাধারণ মনিষ্যি নন। এমন ভয়ংকর শক্তি, যে দিনের পর দিন গাঁয়ের লোকেদের শিকার করে চলেছে, যাকে ভুতের রোজাও কাবু করতে পারেনি, তাকে আপনি তাড়াতে পেরেছেন? হোক সে একবারের জন্যই, কিন্তু এ যে প্রায় অবিশ্বাস্য। আমরা তো অদৃষ্টের হাতে নিজেদের তুলেই দিয়েচি একপ্রকার। আমি আপনার চাইতে সম্পর্কেও বড়ো আর বয়সেও প্রবীণ। যদি কিছু প্রতিকার করে আমাদের প্রাণকয়টা বাঁচাতে পারেন তবে ধন্য আপনার শিক্ষা, সাধু আপনার বিদ্যে। আমি নিজের বা পরিবারের জন্য তত ভাবিত নই, কিন্তু গাঁয়ের গরীবগুর্বো প্রজার দলকে আমি সন্তানবৎ প্রতিপালন করে আসচি। এদের অপঘাত যে আমার প্রাণের ভিতরে আঘাত হানে মুখুজ্জেমশায়। দোহাই আপনার।”

কালীপদ বেহাইয়ের জোড় করা হাতটি নিজের হাতের মধ্যে ধরে নিয়ে বিষণ্ণ গলায় বলল, “এমন ভাবে কইবেন না বেহাইমশায়, আমি বড়ো কুণ্ঠিত হই। আমি একবার পেরেচি মানে দ্বিতীয়বার ও পেরে উঠবো, এমন সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। কোনো মেয়েমানুষের প্রেত নয়, আপনাদের তালুকে অতি ভয়ানক পানিমূড়ার আবির্ভাব ঘটেচে।

যখন আদি মহাজগৎ এক মহাবিষ্ফোরণের ফলে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেল, সেই সময়ে সৃষ্টি হয় গ্রহ থেকে গ্রহাণু, অণু, পরমাণু। সেই সৃষ্টির আদিকালে নূতন সৃষ্টি সৃজনের নিমিত্ত জন্ম নেয় বিভিন্ন শুভকর শক্তি, যাঁরা ভবিষ্যতের সৃষ্টি হওয়া জীবদের প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম একই সঙ্গে জন্ম নেয় এক পরস্পর বিরোধী শক্তি, যাকে আমরা অপশক্তি কয়ে থাকি। ধ্বংস আর সংহারই এদের মূল লক্ষ্য। শুভ শক্তিগুলিকে আমরা বিভিন্ন রূপে নিত্যপূজা করে থাকি, কিন্তু কালের স্রোতে বিস্মৃত হই সেই সকল অন্ধকার অপশক্তির কথা, যারা প্রতিটি মুহূর্তে ওৎ পেতে রয়েচে আমাদের সংহারের জন্য। এই হারিয়ে যাওয়া অশুভ শক্তিগুলিকে ঠিক ঠিক চিনে নিয়ে, তাদের পরাস্ত করা অথবা কাজে লাগানোর বিদ্যের নামই হলো তন্ত্রবিদ্যে।

এই গাঁ কেবল আপনাদেরই গাঁ নয়, আমার কন্যার স্বামীভিটেও বটে। আমার সামান্য শক্তিতে যা কুলায় আমি সাধ্যমতো করবো এই কথা দিলেম। তবে আমার বেশ কয়েকদিন সময় আবশ্যক। এত হুড়াতাড়া করে আমি কিছুই করতে পারবো নে।”

একটু থেমে কালীপদ আবার বললেন, “শুনুন বেহাই, আপনারা তো পূর্বেই শুনেছেন যে এই পানিমুড়াদের জব্দ করার একটিই উপায়। মন্তরপড়া লঙ্কালেবুর সাজিতে যদি এই দানব নিজে থেকে, স্ব-ইচ্ছেয় পা ফেলে, তবেই একে বন্দী করা সম্ভব। কিন্তু আগেরবারেই এই ফাঁদের কথা আপনারা সবাই শুনেচেন। আমি নিশ্চিত, কোথাও না কোথাও লুকিয়ে থেকে সেই পিশাচও নিশ্চয়ই সব শুনেচে। তাই সে একটিও লেবুতে পা দেয়নি, এবং একবার যখন সে নিজের একমাত্র মৃত্যুবাণকে চিনে নিয়েচে, তখন তাকে পরাভব করার সম্ভাবনা কতোখানি থাকতে পারে আপনারাই বিচার করে দেখুন। অথচ ত্রিভুবনে এই একটির অধিক দ্বিতীয় কোনও কৌশল নাই পানিমূড়াদের জব্দ করার।” বলে কালীপদ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আর কোনও উপায়ই কি নাই বাবাঠাকুর?”

এই প্রশ্নটি করল স্বয়ং মহিম। মনের ভিতরে তার কুটিল হাসি, হৃদয়ে তার উদ্দাম উল্লাস, কিন্তু মুখাবয়বে তার চিহ্নমাত্র নাই।

কালীগুণীন চিন্তিত মুখে মাথা নেড়ে মহিমকে কইলেন— “না বাছা। অপর কোনও উপায় বিশ্ব সংসারেও নাই। তবে একেবারে হাল ছেড়ো না। আমি দেখি কিছু সম্ভব হয় কি না।” –

রাত্তির বাড়তে সকলে ধীরে ধীরে নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেল কিন্তু কালীপদর দু চোখের পাতায় দুশ্চিন্তায় আর ব্যর্থ অসহায়তায় নিদ্রা এলো না। এইরূপে রাত্রি অতিবাহিত হলো। প্রভাতে তখনও লোকজন হাজির হয়নি, কালীপদ হাত মুখ ধুয়ে, সূর্য্যস্তব সেরে, তারাপ্রসন্নকে শুধোলো —”বেহাই, আমার একটা ব্যাপার ঠিকঠাক জানা বড়ো প্রয়োজন। এ জন্য আমার একজন সাহসী এবং গাঁয়ের অন্ধিসন্ধি চেনে, এমন লোক দরকার। আমার কানাই সর্দার তো কারুকে চিনবে না, নচেৎ তাকেই পাঠাতুম। আছে এমন কেউ?”

তারাপ্রসন্ন একটুক্ষণ চিন্তা করে উত্তর করলেন,

“বিষয়টি যদি গোপন হয় তবে বরং উমাকে দিতে পারি।”

কালীপদ জিহ্বা দংশন করে কইলো, “আরে রামোঃ, না না, সে হলো গিয়ে জামাই মানুষ…”

“মুখুজ্জেমশায়, বর্তমানে তালুকের যা পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাইতে চক্ষুলাজ বা শৌখিনতার পাট শেষ হয়েছে। আমার উমাপদ চৌকশ ছোকরা। তাকে যা আদেশ করবেন, সে তাই করবে।”

অতঃপর উমাপদ এসে কালীপদ মুখুজ্জেকে শুধালো, “আমায় কী খোঁজ নিতে হবে আজ্ঞা করুন।”

“শোনো বাবা, এই তালুকের সব ঘরই তোমার নখদর্পণে। কিছু বিশ্বস্ত লোকজন নিয়ে গিয়ে, প্রতিটি বাড়ির বাইরে গোপনে গিয়ে একটি বিশেষ ব্যাপার তোমাদের বেশ ভালোভাবে নজর করে আসতে হবে।”

“বেশ। তেমন বিশ্বাসী লোকের অভাব হবে না মুখুজ্জেমশায়। কিন্তু কী জিনিসটা লক্ষ্য করতে হবে?”

“এখেনে নয়, ভিতরে চলো। বলচি।”

কালীপদ তার জামাতাকে কি করতে হবে সব বুঝিয়ে দিলো। বৈকালে উমাপদ এসে খবর দিলে যে তারা কি কি দেখেচে।

শুনে কালীপদ ভ্রুকুটি করে উত্তর দিলেন, “হুমম। বিপদ বটে।”

সন্ধ্যার মুখে তারাপ্রসন্ন আর বাকী পুরজনেরা তখন ভিতরবাড়িতে ব্যস্ত, আর কালীপদ কানাইকে নিয়ে বসে রয়েচেন উঠানের চন্ডীমন্ডপে। একটানা বাদলার জন্য বেশ ঠান্ডা পড়েচে ক’দিন। বসে বসে কতো কি চিন্তা করছেন, এমন সময়ে নিঃশব্দে পাশে এসে বসলো মহিম। তার চোখে ধূর্ত দৃষ্টি। কালীপদ প্রথমটায় তাকে লক্ষ্য করেনি, হঠাৎ মাথা তুলে তাকে দেখতে পেয়ে সামান্য অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “এ কি বাছা, তুমি এ সময়ে? কখন এসে বসেচো?”

“এক্ষুনি এলুম। তা ঠাকুরমশায়, আপনার সেই ভূত ধরার কাজ কদ্দুর এগিয়েচে?”

কালীপদ তার ভাষাটুকু শুনে এবার সত্যিই বিরক্ত হলো।

“খোঁজ খবর তো নিয়ে চলেচি সারা দিনমান তা তো দেখতেই পাচ্চো, বসে তো আর নেই। কিন্তু কাজে লাগতে পারে এমন কোনও খবর এখনও অবধি পাইনি, যা দিয়ে ওই প্রেতাত্মার নাগাল পেতে পারি।”

“যদি ধরুন খোঁজ পেয়েই যান, তবে কী করবেন?”

মহিমের কথাটি নিছক কৌতূহল নাকি বিদ্রূপ তা বুঝতে না পেরে কালীপদ বলল, “আমার মাথায় একখানা বুদ্ধি এসেচে মহিম। কাল সারা রাত্তির ভেবে ভেবে একখানা উপায় হয়তো ভেবে বের করেচি। একবার যদি কোনও উপায়ে ঐ পিশাচের আস্তানাটি বের করা যায়, তবে তার অজান্তে তার নিত্য চলার পথে মন্তরপড়া লেবুলঙ্কা পুঁতে রাখতে হবে, যাতে পা পড়তে সে বাধ্য হয়।”

মহিম একটু গলা খাঁকারি দিয়ে কইলো, “এই লোকটি তফাতে গেলে আমি একখানা কথা কইতুম।” চার

বিস্মিত কালীপদর নির্দেশে কানাই সর্দার উঠে বাগানে চলে গেল।

“বলো কী বলবে।”

“আমি জানি ঠাকুরমশায়। আমি দেখেচি তার বাসা। চন্দনপুরার জঙ্গলের ভিতরে। আপনি চাইলে দেখাতে পারি।”

কালীপদ বুঝি নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারলে না!

লাফিয়ে উঠে হতবিহ্বল স্বরে চিৎকার করে উঠল,

“কী বলচো কী মহিম! তুমি! তুমি সেই শয়তানের বাসা চেনো? গাঁয়ের কারুকে তবে কিছু জানাওনি কেন?”

মুখটা ব্যাজার করে মহিম বলল, “কী হবে জানিয়ে শুনি? কী হবে? তারা কেউ লড়তে যাবে সেই অপদেবতার সাথে, নাকি সেই সামর্থ্য আছে আমাদের? আপনার রয়েচে সেই ক্ষমতা। তাই আপনাকেই জানালুম। তবে আর দেরি নয়, আপনি এখুনি আমার সঙ্গে চলুন।। আপনাকে সে বাসা আমি চিনিয়ে দেবো।”

কালীপদ একটু বিচলিত হয়ে বলল, “এখনি? এই রাত্তিরে? মানে রাত্তিরে জলা জঙ্গলে সাপখোপেরও তো…”

“কিচ্ছুটি ভয় নাই ঠাকুরমশায়।” একটু সময় চুপ থেকে মহিম কইলো, “আপনার তো অনেক ক্ষমতা, তাই না ঠাকুর?”

“অনেক নয় বাবা, সামান্যই।”

“তা বললে মানবো কেন ঠাকুর, আমরা সকলে নিজের চক্ষেই তো দেখলুম আপনি কেমন জব্দটাই না করলেন ঐ শয়তানটাকে। কেমন করে পারলেন ঠাকুরমশায়।”

কালীপদ হেসে উত্তর করল, “আসল কথাখানা কী জানো মহিম, তান্ত্রিকের যতো ক্ষমতা, যতো জারিজুরি, সব এই দুই হাতে। হাত অকেজো তো তান্ত্রিকও শেষ।

“ওহ, তাই বুঝি। এইটুকুই ব্যাপার?”

“না। আরেকটি ব্যাপার ও রয়েচে। সে কথা আমি সহজে কারুকে বলিনে। আমার গুরুদেব অঘোরী হংসী তান্ত্রিকের কাছে এই বিদ্যে শেখার পরে আমার গুরুদেব আমাকে একখানা ইষ্টিকবচ ধারণ করতে দিয়েচিলেন। এই কবচ গলে থাকলে কারুর ক্ষমতা নাই আমায় হত্যা করে। তাই বারেবারেই বেঁচে যাই আমি এবং এখানা আমি গলার থেকে মনভুলান্তেও খুলিনে। খোলা নিষেধ

“বলেন কি কত্তা! সত্যি? তাহলে তো আপনার কোনো ভয়ই নাই। তবে সাবধান, এমন কোনও দুর্বলতা নিশ্চয়ই আছে ওই কবচের, যাতে তার দৈবগুণ বিনষ্ট হয়ে যেতেও পারে।”

কালীপদ একটু হেসে বলল, “ভয় করোনা বাবা, দুর্বলতা একখানা গুরুদেব কয়েচিলেন বটে তবে তা ঘটা প্রায় অসম্ভব। মনের ভুলেও কেউ যদি এই কবচে অশুদ্ধ পায়ের ছোঁয়া লাগিয়ে ফেলে, সেই মুহূর্তেই বজ্রপাতে আমার মৃত্যু অনিবার্য। তবে যেহেতু আমি এখানা গলার থেকে কক্ষনো খুলিনে, তাই তা ঘটার কোনো সম্ভাবনাও দেখিনে। তুমি অযথা এ নিয়ে চিন্তা করো না। ঐ প্রেতের সাধ্য নাই আমার কোনও অনিষ্ট করে।”

“এবার তবে চলুন ঠাকুর।”

“বেশ। তাই চলো।”

কালীপদ মনে মনে উত্তেজিত হয়ে কইলো, “এই শয়তানকে যদি বাগে আনা যায় মহিম, তবে এই গ্রাম, এই তালুক তোমার কাছে চির কৃতজ্ঞ হয়ে রইবে বাছা। তবে এখনই আমরা কিন্তু কিছু করতে যাবো না। আজ তোমার সাথে গিয়ে রাতারাতি চিনে নিয়ে, সকালে আলো ফোটার সাথে সাথেই লোকজন নিয়ে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে আসতে হবে। কানাইইইই, ও কানাই।”

কানাই সামনে এলে পর কালীপদ একছুটে ঘরের মধ্যে গেলেন আর একটু বাদেই দুইগাছি লাল সূতা হাতে বের হলেন।

“এই নে কানাই, এই দিয়ে বেশ করে একখানা লেবু লঙ্কার সাজি গেঁথে ফেল দিকি, আমি দেখে বেরোই। আমি এই মহিমের সাথে একটা জরুরী কাজে বাইরে যাচ্চি। ফিরতে হয়তো বিলম্ব হবে। আর আমার পাণের গোছাটাও অমনি সঙ্গে আনিস।

কানাই কথামতো বাগান থেকে চারখানা পুরুষ্টু পাতিলেবু আর একমুঠি আকাশমরিচ তুলে এনে চটপট একখানা লম্বা সাজি গেঁথে ফেললো। কালীপদ দেখে শুনে বললে, “এই সাজি খানা যত্ন করে রাখ। কাল সকালে আরও বানাতে হবে। দরকারে লাগবে।”

কানাইয়ের আনা পাণের গোছা কামিজের বুকপকেটে ভরে, কাঁধে মুগারের চাদরখানা ফেলে, কইলেন, “চলো মহিম।”

মহিম মনের মধ্যে পৈশাচিক অট্টহাসি হেসে আপনমনে বলল, “প্ৰাণ ভরে পাণ সুপুরী খেয়ে নাও কালীপদ মুখুজ্জে। আর খাবার সময় সুযোগ পাবে না কোনোদিন। কাল সকালে যখন সক্কলে তোমার আধখাওয়া, ছেঁড়াখোড়া মৃতদেহ দেখতে পাবে, তখন না জানি কেমন চেহারা হবে তাদের। সে ভারী তামাশা হবে’খন।”

“আজ্ঞা চলুন ঠাকুরমশায়”, এই বলে মহিম তাকে সঙ্গে নিয়ে পা চালালো।

হাঁটতে হাঁটতে প্রায় মাঝ জঙ্গলে পৌঁছে গিয়েচে দুইজন। নিকষ অন্ধকার ঝোপঝাড় থেকে দূরে দূরে শিয়ালের দল ডেকে উঠচে— হুয়ায়া হুয়ায়া শব্দে। বিরাট বিরাট দানবাকৃতি গাছগুলির মাথা থেকে অবিশ্রান্ত ঝিঝিপোকার ডাক ভেসে আসচে। কখনো বা হুতোমপ্যাঁচার দল ভয়ার্ত আর কর্কশ গলায় যেন মহিমকে দেখিয়েই সাবধান করে দিতে চাইছে, “ভূত ভূত ভূত ভূতুউউউম।”

কালীপদ প্রায় অধৈর্য্য হয়ে কইলো, “আর কতো পথ মহিম?”

“পথ আর সামান্যই অবশিষ্ট আপনার ঠাকুরমশায়। অতি সামান্য।”

মেঠো পাতাঝরা পথে নিশ্ছিদ্র আঁধারে চলছে দু’জনে। কেউ কারুকে দেখতে পাচ্চে না। ভূল। কালীপদ দেখতে পাচ্চে না বটে, কিন্তু মহিম তাকে পিশাচের রাতচরা চোখের জ্যোতিতে পরিস্কার দেখতে পাচ্চে। চলতে চলতে এক জায়গায় এসে মহিম বলল, “বাস্, এইখেনেই থামুন ঠাকুর।”

কালীপদ চারিদিক তাকিয়ে বুঝতে পারলেন এই সেই বটনিমের থান। সে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “সেই শয়তানের বাসা কোথা?”

মহিম কালীপদর দিকে পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে রয়েচে। সেই অবস্থাতেই হিসহিসে সুরে কালীপদর উদ্দেশ্যে কইলো, “তাকে পেলে কী করবেন আপনি?”

“তাকে পেতে চাই তো বলিনি। বলেচি তার বাসাখানা চিনিয়ে দিতে। তুমিই তো বললে! বাকী যা করার সকালে করা হবে।”

এবার মহিম ভয়ংকর শব্দে আকাশ বিদারণ করে হেসে উঠল। সেই হাসি শুনে কালীপদ এইবার আস্তে আস্তে এক পা এক পা করে পিছিয়ে যেতে শুরু করল। মহিম বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়াতেই তার আশ্রয় করা মৃতদেহটা ঝুপ করে ঝরে পড়ে গেল, আর দেহের ভিতর থেকে স্ব-মূর্তিতে বেরিয়ে এলো এক ভয়াল দর্শন পিশাচ। সে প্রতিপক্ষকে সজোরে মারলো এক ধাক্কা, আর সেই অভিঘাতে কালীপদ আছাড় খেয়ে পড়ল কাদামাটির মধ্যে। ধড়মড় করে উঠতে গিয়ে সে দেখলো, পিশাচটা এসে দাঁড়িয়েচে তার কোমরের দুইপাশে পা রেখে। তার হিমশীতল দীর্ঘ হাত দু’খানা পাঁচগুণ লম্বা হয়ে ঐ দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই ব্রাহ্মণের হাতদুটোকে চেপে ধরে রেখেচে। শত চেষ্টাতে ছটফট করেও সে হাত দুখানা কোনওক্রমেই মুক্ত করতে পারলে না। সেই শয়তান এবারে নিজের তীক্ষ্ণ নখওয়ালা একটা পা তুলে ধরলো ব্রাহ্মণের বুকের সামনে।

“এইবার ঠাকুর! তোমার বুকের ঐ পবিত্র ইষ্টিকবচই যে আজ তোমার মহাকাল হবে। সেখানাকে আমিই অপবিত্র করবো। তোমার গুরুর সাবধানবাণীও আজ কাঁটায় কাঁটায় ফলবে। আমাকে না চিনেই নিজের সব দুর্বলতা বলে দিয়েচো তুমি। আমাকে হারানো এত সহজ নয় জেনো!”

কালীপদ একরাশ হতাশা এবং ক্ষোভ মিশ্রিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, “শয়তান বেইমান, পাষণ্ড কোথাকার। আমি তোকে চিনে উঠতে পারিনি। তোকে ভরসা করে কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে এই জঙ্গলে একা ঢুকে পড়েছি। সব কথা বলে ফেলেচি। তবে কানাই সর্দার তো আসার সময়ে তোকে দেখেছে হারামজাদা। আমাকে মেরে তুইও রেহাই পাবিনে এই জেনে রাখ।”

মহিম হিংস্র স্বরে বলল, “তোর ঐ কানাইকে আর কারুকে কিচ্ছু জানাতে হবে না। তোকে মেরেই তাকে বধ করবো আমি আজকেই।”

এই বলে পিশাচটা জ্বলন্ত চোখে একবার ব্রাহ্মণের মুখের পানে চাইলো, তারপর নিজের শ্যাওলামাখা পা-খানি কালীপদর বুকের উপর চাপিয়ে দিলো।

আকাশে সহসা মেঘ গর্জন করে উঠল। বাতাসে বাতাসে ঘূর্ণী তৈরি হলো। ঝড়ের মতো ভয়ানক গতিতে হাওয়া বইতে শুরু করে দিলো। আর সেই হাওয়ায় হাওয়ায়, ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে সেই পিশাচ পানিমূড়া ক্ষুদ্র, আরও ক্ষুদ্র হতে হতে মিলিয়ে গেল কালীগুণীনের বুকের কাছে।

কালী মাটি থেকে উঠে গা ঝেড়ে, কামিজের বুকপকেট থেকে বের করল পানপাতার গোছায় মোড়া লেবুলঙ্কার সাজিটা।

কিছুসময়ে অপেক্ষা করার পর দেখা গেল লন্ঠন হাতে দৌড়ে আসচে কানাই সর্দার। তার পিছনে তারাপ্রসন্ন। আরও পিছনে প্রায় জনা চল্লিশ গ্রামবাসী। সকলের হাতে আলো।

তারাপ্রসন্ন এসে কেঁদে ফেলে জড়িয়ে ধরলেন তার বেহাইকে। আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন, – “আপনি যে অসাধ্য সাধন করলেন মুখুজ্জেমশায়। এ যে স্বপ্নের অতীত। আপনি এ অসম্ভবকে সাধন করলেন কেমন করে।”

“তেমন কিছুই নয়। কাল যখন নদীপাড়ের সাঁকোর ঘটনাটা ঘটলো, তখন হঠাৎ খেয়াল করলাম, নদীর চরের কাদায় মানুষের পায়ের টাটকা ছাপ। সে ছাপ গোরুর গাড়িতে এসে শেষ হয়েচে। তখনই যা বোঝার বুঝতে পারলুম।

আজ সকালে উমাপদকে বলেচিলাম গ্রামের সবকয়খানি বাড়ির পিছনের পাঁশগাদাতে নজর রাখতে। আমরা গাঁয়ের লোকেরা দৈনন্দিন আনাজপাতি, ভাতের ফ্যান, ময়লা, উনুনের ছাই সবই এই পাঁশগাদাতেই ফেলি। তা জামাই বিকেলে এসে সংবাদ দিলে যে একমাত্র মহিমের পাঁশগাদাতেই বেশ কিছুদিন যাবৎ টাটকা ছাই, ময়লা ফেলা হয়নি। অর্থাৎ এই দীর্ঘ সময় যাবৎ মহিমের রান্নাখাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। এইটে শোনার পর আমি আততায়ী সম্পর্কে নিশ্চিত হলাম।

সন্ধ্যাবেলায় চন্ডীমন্ডপে বসে যখন আমি আর কানাই তাকেই জব্দ করার ফন্দি আঁটছি, সেই সময়ে খেয়াল করলুম মহিম অতি নিঃশব্দে আমাদের পাশে এসে বসেচে। আমি তাকে হঠাৎ দেখতে পাবার ভান করে চমকে উঠলুম।

সে যখন আমাকে জঙ্গলে যাবার আমন্ত্রণ জানালে, আমি তখনই সব স্থির করে নিয়েচিলাম। আমার ইষ্টিকবচের মিছে গল্প শুনেই কানাই বুঝতে পেরেচিলো যে আমি নিশ্চিতরূপে কিছু একটা ফন্দী এঁটে ফেলেচি। অমন কোনও ইষ্টিকবচ ভূ-ভারতেও হয় না। এরপর যখন কানাইকে ডেকে আমি একখানা সাজির মালা তৈয়ারী করতে বললুম, তখন আমার হাতে দুইখানি সূতো দেখেই সে বুঝেচিলো যে আসলে দুইখানি সাজি তৈয়ারী করার আদেশ দিচ্চি আমি। সে একখানি সাজি প্রকাশ্যে আমাদের দেখালো, আর অপরখানি পানের গোছায় মুড়ে দিলো আমার হাতে। কানাই ভালোই জানতো আমি কস্মিনকালেও পান খাইনে।” একটু থামলেন কালীগুণীন।

“এই আপনাদের গাঁয়ের বিভীষিকা” এই বলে কালীগুণীন তুলে ধরলো লেবুলঙ্কার মালাটিকে।

তারাপ্রসন্ন কইলেন, “এই অপদেবতার এখন কী গতি করা যায় বেহাইমশায়?”

“প্রথমেই মহিম বেচারার বিধিমতো সৎকার করতে হবে, আর এই পিশাচকে আবার ফেরৎ পাঠাতে হবে এরই জগতে এই বলে কালীগুণীন বিড়বিড় করে কি সব মন্তর পড়ে লেবুর সাজিখানা শূন্যে ছুঁড়ে দিলো। কিছু দূর উপরে ওঠা মাত্রই গরগর শব্দ উত্থিত হলো এবং মাটিতে তৈরি হলো এক অতল গহ্বর। সাজিখানা সেই পাতালস্পর্শী সুড়ঙ্গ দিয়ে তলিয়ে গেল অজানার উদ্দেশে।

কালীগুণীন বেহাইকে বললেন, “ভটচাযমশায়, এ গর্তকে লক্ষ কোটি পাথর ফেলেও ভরাট করা যাবে না। আপনারা বরং এই গহ্বরকে একখানা কূয়ার মতো করে বাঁধিয়ে, মুখে একখানা পাথর চাপা দেবেন, কেমন?”

গাঁয়ের লোকেরা হইহই করে কাজে লেগে পড়ল সকাল হতেই। গর্তটিকে সুন্দর করে শান বাঁধিয়ে ইঁদারার রূপ দেওয়া হলো। শানিয়াড়ির প্রজারা ভালোবেসে তার নাম রাখলে –”কালীকৃয়া।”

সেই কৃয়া আজও সেইখেনেই রয়েচে। কিন্তু নামটা কোথা থেকে উৎপত্তি হয়েছিল, আজ আর কেউ স্মরণ করতে পারে না।

***