নিশি বকের ঝিল – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
নিশি বকের ঝিল
এক
সন্ধ্যা নামার পর থেকেই শব্দটা শুরু হয়েছিল। একটা অদ্ভুত ‘ওয়াক! ওয়াক’ শব্দ। মাঝ রাতে শব্দটা এত বাড়ল যে শতদ্রু আর রাকেশ, দুজনেরই ঘুম ভেঙে গেল। মশার উপদ্রবের ভয়ে জানলা বন্ধ করা। তবু শব্দটা বাইরে থেকে ঘরের ভিতর ঢুকছে! ঝিলের পাড় থেকেই আসছে শব্দটা। তারা দুজনেই শহরের ছেলে। এ শব্দের সঙ্গে তারা পরিচিত নয়। ঘুম জড়ানো গলায় রাকেশ বলল, ‘কীসের শব্দ বল তো? বড় বিচ্ছিরি শব্দ!’
শতদ্রু বলল, ‘কীসের শব্দ জানা নেই। যতদূর মনে হচ্ছে কোনও কিছু একটা ডাকছে। কাল সকালে স্থানীয় কোনও লোককে জিগ্যেস করলে সে নিশ্চয়ই বলতে পারবে। তবে এ বাড়ির কাছাকাছি তো আর কোনও ঘর-বাড়ি লোকজন দেখলাম না। একদম ফাঁকা ফাঁকা জায়গা।
রাকেশ জবাব দিল, ‘লোকজন নিশ্চয়ই আছে। কাছেই একটা গ্রাম আছে বলে শুনেছি। আসলে কলকাতা থেকে এখানে পৌঁছতে সন্ধ্যা নেমে গেল বলে লোকজন চোখে পড়েনি। গ্রামের লোকরা সন্ধ্যা নেমে গেলেই সব ঘরে ঢুকে যায়। তার ওপর শীতও পড়ে গেছে।’
এ কথা বলে একটু থেমে এরপর সে বলল, ‘সন্ধ্যা বেলাতে যেটুকু দেখলাম তাতে জায়গাটা কিন্তু বেশ লেগেছে আমার। অনেকদিন ধরে এমনই একটা জায়গা আমি খুঁজছিলাম। ধানুকা যখন আমাকে এ জায়গার ভিডিয়ো ক্লিপ দেখাল, তখন তা দেখেই জায়গাটা আমার পছন্দ হয়ে গেল। লিজ ডিডও সেরে ফেললাম। এ বাড়িটা এখানে যে বানিয়েছিল সে-ও নাকি কলকাতারই লোক ছিল। তারপর বাড়িটা সে তিরিশ বছর আগে ধানুকার বাবাকে বেচে দেয়।
এত দিন ধরে ফাঁকাই পড়েছিল বাড়িটা। মাঝে মাঝে অবশ্য সে ইয়ারদোস্ত নিয়ে মাল খেতে, ফূর্তি করতে আসত এখানে। যাই হোক রিসর্ট তৈরির পক্ষে এমন নিরিবিলি জায়গাই আদর্শ। কলকাতা থেকে মাত্র তিন ঘণ্টার পথ। এখানে যদি রাত কাটাতে ইচ্ছাও না হয় তবুও বাবু-বিবিরা এখানে এসে সারাদিন ফূর্তি করে ফিরে যেতে পারবে।
শতদ্রু জানতে চাইল, ‘এ বাড়িটা বড় হলেও বেশ পুরোনো ধরনের। এ বাড়িটা কী করবি? রি-মডেলিং করে নিবি? নাকি এমনই থাকবে?’
রাকেশ বলল, ‘রিমডেলিং তো করতেই হবে। লোহার গরাদ বসানো জানলাগুলো সব পালটাতে হবে। মেঝেতে টাইলস বসাতে হবে, সব থেকে বড় ব্যাপার ঘরগুলোর সঙ্গে এটাচড বাথ বানানো। এ বাড়িটার সামনের অংশে যে ফাঁকা জমিটা আছে সেটা পুরোটাই আমার। তিন বিঘা জমি। জায়গাটা ঘিরে জমিটার ভিতর বেশ কয়েকটা এসি কটেজ বানাব। আর পিছনে ঝিলের পাড়ে কিছুটা অংশ ঘিরে বোটিং-এর ব্যবস্থা রাখব। ওটাই হবে রিসর্টের অ্যাট্রাকশন।
আর, দোলনা, স্লিপ বেঞ্চ, ছোটা ভীমের মূর্তি—এসব বসাবি না? জানতে চাইল শতদ্রু।
রাকেশ জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, ওসব বসিয়ে ছোট পার্কের মতোও বানাব। তবে কী জানিস, এসব রিসর্টে কিছু মানুষ বাচ্চা নিয়ে এলেও, অধিকাংশ কাপলই বাচ্চা নিয়ে আসে না, আসে নিভৃতে সময় কাটাতে, মজা নিতে, বাচ্চা পয়দা করার কাজ করতে। এসব জায়গাতে যারা সময় কাটাতে আসে তাদের বেশিরভাগ নারী-পুরুষ, স্বামী-স্ত্রীও নয়।’
রাকেশের কথা শুনে শতদ্রু ঘুম চোখে হেসে বলল, ‘তা যা বলেছিস। তবে আমি কখনও এলে থাকতে দিস কিন্তু।’
রাকেশ হেসে জবাব দিল, ‘তা দেব, তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু বলে কথা। কিন্তু তুই এত দিনেও একটা লাইফ পার্টনার দূরে থাক, সেক্স পার্টনারও জোটাতে পারলি না।’
কথাটা শুনে শতদ্রু বলল, ‘সবার কপালে কি সব কিছু জোটে বল? তবে তা নিয়ে আমার কোনও আক্ষেপ নেই। ঝাড়া হাত-পা নিয়ে একলা বেশ আছি। বউ হোক বা প্রেমিকা, তাদের নিয়ে কি হাঙ্গামা কম হয়? চারপাশে তো তাই দেখি। কোথায় যাচ্ছ? কেন যাচ্ছ? কত রকম কৈফিয়ত দিস তো তাদের কে? তুই যখন কাল রাতে ক্লাবে আমাকে তোর সঙ্গে আমাকে এখানে আসার কথা বললি, তখন আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম আমার ওসব বউ, প্রেমিকার ঝামেলা নেই বলে। তাদের মন রক্ষা করে চলার ব্যাপার নেই বলে।’
শতদ্রু কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই বাইরে থেকে সেই ‘ওয়াক ওয়াক’ শব্দটা বেশ জোরে শোনা যেতে লাগল। বাইরের রাত্রির নিস্তব্ধতা যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল সেই শব্দে!
শতদ্রু তা শুনে বলল, ‘কিন্তু এ যা শব্দ শুনছি, এমন শব্দ যদি রোজ রাতে শোনা যায় তবে তোর রিসর্টের কোনও গেস্ট এক রাতের বেশি এখানে টিকবে বলে মনে হয় না। তাদের সারা রাত জেগেই কাটাতে হবে।’
রাকেশ বলল, ‘কাল সকালে জানার চেষ্টা করতে হবে কীসের শব্দ এটা। শব্দটা সত্যিই খুব বিরক্তিকর।’
কিন্তু এরপরই সেই শব্দটা উচ্চগ্রামে ওঠার পর এক সময় ধীরে ধীরে থেমে গেল। বাইরের পৃথিবীতে যেন অসীম নিস্তব্ধতা নেমে এল। চাদর মুড়ি দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল তারা দুজনেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ঘুম নেমে এল তাদের চোখে।
দুই
শীতের সকালে বেশ একটু বেলা করেই ঘুম ভাঙল শতদ্রুদের। জানলা খুলতেই এক রাশ আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরের ভিতর, জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই তাদের চোখে পড়ল ঝিলটা। বলতে গেলে ঝিলের পাড় ঘেঁসেই দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়িটা। পিছনের বারান্দা দিয়ে নামলে, কিছুটা ফাঁকা জমি, তারপরই জলাশয় শুরু হয়েছে। তাদের ঘরের জানলার ঠিক সোজাসুজি বিরাট একটা ঝাঁকড়া আমগাছ দাঁড়িয়ে আছে ঝিলের ঠিক গায়ে।
এ বাড়িতে আরও দুটো রাত থাকার কথা তাদের। এ দুদিনের মধ্যে এখানে কিছু কাজকর্ম সেরে রাখবে রাকেশ। তাদের খাবারের কোনও সমস্যা হবে না। দু-তিন দিনের মতো রসদ, রান্নার উপকরণ সবই তারা গাড়িতে সঙ্গে এনেছে।
শতদ্রু ভালো রাঁধতে পারে। দিব্যি দুটো দিন কেটে যাবার কথা। তারা দুজন যে ঘরটাতে আছে সে ঘরে খাট বিছানা সবই আছে। লাগোয়া বাথরুমও আছে। বিছানা ছেড়ে ওঠার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ফ্রেশ হয়ে নিল। তারপর চা-বিস্কুট খেয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল তারা। তারপর বাড়িটাকে বেড় দিয়ে বাড়ির পিছনের অংশে এসে উপস্থিত হল।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল ঝিলের পাড়ে গাছটা যেখানে রয়েছে তার ঠিক কাছাকাছি জায়গাতে। সেখান থেকে বেশ কয়েকটা সিঁড়ি নেমে গেছে জলের বুকে। ঝাঁকড়া আমগাছটা সেই সিঁড়ি আর তার সামনে জলের বুকে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে ছায়া রচনা করেছে। জলের রঙ স্বচ্ছ, পাড়ের সামনের অংশে জলের নীচে জলজ গাছ আর শৈবাল দাম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মৃদু জল তরঙ্গে তির তির করে সেগুলো কাঁপছে। সামনে তাকিয়ে তারা বুঝতে পারল ঝিলটা অনেক বড়। কিছুটা তফাতে বাঁক নিয়ে অন্য দিকে হারিয়ে গেছে সেটা। তার দুপাড়েই সবুজের সমারোহ। ছোট-বড় গাছ, ঝোপ-ঝাড় আর ঝাঁঝি, দামের মতো জলজ উদ্ভিদও আছে জলাশয়ের পাড়ে। তবে কোনও লোকজন নেই। কয়েকটা মাছরাঙা পাখি শুধু উড়ে বেড়াচ্ছে ঝিলের বুকে!
চারপাশটা দেখে নিয়ে রাকেশ প্রথমে বলল, ‘এখানে বোটিং-এর ব্যবস্থা করলে দারুণ ব্যাপার হবে তাই না? তাছাড়া কেউ সাঁতার কাটতে চাইলে সে ব্যবস্থাও রাখব। বেশ পরিষ্কার জল। দেখে আমার নিজেরই সাঁতার কাটতে ইচ্ছা হচ্ছে। শীতকালেও ঝিল-পুকুরের জল কিন্তু বেশ গরম থাকে। ছোটবেলায় উত্তর প্রদেশে আমি যখন দেশের বাড়িতে যেতাম, তখন সেখানে পুকুরের জলে স্নান করতে নেমে ব্যাপারটা আমি খেয়াল করেছি। কলকাতার লেকের জলে নেমেও দেখেছি শীতকালে লেকের জল বেশ গরম মানে আরামদায়ক থাকে।’
একথা বলার পর একটু থেমে সে বলল, ‘আমি ছোটবেলা থেকে কলকাতায় বড় হলেও আমি তো আদতে বাঙালি নই। তুই জন্মসূত্রেই বাঙালি, আমার থেকে ভালো বাঙলা জানিস। এই রিসর্টের জন্য একটা ভালো বাংলা নাম ঠিক কর তো। বেশ ক্যাচি নাম, যা শুনে পাবলিক এখানে ছুটে আসবে।’
শতদ্রু বলল, ‘জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। তুই রিসর্টের নাম ”নিরিবিলি” রাখতে পারিস। যে সব নারী-পুরুষ একান্তে সময় কাটাতে চায় তাদের কাছে অ্যাট্রাকটিভ হবে নামটা।’
রাকেশ তার কথার জবাবে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক তখনই কাছের গাছটার গুঁড়ির আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে এল একটা লোক। তাকে দেখে কথা থামিয়ে দিল রাকেশ।
লোকটা এসে দাঁড়াল তাদের সামনে। মাঝবয়সি লোক। রোগা ডিগডিগে চেহারা, গলাটা বেশ সরু-লম্বা, মাথায় ছোট ছোট চুল, পরনে একটা ভেজা গামছা।
শতদ্রুদের দেখে লোকটা মৃদু বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করল, ‘বাবুরা এখানে কোথা থেকে এলেন?’
লোকটাকে ভালো করে দেখে নিয়ে রাকেশ বলল, ‘আমার নাম রাকেশ সিং। আমি এখানে এই বাড়ি, জমি জায়গা নিয়েছি। এখানে আমি একটা রিসর্ট, ওই হোটেলের মতো বানাব। তুমি কে? কোথায় থাকো?’
লোকটা জবাব দিল, ‘আমার নাম ”বগা”, আমি এখানেই থাকি।’
লোকটার নাম শুনে শতদ্রু হেসে বলল, ‘বগা! বেশ অদ্ভুত নাম তো!’
লোকটা বলল, ‘আসলে আমার গলাটা বকের মতো লম্বা তো। আর আমি এই নিশি বকের ঝিলে মাছ ধরি। তাই আমাকে লোকে বগা, মানে বক বলে ডাকে।’
বগা নামের লোকটার কথা শুনে রাকেশ বলল, ‘নিশি বকের ঝিল! নিশি বকটা আবার কী?’
লোকটা বলল, ‘এমনি সাদা বক তো নিশ্চয়ই দেখেছেন বাবুরা। নিশি বক হল তার থেকে একটু বড় ধরনের বক। তবে তাদের পিঠ ও মাথার রং কালো হয়। ”নিশি” অর্থাৎ শুধু রাত্রি বেলায় ওরা শিকার ধরতে বেরোয় বলে ওদের নিশি বক বা রাত চরা বলে। ঝিলে রাতে ওদের দেখা মেলে বলে ঝিলের এই নাম। এই আম গাছেই ওদের ডেরা।’
বগা নামের লোকটার কথা শুনে তারা দুজন তাকাল গাছের মাথার দিকে। কিন্তু গাছটা এত ঘন যে নীচ থেকে ডালপালার ভিতর কিছুই দেখা যায় না। তবে তারা খেয়াল করল যে গাছের নীচে ঝোপ-ঝাড় পাতার গায়ে সাদা রঙের পাখির বিষ্ঠা ছড়িয়ে আছে।
শতদ্রু এবার গত রাতের শব্দর ব্যাপারটা অনুমান করে বলল, ‘রাতে কী ওরা ”ওয়াক ওয়াক” শব্দে ডাকে? কাল রাতে অমন শব্দ শুনেছি।’
বগা বলল, ‘হ্যাঁ, বাবু। ওরা ওভাবেই রাতে ডাকে। শীত শেষ হয়ে বসন্ত কাল আসছে। ও সময় ওরা ডিম পাড়ে। আর এই শীতের শেষে ওরা মিলিত হতে শুরু করে। এসময় ওদের ডাক বাড়ে। মিলনের আনন্দে ওরা চিৎকার করে।’
তার কথা শোনার পর রাকেশ একটু ভেবে নিয়ে শতদ্রুকে বলল, ‘তবে এখানে বোটিং-এর ব্যবস্থা করতে হলে পাড়টাকে ভালো করে বাঁধাতে হবে, গাছটাকেও কেটে ফেলতে হবে। আর তাতে রাতের চিৎকারটাও কমবে। ভাবছি গাছ কাটার ব্যাপারটা এ দু-দিনের মধ্যেই সেরে নেব।’
রাকেশ কথাটা শতদ্রুকে বললেও কথাটা শুনে বগা নামের লোকটা বলে উঠল, ‘এ কাজ করতে যাবেন না বাবু। আপনাদের ক্ষতি হবে গাছ কাটলে, নিশি বকের বাসা ভাঙলে।’
এ কথা শুনে রাকেশ বলল, ‘এ জমি আমার। আমার জমির গাছ আমি কাটব, ক্ষতি হবে কেন?’
এ প্রশ্নর জবাবে লোকটা মৃদু চুপ করে থাকার পর বলল, ‘লোকে বলে, যারা এই ঝিলের জলে ডুবে মরে বা ঝিলের পাড়ে অপঘাতে মরে তারা সবাই নিশি বক হয়ে এই গাছে আশ্রয় নেয়। নিশি বক আসলে মানুষের প্রেতাত্মা। রাতের বেলা বেরিয়ে ঝিলের মাছ ধরে। সাপ-ব্যাঙ এসব খায়। এমনকী ঝিলে ভেসে আসা মানুষের মড়াও খায়। ওদের বাসা ভাঙলে আপনাদের ক্ষতি হবে বাবু।’
কথাটা শুনে হো হো করে হেসে উঠে রাকেশ বলল, ‘তবে ভূত তাড়ানোর কাজটাই আগে করতে হবে দেখছি। বগা, গাছ কাটার জন্য তুমি যদি লোক খুঁজে আনো তবে তোমাকে কিছু পয়সা দেব। নইলে আমরা নিজেরাই লোক ধরে আনব।’
বগা নামের লোকটা এবার বেশ উত্তেজিতভাবে বলল, ‘আবারও বলছি বাবুরা, এটা ওদের মিলনের সময়। নতুন বাসা বেঁধেছে নিশি বকের দল ডিম পাড়ার জন্য। এ কাজ আপনারা করবেন না।’
একথা শুনে রাকেশ আবারও হেসে উঠে বলল, ‘ভূত হবার পরও এখানকার লোকদের মজা লোটা, বাচ্চা পয়দা করার দারুণ শখ দেখছি। বগা তোমারও এই নিশি বকদের মতো সাধ জাগে না?’
বগা নামের লোকটা এ প্রশ্নর জবাব না দিয়ে বলল, ‘বাবুরা চলে যান, এ জায়গা ছেড়ে চলে যান। মিলনের ঋতুতে ওদের বিরক্ত করবেন না।’
লোকটার মুখ থেকে চলে যাবার কথা শুনে এবার খেপে গেল রাকেশ। ধমকের সুরে বগার উদ্দেশ্যে সে বলল, ‘অনেকক্ষণ থেকে তোমার বাজে কথা শুনছি! আমার জায়গা ছেড়ে আমাকেই চলে যেতে বলছ! তোমাকেই যেন আমার জমির সীমানার মধ্যে, এই গাছ বা বাড়ির আশেপাশে না দেখি। চলে যাও এখান থেকে।
বগা নামের লোকটা আর কিছু বলল না। অদ্ভুত দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত রাকেশের দিকে তাকিয়ে থেকে পিছন ফিরে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল আম গাছের দিকে ঝিলের পাড়ের ঝোপঝাড়ের আড়ালে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ছেড়ে তারা দুজন বেরিয়ে পড়ল। বড় রাস্তা ধরে মাইল দুই এগোবার পরই গঞ্জর মতো এক জায়গায় উপস্থিত হল তারা। অনেক লোকজন দোকানপাট সেখানে। একটা করাত কল দেখতে পেয়ে সেখানে গাড়ি থামাল রাকেশ। করাত কলের মালিককে গাছ কাটার কথা বলতেই রাজি হয়ে গেল লোকটা। সে বলল, পরদিন ভোরেই সে গাছ কাটার লোক পাঠাবে। এরপর সেই গঞ্জ থেকে আরও কিছু প্রয়োজনীয় খবর সংগ্রহ করে, রান্নার মাংস কিনে দুপুরের মধ্যেই আবার সেই বাড়িতে তারা ফিরে এল।
দুপুরে রান্না-খাওয়া সেরে টানা ঘুম দেবার পর বিকাল বেলা বাড়িটার ঘরগুলো দুজনে ভালো করে ঘুরে দেখল। দীর্ঘ দিনের অব্যবহারের ফলে বাড়ির পিছনের দিকের ঘরগুলো বেশ নোংরা হয়ে আছে। পাখির বিষ্ঠা আর পালক ছড়িয়ে আছে সে সব ঘরে। হয়তো বা সে সব নিশি বকদেরও হতে পারে। গরাদ বসানো থাকলেও কয়েকটা ঘরের জানলার পাল্লা খসে গেছে। হয়তো বা গরাদের ফাঁক গলে ঘরে ঢোকে নিশি বকের দল। বাড়ির পিছনের অংশ ভালো করে মেরামত করে নিতে হবে রাকেশকে।
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল এক সময়। কিছুক্ষণ চারপাশ কালো অন্ধকারে ঢেকে যাবার পর ঝিলের মাথায় চাঁদ উঠল। তারপর রাত একটু বাড়ার পর ধীরে ধীরে ঝিলের দিক থেকে ভেসে আসতে শুরু করল নিশি বকদের সেই ওয়াক ওয়াক ডাক। রাত যত বেড়ে চলল তত বাড়তে লাগল সে শব্দের তীব্রতা। তীব্র কামের তাড়ানায় সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে মিলনের জন্য ডেকে চলছে বকের দল। বাইরে থেকে ভেসে আসা সে শব্দ শুনতে শুনতে রাকেশ বলল, ‘আজ রাতে যত পারুক ভালোবাসা করে নিক পাখিগুলো। কাল রাতে গাছটাও থাকবে না, আর ডাকাডাকিও থাকবে না।’
শতদ্রু বলল, ‘গাছটা কি সত্যি এখনই কাটার দরকার ছিল?’
রাকেশ বলল, ‘কয়েক মাস পরে কাটলেও চলত। কিন্তু এখন কাটবার ব্যবস্থা করলাম ওই বগা নামের লোকটার কথার জন্য। কিছু দিনের মধ্যেই রিসর্টের কাজ শুরু হবে। নানান লোক কাজ করতে আসবে এখানে। তারা যদি শোনে ওই গাছে ভূতের বাসা আছে তবে তা রটে যেতে পারে। ভবিষ্যতে সেজন্য ক্ষতি হতে পারে ব্যবসার। তাই এখনই গাছটা কাটা দরকার।’
নানা গল্প করতে করতে নিশিবকের ডাক শুনতে শুনতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল তারা দুজন।
তিন
পরদিন ভোরের আলো ফোটার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির বাইরে লোকজনের হাঁক-ডাক শোনা গেল। কথামতো করাত কলের লোকজন এসে উপস্থিত হয়েছে গাছ কাটার জন্য। রাকেশ আর শতদ্রু ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গাছ কাটার লোকগুলোকে সঙ্গে করে বাড়ির পিছনে ঝিলের পাড়ে গাছটার কাছে উপস্থিত হল।
সকালের আলো ছড়িয়ে পড়েছে ঝিলের বুকে। মৃদু বাতাসে কাঁপছে জল। মাছ রাঙার দলও ওড়াউড়ি শুরু করেছে ঝিলের বুকে। চারপাশে বেশ ঝলমলে পরিবেশ। তবে, আমগাছটার দিকে তাকিয়ে শতদ্রুর মনে হল গাছটা যেন কেমন থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে কোন অজানা আতঙ্কে। হয়তো বা সে বুঝতে পারছে, তার মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়েছে এ লোকগুলো। তবে, একটা পাতাও নড়ছে না।
গাছটার দিকে তাকিয়ে তার প্রতি বেশ একটু মায়া জাগল শতদ্রুর। তার মনে হল, গাছটা যদি তার নিজের হতো তবে সে গাছটা কাটত না। তার কারণ গাছটা ভূত-প্রেতের আশ্রয় স্থল বলে নয়, রাকেশের মতো সে-ও ওসব বিশ্বাস করে না। গাছটা শতদ্রু কাটত না গাছ ছায়া দেয় বলে, গাছের প্রাণ আছে বলে, গাছ পশু-পাখির আশ্রয়স্থল বলে। বড় বড় গাছগুলো দেখলে শতদ্রুর তাদের কেমন যেন মানুষ বলে মনে হয়!
দুজন শক্ত সমর্থ লোক বড় বড় করাত, কুঠার, মোটা রশি এসব নিয়ে তৈরি হয়ে এসেছে। দক্ষ লোকগুলো বলল, ‘দুপুরের মধ্যেই গাছটাকে তারা মাটিতে নামিয়ে ফেলতে পারবে। সকাল সাতটা বাজে। কাজ শুরু করে দিল তারা। কয়েকজন লোক উঠে পড়ল গাছে। তারা গাছের ডালে কুঠারের আঘাত শুরু করতেই কাঁপতে লাগল গাছ। আর তার পরই গাছের ডালপালার আড়াল থেকে জেগে উঠল সেই ওয়াক ওয়াক শব্দ। না, এই ডাকে মিলনের আহ্বান নেই, আতঙ্ক মিশে আছে এ ডাকের মধ্যে। আর তারপরই নিশি বকদের দেখতে পেল শতদ্রুরা।
গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে প্রাণ ভয়ে উড়তে শুরু করল নিশি বকের দল। তাদের ওড়ার ভঙ্গি দেখে শতদ্রুর মনে হল দিনের আলোতে রাতচরা বকের দল যেন চোখে দেখতে পাচ্ছে না। উড়তে উড়তে তারা নিজেদের মধ্যে ধাক্কা খেয়ে অথবা গাছে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়তে লাগল ঝোপে, ঝাড়ে, ঝিলের জলে। তা দেখে রাকেশ হেসে বলল, ‘ওই বগা নামের লোকটা এখানে থাকলে এখন দেখতে পেত ভূত-প্রেতদের কী অবস্থা!’
ওড়াউড়ি করতে করতে, জলে মাটিতে ছিটকে পড়ে এক সময় হারিয়ে গেল নিশি বকের দল। গাছ কাটা এগিয়ে চলল। ডালপালার সঙ্গে সঙ্গে ওপর থেকে খসে পড়তে লাগল নিশি বকের ভাঙা বাসাগুলো। লোকগুলো সত্যিই এ কাজে দক্ষ। বেলা বারোটার মধ্যেই এতবড় গাছটাকে তারা মাটিতে শুইয়ে ফেলল। যাবার আগে তারা বলে গেল যে বিকাল বা পরদিন সকালে তারা গাড়ি করে গাছের গুঁড়ি, ডালপালা করাত কলে নিয়ে যাবে।
লোকগুলো চলে যাবার পর নিশ্চিন্ত মনে দুপুরের রান্না-খাওয়া সারল তারা। বেলা দুটো বাজে। বাইরে নিঝুম দুপুর। জানলা দিয়ে ঝিল দেখা যাচ্ছে। গাছের গুঁড়ি-ডাল পড়ে আছে ঝিলের পাড়ে। গাছটা না থাকায় সে জায়গায় কেমন যেন একটা অদ্ভুত শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে! সেদিকে একবার তাকিয়ে একটু গড়িয়ে নেবার জন্য বিছানায় শুয়ে পড়ল শতদ্রু। রাকেশের দুপুরে ঘুমবার অভ্যাস নেই। সে শতদ্রুকে বলল, ‘তুই ঘুমিয়ে নে, আমি বাড়িটা ঘুরে দেখি।’—একথা বলে ঘর থেকে সে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু মিনিট দশেকের মধ্যেই আবার সে ঘরে ফিরে এল। শতদ্রু তখনও ঘুমায়নি। রাকেশ ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘উঠে পড়। তোকে একটা অদ্ভুত মজার দৃশ্য দেখাব। তবে কোনও শব্দ করবি না। একদম পা টিপে টিপে আসবি আমার পিছনে।’
রাকেশের কথা শুনে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল শতদ্রু। ঘরের বাইরে বেরিয়ে রাকেশ শতদ্রুকে নিয়ে উপস্থিত হল বাড়ির পিছনের অংশে। তারপর ইশারায় একটা ঘর দেখিয়ে নিঃশব্দে শতদ্রুকে নিয়ে এগোল সে ঘরের দিকে। ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ তবে জানলার একটা পাল্লা ভাঙা। সেই জানলার কাছে উপস্থিত হয়ে শতদ্রুকে সে উঁকি দিতে ইঙ্গিত করল ঘরের মধ্যে। সাবধানে ঘরের ভিতর উঁকি দিল শতদ্রু। তার চোখে ধরা দিল এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য!
ঘরের এক কোণে রয়েছে একজন নারী ও একজন পুরুষ। বিবস্ত্র, মিথুন কার্যে লিপ্ত তারা। সেই নারী-পুরুষ এমনভাবে মিলিত হচ্ছে যেন বাহ্যজ্ঞান রহিত অবস্থায় আছে। মেয়েটার গলা থেকে বেরোনো শীৎকারের শব্দও যেন অনেকটা নিশি বকের ডাকের মতোই শোনাচ্ছে! ঘরের কোণটা আধা অন্ধকার হলেও পুরুষটাকে চিনতে পারল শতদ্রু। আরে এ যে সেই বগা! তবে নারীর বয়স তার থেকে বেশ কম বলেই মনে হল, কিশোরী বা যুবতী হবে সে। ঘরের ভিতরের দৃশ্য দেখে নেবার পর জানলার পাশ থেকে সরে এল শতদ্রু। ঠিক সেই সময় রাকেশ একটা কাজ করল, নিঃশব্দে দরজার গায়ে লাগানো হুড়কোটা আটকে দিল। তারপর সে শতদ্রুকে ইশারা করল ফেরার জন্য।
সে ঘর থেকে কিছুটা এগোবার পর শতদ্রু বিস্মিত ভাবে জানতে চাইল, ‘দরজায় হুড়কো দিলি কেন? তোর মতলবটা কী?’
রাকেশ বলল, ‘তেমন কিছু না। বাইরে বেরাতে না পেরে ওরা যখন ভয় পেয়ে চিৎকার করবে তখন গিয়ে দরজা খুলে দেব। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস বগা নামের লোকটা কেন আমাদের কাছে নিশি বক ভূতের গল্প ফেঁদেছিল? কেন আমাদের এখান থেকে চলে যতে বলেছিল? আসলে লোকটা বদমাইশ। সে এসে ফূর্তি করে এখানে। তাই ভূতের ভয় দেখিয়ে আমাদের এ জায়গা থেকে তাড়াতে চাইছিল। এরপর যাতে লোকটা আর এ মুখো না হয় সেই কারণেই কিছু সময়ের জন্য ওকে আটকে রাখার ব্যবস্থা করলাম।’
কথা বলতে বলতে ঘরে ফিরে এল তারা।
দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল এক সময়। কিন্তু সে ঘরের দরজা ধাক্কাবার বা ডাকাডাকির কোনও শব্দ হল না। রাকেশ বলল, ‘হয়তো ওরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না দরজাটা কী ভাবে বন্ধ হল, অথবা সংকোচে চিৎকার করতে পারছে না। দেখা যাক কী হয়?’
এ কথা বলার পর সে বলল, ‘সঙ্গে একটা হুইস্কির বোতল এনেছি। তা নিয়ে আজ সন্ধ্যায় এই প্রপার্টি লিজ নেবার ব্যাপারটা সেলিব্রেট করব।’
বিকাল শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামল এক সময়। নিশি বকের ঝিলে নেমে এল অন্ধকার।
চার
বাইরে অন্ধকার নামার পর জানলা বন্ধ করে একটা বড় মোমবাতি জ্বালিয়ে সন্ধ্যাসরে বসে পড়ল তারা দুজন। হুইস্কির বোতল খুলতে খুলতে রাকেশ বলল, ‘দু-দিন রাতে তো ওই হতচ্ছাড়া বকগুলোর ডাকে ভালো করে ঘুমই হল না। আজ সে উপদ্রব হবে না বলেই মনে হয়। তাছাড়া হইস্কিও পেটে পড়বে। রাতে ঘুমটা ভালোই হবে। করাত কলের লোকগুলো বিকালে যখন এল না তখন নিশ্চয়ই সকালে আসবে। তাদের কিছু বুঝিয়ে দেবার পর একটু বেলার দিকে কলকাতা ফেরার জন্য রওনা দেব।’
রাকেশ বোতলটা খোলার পর দুটো গ্লাসে পানীয় ঢালতে ঢালতে শতদ্রু বলল, ‘এখনও কিন্তু ওই ঘরটার থেকে কোনও শব্দ এল না! কেমন যেন একটু অদ্ভুত লাগছে!
রাকেশ বলল, ‘তেমন হলে কাল সকালে গিয়ে দরজা খুলব। সারা রাত আটকে থাক ব্যাটারা। ওদের কথা না ভেবে আমরা এখন সেলিব্রেশন শুরু করি। চিয়ার্স!—এ কথা বলে গ্লাস উঠিয়ে নিল সে।
শুরু হল মদ্যপান। আর তার সঙ্গে নানা গল্প। অন্ধকার কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে চাঁদ উঠতে শুরু করল ঝিলের ওপর। বেড়ে চলল রাত। নিশি বকের সেই ওয়াক ওয়াক ডাক আর বাইরে থেকে ভেসে এল না ঘরে। তাদের কথা ভুলে গিয়ে মদ্যপান করে চলল দুই বন্ধু। চড়তে শুরু করল তাদের নেশা। কীভাবে যে সময় এগিয়ে চলেছে তারা তারা বুঝতেই পারল না।
রাত দশটা নাগাদ মোমের আলো যখন নিভু নিভু হয়ে এলো এখন তাদের হুঁশ ফিরল বোতলটাও তখন প্রায় শেষ হয়ে গেছে।। শতদ্রু বলল, ‘রাতে আর খাবার ইচ্ছা নেই। আমি এবার শুয়ে পড়ব।’
রাকেশ বলল, ‘আমিও রাতের খাবার খাব না। তুই শুয়ে পড়। বোতলের তলানিটুকু শেষ করে আমি শুচ্ছি।’
ঠিক এই সময় হঠাৎই একটা শব্দ শোনা গেল! বাইরে থেকে যেন কেউ ঠক-ঠক করে টোকা দিল জানলাতে! কে টোকা দিচ্ছে? বার কয়েক শব্দটা হতেই খাট থেমে নেমে দুজনে গিয়ে দাঁড়াল জানলার সামনে। রাকেশ একটানে জানলার পাল্লাটা খুলে ফেলতেই একটা নিশি বক ঝটপট শব্দে উড়ে গেল জানলার গা থেকে। তা দেখে রাকেশ বলল, ‘পাখিটা ঘরের ভিতর ঢোকার চেষ্টা করছিল, ঠোঁট দিয়ে ঠোকা দিচ্ছিল। আর আমি ভেবেছিলাম কোনও মানুষ!’
বাইরে ফটফট করছে চাঁদের আলো। আর এরপরই বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘আরে, করাত কলের লোকগুলো চলে এসেছে দেখছি! এত রাত হয়েছে বলে সম্ভবত ওরা আর আমাদের ডাকেনি।’
রাকেশের কথা শুনে শতদ্রু বাইরে তাকিয়ে দেখল বেশ কয়েকজন লোক চাঁদের আলোতে ঝিলের পাড়ে পড়ে থাকা গাছের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের পোশাক দেখে করাত কলের লোক বলেই মনে হচ্ছে।
রাকেশ বলল, ‘তুই শুয়ে পড়। আমি একবার ওদের সঙ্গে কথা বলে আসি।’—এই বলে খাটের থেকে জ্যাকেটটা তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। শতদ্রু বিছানায় শুয়ে পড়ল।
ঘুমিয়ে পড়েছিল শতদ্রু। হঠাৎই বাইরে থেকে ভেসে আসা ওয়াক শব্দে ঘুম ভাঙল শতদ্রুর। মোমের আলো নিভে গেছে। খোলা জানলা দিয়ে একফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরে। কিন্তু রাকেশ ঘরে ফেরেনি। রেডিয়াম লাগানো রিস্ট ওয়াচের দিকে তাকিয়ে শতদ্রু অবাক হয়ে গেল। রাত দুটো বাজে। অর্থাৎ চারঘণ্টা আগে বাইরে বেরিয়েছে রাকেশ। সে এখনও ফিরল না কেন? শতদ্রু খাট থেকে নেমে জানলার সামনে গিয়ে বাইরে তাকাল। না, ঝিলের পারে রাকেশ বা কোনও লোকজন নেই। কোথায় গেল সব? একটু ইতস্তত করে রাকেশের খোঁজে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল শতদ্রু। সে পৌঁছে গেল বাড়ির পিছনের দিকে।
চাঁদের আলোতে কেমন যেন এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে ঝিলের পাড়ে। কিন্তু তারই মধ্যে মাটিতে পড়ে থাকা গাছের গুঁড়ির ওপর বেশ কয়েকজন লোককে বসে থাকতে দেখল শতদ্রু। তবে কি করাত কলের লোকেদের সঙ্গে ওখানেই বসে আছে রাকেশ? শতদ্রু এগোল সেদিকে।
কিন্তু সে ঝিলের পাড়ের কাছে পৌঁছতেই লোকগুলো যেন বেমালুম মিলিয়ে গেল। তবে কি নেশার ঘোরে, ঘুম চোখে ভুল দেখল শতদ্রু? লোক নয়, মাটিতে পড়ে থাকা গাছের গুঁড়ির ওপর সার বেঁধে বসে আছে একদল নিশিবক! শতদ্রু তাদের কাছে পৌঁছতেই তারা উঠে গিয়ে ঝিলের আকাশে পাক খেতে শুরু করল। শতদ্রু চোখ কচলে তাকাল চারদিকে। না কেউ কোথাও নেই। কিন্তু এরপরই জলের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল সে। পাড় থেকে কিছুটা তফাতে জলের মধ্যে গাছের ডালের মতো কী যেন ভাসছে। ভালো করে সেদিকে তাকাতেই শতদ্রুর সব নেশা ছুটে গেল। আরে ও তো রাকেশ! ওই তো তার গায়ের লাল জ্যাকেটটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে! শতদ্রু চিৎকার করে উঠল তার নাম ধরে। কিন্তু কোনও সাড়া এল না। রাকেশ জলে নামল কী ভাবে। সে তো সাঁতার জানে না।
আতঙ্কিত, বিহ্বল শতদ্রু ভাবতে লাগল সে এখন কী করবে? কোথায় কাকে ডাকবে? আর এরপরই হঠাৎ তার মনে পড়ল ঘরবন্দি নারী-পুরুষের কথা। তাদের সাহায্যের জন্য সঙ্গে সঙ্গে ঝিলের পাড় থেকে ছুটল বাড়িটার দিকে।
দরজার সামনে পৌঁছে শতদ্রু হুড়কো খুলে একটানে দরজা খুলে ফেলল। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে চমকে দিয়ে তার পায়ে ডানার ঝাপটা দিয়ে বাইরে ঝিলের দিকে উড়ে গেল দুটো নিশি বক। খোলা দরজা দিয়ে ঢোকা চাঁদের আলোতে দেখতে পেল ঘরের ভিতর কোনও মানুষ নেই! দুটো বকই ছিল যারা বাইরে উড়ে গেল! আর তারপরই নিশি বকের উল্লসিত ওয়াক, ওয়াক চিৎকারে মুখরিত হয়ে উঠল রাতের পৃথিবী।
ঝিলের দিকে তাকিয়ে শতদ্রু দেখল ঘরবন্দি নিশিবক দুটো সোজা উড়ে গিয়ে বসেছে ঝিলের জলে ভাসতে থাকা রাকেশের দেহর ওপর। আর অন্য বকেরাও ডাকতে ডাকতে আকাশ থেকে নেমে আসছে ঝিলের পাড়ে। মাটিতে পা রেখেই মানুষের অবয়বে রূপান্তরিত হচ্ছে তারা।
জ্ঞান হারাবার আগে শতদ্রু স্পষ্ট দেখতে পেল রাকেশের ভাসমান দেহের ওপর চাঁদের আলোতে মিলিত হচ্ছে বিরাট দুটো নিশিবক অথবা সেই বগা আর তার সঙ্গিনী! আর পাড়ে দাঁড়ানো কালো কালো মানুষের অবয়বগুলো যেন তীব্র আনন্দে ওয়াক ওয়াক শব্দে ডেকে ডেকে চলেছে সেই মিথুন দৃশ্য দেখে।
পরদিন ভোরে করাত কলের লোকেরা উপস্থিত হয়ে শতদ্রুর জ্ঞান ফিরিয়ে তাকে জানাল গত রাতে তারা আসেনি। রাকেশের মৃতদেহ যখন তারা ঝিল থেকে উঠিয়ে আনল তখন তার পোশাক ছিন্নভিন্ন। রাকেশের শরীর ঠুকরে খেয়েছে কেউ বা কারা। তা দেখে কেউ একজন বলল, ‘নিশি বকের কাণ্ড হবে। শুনেছি ওরা মড়াও খায়। লোকটার কথার সঙ্গে সঙ্গেই কোন একটা ঝোপের আড়াল থেকে একটা নিশি বক ডেকে উঠল ওয়াক ওয়াক শব্দে! শতদ্রু সেদিকে তাকিয়ে দেখল ঝোপের আড়াল থেকে উকি দিচ্ছে বগা নামের লম্বা গলাওয়ালা লোকটা। আবারও জ্ঞান হারাল শতদ্রু।
