Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/28
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সোমনাথ সুন্দরী – ২

গুর্জর দেশের অন্তর্গত এই প্রাচীন নগরী। সোলাঙ্ক বংশীয় রাজপুত নৃপতি ভীম গুর্জর দেশের শাসনকর্তা। উর্ম্মিমালা বিধৌত এ নগরীর নাম প্রভাস পত্তন বা দেবপত্তন। প্রাচীন নগরী। তবে এ নগরী বাণিজ্য ক্ষেত্র হিসাবে যত না পরিচিত তার চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত তীর্থক্ষেত্র হিসাবে। তবে অঙ্গিরা ইতিপূর্বে এ নগরীতে কোনও দিন আসেনি। সত্যি কথা বলতে সে যেখানে বড় হয়ে উঠেছে সেই বল্লভী নগরীর বাইরেও ইতিপূর্বে কোনও দিন পা রাখেনি সে।

অশ্বপৃষ্ঠে বল্লভী থেকে প্রভাস পত্তন পাঁচ দিনের পথ। গতকাল সন্ধ্যাতেই নগরীর প্রান্ত সীমায় উপস্থিত হয়েছিল সে। কিন্তু অন্ধকার নামতে চলেছে দেখে সে আর নগরীতে প্রবেশ করা সমুচিত মনে করেনি। কারণ এ নগরী অঙ্গিরার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। তা ছাড়া সে শুনেছে যে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই মন্দিরের প্রবেশ তোরণ বন্ধ হয়ে যায়। হয়তো সে প্রবেশ করতে পারত না মন্দিরে। যে মন্দির তার গন্তব্য। কাজেই অঙ্গিরা নগরীতে প্রবেশ না করে নগরীর উপকণ্ঠে এক কাননে কিছু তীর্থ যাত্রীদের সঙ্গে রাত্রিবাস করেছিল।

রাত্রিবাস সাঙ্গ করে, কাননের সন্নিকটে এক ক্ষুদ্র জলাশয়ে স্নান সমাপন করে, সে যখন নগরীর প্রবেশ তোরণের সামনে উপস্থিত হল, তখন সূর্যদেব ওপরে উঠতে শুরু করেছেন। নগরীর ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। প্রবেশ তোরণের সামনে নানা জাতের মানুষের ভিড়। কিছু রক্ষীও আছে।

তোরণের এক পাশে একটা বিরাট অশ্বশালা আছে। তীর্থযাত্রীরা অশ্ব গচ্ছিত রাখে সেখানে। অঙ্গিরা সেখানে তার ঘোড়াটাকে জমা রেখে পদব্রজে তোরণের সামনে এসে দাঁড়াল। হয়তো সে অস্ত্র সজ্জিত দেখেই কয়েকজন রক্ষী এসে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তাদের একজন তাকে প্রশ্ন করল, ‘কোথা থেকে আসা হচ্ছে?’

অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘বল্লভী নগরী।’

অপর একজন যুবককে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কোথায় যাবে?’

‘মন্দিরে।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল অঙ্গিরা।

‘সোমেশ্বরের দর্শনে যাবে তো সঙ্গে ধনুর্বাণ কেন? তরবারি কেন? তুমি কি যুদ্ধ ব্যবসায়ী?’ জানতে চাইল রক্ষী।

অঙ্গিরা জবাব দিল ‘না, আমি যুদ্ধ ব্যবসায়ী নই। তবে, অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। এগুলো আমার সঙ্গে থাকে।’

‘কিন্তু ভিনদেশীদের তো অস্ত্র বহন করে নগরীতে প্রবেশের অনুমতি নেই। মন্দিরে তো নয়ই। অস্ত্র ত্যাগ করে তোমাকে নগরীতে প্রবেশ করতে হবে।’ বলে উঠল একজন রক্ষী।

অতীতে বহুবার আক্রান্ত হয়েছে, লুণ্ঠিত হয়েছে সোমেশ্বরদেবের মন্দির। আরব শাসনকর্তা জুয়ানেদ তো একবার ধ্বংসই করেছিলেন সোমনাথ মন্দির। যদিও মহাদেবের কৃপায় আবার নতুন করে গড়ে উঠেছে চিরন্তন পীঠ আর এই নগরী। যদিও এই আগন্তুকের চেহারা দেখে তাকে যবন বলে মনে হয় না। আর তার সঙ্গে অন্য কেউও নেই। তবুও সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এমনওতো হতে পারে লোকটা গুপ্তচর? তাই রক্ষীদের দলপতি এরপর অঙ্গিরাকে বলল, ‘তুমি মন্দিরে কি করতে যাবে? তোমাকে দেখে তো ঠিক পুণ্যার্থী বলে মনে হচ্ছে না!’

প্রশ্ন শুনে একটু ইতস্তত করে অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘আমি পুরোহিতশ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেবের সাক্ষাৎপ্রার্থী।’ অঙ্গিরার জবাব শুনে অবাক হয়ে গেল রক্ষীরা। এই প্রভাস পত্তনের চিরন্তন পীঠের সর্ব প্রধান ব্যক্তি হলেন ত্রিপুরারিদেব। শুধু তাই নয়, গুর্জর রাজের পর এ রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সম্মানীয় ব্যক্তি তিনি। তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী এই ভিনদেশী যুবক!

অঙ্গিরা রক্ষীদলের মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারল যে তার কথাটা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। এদিকে সূর্যদেব মাথার ওপর উঠে চলেছেন। মন্দিরে পৌঁছতে বিলম্ব হয়ে যাচ্ছে অঙ্গিরার। কাজেই সে এবার এই রক্ষীদলের হাত থেকে মুক্তি লাভের আশায় তার কোমরবন্ধ থেকে একটা বিশেষ ধরনের স্বর্ণমুদ্রা বার করে সেটা এগিয়ে দিল রক্ষীপ্রধানের দিকে।

সেটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে চমকে উঠল রক্ষী প্রধান। সোনার চাকতিটার এক পার্শ্বে খোদিত আছে সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের ছবি, আর অন্য পার্শ্বে খোদিত রাজা ভীম আর প্রধান পুরোহিতের সম্মিলিত স্বাক্ষর। এ মুদ্রার নাম ‘সোমেশ্বর মুদ্রা।’ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত স্বহস্তে এ মুদ্রা অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু লোককে প্রদান করে থাকেন।

এ নগরীর হাতে গোনা কয়েকজন লোকমাত্র এই মুদ্রা প্রাপক। যারা প্রাপক তাদের মৃত্যু হলে তাদের মুদ্রা আবার তার পরিবারকে সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরে ফিরিয়ে দিতে হয়, নচেৎ মৃতের দাহকার্য সম্পন্ন হয় না। আর এই মুদ্রা কেউ চুরি করলে তার মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে।

অতীব গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা আসলে হল বিশেষ ধরনের ছাড়পত্র ও ক্ষমতার আধার। এ মুদ্রা যাঁর কাছে থাকে সে একমাত্র মন্দিরের গর্ভগৃহ ব্যতিরেকে মন্দিরের যে-কোনও স্থানে বা নগরীর যে-কোনও স্থানে যখন খুশি প্রবেশ করতে পারে। রাজ কর্মচারীদের নির্দেশদানও করতে পারে তাঁরা। যাঁদের কাছে সোমেশ্বর মুদ্রা থাকে তাকে সোমেশ্বরের পরম সেবক রূপে চিহ্নিত করেন প্রধান পুরোহিত।

সোমেশ্বর মুদ্রা লাভের জন্য পুরোহিতকুল ও সেবায়েতদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও চলে। কেউ কেউ একে দ্বাদশ মুদ্রাও বলেন। শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মতো এই মুদ্রার সংখ্যাও দ্বাদশ বা বারোটি। কোনও মুদ্রা প্রাপকের মৃত্যু হলে তবেই প্রধান পুরোহিত তা তুলে দেন নতুন কারো হাতে। সেই মুদ্রার অধিকারী এই ভিনদেশী যুবক।

বিস্ফারিত নেত্রে মুদ্রাটা পর্যবেক্ষণ করে মুদ্রাটা অঙ্গিরার হস্তে সমর্পণ করে রক্ষীপ্রধান বলল, ‘মার্জনা করবেন। আপনি এ মুদ্রার অধিকারী তা আমরা বুঝতে পারিনি। আপনার গতিরোধ করে সময় অপচয় করার জন্য দুঃখিত। আপনি যদি প্রয়োজন অনুভব করেন তবে আমার রক্ষীরা মন্দিরের দ্বারপ্রান্তে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারে।’

অঙ্গিরা জবাব দিল ‘না। তার কোনও প্রয়োজন নেই।’

অঙ্গিরা প্রবেশ করল নগরীতে। পাথরের তৈরি প্রধান সড়ক সোজা চলে গেছে সমুদ্র তীরস্থ মন্দির অভিমুখে। পথপার্শ্বে পাথর আর কাষ্ঠ নির্মিত ছোট-বড় গৃহ, তীর্থযাত্রীদের আবাসস্থল। আর প্রত্যেক মন্দির নগরীর মতো এ নগরীতেও নানা ক্ষুদ্রাকৃতির উপমন্দির অর্থাৎ অন্যান্য দেব-দেবীর ছোট-ছোট মন্দির আছে। আর আছে পূজা উপাচার সংগ্রহের জন্য অসংখ্য বিপনি। ফুল, ধূপ, পট্টবস্ত্র, পাথর অথবা ধাতু পাত্রের দোকান। শিব পূজার আবশ্যিক উপাদান সবুজ বিল্বফল স্তুপাকৃত হয়ে রয়েছে কোথাও কোথাও। সোমনাথ মহেশ্বরের উদ্দেশ্যে ধনাঢ্যরা স্বর্ণ-রৌপ্য দান করে। সে সবের বিপণিও রয়েছে কোথাও কোথাও।

দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শহরবাসী ও পুণ্যার্থী ভক্তরা পথে নেমে পড়েছে। নানা জাতের নানা মানুষের ভিড় আর হাঁক-ডাকে সরগরম চারদিক। আর তার সঙ্গে আছে উপমন্দিরগুলোর ঘণ্টাধ্বনি আর তার সামনে বসা ভিক্ষু-পঙ্গুদের ভিক্ষা লাভের কাতর আবেদন। কেউ কেউ দয়াপরবশ হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে মুদ্রা ছুড়ে দিচ্ছে। বিশেষত যে সব তীর্থযাত্রীরা সোমেশ্বর দর্শন শেষে ঘরে ফিরছে তারা ভিক্ষুকদের দান করছে পুণ্য লাভের জন্য। আর আছে মহাদেবের বাহন প্রকাণ্ড কিছু ষণ্ড। মাঝে-মাঝেই খাদ্য লোভে ফুলমালার পসরাতে তারা হানা দিচ্ছে।

যে সব পূণ্যার্থী সোমেশ্বরকে দর্শন করতে আসেন তাদের মধ্যে অধিকাংশরই মন্দিরের অতিথি নিবাসে স্থান সঙ্কুলান হয় না। হবার কথাও নয়। পথ পার্শ্বে মাঝে মাঝে উন্মুক্ত স্থানে বিরাট বিরাট ছত্রী আছে। ধনহীন সাধারণ পুণ্যার্থীদের রাত্রিবাসের, আহারাদির স্থান এ জায়গাগুলোই। সেখানে এই সকালবেলাই বিরাট বিরাট ধাতব পাত্রে তাদের জন্য আহার প্রস্তুত হচ্ছে।

এ সব দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল অঙ্গিরা। পথ চিনতে কোনও অসুবিধা নেই। জনস্রোত সোজা এগিয়ে চলেছে মন্দিরের দিকে। বিরাট বিরাট পুণ্যার্থীদের দল সব। তাদের সবার আগে নিশানবাহী একজন লোক। এক এক দলের এক এক রকম নিশান। যাতে কেউ দলছুট না হয়ে যায়, তাই নিশান দেখে এগোচ্ছে সে দলের পশ্চাদবর্তী লোকেরা। আর তাদের সঙ্গে সঙ্গে শুভ্রবসন পরিহিত মুণ্ডিত মস্তক পুরোহিতের দল।

তীর্থযাত্রীদের মন্দির দর্শন করালে তাদের প্রাপ্তি যোগ হবে। তাই দলগুলোর সঙ্গে ছুটে চলেছে তারা। সেই জনতার ভিড়ে মিশে এগোতে এগোতে কিছু সময়ের মধ্যেই দূর থেকে মন্দিরের শীর্ষদেশ দেখতে পেল অঙ্গিরা। দিনের আলোতে দূর থেকেই ঝলমলে দ্যুতি ছড়াচ্ছে মন্দির শৃঙ্গ। যেন আরও একটা সূর্য স্থাপিত হয়েছে সেখানে।

স্বর্ণ কলসের ওপর প্রোথিত জয়ধ্বজা সমুদ্রর বাতাসে পতপত করে উড়ছে। যে মন্দিরের দিকে অঙ্গিরা প্রবেশ করার জন্য এগোচ্ছে, সে স্থানে ইতিপূর্বে সে না গেলেও সেই মন্দির সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা আছে অঙ্গিরার। সোমেশ্বর মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে সমুদ্রর মধ্যে একটা বিশাল স্তম্ভ আছে। ওই স্থানটাই নাকি পৃথিবীর শেষ সীমানা।

অঙ্গিরা যতই মন্দিরের দিকে যেতে লাগল, ততই ভিড় বাড়তে লাগল। তীর্থযাত্রীদের ভিড় তো আছেই, তার সঙ্গে পুরোহিত আর সেবায়েতদের ভিড়। সাধারণ পুরোহিত আর সেবায়েতদেরও একটা বড় অংশের বাসস্থান মন্দিরের বাইরে প্রাকার সংলগ্ন অঞ্চলে।

ধীরে ধীরে মন্দিরটা জেগে উঠতে লাগল অঙ্গিরার চোখের সামনে। স্বর্ণধ্বজা, স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত বিশাল বিশাল থাম, মন্দির প্রাকার। হাজার জনতার ভিড়ে মিশে এক সময় সে সত্যি পৌঁছে গেল মন্দিরের সামনে। সোমনাথ মন্দির!

বাল্যকাল থেকে সে কত শুনেছে এই মন্দিরের কথা। কিন্তু এ মন্দির যে এত বিশাল তা ধারণা ছিল না অঙ্গিরার। ঘণ্টাধ্বনি আর ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে মন্দির চত্বর থেকে। আর আসছে ‘জয় সোমেশ্বর’, ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি। মন্দিরের সুউচ্চ প্রাকারও অলঙ্করণ শোভিত। উন্মুক্ত রৌপ্য খচিত বিশাল তোরণ দিয়ে বহু মানুষ আসা-যাওয়া করছে।

মন্দিরের সেই প্রবেশ তোরণের কিছু রক্ষী আর লাঠিধারী সেবায়েতদের ভিড়। মন্দির চত্বরে পুণ্যার্থীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। অঙ্গিরা বুঝতে পারে শস্ত্রধারী অঙ্গিরাকে তারা সাধারণভাবে মন্দিরে প্রবেশ করতে বাধাদান করবে। সেবায়েতদের মধ্যে একজন নেতৃত্ব দিচ্ছে অন্যদের। ব্যাপারটা খেয়াল করে সে সটান হাজির হল লোকটার কাছে। তারপর কোমরবন্ধ থেকে সোমেশ্বর মুদ্রাটা বার করে সেটা সেবায়েত প্রধানকে দেখিয়ে বলল, ‘আমি পুরোহিত শ্রেষ্ঠর সাক্ষাৎপ্রার্থী।’

নগরতোরণের সেই রক্ষী প্রধানের মতো এ লোকটাও অবাক হয়ে গেল ভিনদেশী এই যুবকের কাছে সোমেশ্বর মুদ্রা দেখে। প্রবেশ তোরণের ঠিক গায়েই একটা ছত্রী আছে। লোকটা কয়েকজন সেবায়েতকে ডেকে বিষয়টা সম্বন্ধে তাদের অবগত করে তাদের তত্ত্বাবধানে, বলা ভালো তাদের প্রহরাতে অঙ্গিরাকে সেই ছত্রীর নীচে রেখে মন্দিরের ভিতরে ঢুকল কর্তাব্যক্তিদের এই শস্ত্রধারী যুবকের আগমন সংবাদ দিতে।

ছত্রীর নীচে দাঁড়িয়ে অঙ্গিরা জনসমাগম দেখতে লাগল। আর সেবায়েতরা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল তাকে। কে এই ভিনদেশী যুবক? সোমেশ্বর মুদ্রা এ যুবক হস্তগত করল কী ভাবে? অঙ্গিরার প্রতি কৌতূহলের দৃষ্টিতে দেখতে লাগল তারা।

বেশ কিছুক্ষণ পর সেবায়েত প্রধান ফিরে এল। তার সঙ্গে একজন প্রৌঢ় পুরোহিত। মুণ্ডিত মস্তক, শুভ্রবসন পরিহিত লোকটার গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের। কর্ণে হীরক খচিত স্বর্ণ কুণ্ডল ঝিলিক দিচ্ছে সুর্যলোকে। পায়ে রূপোর পটি বসানো কাঠের পাদুকা। একজন সেবায়েতও আছে লোকটার পিছনে। রৌপ্যদণ্ড সমন্বিত মখমলের ছাতা সে ধরে আছে পুরোহিতের মাথায়। দেখেই বোঝা যাচ্ছে স্বর্ণ কুণ্ডলধারী, কপালে বাহুতে চন্দন চর্চিত বৃষস্কন্ধ কৃষ্ণবর্ণের এই ব্রাহ্মণ সাধারণ কোনও পুরোহিত নন।

লোকটা প্রথমে অঙ্গিরার সামনে এসে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল তাকে। তারপর হাত বাড়াল সেই সোমেশ্বর মুদ্রাটা পরখ করার জন্য। মুদ্রাটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর সেটা যে খাঁটি সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলেন ব্রাহ্মণ। তারপর সেটা অঙ্গিরাকে ফিরিয়ে দিয়ে নিজের আত্মপরিচয় দিয়ে বলল ‘আমি মল্লিকার্জুন। এ মন্দিরের সহ-প্রধান পুরোহিত। যুবক তোমার পরিচয় কী? প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাও কেন?’

অঙ্গিরা তাকে নিজের পরিচয় দান করে বলল, ‘আমার যুবা বয়স লাভ হলে প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা। প্রধান পুরোহিত তেমনই নির্দেশ দিয়েছিলেন আমার পিতা-মাতাকে। সেই নির্দেশ পালন করতেই আমি চিরন্তন পীঠে উপস্থিত হয়েছি। আমার নাম অঙ্গিরা।’

অঙ্গিরার জবাব শুনে তাকে আর কোনও প্রশ্ন করলেন না মল্লিকার্জুন। ইশারায় তিনি তাকে অনুসরণ করতে বললেন। সোমনাথ মন্দিরে পা রাখল অঙ্গিরা। কেমন যেন এক শিহরন অনুভব করল সে। যখন থেকে তার জ্ঞান হয়েছে, কথা বলতে বুঝতে শিখেছে, তখন থেকে সে কত গল্প শুনে এসেছে এই মন্দির সম্পর্কে। অবশেষে আজ সে পা রাখল এই মন্দির প্রাঙ্গণে।

চারপাশে ভক্তকুলের ভিড়, ঘণ্টাধ্বনি আর সোমেশ্বর মহাদেবের নামে জয়ধ্বনি। প্রাকার তোরণ থেকে যে পথ সোজা মন্দিরের দিকে এগিয়েছে তার দু-পাশে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে সুরম্য উদ্যান। মাঝে মাঝে সেখানে ছোট ছোট উপমন্দিরও আছে। এসব দেখতে দেখতে মন্দিরের সোপানশ্রেণীর সামনে উপস্থিত হল অঙ্গিরা। এ জায়গা থেকে মন্দিরের ওপরের চত্বর পর্যন্ত তিল ধারণের স্থান নেই ভক্ত সমাগমে।

সোপানশ্রেণী যেখান থেকে শুরু হয়েছে ঠিক তার সামনেই শ্বেতপাথর বাঁধানো একটা হাত খানেক চওড়া প্রণালী আছে। গোড়ালি পর্যন্ত জল ধারা তার একদিক থেকে অপরদিকে প্রবাহিত হচ্ছে। সে জলে পা ডুবিয়েই শুদ্ধ হয়ে মন্দিরের সোপানশ্রেণীতে ওঠার জন্য পা রাখতে হয়। এ জায়গাতে এসে থামতে হল অঙ্গিরাকে।

মল্লিকার্জুন, অঙ্গিরাকে বললেন, ‘চর্মপাদুকা, চর্মদ্রব্য আর অস্ত্র নিয়ে মন্দির চত্বরে ওঠা নিষেধ। এসব এখানে ত্যাগ করতে হবে। তবে নিশ্চিন্তে থাকো। তোমার জিনিসগুলো যত্নেই থাকবে। যথা সময় আবার তুমি তা গ্রহণ করতে পারবে।’

সহ-প্রধান পুরোহিত সোপানশ্রেণীর সামনে জলধারার নিকটে এসে দাঁড়াতেই তাকে দেখে কয়েকজন সেবায়েত তাঁর আজ্ঞা পালনের জন্য হাজির হয়েছিল। মল্লিকার্জুনের নির্দেশ মতো তাদের কাছেই পাদুকা, অস্ত্র সমর্পণ করল অঙ্গিরা। তারপর পরিখার জলে পা ডুবিয়ে দেহকে পবিত্র করে মল্লিকার্জুনকে অনুসরণ করে উঠতে শুরু করল সোপানশ্রেণী বেয়ে।

অন্তত দুই শত হাত চওড়া সোপানশ্রেণী। প্রচুর লোক ওঠা নামা করছে। প্রধান তিনটি ধাপ আছে সোপানশ্রেণীতে। অঙ্গিরা যখন দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছল তখন ওপর দিক থেকে নেমে এল একদল রমণী। পরনে তাদের জরিবোনা পট্টবস্ত্র, বাহুতে, গলায়, কবরীতে ফুলমালা। স্বর্ণনিক্কন আর স্বর্ণভূষণা যুবতী সব।

কাজল আর কুমকুম সজ্জিত মুখমণ্ডলের সেই অপরূপারা ছমছম নূপুর ধ্বনি তুলে ওপর থেকে নামতে নামতে মল্লিকার্জুনকে দেখে মুহূর্তের জন্য থামল। মাথা ঝুঁকিয়ে তারা প্রণাম জানাল সহ-প্রধান পুরোহিতকে। মল্লিকার্জুনও মুহূর্তের জন্য থেমে আপন গাম্ভীর্য ও পদমর্যাদা বজায় রেখে মাথাটা মৃদু নাড়ালেন প্রণাম গ্রহণের জন্য। তারপর আবার অঙ্গিরাকে নিয়ে উঠতে শুরু করলেন ওপর দিকে। যুবতীর দল নেমে গেল নীচের দিকে।

এদের দেখে অঙ্গিরার মনে হল ঠিক যেন এক ঝাঁক রঙিন প্রজাপতি চলে গেল তার পাশ দিয়ে। অঙ্গিরা অনুমান করল এই সুন্দরী রমণীরা নিশ্চয়ই দেবদাসী। এদের গল্পও শুনেছে সে। এই রমণীকুল নিজেদের জীবন-যৌবন সমর্পণ করেছে সোমেশ্বর মহাদেবকে।

মল্লিকার্জুনের পশ্চাদ্ধাবন করে অঙ্গিরা অবশেষে উঠে এল মন্দিরের প্রধান চত্বরে। ওপরে উঠে চমকে গেল সে। এখানকার স্তম্ভ, দেওয়াল সবই স্বর্ণমণ্ডিত! সূর্যালোক সে সবের গায়ে পড়ার ফলে যে বিচ্ছুরণ ঘটছে তাতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। ফুল আর ধূপের সুবাস ছড়িয়ে আছে চারপাশে। অপূর্ব সেই ঘ্রyণ। গর্ভগৃহ সংলগ্ন অঞ্চলে পুরোহিত আর পুণ্যার্থীদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। মাথার ওপর থেকে নেমে আসা সোনারূপার ঘণ্টাগুলো বেজে চলেছে অবিরাম শব্দে। মল্লিকার্জুনকে দেখে চত্বরে উপস্থিত সেবায়েতরা ভিড় হটিয়ে তার চলার পথ করে দিতে লাগল।

মল্লিকার্জুন, অঙ্গিরাকে নিয়ে এক সময় উপস্থিত হলেন চত্বরের প্রান্তসীমায়। এ জায়গাতে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। কয়েকজন লাঠিধারী সেবায়েত সেখানে প্রহরারত। তারা মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানিয়ে পথ ছেড়ে দিল তাদের দুজনকে। আরও কিছুটা এগিয়ে অঙ্গিরাকে নিয়ে একটা কক্ষের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন মল্লিকার্জুন।

বন্ধ দরজার পাল্লাতে রূপার পাত বসানো। মল্লিকার্জুন দরজায় টোকা দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে গেল। অঙ্গিরা দেখতে পেল একজন শুভ্র বস্ত্র সমন্বিত, ঋজু, গৌরবর্ণের বৃদ্ধকে। কর্ণে স্বর্ণকুণ্ডল, বাহুতে মাণিক-খচিত বাজুবন্ধ। তাঁর শিখাটা মাথার পিছন থেকে কাঁধ বেয়ে বুকের কাছে নেমে এসেছে। আর তার প্রান্তদেশে বাঁধা আছে একটা স্বর্ণবিল্বপত্র।

মল্লিকার্জুন তাঁকে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললেন, ‘প্রধান পুরোহিত আমাকে মার্জনা করবেন আপনার কাজের সময় ব্যাঘাত ঘটালাম বলে। এই যুবক বল্লভী নগরী থেকে প্রভাসক্ষেত্রে পদার্পণ করেছে। নাম অঙ্গিরা। এই যুবকের কাছে সোমেশ্বর মুদ্রা আছে। আপনার সাক্ষাৎপ্রার্থী।’ এই বলে মল্লিকার্জুন, অঙ্গিরাকে ইশারা করলেন মুদ্রাটা দেখাবার জন্য।

ইনিই তবে এই সোমেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব! অঙ্গিরা প্রথমে ভূমিষ্ঠ হয়ে ত্রিপুরারিদেবের পাদস্পর্শ করল। ঠিক এই সময় একটা ব্যাপার খেয়াল করল সে। ত্রিপুরারিদেবের বাম পদে শেষ তিনটি আঙুল নেই! ত্রিপুরারিদেব তার ডান বাহু আশীর্বাদের ভঙ্গীতে একটু ওপরে তুললেন। অঙ্গিরা এরপর উঠে দাঁড়িয়ে তার বস্ত্রের ভিতর থেকে সোমেশ্বর মুদ্রাটা বার করে সমর্পণ করল প্রধান পুরোহিতের হাতে।

ত্রিপুরারিদেব মুদ্রাটা হাতে নিয়ে পরখ করলেন ঠিকই, কিন্তু অঙ্গিরার মনে হল, এ মন্দিরে অন্যরা যেমন তার কাছে সোমেশ্বর মুদ্রা দেখে বেশ বিস্মিত হয়েছে তা প্রধান পুরোহিতের ক্ষেত্রে ঘটল না।

এমন মুদ্রা নিয়ে ভিনদেশ থেকে কেউ যে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসবে বা আসতে পারে এমনটা যেন ধারণা ছিল তাঁর। তবে মুদ্রাটা ভালো করে দেখার পর তিনি একদৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর অঙ্গিরাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার পিতা-মাতার নাম?’

অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘পিতার নাম মরীচি, মাতা অম্বালিকা। আমার পিতাই এই সোমেশ্বর মুদ্রা আমাকে দিয়েছিলেন।’

‘তাদের সনাক্তকরণ চিহ্ন?’ জানতে চাইলেন প্রধান পুরোহিত।

এ প্রশ্ন যে তিনি করতে পারেন তা তাঁর পিতা-মাতা অঙ্গিরাকে জানিয়েছিল। তাই সে জবাব দিল ‘পিতার ডানবাহুতে অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন ছিল, মাতার বাম ভ্রূ-র উপরিভাগে কৃষ্ণবিন্দু ছিল।’

প্রধান পুরোহিত তার কথায় সন্তোষ প্রকাশ করে বললেন, ‘তোমার পিতামাতা এখন কোথায়?’

অঙ্গিরা মৃদু চুপ করে থেকে জবাব দিল, ‘তিন মাস পূর্বে আমি একবিংশ বর্ষে পদার্পণ করলে তাঁরা একসঙ্গে নদীবক্ষে প্রাণ বিসর্জন দেন।’

‘তাদের শ্রাদ্ধকার্য কি সম্পাদন হয়েছে?’

অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘না, তাদের নির্দেশ মতোই আমি শ্রাদ্ধকার্য সমাপন করিনি। মৃত্যুর পূর্বে তারা আমাকে বলে গেছেন আমি যেন তাদের মৃত্যুর পর এই প্রভাসক্ষেত্রে পদার্পণ করে সোমেশ্বর মন্দিরে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি, নিজেকে সমর্পণ করি সোমেশ্বরের চরণে। আপনি আমাকে যে নির্দেশ দেবেন একমাত্র তা পালন করলেই সোমেশ্বরের কৃপাতে তাদের স্বর্গলাভ হবে। নচেৎ সাধারণ শ্রাদ্ধকার্যে তাদের স্বর্গারোহন হবে না। আত্মার মুক্তি ঘটবে না।’

ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলে গেছেন তাঁরা।’

একথা বলার পর তিনি শেষ প্রশ্নটা করলেন, ‘তুমি বিবাহ করনি তো?’

‘না।’ জবাব দিল অঙ্গিরা।

ত্রিপুরারিদেব এরপর সোমেশ্বর মুদ্রাটা অঙ্গিরার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে প্রথমে তাকে বললেন, ‘তুমি দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে এসেছ। আপাতত বিশ্রাম নাও। আগামীকাল যথা সময় তোমাকে আহ্বান করব আমি।’

একথা বলার পর তিনি মল্লিকার্জুনকে নির্দেশ দিলেন, ‘প্রধান পুরোহিতের ব্যক্তিগত অতিথি নিবাসে এই যুবকের থাকার ব্যবস্থা করুন। পুরোহিত নন্দবাহন, প্রধান মহারক্ষী জয়দ্রথ আর প্রধান সেবায়েত বিষধারীকে এ যুবকের আগমনবার্তা জানিয়ে দেবেন। যাতে এই যুবকের কোনও সমস্যার কারণ না ঘটে।’

প্রধান পুরোহিতের কথা শুনে সহপ্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুন ‘যথা আজ্ঞা দেব’ বলে সেই স্থান ত্যাগ করে অঙ্গিরাকে নিয়ে রওনা হলেন অতিথি নিবাসের দিকে। দরজার কপাট বন্ধ করে দিলেন প্রধান পুরোহিত। নিজ আসনে বসার আগে আবারও দেওয়ালের এককোণে মাথার দিকে রজ্জুবদ্ধ ঘণ্টাটার দিকে চোখ পড়ল তাঁর। মনে মনে তিনি বললেন, ‘হয়তো-বা এবার তার মুক্তি সমাগত।’