Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/28
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সোমনাথ সুন্দরী – ২০

২০

নিদ্রাহীন ভাবে সারারাত্রি ত্রিপুরারিদেব নানা কথা ভাবলেন মন্দিরের বর্তমান পরিস্থিতি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে। কোনও কোনও সময় তার মনে হতে লাগল, ‘মন্দিরের ওপর সত্যি যদি কোনও দুর্বিপাক নেমে আসে তবে কি তা আমারই কোনও পাপে? কি সেই পাপ?’

কিন্তু এরপরই আবার তার মনে হল, তিনি যা অতীতে করেছেন, করছেন, করতে চলেছেন তা কোনওটাই তাঁর ব্যক্তিগত সুখ-ভোগের জন্য নয়, করেছেন হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা সংস্কার, রীতি, প্রথা মানার জন্য। যা তুষ্ট করে সোমেশ্বর মহাদেবকে। তিনি যা করেছেন, করতে চলেছেন তা মন্দিরের ভালোর জন্য, নিরাপত্তার জন্য, সর্বোপরি সোমেশ্বর মহাদেবের জন্য। সারা জীবনই তো অনাড়ম্বর ভাবে ব্রহ্মচর্য পালন করে এ মন্দিরের সেবায় নিয়োজিত থেকেছেন তিনি। সাত রাজার ধন স্যমন্তক মণি তার করতলগত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কোনওদিন মুহূর্তের জন্যও সে মণি আত্মসাৎ করার ভাবনা আসেনি। বরং মন্দিরের সেই সম্পত্তি রক্ষা করার জন্য তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই, চেষ্টার শেষ নেই। তিনি পাপ করবেন কেন?’

শুকতারা ফুটে ওঠার মুখে অন্যদিনের মতোই কক্ষ ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে সেই স্বর্ণ শৃঙ্খল বাজালেন ত্রিপুরারিদেব। সূর্যোদয়ের মুহূর্তে প্রতিদিনের মতোই অবগাহন করে মন্দিরে ফিরলেন। উন্মোচন করলেন গর্ভগৃহের তোরণ। নিত্য দিনের মতোই ঘুম ভাঙানো হল দেবতার। প্রতিদিনের মতোই দেবদাসীরা তাদের নৃত্যগীত পরিবেশন করল। কিন্তু সব কিছুতেই কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম ম্রিয়মান ভাব! কোথাও যেন একটা অদৃশ্য ছন্দপতন শুরু হয়েছে!

দেবদাসীদের নৃত্যগীত সাঙ্গ হবার পর গর্ভগৃহর চত্বরের বিশাল ঘণ্টাটা বাজালেন ত্রিপুরারিদেব। এই সংকেত ধ্বনি শুনেই দ্বাররক্ষীরা মন্দিরের প্রধান তোরণ উন্মোচন করে। দর্শনার্থীরা সোমেশ্বর মহাদেবের নামে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে জয়ধ্বনি দিতে দিতে বন্যার স্রোতের মতো মন্দিরে প্রবেশ করে। কিন্তু আজ আর সে কোলাহল নেই। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শুধু প্রতিধ্বনিত হতে লাগল প্রাকার আর উপমন্দিরগুলোতে।

প্রাত্যহিক কর্ম সম্পাদনের পর ত্রিপুরারিদেব নিজের কক্ষে ফিরে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় রক্ষী প্রধান জয়দ্রথ এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। প্রধান পুরোহিতকে প্রণাম জানিয়ে তিনি বললেন, ‘এক ব্যক্তি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। তিনি বলছেন তিনি নাকি চালুক্যরাজের মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব। তিনি নাকি মাধেরা মন্দিরের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এখানে এসেছেন! অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে তিনি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান!’

মাধেরার যুদ্ধক্ষেত্র! কথাটা শুনে বিস্মিত ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘তুমি তাকে আমার কক্ষে নিয়ে এসো।’

কিছু সময়ের মধ্যেই জয়দ্রথের সঙ্গে প্রধান পুরোহিতের কক্ষের সামনে উপস্থিত হলেন এক ব্যক্তি। ত্রিপুরারিদেব তাঁকে দেখে বুঝতে পারলেন যে আগন্তুক সম্ভ্রান্তবংশীয়। অন্তত তার পোশাক সে কথা বলছে। কিন্তু সে পোশাক বর্তমানে ধূলাময়। স্থানে স্থানে শুকনো রক্তের ছিটা লেগে আছে। ক্লান্তির স্পষ্ট চিহ্ন ফুটে আছে সেই প্রৌঢ় ব্যক্তির মুখমণ্ডলে। কোমর বন্ধনীর একটা স্থান বেশ স্ফীত। কোনও কিছু বাঁধা আছে সেখানে।

আগন্তুক, প্রধান পুরোহিতকে হাত জোড় করে প্রণাম জানাবার পর তাকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে দ্বার বন্ধ করলেন। মুখোমুখি দুজন উপবেশ করার পর সেই ব্যক্তি তার কোমরবন্ধ থেকে একটা স্বর্ণমুকুট বার করে বললেন, ‘আমি চালুক্যরাজ অম্বুজের মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব। এই তার প্রমাণ, চালুক্য রাজের রাজমুকুট।’

হীরকখচিত সেই স্বর্ণমুকুট যে রাজমুকুটই হবে তা বুঝতে পারলেন ত্রিপুরারিদেব। মৃদু বিস্মিত ভাবে বললেন, ‘তিনি কোথায়? মাধেরার সূর্য মন্দিরে? যুদ্ধর গতিপ্রকৃতি কী?’

চন্দ্রদেব বললেন, ‘তিনি সেখানেই ছিলেন, কিন্তু এখন আর নেই, তিন দিবস পূর্বে নিহত হয়েছেন তিনি। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়েছে যবন বাহিনীর সঙ্গে। যুদ্ধের ফলাফল বা গতিপ্রকৃতি কি হয়েছে তা আমার জানা নেই। কারণ মহারাজের মৃত্যুর পর তার দাহ কার্য সম্পন্ন করেই তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে দেওয়া নির্দেশ পালন করতে মাধেরা ত্যাগ করে আপনার কাছে ছুটে এসেছি।’

‘কি সেই নির্দেশ?’ বিস্মিত ত্রিপুরারিদেব প্রশ্ন করলেন।

চালুক্য মহামন্ত্রী বললেন, ‘মহারাজের মৃত্যুর পূর্বে তার শেষ ইচ্ছা পূরণের অনুরোধ নিয়ে আমি আপনার কাছে এসেছি। তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী রাজশ্রীকে আপনাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। মহারাজের শেষ ইচ্ছা ছিল আমি তাকে সোমেশ্বর মন্দির থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে এই রাজমুকুট পরিয়ে চালুক্য সিংহাসনে অভিষিক্ত করি। মহারাজ অম্বুজ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রীর প্রতি যে অন্যায় আচরণ করেছেন, সেই পাপ স্খলনের জন্য তিনি আমাকে এই নির্দেশ দিয়ে গেছেন। তিনি তাঁর পিণ্ডদান প্রক্রিয়াও এখানেই সম্পন্ন করে চালুক্য প্রদেশে ফিরতে বলেছেন।’

চালুক্য মহামন্ত্রীর বক্তব্য শুনে চুপ করে রইলেন ত্রিপুরারিদেব।

চন্দ্রদেব বললেন, ‘আপনি রাজকুমারী রাজশ্রীকে আমার হাতে তুলে দিন। আমি কালই মহারাজের পিণ্ডদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাজশ্রীকে নিয়ে রওনা হব। চালুক্য সিংহাসন শূন্য অবস্থায় পড়ে আছে।’

ত্রিপুরারিদেব এবার বললেন, ‘প্রয়াত মহারাজের দ্বিতীয় ইচ্ছা, অর্থাৎ এই প্রভাসক্ষেত্রে তাঁর পিণ্ডদান, শ্রাদ্ধ কার্যাদি ইত্যাদি অবশ্যই সম্পন্ন হতে পারে। সে কাজের জন্য আমি আপনাকে সাহায্যও করতে পারি। কিন্তু চালুক্যরাজের প্রথম ইচ্ছা পূরণ, ওই নারীকে কখনোই আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়?’

চালুক্য মহামন্ত্রী বললেন, ‘সম্ভব নয় কেন?’

সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘কারণ, তাকে সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে সমর্পণ করা হয়েছে। সে এখন দেবদাসী সমর্পিতা। তার আর এখন পূর্বের কোনও পরিচয় নেই। সে পরিচয় মুছে গেছে। তার এখন একমাত্র পরিচয় সে দেবদাসী। তার একমাত্র আরাধ্য সোমেশ্বর মহাদেব।’

এ কথা শুনে চন্দ্রদেব বললেন ‘কিন্তু রাজশ্রী তো স্বেচ্ছায় এ মন্দিরে আসেনি। চালুক্যরাজ বলপূর্বক তাকে এখানে পাঠিয়েছিলেন।’

ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘হতে পারে সে হৃতা, বলপূর্বক তাকে এখানে আনা হয়েছে। কিন্তু কোনও দেবদাসী হৃতা, দত্তা, ভূত্যা, ভক্তা, যে শ্রেণিরই হোক না কেন, সোমেশ্বর মহাদেবের থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। সোমেশ্বর মহাদেবের সঙ্গে তাদের আমৃত্যু বন্ধন।

ত্রিপুরারিদেবের বক্তব্য শুনে চন্দ্রদেব অনুনয় করে বললেন, ‘আমার সঙ্গে একবার তার সাক্ষাৎ করাবেন? সে যদি নিজে এ মন্দির ত্যাগ করে ফিরে যেতে চায়? প্রয়োজনে আমি তার বিনিময় একশত চালুক্য রূপসীকে দান করব এ মন্দিরে।’

সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের মুখমণ্ডল এবার কঠিন হয়ে উঠল। তিনি বললেন, ‘দেবদাসীদের ব্যক্তিগত মতামত বা ইচ্ছার কোনও মূল্য থাকে না। সোমেশ্বর মহাদেবের ইচ্ছা বা মন্দির কর্তৃপক্ষর ইচ্ছাই শেষ কথা। বহির্জগতের কোনও ব্যক্তির সঙ্গে অথবা পূর্ব জীবনের কোনও ব্যক্তির সঙ্গে দেবদাসীদের সাক্ষাৎ কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। শত শত বৎসর ধরে চলে আসা এই অনুশাসন আমি ভঙ্গ হতে দিতে পারি না। আর, এক শত কেন, এক সহস্র দেবদাসীর বিনিময়েও তাকে আমি ফিরিয়ে দিতে পারি না। স্বয়ং চালুক্যরাজ উপস্থিত হয়ে আমাকে এ অনুরোধ জানালেও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করতে হতো। অনুগ্রহ করে বারংবার এই অসম্ভব অনুরোধ করে আমাকে বিব্রতবোধ করবেন না।’ কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন ত্রিপুরারিদেব।

আশাহত ভাবে তাঁর কক্ষ ত্যাগ করলেন চন্দ্রদেব। তারপর মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। এই মুহূর্তে তার ঠিক কী কর্তব্য তা বুঝে উঠতে পারলেন না চন্দ্রদেব। তিনি কী সোমনাথ নগরীতে কয়েকটা দিন অপেক্ষা করবেন প্রধান পুরোহিতের মত পরিবর্তনের জন্য। যদিও সে সম্ভাবনা আর নেই বলেই মনে হচ্ছে চন্দ্রদেবের। নাকি তিনি ফিরে যাবেন চালুক্যতে? তবে যাবার আগে অবশ্যই তাকে মহারাজের শ্রাদ্ধ সম্পাদন করে যেতে হবে প্রভাসক্ষেত্রের সমুদ্রতটে।

মন্দির ত্যাগ করে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উপস্থিত হলেন সমুদ্রতটে। যবন হানার আতঙ্কে প্রভাস নগরীতে পুণ্যার্থী বা পারলৌকিক কার্য সম্পাদন করতে আসা লোকজন নেই। সার বেঁধে বসে আর মস্তক মুণ্ডণ করাচ্ছে না ক্ষৌরকারের দল। চন্দ্রদেব শূন্য সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন, ‘এমন যদি কারো সন্ধান পাওয়া যায় যে তাঁকে মহারাজের পারলৌকিক কার্য সম্পাদনে সাহায্য করতে পারে!’ ঠিক এমন সময় তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হল এক বৃদ্ধ। মাথার চুল তাঁর শনের মতো সাদা। বৃদ্ধ তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি পুণ্যার্থী? কোথা থেকে আসছেন?’

চন্দ্রদেব জবাব দিলেন, ‘আমি চালুক্য রাজের মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব। আপনার পরিচয়?’

বৃদ্ধ তার শনের মতো চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘প্রণাম আপনাকে। আমি সোমনাথ নগরীর ক্ষৌরকার-প্রধান খগেশ্বর।’

কথাবার্তা শুরু হল তাদের দুজনের মধ্যে।

ঠিক এই সময় অতিথিশালার অন্ধকার কক্ষে শুয়ে ছটফট করছিল অঙ্গিরা। সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না খগেশ্বরের কথাগুলো। সে অজাচার মিলনের ফল। তার এ পরিচিতির থেকে হয়তো জন্ম মুহূর্তেই তার মৃত্যু ঘটা ভালো ছিল। পিতা-মাতা না হয় তাদের সম্পর্কের কথা জেনে মিলিত হয়নি। কিন্তু ব্যাপারটা যখন তারা জানলেন তখন তার জন্মের পরই তাকে কেন নদীতে বিসর্জন দিলেন না? কেন অঙ্গিরাকে তার নিষ্ঠুর পরিচয় দিয়ে পৃথিবীর বুকে রেখে গেলেন আমৃত্যু যন্ত্রণা দেবার জন্য? নিজের পিতা-মাতার ওপর, নিজের ওপর ক্রমশই ঘৃণা বেড়ে চলল তার। এক এক সময় অঙ্গিরার মনে হতে লাগল সে হয়তো বা বুঝি উন্মাদ হয়ে যাবে! বাইরে সময় এগিয়ে চলল, দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল। সন্ধ্যাও নামল। সন্ধ্যারতির ঘণ্টাও বাজল মন্দিরে। কিন্তু সে শব্দ যেন কানে গেল না তার, যেন দিন রাত সময়ের ব্যবধান, কোনও কিছুই তার জীবনে নেই। চতুর্দিকে শুধু জমাট বাঁধা নিকষ কালো অন্ধকার। আর একটাই কথা শুধু তার মনে হচ্ছে, ‘আমি অজাচার! আমি অজাচার’!

সন্ধ্যার পর রাত্রি নামল। নিস্তব্ধ হয়ে গেল সোমেশ্বর মহাদেবের আবাসস্থল। বেড়ে চলল রাত্রি। অঙ্গিরার কিন্তু ঘুম এল না। প্রবল ক্লান্তি, হতাশা আর মনবেদনাতে কিছুটা আচ্ছন্নর মতো শয্যাতে পড়ে রইল অঙ্গিরা।

এখন মধ্যরাত। হঠাৎ মৃদু করাঘাতের শব্দ যেন কানে গেল তার। হ্যাঁ, কেউ আঘাত করছে বন্ধ কপাটে। কে এল? ত্রিপুরারিদেব নাকি? নিজের শরীরটাকে কোনও রকমে শয্যা থেকে তুলে কপাট খুলল অঙ্গিরা। দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অবগুণ্ঠনরত এক নারী। সে তার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করতেই অঙ্গিরা অবাক হয়ে গেল। রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতা আবছা চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে! দেবদাসী সমর্পিতা কক্ষের ভিতর প্রবেশ করে কপাট বন্ধ করল। আবারও অন্ধকার নেমে এল তার কক্ষে। অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে প্রশ্ন করল, ‘তুমি, এখানে কীভাবে এলে?’

দেবদাসী সমর্পিতা জবাব দিল ‘তুমি যখন গতরাতেও এলে না তখন অস্থির হয়ে উঠল আমার মন। আর তা সহ্য করতে না পেরে আমি দেবদাসী উত্তরাকে বললাম তার প্রেমিকের মাধ্যমে তোমার সন্ধান দেবার কথা। আজ রাতেও যখন এলে না, তখন তাদের সঙ্গে নিয়ে আমি এখানে এসেছি। কিছুটা তফাতেই তারা আছে। তুমি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওনি কেন? তুমি কি অসুস্থ? না, আমি দেবদাসী বলে কোনও কারণে আমার ওপর ঘৃণা জন্মেছে?’

দেবদাসী সমর্পিতার প্রশ্ন শুনে নিরুত্তর রইল অঙ্গিরা।

অন্ধকারে তাকে দেখতে না পেয়ে, তার কণ্ঠস্বর শুনতে না পেয়ে দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘তুমি কোথায়? নিশ্চুপ কেন? আমার কাছে এসো। তোমাকে একবার দেখার জন্য, একবার স্পর্শ করার জন্য বিপদের ঝুঁকি নিয়েও আমি এখানে এসেছি।’

অঙ্গিরা এবার বলল, ‘তুমি ফিরে যাও। আমার পরিচয় জানলে ঘৃণাতে আমার শরীর থেকে হাত সরিয়ে নেবে তুমি।’

চালুক্য রাজকন্যা বলল ‘কেন তুমি শূদ্র নাকি? আর শূদ্র হলেও তুমি কি মানুষ নও? আমিও তো এখন রাজদুহিতা থেকে সোমনাথ মন্দিরের সাধারণ দেবদাসী মাত্র। কাছে এসো আমার।’

অঙ্গিরা এবার বলে উঠল, ‘না, শূদ্রর থেকেও অনেক ভয়ঙ্কর আমার পরিচয়। আর সে পরিচয় জানলে আমি কখনোই তোমার সঙ্গে মিলিত হতাম না। আমি একজন অস্পৃশ্য অজাচার সন্তান। সহোদর-সহোদরার মিলনের ফলে আমার এই পাপ জন্ম হয়েছে।’ অঙ্গিরা কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল সেই অন্ধকার কক্ষে।

রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতা এরপর অন্ধকার হাতড়ে স্পর্শ করল অঙ্গিরার শরীর। তারপর বলল, ‘তোমার জন্ম পরিচয় যাই হোক না কেন, তোমার জন্মের ওপর তোমার তো কোনও হাত ছিলনা। আমি জামি আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমিও আমাকে ভালোবাসো। তুমি আমার প্রেমিক, তোমার এ পরিচয়ই আমার কাছে যথেষ্ট।’

দেবদাসী সমর্পিতার কথা শুনেও চুপ করে রইল অঙ্গিরা। দেবদাসী সমর্পিতা এরপর বলল, ‘এ মন্দিরে আমার মতো অসহায় নারীর একমাত্র অবলম্বন, ভালোবাসা তুমি। হয়তো তুমি আমার সঙ্গে নিত্যদিন মিলিত হতে পারবে না জানি। কিন্তু তোমাকে দূর থেকে দেখেও বাকি জীবনটা আমি কাটিয়ে দিতে পারব।’

অঙ্গিরার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে তা অনুভব করল দেবদাসী সমর্পিতা। মৃদু নিস্তব্ধতার পর অঙ্গিরা বেদনাহত ভাবে বলল, ‘কিন্তু সে দেখাও যে আর সম্ভব হবে না কিছুদিন পর থেকে।’

‘কেন তা সম্ভব হবে না?’ বিস্মিতভাবে জানতে চাইল দেবদাসী সমর্পিতা।

অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘আমার পিতা-মাতা তাদের পাপ মুক্তির জন্য এই মন্দিরে পাঠিয়েছেন। প্রধান পুরোহিত আমাকে সোমেশ্বর মহাদেবের শ্রেষ্ঠ সম্পদ স্যমন্তক মণির প্রহরী হিসাবে নিযুক্ত করতে চলেছেন অন্ধকারময় ভূগর্ভস্থ রত্নকুঠুরীতে। সে কক্ষে একবার কেউ প্রবেশ করলে আর ওপরে উঠে আসতে পারে না। তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।’

কথাটা শুনে কিছু মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে গেল সমর্পিতা। তারপর ক্ষুব্ধ ভাবে বলল, ‘না, এ হতে পারে না! এ ঘটনা কিছুতেই ঘটতে দেব না আমি। সোমেশ্বর মন্দিরের প্রাকার আর তোমার আমার মতো কত মানুষের জীবন গ্রাস করবে?’

অঙ্গিরা বলল, ‘হয়তো এটাই আমার ললাট লিখন। আমি ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশ পালন না করলে যে আমার পিতা-মাতার আত্মার মুক্তি ঘটবে না। অনন্ত নরকবাস হবে তাদের।’

অঙ্গিরার কথা শুনে দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘তাঁরা কি তোমার পরিণতির কথা জেনে তোমাকে প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ পালন করতে বলে গিয়েছিলেন?’

অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘না, ত্রিপুরারিদেব কি কাজে আমাকে নিয়োগ করবে তা তারা জানতেন না।’

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘যে ভাবেই তোমার জন্ম হোক না কেন, কোনও পিতা-মাতা তার সন্তানকে জীবন্ত নরকের মাঝে রেখে স্বর্গসুখ লাভ করতে পারেন না, কিছুতেই এভাবে তাদের আত্মা, সন্তানের নরক যন্ত্রণার বিনিময় মুক্তি লাভ করতে পারেন না। সোমেশ্বর মহাদেবও এসব অনুমোদন করেন না বলেই আমার বিশ্বাস। এ সব নিয়ম মানুষেরই সৃষ্টি।’

এ কথা বলে একটু থেমে দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘না, আমি কিছুতেই সে কক্ষে প্রবেশ করতে দেবনা। আমাদের মুক্তির পথ খুঁজতে হবে।’

‘মুক্তি! তা কি ভাবে সম্ভব?’ জানতে চাইল অঙ্গিরা।

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘যেভাবেই হোক তা সম্ভব করতে হবে। এ মন্দির ত্যাগ করব আমরা। এ মন্দিরে নিজেদের জীবন বলিদান দেব না আমরা।’ একথা বলে অঙ্গিরাকে আলিঙ্গন করে তার শরীরে হাত বোলাতে লাগল দেবদাসী সমর্পিতা। সে স্পর্শে, সে আলিঙ্গনে কোনও যৌনতা নেই, জেগে আছে অঙ্গিরার প্রতি পরম ভালোবাসা, মমত্ব।

এক সময় দেবদাসী সমর্পিতার ভাবনা সঞ্চারিত হতে শুরু করল অঙ্গিরার মনেও। তার মনে হতে লাগল, হ্যাঁ, তাকে মুক্তি পেতে হবে এই সোমেশ্বর মন্দিরের অন্ধকার থেকে। রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতাকে ত্যাগ করে সেই অন্ধকূপে কিছুতেই নামবে না সে। তাতে যদি তার অনন্ত নরকবাস হয় তো হবে।

রাত শেষ হতে চলল এক সময়। দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘এবার আমাকে ফিরতে হবে। তবে মনে রেখো, মুক্তি আমাদের পেতেই হবে।’

অঙ্গিরা দারুণ ভালোবাসায় আবেগে দেবদাসীর ওষ্ঠ চুম্বন করে বলল, ‘হ্যাঁ, সে চেষ্টা আমি করব। মুক্তি পেতেই হবে আমাদের। আগামীকাল রাতে আমি তোমার কাছে যাব।’

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।’

অঙ্গিরার কক্ষ ত্যাগ করল দেবদাসী সমর্পিতা। সে ফিরে যাবার পর অঙ্গিরা ভাবতে লাগল, ‘কিন্তু কীভাবে এ কাজ সম্ভব? সে নিজে নয় মন্দির ত্যাগ করল। দেবদাসী মন্দির ত্যাগ করবে কীভাবে?’ একথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার মনে হল নাপিত শিরোমণি খগেশ্বরের কথা। বহুদর্শী সেই বৃদ্ধ কি কোনও ভাবে দেবদাসী সমর্পিতার মুক্তি লাভে সাহায্য করতে পারবে? কিছুক্ষণের মধ্যেই অঙ্গিরার কানে এল সেই স্বর্ণ শৃঙ্খল বেজে ওঠার ঝনঝন শব্দ। ভোর হল প্রভাসতীর্থের সোমেশ্বর মন্দিরে।