Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/28
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সোমনাথ সুন্দরী – ২৪

২৪

সাধারণত বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে দেবতাকে ভোগ নিবেদনের সময় গর্ভগৃহর সামনে উপস্থিত থাকেন না ত্রিপুরারিদেব। বয়স হয়েছে তাঁর। এ কাজ সামলান পর্যায়ক্রমে সহ প্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন ও মল্লিকার্জুন। কিন্তু এদিন দেবদাসী সমর্পিতার শুদ্ধিকরণের ব্যাপারটা থাকায় তিনি কক্ষত্যাগ করতে যাচ্ছিলেন সে সময়। তিনি কপাট উন্মোচন করেই দেখতে পেলেন পুরোহিত নন্দিবাহন, রক্ষী প্রধান জয়দ্রথকে নিয়ে দাঁড়িয়ে।

তাঁদের গম্ভীর মুখমণ্ডল দেখে কেমন যেন একটু সন্দেহের উদ্রেক ঘটল প্রধান পুরোহিতের। তিনি নন্দিবাহনকে প্রশ্ন করলেন, ‘দেবদাসী সমর্পিতাকে গর্ভগৃহের সামনে উপস্থিত করেছেন?’

সহ প্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন জবাব দিলেন, ‘দেবদাসী সমর্পিতা নিখোঁজ। দেবদাসীদের আবাসস্থল সহ মন্দিরের সব সম্ভাব্য স্থানে তার খোঁজ করেছি, তাকে পাওয়া যায়নি। অন্য দেবদাসীরা বলছে যে তারা তিন দিন ধরে তাকে দেখেনি।’

কথাটা শুনে প্রধান পুরোহিত ক্ষিপ্ত ভাবে রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথকে বললেন, ‘তাহলে দেবদাসী তিলোত্তমার মতো দেবদাসী সমর্পিতাও কি মন্দির ত্যাগ করল! কিন্তু কী ভাবে করল? রক্ষী প্রধান হিসাবে তোমাকেই এ ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।’

জয়দ্রথ মাথা নীচু করে বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন প্রভু। সব রক্ষী কঠোর ভাবে আপনার নির্দেশ পালন করে চলেছে। গত তিন দিন তারা কোনও মন্দিরবাসীকে মন্দির ত্যাগ করতে দেয়নি। এ সময়কালের মধ্যে শুধু দুজন তোরণ অতিক্রম করে মন্দিরের বাইরে গেছে।’

‘কারা তারা?’ জানতে চাইলেন প্রধান পুরোহিত।

রক্ষী প্রধান জয়দ্রথ জবাব দিলেন ‘প্রথম জন ক্ষৌরকার শিরোমনি খগেশ্বর। যে মন্দিরের স্থায়ী বাসিন্দা নয়। বাইরে থেকে মন্দির যাওয়া-আসা করে। কাজেই রক্ষীরা তাকে বাধা দেয়নি। তিন দিন পূর্বে সূর্যোদয়ের সময় খগেশ্বর মন্দির ত্যাগ করে।’

এ কথা বলার পর একটু থেমে রক্ষীপ্রধান বললেন, ‘আর খগেশ্বর মন্দির ত্যাগ করার পূর্বে শেষ রাতের কাছাকাছি সময় আরও একজন মন্দির ত্যাগ করেছিল। পুরুষের পোশাকই ছিল তার পরনে। মুখমণ্ডল আবৃত থাকলেও তাঁর শ্মশ্রুমণ্ডিত চিবুক দেখা যাচ্ছিল। তবে তাকে আটকাবার ক্ষমতা রক্ষীদের ছিল না। কারণ, সে সোমেশ্বর মুদ্রা দেখিয়েছিল তাদের।’

আবার সেই সোমেশ্বর মুদ্রা! পুরোহিত শ্রেষ্ঠ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলেন ‘রক্ষীরা তার পরিচয় জানতে চায়নি? প্রশ্ন করেনি কোনও?’

রক্ষী প্রধান জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, করেছিল। কিন্তু সে ব্যক্তি ইঙ্গিতে জানিয়েছিল সে মৌনব্রত অবলম্বন করে আছে।’

কথাটা জেনে প্রধান পুরোহিত প্রথমে ভাবলেন, সেই ব্যক্তি যদি সমর্পিতা হয়ে থাকবে তবে তার শ্মশ্রু হল কী ভাবে? কিন্তু কয়েক মুহূর্ত ভাবার পরই সম্ভাব্য ব্যাপারটা যেন প্রধান পুরোহিতের মনে ধরা দিল খগেশ্বরের কথাও রক্ষীপ্রধান উল্লেখ করাতে। কেশহীন, শ্মশ্রুহীন অনেক রাজপুরুষ বা সৈনিক থাকে যারা নারীদের কাছে নিজেদের সুন্দর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অথবা বিদ্রুপ থেকে রক্ষা পাবার জন্য কৃত্রিম কেশ, শ্মশ্রু-গুম্ফ পরিধান করে। গুপ্তচরেরাও অনেক সময় ছদ্মবেশ ধারণের জন্য তা ব্যবহার করে। আর এ কাজের জন্য ডাক পড়ে ক্ষৌরকারদেরও। তারা শুধু মুখমণ্ডল-মস্তক মুণ্ডিতই করে তা না। নরসুন্দর, ক্ষৌরকার কৃত্রিম কেশ-গুম্ফ দিয়ে মানুষকে সজ্জিতও করে। হয়তো বা খগেশ্বরই কাজটা করেছে। দেবদাসী সমর্পিতাকে পুরুষের সাজে সজ্জিত করেছে! কিন্তু সোমেশ্বর মুদ্রা? ত্রিপুরারিদেব বললেন ‘খগেশ্বর তো নিত্যদিন মন্দিরে আসে। সে মন্দির ত্যাগ করার পর আর মন্দিরে প্রবেশ করতে এসেছিল?’

জয়দ্রথ জবাব দিলেন, ‘না, তাকে দেখেনি কেউ।’

এরপর একটু থেমে জয়দ্রথ বললেন ‘তবে রক্ষীরা বলল, ‘কিছু সময় পূর্বে আপনার অতিথি অঙ্গিরা নাকি তাদের কাছে জানতে গেছিলেন যে তারা কেউ খগেশ্বরকে দেখেছে কিনা?’ মার্জনা করবেন, আপনার অতিথির আচরণও সন্দেহজনক। সে গত দুদিন ধরে এক স্থানে বসে নাকি নজর রাখছে প্রবেশ তোরণের ওপর। রক্ষীদের তাই ধারণা। এবং আমিও তাকে সেখানে বসে থাকতে দেখেছি।’

একথা শুনেই প্রধান পুরোহিতের মনে হল ‘আরে সোমেশ্বর মুদ্রা তো অঙ্গিরার কাছেও আছে! এমন হয়নি তো যে খগেশ্বর কোনও ভাবে সে মুদ্রা নিয়ে মুক্ত করেছে দেবদাসী সমর্পিতাকে? অর্থের বিনিময়ে তাকে তুলে দিয়েছে চালুক্য মন্ত্রীর হাতে? আর সেই মুদ্রা ফেরত পাবার জন্যই কি অঙ্গিরা খগেশ্বরের প্রতীক্ষা করছে?’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের কর্মপন্থা ভেবে নিলেন প্রধান পুরোহিত। না আর কালক্ষেপ করা সমীচীন হবে না তার। তিনি প্রথমে তাদের নির্দেশ দিলেন রক্ষীদের কয়েকজনকে দেবদাসীদের আবাসস্থলের বাইরে প্রহরার কাজে নিযুক্ত করুন। প্রয়োজনে তারা তাদের আবাসস্থলের ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে। এবং তাদের প্রহরাতেই দেবদাসীরা দেবতার কাছে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য যাওয়া-আসা করবে। দ্বিতীয়ত সোমনাথ মুদ্রা দেখিয়েও আজ থেকে তার অনুমতি ছাড়া কেউ মন্দির ত্যাগ করতে পারবে না।

এ কথা বলার পর একটু থেমে তিনি বললেন, ‘অঙ্গিরার বিষয়টি আমি তত্ত্বাবধান করছি। বিশেষ কাজের দায়িত্ব দিয়ে তাকে আমি অন্যত্র পাঠাব। একটা কাজ করুন। দেবতাকে মধ্যাহ্নভোজ নিবেদন করার পর পঞ্চব্যঞ্জন, পরমান্ন-সহ সেই মহাপ্রসাদ অঙ্গিরার আহারের জন্য অতিথিশালাতে তার কক্ষে পাঠিয়ে দিন। তাকে জানাবেন আমি এই খাদ্যদ্রব্য পাঠিয়েছি। সে যেন এই মহাপ্রসাদ ভক্ষণ করে।’

সহ প্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন আর রক্ষীপ্রধানকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে কপাট বন্ধ করলেন প্রধান পুরোহিত।

একই ভাবে একই স্থানে বসে তোরণের দিকে উৎকণ্ঠিত ভাবে তাকিয়ে ছিল অঙ্গিরা। সেই অশুভ পাখিগুলো মাঝে-মাঝেই ডাকছে। অসহ্য তাদের চিৎকার। মধ্যাহ্নে গর্ভগৃহর ঘণ্টাধ্বনিও কানে এল তার। অর্থাৎ দেবতাকে ভোগ নিবেদন করা হচ্ছে। এর কিছু সময় পর একজন সেবায়েত উপস্থিত হল তার কাছে। সে বলল, ‘আপনি অতিথিশালাতে চলুন। প্রধান পুরোহিত আপনার জন্য মহাপ্রসাদ পাঠিয়েছেন। সেগুলো আপনাকে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।’

সেবায়েতের কথা শুনে অঙ্গিরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সঙ্গে অতিথিশালাতে উপস্থিত হল। তার কক্ষের সামনে বেশ কয়েকজন সেবায়েত খাদ্য পাত্র বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। অঙ্গিরা তার কক্ষের কপাট খুলতেই তারা সেই খাদ্যবস্তুর পাত্রগুলো কক্ষের মেঝেতে সাজিয়ে রেখে ফিরে গেল।

অন্যদিন অতিথিশালার পাচকরা অঙ্গিরার জন্য সাধারণ তণ্ডুল, ব্যঞ্জন দিয়ে যায়। কিন্তু প্রধান পুরোহিতের পাঠানো খাদ্য সামগ্রী দেখে বেশ বিস্মিত হল অঙ্গিরা। রুপোর পাত্র, থালাতে থরে থরে সাজানো নানা ধরনের ব্যাঞ্জন, পরমান্ন, মিষ্টান্ন, তাছাড়া ঘৃত সমৃদ্ধ উৎকৃষ্ট তণ্ডুল তো আছেই।

উৎকণ্ঠাতে কিছুই খেতে ইচ্ছা করছে না অঙ্গিরার। তবুও কিছুটা খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করল শরীরে বল সঞ্চয় করার জন্য। অঙ্গিরা সিদ্ধান্ত নিল রাত্রিতে চন্দ্রমন্দিরের দিকে আজও একবার যাবে খগেশ্বরের সন্ধানে। খাদ্য গ্রহণের পর অতিথিশালার কক্ষে রাত্রি জাগরণ আর প্রচণ্ড মানসিক ক্লান্তিতে ঘুম নেমে এল অঙ্গিরার চোখে।

এই দ্বিপ্রহরেই সৈনিকদের ক্লান্তি মোচনের উদ্দেশ্যে কিছু সময়ের জন্য যাত্রা স্থগিত রেখেছিলেন নৃপতিশ্রেষ্ঠ ভোজরাজ পরমদেও। গত কয়েকদিন ধরে তিনি তার সমুদ্র সমান বিশাল বাহিনী নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সোমনাথ নগরীর দিকে। বিরামহীন তাদের যাত্রা। কয়েক দণ্ড তাঁর সেনাবাহিনীকে বিশ্রামের নির্দেশ দিয়ে তাঁর ঐরাবত থেকে অবতরণ করে নিজেও বিশ্রাম নিচ্ছিলেন রাজাধিরাজ পরমদেও। এমন সময় তাঁর অগ্রবর্তী পথ প্রদর্শক অশ্বারোহীরা কাসেমকে উপস্থিত করল তাঁর সামনে।

কাসেমের পরিচয় জেনে আর তার বক্তব্য শুনে বেশ বিস্মিত হলেন ভারতশ্রেষ্ঠ নৃপতি ভোজরাজ পরমদেও। তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘সেই যবন সুলতান কদিনের মধ্যে সোমনাথ নগরীতে উপস্থিত হতে পারে বলে তোমার ধারণা?’

কাসেম জবাব দিল, ‘মহারাজ, আমি যে রাতে তার শিবির থেকে পলায়ন করি তার পরদিনই যদি সে যাত্রা করে থাকে তবে হয়তো বা সে আর এক-দু-দিনের মধ্যেই নগরীতে প্রবেশ করতে পারে।’ যদি তার বাহিনী সঠিক পথ নির্বাচন করে।

তার জবাব শুনে উৎকণ্ঠিত ভোজরাজ জানতে চাইলেন, ‘আমার হস্তিবাহিনী যেখানে অবস্থান করছে, এ স্থান থেকে সোমনাথ নগরী কত দিনের পথ?’

কাসেম হিসাব করে নিয়ে উত্তর দিল, ‘অন্তত চার দিনের পথ। তবে আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলে হয়তো তিন দিনের মধ্যে আপনাকে সোমনাথ নগরীতে উপস্থিত করাতে পারব।’

যেভাবেই হোক ভোজরাজকে, যবনবাহিনী মন্দিরে প্রবেশ করবার পূর্বেই সেখানে উপস্থিত হতে হবে। কাসেমের কথা শোনার পর ভোজরাজ পরমদেও আর সে স্থানে এক পলও কালক্ষেপ করা সমীচিন বোধ করলেন না। কাসেমকে উঠিয়ে দেওয়া হল একটা হাতির পিঠে। রাজাধিরাজ নিজেও উঠে বসলেন তার রণহস্তির পিঠে। বিশ্রাম স্থগিত করে ভোজরাজ পরমদেও, কাসেমের দেখানো পথ ধরে দ্রুত এগোলেন সোমনাথ নগরীর উদ্দেশ্যে। সূর্য ডোবার পরও সে বাহিনী থামল না।

সোমেশ্বর মন্দিরে সূর্য ডোবার পর যথারীতি সেদিনও সন্ধ্যারতি হল। ঘণ্টা বাজল। রক্ষী পরিবৃত হয়ে আতঙ্কিত দেবদাসীরা গর্ভগৃহ চত্বরের সামনে উপস্থিত হয়ে নৃত্যপ্রদর্শন করে ফিরে গেল প্রাচীর ঘেরা নিজেদের আবাসস্থলে। এরপর নিদ্রাভঙ্গ হলো অঙ্গিরার। পর মুহূর্ত থেকে আবারও দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরতে লাগল তাকে। রাজকন্যা রাজশ্রীর কোনও বিপদ হয়নি তো? নগরী ত্যাগ করার সময় সেনাদল বা দস্যুবাহিনীর দ্বারা সে আক্রান্ত হয়নি তো? নাকি খগেশ্বরের কোনও বিপদ ঘটেছে? অঙ্গিরার যদি জানা থাকত যে খগেশ্বর রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতাকে কোনও নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে গেছে তাহলেও নয় অঙ্গিরা যে-কোনও উপায়েই হোক মন্দির প্রাকার অতিক্রম করে সে স্থানের দিকে রওনা হবার চেষ্টা করত। কিন্তু বৃদ্ধ খগেশ্বর সে স্থানের কথা অঙ্গিরাকে বলে যায়নি। হয়তো বা সে তখন সঠিক স্থান নির্বাচন করে উঠতে পারেনি। বাইরে রাত বাড়তে লাগল। প্রবল দুশ্চিন্তাতে অতিথিশালার অন্ধকার কক্ষে বসে ছটফট করতে লাগল অঙ্গিরা।

ঠিক একই সময় সোমনাথ নগরী থেকে অনেকটা দূরে এক জীর্ণ কক্ষে বসে অঙ্গিরার মতো একই রকম দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ভাবে তার কথাই ভাবছিল রাজকুমারী সমর্পিতা। অরণ্যের ভিতর এই অতি প্রাচীন পরিত্যক্ত শিব মন্দিরে তাদের দুজনকে তিনদিন হল পৌঁছে দিয়ে গেছে বৃদ্ধ খগেশ্বর। এ স্থান থেকে সোমেশ্বর মন্দির পদব্রজে একদিনের পথ। তার তো মন্দিরে ফিরে গিয়ে সোমেশ্বর মুদ্রা অঙ্গিরাকে সমর্পণ করার কথা। আর সে মুদ্রা নিয়ে মন্দিরনগরী ত্যাগ করে গতকালই এ স্থানে উপস্থিত হবার কথা অঙ্গিরার! কিন্তু সে কেন এখনও উপস্থিত হল না? এই জীর্ণ কক্ষে তিন রাত অতিবাহিত হয়ে গেল রাজশ্রীর। তার এই কক্ষের উন্মুক্ত, কপাটহীন দ্বার আগলে তলোয়ার হাতে বসেছিলেন চন্দ্রদেব।

মন্দিরের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে সব মহাবৃক্ষ। কিছুটা তফাতে একটা বৃক্ষর গায়ে তার ঘোড়াটা বাধা আছে। সেদিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ ভাবে বসে আছেন তিনি। গাছের শাখাপ্রশাখার ফাঁক গলে একফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে তাঁর মুখমণ্ডলে। চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট চেপে আছে তার কপালে।

এক সময় তিনি বললেন, ‘আমাদের এ স্থানে অপেক্ষা করা আর উচিত হবে না। এই বনাঞ্চলে দস্যু থাকতে পারে, এমনকী হয়তো বা যবন বাহিনীও এ পথে উপস্থিত হতে পারে। আমি একা মানুষ তখন কী ভাবে রক্ষা করব তোমাকে? চালুক্য সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীকে? কাল সূর্যোদয় পর্যন্ত সেই যুবকের জন্য অপেক্ষা করে আমাদের চালুক্য রাজ্যর দিকে রওনা হওয়া উচিত।’

রাজশ্রী বলল, ‘আমাদের কেউ একজন অশ্বপৃষ্ঠে নগরীর দিকে গিয়ে দেখে আসতে পারিনা সেখানে কি ঘটছে?’

চালুক্য মহামন্ত্রী বললেন, ‘সে কাজ আত্মহননের সামিল হতে পারে। হয়তো যবন মামুদ সোমনাথ নগরীতে প্রবেশ করেছেন বা প্রবেশ করতে চলেছেন!’

মহামন্ত্রী চন্দ্রদেবের বলা অন্তিম বাক্যটা যেন রাজকন্যা রাজশ্রীর উৎকণ্ঠা-দুশ্চিন্তা আরও বৃদ্ধি করল। সে আর কোনও কথা বলল না। নিশ্চুপ হয়ে কক্ষের বাইরের দিকে চেয়ে রইল অঙ্গিরার প্রতীক্ষায়। রাত এগিয়ে চলল। এক সময় শৃগালের দল তাদের সম্মিলিত চিৎকারে মধ্যরাত ঘোষণা করল।

মধ্যরাতে ঠিক সে সময়ই অঙ্গিরা কক্ষ ত্যাগ করতে যাচ্ছিল সেই চন্দ্রমন্দিরে যাবার জন্য। যদি সে স্থানে বৃদ্ধ খগেশ্বর ফিরে আসে সেজন্য। কিন্তু সে দ্বার উন্মোচন করার আগেই মৃদু আঘাতের শব্দ হল বন্ধ কপাটে। তবে কি খগেশ্বর উপস্থিত হয়েছে? অঙ্গিরা দ্রুত কপাট উন্মোচন করল। অঙ্গিরা দেখল, খগেশ্বর নয়, চাঁদের আলোতে তার কক্ষের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব!

কয়েক মুহূর্ত পরস্পরের দিকে নিশ্চুপ ভাবে চেয়ে রইল তারা। ত্রিপুরারিদেব মৃদু হেসে তার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজ রাতেই তোমাকে তোমার কার্যভার সমর্পণ করব। যে পঞ্চব্যঞ্জন, দেবতার প্রসাদ তোমাকে পাঠিয়েছিলাম তা তুমি গ্রহণ করেছ তো?’

অঙ্গিরা এবার খাদ্যদ্রব্য পাঠাবার অন্তর্নিহিত কারণ বুঝতে পারল। সেই অন্ধকার কক্ষে তাকে প্রেরণ করার পূর্বে শেষ বারের মতো পঞ্চব্যঞ্জন, পরমান্ন দিয়ে তার স্বাদ মেটাবার ব্যবস্থা করেছিলেন প্রধান পুরোহিত। যুপকাষ্ঠে সমর্পণ করার পূর্বে যেমন ছাগ শিশুকে উৎকৃষ্ট পল্লব ভক্ষণ করানো হয় ঠিক তেমনই!

অঙ্গিরা মৃদু স্বরে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, প্রভু।’

প্রধান পুরোহিত বললেন, ‘অতি উত্তম। এই নতুন বস্ত্র পরিধান করো, আমি যে স্থানে তোমাকে নিয়ে যাব সে স্থানে উপস্থিত হবার জন্য।’ কথাগুলো বলে তিনি তার হাতে ধরা ঘোর কৃষ্ণবর্ণের বস্ত্রগুলি এগিয়ে দিলেন অঙ্গিরার দিকে।

মুহূর্তের মধ্যে তার কর্তব্য স্থির করে নিল অঙ্গিরা। কক্ষের ভিতর সে নতুন বস্ত্র পরিধান শুরু করল। দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন প্রধান পুরোহিত। অঙ্গিরার পরিধান সম্পন্ন হবার পর ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘ধনুর্বাণ সঙ্গে নাও। আর কক্ষ ত্যাগ করার পূর্বে ওই সোমেশ্বর মুদ্রা আমাকে সমর্পণ করো। ওই মুদ্রার প্রয়োজন আর তোমার হবে না।’

অঙ্গিরা ধনুর্বাণ কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, ‘ও মুদ্রা আমি আপনাকে সমর্পণ করতে অক্ষম। আমাকে মার্জনা করবেন। সোমেশ্বর মুদ্রা আমার কাছে নেই। আমি হারিয়ে ফেলেছি মুদ্রাটি। সম্ভবত আমার বস্ত্র থেকে কোথাও পতিত হয়েছে ওই মুদ্রা।’

কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত অঙ্গিরার দিকে চেয়ে রইলেন প্রধান পুরোহিত। তিনি মনে মনে ভাবলেন তবে কি তার অনুমান সত্য? ওই মুদ্রার সাহায্যেই দেবদাসী সমর্পিতাকে ছদ্মবেশ ধারণ করিয়ে মুক্ত করেছে খগেশ্বর? কিন্তু এ ব্যাপার নিয়ে অঙ্গিরাকে ভর্ৎসনা করা অথবা প্রশ্ন করা এ মুহূর্তে সমীচীন বোধ করলেন না প্রধান পুরোহিত। এখন তিনি অন্তিম কার্য সম্পাদন করতে চলেছেন অঙ্গিরাকে নিয়ে। এ সময় কালক্ষেপ করা তাঁর উচিত হবে না। তাই তিনি এরপর অঙ্গিরাকে শুধু বললেন, ‘আমাকে অনুসরণ করো।’

কক্ষ ত্যাগ করল অঙ্গিরা। তারপর তারা দুজন অতিথিশালা থেকে বাইরে বেরিয়ে এগোল সোমনাথ মন্দিরের সোপানশ্রেণীর দিকে।

নিস্তব্ধ মধ্যরাত্রি। কোথাও কোনও শব্দ নেই। একটা পেঁচকের শব্দ পর্যন্ত নয়। বিশাল মন্দির চত্বর প্রাঙ্গণের কোথাও এক বিন্দু আলো পর্যন্ত নেই শুধু যে স্থানে উন্মুক্ত আকাশের নীচে অগ্নিকুণ্ড ঘিরে বসে আছে নগ্ন সন্ন্যাসীর দল, সে স্থান ছাড়া। কেমন যেন ভৌতিক দেখাচ্ছে তাদের অবয়বগুলো। পাথরের মূর্তির মতো তারা বসে আছে। অঙ্গিরাদের দিকে তারা ফিরেও তাকাল না। সোপানশ্রেণী বেয়ে ত্রিপুরারিদেবকে অনুসরণ করে অঙ্গিরা এসে উপস্থিত হল গর্ভগৃহ তোরণের সামনে। চাঁদের আলো প্রবেশ করছে না এখানে।

কৃষ্ণবর্ণের পোশাক পরিধান করার কারণে নিজের শরীরকেই যেন দেখতে পাচ্ছে না অঙ্গিরা। সে মনে মনে ভাবল, ‘হ্যাঁ, অন্ধকারের প্রহরীর তো এমন পোশাকই হওয়া প্রয়োজন। তারপর এ পোশাকও একদিন খসে পড়বে শরীর থেকে। দীর্ঘদিন সূর্যালোকের স্পর্শ না পেয়ে একদিন হয়তো আমাকে জীবন্ত প্রেতের মতো দেখাবে! ঘা ফুটে উঠবে সর্বাঙ্গে। তখন আমি আর মানুষ থাকব না। আমি তখন শুধুই প্রেত সদৃশ অন্ধকারের প্রহরী। সোমনাথ মন্দিরের অন্ধকার রত্নভাণ্ডারের স্যমন্তক মণির রক্ষক।’

ত্রিপুরারিদেব গর্ভগৃহ তোরণের গায়ের এক কুলুঙ্গি থেকে একটা ক্ষুদ্রাকৃতির প্রদীপ নিয়ে চকমকি পাথর ঘষে সেটা জ্বালালেন। তারপর চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে গর্ভগৃহর তোরণ উন্মোচন করে অঙ্গিরাকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। তারা দুজন ভিতরে প্রবেশ করার পর ভিতর থেকে কপাট বন্ধ করে দিলেন তিনি। প্রদীপের মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়েছে কক্ষে।

অঙ্গিরার মনে হল, গর্ভগৃহর ঠিক মাঝখানে সোমেশ্বর মহাদেবের ঝুলন্ত বিগ্রহ যেন নিদ্রা ভঙ্গ করে তার দিকেই চেয়ে আছেন! প্রধান পুরোহিত কপাট বন্ধ করার পর অঙ্গিরাকে সঙ্গে নিয়ে সেই বিগ্রহর সামনে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে মনে মনে বললেন, ‘হে সোমনাথ, হে সোমেশ্বর মহাদেব, আমি যা করতে চলেছি তা আপনার সম্পদ রক্ষার জন্যই করছি, আমার কোন ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়। যুবক অঙ্গিরাকে আপনার স্যমন্তক মণির প্রহরী নিযুক্ত করছি আমি। আপনি তাকে আশীর্বাদ করুন, যাতে সে আপনার সম্পদ রক্ষা করতে পারে। রত্নাগারের প্রহরীরূপে তার নিয়োগ আপনি অনুমোদন করুন। তার পিতা-মাতার আত্মার মুক্তির পথ প্রশস্ত করুন।’

এ কথা বলার পর সোমেশ্বর মহাদেবের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব অঙ্গিরাকে বললেন, ‘তুমি দেবতার উদ্দেশ্যে বলো, ”আপনার মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব আপনার সম্পদ রক্ষার যে দায়িত্ব আমাকে সমর্পণ করছেন সে দায়িত্ব আমি যথাযথ ভাবে পালন করব। কোনওরূপ লোভ ও ভয়শূন্য ভাবে। আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন।” ‘

একটু ইতস্তত করে প্রধান পুরোহিতের বলা কথাগুলো বলল অঙ্গিরা।

ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘তুমি এবার শপথ গ্রহণ করো, ”আমি আমৃত্যু কোনও দিন আমার দায়িত্বের কথা, সোমেশ্বর মহাদেবের রত্ন কক্ষের কথা দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করব না।” ‘

প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ মতো শপথ বাক্য গ্রহণ করল অঙ্গিরা।

ত্রিপুরারিদেব বিগ্রহর গলা থেকে একটা নীলকণ্ঠ ফুলের মালা নিয়ে সেটা অঙ্গিরার গলায় পরিয়ে দিয়ে দেবতার রত্নরক্ষক, স্যমন্তক মণির প্রহরী রূপে অভিষিক্ত করলেন অঙ্গিরাকে।

অঙ্গিরা ও ত্রিপুরারিদেব দুজনেই প্রণাম করল ত্রিভুবনপতি সোমনাথকে। অঙ্গিরাকে নিয়ে এরপর ত্রিপুরারিদেব এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন কক্ষের পাথুরে দেওয়ালের সামনে। অঙ্গিরা দেখল সে দেওয়ালের এক নির্দিষ্ট স্থানে দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুল স্থাপন করলেন দেবতার প্রধান পুরোহিত। ধীরে ধীরে ফাঁক হতে শুরু করল দেওয়ালের এক অংশ। একজন মানুষ গলে যাবার মতো পথ তৈরি হল। দেওয়ালের ওপাশে খেলা করছে নিকষ কালো অন্ধকার!

ত্রিপুরারিদেব, অঙ্গিরাকে তাঁকে অনুসরণ করতে বলে প্রবেশ করলেন সেই গহ্বরে। অঙ্গিরাও প্রবেশ করল তার পিছনে। প্রদীপের মৃদু আলোতে যতটুকু দৃশ্যমান তাতে অঙ্গিরা দেখল সংকীর্ণ সোপানশ্রেণী নেমে গেছে পাতালের দিকে। সেই সোপানশ্রেণী বেয়ে ধীর পদে নামতে শুরু করলেন প্রধান পুরোহিত। অঙ্গিরা তাকে অনুসরণ করল।

অনেক বাঁক আছে সেই সোপানশ্রেণীর। প্রতিটা বাঁকে দুপাশ থেকে নানা অন্ধকার অলিন্দ এসে মিশেছে। এ যেন এক গোলাকধাঁধা। কিছুটা নামার পর অঙ্গিরার মনে হল এরপর নামলে সে আর এই গোলকধাঁধা ভেঙে কিছুতেই উঠে আসতে পারবে না। এখনই তাকে যা করার করতে হবে। সামনে আবারও একটা বাঁক আসছে। সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত সেই বাঁকের মুখে পৌঁছতেই অঙ্গিরা বলে উঠল, ‘আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন প্রধান পুরোহিত। হে সোমেশ্বর মহাদেব তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো।’

কথাটা কানে যেতেই ত্রিপুরারিদেব থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকাতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে পিছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিল অঙ্গিরা। ত্রিপুরারিদেব অস্পষ্ট আর্তনাদ করে ছিটকে পড়ে সোপানশ্রেণী দিয়ে নীচের দিকে গড়িয়ে যেতে লাগলেন! প্রদীপ নিভে গেল। অঙ্গিরা আর নীচের অন্ধকারের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত উঠতে শুরু করল ওপর দিকে।

অঙ্গিরা শেষ পর্যন্ত উপস্থিত হল গর্ভগৃহতে। ত্রিপুরারিদেব যেখানে অঙ্গুলি স্থাপন করে পথ উন্মোচন করেছিলেন অঙ্গিরা সে স্থানে অঙ্গুলি স্থাপন করে চাপ দিতেই পাথুরে দেওয়াল আবার নিজের স্থানে ফিরে এসে পথ করে দিল। গর্ভগৃহর নীচে অন্ধকারে আটকা পড়ে গেলেন সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত।

অঙ্গিরা এরপর গর্ভগৃহ ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে এসে গর্ভগৃহের ভারী তোরণটা বন্ধ করে দিল। গর্ভগৃহ চত্বরের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অঙ্গিরা হাঁফাতে হাঁফাতে ভাবতে লাগল তার এবার কী করা উচিত? সে কি মন্দিরের পশ্চাত ভাগের প্রাকার অতিক্রম করে সমুদ্রের দিক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়বে? তারপর নগরীতে অনুসন্ধান চালাবে খগেশ্বরের যদি দেখা মেলে সেজন্য? যদি কোনও ভাবে দেবদাসী সমর্পিতা বা চন্দ্রদেবের সন্ধান পাওয়া যায়!

ভাবছিল অঙ্গিরা। গর্ভগৃহর সমুখভাগে এই স্থান মন্দিরের সর্বোচ্চ স্থান। মন্দিরের বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায় এ স্থান থেকে। হঠাৎ অঙ্গিরা দেখতে পেল দূরে এক দিকে আকাশ যেন লাল হয়ে উঠেছে। ও কীসের আলো? অঙ্গিরা বোঝার চেষ্টা করল সেই আলোর উৎস।

শুধু অঙ্গিরাই নয়, প্রচণ্ড উৎকণ্ঠাতে, আতঙ্কে বিনিদ্র রাত্রি যাপন করছিল অনেকেই। সেই আলো যত উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগল, ততই চোখে পড়তে লাগল অনেকেরই। হঠাৎই মন্দিরের প্রবেশ তোরণের দিক থেকে কার যেন চিৎকার ভেসে এল, ‘যবন আসছে! তারা এসে পড়েছে!’

লোকটার সে চিৎকার মিথ্যা ছিল না। আকাশ আলোকিত হয়ে উঠছিল মামুদ বাহিনীর হাজার হাজার মশালের আলোতে। সোমনাথ নগরীর উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে তারা।

সেই চিৎকার শোনার কয়েক মুহূর্তের মধ্যে প্রবল আতঙ্কে যেন ঘুম ভেঙে গেল মন্দিরের। একমাত্র দেবদাসীরা ছাড়া যে যেখানে তারা ছিল নিজেদের কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে এল মন্দির প্রাঙ্গণে। রাত্রির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ভয়ার্ত কোলাহল মুখর হয়ে উঠল প্রাঙ্গণ। চারদিক থেকে শুধু চিৎকার শোনা যেতে লাগল, ‘যবন আসছে! যবন আসছে!’

অঙ্গিরা গর্ভগৃহর চত্বর থেকে যখন নীচে নামতে শুরু করল তখন তার পাশ দিয়েই দ্রুত ওপর দিকে উঠছেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন। তিনি যেন খেয়ালই করলেন না অঙ্গিরাকে। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবকে সংবাদ দেবার জন্য ছুটছেন তিনি। অঙ্গিরা যখন নীচের প্রাঙ্গণে নেমে এল, তখন তিনি উপস্থিত হলেন প্রধান পুরোহিতের কক্ষের সামনে। কিন্তু মল্লিকার্জুন সে কক্ষে বা গর্ভগৃহ চত্বরে কোথাও সন্ধান পেলেন না সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের।