Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/28
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সোমনাথ সুন্দরী – ২৬

২৬

সোনার শিকলের ঝনঝন শব্দে নয়, মন্দির শীর্ষে বসে থাকা শ্বেত গৃধিনিগুলোর উন্নসিত কর্কশ চিৎকারে এদিন ভোর হল প্রভাস তীর্থে, সোমেশ্বর মহাদেবের আবাসস্থল সোমনাথ মন্দিরে। বর্ম পরিহিত মামুদ তার বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে-সঙ্গেই শিঙা বেজে উঠল। সুলতান নিজে তার সেনাপতি আর স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে এগোলেন মন্দিরের তোরণ ভাঙার জন্য।

শিঙার শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে মন্দির প্রাকারের ভিতর থেকেও শঙ্খনাদ হল। তোরণের ভিতর থেকে মন্দির রক্ষার জন্য বাইরে আত্মপ্রকাশ করল ভৈরববাহিনী, একলিঙ্গদেবের উপাসক শূল-ত্রিশূলধারী নাগা সন্ন্যাসীরা। ‘দীন দীন’ আর ‘একলিঙ্গদেবের জয় ধ্বনিতে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হল দুই বাহিনী। এদিনের যুদ্ধরীতি সম্পর্কে সুলতানের নির্দেশ পালন করল যবন বাহিনী। উলঙ্গ কাফেরদের শূল বা ত্রিশূলের আওতার মধ্যে না গিয়ে কিছুটা তফাত থেকে দশ জন যবন সেনা মিলে এক জন নাগা সন্ন্যাসীকে লক্ষ করে বর্শা নিক্ষপ করতে লাগল।

বর্শা নিক্ষেপ করছেন স্বয়ং সুলতানও। তিনি পাশে থাকায় যবন সেনাদের মনোবল, উৎসাহ দ্বিগুণ হয়ে উঠল। নাগা সন্ন্যাসীদের ত্রিশূলের আঘাতে কিছু সুলতান সেনা নিহত হলেও যুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ পেতে লাগল সুলতান সেনারা। যুদ্ধরত গজনীবিদ অবাক হয়ে গেলেন এই নগ্ন সন্ন্যাসীদের সাহস ও শক্তি দেখে। একজন নগ্ন কাফের বর্শাবিদ্ধ অবস্থাতেই বেণীর ফাঁস দিয়ে হত্যা করল এক সুলতান সেনাপতিকে। তবে শেষ পর্যন্ত সুলতান বাহিনীর প্রবল অস্ত্রনিক্ষেপের মুখে একে একে ভূপতিত হতে লাগল মহাদেবের অনুচররা। কিন্তু তাদের শেষ জন পর্যন্ত আমৃত্যু লড়াই চালাল যবনদের বিরুদ্ধে।

যতক্ষণ তাদের শেষ ত্রিশূলধারী জীবিত রইল ততক্ষণ একজন যবনও প্রবেশ করতে পারল না মন্দিরের ভিতর। তারপর এক তরুণ স্বেচ্ছাসেবী জিহাদি তোরণের ভিতর ফাটল গলে প্রবেশ করল। তারপর তার পিছন পিছন আরও কয়েকজন।

যে মন্দিরবাসীরা মন্দিরের ভিতর যবনদের প্রতিরোধ করার জন্য অপেক্ষা করছিল তারা কেউ সৈনিক নয়, তবু তারা যে যা জিনিস সম্ভব হাতের কাছে পেয়েছে তা নিয়েই বাধা দেবার চেষ্টা করল যবনদের। মন্দিরবাসীদের কারো হাতে যষ্টি, কারো হাতে রন্ধন শলাকা, কারও হাতে ধাতব পাত্র অথবা ফুল সংগ্রহের সাঁজি। তা নিয়েই মামুদবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। কিন্তু সে সব দিয়ে আর কতক্ষণ প্রতিরোধ করা চলে অস্ত্রধারী মামুদ যোদ্ধাদের? রক্তস্রোত বইতে শুরু করল সোমনাথ মন্দিরে। বাঁকানো যবন তলোয়ারের আঘাতে উড়তে লাগল মন্দিরবাসী কাফেরদের ছিন্ন মুণ্ড। হাহাকার, আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। এরই মধ্যে সোমনাথ মন্দিরের তোরণের অর্গল উন্মুক্ত করে দিল একদল স্বেচ্ছাসেবী জিহাদি।

বন্যার স্রোতের মতো সুলতান বাহিনী প্রবেশ করতে লাগল সোমেশ্বর মহাদেবের আবাসস্থলে। তলোয়ার চালাতে চালাতে সুলতান বাহিনীর স্বেচ্ছাসেবকরা সোপনশ্রেণীর দিকে এগোতে লাগল মন্দিরে ওঠার জন্য। মন্দির চত্বরের ওপর থেকে যবনদের প্রতিরোধ করার জন্য একদল সেবায়েত দেবতার পূজার জন্য রক্ষিত বিল্ব ফল নিক্ষেপ করতে লাগল তাদের ওপর। অক্ষম, করুণ প্রচেষ্টা অসহায় সেবায়েতদের বিগ্রহকে রক্ষা করার জন্য।

একদল গজনীসেনা পৌঁছে গেল সোপানশ্রেণীর সামনে। সেখানে একটা ধাতব প্রদীপদণ্ড হাতে নিয়ে পথ আগলে দাঁড়িয়ে ছিলেন পুরোহিত নন্দিবাহন। জীবনে কোনও দিন অস্ত্র ধারণ করেননি তিনি। একজন যবন মন্দিরে ওঠার জন্য সোপানশ্রেণীতে পা বাড়াতেই নন্দিবাহন প্রচণ্ড আক্রোশে ভারী ধাতব প্রদীপদণ্ডর এক আঘাতে চূর্ণ করে দিলেন সেই যবনের মস্তক। পরক্ষণেই অবশ্য এক জিহাদির তলোয়ার পুরোহিত নন্দিবাহনের ধর-মুণ্ড আলাদা করে দিল। এরপর গর্ভগৃহ চত্বরে দাঁড়িয়ে পতাকা নাড়াতে শুরু করল সুলতান বাহিনীর পতাকাবাহক। খলিফার পতাকা! যা এখানে প্রোথিত করার জন্য সুদূর গজনী মুলুক থেকে হিন্দ মুলুকে ছুটে এসেছে মামুদবাহিনী। সে দৃশ্য দেখে উল্লাসধ্বনি করে উঠল জিহাদিরা। সোমনাথ মন্দির দখলের কাজ সম্পন্ন হয়েছে তাদের।

উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচরদের সঙ্গে নিয়ে তোরণ দিয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করার সময় অট্টহাস্য করে মামুদ তার অনুচরদের বললেন, ‘কাফেরদের বিশ্বাস ছিলো এ মন্দির কেউ ধ্বংস করতে পারবে না! তাদের দেবতা নাকি সর্বশক্তিমান। আমি তাদের দেবতার থেকেও বেশি শক্তিমান। চলো এবার দেখা যাক, কাফেরদের সেই পুতুল দেবতা কেমন?

সোপানশ্রেণী বেয়ে ওপরে ওঠার সময় অজগর সর্পের মতো স্বর্ণ শৃঙ্খল দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন সুলতান। এই স্বর্ণ শৃঙ্খলের মূল্যই তো অন্তত বিশ লক্ষ দিনার হবে! তবে কত সম্পদ জমা হয়ে আছে কাফেরদের এই মন্দিরে!

গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণে উঠে এসে গর্ভগৃহের বন্ধ কপাটের সামনে দাঁড়িয়ে সেই রত্নখচিত কপাট, কাঠামো দেখেও প্রবল বিস্মিত হলেন সুলতান। এত সম্পদ তো খলিফার তোষাখানাতেও নেই! কয়েক মুহূর্ত সেই কপাটের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে সুলতান পদাঘাত করলেন কপাটে। উন্মোচিত হয়ে গেল গর্ভগৃহ তোরণ। বিজয়ী গজনীবিদ সুলতান মামুদ তলোয়ার হাতে চর্ম পাদুকা সমৃদ্ধ পায়ে প্রবেশ করলেন কাফেরদের গর্ভ মন্দিরে।

গর্ভগৃহতে একটা প্রদীপ জ্বলছে। তার আলোতে মামুদ দেখতে পেলেন হীরকখচিত, রত্ন হারে সজ্জিত ঝুলন্ত বিগ্রহকে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মুণ্ডিত মস্তক, শিখাধারী এক কাফের।

সোমেশ্বর মহাদেবের শূন্যে ঝুলন্ত বিগ্রহ দেখে মুহূর্তের জন্য বিস্মিত মামুদের মনে হল, ‘তবে কি এ বিগ্রহের সত্যিই কোনও অলৌকিক ক্ষমতা আছে? পাথরের পুতুলটা শূন্যে ভেসে আছে কী ভাবে?’

তবে এ ভাবনাকে মনের মধ্যে স্থান দিলেন না সুলতান। সোমেশ্বর মহাদেবের মূর্তির পাশে দণ্ডায়মান লোকটাকে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তুই কে?’

লোকটা জবাব দিল, ‘আমি মল্লিকার্জুন। এই সোমেশ্বর মহাদেবের সেবক, পুরোহিত।’

সুলতান তির্যক হেসে তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমি গজনীর সুলতান মামুদ।’

সুলতানের পরিচয় পেয়ে অনুনয়ের স্বরে মল্লিকার্জুন বললেন, ‘দয়া করে বিগ্রহর কোনও ক্ষতি করবেন না আপনি। তার বিনিময়ে এ মন্দিরে রক্ষিত সম্পদের প্রতিটা কণা আমি আপনাকে দেব।’

সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের পুরোহিতের কথা শুনে মামুদ অট্টহাস্য করে বলে উঠলেন, ‘বেওকুফ কাফের, সুলতান মামুদ তোর কাছে বিগ্রহ বিক্রি করতে আসেনি, বিগ্রহ ধ্বংস করতে এসেছে।’ কথাটা বলে তিনি তলোয়ার ওঠালেন মূর্তির ওপর আঘাত হানার জন্য।

পুরোহিত মল্লিকার্জুন তা দেখে বিগ্রহকে রক্ষার শেষ চেষ্টা করার জন্য দু-হাতে জড়িয়ে ধরলেন সোমনাথকে। কিন্তু এর পরমুহূর্তেই বিগ্রহ ধ্বংসকারী গজনীর সুলতান মামুদের ভয়ঙ্কর তলোয়ার বিদ্যুতের মতো আঘাত হানল বিগ্রকে লক্ষ করে। পুরোহিত মল্লিকার্জুনের দেহ সমেত দেবমূর্তি দ্বিখণ্ডিত হয়ে খসে পড়ল মাটিতে।

বিগ্রহ দ্বিখণ্ডিত অবস্থায় মাটিতে আছড়ে পরার পরও সুলতান আরও বেশ কয়েকবার তলোয়ারের আঘাত হানলেন ভূপতিত সেই খণ্ডিত বিগ্রহকে আরও কয়েকটা খণ্ডে বিভক্ত করার জন্য। তার ভিতরে কোনও সম্পদ লোকানো আছে কিনা তা দেখার জন্য। কিন্তু এ ব্যাপারে একটু হতাশ হলেন সুলতান। খণ্ডিত বিগ্রহর পেটের ভিতর থেকে কোনও রত্ন সম্পদ পেলেন না তিনি।

তবে তেমন হতাশ হবার কিছু নেই। এ মন্দিরের চারপাশেই তো অজস্র সোনা রত্নরাজি ছড়িয়ে আছে। শুধু এই কপাট আর কাঠামোর দামই হবে এক কোটি দিনার! অসংখ্য হীরকখণ্ড, পান্না, নীলকান্ত মণি সমৃদ্ধ সোমনাথ মন্দিরের গর্ভগৃহর বিখ্যাত কপাট, যে কপাটের সামনে নতজানু হয়ে সোমেশ্বর মহাদেবের আশীর্বাদ প্রার্থনা করত হিন্দ মুলুকের শ্রেষ্ঠ সম্পদশালী নৃপতিরা।

গর্ভগৃহর থেকে বাইরে বেরিয়ে সুলতান তার অনুচরদের বললেন, ‘এই কপাট যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। কাঠামো সমেত এই রত্ন-কপাট আমি অবিকৃত অবস্থাতে গজনীতে নিয়ে যাব। তোমরা মন্দিরের তোষাখানার সন্ধান করো। যেখানে যত সম্পদ আছে তা খুঁজে বার করো। আর যেখানে যত মূর্তি দেখবে প্রথমেই তা চূর্ণ করবে। কাফেররা যেন ভবিষ্যতে ও স্থানকে তাদের ধর্মস্থান হিসাবে আর কোনও দিন ব্যবহার করতে না পারে।’

সুলতানের নির্দেশ পেয়ে সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল তার বাহিনী। নানা উপমন্দিরে অথবা দেওয়াল গাত্রে যেখানে যত দেবদেবীর মূর্তি-বিগ্রহ ছিল, তা প্রথম দর্শনেই চূর্ণ করতে লাগল মামুদবাহিনী। মন্দিরের সাধারণ রত্নাগার-সহ যেখানে যত সম্পদ ছিল তা লুঠ করতে লাগল তারা। আর সম্পদের খোঁজ করতে করতেই স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী এক সময় এমনও স্থানে পৌঁছে গেল যেখানে তারা খুঁজে পেল তাদের আকাঙ্ক্ষিত শ্রেষ্ঠ সম্পদ—নারী রত্ন। মুহূর্তের মধ্যেই দেবদাসীদের আবাসস্থল পরিণত হয়ে গেল নরককুণ্ডে।

মন্দিরের সোপানশ্রেণীর ঠিক সামনের প্রাঙ্গণে সুলতানের তাঁবু খাটানো হয়েছিল। গজনীবিদ তার তাঁবুতে মহার্ঘ্য গালিচায় তাকিয়াতে শরীর এলিয়ে সঙ্গীত ধ্বনির মতো উপভোগ করতে লাগলেন দেবদাসীদের আবাসস্থলের দিক থেকে ভেসে আসা গণধর্ষিতা নারীদের, সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসীদের ভয়ার্ত আর্তনাদ। তাদের নাথ সোমেশ্বর মহাদেব রক্ষা করতে পারলেন না তাদেরকে।

তবে সব দিনেরই শেষ থাকে। ভয়ঙ্কর দিনের অবসানে এক সময় অন্ধকার নামতে শুরু করল রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত সোমনাথ মন্দিরে। সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি, দেবদাসীদের নুপূর কিঙ্কিনির পরিবর্তে মন্দিরের নানা প্রান্ত থেকে ভেসে আসতে লাগল জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকদের উল্লাস, কখনও-বা দেবদাসীদের শেষ আর্তনাদ।

অঙ্গিরা সেই জীর্ণ মন্দিরের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল সারা দিন। সেখান থেকেই সে শুনতে পেয়েছে সোমেশ্বর মহাদেবের দিক থেকে নানা গোলযোগ, আর্তনাদের শব্দ ভেসে এসেছে। এবং অন্ধকার নামার পর কিছুটা স্তিমিত হলেও এখনও নারী কণ্ঠের তীক্ষ্ন চিৎকার মাঝে মাঝে শুনতে পাচ্ছিল অঙ্গিরা। আর তার সঙ্গে অজানা আশঙ্কাতে তার বুক কেঁপে উঠছিল। তার মনে হচ্ছিল, এমন ঘটেনি তো যে রাজকন্যা রাজশ্রী নগরী ত্যাগ করে হয়তো পালাতেই পারেনি অথবা পথে ধরা পড়ে গেছে সুলতান সেনাদের হাতে? কিন্তু এ ভাবনা মাথায় আসার পরক্ষণেই আবার তার মনে হতে লাগল, ‘না, এ কখনোই হতে পারে না। আমরা ভালোবেসে কোনও অপরাধ করিনি। আমাদের ভালোবাসা সত্যি। সত্যম-শিবম-সুন্দরম। যা সত্যি, তাই সুন্দর। তাই তো শিব-সোমেশ্বর। নিশ্চয়ই সোমেশ্বর মহাদেব এমন নিষ্ঠুর হবেন না আমাদের প্রতি। নিশ্চয়ই তিনি আমাদের মিলন ঘটাবেন।’

রাত বেড়ে চলল। উৎকণ্ঠিত অঙ্গিরা নানা কথা ভাবতে লাগল। কখনও সে অজানা, অশুভ কল্পনাতে ছটফট করতে লাগল আবার কখনও বা নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টায় মনকে প্রবোধ দিতে লাগল।

এক সময় শেষ হল সুলতানের স্বেচ্ছাসেবকদের উল্লাস। দেবদাসী মহলের সেই মর্মর প্রাঙ্গণ যেখানে তারা নৃত্যগীতের তালিম নিত, সেখানে এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে তাদের ক্ষতবিক্ষত নগ্ন মৃতদেহগুলো।

তাদের মৃত্যু অস্ত্রাঘাতে মৃত্যুর চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। হয়তো তাদের কারো দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়নি, কিন্তু তাদের শরীরের এমন কোন স্থান নেই যে স্থানে স্বাপদের নখরের ছাপ নেই! তরুণ জিহাদিরা শান্ত হল আর একটা কারণে, সুলতানের তাঁবু মন্দির চত্বরেই স্থাপন করা হয়েছে। তাদের চিৎকারে নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

অভিযান সফল হয়েছে গজনীবিদের। শান্তিতে নিদ্রা যাচ্ছেন তিনি। স্তব্ধ হয়ে গেল সব শব্দ। শুধু সুলতানের তাঁবু ঘিরে যে রক্ষীরা পাহারা দিচ্ছে তাঁবুর কাছে মাঝে মাঝে তাদের অস্পষ্ট পদচারণার শব্দ শোনা যেতে লাগল।

সব শব্দ যখন থেমে গেল তখন অঙ্গিরার মনে হল একবার বাইরে উঁকি দিয়ে দেখা যাক। অন্তত একটু চাঁদের আলো তো দেখা যাবে, তাতে হয়তো তার মনের শঙ্কা কিছুটা কাটবে। গত রাত থেকেই সে অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে। একবিন্দু আলোর মুখ দেখেনি।

স্থান ত্যাগ করে অঙ্গিরা অন্ধকার হাতড়ে মন্দিরের বাইরে এসে দাঁড়াল। আকাশের বুকে চাঁদ থাকলেও তা যেন কেমন ম্রিয়মান। সোমদেব যেন করুণ চোখে তাকিয়ে আছে সোমনাথ মন্দিরের দিকে। তেমনই মনে হল অঙ্গিরার। চারপাশে কোথাও কোনও শব্দ নেই, কেউ কোথাও নেই। হয়তো-বা মামুদ বাহিনীর সৈনিকরা মন্দির দখলের পর একবার এদিকে এসেছিল, কিন্তু চারদিকে শুধু পরিত্যক্ত, জীর্ণ মন্দিরের ভগ্ন স্তুপ দেখে আবার ফিরে গেছে।

অঙ্গিরা দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, সে কি করবে? রাত্রির অন্ধকারে মিশে একবার মূল মন্দিরের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখে আসবে নাকি, সেদিকের পরিস্থিতি কি? হয়তো মামুদের রক্ষীরা সব নিদ্রামগ্ন, তার হয়তো কোনও ভাবে মন্দির ত্যাগ করার সুযোগ হল?

ভাবছিল অঙ্গিরা। হঠাৎ একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে সে দেখতে পেল, পাশের একটা ভগ্ন উপমন্দির থেকে বেরিয়ে এসেছে এক নারী! যে অঙ্গিরার দিকে আসছে। সম্ভবত অঙ্গিরার শরীর কৃষ্ণবর্ণের পোশাকে আচ্ছাদিত বলে সে তাকে খেয়াল করেনি। তবে তার অবয়ব দেখে অঙ্গিরা বুঝতে পারল সে নারী দেবদাসী সমর্পিতা নয়। এগিয়ে আসতে আসতে মাঝে মাঝে সে থামছে, চারদিকে তাকিয়ে, বিশেষত যেদিকে সোমনাথ দেবের মন্দির সেদিকে তাকাচ্ছে, তারপর আবার এগোচ্ছে।

এগিয়ে আসতে আসতে অঙ্গিরার কয়েক হাত তফাতে চলে এল সেই নারী। অঙ্গিরাকে এবার দেখতে পেয়ে গেল সে। প্রথমে আতঙ্কে কেঁপে উঠল তার শরীর। সে হয়তো চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই অঙ্গিরা বলে উঠল, ‘ভয় পেও না। আমি যবনও নই, প্রেত নই।’

অঙ্গিরার কণ্ঠস্বর শুনে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরাকে চিনতে পেরে সে নারী অঙ্গিরার সামনে এসে দাঁড়াল। অঙ্গিরারও কেমন যেন চেনা মনে হল তার মুখমণ্ডল। অঙ্গিরা প্রশ্ন করল ‘তুমি কে?’

নারী জবাব দিল, ‘আমি দেবদাসী উত্তরা। আমি আপনাকে চিনি। আপনি দেবদাসী সমর্পিতার প্রেমিক। আমি সে রাতে অতিথিশালাতে নিয়ে গেছিলাম সমর্পিতাকে।’

দেবদাসী সমর্পিতার মুখে তার সহচরী দেবদাসী উত্তরার কথা শুনেছে অঙ্গিরা। নিশ্চয়ই কোনওদিন সন্ধ্যারতির সময় উত্তরাকে দেখেওছে অঙ্গিরা। তাই প্রথম দর্শনেই তাকে চেনা মনে হয়েছিল অঙ্গিরার। চাঁদের আলোতে উত্তরার মুখমণ্ডলে স্পষ্ট উৎকণ্ঠার ছাপ।

অঙ্গিরা তাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি দেবদাসী সমর্পিতার কোনও সংবাদ জানো?’

দেবদাসী উত্তরা প্রথমে বলল, ‘না, সে খগেশ্বরের সঙ্গে দেবদাসীদের আবাসস্থল ত্যাগ করার পর আমি তার আর কোনও সংবাদ পাইনি। আমি তো অনুমান করেছিলাম আপনিও মন্দির ত্যাগ করেছেন।’

এ কথা বলার পর দেবদাসী উত্তরা জানতে চাইল, ‘আপনি চিন্তামনিকে দেখেছেন?’

অঙ্গিরা বলল, ‘তিনি কে?’

উত্তরা জবাব দিল, ‘এ মন্দিরের একজন যুবক সেবায়েত। আমার প্রেমিক। যবন বাহিনীর মশালের আলো যে রাতে দেখা গেল সে রাতেই সে আমাকে এখানে লুকিয়ে রেখে গেছিল। কিন্তু তারপর সে আর ফিরে আসেনি। আমার বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার জন্য। এখানে তাকে দেখেছেন?’

অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘আমি তাকে চিনি না। আর গত রাতে এই ভগ্ন মন্দিরে প্রবেশ করার পর একটু আগেই আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম।’

এ কথা বলে অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘তুমি এখন কোথায় যাচ্ছ?’

উত্তরা জবাব দিল, ‘আমি সেবায়েত চিন্তামনির সন্ধানে বেরিয়েছি।। তার জন্য অশুভ আশঙ্কাতে আমার বুক কাঁপছে। কিছু হয়নিতো তার? নইলে সে ফিরে এল না কেন? ভাবছি একবার মন্দিরের দিকে যাব।’

উত্তরার কথা শুনে অঙ্গিরা বুঝতে পারল, ঠিক যেমন দেবদাসী সমর্পিতার জন্য আশঙ্কাতে সে উদ্বেল হয়ে উঠেছে, একই রকম আশঙ্কাতে সেই অচেনা সেবায়েত যুবকের জন্য দেবদাসী উত্তরাও উতলা হয়ে উঠেছে।

অঙ্গিরা বলল, ‘কিন্তু মন্দিরের দিকে যাওয়া তোমার পক্ষে আত্মহত্যার সামিল হবে। যবনদের হাতে ধরা পড়লে তারা ছিঁড়ে খাবে তোমাকে। সারাদিন ধরে দেবদাসীদের আর্তনাদ এই ভগ্ন মন্দিরে বসে কানে এসেছে আমার। বীভৎস সেই আর্তনাদ!’

কথাটা শুনে দেবদাসী উত্তরা বলল, ‘সে আর্তনাদ আমি শুনেছি। কিন্তু আমাকে যে খুঁজে বার করতেই হবে সেবায়েত চিন্তামণিকে। তাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।’

অঙ্গিরা আবারও তাকে বলতে যাচ্ছিল, ‘মন্দিরের দিকে যেও না তুমি’, কিন্তু তার আগেই উত্তরা একদিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওই দেখো, যবন আসছে! যবন আসছে!’ কথাগুলো বলেই সে অঙ্গিরার কাছ ছেড়ে দ্রুত ছুটল সম্ভবত আত্মগোপন করার জন্য। অঙ্গিরাও এবার দেখতে পেল তাকে। হ্যাঁ, তার পরনে যবনদের মতোই পোশাক। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে আসছে মন্দিরের দিকে! তাকে দেখামাত্রই অঙ্গিরা প্রবেশ করল মন্দিরের অন্ধকারে। তারপর পিঠ থেকে ধনুর্বাণ খুলে প্রস্তুত হল যবন যদি মন্দিরে প্রবেশ করে তবে তাকে তিরবিদ্ধ করার জন্য।

ভগ্ন মন্দির চত্বরে ধীরে ধীরে উঠে এল লোকটা। তারপর এগোতে লাগল মন্দিরে প্রবেশের জন্য। অঙ্গিরা ধনুকের ছিলা টানার জন্য প্রস্তুত হল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে পাথরে হোঁচট খেয়ে একটা অস্পষ্ট আর্তনাদ করে পড়ে গেল সেই যবন। উঠে বসার চেষ্টা করেও যেন সে উঠতে পারছে না। আর এর পরই তার পাগড়িটা খসে গেল। বেরিয়ে পড়ল তার মাথার শনের মতো চুল। অঙ্গিরা চিনতে পারল তাকে। যবন নয়, লোকটা খগেশ্বর! অঙ্গিরা তাড়াতাড়ি মন্দির থেকে বেরিয়ে ছুটে গেল তার কাছে। মাটিতে পড়ে আছে বৃদ্ধ খগেশ্বর। অঙ্গিরা দেখল তার পাঁজরে বিদ্ধ হয়ে আছে একটা তির!

অঙ্গিরাকে দেখে প্রথমে আতঙ্ক ফুটে উঠল বৃদ্ধর মুখে। অঙ্গিরা তার ওপর ঝুঁকে পড়তেই খগেশ্বর চিনতে পারল তাকে। অতিকষ্টে সে বলে উঠল, ‘তুমি জীবিত আছ! আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে, মন্দিরের ভিতর আমাকে নিয়ে চলো।’ অঙ্গিরা তাড়াতাড়ি রক্তস্নাত খগেশ্বরকে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে নিয়ে মন্দিরের অন্ধকারে প্রবেশ করল। নিরাপদ স্থানে পৌঁছে তাকে মাটিতে নামিয়ে জানতে চাইল, ‘দেবদাসী সমর্পিতা কোথায়? আপনার এ অবস্থা হল কীভাবে?’

খগেশ্বর প্রথমে অতিকষ্টে জবাব দিল, ‘নগরীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এক বিশাল জনমানবহীন অরণ্য আছে। সেখানে এক পরিত্যক্ত শিব মন্দিরে চন্দ্রদেবের সঙ্গে দেবদাসী সমর্পিতাকে আমি রেখে এসেছি। তারা নিরাপদ। সে স্থান সোমনাথ নগরী থেকে অশ্বপৃষ্ঠে একদিনের পথ।’ একথা বলে অন্ধকারের মধ্যে জোরে জোরে শ্বাস টানতে লাগল বৃদ্ধ।

দেবদাসী সমর্পিতা নিরাপদে আছে জেনে অঙ্গিরা যেন অনেকটাই চিন্তামুক্ত হল। সে এরপর আবারও প্রশ্ন করল, ‘আপনার এ অবস্থা হল কীভাবে? আপনার পরনে যবনদের পোশাক কেন?’

প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে খগেশ্বরের। সে কোনওক্রমে বলতে লাগল, ‘দেবদাসী সমর্পিতাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবার পরে আমার মনে হয়েছিল আমি আর মন্দিরে ফিরব না। যবনরা এ মন্দিরের যে ক্ষতি করতে পারবে না সে ক্ষতি আমি করব। চরম শাস্তি দেব ত্রিপুরারিদেবকে। তার জন্যই আমার পৌত্রের অমন ভয়ঙ্কর মৃত্যু হল। এ কথা ভেবে আমি অন্যত্র রওনাও দিয়েছিলাম। কিন্তু মাঝপথে আমার মনে হল, তুমি তো আমার কোনও ক্ষতি করোনি। বিশ্বাস করে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন সোমেশ্বর মুদ্রা। বিশ্বাস করে আমার সঙ্গে পাঠিয়েছিলে দেবদাসী সমর্পিতাকে। যে প্রতীক্ষা করে আছে তোমার জন্য। আর তুমিও তার সঙ্গে মিলনের জন্য। তুমি আমার সন্তানসম। তোমার সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। আমার বিবেক অথবা সোমেশ্বর মহাদেব আমাকে পালাতে দিলেন না। আমি আবার মন্দিরে ফিরে এলাম।’

একথা বলার পর খগেশ্বর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। হাঁফাচ্ছে সে। অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে তার। তবুও সে এরপর বলতে লাগল, ‘আমি গতকাল যখন মন্দিরের কাছে ফিরে এলাম তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মন্দিরের বাইরে এক শূন্য বিপনিতে সারাদিন আত্মগোপন করে রইলাম। গত সন্ধ্যায় যুদ্ধ শেষ হবার পর আমি বাইরে বেরিয়ে এসে এক মৃত যবনের পোশাক সংগ্রহ করে সেই বিপনিতেই আবার আত্মগোপন করলাম। আজ যখন মন্দিরের তোরণ ভেঙে হাজারে হাজারে যবন মন্দিরে প্রবেশ করল তখন আমিও মন্দিরে প্রবেশ করলাম। তোমার খোঁজই আবার করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু দ্বিপ্রহরের পর হঠাৎ-ই এক যবন আমি ছদ্মবেশী বুঝতে পেরে তির চালাল আমার দিকে। তিরবিদ্ধ অবস্থায় কোনওক্রমে এক স্থানে লুকিয়ে ছিলাম আমি। রাত নামতেই আমি বুঝতে পেরেছি আমি আর বাঁচব না। তাই আমি এ মন্দিরে আসছিলাম যাতে আমি আমার হতভাগ্য পৌত্রের পাশে আমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। মৃত্যুর পরও তার সঙ্গে থাকতে পারি।’

বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে খগেশ্বর। তার হতভাগ্য শূদ্র জীবনের সময় শেষ হয়ে এসেছে। কোনওক্রমে খগেশ্বর তার শেষ কথাগুলো বলার চেষ্টা করল, ‘আমাকে সে কক্ষে নিয়ে চলো তুমি। সম্ভব হলে এই শূদ্রর মুখে এক টুকরো জ্বলন্ত অঙ্গার গুঁজে দিও। আর মৃত্যুর আগে তোমাকে একটা কথা বলে যাই তা হল…।’

বাক্যটা আর শেষ করতে পারল না বৃদ্ধ। সে ঢলে পড়ল মাটিতে। অভিশপ্ত জীবনের অবসান হল ক্ষৌরকার শিরোমণি বৃদ্ধ খগেশ্বরের। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে জল গড়াতে শুরু করল অঙ্গিরার চোখ বেয়ে।

খগেশ্বরের শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করল অঙ্গিরা। তার দেহটা তুলে নিয়ে গিয়ে সেই কক্ষের দ্বার খুলে তার পৌত্রের মৃতদেহের পাশে শায়িত করল খগেশ্বরের মৃতদেহ। চকমকি পাথর ঘষে জ্বলন্ত অঙ্গার স্থাপন করল খগেশ্বরের মুখে। পিতার অন্ত্যেষ্টি যে শ্রদ্ধায় পুত্র সম্পন্ন করে, ঠিক একই রকম শ্রদ্ধায় অঙ্গিরা শেষ করল খগেশ্বরের শূদ্র অন্ত্যেষ্টি প্রক্রিয়া। বৃদ্ধ খগেশ্বর যা করেছে তার জন্য তা পিতার অধিক। তবে অঙ্গিরা, খগেশ্বরের অন্ত্যেষ্টি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময়ই অনুমান করতে পারল তাকে শেষ কথাটা কি বলে যেতে চেয়েছিল বৃদ্ধ!

যে কক্ষে সে বৃদ্ধ খগেশ্বরকে শায়িত করেছিল সেই কক্ষের বাইরে বেরিয়ে পুনরায় পাথর খণ্ড দিয়ে তার প্রবেশ পথ বন্ধ করে দিল। এ কাজ মিটতে না মিটতেই বাইরে ভোরের আলো ফুটে গেল। অঙ্গিরা শুনতে পেল যবন বাহিনী আবার জেগে উঠেছে। তাদের কোলাহল ভেসে আসছে।

অঙ্গিরার জানা হয়ে গেছে কোথায় তার জন্য অপেক্ষা করে আছে দেবদাসী সমর্পিতা। সে সিদ্ধান্ত নিল সারাদিন এ স্থানেই সে আত্মগোপন করে থাকবে। তারপর অন্ধকার নামলেই যে ভাবেই হোক মন্দির ত্যাগ করে রওনা হবে সেই অরণ্যভূমির দিকে।