সোমনাথ সুন্দরী – ২৮
২৮
মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে একটা ভগ্ন উপমন্দির প্রাঙ্গণে আনন্দ উপভোগ করার জন্য স্থান নির্বাচন করল সুলতানের অনুচরের দল। উপমন্দিরটা ভগ্ন হলেও প্রাচীন নয়। সে মন্দির গতকালই ভেঙেছে যবন বাহিনী। আসন্ন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও রাজশ্রী ভেবে নিল যথাসম্ভব বেশি সময় বেঁচে থাকতে হবে তাকে। যদি তার সঙ্গে মৃত্যুর আগে শেষ দেখা হয়ে যায় অঙ্গিরার। এ কথা ভেবে নিয়ে রাজশ্রী সুলতানের অনুচরদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘আমার শরীর আপনারা গ্রহণ করার আগে আমি আপনাদের সামনে শেষ বারের মতো নৃত্য প্রদর্শন করতে চাই। যে নৃত্য আমি এতদিন দেবতার সামনে প্রদর্শন করে এসেছি সেই নৃত্যকলা। তাহলে আমার শরীর আরও সুন্দর ভাবে উপভোগ করতে পারবেন আপনারা।’
প্রস্তাবটা মনে ধরল গজনীবিদের অনুচরদের। নারী শরীরটা তো তাদের হাতের মুঠোতেই রয়েছে। শরীরটার স্বাদ গ্রহণ করার আগে একটু নৃত্য উপভোগ করলে ভালোই হয়। কামনা আরও বৃদ্ধি পাবে তাতে। তা ছাড়া সুলতানের অনুচরদের এ কথাও শোনা আছে যে, এই সোমনাথ মন্দিরের নর্তকী দেবদাসীরা নাকি এই হিন্দ মুলুকের শ্রেষ্ঠ নর্তকী!
সুলতানের সঙ্গীদের তেমন কোনও কাজও নেই এখন। সুলতান এখন বেশ কিছুদিন বিশ্রাম নেবার পর যাত্রা করবেন গজনী মুলুকে। কাজেই নিজেদের মধ্যে মৃদু আলোচনা সেরে নেবার পর সুলতানের এক অনুচর বলল, ‘ঠিক আছে তুমি নাচ দেখাও। যতক্ষণ তুমি নাচ দেখাবে ততক্ষণ আমরা তোমাকে স্পর্শ করব না। কিন্তু নাচ থামালেই আমরা আলিঙ্গন করব তোমাকে।’ কথাটা শুনে রাজশ্রী তার উদ্দেশ্যে বলল, ‘পুরুষের জবান তো। নাচ না থামা পর্যন্ত আমাকে আলিঙ্গন করবেন না তো?’
রাজশ্রীর কথা শুনে মনে হয় আঁতে একটু ঘা লাগল লোকটার। হাজার হোক সে সাধারণ জিহাদি স্বেচ্ছাসেবী নয়, গজনীর সুলতান মামুদের ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচর। একটু থমকে লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ, জবান দিলাম। তোমার পা না থামলে কেউ তোমাকে স্পর্শ করবে না।’
তার কথা শোনার পর সোমেশ্বর মহাদেবকে মনে মনে স্মরণ করে পায়ে ঘুঙুর বাঁধতে শুরু করল রাজশ্রী। সুলতানের অনুচররা গিয়ে বসল ভগ্ন মন্দিরের ছায়াতে। সূর্য তখন সবে পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করেছে। বেশ রোদের তাপ এখনও। সেই মন্দিরের ঠিক সামনেই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সুলতান মামুদের ঘনিষ্ঠ অনুচরদের সামনে তার নৃত্য প্রদর্শন শুরু করল সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের দেবদাসী সমর্পিতা।
অপূর্ব তার নৃত্যশৈলী, অপূর্ব তার শরীরের বিভঙ্গ। তার নৃত্য দেখে সুলতানের অনুচরদের চোখে ধাঁধা লেগে গেল! তাদের মনে হতে লাগল জন্নত থেকে কোন হুরী-পরী যেন নেমে এসে নৃত্য পরিবেশন করছে তাদের সামনে! কামার্ত সুলতান অনুচররা তাদের উরু চাপড়ে বলতে লাগল, ‘বহুত খুব! কেয়া বাত! কেয়া বাত!’
নেচেই চলল দেবদাসী সমর্পিতা। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল তবু তার নাচ থামল না। সুলতান অনুচররা বিস্মিত হয়ে গেল এতক্ষণ সে নেচে চলেছে দেখে! কিন্তু পুরুষের জবান দেওয়া আছে বলে তারা নর্তকীকে না থামিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল কখন তার পা থেমে যায় সে সময়ের জন্য।
শরীর ক্রমশ অবসন্ন হয়ে আসছে, তবু নেচে চলল দেবদাসী সমর্পিতা। চালুক্য রাজকন্যা রাজশ্রী। নেচে চলল সে। এক সময় সূর্য ডুবে গেল সমুদ্রে। অন্ধকার নামতে শুরু করল। তবুও যবন বাহিনীকে বিস্মিত করে নেচে চলল সে। এক সময় সত্যিই আঁধার নেমে এল চারপাশে। সুলতানের অনুচররা আর রাজশ্রী পরস্পরের চোখ থেকে হারিয়ে গেল। শুধু ঘুঙুরের শব্দ শুনে সুলতানের অনুচররা বুঝতে পারল নর্তকী নেচে চলেছে। তার ঘুঙুরের শব্দ থামার প্রতীক্ষা করতে লাগল তারা।
রাজশ্রীর পা এরপর সত্যি কাঁপতে শুরু করল। শরীর আর পারছে না। পায়ের গতি শ্লথ হয়ে এল তার। নৃত্যরত অবস্থাতেই কিছুক্ষণের মধ্যে সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল রাজশ্রী। থেমে গেল তার ঘুঙুরের শব্দ।
এই নিস্তব্ধতার জন্যই অপেক্ষা করছিল সুলতানের অমাত্য-পারিষদরা। ঘুঙুরের শব্দ থামতেই উঠে দাঁড়াল সুলতানের অনুচররা। একজন মন্দিরের চত্বর থেকে লাফিয়ে নামল রাজশ্রীর দেহ ছিঁড়ে খাবার জন্য। দেহটা কোথায় তা অনুমান করেই এগোচ্ছিল সে। কিন্তু ভূপতিত সংজ্ঞাহীনা রাজশ্রীর কাছে সে পৌঁছতে পারল না। তার আগেই তির বিদ্ধ হয়ে ছিটকে পড়ল। তির তার হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে দিয়েছে, মৃত্যুর আগে একটা শব্দও করতে পারল না লোকটা।
শুধু তার পতনের শব্দ শুনে এক সুলতান অনুচর তিরবিদ্ধ লোকটার উদ্দেশ্যে জানতে চাইল ‘জনাব, হলটা কি?’ কিন্তু নিকষ কালো অন্ধকার থেকে কোনও উত্তর ভেসে এলো না। ব্যাপারটা বোঝার জন্য এবং রাজশ্রীকে পাবার জন্য এরপর দ্বিতীয় লোকটা প্রাঙ্গণে নামল। কিন্তু কয়েক-পা এগোতে না এগোতেই একটা তির এসে তার পাঁজরে বিঁধল! মাটিতে ছিটকে পড়ার আগে লোকটা প্রচণ্ড আর্তনাদ করে উঠল। শেষ আর্তনাদ। আর সেই শব্দ শুনে কিছু একটা ঘটেছে বুঝতে পেরে যবন অমাত্যরা একসঙ্গে তলোয়ার খুলে নেমে পড়ল অন্ধকার প্রাঙ্গণে। কিন্তু কার বিরুদ্ধে লড়বে তারা? শত্রু তো অদৃশ্য।
গাঢ় অন্ধকারের আড়াল থেকে এক-একটা মৃত্যুবাণ এসে ভেদ করতে লাগল সুলতান পারিষদদের শরীর। তাদের অন্তিম আর্তনাদে কেঁপে উঠতে লাগল অন্ধকার। সেই চিৎকার শুনে মন্দিরের দিক থেকে আরও কিছু স্বেচ্ছাসেবী জিহাদি তরুণ সে স্থানে ছুটে এল। কিন্তু তিরের আঘাতে তারাও ভূপতিত হতে লাগল। প্রত্যেকটা মৃত্যুবাণই আঘাত হানছে তাদের হৃৎপিণ্ডে, পাঁজরে বা কণ্ঠদেশে! যাতে এক আঘাতেই তার মৃত্যু নেমে আসে।
কী অব্যর্থ লক্ষ। কিন্তু এই নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে কাউকে দেখতে না পেয়ে যবন বাহিনীর ধারণা হল, আততায়ী এক নয় একাধিক। আত্মগোপন করে থাকা কাফেরদের কোনও বাহিনী তির ছুড়ছে তাদের লক্ষ করে!
তিরবিদ্ধ অবস্থাতেই একজন জীবিত সৈনিক কোনওক্রমে পালাল মন্দিরের দিকে। বাকিরা সবাই তখন সেই অন্ধকার প্রাঙ্গণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে বা অন্তিম শ্বাস নিচ্ছে। সেই উপমন্দির প্রাঙ্গণ নিস্তব্ধ হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই অঙ্গিরা আড়াল থেকে সেই প্রাঙ্গণে বেরিয়ে এসে তুলে নিল রাজশ্রীর সংজ্ঞাহীন দেহটা। তারপর তাকে নিয়ে ছুটল সেই প্রাচীন চন্দ্রমন্দিরের দিকে আত্মগোপন করার জন্য।
মন্দিরের অন্ধকারে প্রবেশ করে অঙ্গিরা, রাজশ্রীকে মাটিতে শুইয়ে দিল। তারপর রাজশ্রীর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলতে লাগল, ‘চোখ মেলো রাজশ্রী, চোখ মেলো। দেখ আমি অঙ্গিরা।’
রাজশ্রী চোখ মেলল। পরিচিত কণ্ঠস্বর আর পরিচিত মানুষের হাতের স্পর্শে অঙ্গিরাকে চিনতে পেরে রাজশ্রী তার গলা জড়িয়ে বলল, ‘সোমেশ্বর মহাদেব সত্যিই আছেন। তিনি আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন।’
অঙ্গিরাও বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, তিনি শুধু পাথরের মূর্তি নন, তিনি সত্যিই আছেন!’
কিন্তু এরপরই সোমনাথ মন্দিরের দিক থেকে প্রচণ্ড গোলযোগের শব্দ ভেসে আসতে লাগল। তবে কি সুলতানবাহিনী তাদেরকে ধরার জন্য এদিকে আসছে? অঙ্গিরা তার প্রাণ থাকতে কাউকে স্পর্শ করতে দেবে না রাজশ্রীকে। অঙ্গিরা রাজশ্রীকে ছেড়ে উঠে গিয়ে ধনুকে শর রচনা করে সেই ভগ্ন মন্দিরের তোরণ আগলে বাইরে তাকাল। হ্যাঁ, প্রচণ্ড চিৎকার ভেসে আসছে সোমনাথ মন্দিরের ওপাশ থেকে। শিঙা ফোঁকার শব্দও যেন কানে আসছে!
গজনীবিদ সুলতান মামুদ তার তাঁবুতে বসেই অন্ধকার নামার পর তাকিয়ে ছিলেন সোপানশ্রেণীর ওপরে অবস্থিত গর্ভমন্দির চত্বরের দিকে। কিছুক্ষণ আগেই তিনি তার একদল অনুচরকে পাঠিয়েছিলেন ওই গর্ভমন্দিরে। তার কারণ, হঠাৎ-ই সুলতানের মনে হয়েছে ওই স্থানে গর্ভ মন্দিরের দেওয়ালের আড়ালে আর কোন ধনসম্পদ লুকিয়ে নেই তো? বিশেষত যে মহামূল্যবান স্যমন্তক মণির কথা তিনি শুনেছিলেন তার সন্ধান তিনি এখনও পাননি। তাই তিনি গর্ভগৃহর দেওয়ালগুলোর কোনও অংশ ফাঁপা কিনা তা দেখার জন্য তার অনুচরদের সেখানে পাঠিয়েছেন।
তাদেরই ফেরার প্রতীক্ষা করছিলেন সুলতান। একবার যেন মন্দিরের পিছন দিক থেকে মৃদু চিৎকারের শব্দও তিনি শুনেছিলেন। কিন্তু তা শুনে সুলতানের মনে হয়েছিল তা নিশ্চয়ই তার অনুচরদের উল্লাসধ্বনি। তাই ব্যাপারটাতে তিনি মনযোগ দেননি। কিন্তু হঠাৎই তাঁর এক অনুচর হুড়মুড় করে প্রবেশ করল তার তাঁবুতে। তার পাঁজরে বিদ্ধ হয়ে আছে একটা তির! আতঙ্কিত ভাবে সে সুলতানের উদ্দেশ্যে বলল, ‘মন্দিরের পিছনে কাফেরদের বিশাল তিরন্দাজ বাহিনী হানা দিয়েছে! আপনার পার্শ্বচরদের অনেকেই মারা পড়েছে!’ এটুকু বলার পরই সুলতানের সেই অনুচরের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল! সে ছিটকে পড়ল গালিচার ওপর। সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়ালেন গজনীবিদ। তার তলোয়ার খুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন সঙ্গীদের নিয়ে কাফের নিধনে এগোবার জন্য।
সুলতান তার সৈনিকদের ডাকতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আর প্রয়োজন হল না। কয়েকজন অশ্বারোহী সৈন্যাধ্যক্ষ তোরণ অতিক্রম করে ছুটে এসে সুলতানের সামনে দাঁড়াল। সুলতান এদেরকে রেখে এসেছিলেন সোমনাথ নগরীর বাইরে পাহারার কাজে। সে স্থান থেকেই ছুটে আসছে তারা। প্রচণ্ড উত্তেজনা তাদের মুখমণ্ডলে। ঘোড়া থেকে সুলতানের সামনে।
সুলতান জানতে চাইলেন ‘কী হয়েছে?’
উত্তেজিত ভাবে সেই সেনাপতি জানালেন, ‘কাফেরদের বিশাল সেনাদল এগিয়ে আসছে নগরীর দিকে! তারা হয়তো কাল ভোরেই এখানে এসে পড়বে! ইতিমধ্যেই তারা নগরীর বাইরেটা ঘিরে ফেলার উপক্রম করেছে!’
কথাটা শুনে গজনীর সুলতান সোমনাথ মন্দির বিজেতা মামুদ বললেন, ‘এতে এত চিন্তার কি আছে। আমার সৈন্যরা, আমার তিরিশ হাজার স্বেচ্ছাসেবী জিহাদি তরুণরা তাদের নিশ্চিহ্ন করবে। কাফেরদের রক্তে লাল হয়ে যাবে মাটি।’
সুলতানের কথা শুনে তাঁর বহুবার হিন্দু মুলুক অভিযানের সাথী এক অভিজ্ঞ সেনাপতি বললেন, ‘তা মনে হয় সম্ভব হবে না সুলতান। কাফেরদের সেই বাহিনীতে রণহস্তীই আছে অন্তত দশ হাজার!’
‘দশ হাজার হাতি!’ আপনি ঠিক বলছেন?’ জানতে চাইলেন বিস্মিত সুলতান।
সেনাপতি বললেন, ‘হ্যাঁ, মালিক। কমপক্ষে দশ হাজার। তার বেশিও হতে পারে। যেন একটা চলমান পর্বতশ্রেণী আসছে নগরীর দিকে! আমি নিজের চোখে সীমান্ত সংলগ্ন নজর মিনারের মাথায় উঠে দেখেছি। আর পদাতিক, অশ্বারোহী সৈন্য সংখ্যা অন্তত এক লক্ষ হবে!’
আরও কয়েকজন সৈন্যাধ্যক্ষও সম্মতি প্রকাশ করলেন এ কথাতে।
দশ হাজার রণহস্তী! আর এক লক্ষ সেনা! বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন বহুবার হিন্দু মুলুকে অভিযানকারী সুলতান মামুদ। সুলতান নিজেও অভিজ্ঞ যোদ্ধা। বহু যুদ্ধের সফল নায়ক। তিনি অবিবেচক নন। তিনি বুঝে ফেললেন এই সমুদ্র সমান কাফের বাহিনীর সামনে তার বাহিনী খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। হাতির পায়ের তলায় পিষে মরতে হবে সবাইকে। বাহিনীর একজনও আর গজনী মুলুকে ফিরে যেতে পারবে না, হয়তো তিনিও নন। তাই হঠকারী কোনও সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি তার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। অনুচরদের উদ্দেশ্যে তিনি সোমনাথ মন্দিরের সেই মহামূল্য কপাট-কাঠামো দেখিয়ে বললেন, ‘ওটাকে দ্রুত উটের পিঠে উঠিয়ে নাও। রত্ন, সোনা ভর্তি জালাগুলোকেও উঠিয়ে নাও। শিঙা ফুঁকে সবাইকে সংকেত করো মন্দিরের সামনে উপস্থিত হতে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা এ স্থান ত্যাগ করে সমুদ্র তীর ধরে প্রস্থান করব।’
নির্দেশ পালিত হল, বেজে উঠল শিঙা। ঠিক মধ্যরাতে মামুদ তাঁর বাহিনী নিয়ে মন্দির ত্যাগ করলেন। যে পথে তারা সোমনাথে উপস্থিত হয়েছিলেন সে পথে ফেরা তাদের সম্ভব ছিল না। তাই মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে পৌঁছে উপকূল ধরে ছুটতে লাগল যবন বাহিনী। গজনীবিদ মামুদ, মূর্তি ধ্বংসকারী মামুদ, সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠনকারী মামুদ, সুলতান মামুদ অন্ধকারের মধ্যে ভীত সন্ত্রস্তভাবে পালাতে লাগলেন সোমনাথ মন্দিরকে পিছনে ফেলে।
সেই প্রাচীন চন্দ্রমন্দিরের প্রবেশ পথ আগলে দাঁড়িয়ে ছিল অঙ্গিরা। সেদিকে কোনও যবন সেনা উপস্থিত হয়নি। সমুদ্রের দিকে মামুদ বাহিনীর পলায়মান পদশব্দ শুনে অঙ্গিরা এক সময় অনুমান করতে পারল যে বাহিনী মন্দির ত্যাগ করে পালাচ্ছে! মামুদ বাহিনী ছোট নয়, তাই মন্দির ত্যাগ করে শেষ ব্যক্তির পায়ের শব্দ মুছে যেতেও অনেকটাই সময় লাগল। এক সময় সব শব্দ মুছে গেল, নিস্তব্ধ হয়ে গেল বিশাল সোমনাথ মন্দির।
তার প্রাকারের ভিতর বা বাইরে কোথাও কোনও শব্দ নেই। অঙ্গিরার অজান্তে কখন যেন তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে রাজশ্রী। সে অঙ্গিরার কণ্ঠ আলিঙ্গন করল। অঙ্গিরার ঠোঁট নেমে এলো রাজশ্রীর ঠোঁটের ওপর। না, এ চুম্বন, এ আলিঙ্গনে কোনও যৌনতা নেই, আছে পরম ভালোবাসা আর বিশ্বাস।
এরপর আরও বেশ কিছুক্ষণ সেখানেই অপেক্ষা করল তারা। তারপর যখন রাত শেষে শুকতারা ফোটার উপক্রম হল তখন সেই ভগ্ন মন্দির ত্যাগ করে বাইরে বেরোল দুজনে। পিছনে সেই ভগ্ন মন্দিরের এক গোপন কক্ষে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে রইল বৃদ্ধ খগেশ্বর আর অন্ধকারের প্রহরী।
সোমনাথ মন্দিরের সামনে উপস্থিত হল অঙ্গিরা আর রাজশ্রী। ঠিক সেই সময় শুকতারা ফুটে উঠল। কেউ কোথাও নেই। উন্মুক্ত সোমনাথ মন্দিরের ভগ্ন তোরণ। যে তোরণ অতিক্রম করার চেষ্টাতে এত ভয়ঙ্কর ঘটনা প্রবাহর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে অঙ্গিরা আর সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসী রাজকন্যা রাজশ্রীকে। আজ আর তাদের বাধা দেবার কেউ নেই। সেই তোরণের দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরা বলল, ‘হ্যাঁ, তিনি আছেন। সোমেশ্বর মহাদেব আছেন। মন্দির ধ্বংস করে, বিগ্রহ-মূর্তি ধ্বংস করে কি আর দেবতাকে ধ্বংস করা যায়? তিনি সর্বত্র বিরাজমান। তিনি আছেন আমার তোমার প্রাণের মধ্যে।’
রাজশ্রী বলল, ‘হ্যাঁ, তিনি শুধু পাথরের মূর্তি নন। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। সব সুন্দরের মধ্যেই তিনি বিরাজমান। ভোরের আলো ফুটলেই আমরা মন্দির ত্যাগ করে রওনা হব চালুক্য নগরীর দিকে। আর এর পরই তারা সোমেশ্বর মহাদেবের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাবার জন্য মন্দিরের নীচের চত্বর থেকে ওপরের গর্ভমন্দিরে চত্বরের দিকে তাকাতেই একজনকে দেখতে পেল। গর্ভমন্দিরের চত্বরে দাঁড়িয়ে সে তাকিয়ে আছে নীচের দিকে। তারা চিনতে পারল তাকে। তিনি ত্রিপুরারিদেব। মামুদের অনুচররা উন্মুক্ত করে ফেলেছিল সেই গোপন পথ। তবে তারা আর ভিতরে প্রবেশ করেনি। শিঙার শব্দ শুনে তারা ফিরে এসেছিল। আর সেই পথ দিয়েই বাইরে বেরিয়েছেন ত্রিপুরারিদেব। তিনি কী ভাবে বাইরে এলেন তা বুঝতে না পারলেও তাকে দেখে অঙ্গিরা, রাজশ্রীকে নিয়ে এগোল সোপানশ্রেণীর দিকে, সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের জন্য।
কপাটহীন গর্ভগৃহর সামনে ত্রিপুরারিদেবের কাছে এসে দাঁড়াল তারা দুজন। কয়েক মুহূর্ত তাদের দিকে নিশ্চুপ ভাবে তাকিয়ে থাকার পর সোমেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব বিষণ্ণ ভাবে বললেন, ‘তোমাদের আর এ মন্দিরে ধরে রাখার ক্ষমতা নেই আমার। আর যদি তা থাকতও তবে ধরে রেখে কোনও লাভ নেই। সবইতো এখন শেষ।’—এই বলে তিনি তাকালেন কপাটহীন গর্ভগৃহর দিকে।
একটু চুপ করে থেকে অঙ্গিরা বলল ‘না, সব এখনও শেষ হয়ে যায়নি।’
কথাটা শুনে ত্রিপুরারিদেব তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার কথার অর্থ? তুমি কি পরিহাস করছ এই অসহায় বৃদ্ধর সঙ্গে?’
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। অঙ্গিরা তার পোশাকের ভিতর থেকে একটা সোনার কৌট বার করে তা তুলে ধরল প্রধান পুরোহিতের সামনে। মুখ বন্ধ সেই স্বর্ণ পাত্রটা দেখে চিনতে পেরে ত্রিপুরারিদেব বিস্মিত ভাবে বললেন, ‘ও জিনিস তুমি কোথায় পেলে? তুমি যখন আমাকে সুড়ঙ্গে আটকে দিলে তখন আমি অনুসন্ধান করে দেখেছি ও পাত্র যেখানে থাকার কথা সেখানে ছিল না!’
অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘মৃত খগেশ্বরের পোশাকের ভিতর থেকে। সম্ভবত অন্ধকারের প্রহরী তার মৃত পৌত্রর থেকে তিনি এটা পেয়েছিলেন। এই পাত্র নিয়ে মন্দির ত্যাগ করে আপনাকে চরম আঘাত দিতে চেয়েছিলেন তিনি।’
ত্রিপুরারিদেব জানতে চাইলেন, ‘ওই স্বর্ণ আধারে কি আছে তা তুমি জানো? খুলে দেখেছ?’
অঙ্গিরা বলল, ‘হ্যাঁ, খুলে দেখেছি। অন্ধকারের মধ্যেও চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল আমার। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে হয়তো তার উজ্জ্বলতায় চোখ অন্ধ হয়ে যেত আমার। তাই সঙ্গে-সঙ্গে পাত্রের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। বিশাল আকৃতির এক হীরকখণ্ড! আমি সেটা কি তা অনুমান করতে পেরেছি। সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ ‘স্যমন্তক মণি’!
প্রধান পুরোহিত কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধ ভাবে অঙ্গিরার হাতে ধরা স্যমন্তক মণির আধারটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই এ মণি তোমার সঙ্গে নিয়ে যাবে?’
অঙ্গিরা মৃদু হেসে তাঁর উদ্দেশ্যে পাত্রটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘না, এ সম্পদ আপনি রক্ষা করুন। মন্দিরের সম্পদ, দেবতার সম্পদ আপনার কাছেই থাক। সোমেশ্বর মহাদেব আমাকে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ দিয়েছেন। ফিরিয়ে দিয়েছেন আমার ভালোবাসা রাজকন্যা রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতাকে।
পাত্রটা গ্রহণ করে অঙ্গিরার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। প্রবল বিস্মিত সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের মনে হল স্বয়ং সোমেশ্বরই যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অঙ্গিরার রূপে। নইলে এত নির্লোভ কেউ হতে পারে! ফিরিয়ে দিতে পারে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রত্ন স্যমন্তক মণি!
বিস্ময়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার পর ত্রিপুরারিদেব আশীর্বাদের ভঙ্গিতে অঙ্গিরা আর রাজশ্রীর উদ্দেশ্যে হাত তুললেন। তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ, যতক্ষণ আমার জীবন আছে এই স্যমন্তক মণিকে অন্ধকারের প্রহরীর দায়িত্ব পালন করে রক্ষা করব আমি। সেই অন্ধকার কুঠুরির স্যমন্তক মণির আমি হব শেষ প্রহরী। আমি এবার নীচে সেই কুঠুরিতে নামব। বাইরে থেকে দেওয়ালটা ঠেলে দাও।’
স্যমন্তক মণির আধারটা নিয়ে গর্ভগৃহতে প্রবেশ করলেন সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। সুড়ঙ্গ পথ ধরে নীচে নেমে গেলেন তিনি। দেওয়ালটা বাইরে থেকে বন্ধ করে ত্রিপুরারিদেব আর সোমেশ্বর মহাদেবের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে গর্ভগৃহ ত্যাগ করে নীচে নেমে এল অঙ্গিরা।
মন্দির ত্যাগ করার জন্য তারা যখন উন্মুক্ত প্রবেশ তোরণের সামনে এসে দাঁড়াল ঠিক তখনই ভোরের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। বাইরে তাকিয়ে তারা দুজন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। বিশাল হস্তিবাহিনী এগিয়ে আসছে প্রবেশ তোরণের দিকে। নতুন সূর্যকিরণে ঝলমল করছে বিশাল ঐরাবতের পিঠে বসে থাকা ভোজমহারাজ পরমদেওর সোনার রাজছত্র! তাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য সোমনাথ মন্দির তোরণের দুপাশে নমস্কারের ভঙ্গিতে হাত জোড় করে দাঁড়াল যুবক অঙ্গিরা আর রাজশ্রী—সোমনাথ সুন্দরী সমর্পিতা।
***
