Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/28
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সোমনাথ সুন্দরী – ৩

 

মধ্যাহ্নের ঠিক দু-দণ্ড পূর্বে নিজের কক্ষ ত্যাগ করে পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত মতো গর্ভগৃহের ঠিক সামনে এসে উপস্থিত হলেন পুরোহিতশ্রেষ্ঠ। তাঁর পূর্ব নির্দেশ মতোই গর্ভগৃহর সামনের চত্বর থেকে ততক্ষণে অপসারিত করা হয়েছে পুণ্যার্থী, দর্শনার্থীদের।

প্রধান দেবদাসী তিলোত্তমা ও আরও কয়েকজন দেবদাসীর তত্ত্বাবধানে সেখানে হাজির করা হয়েছে সেই সব নারীদের, যাদের আজ সমর্পণ করা হবে সোমেশ্বরের চরণে। রঙিন পট্টবস্ত্র, স্বর্ণভূষণ আর ফুল মালায় সজ্জিত করা হয়েছে তাদের। ঠিক যেমন বিবাহকালে সজ্জিত করা হয় নারীদের, তেমনই। তাদের মুখমণ্ডলও চন্দন চর্চিত।

গর্ভগৃহর একপাশে সমর্পণের উপাচার সামগ্রী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেবায়েতরা। দুই প্রধান সহকারী পুরোহিত নন্দিবাহন, মল্লিকার্জুন উপস্থিত আছেন। আছেন সেবায়েত-প্রধান বিষধারীও। ত্রিপুরারিদেব সেখানে গিয়ে উপস্থিত হতেই সবাই নতমস্তকে অভিবাদন জানালো তাকে।

প্রধান পুরোহিত প্রথমে তাকালেন দেবতার কাছে নিজেদের সমর্পণের উদ্দেশ্যে অপেক্ষারত কন্যাদের দিকে। দ্বাদশ থেকে অষ্টাদশ বর্ষীয়া কন্যা সব। বেশ কয়েক মাস যাবৎ এ মন্দিরের কানন সংলগ্ন এক সংরক্ষিত স্থানে এদের নৃত্যগীতের তালিম দিয়েছে দেবদাসী প্রধানা তিলোত্তমা। যদিও গর্ভগৃহর সামনে মন্দিরের প্রধান চত্বরে এই প্রথম পা রাখল তারা। আজকের পর থেকে অবশ্য তাদের নিয়মিত আসা-যাওয়া শুরু হবে এই চত্বরে। বারো জন নারী।

প্রধান পুরোহিতের চোখ ঘুরতে লাগল এক এক করে তাদের মুখমণ্ডলের ওপর। অপরূপা সব। তাদের মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য আর জৌলুশই জানিয়ে দিচ্ছে এই নারীরা সব সম্ভ্রান্তবংশীয়া দুহিতা। প্রধান পুরোহিতের দৃষ্টি এক সময় এসে থমকে গেল এক নারীর মুখের ওপরে। দেবদাসী প্রধানা তিলোত্তমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সে।

দেবদাসী তিলোত্তমা শুধু নর্তকী শ্রেষ্ঠাই নয়, এ মন্দিরের সুন্দরী শ্রেষ্ঠাও বটে। কিন্তু এ কন্যার অঙ্গ সৌষ্ঠব আর রূপের কাছে তিলোত্তমার সৌন্দর্যও যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব নারীসঙ্গ না করলেও সুন্দরী নারী তিনি কম দেখেননি। তিনি দীর্ঘকাল ধরে এ মন্দিরের সুন্দরী দেবদাসীদের তো দেখেছেনই, দেখেছেন এ মন্দিরে পূজা দিতে আসা বহু রাজদুহিতাকেও। কিন্তু, এমন সৌন্দর্য তিনি ইতিপূর্বে দেখেননি। ইন্দ্রসভার নর্তকীরাও হয়তো ম্লান হয়ে যাবে এ নারীর সমুখে দাঁড়ালে।

সারবদ্ধ অন্য নারীরা বিস্মিতভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু এই কন্যা আনতভাবে চেয়ে আছে ভূমির দিকে। যেন স্বর্ণভূষণে সজ্জিত এক স্থির প্রস্তরমূর্তি। মেয়েটি প্রধান পুরোহিতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বুঝতে পেরে মল্লিকার্জুন প্রধান পুরোহিতের পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর চাপাস্বরে বললেন, ‘এই সেই চালুক্য কন্যা।’

পুরোহিতশ্রেষ্ঠর এবার খেয়াল হল এই কন্যার নাম তারই স্থির করার কথা। কিন্তু সোমেশ্বর মুদ্রা নিয়ে বল্লভী নগরী থেকে সেই যুবক হঠাৎ এসে উপস্থিত হওয়াতে তাঁর চিন্তা অন্য খাতে প্রবাহিত হচ্ছিল। তাই নামকরণের ব্যাপারটা তিনি বিস্মৃত হয়েছিলেন।

মুহূর্তের মধ্যে অবশ্য একটা নাম মাথায় এসে গেল তার। তিনি মল্লিকার্জুনকে বললেন, ‘এ নারীর নামকরণ করলাম, সমর্পিতা। সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে যে নিজেকে সমর্পণ করেছে।’ প্রধান পুরোহিত তিলোত্তমাকে কাছে ডাকতে বললেন।

নন্দিবাহনের ইশারাতে নর্তকীশ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা এসে সামনে দাঁড়াতেই ত্রিপুরারিদেব তাকে প্রশ্ন কলেন, ‘তুমি নিশ্চিত তো যে এই কন্যারা সব অক্ষত যোনি?’

তিলত্তমা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, প্রভু। আমি নিশ্চিত।’

এরপর ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশে এই নারীদের সোমনাথের কাছে সমর্পণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। মন্দিরের গর্ভগৃহর ঠিক সমুখভাগে সারবদ্ধ ভাবে দাঁড় করানো হল নারীদের। দুই প্রধান সহচরকে নিয়ে গর্ভগৃহতে প্রবেশ করলেন ত্রিপুরারিদেব। পূজার উপাচার আগেই সে কক্ষে সাজিয়ে রেখেছেন নন্দিবাহন। একটা স্বর্ণপাত্রে রাখা আছে নীলকণ্ঠ ফুলের বারোটি মালা। প্রধান পুরোহিত সেই মালাগুলি স্থাপন করলেন সোমেশ্বরের গলায় অর্থাৎ শিবলিঙ্গে। বিল্বফল, দুগ্ধ, ঘৃত উৎসর্গ করে শুরু হল মহাদেবের পুজো। প্রধান পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবতাকে এই নারীদের গ্রহণ করার অনুরোধ জানালেন।

বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল এই বন্দনা। তারপর নন্দিবাহন দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এক-একজন নারীকে গর্ভগৃহে প্রবেশ করাতে লাগলেন। যারা দেবদাসী তারা জীবনে এই একবারই গর্ভগৃহতে পা রাখার সৌভাগ্য লাভ করে। এ সৌভাগ্য রাজা-মহারাজাদেরও হয় না।

কন্যারা ঘিরে দাঁড়ালো ভগবানকে। চোখে-মুখে তাদের অপার বিস্ময়। তাদের চোখের সামনে শূন্যে ভাসমান সোমেশ্বর মহাদেব। তিনি যে সত্যিই আছেন এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে?

ত্রিপুরারিদেব খেয়াল করলেন সেই চালুক্য দুহিতা একবার দেবতার দিকে তাকিয়েই মাথাটা নামিয়ে স্থির অচঞ্চল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। মল্লিকার্জুন অন্য একটি পাত্রে রাখা স্তুপীকৃত ফুলমালার থেকে একটি করে মালা তুলে দিলেন প্রত্যেক নারীর হাতে। প্রধান পুরোহিত সম্মিলিতভাবে সমর্পণের মন্ত্রপাঠ করাতে শুরু করালেন নারীদের। এ মন্ত্রোচ্চারণ আসলে সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে নিজেদের তনু-মন, সর্বস্ব নিবেদনের অঙ্গীকার।

এ কাজ সম্পন্ন হলে, মল্লিকার্জুন নতুন নামে আহ্বান করতে লাগলেন এক-একজন নারীকে। তারা এসে তাদের হাতের মালাটা তুলে দিতে লাগল মল্লিকার্জুনের হাতে। আর প্রধান পুরোহিত সোমেশ্বর মহাদেবের কণ্ঠ থেকে এক-একটা নীলকণ্ঠ ফুলের মালা তুলে দিতে লাগলেন নারীদের হাতে। সে মালা কণ্ঠে ধারণ করতে লাগল তারা। প্রত্যেক দেবদাসীকে একটা করে চন্দনকাঠের ক্ষুদ্র পেটিকা দেওয়া হয়। তাতে আজীবন ওই নীলকণ্ঠ ফুলের মালা তারা রেখে দেয়।

ত্রিপুরারিদেব শেষ মালাটা তুলে দিলেন সমর্পিতার হাতে। নিশ্চুপ ভাবে মালাটা কণ্ঠে ধারণ করল সে। মল্লিকার্জুন এরপর নারীদের হাত থেকে মালাগুলি তুলে দিলেন প্রধান পুরোহিতের হাতে। নারীরা স্পর্শ করতে পারবে না দেবতাকে। তাই তাদের হয়ে প্রধান পুরোহিত এক-একজন নারীর নাম করে সেই মালাগুলি পরিয়ে দিলেন সোমেশ্বরের কণ্ঠে।

প্রদীপের আলোতে, ধূপের ধোঁয়ায় এই মাল্যদান পর্ব সম্পন্ন হতেই এই কন্যারা দেবদাসীতে রূপান্তরিত হল। এরপর আরও একটা ক্ষুদ্র কাজ ছিল যেটা সম্পন্ন করলেন পুরোহিত নন্দবাহন। একটি স্বর্ণপাত্র থেকে একটি একটি করে স্বর্ণ ঘুঙুরদানা নিয়ে তুলে দিলেন প্রত্যেক নারীর হাতে। এই ঘুঙুরদানা তারা পায়ের ঘুঙুর ছড়াতে বেঁধে নিয়ে নৃত্য পরিবেশন করবে সোমেশ্বর মহাদবের সামনে। সব কার্য সম্পন্ন হল। নারীর দল বিগ্রহ আর পুরোহিতকুলকে প্রণামের পর তাদের নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন ত্রিপুরারিদেব। আর সেই গর্ভগৃহর চৌকাঠ অতিক্রম করে বাইরে এসে দাঁড়াবার সঙ্গে-সঙ্গেই এই নারীদের সব পূর্ব পরিচয় মুছে গেল। নাম, ধাম, কুল, পিতৃপরিচয় সবকিছু। তাদের আজ থেকে একমাত্র পরিচয় হল তারা দেবদাসী। জীবনে-মরণে তাদের একমাত্র নাথ হলেন সোমেশ্বর মহাদেব—সোমনাথ।

বাইরে যারা এতক্ষণ ধরে তাদের নির্গমনের প্রতীক্ষাতে দাঁড়িয়েছিলো তারা প্রস্তুত হয়েই ছিলো। প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে এই নবীনা দেবদাসীরা বাইরে বেরোতেই পুষ্পবৃষ্টি শুরু হলো। সারা মন্দির চত্বর জুড়ে শুরু হলো ঘণ্টাধ্বনি আর শঙ্খনাদ। সুবিশাল মন্দির চত্বর অতিক্রম করে সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো সারা প্রভাস পত্তনে। সারা নগরী জেনে গেল আরও একদল নারী নিজেদের উৎসর্গ করলো সোমেশ্বর মহাদেবের পাদপদ্মে।

এই সব নারী আর তাদের পিতামাতাদের অক্ষয় স্বর্গ লাভ হবে সোমেশ্বরের আশীর্বাদে। নগরীর কোনও কোনও পিতা-মাতাও হয়তো এই ঘণ্টাধ্বনি শুনে মহাদেবের উদ্দেশ্যে কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম জানিয়ে স্বর্গলাভের বাসনাতে তাদের কন্যা সন্তানকে সোমেশ্বরের কাছে নিবেদনের সংকল্প করল।

প্রধান পুরোহিতের কাজ সমাপ্ত। দেবদাসীদের ফিরিয়ে নিয়ে চলল তিলোত্তমা। একজন ছত্রধারী স্বর্ণছত্র এনে ধরল তাঁর মাথায়। সমর্পণ কার্য সম্পাদন করে প্রধান পুরোহিত নিজের কক্ষে ফিরে এলেন। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল এক সময়। আকাশ পরিক্রমণ করে সূর্যদেব সমুদ্রে অবগাহন শুরু করলেন। দিন শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল সন্ধ্যারতির প্রস্তুতি। এ কাজটা অবশ্য প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের দুই সহযোগী মল্লিকার্জুন আর নন্দিবাহনই সামলান।

আরতির পর সোমেশ্বরের উদ্দেশ্যে নৃত্য গীত পরিবেশন করে দেবদাসীরা। তারপর সেদিনের মতো মন্দিরের গর্ভগৃহের কপাট বন্ধ করে সবাইকে নিয়ে গর্ভগৃহ চত্বর ত্যাগ করে নীচে নেমে আসেন দুই প্রধান সহকারী পুরোহিত। গর্ভগৃহ চত্বরে একমাত্র প্রধান পুরোহিত ব্যতীত অন্য কোনও ব্যক্তির থাকার অনুমতি নেই যদি না প্রধান পুরোহিত বিশেষ কোনও কারণ বশত রাত্রিকালে কাউকে সেখানে আহ্বান করেন।

বিশেষ কিছুদিন ব্যতীত সন্ধ্যারতির সময় গর্ভগৃহর সামনে উপস্থিত থাকেন না প্রধান পুরোহিত। সমুদ্রের বুকে সূর্য ডুবে গেল এক সময়। দোর বন্ধ। কক্ষের ভিতর থেকেই ত্রিপুরারিদেব অন্য দিনের মতোই শুনতে পেলেন সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি, শঙ্খের শব্দ, দেবদাসীদের সঙ্গীত মুর্ছনা, নিক্কনের মৃদু শব্দ। তারপর এক সময় সে শব্দ আসতে আসতে একেবারে থেমে গেলো। নিস্তব্ধতা নেমে এল প্রধান পুরোহিতের কক্ষের বাইরে মন্দিরের গর্ভগৃহ সংলগ্ন প্রধান চত্বরে।

প্রধান পুরোহিত বিশ্রাম ত্যাগ করে উঠে একটা ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালালেন। সামান্য কিছু ফলাহার গ্রহণ করে আবার ভূর্জপত্র আর খাগের কলম নিয়ে বসলেন। অন্ধকার নামার পর মন্দির নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়াতে আবার জেগে উঠতে শুরু করেছে সমুদ্র গর্জন। চত্বরের একদম শেষ প্রান্তে প্রধান পুরোহিতের কক্ষ। আর তারপরই মন্দির প্রাকার। রাত্রিকালে তট অতিক্রম করে তার গায়েই আছড়ে পড়ে তরঙ্গমালা। ত্রিপুরারিদেবের কক্ষ সংলগ্ন একটা সংকীর্ণ সোপানশ্রেণী প্রাকার ভেদ করে নেমেছে তটরেখার বুকে। ও পথেই প্রত্যহ সমুদ্র স্নানে যান ত্রিপুরারিদেব।

কক্ষত্যাগ করার জন্য মধ্যযাম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল ত্রিপুরারিদেবকে। তারপর তিনি প্রদীপ নিভিয়ে বাইরের চত্বরে বেরিয়ে এলেন। চাঁদ মাথার ওপর থেকে আলো ছড়াচ্ছে ঘুমন্ত মন্দিরের ওপর। সমুদ্র গর্জন ছাড়া কোথাও কোনও শব্দ নেই। মন্দির প্রাকারে মশালগুলো আলো ছড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা যেন এই সুবিশাল মন্দির প্রাঙ্গণের বিশাল স্তম্ভ, প্রাকার, কক্ষগুলোর আনাচে কানাচে জমাটবাঁধা অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলেছে।

লঘু পায়ে ত্রিপুরারিদেব এসে উপস্থিত হলেন গর্ভগৃহর বন্ধ তোরণের সামনে। গর্ভগৃহর সামনে মাথার ওপর ছাদ থাকায় চাঁদের আলো সরাসরি এখানে প্রবেশ করছে না। আলো আঁধারি খেলা করছে গর্ভগৃহর সমুখে। সেখানে কিয়ৎক্ষণ দাঁড়িয়ে প্রধান পুরোহিত নীচের চত্বরের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে কিনা। যদিও নীচ থেকে গর্ভগৃহর সামনে অন্ধকার মেখে দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান পুরোহিতকে দেখতে পাবার সম্ভাবনা নেই, তবুও তিনি যে কাজে যাচ্ছেন তাতে সতর্কতা অবলম্বন করা বিশেষ প্রয়োজন।

এক সময় নিশ্চিন্ত হলেন প্রধান পুরোহিত।—না, কেউ কোথাও নেই। ত্রিপুরারিদেব তোরণ সংলগ্ন কুলুঙ্গি থেকে একটা ক্ষুদ্রাকৃতি স্বর্ণ প্রদীপ আর দু-খণ্ড অগ্নিপ্রস্তর তুলে নিয়ে সন্তর্পণে স্বর্ণ কপাট উন্মোচন করে প্রবেশ করলেন মন্দিরের অন্ধকার গর্ভগৃহে। ভিতরে প্রবেশ করে কপাটের অর্গল তুলে দিলেন তিনি। অগ্নিপ্রস্তর ঘর্ষণ করে প্রদীপ জ্বালালেন।

মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়ল গর্ভগৃহতে। প্রধান পুরোহিতের সামনে শূন্যে ভাসমান সোমেশ্বর মহাদেবের ঘুমন্ত বিগ্রহ। তার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে ত্রিপুরারিদেব মনে মনে বললেন, ‘আপনার নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটলে আমাকে মার্জনা করবেন। আপনার কার্য সম্পাদনের জন্যই মধ্যযামে আমাকে এখানে উপস্থিত হতে হল।’ একথা বলার পর তিনি বিগ্রহ অতিক্রম করে উপস্থিত হলেন বিগ্রহর পশ্চাতভাগে দেওয়ালের সামনে। দেওয়ালের গায়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে তিনি দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে পেষণ করতেই দেয়ালের একটা অংশ দু-পাশে কিছুটা সরে গিয়ে উন্মুক্ত হল একটা সুড়ঙ্গ পথ। একজন মাত্র মানুষ প্রবেশ করতে পারে সেখানে।

প্রদীপ হাতে ত্রিপুরারিদেব প্রবেশ করলেন সেই সুড়ঙ্গ পথে। দু-পাশে স্যাঁতস্যাতে নিরেট পাথুরে দেওয়াল। অন্ধকার এত গাঢ় যে কয়েক হস্ত দূরে কোনও বস্তু ঠাহর হয় না। নানা বাঁক নিয়ে সুড়ঙ্গ ক্রমশ নীচের দিকে নেমেছে। প্রধান সুড়ঙ্গের দু-পাশ থেকে নানা পথ এগিয়েছে নানা দিকে। ভুলক্রমে সে পথে পা বাড়ালে সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধায় ঘুরে পথ হারিয়ে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে মৃত্যু নিশ্চিত। এই সুড়ঙ্গে অবাঞ্ছিতভাবে প্রবেশ করা ব্যক্তির মৃত্যু ঘটাবার জন্যই এই ব্যবস্থা। ত্রিপুরারিদেবের অবশ্য এ পথ চেনা। প্রতি পক্ষকালে পানীয় জলের কলস আর খাদ্যদ্রব্য নিয়ে এ পথে আসতে হয় তাকে। মাত্র তিন দিবস আগেই তিনি এ পথে এসেছিলেন। সেই সর্পিল সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে তিনি এক সময় উপস্থিত হলেন এক কক্ষে।

কৃষ্ণবর্ণের পাথরের তৈরি কক্ষ। এ কক্ষের ঠিক মাথার উপরই গর্ভগৃহের অবস্থান। কক্ষে কোনও বিগ্রহ না থাকলেও একটা ক্ষুদ্রাকৃতি বেদি আছে। প্রধান পুরোহিত সেই বেদির সামনে উপবেশন করে প্রদীপটা মাটিতে নামিয়ে রাখলেন। তারপর দু-হাতে বেদিটা ঠেলতেই বেদিটা একপাশে সরে গেল। উন্মুক্ত হল একটা গহ্বর। এই গহ্বর দিয়েই প্রতি পক্ষকালে একবার পানীয় জলের কলস আর খাদ্যদ্রব্য রজ্জুবদ্ধ করে নামিয়ে দেন নীচের আরও একটি অন্ধকার কক্ষে।

সে কক্ষের কথা মন্দিরের অধ্যক্ষ আর প্রধান পুরোহিত ব্যতীত কেউ কোনওদিন জানতে পারে না। প্রধান পুরোহিত বা অধ্যক্ষের মৃত্যু আসন্ন হলে তারা তাদের উত্তরসূরী অধ্যক্ষ বা প্রধান পুরোহিতকে সোমেশ্বরকে স্পর্শ করিয়ে, মন্ত্রগুপ্তির শপথ বাক্য পাঠ করিয়ে জানিয়ে দেন এ কক্ষের কথা। ত্রিপুরারিদেবও সে ভাবেই জেনেছেন।

মন্দিরের অধ্যক্ষের মৃত্যু ঘটেছে। নতুন অধ্যক্ষ এখনও নির্বাচিত হননি। তাই ত্রিপুরারিদেবই এই মন্দিরের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যিনি এ কক্ষের কথা জানেন। মন্দিরের নতুন অধ্যক্ষ নির্বাচিত হলে অবশ্য ত্রিপুরারিদেবকেই তাকে অবগত করতে হবে এই গুপ্ত কথা। কারণ উত্তরসূরী নির্বাচিত হবার আগেই মৃত্যু ঘটেছিল পূর্বতন অধ্যক্ষের। গহ্বরের নীচে জমাটবাঁধা অন্ধকার। গহ্বরের মুখটাতে ঝুঁকে পড়ে ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘তুমি কোথায়? আমি এসেছি।’

নীচ থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দে ভেসে এল, ‘এইতো আমি। প্রভু আপনি এসেছেন!’

ওপর থেকে সেই ভূগর্ভস্থ কক্ষের অন্ধকারে কিছু দৃষ্টিগোচর না হলেও মৃদু শব্দ শুনে ত্রিপুরারিদেব বুঝতে পারলেন গহ্বরের ঠিক নীচে এসে দাঁড়িয়েছে যে, তার ডাকে সাড়া দিল সেই মানুষ।

প্রধান পুরোহিত প্রথমে তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার কি খাদ্যপানীয়র অভাব ঘটেছে?’

‘না।’ জবাব এল নীচ থেকে।

‘তুমি কি রোগগ্রস্থ?’ আবার প্রশ্ন করলেন প্রধান পুরোহিত।

আবারও জবাব এল, ‘না।’

ত্রিপুরারিদব এবার মৃদু বিস্মিত ভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘তবে তুমি ঘণ্টাধ্বনি করে আমাকে আহ্বান করলে কেন?’

ত্রিপুরারিদেবের যে রজ্জুবদ্ধ ঘণ্টা আছে তার রজ্জুর প্রান্তভাগ লোকচক্ষুর আড়ালে এই গোপালকক্ষের ভিতর শেষ হয়েছে। নীচে যে আছে সে দড়ি ধরে টান দিলে মাথার ওপরে প্রধান পুরোহিতের কক্ষে ঘণ্টাটা বেজে ওঠে। এভাবেই নীচের লোকটা সংকেত পাঠায় প্রধান পুরোহিতকে। সে সংকেত ধ্বনি শুনে এখানে উপস্থিত হয়েছেন পুরোহিত শ্রেষ্ঠ।

ত্রিপুরারিদেবের প্রশ্ন শুনে মৃদু চুপ করে থেকে নিচের লোকটা বলল, ‘আমি এই অন্ধকারের প্রহরী হয়ে আছি দ্বাদশ বৎসর ধরে। আর কতকাল আমাকে এখানে থাকতে হবে? আমার কি মুক্তি হবে না?’

ত্রিপুরারিদেব প্রথমে তার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তুমি কিন্তু সোমেশ্বর মহাদেবের নামে শপথ নিয়ে স্বেচ্ছায় এ কার্যভার গ্রহণ করেছিলে। তুমি যে দায়িত্ব পালন করছ তার জন্য তোমার আর তোমার ঊর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষের স্বর্গবাস নিশ্চিত। এ সৌভাগ্য রাজা-মহারাজাও লাভ করতে পারেন না। এমনকী, আমিও নই।’

তাঁর বক্তব্য শুনে সেই অন্ধকারের প্রহরী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘এসব কথা আমি জানি প্রভু। কিন্তু আমি আর একলা থাকতে পারছি না। আপনাকে কথাটা জানাব ভেবেও এতদিন সংকোচে বলতে পারিনি। আজ বললাম। কদিন ধরে প্রচণ্ড একাকিত্ব আমাকে গ্রাস করছে। মাথায় আত্মহননের ভাবনা আসছে…।’

এ কথা শোনার পরই তাকে থামিয়ে দিয়ে ত্রিপুরারিদেব বলে উঠলেন, ‘স্তব্ধ হও। এ কথা মনে স্থান দিও না। এ কক্ষে আত্মহনন করলে কোনও দিন তোমার মুক্তি হবে না। এ কক্ষকে অপবিত্র করার অপরাধে অনন্ত নরকবাস হবে তোমার।’

ত্রিপুরারিদেবের কথা শুনে লোকটা যেন অস্পষ্ট ভাবে বলল, ‘নরক কি এ কক্ষের থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর?’

ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘কী বললে তুমি?’

কিন্তু নীচ থেকে কোনও সাড়া এল না। তবে লোকটার কথা শঙ্কা জাগাল প্রধান পুরোহিতের মনে। এই অন্ধকারের প্রহরী যদি সত্যি আত্মহননের পথ বেছে নেয় তখন? যেমন কেউ কেউ বেছেছে ইতিপূর্বে। একটু ভেবে নিয়ে প্রধান পুরোহিত এরপর নরম স্বরে তার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তুমি সোমেশ্বরের প্রহরী, এ সব ভাবনা মনে স্থান দিও না। মহাদেবের আশীর্বাদে হয়তো-বা আর কিছুকালের মধ্যেই মুক্তি ঘটতে চলেছে তোমার। দ্বাদশ বৎসরকাল যাবৎ যে কঠিন দায়িত্ব সম্পাদন করেছ তুমি, তার থেকে মুক্তি ঘটবে তোমার।’

কথাটা শুনে অন্ধকারের প্রহরী যেন মৃদু উৎফুল্ল হয়ে বলল, ‘আপনি সত্যি বলছেন প্রভু? মুক্তি ঘটবে আমার?’

ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘হ্যাঁ। সোমেশ্বরদেব তেমনই ইচ্ছা প্রকাশ করছেন বলে আমার ধারণা। মহাদেবের কাছে তোমার মুক্তি প্রার্থনা করো। তিনি যেন তোমার মুক্তির পথ প্রশস্ত করেন। তোমার আর কিছু বলার আছে? এবার আমাকে প্রস্থান করতে হবে।’

অন্ধকারের প্রহরী জবাব দিল, ‘না, প্রভু, আর কিছু নিবেদন নেই আমার। সোমেশ্বর মহাদেব যেন আমার ডাকে সাড়া দেন।’ এ কথা বলে থেমে গেল লোকটা।

ত্রিপুরারিদেব বেদিটা পূর্ব স্থানে ঠেলে দিয়ে সেই গহ্বরটা আবার ঢেকে দিলেন। তারপর প্রদীপটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ফেরার জন্য। যেমন সবার অগোচরে তিনি মন্দিরের গর্ভগৃহতে প্রবেশ করেছিলেন, তেমনই সবার অগোচরে কিছু সময়ের মধ্যেই গর্ভগৃহর বাইরে বেরিয়ে কপাট টেনে দিলেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। তারপর তিনি রওনা হলেন তাঁর কক্ষের দিকে। শুকতারা ফুটে ওঠার আগেই অবশ্য তাকে আবার ফিরে আসতে হবে এই স্থানে। সোনার শিকল বাজিয়ে মন্দিরবাসীদের নিদ্রাভঙ্গ করার জন্য।