Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/28
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সোমনাথ সুন্দরী – ৪

তখনও অন্ধকার কাটেনি। একটা অদ্ভুত শব্দে ঘুম ভাঙল অঙ্গিরার। গতকাল প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁর নির্দেশ পালন করে পুরোহিত মল্লিকার্জুন অঙ্গিরাকে পৌঁছে দিয়ে গেছিলেন এই অতিথিশালায়। তারপর থেকে আর কক্ষ ত্যাগ করেনি অঙ্গিরা। অতিথিশালার তত্ত্বাবধায়ক এক সেবায়েত এসে তার কক্ষতেই ফলাহার দিয়ে গেছিল। ক্লান্তি কাটাবার জন্য অঙ্গিরার বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। দীর্ঘ সময় সে ঘুমিয়েই কাটিয়েছে।

ঘুম ভেঙে উঠে বসে সে তাকাল গবাক্ষর দিকে। শব্দটা বাইরে থেকেই আসছে। না, কোনও বাদ্য যন্ত্রর নয়, একটা ছমছম-ঝনঝন ধাতব শব্দ! মন্দিরের সব কিছুর সঙ্গে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। তাই শয্যা থেকে নেমে দরজার অর্গল খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো অঙ্গিরা। মাথার ওপরে অপসৃয়মান চাঁদের আলোতে আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল মন্দিরটা। শুকতারাও ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ সূর্যোদয়ের বেশি দেরি নেই।

শব্দটা মন্দির থেকেই আসছে। যদিও আলো না ফোটার কারণে কাঁপতে থাকা সোনার শিকলটা নজরে পড়ল না তার। তবে একটি জিনিস খেয়াল করলো সে। ওই ধাতব শব্দে ধীরে ধীরে চারপাশ যেন জেগে উঠতে শুরু করেছে। নানারকম শব্দ শুরু হয়েছে চারদিকে। অন্ধকারের মধ্যেই মন্দিরে নীচের বিশাল প্রাঙ্গণে নানা ছায়ামূর্তি ব্যস্ত সমস্ত হয়ে চলাচল শুরু করেছে।

অঙ্গিরা দেখতে লাগল সে সব। কিছু সময়ের মধ্যেই শুকতারা মুছে গিয়ে পুবের আকাশে রঙ ধরতে শুরু করলো। ধাতব শব্দটা থেমে গেল। মন্দিরের পশ্চাৎ ভাগে সমুদ্রের বুক থেকে উদয় হতে শুরু করেছেন সূর্যদেব। অঙ্গিরার চোখের সামনে ছায়ামূর্তিরা মানুষের রূপ নিল।

ভোরের আলো ফোটার পূর্ব মুহূর্তেই নিজেদের কাজে নেমে পড়েছে আবাসিকরা। কারো হাতে কলস, কারো হাতে ঝাড়ু বা অন্যান্য নানা সামগ্রী। নারী-পুরুষ সবাই আছে। অঙ্গিরার অতিথি নিবাসের সামনে দিয়েই একদল চয়নিকা ফুলের সাজি নিয়ে এগোল মন্দিরের একপাশে অবস্থিত পুষ্পকাননের দিকে।

ভোরের আলো যখন ভালো করে ফুটলো ততক্ষণে মন্দিরের ওপরের চত্বর থেকে সিঁড়ি বেয়ে সার বেঁধে কলসি হাতে দাঁড়িয়ে পড়েছে সেবায়েতের দল। সেই মানবশৃঙ্খল মন্দিরকে বেড় দিয়ে হারিয়ে গেছে সমুদ্রর দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য অঙ্গিরা ব্যাপারটা বুঝতে পারল। সেবায়েতদের ওই মানবশৃঙ্খলের হাতে ধরা কলসের মাধ্যমে সমুদ্র থেকে জল বাহিত হয়ে আসছে।

মন্দিরের ধৌত কার্য শুরু হল। আর এরপর মন্দির প্রাকারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার প্রধান তোরণের বাইরে থেকেও ধীরে ধীরে ভেসে আসতে লাগল নানা শব্দ, জনতার কোলাহল, হ্রেষারব, হাতির বৃংহতি। তোরণ খোলার প্রতীক্ষাতে বাইরে সমবেত হতে শুরু করেছে পূণ্যলোভী জনতা। কোলাহল ব্যস্ততার মধ্যে জেগে উঠতে লাগল সোমেশ্বরের মন্দির। অঙ্গিরা অবাক হয়ে দেখতে লাগল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।

ধৌতকার্য সম্পন্ন হবার পর মুণ্ডিত মস্তক সেবায়েতের দল পূজার নানা উপাচার বহন করে মন্দিরের ওপরে উঠতে লাগল। দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল দুগ্ধ, ঘৃত, ফুলের সুবাস।

অঙ্গিরা দেখল একদল রূপসী রমণী উঠছে সোপানশ্রেণী বেয়ে। দেবদাসী ওরা। তাদের সম্মিলিত পদচারণায় তাদের পায়ে বাঁধা ঘুঙুরের শব্দও কানে আসছে। গর্ভগৃহের তোরণ উন্মোচিত হবার পর সোমেশ্বরকে নৃত্য প্রদর্শন করবে তারা। তাদের অলঙ্কার আর জরির পোশাক প্রভাতী সূর্যকিরণে ঝলমল করছে।

গর্ভগৃহের তোরণ উন্মোচিত হল যথা সময়ই। তখন সূর্যালোক ছড়িয়ে পড়েছে মন্দিরের আনাচেকানাচে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্দিরের প্রধান চত্বরে আর নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ঘণ্টাগুলো একসঙ্গে বাজতে শুরু করল। আর সেই শব্দে মন্দির প্রাকারের বাইরে প্রতীক্ষারত দর্শনার্থীরা উদ্বেলিত হয়ে ‘জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়’, আর ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলল।

অঙ্গিরা এবার অতিথিশালা ত্যাগ করে এগোল মন্দিরের দিকে। সোপানশ্রেণী বেয়ে ওপরে ওঠার সময় অঙ্গিরা এবার দেখতে পেল অজগর সাপের মতো বিশাল স্বর্ণ শৃঙ্খলটা। গতকাল যখন সে সোপান বেয়ে ওপরে উঠেছিলো তখন প্রচুর জনসমাগম থাকায় শিকলটা সে খেয়াল করেনি। শিকলটা দেখে অবাক হয়ে গেল অঙ্গিরা।

সে যখন চত্বরের ওপরে উঠে এল ততক্ষণে গর্ভগৃহর সামনে বাদ্যকারদের বাজনা আর দেবদাসীদের নৃত্যগীত শুরু হয়ে গেছে। ঘুঙুরের মুর্ছনার শব্দ অনুসরণ করে পায়ে পায়ে অঙ্গিরা হাজির হল সে জায়গাতে।

গর্ভগৃহর বিশাল কপাট দুটো উন্মুক্ত। সূর্যালোকে ঝলমল করছে মাণিক্য খচিত স্বর্ণ কপাট। তার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। আর তার সামনে কিছুটা তফাতে নৃত্য পরিবেশন করছে একদল সুন্দরী দেবদাসী। তাদের একপাশে কিছুটা তফাতে বসে বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে বাদ্যকারের দল। শুভ্র বসনাবৃত রুপো বাঁধানো দণ্ড হাতে সেবায়েতের দল ঘিরে রেখেছে চারদিক।

ধূপের গন্ধে ম-ম করছে জায়গাটা। ওই হীরকখচিত কপাটের অভ্যন্তরেই যে সোমেশ্বর মহাদেব অবস্থান করছে তা বুঝতে অঙ্গিরার অসুবিধা হল না। অঙ্গিরাকে কেউ সে স্থান থেকে চলে যেতে বলল না। অবাক হয়ে সে দেখতে লাগল দেবদাসীদের নৃত্যগীত। কী সুন্দর এই নারীরা! যেন স্বর্গের অপ্সরারা এসে হাজির হয়েছে সোমেশ্বরকে নৃত্যগীত পরিবেশনের জন্য! কী অপূর্ব তাদের সঙ্গীত মুর্ছনা! কী সুন্দর তাদের ঘুঙুরবন্ধ পায়ের নৃত্য বিভঙ্গ!

বেশ কিছুক্ষণ নৃত্যগীত প্রদর্শনের পর দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে তা এক সময় শেষ হল। একটা স্তম্ভের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল অঙ্গিরা। তার পাশ কাটিয়ে উচ্ছল কলরব করতে করতে নীচে নামার জন্য এগোল দেবদাসীর দল। সেবায়েতরাও এদিক ওদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এবার অন্য কাজ সামলাতে হবে তাদের।

অঙ্গিরা দেখল একদল রক্ষী এবার উঠে এসেছে মন্দিরের ওপরে এই গর্ভগৃহ চত্বরে। অবাক হয়ে চারপাশে তাকাচ্ছিল অঙ্গিরা। হঠাৎ একজন এসে দাঁড়ালেন তার সামনে। পুরোহিত মল্লিকার্জুন। অঙ্গিরা মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তাঁকে। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘সব কুশল তো?’

অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’

তিনি তাকে বললেন, ‘বিগ্রহ দর্শন করলে এখনই করে নাও। প্রধান তোরণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। বন্যার স্রোতের মতো মানুষ ওপরে উঠে আসবে। তখন আর এত বড় চত্বরেও তোমার স্থান সঙ্কুলান হবে না।’ এ কথা বলে তিনি অন্যদিকে প্রস্থান করলেন।

তার নির্দেশ পালন করে অঙ্গিরা গর্ভগৃহের হীরকখচিত সেই উন্মুক্ত কপাটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গর্ভগৃহর অভ্যন্তরে তাকিয়ে শূন্যে ভাসমান সোমেশ্বর মহাদেবকে দর্শন করে বাহ্যজ্ঞান যেন কিছুক্ষণের জন্য লুপ্ত হয়ে গেল তার! এ-ও কি সম্ভব! শূন্যে সত্যিই ভাসমান সোমেশ্বর মহাদেব!

বিস্মিত বিহ্বলভাবে ভাসমান বিগ্রহর দিকে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে, ভূমিষ্ঠ হয়ে চৌকাঠে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম জানাল অঙ্গিরা। সোমনাথ দর্শনে যেন ধন্য হল তার জীবন। দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে সে উঠে দাঁড়াতেই মন্দিরের প্রধান তোরণ উন্মুক্ত হয়ে গেল। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে প্রচণ্ড ধ্বনি উঠল ‘জয় সোমেশ্বরের জয়! হর হর মহাদেব’!

চত্বরের ওপর থেকে অঙ্গিরা দেখল সত্যিই বন্যার স্রোতের মতো মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করতে শুরু করেছে পুণ্যার্থীরা। তার পর সেই জনস্রোত আর তীব্র কোলাহল নীচের চত্বর অতিক্রম করে সোপানশ্রেণী বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। অঙ্গিরা তা দেখে গর্ভগৃহর সামনে থেকে সরে গিয়ে বেশ কিছুটা তফাতে যেখানে প্রণামী গ্রহণের জন্য বিরাট বিরাট জ্বালা বা ধাতব কলসগুলো রাখা আছে, তার কাছাকাছি এক স্থানে, এক দেওয়ালের গায়ে আশ্রয় নিল।

গর্ভগৃহ চত্বরে উঠে এল সেই জনতা। তাদের সামলাতে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল রক্ষী আর সেবায়েতদের। নানা দেশ থেকে আসা কত ধরনের পুণ্যার্থী! স্বর্ণ পোশাকে আবৃত ধনাঢ্য থেকে শুরু করে, সামান্য কৌপিন পরা জটাধারী সন্ন্যাসী। অশক্ত বৃদ্ধ থেকে শিশুকাঁখে রমণী। জনস্রোতে সবাই মিলিমিশে একাকার। তাদের সামলাতে হিমসিম সেবায়েত আর রক্ষীরা। গর্ভগৃহের সামনে অবস্থান করতে দেওয়া হচ্ছে না কাউকে। দেবতা দর্শনের সঙ্গে-সঙ্গেই ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুণ্যার্থীকে।

শুধু গর্ভগৃহ নয়, পুরো চত্বরটাতেই ছড়িয়ে পড়েছে জনতা। দেওয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকলেও মাঝে-মাঝেই জনস্রোত এসে ধাক্কা দিচ্ছে অঙ্গিরাকে। এক নাগাড়ে বেজে চলেছে মন্দিরের বিশালাকৃতি পিতলের ঘণ্টাগুলো। চত্বরের মধ্যে এক পাশে জমে উঠতে শুরু করেছে বিল্ব ফলের পাহাড়।

অঙ্গিরা যেখানে দণ্ডায়মান তার সামনের কলসগুলোও উপচে পড়তে শুরু করল কিছুক্ষণের মধ্যেই। স্বর্ণ-রৌপ্য মুদ্রা তো আছেই, তার সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের দুর্মূল্য অলঙ্কার, হিরা-জহরত নিবেদিত হচ্ছে সোমেশ্বর মহাদেবের আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে। মহাবিত্তশালী থেকে ভিক্ষুক যে যার সাধ্যমতো দান করছে তার মনবাঞ্ছা পূরণের জন্য।

একদল রক্ষী তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে নজর রাখছে জায়গাটার ওপর। সূর্যকিরণে ঝলমল করছে কলস থেকে উপচে পড়া স্বর্ণখণ্ডগুলো। অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে তাকিয়ে দেখছিল চারপাশ। হঠাৎ একজন তার সামনে এসে দাঁড়াল। কুঞ্চিত কেশ, শ্মশ্রুমণ্ডিত তামাটে বর্ণের দীর্ঘকায় চেহারা। ধাতু বর্মে আবৃত শরীর। কোমরবন্ধ থেকে খড়গকোষ ঝুলছে। অঙ্গিরাকে ভালোভাবে নিরিক্ষণ করে লোকটা কর্কশভাবে জানতে চাইল, ‘তুমি কে? দীর্ঘক্ষণ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে এই রত্ন কলসগুলোর দিকে কি উদ্দেশ্যে চেয়ে আছ?’

অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘আমার নাম অঙ্গিরা। বল্লভী নগরী থেকে এসেছি পুরোহিতশ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেবের কাছে।’

তার জবাব শোনার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্নকর্তার মুখমণ্ডল থেকে কাঠিন্য অন্তর্হিত হল। মাথা ঝুঁকিয়ে মৃদু অভিবাদন জানিয়ে সে বলল, ‘ও, আপনি সেই ব্যক্তি! আমি মহারক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ। আমি আপনার কথা জেনেছি। আপনি তো প্রধান পুরোহিতের অতিথিশালাতে অবস্থান করছেন। পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।’

তার কথা শুনে অঙ্গিরাও তাঁকে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বলল, ‘আমিও প্রীত হলাম আপনার পরিচয় লাভ করে।’

জয়দ্রথ বললেন, ‘আপনার অস্ত্রগুলি আমার এক সৈনিকের তত্ত্বাবধানে আছে। অতিথিশালাতে পাঠিয়ে দেব। তা আপনিও কি আমাদের মতো যুদ্ধব্যবসায়ী, অর্থাৎ সৈনিক?’

অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘না, আমি ঠিক সে অর্থে সৈনিক নই, তবে অস্ত্রবিদ্যা রপ্ত করেছি। বিশেষত ধনুর্বিদ্যা।’ এ বিষয়ে সে আরও কিছু বলতে পারত, কিন্তু গুপ্তবিদ্যা সবার কাছে প্রকাশ করা ঠিক নয় বলে অঙ্গিরা সে প্রসঙ্গে আর কিছু বলল না মহারক্ষী প্রধানকে।

অঙ্গিরার জবাব শুনে জয়দ্রথ হেসে বললেন, ‘আসলে গচ্ছিত শস্ত্রগুলো দেখে আমি ভেবেছিলাম আপনি যুদ্ধ ব্যবসায়ী। আপনার ধনুর্বাণ আর তলোয়ার পেশাদার যুদ্ধ ব্যবসায়ীদের মতোই।’

অঙ্গিরা মৃদু হেসে জবাব দিল ‘আসলে আমার পিতা যুদ্ধব্যবসায়ী ছিলেন। ওই ধনুর্বাণ আর তরবারি তাঁরই ছিল।’ এ কথা বলার পর অঙ্গিরা স্বর্ণ পূর্ণ কলসগুলোর দিকে তাকিয়ে বিস্মিতভাবে বলল, ‘রোজ এত সম্পদ জমা হয় এখানে! এ সব কোথায় যায়! রাজকোষে?’

মহারক্ষী প্রধান বললেন, ‘না, রাজকোষে নয়, দশ সহস্র মানুষের ভরণপোষণ, মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি নানা কাজে ব্যয় হয় এই সম্পদ। বাকিটা সঞ্চিত থাকে উৎসব, দান ইত্যাদি নানা কাজের জন্য। দেবতার সম্পদের ওপর রাজার কোনও অধিকার নেই।’

একথা বলার পর তিনি নীচের চত্বরে জনতার ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমাকে এবার ওই নীচের চত্বরে যেতে হবে। চারপাশ ঘুরে দেখতে হবে। এই জনস্রোতে মিশে তস্কর-প্রবঞ্চকের দলও মন্দিরে প্রবেশ করে। তা ছাড়া সেবায়েত-পুরোহিতদের সঙ্গে পুণ্যার্থীদের নানা সময়তেই বিবাদ-বিসংবাদ হয়। এসব এ সময়কালে মন্দিরের সর্বত্র দৃষ্টি রাখতে হয় আমাকে। মন্দিরের শান্তিরক্ষা ও নিরাপত্তার ভার আমার ওপরই নিয়োজিত।’

কথাটা শুনে অঙ্গিরা বলল, ‘চলুন, আমিও নীচে নামব। এখানে আসার পর সারাদিন অতিথিশালার কক্ষেই ছিলাম। চারপাশটা ঘুরে দেখব। তা ছাড়া এই স্থানে জনসমাগমের চাপে শ্বাস রোধ হয়ে আসছে।’ মহারক্ষী প্রধান বললেন, ‘মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে সমুদ্রতটেও যেতে পারেন। সেখানে কিছু জনসমাগম থাকলেও উন্মুক্ত বাতাস পাবেন।’

জয়দ্রথের সঙ্গে অঙ্গিরা এগোল সোপানশ্রেণী বেয়ে নীচে নামার জন্য। চার-পাঁচ জন রক্ষী একটা ক্ষুদ্র ব্যুহ রচনা করল তাদের নির্বিঘ্নে নীচের নামাবার জন্য। সেই ব্যুহ পরিবৃত হয়ে জয়দ্রথের সঙ্গে অঙ্গিরা সোপানশ্রেণীর এক ধার ঘেঁষে নামতে শুরু করল।

তাদের এক পাশ দিয়ে ওপরে উঠে আসছে তীব্র কোলাহল মুখর জনস্রোত। ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি চলছে। কয়েকজন সেবায়েত ছড়ি হাতে সোপানের ধাপগুলোতে দাঁড়িয়ে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে দর্শনার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। ওই ঊর্ধ্বগামী জনস্রোতের মধ্যে অঙ্গিরা যদি গিয়ে পড়ে তবে মুহূর্তর মধ্যে সে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

ধীরে ধীরে নামতে নামতে অঙ্গিরারা তখন প্রায় শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে। হঠাৎই সে দেখতে পেল একজন লোক শুয়ে পড়ল সোপানশ্রেণীতে। জনস্রোত কিন্তু ব্যাপারটাতে ভ্রুক্ষেপই করল না। ‘সোমেশ্বর মহাদেবের জয়’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস আন্দোলিত করে সেই লোকটাকে পদদলিত করে উপরে উঠতে লাগল।

সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে অঙ্গিরা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে, ব্যাপারটা মহারক্ষী প্রধান ও তার সঙ্গীদের নজর এড়িয়ে গেছে ভেবে উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘ওই দেখুন, একজন লোক পদদলিত হচ্ছে! শীঘ্রই উদ্ধার না করলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।’ কথাটা কানে যেতে জয়দ্রথ নিস্পৃহ ভাবে বললেন, ‘উদ্ধার করার প্রয়োজন নেই, ও স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করছে। এমন কেউ কেউ করে থাকে।’

মহারক্ষী প্রধানের কথা শুনে অঙ্গিরা বিস্মিতভাবে জানতে চাইল, ‘স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করছে! এর অর্থ?’ জয়দ্রথ জবাব দিল, ‘এ লোকটা নিশ্চয়ই ব্রাহ্মণ হত্যা, গো-হত্যা বা পিতা-মাতাকে হত্যার মতো কোনও গর্হিত পাপ কার্য করেছিল। যে পাপের ফলে নরকবাস অবশ্যম্ভাবী ছিল। কিন্তু এই সোমেশ্বর মন্দিরে পুণ্যার্থীদের পদতলে যদি কারও মৃত্যু হয় তবে তার স্বর্গবাস হয়। এ সোপান হল স্বর্গের সিঁড়ি, মুক্তিলাভের সিঁড়ি। এভাবে মৃত্যু ঘটায় ওর পাপ স্খলন হবে। স্বর্গ আরোহন করবে ওই লোকটা।’ কথাগুলো বলে জয়দ্রথ আবার নামতে শুরু করলেন। বিস্মিত অঙ্গিরা অনুসরণ করল তাকে। ততক্ষণে পুণ্যার্থীদের পদতলে তালগোল পাকিয়ে মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে সেই পাপিষ্ঠের দেহ। হয়তো বা লোকটার আত্মা যাত্রা শুরু করেছে বিষ্ণুলোকের উদ্দেশ্যে।

নীচে নেমে এল তারা। জয়দ্রথ, অঙ্গিরার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন নিজের কর্তব্য সম্পাদনের জন্য। জনতার ভিড়ে হারিয়ে গেলেন তিনি। অঙ্গিরা ভিড় ঠেলতে ঠেলতে এগোতে থাকল মন্দির প্রাকারের বাইরে যাবার জন্য। কোনওক্রমে মন্দিরের প্রধান তোরণ অতিক্রম করে বাইরে বেরিয়ে এল সে। সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু মানুষের মাথা, আর আন্দোলিত নানা বর্ণের নিশান। অযুত, নিজুত সংখ্যায় লোক এগিয়ে আসছে মন্দিরে প্রবেশের জন্য। অঙ্গিরা মন্দির প্রাকারকে বেড় দিয়ে তার গা ঘেঁষে এগোতে থাকল সমুদ্র তটে পৌঁছবার জন্য। কিছু সময়ের মধ্যে অঙ্গিরা পৌঁছে গেল সে স্থানে।

সমুদ্রতটে জনসমাগম থাকলেও সেখানের পরিস্থিতি মন্দির চত্বরের মতো দম বন্ধ করা নয়। মন্দির প্রাকারের পশ্চাতভাগের গা ঘেঁষে তটরেখা এগিয়ে বেশ কিছুটা দূরে বাঁক নিয়েছে। প্রাকারের গায়ে ছোট ছোট শনের ছাউনি দেওয়া কুটীর। তার সামনে বালুতটে সূর্যকিরণে সার বেঁধে বসে পুণ্যার্থীদের মস্তক মুণ্ডন করছে ক্ষৌরকারের দল। সংখ্যায় তারা অগুনতি। মানত করা পুণ্যার্থীরা মস্তক মুণ্ডণ সমাপ্ত হলে সমুদ্রের জলে অবগাহন করে মন্দিরের দিকে যাত্রা করছে সোমেশ্বর মহাদেবের দর্শনের জন্য।

সমুদ্র এখন শান্ত-সমাহিত। ছোট ছোট উর্মিমালা নিঃশব্দে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তটরেখা। সূর্যকিরণে ঝিকমিক করছে সমুদ্রের জল। বেশ কয়েকটা ময়ূরপঙ্খী নোঙর করা আছে তটরেখা থেকে কিছুটা তফাতে। সমুদ্রের বাতাসে উড়ছে তাদের মাস্তুলের মাথায় রঙিন নিশান। কোনও ময়ূরপঙ্খী এসেছে তীর্থ করতে, আবার কোনও ময়ূরপঙ্খী পসরা বোঝাই হয়ে এসেছে প্রভাসক্ষেত্রে বাণিজ্য করতে। দূর দেশ থেকে তারা বয়ে এনেছে চন্দন কাঠ, কড়ি, শঙ্খ রত্নরাজি।

চারপাশ দেখতে দেখতে ধীর পায়ে এগিয়ে চলল অঙ্গিরা। বেশ কিছুটা এগোবার পর মন্দির প্রাকার যেখানে গিয়ে আবার বাঁক নিয়েছে ঠিক সেই জায়গাতে পৌঁছে অঙ্গিরা দেখতে পেল তটরেখার শেষ প্রান্তে সমুদ্রের জলে কিছুটা নিমজ্জিত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে কারুকার্য মণ্ডিত বিরাট এক প্রস্তর খণ্ড। ইতিপূর্বে অঙ্গিরা সে স্তম্ভ কোনও দিন না দেখলেও, সেই স্তম্ভর পরিচয় বুঝতে পারল।

পিতা-মাতার কাছে এই স্তম্ভর কথা শুনেছিল সে। প্রভাসপত্তনে, সোমেশ্বর মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে সমুদ্র তটের শেষ প্রান্তে প্রোথিত ওই স্তম্ভই নাকি পৃথিবীর ভূভাগের শেষ সীমানা! তারপর আর কোথাও নাকি পৃথিবীর মাটি নেই, শুধু কূলকিনারাহীন মহাসমুদ্র আর সেই জলরাশির নীচে অবস্থান করছে মহাপাতাল।

সেই স্তম্ভের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে স্থানের বালুতটে বসল অঙ্গিরা। জায়গাটা বেশ একটু ফাঁকা ফাঁকা। যদিও মন্দির প্রাকারের ভিতর থেকে জনতার কোলাহলের শব্দ আর ঘণ্টাধ্বনি সেখানেও আসছে। সমুদ্রর দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরা ভাবতে থাকল তার নিজের কথা। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর বর্তমানে সে একা হয়ে গেছে। এত মানুষ এ পৃথিবীতে। কিন্তু এত মানুষের মধ্যেও কোথাও তার কোনও আত্মীয়পরিজন নেই।

নিজের ভবিষ্যৎ তার সম্পূর্ণ অজানা। পিতা-মাতার শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য সে এই প্রভাসক্ষেত্রে সোমেশ্বর মন্দিরে এসে উপস্থি হয়েছে, প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। কিন্তু কি কারণে, কোন কার্য সম্পাদনের লক্ষে, যে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে তা তার নিজেরও জানা নেই। তবে শিশুকাল থেকে তার পিতা-মাতা অঙ্গিরাকে অবগত করেছে যে সে এই সোমেশ্বর মন্দিরের জন্যই নিবেদিত। অঙ্গিরা এখানে এসে উপস্থিত হবার পর প্রধান পুরোহিত যে নির্দেশ তাকে দেবেন, তা তাকে পালন করতে হবে। নচেত তার পিতা-মাতার অনন্ত নরকবাস অবশ্যম্ভাবী।

একটা ব্যাপার অবশ্য অঙ্গিরার মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে। হয়তো বা মন্দির রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা হতে পারে তাকে। নইলে এত যত্ন করে তাকে অস্ত্রশিক্ষা দিলেন কেন তার পিতা? বিশেষত অস্ত্র শিক্ষার এক গুঢ় গোপনতম ব্যাপারও বাল্যকাল থেকে তিনি রপ্ত করিয়েছেন তাঁর পুত্রকে। দেখা যাক পুরোহিতশ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেব কি নির্দেশ দেন তাকে।

রৌদ্রকরোজ্জ্বল সমুদ্রতটে বসে নানা কথা ভাবতে লাগল অঙ্গিরা। সূর্যদেব ক্রমশ এগোতে লাগলেন মধ্যাকাশের দিকে। দীর্ঘ সময় ধরে উন্মুক্ত আকাশের নীচে বসে থাকার কারণে একক্ষণে উষ্ণতা অনুভূত হতে লাগল যুবক অঙ্গিরার। মন্দিরে অতিথিশালার যে কক্ষ অঙ্গিরার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে সে কক্ষ বেশ শীতল ও আরামপ্রদ।

দিনমণি প্রায় মাথার ওপর পৌঁছে গেছেন। তার খরদৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হচ্ছে সমুদ্রতটে। উষ্ণ হয়ে উঠছে তটের বালুকারাশি। অঙ্গিরা উঠে দাঁড়িয়ে সমুদ্রতট থেকে মন্দিরে যাবার জন্য পা বাড়াল। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সে আবার পৌঁছে গেল ক্ষৌরকারদের সেই কুটিরগুলোর কাছে। যেখানে সারবদ্ধভাবে বসে মস্তক মুণ্ডণ করাচ্ছে ক্ষৌরকারের দল।

অঙ্গিরা দেখতে পেল পথের পাশে এক স্থানে ইতিমধ্যে কর্তিত কেশ জমা হয়ে পাহাড়ের আকার ধারণ করতে চলেছে! তাকে পাশে রেখে এগোতে যাচ্ছিল অঙ্গিরা, ঠিক সেই সময় একটা লোক তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, ‘আপনি নিশ্চই বল্লভীদেশ থেকে আগত সেই যুবক? যিনি সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারী?’

প্রশ্ন শুনে অঙ্গিরা তাকাল সেই অপরিচিত প্রশ্নকর্তার দিকে। কৃষ্ণকায় বৃদ্ধ একজন লোক, কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা কেশরাশি, শেনপক্ষীর ঠোঁটের মতো নাসিকার নীচ থেকে দু-পাশে ঝুলে পড়া গুম্ফ, সবই দুধের মতো সাদা। তার কোমর শুভ্র বস্ত্র-খণ্ডে আবৃত, গায়ে একটা কৃষ্ণবর্ণের উড়নি। সোনার কর্ণকুণ্ডল দ্যুতি ছড়াচ্ছে সূর্যালোকে। তার বাজুবন্ধও স্বর্ণ নির্মিত। লোকটার শরীর লোল চর্মযুক্ত আর মুখমণ্ডল অসংখ্য বলিরেখাময় হলেও তার চোখের দৃষ্টি যেন অসম্ভব রকম তীক্ষ্ন ও অন্তর্ভেদী। ভালো করে লোকটাকে দেখার পর অঙ্গিরা বলল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনার পরিচয়টা?’

বৃদ্ধ জবাব দিল, ‘আমি নরসুন্দর অধিপতি খগেশ্বর। এই যে এখানে যত ক্ষৌরকার দেখছেন, প্রভাস পত্তনের পাঁচশত ক্ষৌরকারের অধিপতি আমি। তাদের গোষ্ঠীপতি।’

লোকটার পরিচয় জানার পর অঙ্গিরা তাকে প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু, আপনি আমার পরিচয় জানলেন কি ভাবে?’ নরসুন্দর শ্রেষ্ঠ জবাব দিলেন, ‘আপনার নাম যে অঙ্গিরা, আর আপনি যে প্রধান পুরোহিতের অতিথিশালায় অবস্থান করছেন সে সম্পর্কেও আমি অবগত। প্রভাসপত্তন নগরীতে বা সোমেশ্বর মন্দিরে একটা পক্ষী ডানা ঝাপটালেও সে সংবাদ আমার কর্ণগোচর হয়। এ তো তুচ্ছ ব্যাপার।’ কথা শেষ করে মৃদু হাসলেন ক্ষৌরকার শিরোমণি।

অঙ্গিরা বলল, ‘আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আনন্দলাভ করলাম।’

খগেশ্বর বললেন ‘এ নগরীতে আমাকে সবাই চেনে। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব থেকে শুরু করে স্বয়ং গুর্জর-নরেশ ভীমদেব পর্যন্ত। তারও মস্তক মুণ্ডন করিয়েছি আমি। কত রাজা মহারাজা-সম্রাটের-মস্তক মুণ্ডন হয়েছে আমার এ-দু’টি হাত দিয়ে তার কোনও হিসাব নেই। আপনি সমুদ্রতটে মস্তক মুণ্ডনের অভিপ্রায়ে এসেছেন নাকি সমুদ্র স্নানের অভিপ্রায়ে এসেছেন?’

অঙ্গিরা হেসে জবাব দিল, ‘না, এর কোনওটার জন্যই এখানে আসিনি। আসলে মন্দির আর তার চারপাশটা ঘুরে দেখতে বেরিয়েছিলাম।’

জবাব শুনে একটু চুপ করে থেকে খগেশ্বর বললেন, ‘কেমন দেখলেন মন্দির?’

অঙ্গিরা বলল, ‘এত বড় কর্মযজ্ঞ, এত মানুষ আমি আগে কখনও দেখিনি! সব থেকে বিস্মিত হলাম সোমেশ্বর মহাদেবের শূন্যে ভাসমান প্রস্তর বিগ্রহ দেখে। যেন মানব জন্ম সার্থক হল আমার! এমন অলৌকিক দৃশ্য! সূর্যের আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে হাজারো মানুষের কোলাহলে, ঘণ্টাধ্বনিতে কেমন অদ্ভুতভাবে জেগে উঠল মন্দির। অথচ কাল রাতে সন্ধ্যারতির পর কেমন যেন গা-ছমঝমে নিস্তব্ধ হয়ে গেছিল মন্দির চত্বর। কোথাও কোনও শব্দ ছিল না।’

কথাটা শুনে একটা যেন আবছা হাসি ফুটে উঠল বহুদর্শী বৃদ্ধ ক্ষৌরকার শিরোমণি খগেশ্বরের ঠোঁটে।

তিনি বললেন, ‘সূর্যালোকে নয়, মন্দির কিন্তু আসলে জীবন্ত হতে শুরু করে সূর্যাস্তের পর। যখন দেবদাসীরা সন্ধ্যারতির পর তাদের নৃত্যগীত সমাপ্ত করে গর্ভগৃহ চত্বর থেকে নীচে ফিরে আসে, বন্ধ হয়ে যায় গর্ভগৃহের দরজা। তারপর রাত যত গভীর হতে শুরু করে তত যেন জীবন্ত হতে থাকে। আসল প্রাণ ফিরে পেতে থাকে মন্দির। যাদের জ্ঞানচক্ষু আছে তারা তা বুঝতে পারে, অবলোকন করতে পারে।’

অঙ্গিরা প্রশ্ন করল, ‘এর মানে?’

বৃদ্ধ এ কথার জবাব না দিয়ে কেমন যেন অর্থপূর্ণ হাসলেন। তারপর বললেন, ‘যদি আপনার আমাকে কোনও প্রয়োজন হয় তবে জানাবেন। এ নগরীর সবকিছু আমার নখদর্পণে। এবার আমি অন্যত্র কার্য সম্পাদনে যাব।’ এ কথা বলে আর কোনও বাক্যালাপ না করে হাঁটতে শুরু করলেন ক্ষৌরকার শিরোমণি।

অঙ্গিরার কেমন যেন অদ্ভুত লাগল লোকটাকে। বিশেষত তার হেঁয়ালি পূর্ণ কথাবার্তা। সে এগোল মন্দিরে ফেরার জন্য।

মন্দিরে দর্শনার্থীদের স্রোত তখনও অব্যাহত। তবে দ্বিপ্রহরে আরও একবার দেবতার উদ্দেশ্যে নৃত্যগীত প্রদর্শন করে গর্ভগৃহর দরজা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে দেবতার মধ্যাহ্নভোজ সমাপনের জন্য। দর্শনার্থীরা, পুণ্যার্থীরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে পুনর্বার গর্ভগৃহর তোরণ উন্মোচনের প্রতীক্ষাতে। গর্ভগৃহ চত্বর থেকে জনতার সারি নীচের চত্বরে নেমে অজগর সাপের মতো এঁকেবেঁকে রাজপথে চলে এসেছে।

সে সব অতিক্রম করে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে অঙ্গিরা, পৌঁছে গেল অতিথিশালার কক্ষে। ঠিক সেই সময়ই তার কক্ষের সামনে উপস্থিত হল কয়েকজন সেবায়েত। শিখাধারী, মুণ্ডিত মস্তক লোকগুলো। তার মধ্যে একজন স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত লোক আছেন। তার কানে সোনার মাকড়ি, গলায় সোনার হার, সোনার বাজুবন্ধ, হাতে খর্বাকৃতি ছড়িটাও সোনা বাঁধানো। একজন সেবায়েত লোকটার মাথায় রেশমের ছাতা ধরে আছে।

মধ্যবয়সি লোকটা নিজের পরিচয় দান করে জানালেন, ‘আমি বিষধারী। মন্দিরের প্রধান সেবায়েত। বৈকালে সূর্যাস্তের পূর্বে প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব আপনার সাক্ষাৎ অভিলাষী। একজন সেবায়েত আপনাকে নিতে আসবে। আপনি প্রস্তুত থাকবেন।’ অঙ্গিরাকে সংবাদটা দিয়ে অন্যত্র চলে গেলেন সেবায়েত প্রধান বিষধারী।