Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/28
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সোমনাথ সুন্দরী – ৫

মধ্যাহ্নের আহার সমাপন করে বেশ কয়েক দণ্ড নিদ্রার পর অঙ্গিরার যখন নিদ্রাভঙ্গ হল তখন বাইরে দর্শনার্থীদের কোলাহল এদিনের মতো স্তিমিত হয়ে এসেছে। পুণ্যার্থীদের মন্দির প্রাকারের অভ্যন্তরে আর প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। মন্দিরের অভ্যন্তরে পুণ্যার্থীদের অবশিষ্টাংশ সোমেশ্বর মহাদেবের দর্শন লাভ করার পর মন্দির ত্যাগ করছে।

অঙ্গিরা তার কক্ষসংলগ্ন স্নানাগারে শরীর সিক্ত করে, ধৌতবস্ত্র পরিধান করে যখন কক্ষের সামনের ক্ষুদ্র চত্বরে এসে দাঁড়াল, তখন দিনের শেষ আলো মন্দিরের শীর্ষদেশে অবস্থিত স্বর্ণ কলসগুলোর গায়ে ছড়িয়ে সূর্যদেব, সমুদ্রে অবগাহন করতে চলেছেন।

সেবায়েত-প্রধান বিষধারীর কথা মতোই একজন সেবায়েত সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। অঙ্গিরাকে প্রধান পুরোহিতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবার জন্য। অঙ্গিরাকে দেখে মৃদু মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ জানাল সে। অঙ্গিরা অনুসরণ করল তাকে।

দর্শনার্থী, পুণ্যার্থীদের ভিড় ফাঁকা হয়ে গেছে মন্দির প্রাকারের ভিতর। সেবায়েতের সঙ্গে সোপানশ্রেণীর সামনে অঙ্গিরা উপস্থিত হল যেখানে, সেখানে সার সার বলদে টানা শকট উপস্থিত হয়েছে। গর্ভমন্দির চত্বর থেকে ফুল, বিল্বপত্র মাথায় ঝুড়ি করে নামিয়ে এনে শকটগুলো পূর্ণ করছে সেবায়েতরা। প্রত্যহ সায়াহ্নে সমুদ্রে বিসর্জন দেওয়া হয় পুণ্যার্থীদের এসব উপাচার।

এসবের পাশ কাটিয়ে অঙ্গিরা উঠে এল গর্ভগৃহ চত্বরে। সে দেখতে পেল রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথের তত্ত্বাবধানে একদল সেবায়েত সেই দানপত্রগুলো অর্থাৎ সেই জালাগুলো থেকে মুদ্রা ও স্বর্ণখণ্ড এক স্থানে স্তুপীকৃত করেছে। বিরাট বিরাট থলেতে পরিপূর্ণ করা হচ্ছে সেসব। অঙ্গিরার সঙ্গে চোখাচোখি হতে তিনি মৃদু হাসলেন। অঙ্গিরাও মৃদু হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে মৃদু হাসল। অঙ্গিরা এরপর পৌঁছে গেল প্রধান পুরোহিতের আবাসস্থলে।

অঙ্গিরার সঙ্গী সেই সেবায়েত মৃদু ঘা দিল কক্ষের বন্ধ কপাটে। দরজা খুলে আত্মপ্রকাশ করলেন পুরোহিত-শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেব। অঙ্গিরা আর সেই সেবায়েত মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তাকে। সেবায়েতকে ফিরে যেতে বলে অঙ্গিরাকে নিয়ে নিজ কক্ষে প্রবেশ করলেন ত্রিপুরারিদেব।

অঙ্গিরা দেখল, ত্রিপুরারিদেব, সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান ব্যক্তি হলেও তার কক্ষে তেমন কোনও জৌলুশ নেই। বিশ্রাম, শয়নের জন্য অতি সাধারণ শয্যা, আহারের জন্য সামান্য কিছু তৈজস, আর দু-একটি আসবাব আছে সে কক্ষে। আর দেওয়ালের গায়ের তাকগুলোতে আছে রেশম বস্ত্রে মোড়া নানা প্রাচীন পুঁথি, হিসাব রক্ষার জন্য ভুর্জপত্র ইত্যাদি। কপাট বন্ধ করলেন।

প্রধান পুরোহিত খর্বাকৃতি উচ্চতা সম্পন্ন একটা কাষ্ঠ নির্মিত চারপায়াতে অঙ্গিরাকে ইশারায় বসতে বললেন। একটু ইতস্তত করেই সেখানে বসল অঙ্গিরা। একই রকম আর একটা আসনে কয়েক হাত তফাতে অঙ্গিরার মুখোমুখি বসলেন তিনি। শ্বেতপাথরের জাফরি বসানো একটা গবাক্ষ আছে পশ্চিম দেওয়ালে। তার মধ্যে দিয়ে দিনের শেষ আলো কক্ষের মধ্যে চুঁইয়ে প্রবেশ করছে।

বেশ কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে অঙ্গিরাকে নিরীক্ষণ করার পর ত্রিপুরারিদেব জানতে চাইলেন, ‘মন্দিরে থাকতে তোমার কোনও সমস্যা হচ্ছে না তো?’

অঙ্গিরা জবাব দিল ‘না, প্রভু।’

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ত্রিপুরারি বললেন, ‘সত্যিই তুমি তোমার পিতা-মাতার অন্তিম ইচ্ছা পালন করার জন্য এখানে এসেছ তো? আমি তোমাকে যে নির্দেশ দেব তা তুমি পালন করতে পারবে তো?’

অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, পারব।’

‘ধরো যদি সে নির্দেশ ভয়ঙ্কর কঠিন কিছু হয়?’

অঙ্গিরা জবাব দিল ‘হ্যাঁ, তাও পারব। নইলে যে আমার পিতা-মাতার মুক্তি ঘটবে না।’

‘মুক্তি’—শব্দটা শুনে ত্রিপুরারিদেবের একজনের কথা মনে হল। হ্যাঁ, এ যুবকের ওপরই নির্ভর করছে তার মুক্তি। ত্রিপুরারি জানতে চাইলেন, ‘তুমি তোমার পিতা-মাতার অতীত জীবন সম্পর্কে কতটুকু অবগত?’

অঙ্গিরা উত্তর দিল, ‘বিশেষ কিছু নয়, শুধু জানি তারা এক সময় এই মন্দিরে বসবাস করতেন। আর এই মন্দিরের অর্থেই তারা প্রতিপালন করেছেন আমাকে।’

‘কেন তারা এই চিরন্তনপীঠ পরিত্যাগ করে বল্লভীতে আশ্রয় নিয়েছিল, সে প্রসঙ্গে তারা তোমাকে কিছু জানিয়েছিল? এ সংক্রান্ত কোনও ঘটনা?’

‘না,’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল অঙ্গিরা।

অঙ্গিরার জবাব শুনে মনে মনে আশ্বস্ত হলেন প্রধান পুরোহিত। এরপর তিনি জানতে চাইলেন ‘তোমার পিতা নিশ্চই তোমাকে অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছে? কোনও বিশেষ ধরনের অস্ত্রশিক্ষা?’

অঙ্গিরা যে কথাটা ক্ষৌরকার খগেশ্বরকে জানায়নি সে কথাটা এবার জানাল প্রধান পুরোহিতকে। সে বলল ‘হ্যাঁ, তিনি আমাকে বিশেষ ধরনের অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছেন। শব্দভেদী বাণ নিক্ষেপ করতে পারি আমি। চোখ বন্ধ করেও অসি চালনা করতে পারি।’

পুরোহিত-শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেবের ঠোঁটের কোণে আবছা হাসি ফুটে উঠল কথাটা শুনে। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, সে কৌশল তুমি কতটা রপ্ত করেছ সে পরীক্ষা আমি নেব।’

এরপর বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিনি বললেন, ‘সোমেশ্বর মহাদেবের সেবাতে তোমাকে এ মন্দিরে এক যুগ অর্থাৎ দ্বাদশ বর্ষ নিয়োজিত থাকতে হবে এক কঠিন দায়িত্বপূর্ণ কাজে। তারপর তোমার দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করবে তুমি। মন্দির ত্যাগ করে যে-কোনও স্থানে চলেও যেতে পারবে।’

অঙ্গিরা বলল, ‘আপনি যেমন আজ্ঞা দেবেন সে নির্দেশ পালন করব আমি। কবে থেকে সে কার্যভার আমাকে গ্রহণ করতে হবে?’

প্রধান পুরোহিত একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘আর দুই পক্ষকাল পর পূর্ণিমা। ওই দিন তোমার মস্তক মুণ্ডণ করিয়ে ভগবান সোমেশ্বর মহাদেবের চরণে তোমাকে সমর্পণ করা হবে। আর তারও দুই পক্ষকাল পর মাঘী পূর্ণিমা। একই সঙ্গে আবার ওই দিন চন্দ্রগ্রহণও। চন্দ্রগ্রহণের দিন লক্ষ লক্ষ ভক্তর সমাগম হয় এই মন্দিরে। ওই শুভ দিন থেকে তোমার ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করব আমি। তারপর দ্বাদশ বৎসর সে দায়িত্ব পালন করতে হবে তোমাকে।’

ত্রিপুরারিদেবের কথা শুনে অঙ্গিরা জানতে চাইল ‘দেব, তবে এই মধ্যবর্তী সময়কালে আমি কি কার্য সম্পাদন করব?’

ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘মাঘী পূর্ণিমার দিন থেকে সে দায়িত্ব তোমার ওপর ন্যস্ত হবে, দ্বাদশ বৎসরব্যাপী সে দায়িত্ব পালনের জন্য তোমার এই মন্দির ত্যাগ করা চলবে না। জাগতিক সুখ ভোগের অনেক কিছু থেকেই তোমাকে বঞ্চিত থাকতে হবে ওই দীর্ঘ সময়। অবশ্য তার ফলস্বরূপ তুমি একদিন অক্ষয় স্বর্গলাভের অধিকারী হবে। তাই মধ্যবর্তী সময় তুমি তোমার ইচ্ছানুযায়ী যে-কোনও সুখ চাইলে গ্রহণ করতে পারো। নগরীর যে-কোনও অংশ পরিভ্রমণ করতে পারো।

দুই পক্ষকাল পর যে দিন তোমাকে সোমেশ্বরের চরণে নিবেদন করা হবে তার পূর্ব দিবস পর্যন্ত মৎস্য ইত্যাদি আমিষ দ্রব্যও মন্দিরের বাইরে গিয়ে গ্রহণ করতে পারো, এমনকী মন্দিরের বাইরে নগরীতে যে বারাঙ্গনারা অবস্থান করে, তাদের সঙ্গ লাভও করতে পারো। বলা যেতে পারে, এই মধ্যবর্তী সময়কাল তোমার জাগতিক সুখের জন্য নির্ধারিত। পরবর্তীতে দীর্ঘকাল সে সব সুখ থেকে বঞ্চিত থাকবে তুমি। আর এসব সুখ লাভের জন্য অর্থের অভাব হবে না তোমার।’

একটানা কথাগুলো বলে হাসলেন প্রধান পুরোহিত। তারপর বললেন, ‘এবার তুমি সোমেশ্বর মহাদেবের নাম নিয়ে শপথ গ্রহণ করে বলো, আমার সঙ্গে তোমার এই কথোপকথন বাইরের পৃথিবী থেকে গোপন রাখবে তুমি। এমনকী সহপ্রধান পুরোহিতদ্বয় মল্লিকার্জুন ও নন্দিবাহনকেও আমার নির্দেশ ব্যতীত কোনও কথা ব্যক্ত করবে না।’

প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের কথা শুনে অঙ্গিরা বলল, ‘আমি সোমেশ্বর মহাদেবের নামে শপথ গ্রহণ করছি যে আপনার সঙ্গে এই বাক্যালাপ গোপন রাখব আমি।’

ত্রিপুরারি বললেন, ‘শপথ বাক্য মনে থাকে যেন। সোমেশ্বর মহাদেব তোমার মঙ্গল করুন।’

কথাগুলো বলে আসন ত্যাগ করে উঠে একটা কুলুঙ্গি থেকে রেশমের একটা থলি বার করলেন প্রধান পুরোহিত। অঙ্গিরাও উঠে দাঁড়াল তার আসন থেকে। ত্রিপুরারিদেব সেই রেশমের থলিটা অঙ্গিরার হস্তে সমর্পণ করে বললেন, ‘এতে একশত স্বর্ণমুদ্রা আছে। আশা করি এই মুদ্রা দিয়ে এ কয়দিন তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে পারবে তুমি। প্রয়োজনবোধে আরও দেব। হ্যাঁ, কেউ যদি এই মুদ্রার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করে তবে এক্ষেত্রে তুমি বলতে পারো যে এ মুদ্রা আমি তোমাকে উপহার দিয়েছি। তবে সোমেশ্বর মুদ্রাটা কিন্তু সাবধানে রাখবে। ওটাই তোমার মন্দির নগরী পরিভ্রমণের অনুমতিপত্র। নির্দিষ্ট সময়ে ওই মুদ্রা ফিরিয়ে নেব আমি। এবার তুমি প্রস্থান করো। আপাতত বাক্যালাপ সমাপ্ত। যখন প্রয়োজনবোধ করব তখন তোমাকে সাক্ষাতের জন্য আহ্বান করব।’

পুরোহিতশ্রেষ্ঠর কথা শুনে অঙ্গিরা মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁকে প্রণাম জানিয়ে বলল, ‘যথা আজ্ঞা দেব।’

কপাটের অর্গল উন্মোচন করে ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘কিছু সময়ের মধ্যেই সন্ধ্যারতি শুরু হবে। সাধারণ পুণ্যার্থী এমনকী সাধারণ সেবায়েতদেরও এই আরতি দেখার সৌভাগ্য হয় না। সহপ্রধান পুরোহিতদ্বয়, সেবায়েত প্রধান আর নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখ্য ব্যক্তিরাই কেবলমাত্র সন্ধ্যারতি ও নৃত্যগীত দর্শন করতে পারেন। তোমাকে তা দর্শনের অনুমতি দিলাম। মন্দিরের শ্রেষ্ঠ দেবদাসীরা এসময় সোমেশ্বর মহাদেবকে নৃত্য পরিবেশন করে। ইচ্ছা হলে তুমি সোমনাথ সুন্দরীদের নৃত্য অবলোকন করে মানবজন্ম সার্থক করতে পারো।’

অঙ্গিরা মনস্থির করল, ত্রিপুরারিদেব যখন বললেনই তখন সে সন্ধ্যারতি, নৃত্যগীত অবেলোকন করবে। প্রধান পুরোহিতের কক্ষ ত্যাগ করে তাই সে এগোল গর্ভগৃহের দিকে। অন্যান্য মন্দিরকর্মী বা রক্ষীরা, সাধারণ সেবায়েতের দল ততক্ষণে তাদের কার্য সম্পাদন করে গর্ভগৃহ চত্বর ত্যাগ করে নীচে নেমে গেছে।

গর্ভগৃহের কাছে এসে কিন্তু তার সামনে বেশ কিছু নারীকে দেখতে পেল অঙ্গিরা। তারা নৃত্যগীত পারদর্শী দেবদাসী না হলেও সেবাদাসী। পুষ্প চয়ন, মালাগাঁথা, পূজার উপাচার সংগ্রহ ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত থাকে তারা। নানা আকৃতির অসংখ্য প্রদীপ সাজানো হয়েছে গর্ভগৃহর চৌকাঠের সামনে। সেবাদাসীর দল প্রদীপে তৈল সিঞ্চন করছে, কেউ-বা ধূপের পাত্র পরিপূর্ণ করছে তা প্রজ্বলনের আছে।

গর্ভগৃহর সামনে থামের ওপর ধরে থাকা ছাদ-সম্মিলিত যে অঙ্গন আছে সেখানে একটা থামের গায়ে গিয়ে দাঁড়াল অঙ্গিরা। সেখানে সহপ্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন আর মহারক্ষী প্রধান জয়দ্রথকেও দেখতে পেল।

দেখতে পেয়ে নন্দিবাহন কিছু একটা কথা বললেন রক্ষীপ্রধানকে। তিনি অঙ্গিরার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, ‘আপনাকে নীচে নেমে যাবার অনুরোধ জানাই। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ব্যতিরেকে সন্ধ্যারতির সময় কারো এখানে থাকার অনুমতি নেই।’

অঙ্গিরা জবাবে বলল, ‘প্রভু ত্রিপুরারিদেব আমাকে সন্ধ্যারতি দর্শনের অনুমতি প্রদান করেছেন। তার পরামর্শে আমি সন্ধ্যারতি দর্শনে এসেছি।’

অঙ্গিরার বক্তব্য শুনে রক্ষী প্রধান মৃদু বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন। তাঁর নির্দেশ সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। সন্ধ্যারতি দর্শন করুন।’ কথাগুলো বলে তিনি ফিরে গিয়ে তার নির্দিষ্ট স্থানে দণ্ডায়মান হলেন।

গোধূলির শেষ আলো ছড়িয়ে সমুদ্রে ডুবে গেলেন সূর্যদেব। সেবাদাসীরা এক-এক করে প্রদীপগুলো জ্বালাতে শুরু করল। ঠিক সেই সময় গর্ভগৃহের সমুখের অঙ্গনের অপর পার্শ্বের সিঁড়ি বেয়ে সার বেঁধে উঠে আসতে লাগল দেবদাসী, সোমনাথ সুন্দরীরা। পরনে তাদের রেশমের উজ্জ্বল পোশাক, সালঙ্কারা, চন্দন চর্চিত মুখমণ্ডল, কবরী আর বাজুবন্ধতে ফুলমালার সাজ। ঘুঙুরের ছমছম শব্দে উঠে এসে অঙ্গনের একপাশে দাঁড়াল বারো জন অসামান্য রমণী। তাদের শরীরের সুগন্ধীর সুবাস বেশ কিছুটা তফাত থেকেই অনুভব করতে পারল অঙ্গিরা।

অন্ধকার নামার সঙ্গে-সঙ্গেই প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের কাজ শেষ হল। আলোকিত হয়ে উঠল গর্ভগৃহর অঙ্গন। সেই হাজার প্রদীপের আলোক শিখায় মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়ে উঠতে লাগল দণ্ডায়মান রূপসীদের হীরকখচিত নথ। সুবর্ণ কঙ্কন। ঘণ্টাধ্বনি হতে শুরু করল এরপর।

পুরোহিত নন্দিবাহন শাখা সম্মিলিত একটা প্রদীপ-দণ্ড তুলে নিয়ে স্তোত্র পাঠ করতে করতে গর্ভগৃহর চৌকাঠের সামনে দাঁড়িয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে আরতি শুরু করলেন। দুজন নারী জ্বলন্ত ধূপ পূর্ণ পাত্র নিয়ে দণ্ডায়মান। ঘণ্টাধ্বনি, আরতিরত পুরোহিত নন্দিবাহনের ভরাট কণ্ঠস্বরে মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ। ধূপের ধোঁয়াতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল গর্ভগৃহ চত্বর।

নন্দিবাহন তাঁর আরতি শেষ করলেন এক সময়। এবার এগিয়ে এল দেবদাসীর দল। বাইরে থেকে দেবতার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে তারা শুরু করল সম্মিলিত নৃত্য। বাদ্যযন্ত্র আর ঘুঙুরের মুর্ছনায় কেঁপে উঠতে লাগল গর্ভগৃহর অঙ্গন। সম্মিলিত নৃত্যগীতের শব্দ গর্ভগৃহর অঙ্গন থেকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সোমেশ্বর মন্দিরের আনাচেকানাচে।

কি রূপ সেই নর্তকীদের! শরীরের কি বিভঙ্গ! কি ছন্দময় অঙ্গ সঞ্চালন! প্রদীপের আলো যেন চুঁইয়ে পড়ছে মসৃণ রেশমের আবরণে আবৃত তাদের স্তন, নিতম্ব, বাহুমূল থেকে। দেবতা ইন্দ্রের নৃত্যসভা যেন স্বর্গ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে সোমেশ্বর মহাদেবের মন্দিরে।

অঙ্গিরা বিস্মিতভাবে অবলোকন করতে লাগল এই আশ্চর্য সুন্দর নৃত্যগীত। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব যে-কোনও অতিশয়োক্তি করেননি তা বুঝতে পারল অঙ্গিরা। বেশ অনেকটা সময় ধরে দেবদাসীদের দলগত নৃত্য প্রদর্শন চলল। তারপর দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল তারা।

দুজন রমণী এসে দাঁড়াল গর্ভগৃহর প্রবেশদ্বারের সামনে। তারাও সালঙ্কারা, পুষ্পশোভিত দেবদাসী। এতক্ষণ নৃত্যগীতে অংশ নেয়নি তারা। কিন্তু, তাদের সৌন্দর্যের কাছে যেন ম্লান হয়ে গেল অন্য রূপসীরা। যেন উর্বশী আর রম্ভা এসে উপস্থিত হয়েছেন মহাদেবকে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য! তাদের একজন মধ্যযৌবনা দেবদাসীশ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা, অপরজন সদ্য যৌবনবতী নবাগতা দেবদাসী সমর্পিতা।

তাদের পরিচয় অবশ্য অঙ্গিরার জানা নেই। মাথা ঝুঁকিয়ে দেবতাকে প্রথমে প্রণাম জানাল তারা। অল্পবয়সি সদ্য যুবতীকে গর্ভগৃহের সমুখের অঙ্গনের কেন্দ্রস্থলে এনে দাঁড় করিয়ে পিছু হটে গেল তিলোত্তমা। নবাগতা দেবদাসী আজ সর্বপ্রথম এককনৃত্য পরিবেশন করবে সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে। সেই মতো তাকে তালিম দিয়েছে দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা।

বুকের কাছে তার মৃণালবাহু দুটো প্রার্থনার ভঙ্গীতে জড়ো করে কয়েক মুহূর্ত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল সেই কন্যা। তার পরনে জরির কাজ করা পট্টবস্ত্র, রক্তিম বক্ষ বন্ধনী। মেঘ রাশির মতো কুঞ্চিত কেশদাম, কাজল, কুমকুম চন্দন শোভিত মুখমণ্ডল, ক্ষীণ কটিদেশ, ভারী নিতম্ব শোভিত সেই নারীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সবাই। পুরোহিত নন্দিবাহনও তার ব্যতিক্রম নন।

ধীরে ধীরে নৃত্যের ভঙ্গীতে অঙ্গ সঞ্চালন শুরু করল সেই নারী। বাদ্যযন্ত্রের তাল-লয় বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ পরিস্ফুটিত হতে শুরু করল তার নৃত্যকৌশল। অঙ্গিরা অবাক হয়ে দেখতে লাগল তাকে। এ যেন কোনও নারী নয়, অপ্সরা! এত সৌন্দর্য কি কোনও মানবীর হতে পারে!

শুধু অঙ্গিরা নয়, দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা, ত্রিপুরারিদেবের সহকারী নন্দিবাহন, রক্ষীধীশ জয়দ্রথ, যারা ইতিপূর্বে সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে বহু দেবদাসীর নৃত্যপরাঙ্গম দেখেছেন, তারাও মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল চালুক্যকন্যার নৃত্যশৈলী। ইতিপূর্বে এমন অনবদ্য নৃত্য তারাও যেন কেউ দেখেননি। মন্দিরে প্রস্তর স্তম্ভগুলোর গায়ে যত দেবতা, অক্ষর মূর্তি আছে তারাও যেন সব জীবন্ত হয়ে উঠে চেয়ে রইল তার দিকে।

এক সময় অবশ্য সমাপ্ত হল সোমনাথ সুন্দরীর নৃত্যকলা। ভূগর্ভগৃহর চৌকাঠে মাথা ছুঁইয়ে দেবতাকে শেষ প্রণাম জানিয়ে উঠে দাঁড়াবার পর তাকে আর অন্য দেবদাসীদের নিয়ে সে স্থান থেকে অন্তর্হিত হল দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা। গর্ভগৃহর দ্বার এবার বন্ধ হবে।

কিন্তু দ্বার যখন বন্ধ হল তখনও সেই নৃত্যগীতের রেশ কাটেনি অঙ্গিরার। তার কানে তখন বেজে চলেছে নিক্কণ ধ্বনি, সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনা। চোখের সামনে ভেসে উঠছে অপ্সরা সদৃশ সেই নারীর লাবণ্য চুঁইয়ে পড়া স্নিগ্ধ মুখমণ্ডল, শরীরী বিভঙ্গ! স্তম্ভের সামনেই চিত্রার্পিত ভাবে দাঁড়িয়ে রইল সে।

গর্ভগৃহের স্বর্ণকপাট বন্ধ হয়ে গেল। এবার এই চত্বর পরিত্যাগ করতে হবে সবাইকে। প্রদীপের আলোগুলো এবার নিভু নিভু হয়ে এসেছে। অন্ধকার অপেক্ষা করছে গর্ভগৃহকে গ্রাস করে নেবার জন্য। সে স্থান পরিত্যাগ করতে লাগল সবাই। অঙ্গিরাকে একই স্থানে একই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রক্ষীপ্রধান তার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, ‘এবার চত্বর ত্যাগ করতে হবে আমাদের।’

জয়দ্রথের কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে তার সঙ্গেই সোপনশ্রেণীর দিকে এগোল অঙ্গিরা। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে নামতে জয়দ্রথকে বলল, ‘কী অপূর্ব নৃত্যগীত। মানব জন্ম যেন সার্থক হল! নীলবসনা এই দেবদাসী কে? যে একক নৃত্য পরিবেশন করল?’

জয়দ্রথ জবাব দিলেন, ‘ওর পূর্বাশ্রমের নাম জানা নেই। সোমেশ্বর মহাদেব প্রাপ্ত নাম—সমর্পিতা। তবে শুনেছি ওই নারী চালুক্য রাজবংশ দুহিতা। মন্দিরে নবাগতা।’

অঙ্গিরা বলল, ‘যেমন সে রূপবতী, তেমনই গুণবতী। স্বর্গের অপ্সরারাও মাথা নত করবেন ওর সামনে।’

সিঁড়ির শেষ ধাপে নেমে এল তারা। নিজের বাসস্থানের দিকে এগোবার আগে মুহূর্তের জন্য হাসলেন রক্ষীপ্রধান। যুবক অঙ্গিরার উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, ‘তবে মনে রাখবেন, দেবদাসীরা কিন্তু দেবতার কাছে সমর্পিত। তাদের একমাত্র আরাধ্য, একমাত্র নাথ সোমেশ্বর মহাদেব।’