সোমনাথ সুন্দরী – ৬
৬
অলঙ্কৃত স্তম্ভ সমন্বিত, বৃত্তাকার মর্মর পাথরের বিশাল অঙ্গনকে কেন্দ্র করে সার-সার কক্ষ-প্রকোষ্ঠ সমন্বিত এ স্থান সোমনাথ মন্দির প্রাকারের মধ্যে অবস্থান করলেও অন্য এক প্রাকার দিয়ে মন্দিরের অন্য অংশের থেকে বিচ্ছিন্ন করা আছে। মন্দিরের অন্য আবাসিকদের এ স্থানে প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ না হলেও, কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারি অথবা সহকারী পুরোহিতদ্বয়ের অনুমতি সাপেক্ষে বিশেষ প্রয়োজনে এ স্থানে প্রবেশাধিকার পায় অন্যরা।
মন্দির প্রাকারের অভ্যন্তরে মন্দির সংলগ্ন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো এ স্থান দেবদাসীদের আবাসস্থল। প্রাকার ও কক্ষ বেষ্টিত এই প্রাঙ্গণে দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার তত্ত্বাবধানে নৃত্যগীতের তালিম নেয় দেবদাসীরা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তর মধ্যে সে সময়টুকুতে সূর্যদেবের দহন জ্বালা সহ্য করা সম্ভব নয়, সে সময় ব্যতিরেকে বাকি সময় এ প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে নূপুরের নিক্কণ ধ্বনি, বাদ্যযন্ত্রর শব্দ অথবা সঙ্গীতের মূর্ছনায়।
এ প্রাঙ্গণে উপযুক্ত পারদর্শী হবার পর দেবদাসীদের উপস্থিত করা হয় সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে। প্রাতঃকাল, দ্বিপ্রহর আর সায়াহ্নে দেবদাসীর উপযুক্ত সাজে সজ্জিত হয়ে প্রাঙ্গণের ঈশানকোণে যে সোপানশ্রেণী আছে তা বেয়ে গর্ভগৃহর সামনে গিয়ে উপস্থিত হয় তাদের নাথ, সোমেশ্বর মহাদেবকে তাদের নৃত্যগীত পরিবেশনের জন্য। সন্ধ্যারতি সাঙ্গ হলে দেবদাসীরা যখন ফিরে এসে আপন আপন কক্ষে প্রবেশ করে তখন নৃত্যগীত-কলহাস্য মুখরিত বিশাল এ প্রাঙ্গণে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। জনশূন্য হয়ে যায় প্রাঙ্গণ। শুধু সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসা নোনা বাতাস আর উর্মিমালার শব্দ পাক খায়, কেঁদে ফেরে প্রাকার বেষ্টিত এই প্রাঙ্গণে, অনেকটা ওখানকার বাসিন্দাদের হৃদয়ের মতো।
এদিনও সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে সন্ধ্যারতির নৃত্যগীত পরিবেশন করে নিজেদের কক্ষে ফিরেছে দেবদাসীরা। তারপর ঘুঙুর খুলে রেখে পোশাক পরিবর্তন করে শয্যা গ্রহণ করেছে। অন্ধকার থাকতেই ভোরের আলো ফোটার পূর্ব মুহূর্তে স্বর্ণ শিকলের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও শয্যা ত্যাগ করতে হয়। প্রস্তুতি শুরু হয় তালিম, অনুশীলনের জন্য অথবা সোমেশ্বর মহাদেবকে প্রাতঃকালীন নৃত্যগীত পরিবেশনের জন্য। সারা দিনে তিন সময়ের মধ্যে কারা কখন ভগবানের সামনে নৃত্যগীত পরিবেশন করবে তা নির্ধারণ করে দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা।
পাথুরে কক্ষটি বেশি প্রশস্ত নয়। বাহুল্য বলতে যা বোঝায় তেমন বিশেষ কিছু নেই। কাষ্ঠ নির্মিত, বস্ত্রখণ্ড সমন্বিত সাধারণ এক শয্যা আর সামান্য কিছু তৈজসপত্র রয়েছে কক্ষে। দেওয়াল গাত্রে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি কুলুঙ্গি আছে। তার কোনওটিতে রাখা আছে মন্দির থেকে প্রাপ্ত পোশাক, ঘুঙুরের ছড়া। এ সবই অবশ্য মন্দিরের সম্পত্তি, ব্যক্তিগত কোনও জিনিস নয়। আর একটি বিশেষ কুলুঙ্গিতে চন্দনকাঠের বাক্সর মধ্যে রক্ষিত আছে সেই নীলকণ্ঠ ফুলের শুকনো মালা, দেবতার কাছে দেবদাসীদের নিজেকে সমর্পণের সাক্ষী ওই মালা। যে মালা পরানো ছিল প্রাণনাথ সোমেশ্বর মহাদেবের কণ্ঠে। নাথ নাকি ওই চন্দন পেটিকার মধ্যেই অবস্থান করেন দেবদাসীদের কক্ষে। প্রতি সন্ধ্যায় কক্ষে ফিরে এসে ওই ক্ষুদ্র পেটিকার সামনে প্রদীপ জ্বালায় দেবদাসীরা।
সে প্রদীপের আলো অনেকক্ষণ নিভে গেছে। অন্ধকার কক্ষ। সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের অস্পষ্ট শব্দ প্রাঙ্গণ অতিক্রম করে বন্ধ কপাটের ফাঁক গলে কক্ষে প্রবেশ করছে। প্রায় মধ্যরাত্রি। কোথাও আর কোনও শব্দ নেই।
মাসাধিক কাল অতিক্রান্ত সোমনাথ মন্দিরে আছে রাজশ্রী। দেবতার কাছে উৎসর্গীকৃত সে এখন। তার নামকরণ করা হয়েছে সমর্পিতা। কিন্তু মনের ভিতরে সে এখনও রাজশ্রী থেকে সমর্পিতা হয়ে উঠতে পারছে না কিছুতেই।
সোমেশ্বরের কাছে আত্মনিবেদনের পর নবজন্ম লাভ হয় দেবদাসীদের। পূর্ব জন্মের অর্থাৎ ফেলে আসা জীবনের কথা এখন মনে আনা নাকি পাপ! তেমনই তো বলে অন্যরা। কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারছে না ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। বিশেষত, দিনশেষে এই নিস্তব্ধ রাত্রিগুলোতে সে যখন একা থাকে তখন তার নিজেকে বড় বেশি রাজশ্রী বলে মনে হয়।
ঘুম আসতে চায় না রাজশ্রীর। ঠিক যেমন আজও আসছে না। চালুক্য রাজপরিবারে জন্ম হলেও সে অর্থে রাজকন্যা সে ছিল না। চালুক্য রাজ অম্বুজ তার খুল্লতাত। তারও একটি কন্যা আছে। যদিও তিনিই রাজশ্রীকে তুলে দিয়েছেন সোমেশ্বর মন্দিরে দেবদাসী হবার জন্য।
এর আগে চালুক্য সিংহাসনের অধিপতি ছিলেন রাজশ্রীর পিতামহ ভদ্রসেন। দুই পুত্র ছিল তাঁর। জ্যেষ্ঠ, রাজশ্রীর পিতা অম্বরীষ, কনিষ্ঠ পুত্র অম্বুজ। চালুক্যরাজ ভদ্রসেনের বানপ্রস্থ লাভের পর সিংহাসনে বসার কথা ছিল জ্যেষ্ঠ পুত্র অম্বরীষের। সে ক্ষেত্রে রাজশ্রী হতো রাজকন্যা। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। অভিষেকের কিছু দিন পূর্বে অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীদের হাতে সস্ত্রীক নিহত হলেন অম্বরীষ। কাজেই সিংহাসনে বসলেন অম্বুজ।
রাজশ্রীর পিতা-মাতার যখন মৃত্যু হয় তখন রাজশ্রীর মাত্র পাঁচ বৎসর বয়স। একথা ঠিকই যে রাজপ্রাসাদের এক কোণে বেশ কিছুটা অবহেলাতেই ধাই আর পরিচারিকাদের তত্ত্বাবধানেই সে বড় হয়ে উঠেছিল, তবুও সেখানে উন্মুক্ত বাতাস ছিল, চার দেওয়ালের মধ্যে এমন ঘেরাটোপে আটতে থাকতে হতো না তাকে। প্রাসাদের বাইরে কাছেপিঠে শিবিকাতে চেপে ভ্রমণের অনুমতিও ছিল তার। ছিল চেনা মানুষেরা।
তাদের কেউ কেউ রাজশ্রীর প্রতি সমব্যথীও ছিলেন। যেমন বুড়ি ধাই কিস্কিন্ধ্যা। আর এই প্রাকারবেষ্টিত মন্দির, চারপাশে বহু মানুষজন কাউকেই তার আপন বলে মনে হয় না। অথচ এখানে আসার পর কেউ কোনও ধরনের দুর্ব্যবহার করেনি তার সঙ্গে। কিন্তু রাজশ্রীর কেন জানি মনে হয়, এখানে কেউ কারো নয়। সবাই সহাস্য বাক্যালাপ করলেও আসলে এখানকার সব কিছুই এক অদৃশ্য প্রাণহীন কঠোর অনুশাসনে মোড়া। এখানে সে সারাজীবন কাটাবে কীভাবে? অথচ এটাই কঠিন বাস্তব।
সে এখন দেবদাসী, তার নাথ হলেন সোমনাথ। তিনিই এখন তার একমাত্র আরাধ্য। এই দেবদাসীদের আবাসস্থলই তার জীবনের শেষ আশ্রয়। তার স্বর্গবাসের নিশ্চিত ঠিকানা। কিন্তু এই সত্যটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না রাজশ্রী।
রাজসিংহাসন বা রাজকন্যার অধিকার কোনওদিন দাবি করেনি রাজশ্রী। তাকে যে কোনওদিন এখানে আসতে হবে তাও জানা ছিল না তার। সেদিন হঠাৎই অন্ধকার রাতে প্রাসাদের একপ্রান্তে তার কক্ষের সামনে শিবিকা নিয়ে হাজির হল একদল সৈনিক। তারা তাকে জানাল, চালুক্যরাজের নির্দেশ, শিবিকাতে উঠতে হবে তাকে। রাজি না হলে বলপ্রয়োগ করা হবে।
রাজশ্রীর সেই মুহূর্তে তাদের কথা শুনে মনে হয়েছিল চালুক্যরাজ হয়তো বা তার রাজ্য থেকে বহিষ্কার করতে চাচ্ছেন রাজশ্রীকে। যাতে ভবিষ্যতে তাঁর অথবা তার মনোনীত উত্তরাধিকারীর সিংহাসনের ওপর কারো ক্ষীণতম দাবি না থাকে সে কারণে।
প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তার ছিল না। সে উঠে বসেছিল শিবিকাতে। কাষ্ঠনির্মিত শিবিকার দ্বার বন্ধ করে গোপনে প্রাসাদ ত্যাগ করেছিল রক্ষীরা। তারপর নানা পথ অতিক্রম করে, দীর্ঘ দিবস পরে যখন শিবিকার দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল তখন প্রখর সূর্যালোকে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল রাজশ্রীর।
তাকে শিবিকা থেকে হাত ধরে বাইরে বের করল এক রূপসী নারী, দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা। তাদের কিছুটা তফাতে দণ্ডায়মান ছিলেন মুণ্ডিত মস্তক শিখাধারী সহ প্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুন। তখন অবশ্য তাদের কারোরই নাম পরিচয় জানা ছিল না রাজশ্রীর।
একটু ধাতস্থ হবার পর তার চোখে পড়েছিল বিশাল এক মন্দির, তার শীর্ষদেশে প্রথিত স্বর্ণকলসের মাথায় উড্ডীন জয়ধ্বজ। প্রাকারের ওপর থেকে, মন্দির চত্বর থেকে ভেসে আসছিল জনস্রোতের তীব্র গর্জন। সে সব দেখেশুনে বিস্মিত রাজশ্রী অস্ফুট স্বরে জানতে চেয়েছিল, ‘এ কোন স্থান?’
তিলোত্তমা জবাব দিয়েছিল, ‘এ স্থান প্রভাসপত্তনের সোমেশ্বর মন্দির। নরশ্রেষ্ঠ চালুক্যরাজ তোমাকে সমর্পণ করেছেন মন্দির কর্তৃপক্ষের নিকট। সোমেশ্বর মন্দির কর্তৃপক্ষ ও গুর্জররাজ ভীমদেব, চালুক্যরাজের এই দান গ্রহণ করেছেন।’
বিস্মিত রাজশ্রী জানতে চেয়েছিল, ‘কিন্তু আমি এখানে কী করব?’
‘তুমি দেবদাসী হবে। সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে নিবেদন করা হবে তোমাকে। তিনি নাথ হবেন তোমার। তাকে নৃত্যগীত পরিবেশন করবে তুমি।’ জবাব দিয়েছিল তিলোত্তমা। আর সেদিনের পর থেকেই এই কক্ষ, বাইরের প্রাঙ্গন আর গর্ভগৃহর সমুখভাগে নৃত্যগীত পরিবেশনের স্থানই হল রাজশ্রীর পৃথিবী। সে আর এখন রাজশ্রী নয়। সোমেশ্বর মহাদেবের চরণে সমর্পিত দেবদাসী সমর্পিতা।
প্রদীপের আলো নিভে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু কিছুতেই যেন তার ঘুম আসছে না। কেমন যেন দমবন্ধ লাগছে রাজশ্রীর। তার মনে হতে লাগল অন্ধকারের মধ্যে চারপাশ থেকে পাথুরে দেওয়ালগুলো যেন এগিয়ে আসছে তাকে পিষে ফেলার জন্য! এক সময় সেই পরিস্থিতিতে থাকতে না পেরে শয্যা ত্যাগ করল সে। দরজার কপাট উন্মুক্ত করতেই এক ফালি চাঁদের আলো প্রবেশ করল কক্ষে।
একটু ইতস্তত করে সে বাইরের প্রাঙ্গনে পা রাখল। এক ঝলক শীতল বাতাস তার শরীর স্পর্শ করল। জনশূন্য প্রাঙ্গণ। চারপাশের কক্ষগুলো ঘুমিয়ে পড়েছে। আকাশের চাঁদের আলো প্রাঙ্গণের সর্বত্র প্রবেশ করছে না, স্তম্ভগুলোর পাদদেশে জমাট বাঁধা অন্ধকার। সমুদ্রের দিক থেকে জলোচ্ছ্বাসের গর্জন আর নোনা বাতাস ভেসে আসছে। সেদিকে প্রাকারের গায়ে ছোট একটি পাথরের বেদি আছে ছত্রী সমেত। সেখানে বসে অনুশীলনের সময় পরিশ্রান্ত দেবদাসীরা বিশ্রাম নেয়। সেই বেদির ওপর উঠে দাঁড়ালে প্রাকারের ওপাশে সমুদ্র দর্শন হয়।
ধীর পায়ে রাজশ্রী এগিয়ে গেল সেই বেদির দিকে। সমুদ্র গর্জন ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বেদির উপর উঠে দাঁড়িয়ে প্রাকারের বাইরে উঁকি দিল সে। চাঁদের আলোতে দৃশ্যমান মহাসমুদ্র। তরঙ্গমালা এসে তটরেখা অতিক্রম করে আছড়ে পড়ছে প্রাকারের গায়ে। তারা ভরা আকাশের নীচে সাপের মাথার মণির মতো ঢেউয়ের মাথায় চাঁদের প্রতিবিম্ব নাচতে নাচতে এগিয়ে এসে ভেঙে পড়ছে প্রাকারে। পরমুহূর্তেই আবার নতুন তরঙ্গমালা এগিয়ে আসছে চাঁদের মুকুট মাথায় নিয়ে।
কিছুটা তফাতে চাঁদের আলোতে জেগে আছে সেই পাথুরে স্তম্ভটা। তার অর্ধেকাংশ বর্তমানে জোয়ারের জলে নিমজ্জিত। রাজশ্রী এখানে আসার পর শুনেছে ওই স্তম্ভই নাকি পৃথিবীর ভূমিভাগের শেষ সীমানা! সেই স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে রাজশ্রীর মনে হল, যৌবনে পদার্পণ করার সঙ্গে-সঙ্গেই কি বিধাতা পুরুষ ওই স্তম্ভর মতোই তাকে জীবনের প্রান্ত সীমায় পৌঁছে দিলেন?
বেশ কিছুটা সময় চন্দ্রালোকের নীচে তরঙ্গমালার দিকে চেয়ে রইল সে। সেই আদি-অন্তহীন জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আর সমুদ্রর দিক থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাসে অঙ্গ ভিজিয়ে এক সময় মনের অস্থিরতা যেন কিছুটা প্রশমিত হল তার।
তালিম, দেবতার সমুখে সন্ধ্যারতি পরিবেশন এসবে পরিশ্রম কম হয়না শরীরের। তার ওপর আবার এদিন সন্ধ্যারতির সময় সমর্পিতার একক নৃত্য ছিল। এবার যেন ঘুম ভাবও নেমে আসতে লাগল তার চোখে। বেদি থেকে নেমে রাজশ্রী পা বাড়াল নিজের কক্ষে ফেরার জন্য।
কিন্তু কয়েক পা এগিয়ে একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। কিছুটা তফাতে প্রাকারের গায়ে মেঝের কাছে একটা বেশ বড় ছিদ্র আছে। প্রাঙ্গণের ধৌত কার্য সম্পন্ন হলে সে পথে জল প্রাঙ্গণের বাইরে নিষ্কাশিত হয়। শব্দ শুনে রাজশ্রী তাকিয়ে দেখল সে পথ দিয়ে সরিসৃপের মতো প্রবেশ করছে একটা দেহ! বুকে হেঁটে অঙ্গনে প্রবেশ করে দু-পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে।
এক নারীমূর্তি! যদিও তার মুখ অবগুণ্ঠনে আবৃত। সতর্ক দৃষ্টিতে চার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে হয়তো-বা সে প্রাঙ্গণ সংলগ্ন কোনও কক্ষর দিকে এগোতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই তার চোখ পড়ে গেল তার হাত পাঁচেক তফাতে থামের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাজশ্রীর ওপর। তাকে দেখে যেন কেঁপে উঠল সেই নারী। হঠাৎ কোনও গোপন কার্য সম্পাদনের সময় কারো চোখে ধরা পড়ে গেলে যেমন হয়।
অবগুণ্ঠন সেই কাঁপনের ফলে সরে গেল তার মুখ থেকে। রাজশ্রী চিনতে পারল তাকে। এ নারীর সঙ্গে তেমন বাক্যালাপের সুযোগ না ঘটলেও তার সঙ্গে একদিন সম্মিলিত নৃত্য প্রদর্শন করেছে সমর্পিতা। তার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে ও একজন দেবদাসী। তার নাম উত্তরা। সে ও চিনতে পারল তাকে। বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘সমর্পিতা তুমি!’
সমর্পিতাও গভীর রাত্রে এভাবে তাকে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দেখে কম বিস্মিত হয়নি। সে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আমি। ঘুম আসছিল না তাই প্রাঙ্গণে বেরিয়েছিলাম।’
একথা বলার পর সে কৌতূহল নিরসনের জন্য প্রশ্ন করল, ‘তোরণ পথে প্রবেশ না করে ছিদ্রপথ দিয়ে ওভাবে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলে কেন?’
উত্তরা বুঝতে পারল এই নবাগতা সমর্পিতার চোখে সে ধরা পড়ে গেছে। তার আবির্ভাবের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে সে। একটু ইতস্তত করে উত্তরা জবাব দিল, ‘তোরণ তো বন্ধ থাকে। তাছাড়া এই তোরণ তো অতিক্রম করার অনুমতি নেই কারও। ব্যতিক্রম একমাত্র দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা।’
সমর্পিতা মৃদু হেসে বলল ‘ওই জল নিষ্কাশন ছিদ্রই বুঝি তবে বাইরে যাবার পথ?’
উত্তরা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, ওই ছিদ্রই তো জীবনের সঙ্গে আমাদের একমাত্র যোগসূত্র। বেঁচে থাকার একমাত্র রাস্তা।’
সমর্পিতা মৃদু বিস্মিত ভাবে জানতে চাইলে, ‘এ কথার মানে?’
উত্তরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘প্রায় দশ বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে আমি এই চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ। আমার যখন দ্বাদশ বৎসর বয়স তখন অবন্তী রাজ্য থেকে এক শ্রেষ্ঠী আমাকে এক দাসের হাট থেকে ক্রয় করে গুর্জর প্রদেশে এনে উপহার দেয় রাজা কুমারপালকে। আমি ষোড়শ বর্ষে পদার্পণ করলে রাজা আমাকে সোমেশ্বর মন্দির কর্তৃপক্ষর হাতে তুলে দেয়। তারপর থেকে আমি এখানেই আছি।
অন্ধকার রাত হলেও ওই ছিদ্রপথই আমাকে বাইরের পৃথিবীর আলো দেখায়। শুধু আমি নয়, হয়তো-বা আরও কাউকে কাউকে। যারা আমার তোমার মতো বন্দি জীবন কাটাচ্ছে এখানে। ওই বহির্নির্গমনের গোপন পথ না থাকলে এতদিনে হয়তো পাগল হয়ে যেতাম। আহার গ্রহণই তো শেষ কথা নয়, মন আর শরীর বলেও তো কিছু আছে।’ একটানা কথা বলে থামল উত্তরা।
সমর্পিতা বুঝল তার মধ্যে যে দমবন্ধ করা মানসিক ভাব আছে তা হয়তো এখানে সবার মধ্যে চাপা আছে। সে জানতে চাইল, ‘ওই জল নির্গমনের পথ দিয়ে যে আসা-যাওয়া করা হয় তা তিলোত্তমা বা পুরোহিতরা জানেন?’
প্রশ্ন শুনে দেবদাসী উত্তরার ঠোঁটের কোণে আবছা একটা হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, ‘তারা জানুন বা না জানুন, ধরা পড়লে কিন্তু নিস্তার নেই। ভয়ঙ্কর শাস্তি অপেক্ষা করে থাকে তার জন্য। একবার সেবায়েত প্রধানের হাতে ধরা পড়ে গেছিল এক দেবদাসী। যেই না সে ওই ফোঁকর গলে বাইরে বেরিয়েছে অমনি একদল সেবায়েত ধরে ফেলল তাকে। পুরোহিতরা শাস্তি বিধান করল তার। তিন দিন ‘কীট কক্ষে’ বাস করতে হবে তাকে।
এই চত্বরের নীচে একটা ভূগর্ভস্থ কক্ষ আছে তার নাম ‘কীট কক্ষ’। বৃশ্চিক, নানা ধরনের বিষাক্ত কীট পরিপূর্ণ কক্ষ। সেখানে নামিয়ে দেওয়া হল সেই দেবদাসীকে। তিনদিন পর তাকে যখন সেখান থেকে ওপরে উঠিয়ে এনে এই চত্বরে আমাদের সামনে হাজির করা হয়েছিল, তখন তাকে দেখে শিউরে উঠেছিলাম সবাই। সারা শরীরে তার কীটের বীভৎস দংশন চিহ্ন। চোখের মণি, স্তনবৃন্ত সবই খুবলে খেয়েছে কীটের দল। মেয়েটা বাঁচেনি। বাঁচার কথাও নয়। প্রাঙ্গণে তাকে শোয়াবার পর একবার সে প্রাণভরে শ্বাস নিয়েছিল, তারপর চিরজীবনের জন্য মুক্তি পেয়েছিল এই বন্দি জীবন থেকে।’
উত্তরার কথা শুনে সেই হতভাগ্য নারীর কথা মনে করে যেন শিউরে উঠল সমর্পিতার শরীর।
সে বলল, ‘তবু তোমরা বাইরে যাও?’
উত্তরা মৃদু হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, যাই। সেই ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা অবগত হওয়া সত্ত্বেও যাই। নইলে হয়তো উন্মাদ হয়ে যেতে হবে। যেমন অনেকে ইতিপূর্বে হয়েছে।’
জবাব দেবার পর উত্তরা বলল, ‘এবার আমি কক্ষে প্রবেশ করি। আর কক্ষের বাইরে থাকা সমিচীন নয়। আশা করি আমাদের এই কথোপকথন অন্যদের থেকে গোপন রাখবে। তুমি নিশ্চই চাইবে না যে আমাকেও কীট কক্ষে নিক্ষেপ করা হোক?’
সমর্পিতা জবাব দিল, ‘তুমি নিশ্চিত থাকো, আমাদের এই সাক্ষাৎ বা কথোপকথনের কথা কোথাও প্রকাশ পাবে না।’ সমর্পিতার জবাব শুনে আশ্বস্ত হয়ে মৃদু হেসে প্রাঙ্গণ সংলগ্ন এক কক্ষের দিকে এগিয়ে নিঃশব্দে সেই কক্ষের ভিতর অদৃশ্য হল দেবদাসী উত্তরা। আর রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতাও ফিরে এল তার কক্ষে।
