সোমনাথ সুন্দরী – ৭
৭
সোমেশ্বর মন্দিরে বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়েছে অঙ্গিরার। মন্দিরে কোনও ধরনের কর্ম সম্পাদন তাকে করতে হয় না। নিজ কক্ষে বিশ্রাম নেয়, কখনও-বা বিশাল প্রাকার বেষ্টিত নানা স্থানে ঘুরে বেড়িয়ে নানা কর্মযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে। প্রত্যুষে অথবা বৈকালে কখনও কখনও বা সে সমুদ্র তীরে যায়। তবে সূর্যাস্তের পূর্বেই আবার সে মন্দিরে ফিরে আসে। গর্ভগৃহর অঙ্গণে নিয়মিত সন্ধ্যারতি প্রত্যক্ষ করে অঙ্গিরা। মাঝে একবার একদিন নগর পরিভ্রমণেও বেরিয়ে ছিল সে। পুরাণকথিত প্রাচীন নগরী দেওপত্তন বা প্রভাসপত্তন। বলা যেতে পারে সোমেশ্বর মন্দিরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় প্রভাসপত্তনের নগর জীবন।
ছোট-বড় অন্য নানা মন্দিরও আছে প্রভাসপত্তনে। সেই মন্দিরগুলোতে নানারূপে পূজিত হন সোমেশ্বর মহাদেব। কাষ্ঠ এবং ইষ্টক নির্মিত বহু অট্টালিকা হর্ষপ্রাসাদও আছে নগরীতে। সেগুলি ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাসস্থান। তাদের অধিকাংশই হয় সোমনাথ মন্দিরের পুরোহিত সম্প্রদায়ের মানুষ অথবা শ্রেষ্ঠী।
মন্দিরে এই শ্রেষ্ঠীকূল নানা ধরনের পণ্য সরবরাহ করেন, সোমেশ্বর মহাদেবকে দর্শনের জন্য প্রত্যহ এ নগরীতে বহিঃদেশ থেকে আসা যে বিপুল জনসমাগন হয়, তাদেরও বিভিন্ন পণ্য বিক্রয় করে তারা। অর্থাৎ নগরীর ধনাঢ্যকুল কোনও না কোনও ভাবে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত সোমেশ্বর মন্দিরের সঙ্গে।
দূর থেকে সোলাঙ্কি গুর্জর রাজার প্রাসাদও দেখেছে সে। কাষ্ঠ আর ইষ্টক নির্মিত বিশাল প্রাসাদ। স্বর্ণমণ্ডিত তার শীর্ষদেশ। কারুকাজ করা বিশাল তোরণের দু-পাশে সারবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে হস্তিযুথ। রণহস্তি সব। দূর থেকে তাদের বৃংহণ শোনা যায়। তবে পরিখা আর রক্ষীপরিবৃত গুর্জররাজ্যের প্রাসাদের কাছে সাধারণ নাগরিকদের ঘেঁষতে দেওয়া হয় না। অনেক তফাত থেকেই মানুষকে হঠিয়ে দেয় খড়গধারী, বর্ম-শিরস্ত্রাণ, চর্মপাদুকা পরিহিত রাষ্ট্রদল।
নগরীর কেন্দ্রস্থল কিন্তু বেশ ঘিঞ্জি। নানা জাতের নানা মানুষের ভিড় আর কোলাহল মণ্ডিত পথের দু-পাশে অজস্র বিপণি। স্বর্ণ, রৌপ্য ইত্যাদি মূল্যবান ধাতুখণ্ডর বিপণি থেকে শুরু করে মৃৎপাত্র, ফুল, ধূপ, পিষ্টক, নানা দ্রব্য সাজিয়ে বসে থাকে বিক্রেতারা।
জনতার ভিড় ঠেলে ঘুরে বেড়ায় মহাদেবের বাহন বিশালাকৃতির সব ষণ্ডরা। তাদের কারো কারো শৃঙ্গ আবার সোনা, রূপা ইত্যাদি মূল্যবান ধাতু দিয়ে বাঁধানো। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা তাদের মনষ্কাম পূর্ণ হলে সোমেশ্বরের বাহনের শৃঙ্গ আবৃত করে দেয় মূল্যবান স্বর্ণে। অনেক সময় এমনও হয় যে কোনও ক্ষিপ্ত ষণ্ডর শৃঙ্গের প্রচণ্ড আঘাতে কোনও পথচারীর মৃত্যু ঘটলে তার নিশ্চিত স্বর্গবাস হয়েছে মনে করা হয়।
এ নগরীতে মহাদেবের বাহন হিসাবে পূজিত হন ষণ্ডকূল। আর আছে পথপার্শ্বে অসংখ্য ভিক্ষুক-ভিক্ষুণী। অন্ধ, খঞ্জ, কুঁজো, কেউ বা কুষ্ঠরোগ- গ্রস্থ অথবা বার্ধক্যে জর্জরিত। তাদের মধ্যে যে কেউ ছদ্মরোগ বা জরাগ্রস্থ নেই তা হলফ করে বলা যায়না। পথের দুপাশে সারবেঁধে বসে সুর করে আর্তনাদ করতে করতে ভিক্ষা চায় তারা। কখনও বা আবার তারা অভিসম্পাতের ভয়ও দেখায় পুণ্যার্থীদের। মাঝে-মাঝেই মন্দিরে পূজা দিতে আসা পুণ্যার্থীদের ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে পুরোহিত-ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠীকুলের নিজেদের মধ্যে রাজপথে বিবাদ বিসংবাদ দেখা যায়।
ভ্রাম্যমান শান্তিরক্ষা বাহিনীর কর্মীরা সে সব বিবাদ-বিসংবাদ, গোষ্ঠী-কলহ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রয়োজনে যষ্ঠী সঞ্চালনও করে জনতাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে। মূল নগরীর হম্যরাজির আড়ালে নাকি বিত্তহীন মানুষদের পর্ণকুটিরগুলি অবস্থিত। সে সব অবশ্য দেখা হয়নি অঙ্গিরার। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের থেকেও আর কোন ডাক আসেনি তার।
সেদিন বৈকালে অঙ্গিরার যখন ঘুম ভাঙল তখন সমুদ্রের বুকে সূর্য ঢলতে শুরু করেছে। সন্ধ্যারতি দেখতে যেতে হবে তাকে। কিন্তু তা আরম্ভ হতে বেশ কিছু বিলম্ব আছে। অঙ্গিরার অস্ত্র-বর্ম তাকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। ধনুকটা নিয়ে পরীক্ষা করতে বসল যে। ছিলাতে মৃদু টান দিতেই তার টঙ্কারে বদ্ধ কক্ষে গুরু গম্ভীর নাদের সৃষ্টি হল। ধনুকটা হাতে নিয়ে অঙ্গিরা ভাবল, প্রধান পুরোহিত তাকে কবে অস্ত্র পরীক্ষার জন্য ডাকবেন? তা ছাড়া বল্লভী থেকে চিরন্তনপীঠে যাত্রা করার পর একদিনের জন্যও অস্ত্র অনুশীলন করার সুযোগ পায়নি সে। সেটাও করা প্রয়োজন। প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে নিজেই সাক্ষাৎ করে তার অস্ত্র অনুশীলনের জন্য একটি স্থান নির্বাচন করে দেবার আবেদন জানাবে। বিশাল মন্দির চত্বরে প্রাকারের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় কানন বা উন্মুক্ত অঞ্চল আছে যেখানে বহিরাগতরা প্রবেশ করে না। অস্ত্র-অনুশীলনের তেমন কোনও স্থান যদি প্রধান পুরোহিত নির্দিষ্ট করে দেন।
ব্যাপারটা হয়তো নিছকই কাকতালীয়, কিন্তু একথা ভাবতে ভাবতেই বাইরে থেকে কপাটে আঘাতের শব্দ শোনা গেল। ধনুক নামিয়ে রেখে দ্বার উন্মোচন করে অঙ্গিরা দেখল সেবায়েত প্রধান উপস্থিত হয়েছেন সেখানে। তিনি তাকে বললেন, ‘প্রধান পুরোহিত আপনাকে এখন আজ্ঞা দিয়েছেন।’
পোশাক পরিবর্তন করে সেবায়েত প্রধান বিষধারীর সঙ্গে পুরোহিতশ্রেষ্ঠর নির্দেশ পালনে চলল অঙ্গিরা। কক্ষের দ্বার উন্মোচন করলেন ত্রিপুরারিদেব। বিষধারী, যুবককে প্রধান পুরোহিতের কাছে সমর্পণ করে অন্যত্র চলে গেলেন। ত্রিপুরারিদেবকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম জানিয়ে তার কক্ষে প্রবেশ করল অঙ্গিরা। আগের দিনের মতোই দোর বন্ধ করে মুখোমুখি বসলেন তারা। পুরোহিতশ্রেষ্ঠ প্রথমে তার কাছে জানতে চাইলেন, ‘এখানে থাকতে তোমার কোনওরূপ সমস্যা হচ্ছে না তো? অর্থের আর প্রয়োজন আছে কি?’
অঙ্গিরা হেসে জবাব দিল, ‘না, কোনওরূপ সমস্যার সম্মুখীন হইনি প্রভু। আর আপনি যে অর্থ আমাকে প্রদান করেছেন তার সম্পূর্ণটাই আমার কাছে রয়ে গেছে। তা ব্যয় করার কোনও উপায় খুঁজে পাইনি। আমার সামান্য যেটুকু প্রয়োজন তা সবকিছুই তো সেবায়েতরা আমার কক্ষে পৌঁছে দেন।’
অঙ্গিরার জবাব শুনে পুরোহিতশ্রেষ্ঠ মৃদু হাসলেন। এরপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, আর একটি সপ্তাহ পর পূর্ণিমা। তোমাকে তো বলেইছি যে ওই দিন তোমার মস্তক মুণ্ডণ করে দেবতার কাছে তোমাকে উৎসর্গ করা হবে। তার আগে আমি তোমার ধনুর্বাণ-বিদ্যার সেই কৌশল চাক্ষুষ করতে চাই। যে দায়িত্ব তোমার ওপর অর্পিত হতে চলেছে, সে কাজের দায়িত্ব অর্পণের পূর্বে আমার একবার সেই বিশেষ অস্ত্রবিদ্যায় তোমার পারদর্শিতা পরীক্ষা করে নেওয়া প্রয়োজন। কাল মধ্যযামে আমি সে পরীক্ষা গ্রহণ করব। তুমি প্রস্তুত থেকো। নির্দিষ্ট সময় আমি তোমার কক্ষে উপস্থিত হব।’
প্রধান পুরোহিতের কথা শুনে অঙ্গিরা বললেন, ‘আপনি যেমন আজ্ঞা করবেন দেব। আমি প্রস্তুত থাকব। আপনার কাছে আমার একটা নিবেদনও আছে। আমার তিরন্দাজি অনুশীলনের জন্য আপনি যদি কোনও স্থান নির্বাচন করে দেন তবে উপকৃত হই।’
ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘হ্যাঁ, সে স্থানও আমি নির্বাচন করে দেব রাত্রিতেই। যাতে তোমার কার্যভার গ্রহণের পূর্বে নিজেকে যথাসম্ভব অস্ত্রচালনাতে দক্ষ করে তুলতে পারো তুমি।’
এ কথা বলার পর ত্রিপুরারিদেব আরও কিছু কথা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু ঠিক সেই সময় কক্ষের মধ্যে ঘণ্টাধ্বনির শব্দ হলো। কক্ষে তো তারা দুজন ব্যতীত অন্য কেউ নেই, তবে ঘণ্টাধ্বনি হচ্ছে কী ভাবে? থেমে থেমে বেজে উঠছে শব্দটা।
অঙ্গিরা বিস্মিতভাবে চারপাশে তাকিয়ে সেই শব্দের উৎস আবিষ্কার করে ফেলল। কক্ষের একপাশের দেওয়ালের মাথার দিকের এককোণে ঝোলানো আছে একটা ক্ষুদ্রাকৃতি ঘণ্টা। সেটাই কেঁপে কেঁপে বেজে উঠছে। রজ্জুবাহিত সেই ঘণ্টার রজ্জুতে বাইরে থেকে টান দিচ্ছে কেউ। ঘণ্টা বাজছে। ত্রিপুরারিদেবও কথা থামিয়ে চেয়ে আছেন সেই ঘণ্টার দিকেই।
নিজের অজান্তেই যেন অঙ্গিরা প্রশ্ন করে বসল, ‘ও কীসের ঘণ্টা?’
অঙ্গিরার প্রশ্ন শুনে যেন সম্বিত ফিরল ত্রিপুরারিদেবের। অঙ্গিরার মনে হল প্রধান পুরোহিতের মুখমণ্ডলে মুহূর্তের জন্য কেমন যেন অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল। তিনি অঙ্গিরার প্রশ্নর সরাসরি কোনও জবাব না দিয়ে বললেন, ‘এই ঘণ্টাধ্বনির বিষয়টা তেমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। এবার তুমি যাও। আগামী রাত্রির ব্যাপারটা সম্বন্ধে তোমাকে অবগত করার জন্যই তোমাকে আহ্বান জানিয়েছিলাম।’ এই বলে আসন ত্যাগ করে দ্বার উন্মুক্ত করলেন প্রধান পুরোহিত। তাকে প্রণাম জানিয়ে কক্ষত্যাগ করল অঙ্গিরা। ত্রিপুরারিদেব কপাট বন্ধ করলেন ঠিকই, কিন্তু অঙ্গিরা বাইরে থেকে শুনতে পেল কক্ষের ভিতর অস্থির ভাবে বেজে চলেছে সে ঘণ্টা।
কিছু সময় পরই সন্ধ্যারতি শুরু হবে। নিজ কক্ষে ফিরে এখন আর কোনও কার্য নেই। অঙ্গিরা তাই নীচে না নেমে এগোল গর্ভগৃহ চত্বরের দিকে। পুণ্যার্থীদের দল চত্বর থেকে নীচে নেমে গেছে। রয়েছে শুধু কিছু কর্মরত সেবায়েত আর রক্ষীদের দল। অঙ্গিরা এগোচ্ছিল সেই স্থান দিয়ে যেখানে পুণ্যার্থীদের দানসামগ্রী, মুদ্রা ইত্যাদি থলেবন্দি করা হচ্ছিল। রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ সে কাজের তত্ত্বাবধান করছিলেন। তাকে দেখে থামল অঙ্গিরা। কুশল বিনিময়ের পর জয়দ্রথ বললেন, ‘সন্ধ্যারতি দর্শনে যাচ্ছেন তো? কিছু সময়ের মধ্যে আমিও আসছি।’
এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘আপনাকে একটা জিনিস দেখাই। এই দেখুন।’ কর উন্মুক্ত করলেন জয়দ্রথ। তার তালুতে রাখা বেশ বড় একটা স্ফটিক খণ্ডর মতো দেখতে জিনিস। তবে তার ঔজ্জ্বল্য স্ফটিক খণ্ডর থেকে বেশি।
অঙ্গিরা বলল, ‘কী এটা? বিশেষ ধরনের স্ফটিক?’
রক্ষীপ্রধান হেসে জবাব দিলেন, ‘স্ফটিক নয়, পল না কাটা হীরক খণ্ড।’
এ জিনিস আগে দেখেনি অঙ্গিরা। বিস্মিতভাবে হীরক খণ্ডর দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘এই দুর্মূল্য জিনিস কে দান করলেন?’
জয়দ্রথ জবাব দিলেন, ‘জানা নেই। কত মানুষই তো আসেন। তাদের মধ্যে অনেকে দেবতাকে যা উৎসর্গ করেন তা অন্যকে জানতে দিতে চান না। তেমনই কেউ এই হীরক খণ্ড দানপাত্রে ফেলে গেছেন। এটা এবার প্রধান পুরোহিতের কাছে জমা দেব। তিনি নির্দিষ্ট স্থানে এটি গচ্ছিত রাখবেন।’ কথাগুলো বলে রক্ষীপ্রধান পা বাড়াল সেদিকে, যেদিকে প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের বাসস্থান। আর অঙ্গিরাও গিয়ে উপস্থিত হল গর্ভগৃহর কাছে। সহপ্রধান পুরোহিত নন্দিবাহনের তত্ত্বাবধানে তখন সেখানে সন্ধ্যারতির প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে।
অঙ্গিরা একটা ব্যাপার আজকাল খেয়াল করছে, সূর্যাস্তের সময় হলেই এ স্থানে আসার জন্য কেমন জানি চঞ্চল হয়ে ওঠে তার মন! বিশেষত সমর্পিতা নাম্নি দেবদাসীর নৃত্য পরিবেশন যেন একটা ঘোর লাগিয়ে দেয় অঙ্গিরার মনে। হয়তো বা তার নৃত্যর প্রতি আকৃষ্ট হয়েই সন্ধ্যারতির সময় এখানে ছুটে আসে অঙ্গিরা।
অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপ জ্বলে উঠতে শুরু করল। আলোক মালাতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগল গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণ। সেখানে উপস্থিত হতে শুরু করল বাদ্যকারের দল। তারপর তিলোত্তমার সঙ্গে উপস্থিত হল দেবদাসীর দল।
প্রদীপের আলোতে ঝলমল করছে তাদের উজ্জ্বল রেশম বস্ত্র, সোনালি জরি বসানো উদ্ধত বক্ষবন্ধনী। স্বর্ণখচিত কবরী কাঁটা। তাদের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই মৃগনাভির সৌরভে ভরে উঠল বাতাস।
সেই রূপসীদের দলের মধ্যে অঙ্গিরার চোখ খুঁজে পেল সমর্পিতাকে। দেবদাসীদের যে দলটা আজ নৃত্য প্রদর্শনের জন্য উপস্থিত হয়েছে তার একদম শেষ ভাগে একটা থামের গায়ে হাত রেখে আনত দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে সে।
অঙ্গিরা তাকে দেখে আশ্বস্ত হল। এরমধ্যে একদিন সন্ধ্যারতির সময় উপস্থিত ছিল না সমর্পিতা। অন্য নারীরা সেদিন নৃত্য পরিবেশন করলেও অঙ্গিরার যেন মনে হয়েছিল সেদিনের নৃত্য পরিবেশন কেমন যেন জৌলুশহীন। সমর্পিতার পরণে রেশমের নীলাম্বরী। নীলকণ্ঠ মহাদেবের প্রিয় রঙ।
সুগন্ধী ধূপের ধোঁয়াতে ভরে উঠল গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণ। ঘণ্টাধ্বনি শুরু হল। প্রদীপদণ্ড উঠিয়ে নিয়ে আরতি শুরু করলেন নন্দিবাহন। গর্ভগৃহ চত্বর থেকে নীচের প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সেই ঘণ্টাধ্বনি আর নন্দিবাহনের গম্ভীর ভরাট গলার মন্ত্রোচ্চারণ।
ঘণ্টাধ্বনি থামল এক সময়। সন্ধ্যারতি সাঙ্গ করে নন্দিবাহন প্রদীপদণ্ড নামিয়ে রাখতেই শুরু হল নিক্কণ ধ্বনি। শুরু হল দেবদাসীর সমবেত নৃত্য। তবে সে দলের মধ্যে সমর্পিতা নেই। সে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে স্তম্ভর গায়ে। তার দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরার মুহূর্তের জন্য মনে হল কেমন যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা তার মুখমণ্ডলে জেগে আছে!
কয়েকটি দলের সমবেত নৃত্য প্রদর্শনের পর অবশেষে গর্ভগৃহর সামনে একক নৃত্য পরিবেশনের জন্য আবির্ভূত হল সমর্পিতা। অন্য দেবদাসীরা অর্ধবৃত্ত রচনা করে ঘিরে দাঁড়াল তাকে। শুরু হলো তার নৃত্য প্রদর্শন। প্রথমে ধীর লয়ে, তারপর ক্রমশ দ্রুত হতে শুরু করল তার নৃত্য বিভঙ্গ। তার ক্ষিপ্র পদচারণা আর ঘুঙুরের শব্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল গর্ভগৃহের অঙ্গণ। যেন এ কোনও মানবশরীর নয়, ঘূর্ণায়মান এক নীল তড়িৎশিখা আবর্তিত হচ্ছে অঙ্গিরার চোখের সামনে।
শুধু অঙ্গিরাই নয়, বিমোহিত অন্য দর্শকরাও। পুরোহিত নন্দিবাহন, রক্ষী প্রধান জয়দ্রথ, সেবায়েত-প্রধান বিষধারী সবাই নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সেই অপূর্ব নৃত্যশৈলীর দিকে। নানা বিভঙ্গে অনেক সময় প্রকট হয়ে উঠছে নর্তকীর শরীরের আহ্বান। চকিতের জন্য উঁকি দিয়ে যাচ্ছে সুডৌল ডিম্বাকৃতি স্তন যুগলের মধ্যে গাঢ় বক্ষ বিভাজিকা অথবা ঘূর্ণায়মান বস্ত্র খণ্ডের আড়াল থেকে গভীর নাভিকূপ। আর তা হয়তো গোপনে কামের আগুন জাগিয়ে তুলছে কোনও কোনও পুরুষের মনে।
নারী শরীরের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তর জন্য হয়তো বা চকচক করে উঠছে কোনও পুরুষের চোখ। অঙ্গিরার অবশ্য সে-সব কিছু নয়, মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল সমর্পিতার অপূর্ব, অসামান্য নৃত্য। কিন্তু এক সময় সমর্পিতার নৃত্য সমাপ্তির পর্যায়ে পৌঁছল।
সব কিছুই তো শেষ হয় এক সময়। তার নৃত্যকলা সাঙ্গ করার আগে সমর্পিতা যখন তার পদযুগল দিয়ে শেষ বারের জন্য আঘাত হানল ভূমির পর, ঠিক সেই সময় কি যেন একটা সেদিক থেকে সবার অলক্ষে ঠিকরে এসে পড়ল কিছুটা তফাতে অঙ্গিরার গায়ে। প্রাথমিক অবস্থাতে সে ব্যাপারটা যেন ঠিক খেয়াল করেও খেয়াল করল না।
স্তব্ধ হল সমর্পিতার নৃত্য আর বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। সোমেশ্বর মহাদেবের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে অন্য দেবদাসীদের সঙ্গে সমর্পিতা গর্ভগৃহ চত্বর থেকে এগোল সেই সোপানশ্রেণীর দিকে। যে সিঁড়ি বেয়ে তাদের আবাসস্থল থেকে সন্ধ্যারতির জন্য ওপরে উঠে এসেছিল তারা। কিন্তু অঙ্গিরার মনে হতে লাগল যেন নেচেই চলেছে দেবদাসী সমর্পিতা!
অঙ্গিরার বিভ্রম যখন কাটল ততক্ষণে দেবদাসীর দল অন্তর্হিত হয়েছে মন্দির চত্বর থেকে। গর্ভগৃহর তোরণ বন্ধ করছেন সহ প্রধান-পুরোহিত নন্দিবাহন। এবার ফিরতে হবে অঙ্গিরাকে। সে এগোতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ-ই তার নজর পড়ল তার পায়ের সামনে পড়ে থাকা ক্ষুদ্রাকৃতি একটা বস্তুর ওপর। যেটা একটু আগে ছিটকে এসে পড়েছিল তার শরীরে।
ভূমি থেকে জিনিসটা কুড়িয়ে নিল সে। মৃদু শব্দ হল সেটা থেকে। একটা ঘুঙুর দানা! দেবদাসী সমর্পিতার পায়ের ঘুঙুরের ছড়া থেকে ছিন্ন হয়ে ছিটকে সেখানে এসে পড়েছে। অঙ্গিরা সেটা নিয়ে কি করবে তা বুঝে উঠতে পারল না। সে কি সেটা ফেলে দেবে, নাকি কারো হাতে সমর্পণ করবে?
তবে সেই ঘুঙুরদানা হাতে নিয়ে অঙ্গিরার মনে কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হল। এই ঘুঙুরদানাই তো কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সংযুক্ত ছিল ওই জীবন্ত উর্বশীর শরীরের সঙ্গে! কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাবে অঙ্গিরা দাঁড়িয়েছিল ঘুঙুরদানাটা হাতে নিয়ে।
নন্দিবাহন কপাট বন্ধ করছেন। প্রদীপের আলোগুলো নিভুনিভু হয়ে এসেছে। সবার উদ্দেশ্যে রক্ষী প্রধান জয়দ্রথের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘এবার সবাই এ স্থান ত্যাগ করুন।’
সে কথা শুনে অঙ্গিরা সেই ঘুঙুরদানা মুঠিতে নিয়ে সোপানশ্রেণীর দিকে এগোল নীচে নামার জন্য। কক্ষে ফিরে এল অঙ্গিরা। ঘুঙুরদানাটাকে কুলুঙ্গিতে রেখে কিছু সময় সমর্পিতা নামে সেই দেবদাসীর অপূর্ব নৃত্যর কথা ভাবতে ভাবতে বেশ কিছু সময় অতিক্রম করল। তখনও যেন তার ঘোর কাটেনি সম্পূর্ণভাবে। প্রদীপের আলোতে চিকচিক করছে কুলুঙ্গিতে রাখা ঘুঙুরদানাটা। প্রদীপের আলো যখন স্তিমিত হয়ে এল তখন রাতের আহার সাঙ্গ করে শয্যা গ্রহণ করল অঙ্গিরা। আলো নিভে গেল। বাইরে নিস্তব্ধ পৃথিবী। ঘুম নেমে এলো তার চোখে। রাত গভীর হতে শুরু করল। ঘুমের মধ্যেও সে স্বপ্ন দেখতে লাগল তার সামনে নেচে চলেছে সোমনাথ সুন্দরী সমর্পিতা।
ঠিক মধ্যরাতে কক্ষ ত্যাগ করলেন সোমেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। অঙ্গিরার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় থেকে ক্ষুদ্র ঘণ্টাটা বহুবার বেজেছে। কিছু সময় আগেও বেজেছে। কয়েক রাত আগেইতো তিনি সাক্ষাৎ করে এসেছেন তার সঙ্গে। তাকে বুঝিয়ে এসেছেন তার মুক্তি আসন্ন। তবে সেই অন্ধকারের প্রহরীর হঠাৎ কি এমন প্রয়োজন পড়ল যে, সে অবিরত ঘণ্টাধ্বনি করে আহ্বান জানিয়ে চলেছে প্রধান পুরোহিতকে?
তিনি হাজির হলেন গর্ভগৃহর তোরণের সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে দ্বার উন্মোচনের আগে একবার তাকালেন চারপাশে আর নীচের চত্বরের দিকে। ঘুমন্ত মন্দির চত্বর। অন্তত আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই। আকাশে মেঘ দেখা দিচ্ছে। চাঁদ থাকলেও তাকে মাঝে মাঝে ঢেকে দিচ্ছে মেঘমালা। নীচের সুবিশাল চত্বর ঢেকে যাচ্ছে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে।
পূর্ব দিনের মতোই তিনি কুলুঙ্গি থেকে প্রদীপ আর চকমকি পাথর নিয়ে গর্ভগৃহের তোরণ উন্মোচন করে ভিতরে প্রবেশ করে কপাটের অর্গল তুলে প্রদীপ জ্বালালেন। এত রাতে কক্ষে প্রবেশের জন্য বিগ্রহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে দেওয়ালের নির্দিষ্ট স্থানে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ স্থাপন করে উন্মোচিত করলেন সুড়ঙ্গ পথ।
নামতে শুরু করলেন সুড়ঙ্গের গোলাকধাঁধা বেয়ে। ত্রিপুরারিদেব পৌঁছে গেলেন গর্ভগৃহর নীচে ভূগর্ভস্থ সেই কক্ষে। প্রত্যাশা মতোই সে কক্ষেও খেলা করছিল জমাট বাঁধা অন্ধকার। প্রদীপের মৃদু আলোতে কিছুটা অন্ধকার মুক্ত হল সেই কক্ষ। কক্ষের মাঝখানে সেই ক্ষুদ্রাকৃতির বেদির সামনে নতজানু হয়ে বসে এক পাশে প্রদীপটা নামিয়ে রেখে ধাক্কা দিলেন বেদিতে। এক পাশে সরে গেল বেদি। আত্মপ্রকাশ করল সেই গহ্বর। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার খেলা করছে সেখানে।
ত্রিপুরারিদেব ঝুঁকে পড়লেন সেই গহ্বরের মুখে। অন্ধকারের প্রহরীর উদ্দেশ্যে তিনি বললেন ‘কোথায় তুমি? আমি এসেছি।’
তাঁর কথার জবাবে কোনও সাড়া মিলল না নীচের সেই অন্ধকার কক্ষ থেকে।
প্রধান পুরোহিত গলার স্বরটা আরও একটু তুলে বললেন, ‘আমি এসেছি। প্রহরী তুমি কোথায়?’
আশ্চর্যজনক ভাবে এবারও ত্রিপুরারিদেবের প্রশ্নের কোনও জবাব মিলল না। তাঁর কথা সেই অন্ধকার ভূগর্ভস্থ কক্ষে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল।
তবে কি অন্ধকারের প্রহরী নিদ্রামগ্ন, নাকি অসুস্থ হয়ে বাকশক্তি রোহিত বা সংজ্ঞা হারিয়েছেন? এই শেষ ভাবনাটা মাথায় আসতেই ত্রিপুরারিদেব আশঙ্কিতভাবে বললেন, ‘তুমি কি অসুস্থ? সাড়া দিচ্ছ না কেন?’
আর এর পরই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। উত্তর নয়, গহ্বরের অন্ধকার থেকে প্রবল ধাক্কাতে ত্রিপুরারিদেবকে ছিটকে এক পাশে ফেলে দিয়ে এক লাফে বাইরে বেরিয়ে এল সেই অন্ধকারের প্রহরী! ত্রিপুরারিদেবের শরীরের আঘাতে প্রদীপটা কাত হয়ে পড়ে নিভে যাবার আগে দপদপ করছে। সেই আলোতে ত্রিপুরারিদেব কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখতে পেলেন তাকে। তার পরনে শুধু কৌপিনের মতো এক টুকরো বস্ত্রখণ্ড। এক হাতে ধরা ধনুক, কাঁধে তুনির।
এ কী চেহারা হয়েছে তার! এক যুগ আগে ত্রিপুরারিদেব যে যুবককে দেখেছিলেন, তার সঙ্গে এ লোকের কোনও মিলই নেই! সারা শরীর জুড়ে অসংখ্য ঘা বেরিয়েছে তার, চামড়া ফেটে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য সাদা সাদা ক্ষত। দীর্ঘ বছর ধরে শরীর সূর্যালোক পায়নি। তার ফল। কাঁধ ছাপিয়ে পিঠে নেমেছে জট পাকানো চুল। শ্মশ্রুর অরণ্যের আড়ালে তার মুখমণ্ডল প্রায় অদৃশ্য।
এই সামান্য সময়টুকুর মধ্যেই ত্রিপুরারিদেব আরও একটা জিনিস খেয়াল করলেন, দীর্ঘদিন ছেদন না করার ফলে তার হাত-পায়ের নখগুলো ভয়ঙ্কর রকমের দীর্ঘ আর তীক্ষ্ন হয়ে উঠেছে! ঠিক যেন কোনও স্বাপদের নখ! সব মিলিয়ে এ মূর্তি যার সামনে আবির্ভূত হবে সে নিশ্চয়ই এই ভয়ঙ্কর মূর্তিকে কোনও প্রেতাত্মাই ভাববে।
প্রদীপের আলো যত ক্ষীণই হোক না কেন দীর্ঘদিন পর কোনও আলোকবিন্দু দেখে মনে হয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল লোকটার। আর এর পরই অবশ্যই আলো নিভে গিয়ে চারপাশে গাঢ় অন্ধকার নেমে এল। ত্রিপুরারিদেব সম্বিত ফিরে পেয়ে বলে উঠলেন, ‘তুমি এভাবে বাইরে বেরোলে কেন?’
অন্ধকারের প্রহরী ফ্যাসফ্যাসে স্বরে জবাব দিল, ‘আমি আর এক দণ্ড ওই অন্ধকূপে থাকব না।’
ত্রিপুরারিদেব তাকে শান্ত করার জন্য বললেন, ‘তোমাকে তো বলেইছি তোমার মুক্তি আসন্ন। সামনেই মাঘী পূর্ণিমা, ওই দিনেই মুক্তি ঘটবে তোমার। দ্বাদশ বছর যখন অতিক্রান্ত করেছ তখন আর মাত্র কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে পারবে না? মাত্র তিন পক্ষকাল। সামনে পূর্ণিমার পরের পূর্ণিমা।’
লোকটা উত্তেজিতভাবে বলে উঠল ‘না, না, আর একটা পলের জন্যও আমি থাকব না ওখানে।’
প্রধান পুরোহিত তার উদ্দেশ্য বললেন, ‘জন্ম-জন্মান্তরের পুণ্যলাভের এত কাছে এসে ফিরে যাবে তুমি? বঞ্চিত হবে অক্ষয় স্বর্গলাভের থেকে?’
অন্ধকারের প্রহরী বলল, ‘আমার যদি নরকবাস হয়, তবুও আর এক দণ্ড আমি ওখানে থাকব না।’
আর নরকও নিশ্চয়ই ওই অন্ধকার স্থানের থেকে বেশি ভয়ঙ্কর হবে না। মুক্তিলাভ করার জন্যই আমি আজ কৌশলে এখানে আপনাকে ডেকে এনেছিলাম। আমি এখন এ স্থান পরিত্যাগ করব।’
তার কথা শুনে ত্রিপুরারিদেব আতঙ্কিত ভাবে বলে উঠলেন, ‘না, এভাবে তুমি এ স্থান ত্যাগ করতে পারোনা। তুমি সোমেশ্বর মহাদেবের নামে শপথ গ্রহণ করেছিলে, আমার নির্দেশ মেনে চলবে তুমি। আমি তোমাকে যেতে দেব না। কিছুতেই নয়। এ স্থানকে অরক্ষিত রেখে তুমি যেতে পারবে না।’
এবার এক হিমশীতল কণ্ঠস্বর শোনা গেল। সে বলল, ‘আমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করলে এই মুহূর্তেই তোমাকে আমি বধ করব ব্রাহ্মণ। অন্ধকারের মধ্যে সামান্য শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনে আমি যে বাণ নিক্ষেপ করতে পারি, নির্ভুল লয়ে অস্ত্র চালনা করতে পারি তো তোমার থেকে অধিক কেউ জানে না। এই আমি ধনুকে শর রচনা করলাম। তোমার হৃৎপিণ্ডের শব্দও আমি শুনতে পাচ্ছি। সেদিকেই লক্ষ স্থির করলাম। স্থান ত্যাগ করলেই আমার বাণ, জ্যা মুক্ত হবে। ব্রহ্মহত্যার পাপের ভয় এখন আর আমার নেই।’
তার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন ত্রিপুরারিদেব। লোকটা যে কথা বলছে, অন্ধকারে নির্ভুল লক্ষে বাণ চালাবার ক্ষমতা যে সত্যিই তার আছে তা সম্যক জানা আছে প্রধান পুরোহিতের। তা ছাড়া লোকটার কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা বলে দিচ্ছে কাজটা সে করতে পারে। লোকটা মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষাতে পাগল হয়ে উঠেছে। অতএব স্তব্ধ হয়ে গেলেন ত্রিপুরারিদেব।
প্রধান পুরোহিত যে আর তাকে বাধাদান করবে না তা যেন বুঝতে পারল সেই অন্ধকারের প্রহরী। নির্বাক ত্রিপুরারিদেবের মনে হল লোকটার লঘু পদশব্দ যেন ধীরে ধীরে এগোচ্ছে ওপরে ওঠার সোপানশ্রেণীর দিকে মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষাতে। একটা ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে ত্রিপুরারিদেবকে। যার পরিণতি ভবিষ্যতের পথে মারাত্মক হতে পারে।
দীর্ঘক্ষণ একই স্থানে একই ভাবে বসে রইলেন ত্রিপুরারিদেব। প্রহর অতিক্রান্ত হল। তারপর এক সময় উঠে পড়লেন তিনি। না, কোথাও কোনও শব্দ নেই। অদৃশ্য হয়ে গেছে অন্ধকারের প্রহরী। হাতড়ে হাতড়ে বেদিটা ঠেলে ফোকরের মুখ বন্ধ করে ত্রিপুরারিদেব এগোলেন সোপানশ্রেণীর দিকে। চেনা পথ, তাই সে পথ ধরে ওপরে উঠে আসতে অসুবিধা হল না তার।
এক সময় গর্ভগৃহর বাইরে এসে দাঁড়ালেন প্রধান পুরোহিত। নিঃশব্দে কপাট বন্ধ করে চারপাশে তাকালেন। না, আশেপাশে কোথাও সেই অন্ধকারের প্রহরী নেই। তবে সে যে খুব সহজে এই মন্দির থেকে বাইরে যেতে পারবে না, তা জানা আছে ত্রিপুরারিদেবের। এই বিশাল মন্দিরের কোনও অংশে নিশ্চয়ই লুক্কাইত অবস্থায় থাকবে সে। সমস্যা হল তার কথা কাউকে জানানো যাবে না। তাতে গোপন ব্যাপার উন্মোচনের সম্ভাবনা আছে। এই মন্দিরের যে সব স্থানে সে আত্মগোপন করে থাকতে পারে সে সব স্থানে ত্রিপুরারিদেবকেই অনুসন্ধান চালাতে হবে তার খোঁজে। বিশেষত প্রাকারের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উপমন্দিরগুলোতে। যেখানে লোকজন বিশেষ প্রবেশ করে না, সে সব স্থানে।
গর্ভগৃহর সামনে দাঁড়িয়ে নীচের ঘুমন্ত চত্বরের দিকে চেয়ে রইলেন প্রধান পুরোহিত। শুকতারা ফুটে উঠল এক সময়। ত্রিপুরারিদেব এগিয়ে গেলেন সেই স্বর্ণ শৃঙ্খলের দিকে। ঝুঁকে পড়ে ঝমঝম শব্দে সেটা বাজাতে শুরু করলেন মন্দিরবাসীদের জাগ্রত করতে।
ঠিক একই সময় শিঙা বেজে উঠল দূরের এক মরু প্রান্তরে। সেখানেও অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করেছে। চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু অস্থায়ী ছাউনি জেগে আছে মরুভূমির বুকে। শিঙার শব্দে নিদ্রাভঙ্গ হতে শুরু করল ঘুমন্ত সৈনিকদের। তাঁবুর ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করল তারা। তিরিশ হাজার সৈনিকের এক কাফেলা মাসাধিক কাল ধরে মরুভূমি অতিক্রম করে উপস্থিত হয়েছে তার প্রান্তদেশে।
সামনেই ভারতবর্ষের হিন্দু কাফেরদের ভূখণ্ড শুরু হচ্ছে। ইতিপূর্বেও অবশ্য বহুবার তারা হানা দিয়েছে এই ভূখণ্ডে। লুঠতরাজ চালিয়েছে, বিধর্মীদের রক্তে তৃপ্ত করেছে তাদের তলোয়ার, ধ্বংস করেছে অসংখ্য স্থাপত্য, প্রাসাদ, ধর্মস্থান। তবে এবারের অভিযানের লক্ষ আরও ব্যাপক। যে জন্য সেনার সংখ্যাও অনেক বেশি।
নির্দিষ্ট লক্ষে আঘাত হানার জন্যই তারা প্রবেশ করতে চলেছে মূর্তিপূজার উপাসকদের ভারতভূমিতে। বারংবার শিঙার শব্দে, আর সূর্যোদয়ের আভাস পেয়ে চঞ্চল হয়ে উঠল সমরাস্ত্রগুলোও। ভোরের প্রথম আলো মরুভূমির বুকে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ কাঁপিয়ে একসঙ্গে হ্রেসারব করে পা ঠুকতে লাগল ঘোড়াগুলো।
কিছুটা দূরে ওই যে দেখা যাচ্ছে বিধর্মীদের মাটি, রাজপুত ভূমি। আর কিছু সময়ের মধ্যেই প্রভুদের পিঠে নিয়ে, খুরের আঘাতে ধুলোর ঝড় তুলে উন্মত্ত হিংস্র উল্লাসে সেদিকে ধাবিত হবে এই অশ্ববাহিনী। কোথাও কোন প্রতিরোধ যদি আসে তবে তাকে ক্ষমাহীন ভাবে চূর্ণ করে, পদদলিত করে মামুদশাহর বাহিনী এগোবে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। লক্ষ্যবস্তুর কাছে উপস্থিত হতে তাদের এক চাঁদ মতো সময় লাগার কথা।
