নির্বাসিতের আত্মকথা – ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
নির্বাসিতের আত্মকথা – ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
নানা প্রকারের জল্পনা কল্পনা চলিতেছে, এমন সময় হঠাৎ একদিন আমাদের অদৃষ্ট খুলিয়া গেল। জেলের কর্তৃপক্ষগণ হুকুম দিলেন যে ৪৪ ডিগ্রী হইতে অন্যস্থানে লইয়া গিয়া আমাদের একত্র রাখা হইবে। ভাগ্য-বিধাতা সহসা প্রসন্ন হইয়া কেন উঠিলেন তাহা তিনিই জানেন; কিন্তু আমরা ত হাসিয়াই খুন! আলিঙ্গন, গলা জড়াজড়ি, লাফালাফি আর চীৎকার থামিতেই এক ঘণ্টা কাটিয়া গেল। তাহার পর প্রকৃতিস্থ হইয়া দেখিলাম, যে তিনটি পাশাপাশি কুঠরীতে আমাদের রাখা হইয়াছে, তাহার মধ্যে পাশের দুইটা কুঠরী ছোট; আর মাঝেরটা অপেক্ষাকৃত বড়। অরবিন্দ বাবু ও দেবব্রতের মত যাঁহারা অপেক্ষাকৃত গম্ভীর-প্রকৃতি, তাঁহারা পাশের দুইটী কুঠরীতে আশ্রয় লইলেন; আর আমাদের মত “চ্যাংড়া” যাহারা, তাহারা মাঝের বড় কুঠরিটি দখল করিয়া সর্বদিনব্যাপী মহোৎসবের আয়োজন করিতে লাগিল। মেদিনীপুরের শ্রীযুক্ত হেমচন্দ্র কাননগুও আমাদের সঙ্গে আসিয়া জুটিলেন। হেমচন্দ্রের সহিত পূর্বে কখনো বিশেষ ভাবে পরিচিত হইবার অবসর পাই নাই; এবার কাছে আসিয়া দেখিলাম যে, যাঁহাদের মাথার চুল পাকে, বুদ্ধিও পাকে, কিন্তু বয়স বাড়ে না, হেমচন্দ্র তাঁহাদের মধ্যে একজন। অসাধারণ শক্তিমত্তার সহিত বালস্থুলভ তরলতা মিশিলে যে অদ্ভুত চরিত্রের সৃষ্টি হয়, হেমচন্দ্রের তাহাই ছিল। ছুই একদিনের মধ্যেই সর্বসম্মতিক্রমে তিনি সাধারণের “হেমদা” হইয়া দাঁড়াইলেন। আমাদের পাশের দুইটি ঘরে লেখাপড়া ও ধর্মালোচনা চলিতে লাগিল; আর আমাদের ঘরটি হইয়া উঠিল নাচ, গান, হাসি ঠাট্টা, তামাসা ও চিমটি কাটাকাটির কেন্দ্র। বলা বাহুল্য উল্লাসকর আমাদের সহিত একত্রই ছিল। সে না থাকিলে আসর জমিত না। আমরা বাড়িঘর ছাড়িয়া যে জেলে আসিয়াছি হট্টগোলের মধ্যে সে কথা মনেই হইত না।
দিন কয়েক পরে সুখের মাত্রা আরও এক পর্দা চড়িয়া গেল। বাহির হইতে পুলিশ আরও কয়েকজনকে ধরিয়া আনিল। মোট আমরা চল্লিশ পঞ্চাশ জন হইলাম। এত লোককে তিনটা কুঠরীর মধ্যে পুরিতে গেলে অন্ধকূপহত্যার পুনবভিনয় করিতে হয়! ডাক্তার সাহেব বলিলেন যে, একটা ওয়ার্ড খালি করিয়া আমাদের সকলকে সেখানে রাখা হোক। কাজে কাজেই সকলেই আসিয়া একসঙ্গে মিশিলাম। নরক একেবারে গুলজার হইয়া উঠিল।
জেলের খাওয়া সম্বন্ধে নানারূপ অভিযোগ করায় ডাক্তার সাহেব আমাদের জন্য বাহির হইতে ফল মূল বা মিষ্টান্ন পাইবার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন। সুশীল সেনের পিতা প্রায়ই আম, কাঁঠাল ও মিষ্টার পাঠাইয়া দিতেন। কলিকাতার অনুশীলন সমিতির ছেলেরাও মাঝে মাঝে ঘি, চাল, মসলা ও মাংস পাঠাইয়া দিত। সর্ববিদ্যাসিদ্ধ “হেমদা” সেগুলি হাসপাতালে লইয়া গিয়া পোলাও বানাইয়া আমাদের ভুরিভোজনের ব্যবস্থা করিয়া দিতেন। আম কাঁঠাল এত অধিক পরিমাণে আসিত যে, খাইয়া শেষ করা দায় হইত; সুতরাং সেগুলি পরস্পরের মুখে ও মাথায় মাখাইয়া সদ্ব্যবহার করা ভিন্ন উপায়ান্তর ছিল না।
সন্ধ্যার সময় গানের আড্ডা বসিত। হেমচন্দ্র, উল্লাসকর, দেবব্রত কয় জনেই বেশ গাহিতে পারিত; কিন্তু দেবব্রত গম্ভীর পুরুষ—বড় একটা গাহিত না! অনেক পীড়াপীড়িতে একদিন তাহার স্বরচিত একটা গান আমাদের শুনাইয়াছিল। ভারত-ব্যাপী একটা বিপ্লবকে লক্ষ্য করিয়াই তাহা রচিত। তাহার সুরের এমন একটা মোহিনী শক্তি যে, গান শুনিতে শুনিতে বিপ্লবের রক্তচিত্র আমাদের চোখের সম্মুখে যেন স্পষ্ট হইয়া ফুটিয়া উঠিত। গান বা পদ্য কস্মিনকালেও আমার বড় একটা, মনে থাকে না, কিন্তু দেবব্রতের সেই গানটার দুই এক ছজ আজও মনে গাঁথিয়া আছে—
উঠিয়া দাঁড়াল জননী!
কোটী কোটী স্মৃত হুঙ্কারি দাঁড়াল!
***
রক্তে আঁধারিল রক্তিম সবিতা
রক্তিম চন্দ্রমা তারা,
রক্তবর্ণ ডালি রক্তিম অঞ্জলি
বীর রক্তময়ী ধরা কিবা শোভিল!
গানটা শুনিতে শুনিতে মানস-চক্ষে বেশ স্পষ্টই দেখিতাম যে, হিমাচলব্যাপী ভাবোন্মত্ত জনসঙ্ঘ বরাভয়করার স্পর্শে সিংহগর্জনে জাগিয়া উঠিয়াছে; মায়ের রক্ত-চরণ বেড়িয়া বেড়িয়া গগনস্পর্ণী রক্তশীর্ষ উত্তাল তরঙ্গ ছুটিয়াছে; দ্যুলোক ভূলোক সমস্তই উন্মত্ত রণবাদ্যে কাঁপিয়া উঠিয়াছে। মনে হইত যেন আমরা সর্ববন্ধনমুক্ত—দীনতা, ভয়, মৃত্যু আমাদের কখন স্পর্শও করিতে পারিবে না।
ছেলেরা অনেকেই সেকালের স্বদেশী গান গাহিত। তাহাদের অদম্য উৎসাহ আর স্ফুর্তি চাপিয়া রাখাই দায়। শচীন সেন ছিল তাহাদের অগ্রণী। পনেরো বৎসর যখন তাহার বয়স, তখন সে মা-বাপের কথা ঠেলিয়া একরূপ জোর করিয়াই কলিকাতা ন্যাশনাল কলেজে আসিয়া ভর্তি হয়। কিন্তু তাহার প্রাণের গভীরতর আকাঙ্ক্ষা কলেজের বিদ্যায় মিটিল না; শেষে বাড়ি হইতে পলাইয়া আসিয়া সে বাগানে যোগ দিল। জেলে আসিবার পর চীৎকার করিয়া, লাফালাফি করিয়া গান গাহিয়া, কাঁধে চড়িয়া, আম কাঁঠাল চুরি করিয়া সে যে শুধু আমাদেরই অস্থির করিয়া তুলিল তাহা নহে; জেলের কর্তৃ পক্ষগণও তাহার বক্তৃতার ও গানের জ্বালায় অতিষ্ঠ হইয়া উঠিলেন। রাত বারোট। একটা বাজিয়া চলিয়াছে, শচীনের গানের আর বিরাম নাই! জেলার বাবুটী নিতান্ত ভদ্রলোক। এতগুলা ভদ্রলোকের ছেলেকে তাঁহার জেলের মধ্যে পুরিয়া দেওয়ায় তিনি নিতান্তই বিব্রত হইয়া পড়িয়াছিলেন। একদিকে সরকারী চাকরী, পেন্সন পাইবার আর বৎসর খানেক মাত্র বিলম্ব—আর অপর দিকে চক্ষুলজ্জা—এই দোটানায় পড়িয়া বেচারার একেবারে প্রাণান্ত! একে ভদ্রলোক প্রৌঢ় বয়সে চতুর্থ না পঞ্চম পক্ষের পাণিপীড়ণ করিয়াছেন, তাহার উপর রাত্রিকালে ছেলেদের গানের জ্বালায় অস্থির! একদিন প্রাতঃকালে তিনি নিতান্ত ভাল মানুষের মত আসিয়া নিবেদন করিলেন যে ছেলেদের বুঝাইয়া সুঝাইয়া যেন আমরা একটু শান্ত করিয়া রাখি। কেন-না রাত্রিকালে গৃহিণীর ও মশকের উপদ্রবের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের গানের উপদ্রব আসিয়া জুটিলে তাঁহার আর এক বৎসর বাঁচিয়া থাকিয়া পেন্সন ভোগ করিবার সুবিধা মিলিবে না। এ হেন সদ্যুক্তির পর আর কি করা যায়? কথামালা ও শিশুশিক্ষা হইতে উদ্ধৃত করিয়া অনেকগুলি ভাল ভাল উপদেশ ছেলেদের শুনাইয়া দিয়া যথাসাধ্য কর্তব্যপালন করিলাম; কিন্তু সদুপদেশ মত কার্য করিবার বুদ্ধিসুদ্ধিই যদি তাহাদের থাকিবে, তাহা হইলে আর ভারত-উদ্ধার করিবার কুপ্রবৃত্তি তাহাদের স্কন্ধে চাপিবে কেন?
অরবিন্দ বাবু, দেবব্রত ও বারীন্দ্র ভিন্ন আর সকলেই এই হট্টগোলে যোগ দিত; তবে মধ্যে মধ্যে উহারাও যে বাদ পড়িতেন—তাহা নহে। ধরা পড়িবার পর বারীন্দ্রের মনে কোথায় একটা বিষম ধাক্কা লাগিয়াছিল বলিয়া মনে হয়, সে প্রায় সমস্ত দিন একখানা চাদর মুড়ি দিয়া লম্বা হইয়া পড়িয়া থাকিত। দেবব্রত সকালে উঠিয়া পায়ের উপর পা তুলিয়া দিয়া সেই যে অচলপ্রতিষ্ঠ হইয়া বসিত, বেলা দশটা পর্যন্ত তাহাকে আব নাড়িবার উপায় ছিল না। আহারাদির পর আবার বেলা চার পাঁচটা পর্যন্ত চুপ করিয়া বসিয়া থাকিত; কখনও বা গীতা ও ভাগবত পড়িত। তাহার সময় এইরূপেই কাটিয়া যাইত। অরবিন্দ বাবুব জন্য একটা কোণ নির্দিষ্ট ছিল। সমস্ত প্রাতঃকাল তিনি সেইখানে আপনার সাধন ভজনের মধ্যে ডুবিয়া থাকিতেন। ছেলেরা চীৎকার করিয়া তাঁহাকে বিরক্ত করিলেও কোন কথাই কহিতেন না। অপবাহ্ণে দুই তিন ঘণ্টা পায়চারী করিতে করিতে উপনিষদ বা অন্য কোনও ধর্মশাস্ত্র পাঠ করিতেন। তবে সন্ধ্যাবেলায় এক আধ ঘণ্টার জন্য ছেলেখেলায় যোগ না দিলে তাঁহারও নিষ্কৃতি ছিল না।
কানাইলাল প্রভৃতি চার পাঁচজন নিদ্রার কাজটা সন্ধ্যার পরেই সারিয়া লইত। রাত ১০টা ১১টার সময় সকলে যখন ঘুমাইয়া পড়িত তখন তাহারা বিছানা ছাড়িয়। কাহার কোথায় সন্দেশ, আম বা বিস্কুট লুকান আছে তাহার সন্ধান করিয়া ফিরিত। যে দিন সে সব কিছু মিলিত না, সে দিন এক গাছা দড়ি দিয়া কাহারও হাতের সহিত অপরের কাছা বা কাহারও কানের সহিত অপরের পা বাঁধিয়া দিয়া ক্ষুণ্নমনে শুইয়া পড়িত। একদিন রাত্রে প্রায় ১ টার সময় ঘুম ভাঙ্গিয়া দেখি কানাই একজনের বিছানার চাদরের তলা হইতে একটা বিস্কুটের টিন চুরি করিয়া মহানন্দে বগল বাজাইতেছে। অরবিন্দ বাবু পাশেই শুইয়াছিলেন। আনন্দের সশব্দ অভিব্যক্তিতে তাঁহারও ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। কানাই অমনি খানকয়েক বিস্কুট লইয়া তাঁহার হাতের মধ্যে গুজিয়া দিল। বিস্কুট লইয়া অরবিন্দ বাবু চাদরের মধ্যে মুখ লুকাইলেন; নিদ্রাভঙ্গের আর কোন লক্ষণই দেখা গেল না! চুরিও ধরা পড়িল না।
রবিবারে আমাদের স্ফতির মাত্রা একটু বাড়িয়া যাইত। আত্মীয়স্বজন ও বাহিরেব অনেক লোক আমাদের সঙ্গে দেখা করিতে আসিতেন সুতরাং অনেক প্ৰকাব সংবাদাদি পাওয়া যাইত। মিষ্টান্নও যথেষ্ট পরিমাণে মিলিত। বিপুল হাস্যরসের মাঝে মাঝে একটু আধটু করুণ রসও দেখা দিত। শচীনের পিতা একদিন তাহার সহিত দেখা করিতে আসিয়াছিলেন। জেলে কি বকম খাদ্য খাইতে হয় জিজ্ঞাসা করায় শচীন লপসীর নাম করিল। পাছে লপসীর স্বরূপ প্রকাশ পাইয়া তাহার পিতার মনে কষ্ট হয় সেই ভয়ে শচীন লপসীর গুণগ্রাম বর্ণনা করিতে করিতে বলিল—“লপসী খুব পুষ্টিকর জিনিস।” পিতার চক্ষু জলে ভরিয়া আসিল। তিনি জেলার বাবুর দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিলেন—“বাড়িতে ছেলে আমার পোলাও এর বাটি টান মেরে ফেলে দিত; আর আজ লপসী তার কাছে পুষ্টিকর জিনিস!” ছেলের এ অবস্থা দেখিয়া বাপের মনে যে কি হয় তাহা তখনও ভাল করিয়া বুঝি নাই, তবে তাহার ক্ষীণ আভাস যে একেবারে পাই নাই তাহাও নয়। একদিন আমার আত্মীয়-স্বজনেরা আমার ছেলেকে আমার সহিত দেখা করাইতে লইয়া আসিয়াছিলেন। ছেলের বয়স তখন দেড় বৎসর মাত্র; কথা কহিতে পারে না। হয়ত এ জন্মে তাহার সহিত আর দেখা হইবে না ভাবিয়া তাহাকে কোলে লইবার বড় সাধ হইয়াছিল। কিন্তু মাঝের লোহার রেলিংগুলা আমার সে সাধ মিটাইতে দেয় নাই। কারাগারের প্রকৃত মূৰ্তি সেইদিন আমার চোখে ফুটিয়াছিল!
এইরূপে ত’ সুখে দুঃখে জেলখানায় আমাদের দিন কাটিতে লাগিল। ওদিকে ম্যাজিষ্ট্রেটের আদালতে বিচারও আরম্ভ হইয়া গেল। রাস্তায় লোকে লোকারণ্য; আদালতে উকিল ব্যারিষ্টারের ছড়াছড়ি; কিন্তু আমাদের সে দিকে লক্ষ্য নাই। সবটাই যেন আমাদের চোখে একটা প্রকাণ্ড তামাসা বলিয়া মনে হইতে লাগিল। কত রকম বেরকমের সাক্ষী আসিয়া সত্য মিথ্যার খিচুড়ী পাকাইয়া যাইত; আমরা শুধু শুনিতাম আর হাসিতাম। তাহাদের সাক্ষ্যের সহিত যে আমাদের মরণ বাঁচনের সম্বন্ধ এ কথাটা মনেই আসিত না। স্কুলের ছুটির পর ছেলেরা যেমন মহাস্ফুর্তিতে বাড়ী ফিরিয়া আসে, আমরাও সেইরূপ আদালত ভাঙ্গিবার পর গান গাহিতে গাহিতে চীৎকার করিতে করিতে গাড়ী চড়িয়া জেলে ফিরিয়া আসিতাম। তাহার পর সন্ধ্যার সময় যখন সভা বসিত, তখন বার্লি সাহেব কি রকম ফিরিঙ্গি -বাঙ্গালায় সাক্ষীদের জেরা করে, নর্টন সাহেবের পেণ্ট লানটা কোথায় ছেঁড়া আর কোথায় তালি লাগান, কোর্ট ইন্সপেক্টরের গোঁফের ডগা ইদুরে খাইয়াছে কি আরদুলায় খাইয়াছে—এই সমস্ত বিষয়ে উল্লাসকব গভীর গবেষণা করিত। আর আমরা প্রাণ ভরিয়া হাসিতাম। কিন্তু এই হাসি পর্বের পর যে একটা প্রকাণ্ড কান্না পর্ব আছে তাহা ভাল করিয়া তখন বুঝি নাই
নরেন্দ্র গোস্বামীর কথা পূর্বেই বলিয়াছি। আমরা যাহা ভয় করিয়াছিলাম, ফলে তাহাই হইল। বিচার আরম্ভ হইবার দুই চারি দিন পরেই সে সরকারী সাক্ষী হইয়া কাঠগড়ায় গিয়া দাঁড়াইল। তাহার সাক্ষ্যের ফলে চারিদিকে নূতন নূতন খানাতল্লাসী আরম্ভ হইল; আর পণ্ডিত হৃষীকেশের উর্বর-মস্তিষ্ক-প্রসূত মারাঠি ও মাদ্রাজী নেতৃবৃন্দকে আবিষ্কার করিবার জন্য পুলিশ চারিদিকে ছুটাছুটি করিতে লাগিল।
নরেন সরকারী সাক্ষী হইবার পরই তাহাকে আমাদের নিকট হইতে সরাইয়া হাসপাতালে ইউরোপীয় প্রহরীর তত্ত্বা-বধানে রাখা হইয়াছিল। পাছে কেহ তাহাকে আক্ৰমণ করে, সেই ভয়ে জেলের কর্তৃপক্ষগণ সর্বদাই সাবধান হইয়া থাকিতেন। জেলার বেচারী একদিন বলিলেন—“দেখুন, আমার হয়েছে তালগাছের আড়াই হাত। তালগাছ সবটা চড়া যায়, কিন্তু শেষ আড়াই হাত ওঠবার সময় প্রাণটা বেরিয়ে যায়। এতদিন চাকরী করে এলুম, বেশ নির্বিবাদে কেটে গেল। আর এই পেন্সন নেবার সময় আপনাদের হাতে গিয়ে পড়েছি। এখন মানে মানে আপনাদের বিদেয় করতে পারলে বাঁচি।” কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস! তালগাছের শেষ আড়াই হাত আর তাঁহাকে চড়িতে হইল না।
ম্যাজিষ্ট্রেট আমাদের মোকর্দমা সেসনে পাঠাইয়া নিশ্চিন্ত হইলেন। আমরাও লম্বা ছুটি পাইলাম। নিষ্কর্মার দল-কাজেই সকলেই হাসে, খেলে, লাফালাফি করে, মোকর্দ মার ফলাফল লইয়া মাঝে মাঝে বিচার-বিতর্কও করে। ছেলেরা কাহাকেও বা ফাঁসিকাঠে চড়ায়, কাহাকেও বা খালাস দেয়। কানাইলাল একদিন বলিল, “খালাসের কথা ভুলে যাও সব, বিশ বৎসর করে কালাপানি।” শচীনের তাহাতে ঘোরতর আপত্তি। সে প্রমাণ করিতে বসিল যে, বিশ বৎসরের মধ্যে দেশ স্বাধীন হইবেই হইবে। কানাইলাল খানিকক্ষণ গম্ভীর ভাবে বসিয়া থাকিয়া বলিল—“দেশ মুক্ত হোক আর না হোক্, আমি হবো। বিশ বৎসর জেলখাটা আমার পোষাবে না।” এই কথার দুই একদিন পরেই সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ পেটে হাত দিয়া শুইয়া পড়িয়া সে বলিল যে তাহার পেটে ভারি যন্ত্রণা হইতেছে। ডাক্তার বাবু আসিয়া তাহাকে হাসপাতালে পাঠাইয়া দিলেন। সেই অবধি সে হাসপাতালেই রহিয়া গেল। মেদিনীপুরের সভোনকে কিছুদিন পূর্বে পুলিস ধরিয়া আনিয়াছিল। কঠিন কাশরোগগ্রস্ত বলিয়া সেও হাসপাতালেই থাকিত।
কানাই হাসপাতালে যাইবার তিন চারি দিন পরেই, একদিন সকালবেলা বিছানা হইতে উঠিয়া আমরা মুখ-হাত ধুইতেছি, এমন সময় হাসপাতালের দিক হইতে দুই একটা বন্দুকের মত আওয়াজ শুনিলাম। কিছুক্ষণ পরে দেখিলাম, চারিদিক হইতে কয়েদী পাহারাওয়ালারা হাসপাতালের দিকে ছুটিতেছে। ব্যাপার কি? কেহ বলিল, বাহির হইতে হাসপাতালের উপর গোলা পড়িতেছে, কেহ বলিল সিপাহিরা গুলি চালাইতেছে। হাসপাতালের একজন কম্পাউণ্ডার ঘুরপাক খাইতে খাইতে ছুটিয়া আসিয়া জেলের অফিসের কাছে শুইয়া পড়িল। ভয়ে তাহার মুখ বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে। যে সংবাদ দিবার জন্য সে ছুটিয়া আসিয়াছিল, তাহা তাহার পেটের মধ্যেই রহিয়া গেল। প্রায় দশ পনের মিনিট এইরূপ উৎকণ্ঠায় কাটিল, শেষে একটা পুরানো চোর আসিয়া আমাদের সংবাদ দিল—
“নরেন গোঁসাই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে!”
“ঠাণ্ডা হয়ে গেছে কি রে?”
“আজ্ঞে, হ্যাঁ বাবু; কানাই বাবু তা’কে পিস্তল দিয়ে ঠাণ্ডা করে দিয়েছে। ঐ দেখুন গে না—কারখানার সুমুখে সে একদম লম্বা হয়ে পড়েছে। আর জেলার বাবুরও আর একটু হলে হয়ে যেত। তিনি কারখানায় ঢুকে পড়ে বেঞ্চির তলায় লুকিয়ে খুব প্রাণটা বাঁচিয়েছেন।”
প্রায় পনের মিনিট পরে জেলের পাগলা ঘণ্টা (alarm bell ) বাজিয়া উঠিল। চারিদিক হইতে জেলের প্রহরীরা ছুটিয়া আসিয়া হাসপাতালের দিকে চলিল। কিছুক্ষণ পরে দেখিলাম, তাহারা কানাই ও সত্যেনকে ধরিয়া ৪৪ ডিগ্রীর দিকে লইয়া চলিয়াছে।
