নির্বাসিতের আত্মকথা – সপ্তম পরিচ্ছেদ
নির্বাসিতের আত্মকথা – সপ্তম পরিচ্ছেদ
নানারূপ গুজবের মধ্য হইতে সার সঙ্কলন করিয়া এই ঘটনা সম্বন্ধে যাহা বুঝিলাম তাহা এই— হাসপাতালে থাকিবার সময় সত্যেনের মনে হয় যে, যখন কাশরোগে ভুগিতেছি তখন ত অল্পদিনের মধ্যে মরিতেই হইবে; বৃথা না মরিয়া নরেনকে মারিয়া মরিলেই ত বেশ হয়। কানাইলাল সে কথা শুনিয়া তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য পিস্তল লইয়া হাসপাতালে আসে। পেটের যন্ত্রণা শুধু ডাক্তারকে ঠকাইবার জন্য ভাণ মাত্র। তাহার পর সত্যেন নরেনকে বলিয়া পাঠায় যে, জেলের কষ্ট আর তাহার সহ্য হইতেছে না; সেও নরেনের মত সরকারী সাক্ষী হইতে চায়; সুতরাং পুলিসের কাছে কি কি বলিতে হইবে তাহা যদি দুইজনে মিলিয়া পরাপর্শ করিয়া ঠিক করে তাহা হইলে আদালতে জেরার সময় কোন কষ্ট পাইতে হইবে না। সত্যেনের ছলনায় ভুলিয়া নরেন তাহাই বিশ্বাস করিল এবং একজন ইউরোপীয় প্রহরী সঙ্গে লইয়া সত্যেনের সঙ্গে দেখা করিতে আসিল। কথা কহিতে কহিতে যখন সত্যেন পিস্তল বাহির করিয়া তাহার উরু লক্ষ্য করিয়া গুলি করে তখন নরেন ঘর হইতে পলাইয়া যায়। পলাইবার সময় তাহার পায়ে একটা গুলি লাগিয়াছিল, কিন্তু আঘাত সাংঘাতিক হয় নাই। গুলির শব্দ শুনিবামাত্র কানাইলাল হাসপাতালে নীচে হইতে উপরে ছুটিয়া আসে। ইউরোপীয় প্রহরী তাহাকে ধরিতে যায়, কিন্তু হাতে একটা গুলি খাইয়া সে সেইখানেই পড়িয়া চীৎকার করিতে থাকে। ইতিমধ্যে নরেন নীচে আসিয়া হাসপাতালের বাহির হইয়া পড়ে। ইউরোপীয় প্রহরীকে ধরাশায়ী করিয়া কানাই যখন নরেনকে খুঁজিতে থাকে, তখন সে হাসপাতালের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে এবং হাসপাতালের দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া একজন প্রহরী সেখানে দাঁড়াইয়া আছে। কানাই তাহার বুকের কাছে পিস্তল ধরিয়া ভয় দেখায় যে নরেন কোথায় পলাইয়াছে তাহা যদি সে বলিয়া না দেয় ত তাহাকে গুলি খাইয়া মরিতে হইবে। বেচারা দরজা খুলিয়া দিয়া বলে যে নরেন আফিসের দিকে গিয়াছে। কানাই ছুটিয়া আসিতে আসিতে দূর হইতে নরেনকে দেখিতে পায় ও গুলি চালাইতে থাকে। গুলির শব্দ শুনিয়া জেলার, ডেপুটী জেলার, অ্যাসিষ্টাণ্ট জেলার, বড় জমাদার, ছোট জমাদার সবাই সদলবলে হাসপাতালের দিকে আসিতেছিলেন। পথের মাঝে কানাই এর রুদ্রমূর্তি দেখিয়া তাঁহারা রণে ভঙ্গ দেওয়াই শ্রেয়ঃ বোধ করিলেন। কে যে কোথায় পলাইলেন, তাহার ঠিক বিবরণ পাওয়া যায় না; তবে জেলার বাবু যে তাঁহার বিপুল কলেবরের অর্দ্ধেকটা কারখানার একটা বেঞ্চের নীচে ঢুকাইয়া দিয়াছিলেন একথা সর্ববাদিসম্মত। এদিকে কানাই এর হাত হইতে গুলি খাইতে খাইতে নরেন কারখানার দরজার কাছে গিয়া আছাড় খাইয়া পড়িল। কানাইয়ের গুলি যখন ফুরাইয়া গেল তখন বন্দুক কীরিচ লাঠি সোটা লইয়া সকলেই বাহির হইয়া আসিল এবং কানাইকে ঘিরিয়া ফেলিল।
এখন প্রশ্ন এই, পিস্তল আসিল কোথা হইতে? কয়েদীরা গুজব রটাইল যে, বাহির হইতে আমাদের জন্য যে সমস্ত ঘিয়ের টিন বা কাঁঠাল আসিত তাহার মধ্যে ভরিয়া কেহ পিস্তল পাঠাইয়া থাকিবে। কানাইলাল বলিল, ক্ষুদিরামের ভূত আসিয়া তাহাকে পিস্তল দিয়া গিয়াছে। প্রেততত্ত্ববিদদের এক আধখানা বই পড়িয়াছি, কিন্তু ভূতকে পিস্তল দিয়া যাইতে কোথাও দেখি নাই। আর আমাদের স্বদেশী ভূতেরা গৃহস্থের বাড়ীতে ইট-পাটকেল ফেলে; খুব জোর কচুপাতায় মুড়িয়া এক আধটা খারাপ জিনিষ ছুঁড়িয়া মারে; সুতরাং পিস্তলের ব্যাপারে ভূতের থিওরিটা একেবারে অবিশ্বাসযোগ্য বলিয়াই মনে হয়। কাঁঠাল বা ঘিয়ের টিনও ডাক্তার সাহেব নিজে পরীক্ষা করিয়া দিতেন, সুতরাং তাহার ভিতর দিয়া দুই দুইটা রিভলবার আসা তত সুবিধার কথা বলিয়া মনে হয় না। তবে কর্তৃপক্ষের চক্ষুর অগোচরে জেলের মধ্যে গাঁজা, গুলি, আফিম, সিগারেট সবই যে রাস্তা দিয়া যাইতে পারে, সে রাস্তা দিয়া পিস্তল যাওয়া ত বিচিত্র নয়!
যাক্ সে কথা। তাহা লইয়া এখন মাথা ঘামাইয়া কোন ফল আর নাই। কিন্তু নরেনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অদৃষ্ট পুড়িল। আধঘণ্টার মধ্যেই জেলের সুপরিনটেনডেন্ট সশস্ত্র সিপাহী শাস্ত্রী লইয়া ব্যারাকে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, আর একে একে আমাদের সকলের তল্লাসী লইয়া বাহির করিয়া দিলেন। তাহার পর ব্যারাকের তল্লাসী আরম্ভ হইল। বিছানার মধ্যে বা এদিক ওদিক দশ বিশটা টাকা লুকান ছিল। তল্লাসীর সময় প্রহরীরা তাহা নির্বিবাদে হজম করিয়া লইল। আমাদের কাছে ত কিছুই পাওয়া গেল না, কিন্তু ইন্সপেক্টর জেনারেল হইতে আরম্ভ করিয়া ছোট বড় পুলিসের কর্মচারীতে জেল ভরিয়া গেল। আরও রিভলবার জেলের মধ্যে লুকান আছে কি না, পুকুরের মধ্যে দুই একটা ফেলিয়া দেওয়া হইয়াছে কি না ইত্যাদি বহুবিধ গবেষণা চলিতে লাগিল। আমাদের বড় আশা হইয়াছিল যে, রিভলভার অনুসন্ধান করিবার জন্য যদি জেলখানার পুকুরের জল ছেঁচিয়া ফেলে তাহা হইলে এক আধদিন যথেষ্ট পরিমাণে মাছ খাইতে পাওয়া যাইবে, ‘কিন্তু অদৃষ্টে তাহা ঘটিল না। অধিকন্তু ইন্সপেক্টর জেনারেল আসিয়া আবার আমাদের পৃথক পৃথক কুঠরীর (cell) মধ্যে বন্ধ করিবার হুকুম দিয়া গেলেন। ডিগ্রী খালি করিয়া আমাদিগকে সেখানে লইয়া যাইবার বন্দোবস্ত চলিতে লাগিল।
সন্ধ্যার সময় জেলার বাবু আমাদের সহিত দেখা করিতে আসিলেন। ভদ্রলোকের মুখ একেবারে শুকাইয়া গিয়াছে। তিনি বলিলেন—“মশাই, এতই যদি আপনাদের মনে ছিল, ত জেলের বাইরে কাজটা করলেই ত হতো। দেখছি ত আপনারা একেবারে মরিয়া, তবে ধরা পড়তে গেলেন কেন?” আমরা সমস্বরে প্রতিবাদ করিয়া তাঁহাকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলাম যে, এ কার্যের সহিত আমাদের কিছুমাত্র সম্বন্ধ নাই। তিনি অবিশ্বাসের হাসি হাসিয়া বলিলেন—“আজ্ঞে হাঁ, তা বুঝতেই পারচি। যাই হোক, আপনাদের যা হবার তা হবে; এখন আমার দফা রফা হয়ে গেল!”
এক সপ্তাহের মধ্যেই ৪৪ ডিগ্রী হইতে সমস্ত কয়েদী অন্যান্য জেলে চালান করিয়া আমাদের সেখানে স্থানান্তরিত করা হইল। জেল যে কাহাকে বলে এতদিনে তাহা বুঝিলাম।
পুরাতন সুপারিনটেনডেন্টের উপর নরেন্দ্রের হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধানের ভার পড়িল; তাঁহার জায়গায় নূতন সুপারি-টেন্ডেন্ট আসিয়া কাজ করিতে লাগিলেন। পুরাতন জেলার ও ডাক্তার বদলি হইয়া গেলেন। আমাদের হাসপাতাল যাওয়া সম্পুর্ণরূপে বন্ধ হইয়া গেল। অসুখ হইলে কুঠরীর মধ্যে পড়িয়া থাকিতে হইত। কাহারও সহিত আর কাহারও কথা কহিবার উপায় রহিল না। সমস্ত দিন কুঠরীর মধ্যে খাও দাও, আর চুপ করিয়া বসিয়া থাক। জেলের অন্যান্য অংশ হইতেও কোন লোক ৪৪ ডিগ্রীতে ঢুকিতে পাইত না।
ক্রমে দেশী প্রহরীর পরিবর্তে ইউরোপীয় প্রহরী আসিল, আর দিনের বেলা ও রাত্রিকালে দুইদল গোরা সৈন্য আসিয়া জেলের ভিতরে ও বাহিরে পাহারা দিতে আরম্ভ করিল। কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হইয়াছিল যে, আমরা বোধ হয় জেল হইতে পলাইয়া যাইবার চেষ্টা করিব।
প্রথম দুইটী কুঠরীতে কানাই ও সত্যেন আবদ্ধ থাকিত। আমরা পাঁচ সাত দিন অন্তর এক কুঠরী হইতে অন্য কুঠরীতে বদলী হইতাম। যখন কানাই বা সত্যেনের কাছাকাছি কোন কুঠরীতে আসিতাম তখন রাত্রিকালে চুপি চুপি তাহাদের সহিত কথা কহিতে পারিতাম। দিনের বেলা কাহারও সহিত কথা কহিবার কোন উপায়ই ছিল না। প্রাতঃকালে ও বৈকালে আধঘণ্টা করিয়া উঠানের মধ্যে ঘুরিতে পাইতাম; কিন্তু সকলকেই পরস্পরের কাছ হইতে দূরে দূরে থাকিতে হইত। প্রহরীদের চক্ষু এড়াইয়া কথা কহিবার সুবিধা হইত না।
সমস্ত দিন চুপ করিয়া বসিয়া থাকার যে কি যন্ত্রণা তাহা ভুক্তভোগী ভিন্ন অপর কাহারও বুঝিবার উপায় নাই। একদিন সুপারিনটেনডেন্ট সাহেবের নিকট হইতে পড়িবার জন্য বই চাহিলাম। তিনি দুঃখের সহিত জানাইলেন যে, গবর্ণমেন্টের অনুমতি ব্যতীত আমাদের সম্বন্ধে তিনি কিছুই করিতে পারেন না। নরেনের মৃত্যুর পর তাঁহার হাত হইতে সমস্ত ক্ষমতা কাড়িয়া লওয়া হইয়াছে।
আমরা যখন বাহিরে ঘুরিতাম তখন কানাই ও সত্যেনের কুঠরীর দরজা বন্ধ থাকিত। একদিন দেখিলাম কানাইলালের দরজা খোলা রহিয়াছে। আমরা সেদিকে যাইবার সময় প্রহরীও বাধা দিল না। পরে শুনিলাম যে, কানাইলালের ফাঁসির দিনও স্থির হইয়া গিয়াছে। সেই জন্য প্রহরীরা দয়া করিয়া কানাইকে শেষ দেখিবার জন্য আমাদিগকে ছাড়িয়া দিয়াছে।
যাহা দেখিলাম তাহা দেখিবার মত জিনিষই বটে! আজও সে ছবি মনের মধ্যে স্পষ্টই জাগিয়া রহিয়াছে : জীবনের বাকি কয়টা দিনও থাকিবে। জীবনে অনেক সাধুসন্ন্যাসী দেখিয়াছি, কানাইএর মত অমন প্রশান্ত মুখচ্ছবি আর বড় একটী দেখি নাই। সে মুখে চিন্তার রেখা নাই, বিষাদের ছায়া নাই, চাঞ্চল্যের লেশ মাত্র নাই—প্রফুল্ল কমলের মত তাহা যেন আপনার আনন্দে আপনি ফুটিয়া রহিয়াছে। চিত্রকূটে ঘুরিবার সময় এক সাধুর কাছে শুনিয়াছিলাম যে, জীবন ও মৃত্যু যাহার কাছে তুল্যমূল্য হইয়া গিয়াছে সেই পরমহংস। কানাইকে দেখিয়া সেই কথা মনে পড়িয়া গেল। জগতে যাহা সনাতন, যাহা সত্য, তাহাই যেন কোন্ শুভ মুহূর্তে আসিয়া তাহার কাছে ধরা দিয়াছে। আর এই জেল, প্রহরী, ফাসী কাঠ, সবটাই মিথ্যা, সবটাই স্বপ্ন! প্রহরীর নিকট শুনিলাম ফাঁসির আদেশ শুনিবার পর তাহার ওজন ১৬ পাউণ্ড বাড়িয়া গিয়াছে! ঘুরিয়া ফিরিয়া শুধু এই কথাই মনে হইতে লাগিল যে, চিত্তবৃত্তিনিরোধের এমন পথও আছে যাহা পতঞ্জলিও বাহির করিয়া যান নাই। ভগবানও অনন্ত, আর মানুষের মধ্যে তাঁহার লীলাও অনন্ত।
তাহার পর একদিন প্রভাতে কানাইলালের ফাঁসি হইয়া গেল। ইংরাজশাসিত ভারতে তাহার স্থান হইল না। না হইবারই কথা। কিন্তু ফাঁসির সময় তাহার নির্ভীক, প্রশান্ত ও হাস্যময় মুখশ্রী দেখিয়া জেলের কর্তৃ পক্ষরা বেশ একটু ভ্যাবাচাকা হইয়া গেলেন। একজন ইউরোপীয় প্রহরী আসিয়া চুপি চুপি বারীনকে জিজ্ঞাসা করিল— “তোমাদের হাতে এ রকম ছেলে আর কতগুলি আছে?” যে উন্মত্ত জনসঙ্ঘ কালীঘাটের শ্মশানে কানাইলালের চিতার উপর পুষ্প বর্ষণ করিতে ছুটিয়া আসিল, তাহারাই প্রমাণ করিয়া দিল যে, কানাইলাল মরিয়াও মরে নাই।
কিছুদিন কুঠরীতে বদ্ধ থাকিবার পরে আলিপুরের জজের আদালতে আমাদের মোকর্দমা আরম্ভ হইল। দিনের মধ্যে ঘণ্টা কয়েকের জন্য একটু খোলা হাওয়া খাইয়া ও লোকজনের মুখ দেখিয়া আমাদের প্রাণগুলা হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল। দুই একজন ভিন্ন মোকর্দমার খরচ জোগাইবার পয়সা কাহারও নাই; সুতরাং অরবিন্দ বাবুর সাহায্যের জন্য যে চাঁদা উঠিয়াছিল তাহা হইতেই উকিল-ব্যারিষ্টারদের অল্পস্বল্প খরচ দেওয়া হইতে লাগিল। যাঁহাদের অল্প দক্ষিণায় পোষাইল না তাঁহারা দুই চারিদিন পরেই সরিয়া পড়িলেন; শেষে শ্রীযুক্ত চিত্তরঞ্জন দাশ অর্থের মায়া ত্যাগ করিয়া আমাদের মোকর্দমা চালাইতে লাগিলেন।
হাইকোর্ট ছাড়িয়া আলিপুরে মোকর্দমা চালাইতে আসায় ব্যারিষ্টারদের অনেক অসুবিধা; সুতরাং মোকর্দমা যাহাতে হাইকোর্টে যায়, সে জন্য তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ চেষ্টা করিয়াছিলেন, বিশেষতঃ হাইকোর্টে গেলে বিচারের ভার জুরির উপর পড়িত। বারীন্দ্রের বিলাতে জন্ম; সে একজন পুরাদস্তুর European British born subject. সুতরাং সে ইচ্ছা করিলে মোকর্দমা হাইকোর্টে লইয়া পাইতে পারিত। কিন্তু ম্যাজিষ্ট্রেট যখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন যে, সে বিলাতী সায়েবের অধিকার চায় কি না, তখন সে একেবারে স্পষ্ট ভাষায় বলিয়া দিয়াছিল–না। কাজে কাজেই আলিপুরের জজের কাছে আমাদের বিচার আরম্ভ হইল।
কিন্তু বিচারের কে খবর রাখে, আমরা হট্টগোল লইয়াই ব্যস্ত। আদালত খোলার আরও একটা মহাসুবিধা এই যে, দুপুর বেলা জলখাবার পাওয়া যায়! জেলের ডাল-ভাত খাইয়া খাইয়া প্রাণপুরুষ যেরূপ মুমুর্ষু হইয়া পড়িয়াছিলেন, তাহাতে অনন্তকাল যদি এই মোকর্দমা চলিত, তবুও জলখাবারটুকুর খাতিরে তিনি ঐ ব্যবস্থায় রাজী হইয়া পড়িতেন।
কোর্টে আসিবার ও যাইবার সময় আমাদের হাতকড়ার ভিতর দিয়া শিকল বাঁধা থাকিত। দুপুর বেলা শৌচ প্রস্রাব ত্যাগ করিতে গেলে সেই হাতকড়া পরান অবস্থায় পুলিশ আমাদের রাস্তা দিয়া টানিয়া লইয়া যাইত। আমাদের জন্য ততটা ভাবনা ছিল না; কেন না “ন্যাংটার নেই বাটপাড়ের ভয়।” যাহার মান নাই তাহার আবার মানহানি কি? কিন্তু অরবিন্দ বাবুকে হাতকড়া পরাইয়া টানিয়া লইয়া যাইতে দেখিলে মনটার ভিতর একটা বিদ্রোহ জমাট হইয়া উঠিত। তিনি কিন্তু নিতান্ত নির্বিরোধ ভদ্রলোকের মত সমস্তই নীরব হইয়া সহ্য করিতেন।
সাক্ষীরা একে একে আসিয়া আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়া যাইত; আমাদের মনে হইত যেন থিয়েটার দেখিতে আসিয়াছি। উকিল, ব্যারিষ্টারের জেরা; পুলিশ-কর্মচারীদের ছুটাছুটি, সবই যেন একটা বিরাট তামাসা! আমাদের হাস্য-কোলাহলে মাঝে মাঝে আদালতের কাজকর্ম বন্ধ হইয়া যাইবার উপক্রম হইত। জজ সাহেব আমাদের হাতকড়া লাগাইবার ভয় দেখাইতেন, ব্যারিষ্টারেরা ছুটিয়া আসিয়া অরবিন্দবাবুকে অনুরোধ করিতেন, “ছেলেদের একটু থামতে বলুন।” অরবিন্দ-বাবু নির্বিকার প্রস্তর মূর্তির মত এক কোণে চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতেন; ব্যারিষ্টারদের অনুরোধের উত্তরে জানাইতেন যে, ছেলেদের উপর তাঁহার কোনও হাত নাই।
বিচারসংক্রান্ত সব স্মৃতিটাই প্রায় ছায়ার মত অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে—শুধু মনে আছে, ইন্সপেক্টর শ্যামশুল আলমের কথা। আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী-সাবুদ জোগাড় করিবার ভার তাঁহার উপরই ছিল। মিষ্ট কথায় কিরূপে কাজ গোছাইতে হয়, তাহা তিনি ভাল করিয়াই জানিতেন; ভাই . ছেলেরা তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া গান গাহিত—“ওগো, সরকারের শ্যাম তুমি, আমাদের শূল। তোমার ভিটেয় কবে চরবে ঘুঘু, তুমি দেখবে চোখে সরষে ফুল!” আমাদের মোকর্দমা শেষ হইবার পর সরকার বাহাদুর তাঁহার যথেষ্ট পদোন্নতি করিয়া দেন, কিন্তু অদৃষ্টের নিষ্ঠুর পরিহাসে তাঁহাকে সে পদ-গৌরব অধিক দিন ভোগ করিতে হয় নাই।
কোর্ট ইন্সপেক্টর শ্রীযুক্ত আবদর রহমান সাহেবের কথাও মনে পড়ে, কেননা আমাদের জলখাবার জোগাইবার ভার তাঁহারই উপর ছিল। দৈত্যকুলে প্রহ্লাদের মত তিনি ছিলেন পুলিস কর্মচারীদের মধ্যে এক মাত্র ভদ্রলোক। আমাদের সম্ভবতঃ দ্বীপান্তরে যাইতে হইবে, এই কথা ভাবিয়া তাঁহার মুখে যে করুণার ছবি ফুটিয়া উঠিত তাহা আজও বেশ স্পষ্ট মনে পড়ে।
কিন্তু এ সমস্ত বাহিরের কথা আমাদের খুব বেশী আন্দোলিত করিত না। আমাদের মধ্যে তখন অন্তর্বিপ্লব আরম্ভ হইয়া গিয়াছে। তাহাই তখন আমাদের কাছে মোকর্দমার দৈনন্দিন ঘটনা অপেক্ষা ঢের বেশী সত্য।
