আঁধারগ্রামের আলো – সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়
বহু বছর পর আজ বাসের মাথায় চড়েছে প্রবীর। বাধ্য হয়েই। স্কুল- কলেজবেলায় চড়ত। ফাঁকি দেওয়া যেত ভাড়া। যাত্রাটাও হত খোলামেলা, আরামের। তখন তাদের কষ্টের সংসার। ভাড়া বাঁচানো পয়সায় বই-খাতা কিনত। গ্রামের গরিবগুরবো মানুষ আর জিনিসপত্র সঙ্গে থাকা ব্যাবসাদাররা এভাবেই যাতায়াত করে।
প্রবীর এদের মধ্যে কেউই নয়। গ্রামের ভাষায় সে এখন ‘বাবুমানুষ’। বি এ পাশ। সরকারি চাকরি করা ছেলে। তবু বাসের মাথায় উঠতে হয়েছে সঙ্গে বড়োসড়ো প্যাকিংবাক্স থাকার জন্যে। চাকরিটা সদ্য পেয়েছে, এক মাস হল। দু-দিনের ছুটি নিয়ে দেশের বাড়ি ফিরছে আজ। চাকরির সন্ধানে এবং বিশেষ ধরনের পড়ালেখার জন্যে গত চার-পাঁচ বছর শহরেই থাকতে হয়েছে প্রবীরকে। কদাচিৎ এসেছে গ্রামে। জীবনে দাঁড়িয়ে যাওয়া প্রবীরের এবারের দেশের বাড়ি আসাটা অনেক বেশি আনন্দের। বাসের মাথায় হু-হু হাওয়ার মধ্যে সে যেন তাদের জগমোহনপুরের গন্ধ পাচ্ছে।
নীচে কনডাক্টর চেঁচাচ্ছে, ‘কালিয়াশোল… কালিয়াশোল… এরপরই রথতলা।’ প্রবীরদের গ্রামে যাওয়ার স্টপ। প্যাকিংবাক্সটা নিজের পাশে টেনে নিয়ে নামার জন্য তৈরি হল প্রবীর।
খানিক পরেই এসে গেল রথতলা। কনডাক্টর বাসের পিছনে এসে বাক্সটা নামাতে সাহায্য করল। অশ্বত্থ গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটে ভ্যানরিকশার একটা এগিয়ে এল প্রবীরের কাছে। ভানুদা, চেনা রিকশাওলা। প্রবীরদের জগমোহনপুরেই বাড়ি।
বেশ দম লাগিয়ে রিকশায় বাক্সটা তুলল ভানু। বলল, ‘অনেকদিন পরে এলে বাড়ি। কী নিয়ে এলে এতে?’
রিকশার পাটাতনে বসে প্রবীর মজার গলায় জানতে চাইল, ‘তুমি আন্দাজ করো তো দেখি!’
রিকশার সিটে বসল ভানু। প্যাডেলে চাপ দিয়ে বলল, ‘মনে তো হচ্ছে টিভি।’
প্রবীর বলল, ‘টিভি চলবে কী করে, আমাদের গ্রামে কারেন্ট কই?’ লাল নুড়ি বিছানো রাস্তায় রিকশা চলছে গড়গড় করে। ভানু বলল, ‘ব্যাটারিতে চলবে। নবগ্রামে দুটো বাড়িতে যেমন চলে।’
প্রবীরদের গ্রামে কারও বাড়িতেই টিভি নেই। অতি উৎসাহীরা পাশে নবগ্রামের বাড়ি দুটোয় টিভি দেখতে যায়। সে বাড়ির লোক যথেষ্ট বিরক্ত হয়, প্রবীর তা জানে। তা হলে কি নিজেদের গ্রামের জন্য একটা টিভি কিনে আনলেই ভালো হত?
এখনও পাঁচ কিলোমিটার প্রবীরদের জগমোহনপুর। বাস যায় না। হাঁটা বা রিকশাই ভরসা। এতটা পথ, তাই কথা চালিয়ে গেল প্রবীর, বাড়ির জন্য টিভি কিনে কী লাভ বলো ভানুদা? দেখার তো কেউ নেই! ‘
‘তা অবিশ্যি ঠিক। তা হলে আছে কী ওতে?’
‘এখন বলব না। পরে জানতে পারবে।’ বলে চুপ করে গেল প্রবীর ভানুও আর কৌতূহল দেখাল না। একবার বাঁয়ে, পরে ডাইনে হেলে নির্দিষ্ট ছন্দে টেনে চলেছে রিকশা। রাস্তার দু-ধারে ধান, সবজির খেত। কখনো- বা জলা। রোদ মাথার উপর। শীতের শুরু বলে গরম তত লাগছে না।
প্রবীর বলে দিতেই পারত, বাক্সে কী আছে। কিন্তু সারপ্রাইজ দেওয়ার লোভটা সামলাতে পারল না। পরশু দিন চাকরি জীবনের প্রথম মাইনে পেয়েছে প্রবীর। চাকরিটা পুলিশের। ওরা এখন পুলিশট্রেনিং কলেজে আছে। গতকাল বন্ধুরা মিলে বাড়ির জন্য বেরিয়েছিল বাজার করতে। সকলেই বাবা-মা, ভাই-বোনের জন্য কিছু-না-কিছু কিনল। প্রবীরের কাউকে কিনে দেওয়ার নেই। বাবা মারা গিয়েছেন, সে যখন কলেজে পড়ে। মা গেলেন প্রবীর চাকরিতে ঢোকার দু-মাস আগে। একটাই বোন, বিয়ে হয়ে চলে গিয়েছে দূরে, আগ্রায়। বাড়ি ফাঁকা। তবু বন্ধুদের সঙ্গে বাজারে গিয়ে প্রবীর যা কিনল, সবাই থ।
‘কী ঠিক করলে, বাড়ি-জমি রাখবে, না কি বেচে দেবে?’ রিকশা চালাতে চালাতে জিজ্ঞেস করল ভানু।
একটু অবাক হয়ে প্রবীর বলল, ‘বিক্রি করব কেন? কোনো অসুবিধে তো হচ্ছে না।’
ভানু বলল, ‘না, আসলে গ্রাম থেকে যারা শহরে চাকরি করতে যায়, থেকে যায় পাকাপাকিভাবে। তোমার তো আবার পুলিশের চাকরি। কাঁহা কাঁহা মুলুকে বদলি করে দেবে। তখন কি আর হুট বলতে আসতে পারবে? একটা সময় টানও কমে যাবে বাড়ির উপর। তুমি যদি বিক্রি না করো, বসত, চাষের জমি সব খাঁ খাঁ করবে।
কথাটা খুব একটা ভুল বলেনি ভানুদা। নিজেদের বাড়ি-জমির জন্য বুকটা টনটন করে উঠল প্রবীরের। তবে একটা ব্যবস্থা সে রেখেছে। সেটাই খেয়াল করিয়ে দিল ভানুকে, ‘আমাদের জমি-বাড়ি তো সহদেবদা দেখছে, আমার চিন্তা কীসের?’
‘সহদেবের কথা আর বোলো না। ওর মতো বাউন্ডুলের হাতে কেউ সম্পত্তির ভার দেয়? কতক্ষণ থাকে তোমাদের ভিটেয়? সারা দিনমান ঘুরে বেড়াচ্ছে এ-গ্রাম সে-গ্রাম। ও দেখবে তোমাদের চাষাবাদ?’
ভানুদার এই কথাটাও ফেলা যায় না। সত্যিই সহদেবদা গ্রামসেবায় সদাব্যস্ত। স্কুলছুট ছাত্রদের পৌঁছে দিয়ে আসছে স্কুলে। সরকারি সাহায্য নিয়ে আসছে হাসপাতালে। ডাক্তার, শিক্ষকরা লম্বা ছুটি নিলে পৌঁছে যাচ্ছে তাদের বাড়ি। মানুষের বিপদেআপদে সবসময় পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। মা যখন মারা গেলেন, খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল প্রবীর। শ্রাদ্ধের আগে একদিন সমস্যার কথা বলছিল সহদেবকে, ‘আমি শহরের দিকে একটা চাকরিবাকরি পেয়েই যাব। তখন এই ভিটে-জমির কী হবে সহদেবদা?’
উত্তরে বেশ জোর দিয়ে সহদেব বলেছিল, ‘কেন? আমি থাকব। আমিই দেখাশোনা করব তোদের জমি-বাড়ি। খামোকা বিক্রিটিক্রির কথা ভাবতে যাস না আবার! মনে রাখবি, এই জমির জল-হাওয়ায় তুই বড়ো হয়ে উঠেছিস। বাবা-মায়ের পায়ের ধুলো লেগে আছে এই মাটিতে। চাকরি যত দূরেই হোক, আসবি মাঝেমধ্যে ছুটি নিয়ে। নিজের গ্রাম, পৈতৃক ভিটেকে একেবারে ভুলে যাস না।’
প্রবীর হয়তো ভুলবে না। তাই তো প্রথম মাসের মাইনে মায়ের হাতে তুলে দিতে পারবে না জেনেও গ্রামে ফিরছে। কিন্তু বাড়ি-জমির দেখভাল সহদেবদা কতটা কী করছে, কে জানে!
ভ্যানরিকশা বোঁয়াইচণ্ডীর মোড়ে চলে এসেছে। বাঁ-দিকের রাস্তাটা চলে গিয়েছে সিধে প্রবীরদের পাড়ায়। মোড়ের সারের দোকান থেকে ভেসে এল নিমাই লাহার গলা, ‘অ্যাই প্রবীর, গাড়িটা দাঁড় করা, কথা আছে।’
ভানু রিকশা থামাল। দোকান থেকে বেরিয়ে নিমাই লাহা হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল। বলল, ‘সহদেব গিয়েছে কালীগঞ্জে। স্বাস্থ্যশিবির না কী যেন হচ্ছে ওখানে। দোকানে বলে গেল, তুই আজ আসবি। দুপুরটা রেঁধেবেড়ে খেয়ে নিতে বলেছে তোকে। সে ফিরবে রাতে।’
‘ঠিক আছে।’ মুখে বললেও প্রবীর একটু দমে গেল। সেই কোন ভোরে পুলিশট্রেনিং কলেজ থেকে বেরিয়েছে। প্রথমে নৌকোয় চেপে নদী পেরিয়ে ট্রেন। বর্ধমানে নেমে বাসের মাথায় দু-ঘণ্টা। ভেবেছিল, বাড়িতে গিয়ে দেখবে, গরম গরম ডাল-ভাত-তরকারি করে রেখেছে সহদেবদা। কিন্তু কোথায় কী। এখন নিজেকে গিয়ে সব করতে হবে।
রিকশা ফের চলতে শুরু করল। ভানু বলল, ‘কী বলেছিলাম, মিলে গেল তো? সহদেবের এমনই কাণ্ড। তুমি আর লোক পেলে না?’
ভানু কত কী বলে যাচ্ছে! প্রবীরের মন চলে গিয়েছে নিজের বাড়ির মাটির দালানে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর ডান পাশের শালখুঁটির টঙে একটা ফোকর। সেইখানেই থাকে বাড়ির চাবি। জানে শুধু প্রবীর আর সহদেব। চাবিটা সহদেবদা যদি জায়গামতো রাখতে ভুলে গিয়ে থাকে, রাত অবধি বাইরেই বসে থাকতে হবে।
আশঙ্কা বাড়ি ঢোকার আগেই দূর হল। মাইতিদের উঠোনে আসতেই দেখা গেল, প্রবীরদের খড়ের চারচালা মাটির বাড়ি।
দেখা যাচ্ছে দরজা খোলাই আছে। তা হলে কি ফিরে এল সহদেবদা?
‘নাও, মনে হচ্ছে বাবু আছেন।’ বলে উঠোনে এসে দু-বার হর্ন বাজিয়ে রিকশা থামাল ভানু।
ভিতরবাড়ি থেকে কেউ কিন্তু বের হল না। ভানু, প্রবীর মিলে প্যাকিংবাক্সটা দালানে ওঠাল।
ভানু বলল, ‘এত ভারী কেন? কী এনেছ বললে না তো?’
ভানুকে পয়সা মিটিয়ে প্রবীর বলল, ‘আর একবেলা পরে সবই জানতে পারবে। এখন বলে দিলে মজাটাই মাটি!’
রিকশা ঘুরিয়ে চলে গেল ভানু। দালানে পা ঝুলিয়ে বসল প্রবীর। আড়মোড়া ভাঙল। হাঁক দিল, ‘কোথায় গেলে গো সহদেবদা।
কোনো সাড়া নেই। বাড়ির লাগোয়া গাছপালা থেকে ভেসে এল পাখির কিচিরমিচির। পুকুর বা মাঠে গিয়েছে মনে হচ্ছে। দালান থেকে নেমে পুকুরের দিকে এগোল প্রবীর। পুকুরঘাটে কাউকেই দেখা গেল না। পুকুরের পাশেই প্রবীরদের খেতজমি। মাঠ ভরে আছে ফলন্ত ধানগাছে। চাষের ব্যাপারে নজর রেখেছে সহদেবদা। ভানুদা অযথাই দোষ দিচ্ছিল। মাঠে কোনো চাষের লোক দেখা যাচ্ছে না। দেখার কথাও নয়। ফসল উঠে যাওয়ার পর কাজ তেমন থাকে না। জমির দিকে তাকিয়ে ফের একবার হাঁক পাড়ল প্রবীর, ‘সহদেবদা! ও সহদেবদা!
‘সহদেবের ফিরতে রাত হবে।
কানের পাশে কোনো এক মহিলার এগুলা। চমকে ঘাড় ফেরাল প্রবীর। না, পাশে কেউ নেই, সাদা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন দূরে, দালানের উপর। উনিই বলেছেন কথাটা। গ্রামের দিকে ফাঁকা জায়গায় এরকমই হয়। দূর থেকে ভেসে আসা কথা কানের কাছে স্পষ্ট হয়ে বাজে। মহিলাকে প্রবীর চিনতে পারল না। সেটাই স্বাভাবিক, ইদানীং দেশের বাড়ি খুব কমই আসা হয়।
উঠোনে ফিরে এল প্রবীর। বৃদ্ধার হাতে গামছা, লুঙ্গি। প্রবীরের দিকে এগিয়ে ধরে বললেন, ‘যা, তেতেপুড়ে এয়েছিস। পুকুরে দুটো ডুব দিয়ে আয়। আমি রেঁধে রেখেছি!
বেশ একটা শাস্তি নেমে এল প্রবীরের মনে। সহদেবদা তার মানে শেষ মুহূর্তে সব ব্যবস্থাই করে রেখে গিয়েছে। কেন না, নিমাই লাহা বলছিল প্রবীরকেই দুপুরের রান্নাবাড়া করতে হবে।
বৃদ্ধা মানুষটির হাত থেকে লুঙ্গি, গামছা নেওয়ার পর প্রবীরের দৃষ্টি হোঁচট খেল দালানে, প্যাকিংবাক্সটা কোথায় গেল?
প্রবীরের চিন্তিত মুখ দেখে বৃদ্ধা বললেন, ‘বাক্সটা আমি ঘরে তুলে রেখেছি।’
অবাক হল প্রবীর। বলল, ‘সে কী! অত ভারী বাক্স আপনি ঘরে নিয়ে গেলেন কী করে?’
‘আমরা গ্রামের মানুষ, এর চেয়েও ভারী জিনিস বওয়ার অভ্যেস আছে আমাদের।’ বললেন বৃদ্ধা।
কথা বাড়াল না প্রবীর। ঘরে ঢুকল প্যান্ট-জামা ছাড়তে। বাক্সটা যথেষ্ট ওজনদার। একা বইতে হিমশিম খেতে হয়েছে। দালানে তোলার সময় সাহায্য নিতে হয়েছে ভানুদার। বৃদ্ধা সেটা একা নিয়ে এলেন ভিতরে? ক্ষমতা আছে বলতে হবে! পুলিশ হিসেবে এ তো বৃদ্ধার কাছে হার হল প্রবীরের। লুঙ্গি পরে গামছা কাঁধে মাথা নীচু করে বৃদ্ধার সামনে দিয়ে দালান থেকে নেমে এল প্রবীর।
.
চান-টান করে এসে প্রবীর খেতে বসল। অনেক ক-টা পদ রান্না করেছেন মহিলা। রান্নার স্বাদও দারুণ। সামনে বসে থেকে খাওয়াচ্ছেন। ওঁর পরিচয়টা এখনও জানা হয়নি। জিজ্ঞেস করতে সংকোচ হচ্ছে। হয়তো নিকটাত্মীয় কেউ। কথায় কথায় ঠিকই বেরিয়ে পড়বে।
প্রবীর বলল, ‘একটা বেলা আমি ভাতে-ভাত করে নিতে পারতাম। সহদেবদা কেন যে আবার আপনাকে কষ্ট দিল! তবে এত সুন্দর রান্না অনেদিন খাইনি!’
বৃদ্ধা মানুষটি বললেন, ‘তুই তখন থেকে আমায় ‘আপনি, আপনি’ করে যাচ্ছিস কেন রে? চিনতে পারছিস না আমাকে?’
প্রবীরের মুখে অপরাধীর হাসি। বৃদ্ধা বললেন, ‘আমি হচ্ছি তোর লতুমাসি। মাইলটাক দূরে ক্যানেলপাড়ে বাড়ি। যখন ছোটো ছিলি, হামেশাই আসতাম তোদের বাড়িতে। তোর মায়ের সঙ্গে খুব ভাব ছিল আমার। আমার কোলে কত খেলা করেছিস তুই! মনে পড়ছে এবার?’
মোটেই পড়ছে না। তবু হাসিহাসি মুখ করে প্রবীর বলল, ‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ। মনে পড়েছে। আসলে অনেকদিন আগের কথা তো! বড়ো হওয়ার পর কিন্তু তোমাকে আমাদের এখানে আর দেখিনি।’
‘কী করে দেখবি? উপায় ছিল না আসার।’ বিমর্ষ গলায় বললেন লতুমাসি। কেন ছিল না, জানতে চাইল না প্রবীর। মনে হচ্ছে কোনো দুঃখের কাহিনি লুকিয়ে আছে।
খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। প্রবীর এবার কথা নিয়ে গেল অন্য প্রসঙ্গে। বলল, ‘দুপুরের খাওয়া-দাওয়া না-হয় আরাম করে হল। বিকেলের কাজের ব্যবস্থাটা সহদেবদা কী করে রেখেছে, কে জানে! যার জন্য আমার আসা।’
‘সেটাও হয়ে যাবে।’
লতুমাসির কথায় খাওয়া থেকে মুখ তুলল প্রবীর। বলল, ‘কাজটা কী জানেন? বলে গিয়েছে সহদেবদা?’
‘হ্যাঁ, সব ব্যবস্থাই সে করে গিয়েছে। বিকেলবেলা গ্রামের বিধবা বৃদ্ধারা আসবে। তখনই থান কাপড়গুলো দিয়ে দিস!
মনে মনে আরও একবার সহদেবদাকে কৃতজ্ঞতা জানাল প্রবীর। কাজ গুছিয়ে রেখে গিয়েছে। আজ যদি শাড়িগুলো বিলি করা না যেত, ছুটি বাড়াতে হত একটা। নতুন চাকরির পক্ষে যা মোটেই ভালো কথা নয়। বড়োসাহেবরা ব্যাপারটা পছন্দ করেন না।
লতুমাসি বললেন, ‘তোর মনটা কত বড়ো! চাকরির প্রথম মাইনে থেকে গ্রামের সমস্ত বিধবাকে একটা করে থান দিবি। অনেক অনেক আশীর্বাদ পাবি তাদের থেকে। তোর আগে এ গ্রামের কত ছেলেই তো ভালো ভালো চাকরি পেয়েছে। শহরে গিয়ে সুখে ঘর-সংসার করছে তারা। ভুলেই গিয়েছে গ্রামের কথা। তোর মা নেই, গ্রামে পরিবারের কেউই নেই। তবু আমাদের ভুলিসনি তুই!’
নিজের প্রশংসা সামনাসামনি শোনা বড়ো অস্বস্তিকর। লাজুক মুখে হাত-মুখ ধুতে উঠে গেল প্রবীর।
ঘরের চালে বসে দাঁড়কাক ডাকছে। যেন কথা বলছে প্রায়। খাওয়া- দাওয়া সেরে প্রবীর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। মাথার পাশে জানলা। দেখা যাচ্ছে আদিগন্ত মাঠ, গাছ, পুকুর… সবই আছে, শুধু মানুষ নেই। বাড়ির উঠোনে আজ বিড়াল, কুকুরও দেখা গেল না। আগে যখনই এসেছে, রান্নার গন্ধে চলে এসেছে তারা। আজ যেন বড্ড নির্জন লাগছে নিজেদের ভিটেটা। একসময় এ বাড়িতেই কত হাঁকডাক। বসতটুকু বাদ দিয়েই চাষের জমি, বাবা চাষাবাদ নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত। ঘর-সংসার সামলে মা, বোন সাহায্য করতেন বাবাকে। পাড়ার লোকের যাতায়াত লেগেই থাকত। এবার যেন গোটা গ্রামটা একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগল। সবাই কি শহরে চলে যাচ্ছে?
.
লতুমাসি বাড়ি ফিরে গেলেন খানিক আগে। বললেন, বিকেলে বৃদ্ধাদের নিয়ে আসবেন।
প্রবীর জিজ্ঞেস করল, ‘কতজন হবে মনে হয়?’
মাসি জানতে চাইলেন, ‘শাড়ি ক-টা এনেছিস?’
প্রবীর বলল, ‘দেড়শো মতো। সহদেবদা এরকম হিসেবই দিয়েছে।’ লতুমাসি বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ওতেই হয়ে যাবে। তবে আমাকে তুই বাবা দুটো শাড়ি দিস!
আবদারটাকে প্রশ্রয় না দিতে চেয়ে প্রবীর বলল, ‘দুটো শাড়ি কি তুমিই নেবে? আমি যে মাথাপিছু একটা এনেছি।’
‘না রে, আমার চেনা একজন আছে, সে আসতে পারবে না।’
‘কেন পারবেন না আসতে? শরীর অসুস্থ??
‘না, তার আসলে খুব লজ্জা!’ লজ্জাটা যে আসলে লতুমাসির, বুঝতে অসুবিধে হয়নি প্রবীরের। বেচারির বলতে সংকোচ হচ্ছে, ‘শাড়ি দুটো আমিই পরব’। আহা, পরুন! নিজের ঘরের কাজ ছেড়ে এসে প্রবীরের জন্য সকাল থেকে রান্নাবাড়া করছেন। প্রবীরের এখন প্রধান চিন্তা বিকেলের প্রোগ্রাম নিয়ে। দেড়শোজন বৃদ্ধাকে শাড়ি দিতে হবে। লতুমাসির মতো আর কেউ যদি দুটো শাড়ি চান, অথবা দেড়শোর বেশি ক্যান্ডিডেট চলে আসেন, কী করে সামলাবে প্রবীর? সহদেবদা থাকলে এসব নিয়ে ভাবতেই হত না।
মায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে প্রবীরের। বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন। নিজের হাতে শাড়ি দিতেন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়জনদের। গর্বে ডগমগ করত মায়ের মুখ।
শাড়ি দেওয়ার প্ল্যানটা মাথায় আসার পরই সহদেবকে ফোন করেছিল প্রবীর। সহদেব খুবই উৎসাহিত হয়ে বলেছিল, ‘দারুণ ভেবেছিস! তোর বাড়ির লোক না থাকলে কী হবে, আমাদের গ্রামের দিকে পাড়াপ্রতিবেশীরা তো একটা যৌথ পরিবারের মতোই থাকি। সেখানকার সব বিধবা বয়স্কা আমাদের আত্মীয়, গুরুজন।
সেই গুরুজনদের মধ্যে একজন লতুমাসি। যাঁকে আজ চিনতেই পারল না প্রবীর। ব্যাপারটার জন্য প্রবীর এখনও মরমে মরে আছে।
.
বিকেলে লতুমাসি এসে ঘুম ভাঙালেন, ‘প্রবীর, এবার ওঠ রে। বেলা ফুরিয়ে এল। ওরা সব এসে পড়েছে উঠোনে।’
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল প্রবীর। ওরা কারা? বুঝতে একটু সময় লাগল। খেয়াল হল, গ্রামের বিধবা বৃদ্ধাদের কথা। জানলার বাইরে তাকাল। আলো একেবারেই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। অনেকক্ষণ ধরে হয়তো অপেক্ষা করছেন বৃদ্ধারা। বিছানা থেকে নেমে এল প্রবীর। পাকশাল থেকে ভেসে এল লতুমাসির গলা, ‘চা করছি। খেয়ে নিয়ে বিলি করতে বসিস!
ঘরের চৌকাঠে গিয়ে দাঁড়াল প্রবীর। উঠোনে বৃদ্ধাদের ভিড় দেখে চমকে উঠল! দেড়শো ছাড়িয়ে যাবে না তো? ওঁরা ইতস্তত দাঁড়িয়ে-বসে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছেন। অনেকদিন পর একসঙ্গে হতে পেরেছেন সকলে। শাড়ির পেটিটা ফের বারান্দায় রাখা হয়েছে। পাশে জলচৌকি, যেখানে বসবে প্রবীর। বোঝাই যাচ্ছে এসব লতুমাসির কাজ। খুবই পরিপাটি স্বভাবের মহিলা। সহদেবদা উপযুক্ত মানুষই রেখে গিয়েছে। পাঁচ-ছ-জন বৃদ্ধা উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে দেখছেন পেটিটা। দুজন আবার পেটির গায়ে নাক ঠেকিয়ে গন্ধ শুঁকলেন। নতুন শাড়ির গন্ধ পেতে চাইছেন, ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে ওঁদের। কতদিন পর হয়তো নতুন থানকাপড়ের গন্ধ পাবেন। প্রবীরদের গ্রামটা যে বড়োই গরিব।
‘এই নে, চা ধর!’
লতুমাসি এসে দাঁড়ালেন পিছনে। মাসির হাত থেকে চা নিল প্রবীর। থানকাপড় বিলি করছে প্রবীর। সকলেই সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে আছেন লাইনে। অনেকটা করে ঘোমটা টেনে রেখেছেন বৃদ্ধারা। গ্রামের মানুষদের সংকোচ একটু বেশি। দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করছেন প্রবীরকে। লতুমাসির জন্য প্রবীর দুটো শাড়ি আলাদা সরিয়ে রেখেছে। সব শেষে দেবে। প্রবীরকে শাড়ি বিলি করতে সাহায্য করে যাচ্ছেন মাসি। আলাপ করিয়ে দিচ্ছেন বৃদ্ধাদের সঙ্গে।
একসময় শেষ হল কাপড় বিলি। কম পড়েনি। সকলেই পেয়েছেন। গোটা কাজটা সুষ্ঠুভাবে সমাধা হলেও, কোথায় যেন একটা ফাঁকা রয়ে গেল। বৃদ্ধারা চলে গিয়েছেন। উঠোন এখন ফাঁকা। শুধু একটা কাঠবিড়ালি কেমন যেন ভয় পেয়ে দৌড়োদৌড়ি করছে সেখানে। লতুমাসি আছেন এখনও।
প্রবীর জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা মাসি, আমাদের উঠোনে এরকম একটা ব্যাপার হল, গ্রামের কেউ তো দেখতে এল না?’
লতুমাসি বললেন, ‘তা আসবে কেন? ওদের যে হিংসে হয়েছে। আমাদের তো সকলেই হেলাফেলা করে। আজ আমাদের সুখের দিন, সহ্য হবে কেন ওদের?
প্রবীর হেসে ফেলল। তাদের গ্রামের লোকগুলো এখনও ছেলেমানুষই রয়ে গেল। সহদেবদা কোনো উন্নতি করে উঠতে পারেনি।
লতুমাসির হাতে থানকাপড় দুটো দিয়ে প্রবীর বলল, ‘তোমার সেই লাজুক বৃদ্ধাকে বোলো, শাড়ি নিতে আসতে না পারলেও আশীর্বাদটা যেন দূর থেকে করেন।
‘তার আশীর্বাদ সবসময়ই তোর মাথার উপর আছে।’ বলে, শাড়ি দুটো নিয়ে উঠোনে নেমে গেলেন লতুমাসি। সন্ধে হয়েই এসেছে প্রায়। একটু পরেই লতুমাসি মিলিয়ে গেলেন: গাছপালা ঘেরা রাস্তার অন্ধকারে।
সন্ধে গাঢ় হতে আরও একা হয়ে গেল প্রবীর। গাছে ফিরে আসা পাখিরা চেঁচামেচি থামিয়েছে। ভিটে ঘিরে এখন ঝিঝির কোরাস। পুকুরধারে, ঝোপঝাড়ে জ্বলে উঠেছে জোনাকি। লম্প জ্বালিয়ে স্কুলবেলার বইখাতা ওলটাচ্ছে প্রবীর। একসময় যখন ভাবছে, রাতের রান্নাটা চাপিয়ে দেবে কি না, তখনই বাইরে সাইকেলের ঘণ্টি। উঠোন থেকেই হাঁক পাড়ল সহদেব, ‘কী রে? খুব রেগে গিয়েছিস আমার উপর?’
উত্তর না দিয়ে সহদেবের জন্য অপেক্ষা করল প্রবীর। সাইকেল দালানে তুলে ঘরে এল সে। ফের বলল, ‘কিছু মনে করিস না ভাই! কালীগঞ্জে আমি না গেলে স্বাস্থ্য সচেতন ক্যাম্পটা করাই যেত না। সরকারি ডাক্তারদের সঙ্গে সহজভাবে মিশতে পারে না গ্রামের লোক!
প্রবীর বলল, ‘না না, আমার কোনো অসুবিধে হয়নি। তুমি তো সব ব্যবস্থাই করে গিয়েছিলে।’
সহদেব একটু থমকাল। বলল, ‘মানে?’
প্রবীর বলল, ‘লতুমাসি থাকায় আমার কোনো সমস্যাই হয়নি।’
‘কে লতুমাসি?’ কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চাইল সহদেব।
প্রবীর অবাক হয়ে বলল, ‘সে কী! নিজে ঠিক করে গিয়েছ তাঁকে, এখন চিনতে পারছ না? দুপুরে রান্নাবান্না করে রাখলেন মাসি। বিকেলে…।’
‘দাঁড়া, দাঁড়া!’ বলে কথার মাঝে বাধা দিল সহদেব। বিছানায় এসে বসল। উদবিগ্ন আগ্রহে জানতে চাইল, ‘এবার বল তো, ঘটনাটা কী? কে এসেছিল দুপুরে?’
বাড়ি ফেরা থেকে সন্ধে অবধি যা-যা ঘটেছে, সবিস্তার সহদেবকে জানাল প্রবীর। কখনো চোখ বড়ো বড়ো, কখনো-বা চোখ ছোটো, ভ্রু কুঁচকে সহদেব শুনে গেল বৃত্তান্ত। তারপর কপালে হাত রেখে বসে রইল। প্রবীর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল তোমার! অমন করে বসে রইলে কেন?’
মাথা সোজা করল সহদেব। সন্দেহের গলায় জানতে চাইল, ‘এই লতুমাসি কোথায় থাকেন, কিছু বলেছেন?’
‘হ্যাঁ, বললেন তো ক্যানেলপাড়ে। আমার ছেলেবেলায় এ বাড়িতে নাকি আসতেন খুব!’
নীচের ঠোঁট উলটে দৃষ্টি চালার দিকে তুলে কী যেন ভাবতে বসল সহদেব। একটু পরে আশঙ্কিত গলায় বলল, ‘ক্যানেলপাড়ে চার ঘর মণ্ডলদের বাস। বিমল মণ্ডলের মা লতিকা মণ্ডল বহুদিন ধরে ভুগে বছর পাঁচেক হল মারা গিয়েছেন। ঠিকই, তোর মায়ের সঙ্গে খুব ভাব ছিল তাঁর। কিন্তু তিনি কী করে আসবেন? ‘
বুকটা ছমছম করে উঠল প্রবীরের। এতক্ষণে বাড়ির চারপাশের নির্জনতা, ছায়া-অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। শুকনো গলায় বলল, ‘এই রে, আরও যেসব বৃদ্ধা এসেছিলেন, তাঁরাও কি…?’
সহদেব বলল, ‘তাই তো মনে হচ্ছে। কেন না, কালীগঞ্জের কাজটা হঠাৎ পড়ে যেতে আমি গ্রামের সব বৃদ্ধাকেই বলে রেখেছিলাম, কাল সকালে দেওয়া হবে শাড়ি। এই তো, এখন আসার সময় বেশ কয়েক জন বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন, সত্যিই কাল দেওয়া হবে কি না?’
‘কী হবে তা হলে? আর শাড়ি পাব কোথায়? সব তো শেষ।’ হতাশ গলায় বলল প্রবীর।
সহদেব ঘাবড়াল না। বলল, ‘ও নিয়ে অত ভাবিস না। আমি ওদের বলে দেব, সামনের মাসে দেওয়া হবে। খরচা ডবল হবে তোর, এই যা! তবে আজকের ঘটনাটা পাঁচকান করিস না! ‘
‘কেন?’ বিষম কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল প্রবীর।
সহদেব বলল, ‘এমনিতে তো গ্রামে লোকজন থাকতে চায় না, আসতেও চায় না। তারপর এই ভূতটুতের ঘটনা কানে গেলে আরও শুনশান হয়ে যাবে জায়গাটা।’
প্রবীর বলল, ‘কিন্তু এঁরা যে এ গ্রামেই আছেন, এসেও ছিলেন আমাদের উঠোনে, এটা তো সত্যি?’
‘হোক সত্যি। সব কিছুর অত হিসেব ধরলে চলে না। তুই সামনের মাসে মাইনে পেলে আবার থানকাপড় নিয়ে চলে আসবি। আমি এখন উঠি, রান্নার জোগাড় করতে হবে।’
সহদেব চলে গেল। প্রবীর জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকল। আকাশের ঢালে ফালি চাঁদ। ম্লান আলো। বাঁশঝাড়ের ভিতরে টিমটিম করে জ্বলছে জোনাকি। আচমকা আসা হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে খেতভরা ধানগাছ। প্রবীরের চোখে ভেসে উঠছে দুপুরের দৃশ্য। কখনো তাঁদের অশরীরী মনে হয়নি। ঘোমটাটা একটু বেশি করে টেনে রেখেছিলেন, এই যা! তাঁদের অস্তিত্ব বোধহয় পশুপাখিরা টের পেয়ে থাকবে। দাঁড়কাকটা কি কিছু বলতে চাইছিল? কাঠবিড়ালিটা তো ভয়ে অস্থির। বিড়াল, কুকুর মাড়াল না চত্বর। শাড়িগুলো নিয়ে কোথায় গেলেন তাঁরা? লতুমাসি অত কথা বললেন, এতটুকু খোনা সুর শোনা যায়নি!
এইসব ভাবতে ভাবতেই প্রবীর দেখল, সাদা শাড়ি পরা কারা যেন পুকুর, খেত, মাঠের উপর ভেসে বেড়াচ্ছে! গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল প্রবীরের। তবে ভয়ে কাবু হয়ে পড়ল না। বুঝতে পারল, ফিরে এসেছেন তাঁরা। নতুন শাড়িটা পরে এসে প্রবীরকে দেখাচ্ছেন। সাদা প্রজাপতির ডানা মনে হচ্ছে তাঁদের। লতুমাসিও আছেন নিশ্চয়ই ওখানে। কেন জানি প্রবীরের মন বলছে, ওঁদের মধ্যে আর-একজনও আছেন, লতুমাসির বান্ধবী, প্রবীরের মা। দুপুরে ছেলের সামনে আসতে লজ্জা পেয়েছিলেন।
মায়ের কথা মনে আসতে আর-একটা ব্যাপার খেয়াল হল। প্রবীর যখন স্কুলে পড়ে, মা বলতেন, ‘মন দিয়ে লেখাপড়া কর। গ্রাম আলো করতে হবে তোকে!’
সামনে ভেসে বেড়ানো সাদা শাড়িপরা বৃদ্ধাদের জন্য গ্রামটা বেশ আলোকিত মনে হচ্ছে আজ।
প্রবীর হাঁক দিল, ‘সহদেবদা, একটা জিনিস দেখে যাও। ও সহদেবদা!’
সহদেব এল। জিজ্ঞেস করল, ‘কী জিনিস?’
প্রবীর জানলার বাইরে আঙুল দেখিয়ে থমকে গেল। আর তো ওঁদের দেখা যাচ্ছে না! শুধুই জোনাকির আলো!
সহদেব বলল, ‘কী দেখাবি? ডাকলি কেন?
প্রবীর বুঝল, তাঁরাও চান না ভূতের ভয়ে গ্রামটা পরিত্যক্ত হয়ে যাক। তাই উধাও হয়েছেন।
ওদিকে সহদেব অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল, ‘কী হল? কেন ডাকলি, বলবি তো!’
একটু উদাস গলায় প্রবীর বলল, ‘দেখো, একফালি চাঁদের আলোতেও কী সুন্দর দেখাচ্ছে আমাদের গ্রামটা!’
‘আমি তো রোজ দেখি। আজ তুই দেখ!’ বলে, তড়িঘড়ি পাকশালের দিকে চলে গেল সহদেব।
[ আনন্দমেলা, ২ মার্চ ২০০৪ ]
