Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
0/50
New Courseপেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

এক রাত্রি – শ্রীধীরেন্দ্রলাল ধর

নৌকা করে যাচ্ছিলাম। সন্ধ্যার পর তুমুল জল-ঝড়ে নৌকা পথে আটক পড়ল। এক ঘাটের কাছে একটি বাঁশের খুঁটিতে নৌকা বাঁধা রইল পুরো দুটি ঘন্টা।

রাত আটটায় যেখানে পৌঁছোবার কথা সেখানে পৌঁছোলাম রাত দশটার পরে।

সেখান থেকে পুরো এক ক্রোশ গেলে তবে আমার গন্তব্য স্থান। পাকা পথ কিছু নেই। ধান খেতের আলের উপর দিয়ে হাঁটতে হয়। রাতে সে-পথ দিয়ে যেতে ভরসা পেলাম না। তার উপর আকাশে তখনও মেঘ ছিল। ঘাটের পাশেই একটি খাবারের দোকান থেকে কিছু খেয়ে নিয়ে বললাম— আজকের রাতটা এখানে থাকার কোনো ব্যবস্থা হবে?

দোকানি বলল— না মশাই, পর পর এই অঞ্চলে কয়েকটা ডাকাতি হয়ে গেছে; সেইজন্য দারোগাবাবুর কড়া হুকুম আছে, বাইরের কোনো লোককে যেন এখানে থাকতে দেওয়া না হয়। আপনি বরং থানায় যান, ওখানে বারান্দায় শোবার জায়গা আছে।

—থানা কতদূর?

এখান থেকে পোয়াটাক পথ, ওই রাস্তায় সোজা গেলেই দেখতে পাবেন, একটা আলো জ্বলছে।

কিন্তু থানায় একবার গেলেই তো অনেক কথা, অনেক কৈফিয়ত। বললাম— না, অতদূর আর যাব না। কাছাকাছি কোনো জায়গা নেই, যেখানে শুয়ে রাতটা কেটে যায়, ভিজতে হয় না?

—ওই পাশেই নদীর ঘাটে একটা চাতাল আছে, দেখুন গে।

সেই দিকেই গেলাম। একটু গিয়েই একটা ঘাট। বাঁধানো চত্বর, দু-পাশে একটু রোয়াক। মাথার উপর ছাদ। স্থানটি খারাপ লাগলো না, একটি রোয়াকের উপর শুয়ে পড়লাম।

নতুন জায়গা। ঘুম আসতে চায় না। খানিকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করলাম। আবার বৃষ্টি নামলো। ব্যাং ডাকতে শুরু করল। একটানা ব্যাঙের ডাক শুনতে শুনতে কোনো এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না, সহসা কোনো এক সময় কে যেন আমার নাম ধরে ডাকল। ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলো এসে পড়েছে চাতালের উপর। কেউ কোথাও নেই। মনের ভুল তাহলে। নিশ্চিত্তমনে চোখ মুদলাম।

আবার যেন কে আমাকে ডাকল!

চোখ চাইলাম। এবার চোখে পড়ল চাতালটার বাইরে থামের পাশে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোয় তার সাদা কাপড়ের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। একজন রমণী। মুখখানি কুয়াশার মতো অস্পষ্ট, কিন্তু চোখ দুটি বড়ো বেশি স্পষ্ট। সেই চোখের পানে তাকিয়ে কেমন যেন মনে হল, জিজ্ঞাসা করলাম— তুমি কে?

—আমি গো, আমি! স্পষ্টকণ্ঠে রমণী উত্তর দিল।

—কে তুমি?

—আমায় চিনতে পারছ না? আমি যে তোমার স্ত্রী।

—আমার স্ত্রী! আমি বিয়ে করলাম কবে? আমার বয়স তো মাত্র বাইশ বছর। সেকথার কোনো জবাব না-দিয়ে রমণী বলল— এসো, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।

—আমার জন্য তুমি অপেক্ষা করছ?

—হ্যাঁ গো হ্যাঁ। এসো।

রমণী ধীরে ধীরে আমার সামনে এগিয়ে এল। সাদা কাপড় পরা অস্ফুট জ্যোৎস্নার মাঝে অস্পষ্ট আবছা দেহ। স্পষ্ট শুধু দুটি চোখের স্থির দৃষ্টি। সে দুটি আমার মুখের উপর। সে দৃষ্টির সামনে এবার আমার সত্যই ভয় হল। মনে হল একদৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাই, কিন্তু পালাতে পারলাম না, সারা দেহ অনড়, সব শক্তি যেন উবে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসলাম বটে, কিন্তু রমণী তখন একেবারে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বলল – এসো, আমার সঙ্গে চলো—

—তোমার সঙ্গে কোথায় যাব? তোমাকে তো আমি চিনি না!

—চলো না, খানিক ঘুরে আসি। অনেক দিন পরে তোমাকে পেলাম। কতদিন তোমার জন্যে এখানে অপেক্ষা করে আছি। জানি তুমি আসবে। এসো… বলে রমণী আমার একখানি হাত ধরল।

আশ্চর্য রকমের ঠান্ডা হাত। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটা হিমের প্রবাহ বয়ে গেল। ঝটকা মেরে হাতখানি ছাড়িয়ে নিতে গেলাম কিন্তু পারলাম না। রমণী হেসে উঠল, বলল- ভয় করছে, না?

অমন তীক্ষ্ণ হাসি কখনো শুনিনি। তার মুখের পানে তাকালাম, সাদা দাঁতের স্পষ্ট আভাস দেখা যাচ্ছে ঠোঁটের ফাঁকে। সে হাসির রেশটুকু কান থেকে না মেলাতেই, আমার হাত ধরে সে টানল, বললু এসো—

সে আকর্ষণ এড়িয়ে যাবার শক্তি আমার ছিল না। স্বচ্ছন্দে সে আমাকে নামিয়ে আনল রোয়াক থেকে, অতি সহজে সে আমাকে টেনে আনল চাতালের বাইরে। তারপর চোখের নিমেষে সে উঁচু হয়ে উঠল, তার মাথা চাতালের ছাদ ছাপিয়ে উঠে গেল। আবার সে খিলখিল করে হেসে উঠল, বলল- বড্ড ভয় করছে, না?

বুঝলাম, আমাকে প্রেতিনি ধরেছে। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। বোধ হয় কাঁপছিলাম।

সহসা সে আমার দু-হাত ধরে আমাকে শূন্যে তুলে ফেলল, ঝুপ করে বসিয়ে দিলে এক গাছের মাথায়, বলল— বসো।

একটা ডাল ধরে কোনোরকমে তো বসলাম, কী করে যে বসলাম তা জানি না, তবে বসলাম যে সেটুকু জানি। অনেক চেষ্টা করে এবার কথা বললাম— এ কী, এখানে বসে আমি কী করব?

—আমি এখানে থাকি, তুমিও থাকবে।

—মানুষ কখনো গাছে থাকে? তুমি আমাকে নীচে নামিয়ে দাও।

—তুমি আমার স্বামী, আমি তোমাকে ছাড়ব কেন? আমি যেখানে থাকি, তুমিও সেখানে থাকবে।

—আমি বিয়েই করিনি, আমি তোমার স্বামী হলাম কেমন করে?

—বুঝেছি, আমাকে স্ত্রী বলে মানতে এখন তোমার ভয় হচ্ছে, আমি কিন্তু ঠিক চিনেছি। তোমায় কখনো ভুলতে পারি? তুমি কীরকম লোক! বাবা পণের পুরো টাকা দিতে পারেননি, সেজন্যে তুমি আমাকে কত মেরেছ, শেষে আমাকে পুকুরের জলে ঠেলে ফেলে দিলে। আমি কি তোমাকে সহজে ভুলতে পারি?

—আমি তোমাকে জলে ডুবিয়ে মেরেছি?

—হ্যাঁ গো, হ্যাঁ। এখন সব ভুলে গেলে চলবে কেন?

—আমি থাকি কলকাতায়, সেখানে পুকুর কোথায়?

—আমাকে কথা দিয়ে ভোলাতে পারবে না, আমি তোমাকে ঠিক চিনেছি! বাতাসের ঝাপটায় গাছ দুলে ওঠে। মনে হয় এখনি বুঝি পড়ে যাব। প্রাণপণে কয়েকটি ডাল দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে থাকি। কোথায় যেন একটা পেঁচা হুট হুট করে ডেকে ওঠে। কী বলব, কী করব কিছুই ভেবে পাই না। সামনের পানে তাকিয়ে দেখি সেই দুটি চোখ। আজ রাতে এই প্রেতিনির হাতেই বোধ হয় অপঘাতে মরতে হবে।

কতক্ষণ এভাবে গাছের মাথায় বসেছিলাম কে জানে, কোনো এক সময় সে বলে উঠল— কী, খুব ভয় করছে, না?

—গাছের উপর বসে থাকলে ভয় করবে না?

—এসো, তোমাকে নামিয়ে দিই।

নিমেষে আমার হাত ধরে সে নীচে নামিয়ে দিল। নিশ্বাস ফেলে বাঁচলাম কিছুটা সাহস ও পেলাম। বললাম— আমাকে নিয়ে এমনি করছ কেন? কী চাও বলত? সত্যি বলছি, আমি তোমার স্বামী নই।

—তোমার সব মিছে কথা। আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না। তুমি আমাকে সহজে ভোলাতে পারবে না।

—বলো, আমি ঠাকুর দেবতার নামে দিব্যি করছি।

—ঠাকুর ঠাকুর করো না, এসো… সে ধমক দিয়ে উঠল।

—ঠাকুর দেবতার নাম করব না?

—না। এসো—

আমার হাত ধরে শাঁ করে সে একপাশে ঘুরে গেল। মনে হল, আমার চারপাশ দিয়ে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। পরক্ষণেই দেখি আমি একেবারে নদীর ঘাটে জলের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি। সামনেই একটি চিতা জ্বলছে। দমকা বাতাসে কাঠগুলি ধক ধক করে জ্বলে উঠছে। আমাকে দেখে চিতার পাশে দুটি শেয়াল খ্যাঁক খ্যাঁক করে ডেকে উঠল। বললাম— এ তো শ্মশান!

—হ্যাঁ।

—আমাকে এখানে আনলে কেন?

—তোমাকে দেখাতে।

—কী?

—ওই যে আমি পুড়ছি। সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল। সারা দেহ জ্বলছে। তোমার জন্যে আমি জ্বলে মলুম। উঃ!

তাকালাম তার পানে। সেই দীর্ঘ প্রেতিনি আবার ছোট্ট মানুষ হয়ে গেছে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোয় অস্পষ্ট আবছা সাদা কাপড়, চিতার আগুনের আভাতেও তা স্পষ্ট হয়নি। স্পষ্ট শুধু দুটি চোখ, স্থির দৃষ্টিতে জ্বল জ্বল করছে আমার মুখের উপর। সেই চোখের পানে তাকিয়ে আমার সারা দেহ কেঁপে উঠল। তবু কোনোরকমে বললাম— তুমি কোথায় জ্বলছ? এই তো তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ!

—না, আমি জ্বলছি, দেখতে পাচ্ছ না ওই তো আমি জ্বলছি, তোমাকেও আমি অমনি জ্বালাব!

এই বলে সহসা আমার হাত ধরে এক ঝটকায় সে আমাকে টেনে নিয়ে ফেলে দিলে একেবারে চিতার উপর। আগুনের স্পর্শ পেয়েই আমার সারাদেহ চনমন করে উঠল। বাঁচবার একটা প্রচণ্ড আগ্রহ দেখা দিল মনে। চিতার আগুনটা ধুইয়ে ধুইয়ে জ্বলছিল বলেই রক্ষা, না হলে তখনই দগ্ধ হয়ে যেতাম। তখনই তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে সরে এলাম।

খিলখিল করে প্রেতিনি হেসে উঠল। আরও অনেকগুলি ছায়া খিলখিল করে উঠল আমার চারপাশে। সহসা কী মনে হল, চিতা থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠ টেনে নিলাম, চিৎকার করে উঠলাম— তবে রে!

প্রেতিনি সট করে আমার সামনে থেকে সরে গেল। আমার সামনের পথ পরিষ্কার হয়ে গেল। জ্বলন্ত কাঠখানা হাতে নিয়ে আমি ছুটলাম। শুনতে পেলাম পিছনে সে ডাকছে— যেও না, যেও না, শোনো। আমাকে এখানে একলা ফেলে যেও না। শোনো—

কোনো দিকে না তাকিয়ে আমি দৌড়োলাম। কোন দিকে কতদূর গিয়েছিলাম জানি না, দেখি একখানি দোকানঘরের সামনে জন চারেক লোক বসে গাঁজা খাচ্ছে। কল্কের আগুনটা ধক ধক করে জ্বলে উঠছে। তাদের মাঝে গিয়ে ঝুপ করে বসে পড়লাম। তারা চমকে উঠল, বলল— কে গো? কী হল?

বললাম— পেতনি তাড়া করেছে!

গাঁজা খাওয়া থেমে গেল, সবাই আমার মুখের পানে তাকাল। আমার অবস্থা দেখে একজন বলল— জল খাবে?

হাতের কাছেই ঘটিটি ছিল, এগিয়ে দিল।

বেশ খানিকটা জল খেয়ে তবে একটু সুস্থ বোধ করলাম।

এবার তারা জিজ্ঞাসা করল— কী হয়েছিল, কী? এই রাতদুপুরে শ্মশানে গিয়েছিলে কেন?

—আমি কি আর গেছি, আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।

—কী হয়েছিল, কী? –সবাই তাকাল আমার মুখের পানে।

চারপাশে একবার তাকিয়ে নিলাম। প্রেতিনিকে আর দেখতে পোলাম না। সাহস পেলাম। ধীরে ধীরে বললাম সব ঘটনা। শুনে তারা বলল— এ তো হতেই পারে। ওটা তো শ্মশানের ঘাট। শ্মশানে ভূত-প্রেত থাকবে এ আর আশ্চর্য কী? কত রকমের কত মরা আসছে। ওখানে তো রাতে কেউ থাকে না। তার উপর তুমি আবার একা ছিলে। তোমার সাহস বলিহারি যাই। যাক, নারায়ণ তোমাকে রক্ষে করেছেন। তোমার বাপ-মায়ের আশীর্বাদ। না হলে এই তো বছর খানেক আগে এই শ্মশানের পাশ দিয়ে আসার সময় আমাদের হারাধন ডাক্তারের ঘাড় মটকে মেরে ফেললে। কী হাতযশ‍ই ছিল ডাক্তারবাবুর, এক ফোঁটাতে কত রোগ সারিয়েছে। ও শ্মশানটা জায়গা ভালো নয়। তুমি খুব বুদ্ধি খরচ করে চিতা থেকে কাঠখানা তুলে নিয়েছিলে, তাই রক্ষে! যাক, রাতের বেলা ওসব কথা থাক, রাম রাম রাম রাম!

নিশ্চিন্তমনে তারা আবার গাঁজা টানতে শুরু করল।

বাকি রাতটুকু আমি সেই গাঁজাখোরদের পাশে বসেই কাটিয়ে দিলাম।

[শিশুসাথী, আষাঢ় ১৩৬৮ (জুন ১৯৬১)]