কিশোরী ভূতের বয়ফ্রেন্ড – শিবতোষ ঘোষ
বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটির সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অর্ণবের সঙ্গে গল্প করছিলাম। আমরা ছুটিতে বাড়ি এসেছি।
অর্ণব জিজ্ঞেস করল, ‘কাল একটা জায়গায় যাবি?’
‘কোথায়?’
‘কাপালিক দর্শনে।’
অর্ণব নিশ্চয় ভয়ে ‘দেখতে’ বলল না, ‘দৰ্শন’ বলল।
বঙ্কিমচন্দ্রের কাপালিকের বাইরে কাপালিক সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। ‘কপালকুণ্ডলা’র কাপালিক ভয়ানক, নবকুমারকে বলিই দিত, কপালকুণ্ডলা ছিল বলে… কিন্তু আমাদের জন্য কি আর কোনো কপালকুণ্ডলা থাকবে!
অর্ণব বলল, ‘তুই কী রে, এখন আগের মতো কিছু আছে? গিয়ে দেখবি সে আর তার বউ টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছে।’
অর্ণবের বাবা বড়ো পুলিশ অফিসার, ও নিজেও ক্যারাটে শিখেছিল বেশ কিছুদিন, এই দুই শক্তির উপর ভর করে আমি কিছুটা সাহসী হয়ে উঠলাম। পরের দিন দগ্ধ গ্রীষ্মকে উপেক্ষা করে, প্রায় আট কিলোমিটার অর্ণবের পিছন-পিছন শালবনির জঙ্গুলে রাস্তায় হেঁটে, কাপালিকের আশ্রমে পৌঁছোলাম।
অর্ণবের কথাই সত্যি, উনি একেবারে আমাদের দাদু-জেঠুর মতো। আমরা প্রণাম করে শ্রদ্ধা জানাতে, উনিও চিবুক স্পর্শ করে স্নেহ জানালেন।
আমরা দুজনেই মেডিক্যালের ছাত্র শুনে খুশি হয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, ‘তোমরা যেন অসুস্থ মানুষের বন্ধু হতে পারো।’ উনি তাঁর এক সেবককে দিয়ে গাছ থেকে কলা, পেঁপে, পেয়ারা, শশা পাড়িয়ে এনে যত্ন করে আমাদের খাওয়ালেন। একসময় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি কোনো মনস্কামনা নিয়ে এসেছ?’ আমার বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস পড়ে অনেকদিন ধরে কাপালিক সম্পর্কে ভীষণ কৌতূহল ছিল, এজন্যই…। আমাকে বলতে হল না, তার আগেই অর্ণব বলল, ‘আমরা আমেরিকা যেতে চাই, বিখ্যাত ডাক্তার হতে চাই।’ আমেরিকা শুনে আমারও আবেগ এসে গেল, এক লাইন জুড়ে দিলাম, ‘ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসায় বেশ কিছু রোগী মারা যান। আমরা এমন একটা যন্ত্র আবিষ্কার করব, ভুল চিকিৎসার শুরুতেই যন্ত্রে লাল আলো জ্বলে উঠবে। কাপালিক উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘সাধু, সাধু! কিন্তু বাবা, আমার তো কোনো ক্ষমতা নেই, সবই মা-ভৈরবীর করুণা। আমি মায়ের পায়ে তোমাদের নামে ফুল চাপাচ্ছি, যদি মায়ের আশিস পাও, তা হলে ওই ফুল নীচে গড়িয়ে আসবে, আর যদি না পাও…ওঁ মা ভৈরবী, হিং-ট্রিং…।’
মায়ের পা থেকে দুটো জবাফুলই গড়িয়ে এসেছিল, আমরা সেই আনন্দে ফেরার কথা প্রায় ভুলেই গেলাম। ফুলটিকে বুকপকেটে নয়, যেন অপারেশন করে হৃৎপিণ্ডে সেলোটেপ দিয়ে আটকে নিয়ে অন্ধকার নামার মুখে আশ্রম ছেড়ে বেরোলাম।
বাইরে বেরিয়ে প্রায় কিছু দেখতে পাচ্ছি না। এমনিতে জঙ্গলের অন্ধকার, আর নিশ্চয় ঘোর কৃষ্ণপক্ষ, অমাবস্যাও হতে পারে। অর্ণব বলল, ‘দেখার দরকার কি, শুধু কদম-কদম বাড়ায়ে যা।’
একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, ‘তোর কি ভয় করছে?’
‘করবে না!’
‘তা হলে একটা গান গা।’
‘মজা করিসনে তো!’
‘মজা নয় রে, ‘যদি তোর ডাক শুনে’ গা, দেখবি ভয় কেটে গেছে।’ আমাকে গাইতে হল না, হঠাৎ দেখি একটা মৃদু টিমটিমে আলো জঙ্গলের ভিতর থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। অর্ণব আমাকে টেনে নিয়ে একটু আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল।
আলোটা যখন কাছাকাছি এল তখন দেখলাম লন্ঠন হাতে এক মহিলা। সর্বাঙ্গ কাপড়ে ঢাকা, মাথায় একহাত ঝোলানো ঘোমটা। আমরা তাকে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু টিমটিমে হলেও একটু আলোরও তো দেখা পেয়েছি। অন্ধকার যে কীভাবে মানুষের দম শুষে নেয় তা এই প্রথম টের পেলাম। তাই এখন এই আলোটুকুকেও হারাতে চাইলাম না। আমরা আলো-হাতে মহিলার পিছন পিছন হাঁটতে লাগলাম।
ওই আলোর পিছনে কতক্ষণ হেঁটেছি খেয়াল নেই। কীরকম যেন একটা ঘোরের মধ্যে হেঁটেছি। আলোটা হঠাৎ একটা দুর্জয় বটতলায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমরাও দাঁড়িয়ে গেলাম। মহিলা প্রথম কথা বলল। জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কোথায় যাবে?’
অর্ণব বলল, ‘শালবনির বাসস্ট্যান্ড।
‘সেকী, তোমরা তো পুরো উলটো রাস্তায় এসেছ!’
‘কিন্তু আমরা তোমার পিছনে-পিছনে আসছি!’
‘আমি তো বাসস্ট্যান্ডে যাচ্ছি না। বাবা অসুস্থ, খবর পেয়ে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম, এখন ঘরে ফিরছি। তোমরা খেয়াল করোনি একটা জায়গায় রাস্তা দু-দিকে ভাগ হয়েছে, একটা গেছে জঙ্গলের ভেতরে, একটা বেঁকে গেছে বাসস্ট্যান্ডে। পিছন দিকে তিন-চার কিলোমিটার হাঁটলে ওই বাঁকটা পাবে। সেখান থেকে আট কিলোমিটার।’
আমি ধপাস করে বটতলায় বসে পড়লাম।
অর্ণব জিজ্ঞেস করল, ‘তা হলে কী করবি?’
মহিলা বলল, ‘এখন বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে কোনো লাভ হবে না, লাস্ট বাস বহু আগেই চলে গেছে। আর ওখানে থাকারও কোনো হোটেল নেই।’ অর্ণব বলল, ‘সেখানে কোনো রকে বা গাড়িবারান্দায় তো রাতটা কাটিয়ে দিতে পারব।’
আমি বললাম, ‘হোঁচট লেগে বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুল কেটে গেছে, জ্বালা করছে, এত অন্ধকারে অতখানা আর হাঁটতে পারব না। এই গাছতলায় রাত কাটিয়ে দেব!’
মহিলা বলল, ‘দ্যাখো, আমাদের পোড়ো বাড়ি, ভাঙা ঘরদোর, তবু যদি… গাছতলার চেয়ে তো কম কষ্ট হবে।’
তাকে আর বেশিকিছু বলতে হল না, আমরা সঙ্গেসঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। এই ঝাঁকড়া বটগাছের তলার অন্ধকার যেভাবে তার ছায়াবাজির খেলা দেখাতে শুরু করেছে, তা দেখে এই সামান্য সময়েই আমি ঘামছি। আমি অর্ণবকে কিছু বলতে না দিয়ে মহিলার পিছু-পিছু হাঁটতে লাগলাম।
.
দুই
মহিলা পোড়োবাড়ি বলে আমাদের যেখানে নিয়ে এল, তা কীরকম পোড়ো, এক্ষুনি মাথায় ইট খসে পড়বে কি না, অন্ধকারে কিছুই বুঝতে পারলাম না। অনেকখানা জায়গা জুড়ে স্তূপীকৃত অন্ধকারকে এখানে যেন জমাট বেঁধে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর লাগছে এ-বাড়িটায় কোনো আলো নেই। ওই আলো-হাতে মহিলার টিমটিমে আলোর মতো একটা কী দুটো…
জোনাকিও হতে পারে, আবার বেড়ালের মতো কোনো জন্তুর চোখও হতে পারে। কিন্তু অবাক কাণ্ড, এ-বাড়ির মানুষজনের হাঁটাচলা কী কাজকর্মে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। উঠোনে কয়েকজন ছেলে মিলে বল খেলছে, গোল-গোল চিৎকার করছে। আমি অর্ণবকে বললাম, ‘আমার কিন্তু অন্যরকম সন্দেহ হচ্ছে, ভয় করছে!’
সে বলল, ‘দ্যাখ, এসব জায়গায় ইলেকট্রিক নেই, এক-একটা ফ্যামেলি বড়োজোর হাফ লিটার করে কেরোসিন পায়। ব্ল্যাকে তো সকলে কিনতে পারে না, প্রচণ্ড দাম। তাই অন্ধকারে এদের সব কিছু করার অভ্যেস তৈরি হয়ে গেছে। আমাদের জীবনযাপনের সঙ্গে ওদের মেলাতে যাস না, মিলবে না।’
অর্ণবের কথা শুনে চুপ করে গেলাম বটে, কিন্তু ভয় গেল না।
বটতলা থেকে এই পোড়োবাড়িতে আসার পথে ওই আলো-হাতে মহিলাকে অর্ণব হঠাৎ পিসিমণি বলে ডাকতে লাগল। পিসি ডাকলে হয়তো বেশি যত্নআত্তি পাওয়া যাবে।
সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কোথায় গিয়েছিলে?’
বললাম।
শুনে সে অবাক হয়ে বলল, ‘তোমাদের কপাল ভালো যে জান নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছ!’
আমি বললাম, ‘না-না, তিনি খুব ভালো, গাছ থেকে ফল পেড়ে, কত যত্ন করে আমাদের খাওয়ালেন। আমাদের গায়ে-মাথায়…।’
আমাকে আর বলতে দিল না, আমাদের দিকে একপাক ঘুরে কীরকম অদ্ভুত ধরনের হাসি হেসে উঠল পিসিমণি। অন্ধকারে তাকে দেখা গেল না; কিন্তু তার দাঁত থেকে হঠাৎ এমন একটা বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল, যা দেখে আমি চমকে গেলাম।
‘তোমরা ওই জোচ্চোর, ডাকাত, নরখাদকের ডেরায় গিয়েছিলে? ওখানে যে যায় সে আর ফেরে না। তাকে মেরে জঙ্গলে পুঁতে দিয়ে তার যা টাকাপয়সা থাকে নিয়ে নেয়। ওর শাকরেদগুলো তো এক-একজন নামকরা ডাকাত।
হতে পারে, স্থানীয় মানুষজনই ভালো জানবে। কিন্তু আমার কাছে কাপালিকের চেয়ে অনেক বিপজ্জনক মনে হল মহিলার দাঁতে বিদ্যুৎ খেলে যাওয়া। ওর দাঁতে যেন বিদ্যুতের কারখানা আছে। অর্ণবকে বলতে সে হেসে উড়িয়ে দিল, ‘মানুষের দাঁতে কখনো… তোর যত সব উদ্ভট!’ তবে বাঁচোয়া হয়েছে। এখানে ওই মহিলাকে বিশেষ দেখতে পাচ্ছি না। হয়তো ভাইপোদের জন্য ভালো খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করছে।
এখন আমাদের সামনে ঘুরঘুর করছে একটি কমবয়সি মেয়ে। অন্ধকারে কিছু বোঝার উপায় নেই, শুধু মনে হচ্ছে অর্ণবের পিসিমণির চেয়ে হাইটে ছোটো, আর গলার স্বর কর্কশ নয়, অনেক মোলায়েম।
মেয়েটি প্রায়ই এসে পীড়াপীড়ি করছে আমাদের, হাত-পা ধোওয়ার জন্য।
‘এত গরমে জামা-প্যান্ট পরে বসে আছো কী করে? যাও, সব ছেড়ে রেখে হাত-পা ধুয়ে নাও। আমি জল তুলে এনে রেখেছি। আমাদের জল খুব ভালো, খুব ঠান্ডা।’
অর্ণব জামা খুলতে যাচ্ছিল, আমি নিষেধ করলাম। জামাটামা খুলে রেখে গেলে আর কিছুই থাকবে না, দুজনের পকেটে সাত-আটশো টাকা তো আছে। আমি শেষ পর্যন্ত হাতের ব্যাগটাও রেখে যেতে সাহস পেলাম না, ওটা নিয়েই হাত-পা ধুতে গেলাম। ওতে এমন কিছু ছিল না। জলের বোতল, প্যাকেট-দুই বিস্কুট, তোয়ালে…। ব্যাগ নিয়ে যাওয়াটা একটু বেশি দৃষ্টিকটু হয়ে গেল।
আমি ফিরে এসে হাত-পা মুছে বসেছি, অর্ণব তখনও বাইরে দাঁড়িয়ে মেয়েটির সঙ্গে গল্প করে যাচ্ছে। ওদের হাসাহাসিও শুনতে পাচ্ছিলাম। হঠাৎ এই সময়ই আমার মাথার ওপরে ছাদ কাঁপিয়ে একটা আওয়াজ হল। শুনতে পেলাম একদল লোকের ছাদ-ফাটানো দাপাদাপি। অর্ণবকে চিৎকার করে ডাকতে যাব, কিন্তু স্বর বেরোল না। আমার পিছনেই এক মহিলার গলা-ফাটা আর্তনাদ। আমিও ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলাম। আমার গলা শুনে অর্ণব দৌড়ে এল। সব বললাম। উলটে সে আমাকেই বকল, ‘তোর নার্ভ এত উইক! তুই ডাক্তারি করবি কী করে? ডাক্তারদের নার্ভ খুব স্ট্রং হতে হয়।’
আমি রেগে বললাম, ‘তখন থেকে মেয়েটার সঙ্গে তোর এত কী গল্প?’
অর্ণব বলল, ‘জানিস, মেয়েটি কিন্তু খুব ভালো, কত কথা বলল। ওকে নাকি ওর বর গলা টিপে মেরে ফেলেছিল। তারপর ওর মা-বাবা খবর পেয়ে ওকে এখানে নিয়ে আসে। ওরা খুব গরিব, নাকি পাঁচ-ছ’দিন হল কেউ কিছু খেতে পায়নি। ভাবছি ওকে ডেকে কিছু টাকা দিই, কিছু খাবারদাবার আনুক। কিন্তু এত রাতে কি দোকানটোকান খোলা পাবে?’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওকে মেরে ফেলেছিল তো ও বেঁচে উঠল কী করে?’
‘আরে বোকা, একেবারে কী আর মেরে ফেলেছিল। অজ্ঞান অবস্থায় তুলে এনেছিল, চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে গেছে।
‘আমার কিন্তু অন্যরকম…!’
‘কী অন্যরকম?’
হঠাৎ অর্ণবের পিসিমণি এল, অনেকক্ষণ পর এল, এসেই তীব্র ঝাঁঝালো গলায় বলল, ‘তোমরা ভেবেছ কী? মেয়েটা এত কষ্ট করে জল তুলে আনল, তোমরা ভালো করে গাও ধুলে না, স্নানও করলে না!’
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘পা হাত ধুয়ে নিয়েছি। বাতাস দিচ্ছে তো, তাই আমাদের অসুবিধে হচ্ছে না।’
‘ওসব শুনছি না। মেয়েটা এত কষ্ট করল… নাও-নাও ওঠো।’
‘আমাদের জন্য শুধু শুধু ব্যস্ত হচ্ছো, কোনো দরকার নেই।’
মহিলা গর্জন করে উঠল, এবারও দেখলাম তার দাঁতে বিদ্যুতের ঝিলিক। বলল, ‘দেখছি কীরকম দরকার নেই!’ বলে বেরিয়ে গেল। আর সঙ্গেসঙ্গে ঘরের ভাঙা জানালা দিয়ে ঢুকতে লাগল গায়ে আগুন ধরার মতো গরম বাতাস। আমরা পুড়ে যাচ্ছি, গোটা গায়ে যেন ফোস্কা পড়ে যাচ্ছে। খুব অল্পক্ষণই ছিল এই আগুনে বাতাস, কিন্তু এতেই আমরা ঘেমে-নেয়ে… এবার অর্ণবও ভয় পেয়েছে, সে আমার কানে-কানে বলল, ‘খুব সাবধান, আমরা এক রহস্যজনক চক্রান্তের মধ্যে পড়েছি।
কিশোরী মেয়েটি কাছাকাছিই ছিল, কাছে এসে বলল, ‘কী, এবার গরম লাগছে তো? নাও, জামা-প্যান্ট ছেড়ে স্নান করে নেবে চলো। গরম নেই। আর কত গরম হলে জামা-প্যান্ট ছাড়বে?’
‘আচ্ছা, এত করে আমাদের জামা-প্যান্ট ছাড়াতে চাইছ কেন? টাকার জন্য তো? এই নাও।’ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে অর্ণব ছুড়ে মারল ওর দিকে। সেও সঙ্গে-সঙ্গে ব্যাগটা তুলে নিয়ে সপাটে ছুড়ে মারল অর্ণবের গালে, বলল, ‘টাকার গরম দেখাচ্ছ!’ ব্যাগে শুধু নোট ছিল না, কিছু খুচরো কয়েনও ছিল, ফলে গালপাট্টায় এমন লাগল যে গাল ধরেই থেকে গেল কিছুক্ষণ।
হঠাৎ দেখা গেল আমাদের মাথার ওপরে একটা-কিছু যেন অনবরত পাক খাচ্ছে। ভয়ে তাকাতে পারছি না। অর্ণব ভয়ে ভয়ে ভাঙা-চোখে কোনোরকমে দেখে বলল, ‘মনে হচ্ছে কালো পরি!’ আমি রেগে বললাম, ‘তুই এখনও পরি দেখছিস? আমি তো দেখছি বিশাল বিশাল নখ বের করে শকুন উড়ছে।’ শাঁ-শাঁ শব্দ হচ্ছে, এমনভাবে ঠোঁট-নখ বের করেছে যেন এক্ষুনি আমাদের ছিঁড়ে খাবে।
একসময় এটা থামল। কিন্তু সঙ্গেসঙ্গে শুরু হয়ে গেল আমাদের ঘিরে কতকগুলো কালো-কালো ছায়ার কাচ্চাবাচ্চার চেঁচানি। তারা চেঁচাতে চেঁচাতে অনবরত বলছে, ‘খাবো-খাবো, খাবো-খাবো!’ এরকম ভয়ংকর সমবেত সংগীত সহ্য করতে না পেরে আমরা কানে আঙুলচাপা দিয়ে হাঁটুতে মুখ গুজলাম। আর এ-সময়ই আছড়ে পড়ল প্রায় দেড়শো কিলোমিটার বেগের ঘূর্ণিঝড়। থরথর করে কাঁপতে লাগল গোটা বাড়িটা। এবার ছাদ খসে পড়বে মাথায়, একটা আধলা ইট খসে পড়লেও তো ভবলীলা সাঙ্গ। আমাদের চারপাশের কালো ছায়াগুলো তখন খুশি হয়ে লাফাতে লাফাতে বলছে, ‘ছোটোদাদু এসেছে, ছোটোদাদু এসেছে!’
আমাদের সামনেই একটা বজ্রপাতের মতো শব্দ হল, ‘হয়েছেটা কী?’
আলো-হাতে মহিলা তার কর্কশ গলা আরও কর্কশ করে বলল, ‘এই দ্যাখো না, ছোঁড়া দুটো…।’ বাকি কথাগুলো তার কানে ফিসফিস করে বলল।
‘ও, এই!’ বলে প্রচণ্ড জোরে হাসল। ‘তোরা সবাই সরে যা! আমি দেখছি।’ নিমেষের মধ্যে ওই ছোটোদাদু হয়ে গেল এক হুঁদো বাঘ, আমাদের হাত-তিনেক দূরত্বে বসে হাঁ করে হুংকার ছাড়ছে। যখন আমাদের ঘাড় লক্ষ্য করে লেজ তুলে লাফ দিল, তখন আমরা মুখ থুবড়ে পড়ে ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে কাঁপতে লাগলাম।
এতসব করেও আমাদের উপর শেষ আঘাতটা কিন্তু করতে পারছে না, একটা জায়গায় এসে ওদের থেমে যেতে হচ্ছে। যে ছেঁড়া তালাইয়ের উপর আমরা বসেছি, ওতে কীভাবে পা লেগে গিয়েছিল একটা বাচ্চার, সে প্রায় আধঘণ্টা ধরে কাতরেছিল যন্ত্রণায়। এইসব কারণে সকলে আমাদের উপর দারুণ খেপে গেল। একজন ভারী গলায় বলল, আর দেরি নয়, চলো, সবাই মিলে গিয়ে দাদাকে ধরে নিয়ে আসি। এ আমাদের মান-সম্মানের প্রশ্ন, দুটো ছোকরা এভাবে… আমরা সমাজে মুখ দেখাব কী করে?
কর্কশকণ্ঠী মহিলা বলল, ‘শুধু মান-সম্মান নয়, আজ পাঁচ-ছ’দিন হয়ে গেল বাচ্চাকাচ্চা কারও পেটে দানাপানি পড়েনি, হাতের কাছে এমন নধর খাবার থেকেও বাছারা আমার…! ‘‘
যাওয়ার সময় মহিলা আমাদের শাসিয়ে গেল, ‘কথা শুনলি না তো, এবার দ্যাখ তোদের কী অবস্থা হয়!’
দেখতে-দেখতে ঘর ফাঁকা হয়ে গেল। একটু-একটু করে বাতাস স্বাভাবিক হয়ে এল। আমরাও মাথা সোজা করলাম। কিন্তু দুজনেই বুঝে গেছি, মৃত্যু আমাদের শিয়রে দাঁড়িয়ে, শুধু সময়ের অপেক্ষা।
হঠাৎ এসময় কিশোরী মেয়েটি আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। ফিসফিস করে বলল, ‘এখান থেকে এক্ষুনি পালাও! বাবা এসে গেলে আর নিস্তার নেই তোমাদের! সে এ-অঞ্চলের রাজা, গোদাপিয়াশালের জঙ্গলের ভাঙা নীলকুঠি তার রাজধানী, সে সেখানে থাকে। সবাই মিলে গেছে তাকে ডেকে আনতে। এই হল সুবর্ণ সুযোগ!’
আমি বললাম, ‘একটু আগে তুমিই আমাদের মাথার উপর শকুন হয়ে উড়তে-উড়তে ছিঁড়ে খেতে চেয়েছিলে। তোমাকে বিশ্বাস করব কী করে?’
‘বিশ্বাস করো আর নাই করো, তোমাদের মিনতি করছি তোমরা পালাও! বাবাকে তো জানি, যেকোনো উপায়ে তোমাদের মেরে ফেলবে।’
অর্ণব বলল, ‘কোনদিকে পালাব? অন্ধকারে রাস্তাঘাট কিছু বুঝতেও পারব না।’
‘চলো, আমি তোমাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে বর্ডার লাইন পার করে দিয়ে আসছি।’
আমি ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বর্ডার লাইন মানে?’
‘ভারত-পাকিস্তানের মতো। লাইন পেরিয়ে ওপারে চলে গেলে আমাদের কোনো জারিজুরি চলে না। আমাদের যত জোর সব এক্তিয়ারের মধ্যে।’ হঠাৎ অর্থব অন্যরকম গলায় বলল, ‘তুমি ডেকে নিয়ে গিয়ে আমাদের মেরে ফেলবে না তো?’
‘আমি তো কোন ছার, আমাদের কেউ তোমাদের মেরে ফেলতে পারবে না। তোমাদের বুক পকেটে কী আছে জানো? বের করে দ্যাখো।’
‘এ তো ভৈরবীমায়ের পায়ে ঠেকানো ফুল।’
‘এর জোরেই এখনও বেঁচে আছো তোমরা। কিন্তু তোমাদের উপর যে অত্যাচার গেছে, আবার বাবা এসে যদি তার উপর… তোমরা নিজেরাই হার্টফেল করবে।’
আমরা ভূতের ডেরা থেকে পালাচ্ছি। সামনে দৌড়চ্ছে ভূত-কিশোরী। আমরা তার পিছনে-পিছনে। দৌড়তে-দৌড়তে অর্ণবের সঙ্গে টুকরো টুকরো কথা হচ্ছে আমার কানে আসছে।
কিশোরী : আমার বর তো গলা টিপে আমাকে মেরে ফেলেছিল।
অর্ণব : কেন, তুমি কী করেছিলে?
কিশোরী : বাবা পণের পুরো টাকা দিতে পারেনি। তাই একদিন রেগে…। আচ্ছা, এখনও কি পণ আছে?
অর্ণব : পেপারে তো মাঝেমধ্যেই দেখি। যারা অর্থপিশাচ, অমানুষ তাদের মধ্যে আছে।
কিশোরী : তোমরা পণ নেবে না তো?
অর্ণব : ছিঃ, কী যে বলো!
কিশোরী : জানো, আমার কী ইচ্ছে করছে— তোমাদের সঙ্গে চলে যেতে। আমি যদি মানুষ হতাম, তা হলে…!
কিশোরীর দীর্ঘশ্বাস আমি এত পিছন থেকেও শুনতে পেলাম।
বেশ খানিকক্ষণ দৌড়নোর পর রাতের সেই বিশাল ভয়ংকর বটগাছের তলায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল কিশোরী। বলল, ‘এই বটগাছটাই হল আমাদের বর্ডার লাইন। তোমরা আর দাঁড়িয়ে থেকো না, এগিয়ে যাও, যেকোনো মুহূর্তে দলবল এসে পড়তে পারে।’
আমি বললাম, ‘আমাদের না দেখতে পেলে ওরা তো তোমাকেই…।’
‘হ্যাঁ, মারবে। হাড় গুঁড়িয়ে দেবে। কিন্তু কী করব, তোমরা যে এখন আমার বয়ফ্রেন্ড। তোমাদের উপর অত্যাচার যে আমাকে আরও কষ্ট দিত। এখন আমি সব সহ্য করতে পারব।’
হঠাৎ শোনা গেল ভূতগুলো সব হই-হুল্লোড় করতে-করতে বটগাছের দিকে এগিয়ে আসছে। কিশোরী বলল, ‘পালাও-পালাও, ওরা এসে গেল!’ আমরা বটতলা পেরিয়ে এসে একবার পিছনে ফিরলাম। কিশোরী হাত নাড়ছে।
হঠাৎ সে চেঁচিয়ে বলল, ‘আমাকে ভুলে যাবে না তো?’
আমরাও চেঁচিয়ে বললাম, ‘কক্ষনো না! ‘
আমরা দৌড়চ্ছি। দৌড়তে-দৌড়তে অর্ণব জিজ্ঞেস করল ‘হ্যাঁ রে, মানুষ মারা গেলে ভূত হয়, ভূত মারা গেলে সে আবার মানুষ হতে পারে না?’
এর উত্তর আমরা জানি না। আমাদের দুজনেরই চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
[ আনন্দমেলা, ৬ অক্টোবর ২০০২ ]
