কী দেখলাম…. – অলোককৃষ্ণ চক্রবর্তী
যাব না যাব না করেও শেষপর্যন্ত বেরিয়ে পড়লাম আমরা দু-জন— সনৎ আর আমি। হাওড়া থেকে বর্ধমান কড লাইনের লোকাল ট্রেনে চেপে সোজা শিবাইচণ্ডী স্টেশন। সেখান থেকে রিকশায় ধনেখালি ডাকবাংলো। রিকশাওয়ালা গেটের সামনে আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। গেট বন্ধ।
বেলা তখন একটা। ভর দুপুর। ভাদ্দর মাসের কড়া রোদ্দুর পিঠে চড়চড় করে ফুটছে আলপিনের মতোন। এই ভর দুপুরে সূর্যের গনগনে আঁচের মধ্যে কি দাঁড়িয়ে থাকা যায়! তাই আমরা দুজনেই গেটটা খুলে দেবার জন্যে একসঙ্গে হাঁক পাড়লাম। মিনিট তিনেকের মধ্যে দারোয়ান এসে আমাদের নাম জিজ্ঞেস করে খুলে দিল গেটটা। দারোয়ানের কথা মতোন তার পিছু পিছু গেলাম কেয়ার টেকারের কাছে বুকিং স্লিপটা দেখাতে। স্লিপটা দেখে ঘর খুলে দেবার নির্দেশ দিলেন তিনি। দারোয়ান ঘর খুলল।
ঘরটা দেখে আমাদের খুব ভালো লাগল। প্রকাণ্ড ঘর। সাজানো গোছানো। আসবাবপত্রও বেশ ভালো। নতুন দু-খানা বড়ো খাট। ঘরের এক কোণে খাবার টেবিল-চেয়ার। আর একদিকে সুন্দর একটা ওয়্যারড্রোব। বাথরুমও বেশ ভালো। তা ছাড়া পুবে আর দক্ষিণে বারান্দা। বারান্দা দুটিও প্রশস্ত।
এই বিল্ডিং থেকে অফিসের দূরত্ব বেশ খানিকটা। তবে অফিসেও বেশি লোকজন আছে বলে মনে হয় না। দারোয়ান আর ‘কেয়ারটেকার’ ছাড়া আর কাউকে তো চোখে পড়ল না এখনও। এইরকম একটা নির্জন জায়গাই আমরা চাইছিলাম।
তা ছাড়া বাংলোটাও বেশ সুন্দর। সামনে সাজানো ফুলের বাগানে ফুটে আছে নানা রঙের ফুল। চারদিকে পাতাবাহার গাছের সে কী বাহার! গেট থেকে বিল্ডিং পর্যন্ত সুরকির পথ। পেছন দিকে গাছ-গাছালি আর একটা প্রকাণ্ড পুকুর। বাংলোটা আমাদের মনের মতোনই পেয়েছি। যে জন্যে এসেছি তার উপযুক্ত পরিবেশ।
সবই ঠিক আছে। তবে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে কিছু জানা হয়নি। তাই জিজ্ঞেস করতে দারোয়ান বলল— সামনেই সুপার মার্কেট। ওখানে দু-তিনটে হোটেল আছে। ভাত-রুটি, ডাল-তরকারি, মাছ-মাংস সবই পাবেন আর সামনে ওই যে রাস্তার ওপারে চায়ের দোকান দেখছেন, ডাকলেই লোক চলে আসবে। ডিম, কেক, বিস্কুট, টোস্ট, চা— সব কিছু পেয়ে যাবেন।
জোর খিদে পেয়েছিল। তাই আর দেরি না করে সুপার মার্কেটে চলে এলাম। হোটেলে খেতে খেতে আমরা নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করছিলাম। মনে হয় হোটেল-মালিক কিছু কিছু শুনতে পেয়েছেন। তাই ক্যাশ কাউন্টারে পেমেন্ট করার সময় জিজ্ঞেস করলেন- আপনারা কোথায় উঠেছেন?
—ডাকবাংলোয়। সনৎ বলল।
—ওঃ! বলে কেমন যেন চমকে উঠলেন ভদ্রলোক। বাংলোয় ফিরে এলাম আমরা। সেই একই নির্জনতা। অফিসেও ওই দু-জন ছাড়া আর কোনো নতুন মুখ দেখা গেল না। বেশ ভালোই হল। এরকম পরিবেশ না হলে কি কাজে মন বসে।
তাহলে এবার এখানে আসার উদ্দেশ্যটা খুলেই বলি। আসলে আমরা দুজনেই লেখক। সামনে পুজো। পুজো সংখ্যার লেখা তো আছেই। তা ছাড়াও আছে কয়েকটি কিশোর সংকলনে লেখার চাপ। এরকম কিশোর সংকলন ইদানীং পুজোর আগে অনেকগুলো প্রকাশিত হয় কলেজস্ট্রিট পাড়া থেকে। কলকাতায় হাজার ঝামেলায় লেখালেখি ঠিকমতন হচ্ছে না দেখে এখানে চলে আসা। কিন্তু শেষপর্যন্ত লেখা শিকেয় উঠল। পাঁচ দিন থাকা তো দূরের কথা, দু’দিনেই আমরা একেবারে ঠান্ডা। য পলায়তি স জীবতির মতন অবস্থা তখন আমাদের। দু’দিন পরেই বাংলো ছাড়তে বাধ্য হলাম। সেই কথাই বলব এখন।
খেয়ে-দেয়ে বাংলোয় ফিরে লেখার তোড়জোড় শুরু করতেই সনৎ জিজ্ঞেস করলো— আপনি কি এখন লিখতে বসবেন, অলোকদা?
—হ্যাঁ। তুমি বসবে না?
—একটু বিশ্রাম নিয়ে বসব ভাবছি।
—এখন আবার বিশ্রাম কী? এসেছি তো মাত্র পাঁচ দিনের জন্যে। এর মধ্যে অনেক লিখতে হবে। অযথা সময় নষ্ট করে লাভ কী?
—গুরুর আদেশ শিরোধার্য।
সনৎ আমাকে কখনো গুরু, কখনো অলোকদা বলে ডাকে।
লিখতে বসে আমি হঠাৎ সনৎকে জিজ্ঞেস করলাম— এখন কী লিখবে ঠিক করেছ?
—ভূতের গল্প।
—ভূতের গল্প! বিস্ময় প্রকাশ করলাম আমি।
—হ্যাঁ। তা ছাড়া উপায় কী?
—কেন?
—আপনি তো জানেন কতদিন আগে থেকে প্রকাশিত কিশোর সংকলনের জন্যে লেখা চাইছে। আপনাকেও তো খুব তাগাদা দিচ্ছে।
—তো কিশোর-সংকলনে ভূতের গল্প কেন লিখবে। আরও তো অনেক বিষয় আছে।
—তা আছে। তবে এখন ভূতের গল্পের বাজার ভালো। তা ছাড়া এটাও তো একটা বিষয়।
—বিষয় না ছাই। ভূত আছে বলে তুমি বিশ্বাস করো? –কেন, আপনি করেন না?
— না।
—কিন্তু একটা কিছু আছে বলে মনে হয়।
—কী আছে?
—আপনি তো জানেন আত্মা অমর। এ কথা আমাদের বেদ-উপনিষদ- পুরাণে আছে। ভারতীয় ধর্ম সাধনায় হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও অনেক আছে। সুতরাং, আত্মার পুনর্জন্ম যেমন হয় তেমনি অতৃপ্ত আত্মাও ভূত-প্রেত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
—বোগাস। বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাব কী করে? তোমার মাথায় এই সব উদ্ভট চিন্তাভাবনা ঢুকল কী করে?
—তা হলে যা শোনা যায়, সব মিথ্যে?
—সব শোনা কথা সত্যি হয় নাকি?
—তবুও ‘যত রটে কিছু বটে’ বলে তো একটা কথা আছে।
—ও সব কথা আজকালকার দিনে অচল।
—তবে কি ভূত-টুত বলে কিছু নেই?
—নো। ভূত-টুত সব কল্পনা ছাড়া কিছু নয়।
—আমারও অনেক সময় তাই মনে হয়।
—তবুও ভূত নিয়ে লেখা চাই?
—প্রকাশকের দাবি। কথাও দিয়েছি। এবারই শেষ। এরপর আর লিখছি না।
—যাক, অনেক কথা হয়েছে। আর কথা নয়। এবার কাজে মন দাও।
টানা তিনঘণ্টা লেখার পর আমরা চায়ের অর্ডার দিলাম। চা খেতে খেতে সনৎকে জিজ্ঞেস করলাম— ভূতের গল্প কদ্দূর এগোলো? ভূত কি এসে গেছে, না আসি আসি করছে।
—আসি-আসি করছে।
—চালিয়ে যাও।
—গুরু, আপনি কী লিখছেন?
—বধূহত্যা নিয়ে গল্প। শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে শেষপর্যন্ত আত্মহত্যা করতে বাধ্য হল বউটি।
—বাঃ, সাধে কী আর গুরু বলি! গুরু-শিষ্যের কি অদ্ভুত মিল দেখুন তো। আমার ভূতের গল্পেও বউটা গলায় দড়ি দিয়ে মারা যাবে। তারপর…
—ভয় দেখাবে। সনতের কথা শেষ হবার আগেই বললাম আমি।
—ঠিক তাই।
ব্যস, এবার লেখা শুরু করল।
আবার লেখায় মন দিলাম আমরা। রাত ন-টা পর্যন্ত লিখে হোটেলে খেতে গেলাম।
হোটেলে থেকে বেরিয়ে ফেরার পথে সনৎ বলে— মাথাটা ধরেছে। আজ আর লিখব না। সকাল-সকাল শুয়ে পড়ব।
আমারও তাই ইচ্ছে। একে প্রথম দিন, তারপর নতুন জায়গা। তা ছাড়া শরীরটাও বেশ ক্লান্ত।
বাংলোয় ফিরে শুতে যাবার সময় হাসতে হাসতে বললাম— সনৎ, তোমার ভূত কি এসে গেছে?
—ভূত না, পেতনি।
—একই কথা। তো পেতনি কি ফিল্ডে নেমেছে?
—প্রায়।
—শোনাও তাহলে।
শুরু করল সনৎ—
বউটার চোখ দুটো জবাফুলের মতোন লাল। দুশ্চরিত্র মদ্যপ স্বামী প্রায়ই মারধোর করে। প্রতিদিনই মদ খেয়ে আজেবাজে জায়গায় যায়। কোনোদিন মাঝরাতে বাড়ি ফেরে, কোনোদিন ফেরে না। আজ বাড়ি থেকে বেরুবার সময় বউটা বাধা দিয়েছিল। কিন্তু কে কার কথা শোনে! উলটে বউটাকে বেধড়ক ঠেঙিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে লম্পট স্বামীটা। বউটার হাতে মোটা শক্ত দড়ি। উন্মাদের মতো ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে। ওপর দিকে তাকিয়ে কী যেন খুঁজছে। বারান্দা থেকে খুব উঁচু একটা টুল আনল ঘরে। তারপর গলায় দড়ি দিল। ঘরের কড়িতে দেহটা ঝুলছে। মাথাটা একদিকে একটু কাতও হয়ে পড়েছে। জিভটা বেরিয়ে আছে। জিভ কেটে টপ টপ করে তাজা রক্তের ফোঁটা ঝরে পড়ছে। আর লাল চোখ দুটো ঠেলে বাইরে এসেছে, ঝুলে পড়েছে। দেখলে মনে হয় ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে আছে।’ সনৎ থামতেই আমি বলে উঠলাম— দারুণ বর্ণনা! একেবারে মাতিয়ে দিয়েছ।
—এরপর প্রেতাত্মা আসবে। সনৎ বলল।
—প্রেতাত্মা আসার আগেই যে ভয়ের বর্ণনা দিয়েছ তাতে আমারই বেশ ভয়-ভয় করছে।
—তা হলে ঠিক আছে, গুরু?
— বিলকুল ঠিক। আজ আর রাত করা ঠিক হবে না। শুয়ে পড়া যাক।
দু-খানা খাটে দুজনে আলাদা শুলাম। বাথরুমের দরজাটা খুলে রাখা হল। নাইট বাল্ব জ্বালিয়ে টিউবটা নিভিয়ে দিলাম। মিনিট দশেক যেতে না যেতেই সনতের নাসিকা গর্জন কানে এল। আমার কিন্তু ঘুম আসছে না। চুপচাপ চিত হয়ে পড়ে আছি। হঠাৎ বাথরুমে কীসের যেন একটা শব্দ হল। ভাবলাম, ছুঁচো বা ইঁদুর-টিদুর কিছু হবে। পাশ ফিরে শুলাম। একটু পরে আবার বাথরুমের দরজার কাছ থেকে শব্দটা এল। এবার দরজার দিকে তাকাতেই মনে হল কে যেন বাথরুমে ঢুকে পড়ল। চোর- টোর নয় তো? নতুন জায়গা। হতেও পারে। তাই বিছানা থেকে সোজা উঠে গিয়ে বাথরুমে ঢুকতেই আমার চোখে-মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ল এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস। শরীরটা যেন শিরশির করে উঠল। বাথরুমের আলো জ্বাললাম। না, কেউ নেই। তা হলে আমারই ভুল।
ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। চোখ বুজে ঘুমোবার চেষ্টা করছি। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। সনতের নাক ডাকা একইভাবে চলেছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে একটু তন্দ্রার মতন এসেছে, এমন সময় দেখি জানালার পর্দা উথাল-পাথাল করছে। আশ্চর্য, বাইরে তেমন হাওয়া নেই, অথচ দুরন্ত বেগে পর্দা উড়ছে। চোখ রগড়ে ভালো করে দেখি যেমন পর্দা তেমন আছে। বিন্দুমাত্র নড়ছে না। ঘুমের বারোটা বেজে গেল। হল কী আজ! এত ভুলভাল দেখছি কেন? মনে মনে ভাবলাম নিশ্চয়ই ভূতের গল্প শোনার জন্য এরকম হচ্ছে।
এবার আর কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে চোখ বুজলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
যখন ঘুম ভাঙল, রাত তখন অনেক। সুনৎ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাই ওকে ডাকতে গিয়েও ডাকলাম না। আমার ঘুম ভেঙেছিল শব্দ শুনে। এখনও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি বাথরুমে জোরে জল পড়ার শব্দ। এ নির্ঘাত সনতের কাজ। কী জ্বালা রে বাবা! বাথরুমে গিয়ে কল খুলবে, বন্ধ করবে না। আর ঘুমোতেও পারে বটে।
হঠাৎ জল পড়ার শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। এবার ঘরের মধ্যে ধপ্ ধপ্ করে পায়চারি করার শব্দ শোনা গেল।
এই প্রথম আমি ভয় পেলাম। অদ্ভুত ব্যাপার। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কতরকম আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। একবার একটা ছায়ামূর্তিকে বাথরুমে ঢুকতেও দেখেছি। সবই চক্ষু-কর্ণের ভুল মনে করেছি। কিন্তু এবার তো বেশ কয়েক মিনিট ধরে স্পষ্ট বাথরুমে জল পড়ার শব্দ শুনতে পেয়েছি। জল পড়া আবার আপনা-আপনি বন্ধও হয়ে গেল। এখন ঘরের মধ্যে পায়ের শব্দ। কী ব্যাপার! রহস্যটা কী?
তাই যেদিক থেকে শব্দ ভেসে আসছিল সেদিকে তাকাতেই আমার সারা দেহের রক্ত হিম হয়ে গেল।
একটা বউ হাতে দড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! চোখ দুটো জবাফুলের মতোন লাল!
কোনোক্রমে বিকৃত কণ্ঠে বললাম— কে, কে ওখানে?
বউটা আমার দিকে তাকাল। সেকী পলকহীন জ্বলন্ত দৃষ্টি! যেন চোখ দিয়ে আমায় গিলে ফেলে আর কী! সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। বুকটা ধড়ফড় করতে লাগল। হার্টফেল করার মতন অবস্থা আমার। ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করতে গিয়ে আমার গলার স্বর ফুটল না। সনকে জানাব, তাও পারছি না। মনে হল দেহটা ভারী হয়ে গেছে, নড়তে পারছি না। বউটা একইভাবে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হাতে তার শক্ত দড়ি। আঁ-আঁ করতে করতে হঠাৎ আমার গলা দিয়ে খুব জোরে অস্বাভাবিক আওয়াজ বেরিয়ে পড়ল।
—কী হল, কী হল বলে ধড়মড় করে জেগে উঠল সনৎ।
প্রচণ্ড কাঁপা গলায় ওই যে- ওই যে ছাড়া আর কোনো শব্দই বেরুল না আমার মুখ থেকে।
—ওই যে কী? বলে সনৎ আমার কাছে এল।
সনৎকে হাত দিয়ে দেখাতে গেলাম। না, কেউ নেই। আমি অবাক। বাথরুমে আর ঘরে কি আপনা-আপনি ম্যাজিক হচ্ছিল?
সব কথা খুলে বললাম সনৎকে। এ-ও বললাম তোমার বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিল বউটার। বাকি রাতটুকু আমরা একই খাটে জেগে কাটালাম। আশ্চর্য, তারপর আর কোনো শব্দ হয়নি বা কোনো কিছু দেখাও যায়নি।
পরের দিন। সকালে চা খেতে খেতে সনৎ বলল— গুরু, কাল তো প্রায় সারারাত আপনার ঘুম হয়নি। আপনি আবার দিনেও ঘুমোন না। আজ সকাল সকাল শুয়ে পড়বেন। তা ছাড়া কাল রাতে যা ধকল গেছে আপনার।
—সত্যি ধকল গেছে। কিন্তু ব্যাপারটা কী, বলো তো শিষ্য?
–আমিও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
—কী দেখলাম?
—সত্যিই তো এটা ভাবার বিষয়, কী দেখলেন?
—শুনেছি প্রেতাত্মা নাকি ঘুরে ফিরে দেখা দেয়?
—আমিও তো তাই জানি।
—তাহলে আজই তো ওদের আনাগোনার বিশেষ দিন। আজ একে শনিবার, তার ওপর ভরা অমাবস্যা।
—ঠিকই বলেছেন। দেখাই যাক না আজ কী হয়।
সত্যি রাত্রে যা ঘটল তা শুনলে অতি বড়ো সাহসীরাও বুকের রক্ত হিম হয়ে যাবে।
ন-টার মধ্যেই আমি শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসতেও বড়ো একটা দেরি হল না। মাঝরাতে অবশ্য ঘুম ভেঙে গেল সনতের গোঙানির শব্দে। সেকী অদ্ভুত আওয়াজ!
সনৎ প্রায় অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গোঙাচ্ছে। কোনোক্রমে তুলে খাটের ওপর বসালাম ওকে। স্বাভাবিক হতে ওর সময় লেগেছিল প্রায় আধঘণ্টা। ভয়ে চোখ-মুখ একেবারে শুকিয়ে গেছে। বললাম— চলো, বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে আগে জল দাও। তারপর সব শোনা যাবে।
—আবার বাথরুম! আঁৎকে উঠল সনৎ।
—কেন, বাথরুমে কী হল?
—তবে শুনুন, সেই কথাই বলছি। রাত বারোটা পর্যন্ত আমি জেগেই ছিলাম। তার মধ্যে কিছু দেখিনি, শুনিনিও কোনোরকম শব্দ। তাই শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম আপনার কথা। এরকম ভুল তো আপনার হওয়ার কথা নয়। কিন্তু হল কী করে। ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ি।
ঘুম ভাঙল বাথরুমে যাবার প্রয়োজনে। খাট থেকে নেমে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বাথরুমে যাবার জন্যে দু-চার পা এগিয়েছি, হঠাৎ মাথায় ঠক করে কী একটা লাগল। কিন্তু মাথায় লাগার মতোন কোনো জিনিস তো ঘরে নেই। তা হলে কী এটা! উপরের দিকে তাকালাম। নাইট বাবের আলোতেও স্পষ্ট দেখতে পেলাম। সনৎ থামল।
লক্ষ করলাম সনতের মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ঠক ঠক করে কাঁপছে।
—কী দেখলে, কী দেখলে? বলে আমি ওকে খুব জোরে ঝাঁকুনি দিলাম।
ঝাঁকুনি খেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হল সনৎ। তারপর চোখ দুটো বড়ো করে আস্তে আস্তে বলল- কড়িতে সেই বউটার দেহ ঝুলছে।
—কোন বউটা? আমি তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলাম।
—কাল রাতে আপনি যে বউটাকে দেখেছিলেন, সেই। গলায় দড়ির ফাঁস। জিভটা বেরিয়ে আছে। জিভ কেটে টপ টপ করে রক্ত ঝরে পড়ছে। আর ওই রক্তবর্ণ চোখে কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হল, আমার হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে যাবে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুল না। সেই অবস্থায় হঠাৎ দেখি বউটার হাতের মতোন দু-খানা হাত বাথরুমের দিক থেকে আমার কাছে এগিয়ে আসছে। হাতে সেই দড়ি। তখনি একটা দমকা হাওয়ার ঝাপটায় মেঝেতে পড়ে গেলাম।
অদ্ভুত ব্যাপার তো! কাল আমি দেখলাম, আজ সনৎ। না, এখানে থাকাটা আর ঠিক নয়। ঠিক করলাম, কাল সকালেই কলকাতা ফিরে আসব। বাকি রাতটা বিছানায় বসে গল্প করে কাটালাম।
সকালে ‘কেয়ার টেকার’ আর দারোয়ানকে সব ঘটনা খুলে বললাম। ওদের মুখ গম্ভীর হল। কোনো কথা বলল না। আমরা কলকাতা ফিরে এলাম।
আজকালকার দিনে ভূত আছে বললে লোকে হাসবে। আমিও ভূতের অস্তিত্ব মানি না। তবে সেদিন আমরা দুজনে কী দেখলাম?
[ ছুটির দুপুর (নির্মল বুক এজেন্সী), ২০০৪ (প্রথম প্রকাশকাল অজ্ঞাত)]
