গুপ্তধনের চাবি – কমল লাহিড়ী
চিঠিটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল অরিন্দম। আজ সারাদিন পরিশ্রমও হয়েছে। তারপর পরিতোষ বলেছিল, ওর সেজদির বাড়িতে নিয়ে যাবে। কিন্তু অফিস থেকে মেসে ফিরে পিসিমার এই চিঠিটাই সব গোলমাল করে দিল।
কিছুই ভালো লাগছে না। ‘চা-টাও ঠান্ডা হয়ে গেল। মেসের ঠাকুর চা দিতে এসে চিঠিটা দিয়েছে। পরিতোষটাও এখনও ফিরল না। একটু যে পরামর্শ করবে তার উপায় নেই।
নীল রঙের ইনল্যান্ডখানা আবার খুলে পড়তে লাগল অরিন্দম। প্রিয়নগর থেকে পিসিমাই লিখেছেন:
পরম কল্যাণবর,
বাবা অমু, এর আগের চিঠিতেও তোমাকে একবার তাড়াতাড়ি আসিতে লিখিয়াছিলাম। কিন্তু ছুটি না পাওয়ায় তুমি আসিতে পারো নাই। সব কথা খোলাখুলি লিখিতেও পারি না। তোমার সঙ্গে একবার দেখা হওয়া বিশেষ দরকার। আমার মন ভালো না। যত সত্ত্বর পারো একবার আসিও। খুবই বিপদে পড়িয়াছি। আমার স্নেহাশীর্বাদ নিও।
ইতি— পিসিমা
চিন্তার রেখা ফুটে উঠল অরিন্দমের চোখে-মুখে। একটা কথা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। এই তো দু-মাস আগেই পিসিমার সঙ্গে দেখা করে এসেছে। নতুন চাকরি। কথায় কথায় তো ছুটি পাওয়া যায় না। হঠাৎ যে পিসিমার কী এমন দরকার পড়ল!
মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই একমাসের ব্যবধানে, বাবা-মা দু-জনকে হারিয়ে অরিন্দম নিঃসন্তান পিসিমার কাছে আশ্রয় পেয়েছিল। পিসেমশাইও খুব ভালোবাসতেন। প্রিয়নগর গ্রাম হলেও, শহরতলির অনেক সুবিধে ছিল। কলকাতার এক বেসরকারি ফার্মে চাকরি করতেন পিসেমশাই। ভালোই কাটছিল দিন। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরনোর দিন আবার একটা প্রচণ্ড ধাক্কা এল ওর জীবনে।
গত বছরের ঘটনা। পরীক্ষার রেজাল্ট জেনে খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছিলেন পিসেমশাই। আনন্দ আর উত্তেজনায় একটু অসতর্ক হয়ে পড়েছিলেন। শিয়ালদহ স্টেশনের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় দৈত্যের মতো বাসটা পিসেমশাইকে চাপা দিয়ে চলে যায়।
পুলিশের কাছে খবর শুনে প্রথমে হতবাক হয়ে গিয়েছিল অরিন্দম। পিসেমশাইয়ের পকেটের ডায়েরি থেকেই ঠিকানা পাওয়া গেছে। খবর শুনে পিসিমা অজ্ঞান হয়ে যান। শেষে অবশ্য সব কিছু পিসিমাই সামাল দেন। শক্ত হাতে হাল ধরে পিসেমশাইয়ের প্রভিডেন্ড ফান্ড ইত্যাদির ব্যবস্থা থেকে শুরু করে, অরিন্দমের এই চাকরিটাও পিসেমশাইয়ের অফিসের লোকজনকে ধরে করে দিয়েছিলেন। প্রিয়নগর থেকে যাওয়া-আসার কষ্ট হবে বলে, কলকাতার মেসে থাকার ব্যবস্থাও করেছিলেন। ধীরে ধীরে সব কিছু অরিন্দমও মানিয়ে নিয়েছিল।
ঠাকুরকে আর এক কাপ চা দেবার কথা বলতে যেতেই পরিতোষের সঙ্গে দেখা হল। ওরা দু-জন এক ঘরে থাকে। চাকরিও এক অফিসে। ঘরে ঢুকেই পরিতোষ বলল, কী রে এখনও রেডি হোসনি, সাড়ে ছ-টা বাজে প্রায়। কথার জবাব না দিয়ে পরিতোষের দিকে পিসিমার চিঠিটা এগিয়ে দিল অরিন্দম।
বোকার মতো পিসিমার চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল পরিতোষ। তারপর অরিন্দমের কাঁধে হাত রেখে বলল, তাহলে তো তোর যাওয়া হবে না। তা এখন কি ট্রেন আছে?
রাত আটটায় একটা গাড়ি আছে। তবে প্রিয়নগর পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে যাবে। তাই ভাবছি।
আর ভেবে কাজ নেই। নিশ্চয়ই পিসিমার কোনো বিপদ-টিপদ হয়েছে। চিঠিতে তো সব লেখা যায় না। দেরি না করে তুই বরং আজই বেরিয়ে পড়। একটা দরখাস্ত শুধু লিখে দিয়ে যা। আমি কাল অফিসে বড়োবাবুকে দিয়ে দেব।
শেষ পর্যন্ত রাত্রের ট্রেনেই যাওয়া স্থির ঠিক করল অরিন্দম। জিনিসপত্র একটা ছোটো হাত ব্যাগে গুছিয়ে অরিন্দম ঠাকুরের নাম স্মরণ করে রাস্তায় নামল।
নির্দিষ্ট সময় থেকে আধ ঘণ্টা দেরি করে ট্রেন ছাড়ল। ওভারহেড তারে কারেন্ট না থাকার ফলে সব ট্রেনই দেরি করে ছাড়ছে। প্রিয়নগর স্টেশনে যখন গাড়ি পৌঁছোল তখন রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। রাত্রের ট্রেনে খুব বেশি লোকজন নামে না। আজ নামল শুধু তিনজন। দু-জন যাত্রী একসঙ্গে কথা বলতে বলতে অরিন্দমের সামনে দিয়ে চলে গেল।
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে একটু চিন্তা করল অরিন্দম। স্টেশন মাস্টারমশাই-এর ঘরের দরজাও বন্ধ। সামনের দিকে একটা কুকুর কান্নার সুরে ডেকে উঠতে চমক ভাঙল অরিন্দমের। কয়েক পা এগিয়ে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। স্টেশনের বাইরে কাঠ-বাদাম গাছটার নীচে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। মনে সাহস এনে বাদাম গাছটার দিকে পা চালাল অরিন্দম।
আকাশে সরু একফালি চাঁদ ছিল। কিন্তু একখণ্ড কালো মেঘ এসে ঢেকে দিল। স্টেশন থেকে পিসিমার বাড়ি দু-মাইলের মতো রাস্তা। কয়েকটা সাইকেল রিকশাও থাকে। আজ ট্রেনের দেরি দেখে বোধ হয় চলে গেছে। বাদাম গাছটার কাছে এসে দাঁড়াল অরিন্দম। তারপর সামনের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। না চোখের ভুল তো নয়! বাদাম গাছের আড়াল থেকে ঠিক পিসিমার মতো কে একজন সরে গেল। অরিন্দম কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিসিমা ওর সামনে এসে বললেন, অমু এলি বাবা। ট্রেনটা যা দেরি করল। মুখপোড়া যতীনটা সেই যে আমাকে রেখে ভাড়া খাটতে গেল আর ফেরার নাম নেই। তা তুই আমার সঙ্গে হেঁটেই চল। এইটুকুন তো রাস্তা পারবি না হাঁটতে। পিসিমার কথা শুনে হেসে ফেলল অরিন্দম। কিন্তু পরক্ষণেই অনেকগুলো প্রশ্ন একসঙ্গে মাথায় ভিড় করে এল। এত রাত্রে পিসিমা স্টেশনে এসেছেন। যতীন অবশ্য ওদের চেনা লোক রিকশা চালায়। ওদের বাড়ির কাছেই থাকে। কিন্তু সেই-বা গেল কোথায়?
প্রশ্নগুলো মনের মধ্যে তোলপাড় শুরু করল। পিসিমাকে প্রণাম করতে যেতেই তিনি একটু সরে গিয়ে বললেন, থাক থাক, রাস্তায় প্রণাম করতে নেই। তুই আগে বাড়িতে চল।
তুমি এত রাত্রিতে স্টেশনে এলে কেন?
দেখ ছেলের কথা। তোকে চিঠি দিয়েছি না। আমার মন বলছিল তুই আজ ঠিক আসবি। তাই তো যতীনকে নিয়ে রাত্রের ট্রেন দেখতে এলাম। তা সে আবার আমাকে নামিয়ে দিয়ে পলাশপুরে ভাড়া খাটতে গেল। ট্রেন আসার দেরি আছে শুনে আমিও না করিনি।
পিসিমার কথা শুনে মাথার মধ্যে আবার ঝিম-ঝিম করে উঠল। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে আর কিছু প্রশ্ন নয়। খিদেও পেয়েছে। ব্যাগটা ভালো করে ধরে একটু হেসেই অরিন্দম বলল, তুমি না সত্যি পাগল। আমি আসতে পারি ভেবে, এই রাতদুপুর অবধি স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছ? নাও আর দেরি না করে চলো, আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে।
হ্যাঁ বাবা তাই চল, বাড়ি গিয়েই সব কথা হবে। তোর খাবার আমি ঢাকা দিয়ে এসেছি। অরিন্দমের সঙ্গে বাড়ির দিকে পা চালাল পিসিমা।
স্টেশনের সীমানা পেরিয়ে মাটির রাস্তা। পিসিমা আগে আগে হাঁটছেন। অরিন্দমের মনের মধ্যে অনেক কথার ভিড় জমলেও কিছু বলতে পারছে না। কী মনে হওয়ায় পিসিমা ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, তোর অফিসে বলে এসেছিস তো অমু। কয়েক দিন এখানে থাকতেও হতে পারে।
হ্যাঁ, পরিতোষের কাছে একটা দরখাস্ত লিখে দিয়েছি। তা তোমার এমনকী দরকার পড়ল একটু খুলে বলো তো। অরিন্দম একটু বিরক্তভাবে প্রশ্ন করল।
এবার অরিন্দমের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে পিসিমা তাঁর বিপদের কথা বলতে লাগলেন। চাপা স্বরে ফিসফিস করে পিসিমা যা বললেন তার কিছুটা অরিন্দম আগেই আন্দাজ করেছিল।
শ্বশুরের আমলের পাঁচটা নবাবি মোহর ছিল পিসিমার কাছে। অরিন্দমকে কয়েক বার দেখিয়েওছেন সে মোহর। এখনকার বাজারদরে মোহরগুলোর বেশ কয়েক হাজার টাকা দাম হবে। অরিন্দমকে কয়েক বার বলেছিলেন পিসিমা মোহর ক-টা কলকাতায় নিয়ে বিক্রি করে টাকা ব্যাঙ্কে রেখে দিতে। কিন্তু অরিন্দম সেকথায় কান দেয়নি। গত সপ্তাহে পিসিমা নাকি নিজেই একটা মোহর নিয়ে হরেন স্যাকরার দোকানে গিয়েছিলেন দাম যাচাই করতে। সেখানে আবার তখন গ্রামের কয়েকটি বখাটে ছেলে বসেছিল। মোহর দেখে হরেন স্যাকরা চমকে উঠেছিল প্রথমে। তারপর ছেলেদের দিকে তাকিয়ে, চুপি চুপি মোহরটা পিসিমার হাতে দিয়ে পরে আসতে বলেছিল।
উৎপাত শুরু হল সেই রাত্রি থেকেই। হরেন স্যাকরার দোকানের সেই বখাটে ছেলেদের মধ্যে একজন রাজেন, পিসিমার কাছে এসে মোহরের কথা জিজ্ঞাসা করল। আর কলকাতায় গিয়ে বিক্রি করে দেবার কথাও বলল। পিসিমা তো অনেক বকাঝকা করে তাকে তাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু রাজেন পরদিন থেকেই তার দলবল নিয়ে রাত্রে উৎপাত শুরু করল। গ্রামের মাতব্বরদের বলেও ফল হয়নি। পরশু নাকি রাজেন পিসিমাকে ভয় দেখিয়ে গেছে, ওকে মোহর বিক্রি করতে না দিলে পিসিমা খুব বিপদে পড়ে যাবেন। তাই ভয় পেয়ে পিসিমা অরিন্দমকে আসতে লিখেছেন।
কথা শেষ করে পিসিমা বললেন, এখন তুই এসে গেছিস, যা ব্যবস্থা করতে হয় কর।
ওরা যে এরকম করছিল, তুমি সুমনদের দিয়ে পুলিশে খবর দিলে না কেন? সুমন অরিন্দমের স্কুলের বন্ধু। ওর বাবাও পিসেমশায়ের বন্ধু ছিলেন। তাই সুমনের নামটা অরিন্দমের মাথায় এল! তা ছাড়া বিপদে-আপদে ওরাই তো আগে ছুটে আসে।
একগাল হেসে পিসিমা বলেন, ওমা পুলিশ আবার কী করবে। এসব কথা কি পাঁচকান করতে আছে। ওই রাজেন ছোঁড়াকে আমি ঢিট্ করে দিয়েছি কথায়। ও আমার আর কিছুই করতে পারবে না। তোর পিসের ছোটো সিন্দুকের চাবি আমি লুকিয়ে রেখেছি। মোহরগুলো সেখানেই আছে। তুই বাবা চাবিটা নিয়ে ওগুলো উদ্ধার কর তাহলেই আমার শান্তি। শেষের কথাগুলো বলতে বলতে পিসিমার গলা ধরে এল।
রাগে ঘৃণায় বিষিয়ে উঠল অরিন্দমের মন। দিন দিন দেশটা কী হয়ে উঠছে! অসহায়া বৃদ্ধা মহিলার উপর অত্যাচার করছে বখাটে ছেলেরা আর গ্রামের বয়স্ক লোকেরা তা দেখছে।
কথা বলতে বলতে বাড়ির কাছাকাছি এসে গেল। আবার কয়েকটা কুকুর একসঙ্গে বিশ্রীভাবে ডেকে উঠল। সোজা রাস্তায় না গিয়ে পুকুরের পাশে বাঁশ ঝোপের দিকের রাস্তায় এগিয়ে যাচ্ছেন পিসিমা। কথা না বলে পিছনে হাঁটছে অরিন্দম। বাঁশঝোপের রাস্তা দিয়ে বাড়ির পিছন দিকে ঢুকল ওরা।
সমস্ত বাড়িটা অন্ধকারে ঢাকা। পকেট থেকে দেশলাই বের করে জ্বেলেই চমকে উঠল অরিন্দম। পিসিমা কোথায় গেলেন! এই তো একটু আগেই পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন।
—পি-সি-মা— কাঁপা কাঁপা গলায় ডেকে উঠল অরিন্দম।
হঠাৎ সামনের দিকে হাসির আওয়াজ হতে ভয় পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল অরিন্দম। বড়ো ঘরের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে পিসিমা তখন ওকেই ডাকছেন, আচ্ছা ভীতু ছেলে তো তুই। উঠোনে দাঁড়িয়ে কী ভাবছিস? এতদিন এ বাড়িতে কাটালি আজ কি সব নতুন ঠেকছে! আয় ঘরে আয়— আমি তোর খাবার আনছি।
পিসিমা যে কখন গিয়ে ঘরের দরজা খুললেন সেটা বুঝে উঠতে পারে না অরিন্দম। ট্রেন থেকে প্রিয়নগরে নামার পর থেকেই একের-পর-এক অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটছে আজ। আর কিছু ভাবতেও পারছে না অরিন্দম।
ঘরে ঢুকে ব্যাগ থেকে একটা মোমবাতি বের করে ধরাল। গ্রামে আসার জন্যই সঙ্গে এনেছিল। মোমবাতি জ্বেলে মুখ তুলতেই আবার চমকে উঠল। ঘরে তো পিসিমা নেই। এবার খুবই ভয় পেয়ে গেল ও; যদিও এখানকার সবই চেনা। ছোটোবেলা থেকে এই ঘরে পিসিমার কাছে থেকেছে, কিন্তু আজ পিসিমার হাঁটাচলা কথাবার্তা সবই যেন কেমন ধোঁয়াটে লাগছে।
মোমবাতি হাতে বাইরের বারান্দায় আসতেই আর একদফা চমক। হাতে খাবারের থালা নিয়ে পিসিমা ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। রান্নাঘরের দরজাটাও খোলা। এবারে হেসে ফেলল অরিন্দম। পিসিমা যে ওরই জন্য খাবার আনতে রান্নাঘরে গেছেন সেই কথাটাই মনে পড়েনি।
পিসিমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে নীচে নামে অরিন্দম। লেবুতলা পেরিয়ে পাতকুয়ো থেকে জল তুলে মুখ-হাত ধুয়ে আবার ঘরে ঢোকে। খাবারের থালা সাজিয়ে পিসিমা তক্তপোশের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। চারখানা রুটি-তরকারি। একবাটি দুধ আর কলাও রয়েছে। রুটি ছিঁড়ে মুখে দিয়ে অরিন্দম বলল, তোমার খাবারটাই দিয়ে দিলে তো?
ওমা আমার যে একাদশী আজ। এগুলো তোর জন্যই করে রেখেছি। তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। আরও কথা আছে। আমি যাই রান্নাঘরটা বন্ধ করে হাত ধুয়ে আসি। ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন পিসিমা। একঝলক ঠান্ডা শীতল হাওয়া এসে ঝাপটা মারল অরিন্দমের চোখে-মুখে।
খিদেও পেয়েছিল। চারখানা রুটি তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। পিসিমা তো অনেকক্ষণ গেছেন। জলের গ্লাস হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল অরিন্দম। রান্নাঘরের পাশে, ঘোড়া নিমগাছটার কাছে দাঁড়িয়ে পিসিমা যেন কী করছেন। আস্তে আস্তে বারান্দা থেকে নীচে নেমে একটু জোরে অরিন্দম বলল, অন্ধকারে ওখানে কী করছ পিসিমা?
অরিন্দমের ডাক শুনে ঘুরে তাকালেন পিসিমা। তারপর কয়েক পা এগিয়ে এসে বিষণ্ণ করুণ সুরে বললেন, না রে নিতে পারেনি। যেমন রেখেছিলাম তেমনি আছে। তুই একটু এগিয়ে আয় অমু।
প্রায় যন্ত্রচালিতের মতো এবার পিসিমার দিকে এগিয়ে যায় অরিন্দম। ঘোড়া নিমগাছের কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে পিসিমা বলেন, ওই যে উঁচু মতো জায়গাটা দেখছিস, সিন্দুকের চাবিটা ওখানেই আছে। মাটি খুঁড়ে তুই ওটা বের করে নে অমু। আর দেরি করিস না।
কথাগুলো বলেই নিমেষের মধ্যে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন পিসিমা। নিমগাছের ডালটাও হাওয়ায় দুলে উঠল। একটা হিম শীতল হাওয়া আবার অরিন্দমের মুখে লাগল। নিমগাছের উপর পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ হল। অরিন্দমের কানে তখন পিসিমার চাপাস্বরে বলা কথাগুলোই বাজছে। ভয়ে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে এবার পি-সি-মা— বলে ভীষণ জোরে ডেকে উঠল অরিন্দম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কুকুরের কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না অরিন্দম। জ্ঞান হারিয়ে টলে পড়ে গেল মাটিতে।
আস্তে আস্তে ভোরের আলো উঁকি দিচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও চোখ দুটো খুলতে পারছে না অরিন্দম। মাথাটা ভীষণ ভারী। ঘরের মধ্যে যেন কথার শব্দ। মনে জোর এনে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল অরিন্দম। মাথার কাছেই সুমন বসে আছে। পাঁচুকাকা শিবেন জেঠু আরও কয়েক জন দাঁড়িয়ে কী যেন বলছেন। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বিছানায় বসতেই চাপা গুঞ্জন ভেসে উঠল ঘরে। শিবেন জেঠুই এগিয়ে এলেন অরিন্দমের কাছে।
বোকার মতো তাঁর মুখের দিকে তাকাতে মাথায় হাত দিয়ে সান্ত্বনার সুরে শিবেন জেঠু বললেন, শক্ত হও অমু, এখন তোমার অনেক কাজ।
ধড়মড় করে উঠে বসে চিৎকার করে উঠল অরিন্দম, কী হয়েছে সুমন— আমার পিসিমা কোথায়? অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘোরাল সুমন। শিবেন জেঠু এগিয়ে এসে অরিন্দমকে ধরে ফেললেন।
সুমন আর শিবেন জেঠুর কাছেই ঘটনাটা শুনল অরিন্দম। পিসিমার সব কথাই ঠিক। রাজেন নাকি সেই মোহরের জন্য ক-দিন পিসিমাকে ভয় দেখিয়েছিল। তবে এতবড়ো অঘটন যে ঘটে যাবে সেকথা কেউ ভাবেনি। কাল দুপুরের দিকে রাজেন নাকি পিসিমার কাছে এসে মোহরের কথা বলে। এক কথা দুই কথায় পিসিমা চিৎকার করে উঠতেই দুই হাত দিয়ে রাজেন পিসিমার গলা টিপে ধরে। পিসিমা ও গায়ের জোরে লড়ছিলেন। গলা ছেড়ে রাজেন পিসিমাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। চিৎকার শুনে লোকজন ছুটে আসে। রাজেন তখন পালিয়েছে। কিন্তু প্রচণ্ড উত্তেজনায় পিসিমা হার্টফেল করে মারা যান।
পুলিশও এসেছিল। তবে ডাক্তারবাবু আর পঞ্চায়েত প্রধানের জন্য কোনো ঝামেলা হয়নি। শিবেন জেঠুই সব ব্যবস্থা করেছেন। সুমন-কল্যাণ-পলাশদের নিয়ে পিসিমার দেহ কাল রাত্রে দাহ করা হয়েছে। অরিন্দমকে খবর দিতেও লোক পাঠিয়েছেন কলকাতায়।
সব কথা শুনে আবার চিৎকার করে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে হয়েছিল অরিন্দমের। কিন্তু তার আগেই সুমন বলল, কাল যখন রাত তিনটের সময় আমরা পিসিমাকে দাহ করে বাড়িতে ফিরে আসছিলাম, তখনই তোকে ঘোড়া নিমগাছতলার কাছে পড়ে থাকতে দেখি। কিন্তু তুই গ্রামে এলিই বা কখন আর ওই ঘোড়া নিমগাছের কাছে গিয়েছিলিই বা কেন?
সুমনের কথার জবাব না দিয়ে এবার তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নামে অরিন্দম তারপর সবাইকে অবাক করে— পাগলের মতো ছুটে যায় সেই ঘোড়া নিমগাছের কাছে। একটা লাঠি নিয়ে মাটির ঢিপিটা খুঁড়তেই একটা ছোটো মতো কৌটো বেরিয়ে পড়ে। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে কৌটোর মুখটা খুলতেই একটা চাবি দেখতে পায় অরিন্দম।
চাবিটা বুকের কাছে চেপে ধরে এতক্ষণে অরিন্দম ছোট্ট ছেলের মতো ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে।
[ ভূত পেত্নী রক্তচোষা (দেব সাহিত্য কুটীর), ১৯৮৪ ]
