Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
0/50
New Courseপেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

চিলেকোঠার রহস্য – মুরারিমোহন বিট

গ্রামটার নাম মনে নেই।

তবে এটুকু মনে আছে, ব্যান্ডেল-কাটোয়া রেললাইনের ত্রিবেণী নামক জায়গা থেকে মাইল পাঁচেক দূরে গঙ্গার ধারে সেই গ্রামটি।

ছবির মতো গ্রাম। গঙ্গার ধারের প্রাকৃতিক দৃশ্য অতি মনোরম। ধরা যাক গ্রামটির নাম চন্দনপুর

এই গ্রামেরই একটি মাঝারি আকারের আধপুরোনো দোতলা বাড়ি বেশ সস্তা দামে খরিদ করলেন কলকাতার এক স্টিল কোম্পানির মালিক সুরজিৎ আগরওয়ালা।

বাড়িটার অবস্থা মোটামুটি খুব খারাপ নয়। একটু-আধটু, মেরামত করে নিতে পারলে বসবাসের কোনোই অসুবিধা হবে না। তবু কোটিপতি আগরওয়ালা স্থির করলেন, বাড়িটা আগাগোড়া চুনবালি খসিয়ে নিখুঁতভাবে সারিয়ে নেবেন। তাতে খরচ যা হয় হবে, সে খরচ করতে তিনি কার্পণ্য করবেন না— কারণ গঙ্গাধারের অমন সুন্দর পরিবেশের এই বাড়িটাকেই তিনি করতে চান নানারকম ফুলগাছ ও বাহারি লতাপাতায় সাজানো একটি মনোরম পল্লীভবন, যেখানে তিনি মাঝে মাঝে কলকাতার ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে অবসরগ্রহণ করতে পারবেন।

এই ভেবে একদিন তিনি তাঁর অফিসের একজন বিশ্বাসী কর্মচারী অনিমেষ রায়ের সঙ্গে সাতজন মিস্ত্রিকে পাঠিয়ে দিলেন চন্দনপুর। এবং পৃথক একটি লরিতে করে সিমেন্ট, বালি, চুন ইত্যাদি পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন— যাতে প্রথম কয়কেটা দিন কাজ চালানো যাবে। তারপর দেখে-শুনে অনিমেষ যেন ত্রিবেণী থেকেই ওইসব জিনিস সংগ্রহ করার ব্যবস্থা করে।

এমন একটি বাড়ি এত কম দামে পাওয়ার আশা সত্যিই করতে পারেননি আগরওয়ালা। এই বাড়িটা তিনি কিনেছেন হরিশঙ্কর গঙ্গোপাধ্যায় নামে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের একজন পদস্থ অফিসারের কাছ থেকে। ভদ্রলোক বর্তমানে সপরিবারে কলকাতায় বাস করেন, তাঁরই স্বোপার্জিত অর্থে কেনা নিজের বাড়িতে। চন্দনপুরের এই বাড়িটি তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি।

ভদ্রলোকের বয়স হয়েছে, বহুদিন যাবৎ তিনি চাকরি করছেন। বছর পনেরো হল, তিনি কলকাতায় বাড়ি কিনে গাঁয়ের বাড়ি ছেড়ে সপরিবারে বসবাস শুরু করেছেন কলকাতায়।

প্রথম প্রথম বছরে একবার দুর্গা পূজার সময় দু-চার দিনের জন্য দেশের বাড়িতে গিয়ে বাস করে আসতেন। তারপর ক্রমশ দু-বছর অন্তর একবার, তিন বছর অন্তর একবার এইভাবে কমতে কমতে গত কয়েক বছর হল তিনি আর চন্দনপুর যাননি। ছেলে-মেয়েরাও কেউ আর দেশের বাড়িতে যেতে চায় না। আর তাঁর বর্তমান দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রী তো খাঁটি বালিগঞ্জের মেয়ে; তাঁর তো ওদিকে পা দিতে কোনোরকম ইচ্ছাই নেই। স্বামী যেতেন বলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে যেতে হত, এই যা।

দেশের মায়া হরিশঙ্করবাবুর কেটে গেছে, দেশে বাস করার ইচ্ছা তাঁর আর নেই। সে কারণে তিনি বাড়িটাকে বিক্রি করার জন্য খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। সেই বিজ্ঞাপন দেখেই আগরওয়ালা বাড়িটা কিনে নিয়েছেন।

কারখানার মোটর ভ্যানে করে দলবল নিয়ে যখন অনিমেষ চন্দনপুর পৌঁছাল, তখন বেলা তিনটে। মিস্ত্রিরা সকলে মিলে খানতিনেক ঘর পরিষ্কার করে নিল সকলের বাস করার জন্য। যতদিন না বাড়িটার মেরামতের কাজ শেষ হয়, ততদিন তাদের এবং অনিমেষকে এখানেই থাকতে হবে— এইরকমই নির্দেশ আছে আগরওয়ালার।

এবং থাকতে হলেই রান্নাখাওয়ার আয়োজন করতে হবে। মিস্ত্রিরা সাতজন আর অনিমেষ নিজে— এই আট জনের দু-বেলার রান্নার জন্য একজন লোকের নিতান্তই দরকার। এবং আজ থেকেই দরকার। বাড়িতে পৌঁছেই অনিমেষ তাই আবার গাঁয়ের মধ্যে বেরিয়ে পড়ল লোকের সন্ধানে।

খানিক পথ অগ্রসর হওয়ার পর একটা ছোটো কোঠাবাড়ির বাইরের বারান্দায় কয়েক জন বয়স্ক লোককে দাবা খেলতে দেখে অনিমেষ দাঁড়াল তাঁদের সামনে। এক কেতাদুরস্ত, সুটপরিহিত অচেনা যুবককে দেখে গাঁয়ের লোকগুলির দাবা খেলা বন্ধ হল। তাঁরা সকৌতূহলে অনিমেষের দিকে তাকালেন। অনিমেষ বলল, আমি কলকাতা থেকে আসছি। আপনাদের বোধ হয় অজানা নেই, এখানে হরিশঙ্কর গাঙ্গুলীর বাড়িটা সুরজিৎ আগরওয়ালা কিনেছেন।

একজন ভদ্রলোক বললেন, গঙ্গার কাছে অশথতলার ডান দিকে যে দোতলা কোঠাবাড়িটা রয়েছে, ওই বাড়িটার কথা বলছেন তো?

অনিমেষ বলল, হ্যাঁ, ওই বাড়িটাই। আমি আগরওয়ালা সাহেবের স্টিল কোম্পানিতে কাজ করি। সাহেব আমাকে কয়েক জন রাজমিস্ত্রি দিয়ে এখানে পাঠিয়েছেন বাড়িটা মেরামত করবার জন্য। পনেরো-বিশ দিন লাগবে বলে মনে হচ্ছে। আমরা আছি আটজন। দু-বেলা রান্না-খাওয়া তো করতে হবে। ভালো রাঁধতে পারে, এমন একজন লোকের দরকার। সেই খোঁজেই আপনাদের কাছে এসেছি। যদি আপনারা একটা ব্যবস্থা করে দিন, খুব উপকার হয়।

দ্বিতীয় একজন ভদ্রলোক বললেন, হ্যাঁ, একজন বয়স্কা মেয়েছেলে আছে, দিতে পারি। তা তাকে তো দু-বেলা খেতে দিতে হবে, আর হাতখরচাও দু-এক টাকা দেওয়া দরকার।

অনিমেষ বলল, তা তো বটেই। পনেরো দিন হোক, বিশ দিন হোক, পঁচিশ দিন হোক, রান্না করে দিতে হবে দু-বেলা তিনি খাবেন, আর হাতখরচ বাবদ পাঁচ টাকা দেব।

—ব্যস, ব্যস। ওতেই হবে। তা আপনার কি আজই লোকের দরকার?

—হ্যাঁ, সেইজন্যে তো বাড়িতে পা দিয়েই বেরিয়ে পড়েছি। আর সন্ধ্যার আগেই যদি পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেন—

—বেশ, ঘণ্টাখানেক পর আমি নিজেই তাকে নিয়ে যাচ্ছি। আপনি থাকবেন তো? অনিমেষ বলল, হ্যাঁ আছি। আচ্ছা এদিকে দোকানপসার, বাজারহাট এসব কোথায়? যদি বলে দেন তো ঘুরে ঘুরে এখন একবার দেখে আসি। আজকের মতো চাল ডাল তরিতরকারি কিছু নিয়ে এসেছি বটে, কিন্তু মুদির দোকানের কিছু জিনিস আজ নেব।

দ্বিতীয় ভদ্রলোকটি দাবাখেলার দর্শক ছিলেন। হাব ভাব এবং কথাবার্তায় তাঁকে বেশ অমায়িক ও সহানভূতিশীল মনে হল। তিনি বললেন, বাজার আর দোকান কাছেই। সকালে টাটকা তরিতরকারি মাছ সবই পাবেন— চলুন আপনাকে দেখিয়ে দিয়ে আসি।

অনিমেষকে সঙ্গে নিয়ে গাঁয়ের প্রধান সড়ক ধরে তিনি উত্তরদিকে হাঁটা দিলেন। এই ভদ্রলোকের নাম শঙ্কর নারায়ণ চৌধুরী।

.

পরদিন সকাল আটটা থেকে মিস্ত্রিদের কাজ শুরু হয়ে গেল। একতলা- দোতলা মিলে বাড়িটাতে সবসুদ্ধু খান দশেক ঘর। আর দোতলার ছাদের ওপর আছে একটা চিলেকোঠা। চিলেকোঠা ঘরটাও নেহাত ছোটো নয়। লম্বা-চওড়াও আছে এবং উঁচুও বেশ।

দোতলার ছাদ এবং চিলেকোঠা থেকেই কাজ আরম্ভ করা হল। ঘরদোর ছাদ মোটামুটি সব ভালোই আছে; খারাপের মধ্যে চুনবালির প্লাস্টারে বহু জায়গায় নোনা ধরেছে, আর স্থানে স্থানে চুনবালি খসে ইঁট বেরিয়ে পড়েছে। দরজা জানালার কপাট ইত্যাদি মজবুত আছে— শুধু রং খুব ফিকে হয়ে গেছে।

আগরওয়ালার নির্দেশ আছে, ঘরগুলির সমস্ত বালি খসিয়ে আগাগোড়া নতুন চুনবালির প্লাস্টারিং করা হবে। সেই হিসেবেই ছাদ ও চিলেকোঠার প্লাস্টারিং খসানোর কাজ শুরু করা হল। দু-জন মিস্ত্রি চিলেকোঠার মধ্যে ঢুকল, বাকিরা ছাদের কাজে হাত দিল।

চিলেকোঠার দেওয়ালে একজন মিস্ত্রি প্রথম যেই শাবলের ঘা মেরেছে, অমনি একটা বিশ্রী কাণ্ড ঘটে গেল। শাবলটা আচমকা পিছলে গিয়ে পড়ল লোকটার পায়ের পাতায়। বেশ খানিকটা গর্ত হয়ে গেল… রক্তারক্তি কাণ্ড!

অনিমেষ খুব বুদ্ধি করেই সঙ্গে কিছু ওষুধপত্র, তুলো, ব্যান্ডেজ ইত্যাদি এনেছিল। সে তৎক্ষণাৎ টিংচার বেঞ্জয়িন লাগিয়ে তার পা-টা বেশ শক্ত করে বেঁধে দিল, এবং কিছুক্ষণের জন্য তার বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিল। যদি তার পায়ের অবস্থা ভালো থাকে, তাহলে পরে সে কাজ করবে, নচেৎ দরকার বুঝলে তাকে ডাক্তার দেখানো হবে।

কিন্তু কী আশ্চর্য! আর একজন মিস্ত্রি যে চিলেকোঠায় ছিল, তারও ঘটে গেল একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা। শাবলের আঘাতে দেওয়ালের খানিকটা প্লাস্টার খসিয়ে ফেলতেই লোকটা মাথা ঘুরে পড়ে গেল মেঝের ওপর। তার আর জ্ঞান রইল না।

হইহই ব্যাপার। সব মিস্ত্রিরা ছুটে গিয়ে তাকে ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে এসে ছাদের ওপর তাকে শুইয়ে দিল। মুখে-চোখে জলের ছিটে দিয়ে খানিকক্ষণ হাওয়া দিতে তবে সে চোখ খুলল। অনিমেষ বলল, চিলেকোঠা ঘরটা বড়ো অপয়া। দু- দু-বার এরকম বাধা পড়ল। আজ এ ঘরের কাজ বন্ধ থাক।

বৈকাল পাঁচটা অব্দি মিস্ত্রিরা নির্বিঘ্নে ছাদের আলিসা, এবং দোতলার ঘরের কিছু কিছু দেওয়ালের কাজ শেষ করল। বেলা বারোটা থেকে একটা অবধি মিস্ত্রিদের খাওয়ার ছুটি ছিল। কাজ তারা করল বটে, কিন্তু সহকর্মী দু-জনের দুর্ঘটনার জন্য তাদের মন কারো ভালো ছিল না। ওই অসুস্থ মিস্ত্রি দু-জনের পক্ষে এদিন আর কাজ করা সম্ভব হয়নি।

সন্ধ্যা ছ-টা নাগাদ রাঁধুনি মহিলাটি এসে উনুন জ্বেলে রান্না চাপিয়ে দিল। সকালে আটটা নাগাদ এসেছিল। রান্নাবান্না করে বারোটার মধ্যে খেয়ে-দেয়ে চলে গিয়েছিল। কাল রাতে গিয়েছিল সাড়ে ন-টায়। আজ গেল ন-টায়।

অনিমেষ রাত এগারোটার আগে খেতে পারে না, এইরকমই ওর বরাবরের অভ্যাস। মিস্ত্রিদের একটু সকাল সকাল খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও অনিমেষের কথা শুনে তারাও বাবুর সঙ্গে রাত এগারোটাতেই খাওয়া উচিত বিবেচনা করেছে। কাল রাত এগারোটাতেই একসঙ্গে সকলে খেয়েছে, আজও তারা সেইরূপ খাবে স্থির করে মেঝেতে আঁক কেটে হ্যারিকেনের আলোয় বাঘবন্দি খেলা শুরু করেছে। আর অনিমেষ তাদের পাশের ঘরে মেঝেতে বিছানা পেতে একটা ইংরাজি বই পড়ছে। মাথার ওপর জ্বলছে হ্যারিকেন।

রাত তখন দশটা বেজে গেছে।

বেশ তন্ময় হয়েই অনিমেষ বইখানা পড়ছিল। হঠাৎ কীসের যেন একটা শব্দ পেয়ে সে দরজার দিকে তাকাল। তাকিয়েই কেমন যেন একটা চমকে উঠল। দেখল দরজার গোড়ায় আধা আলো আধা অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি মহিলা। পরনে তার কালো বা ওই ধরনের কোনো গাঢ় রঙের নকশাদার চওড়া পাড়ওলা সাদা ভূমির শাড়ি… মাথায় ঘোমটা টানা। মুখমণ্ডল ভালো দেখা যাচ্ছে না— বোঝাও যাচ্ছে না কীরকম দেখতে!

অনিমেষ অত্যন্ত অবাক হল, এত রাত্রে তার কাছে সম্পূর্ণ একজন অচেন মহিলাকে আসতে দেখে। প্রথম নজরে সে হঠাৎ ভেবেছিল, রাঁধুনি মেয়েটাই বোধ হয় এসেছে। কিন্তু পরমূহূর্তে তার ভুল ভেঙেছে। অনিমেষ অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। বিছানার ওপর উঠে বসে অস্বস্তিকর কণ্ঠে সে প্রশ্ন করল, কে আপনি?

মহিলাটি এত কাছে থাকা সত্ত্বেও তার কাছ থেকে উত্তর যা এল, অনিমেষের মনে হল তার সেই কণ্ঠস্বর যেন ভেসে এল বহুদূর থেকে। মহিলাটি বলল, আমার পরিচয় জেনে আপনার লাভ নেই। আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছি। সারা বাড়িটা মেরামত করুন, বাধা দেব না— কিন্তু ওপরের চিলেকোঠাতে হাত দেওয়ার চেষ্টা করবেন না— কারণ ওই ঘরটাতে আমি বাস করি। আমার ঘর যেমন আছে তেমনি থাকবে। আমার ঘরে হাত দিলে খুব বিপদে পড়বেন— সাবধান!

অনিমেষ বিস্ফারিত নেত্রে হতভম্বের মতো বলল— কই, ওপরের ওই চিলেকোঠায় কেউ বাস করে বলে তো মনে হল না।

অনিমেষের কথা বলার মধ্যেই মহিলাটি অন্ধকারের মধ্যে মিশে গেল।

হারিকেন নিয়ে অনিমেষ তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না। মুহূর্তের মধ্যে আবার তিন সেলের টর্চাটা নিয়ে এল, চতুর্দিকে আলো ফেলল– নাঃ, কেউ কোথাও নেই। কী আশ্চর্য! সে চতুর্দিকে অন্ধকারের মধ্যে দৃষ্টিপাত করছে, আচমকা তার মনে হল, একেবারে পাশ থেকে তার কানের কাছে মুখ এনে কে যেন ফিসফিস করে বলল— সাবধান! সাবধান!

গভীর আতঙ্কে অনিমেষের সারা দেহটা শিরশির করে উঠল। যেন একটা হিমপ্রবাহ বয়ে গেল তার শিরদাঁড়ার মধ্যে দিয়ে।

পাশের মিস্ত্রিদের ঘরে গিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল— তোমরা এইমাত্র কোনো মেয়েছেলেকে দেখেছ কি? মাথায় ঘোমটা দেওয়া… সাদা কাপড় পরা?

সকলে অবাক হয়ে অনিমেষের মুখের দিকে তাকাল। একজন বলল– না তো!… আমরা বাবু খেলাতেই ডুবে আছি, অন্যদিকে খেয়াল করিনি। কোনো মেয়েছেলে এসেছিল কি? আপনি দেখেছেন?

—হুঁ! অনিমেষ সংক্ষেপে উত্তর দিল।

মিস্ত্রিরা অবাক হয়ে এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।

.

নানা চিন্তায় রাতে ভালো ঘুম হল না অনিমেষের। কে ওই মহিলাটি? চিলেকোঠায় তো কেউ থাকে না!

তবে তার ওই কথার অর্থ কী? কেন সে বলল যে সে চিলেকোঠায় বাস করে? তা ছাড়া মেয়েটির অস্বাভাবিক আগমন ও প্রত্যাগমন অত্যন্ত রহস্যজনক… তার কথাবার্তা আরও রহস্যময়! তবে কি…তবে কি চিলেকোঠায় হাত দেওয়ার অপরাধেই ওই মিস্ত্রি দু-জনের অমন আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটেছে? মহিলাটি মানুষ, না মানুষের রূপধারী অন্য কিছু?

অনিমেষের দেহটা ভয়ে কাঠ হয়ে আসে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই চা-টা খেয়ে বাজারের থলি হাতে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল।

এখানে সাড়ে সাতটার আগে ভালো বাজার বসে না। তার এত সকাল সকাল বেরুনোর উদ্দেশ্য, শঙ্কর চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর কাছ থেকে ওই রহস্যজনক মহিলাটি সম্পর্কে কিছু জানা যায় কিনা চেষ্টা করতে হবে।

চৌধুরী মশায়ের বাড়ি অনিমেষের জানা। প্রথম দিন চৌধুরীমশাই যখন অনিমেষকে বাজারহাট দেখাতে বেরিয়ে ছিলেন, সেইসময় তাঁর বাড়িটি পথিপার্শ্বে পড়ায় তিনি তাকে বাড়িটি দেখিয়ে দিয়েছিলেন।

অনিমেষকে এত সকালে তাঁর বাড়ির দরজায় দেখে চৌধুরীমশাই একগাল হেসে প্রশ্ন করলেন, কি অনিমেষবাবু, এত সকালে?

অনিমেষ বলল— বিশেষ একটা কারণে আসতে বাধ্য হলাম চৌধুরীমশাই…

–কী ব্যাপার; বসুন বসুন

ঘরের বাইরের দাওয়ায় তিনি মাদুর বিছিয়ে দিলেন।

অনিমেষের মুখমণ্ডলের রেখাগুলো দুশ্চিন্তায়ও অনিদ্রায় কুঁচকে রয়েছে… মুখমণ্ডল শুষ্ক। সেটা লক্ষ করে বিচক্ষণ চৌধুরীমশাই প্রশ্ন করলেন, আবার কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে কি? আপনার সেই মিস্ত্রি দু-জনের কথা তো কাল শুনেই এলাম, এবং তারা তো ভালোই আছে আপনি বললেন। আবার অন্য কিছু…

অনিমেষ বলল, হ্যাঁ, রাত্রে আর একটা ঘটনা ঘটেছে অস্বাভাবিক ঘটনা!

চৌধুরীমশাইও আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, কীরকম? কী হল আবার? কেউ আবার জখম-টখম …

—না, জখম-টখমের ব্যাপার নয়, শুনুন বলছি।

আগাগোড়া ঘটনাটা জানাল অনিমেষ।

শুনে-টুনে গম্ভীরমুখে চৌধুরীমশাই বললেন, বুঝেছি।

—কী বুঝেছেন? —গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে অনিমেষ প্রশ্ন করল।

চৌধুরীমশাই বললেন, যার বাড়ি আপনি কিনেছেন, সেই হরিশঙ্কর গাঙ্গুলীর প্রথম পক্ষের স্ত্রী সাংসারিক কোনো অশান্তির জন্য প্রায় পনেরো-ষোলো বছর আগে ওই চিলেকোঠা ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরই কিছুদিনের মধ্যে হরিশঙ্করবাবু, কলকাতায় বাড়ি কিনে চলে যান, এবং কলকাতার মেয়ে বিয়ে করে আবার নতুনভাবে ঘরসংসার পাতেন। বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে, তাঁর সেই প্রথমা স্ত্রীর অতৃপ্ত আত্মা এখনও পর্যন্ত ওই চিলেকোঠা ঘরটি আঁকড়ে ধরে রয়েছে। আপনার মিস্ত্রি দু-জনের দুর্ঘটনার কারণ এবার স্পষ্ট হল।

অনিমেষ সভয়ে তাকাল চৌধুরীমশায়ের মুখের দিকে।

—হ্যাঁ তাই। ওই ঘরে হাত দেওয়ার জন্যেই মহিলাটির প্রেতাত্মা ক্রুদ্ধ হয়ে ওদের শাস্তি দিয়েছে।

—তাহলে এখন আমার কী কর্তব্য?

বোকার মতো মুখের হাবভার করে অনিমেষ প্রশ্ন করল।

—কী করা উচিত, তা ভেবে দেখতে হবে। আপনি এখন ওই ঘরটা ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য ঘরগুলো মেরামতে হাত দিন। কয়েক জনের সঙ্গে আমি পরামর্শ করে দেখি… ত্রিবেণীতে একজন খুব ভালো ওঝা আছেন, তাঁর সঙ্গেও পরামর্শ করা দরকার। এরই মধ্যে একবার তাঁর কাছে যাব সময় করে… আপনাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। তবে আজ কাল হবে না— পরশুদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর যেতে পারি।

অনিমেষ কিন্তু এখানেই থামল না। মিস্ত্রিদের কাজকর্ম বুঝিয়ে দিয়ে বেলা এগারোটার মধ্যে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিয়ে কলকাতায় রওনা হয়ে পড়ল। বলে গেল, পাঁচটার মধ্যেই ফিরে আসবে।

মি আগরওয়ালা তো সব শুনে ক্ষেপে আগুন। অনিমেষকে তিরস্কার করে বললেন, থাম। যত সব বুজরুকি গাঁজাখুরি! তুমি আজকালকার ছেলে হয়ে এসব বিশ্বাস করো? ছিঃ ছিঃ, কী দেখতে কী দেখেছ, কী শুনতে কী শুনেছ… ঠিক আছে, এখন তুমি চলে যাও, আমি কাল সকালে চন্দনপুর যাচ্ছি…দেখব সে মেয়ে- ভূত কেমন…কত তার শক্তি! কেউ নিশ্চয় তোমাকে ভয় দেখিয়েছে। দেখা যদি তার পাই, গলা টিপে তাকে মারব! সকাল ন-টার মধ্যেই যাব তুমি আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করো রায়। আমার সঙ্গে একজন বন্ধু যাবে, আর ড্রাইভার থাকবে… আর একজন দারোয়ানকেও নিয়ে যাব। মোট চারজন আমরা যাব খাওয়ার ব্যবস্থা করবে।

আগরওয়ালা কথা রাখলেন। নিজের মোটরে করে পরদিন সাড়ে ন-টা নাগাদ চন্দনপুর পৌঁছালেন তিনি। সঙ্গে এনেছেন তাঁর অফিসের একজন বন্দুকধারী দারোয়ান আর তাঁর একজন বন্ধুকে। তিনি তো বাড়িতে পৌঁছেই ওই দু-জন এবং অনিমেষকে নিয়ে উঠে গেলেন দোতলার ছাদে। দেখলেন চিলেকোঠা ঘরটি। বেশ কিছুক্ষণ ঘরের ভিতর ও চারপাশটা লক্ষ করে ওপরে ডেকে পাঠালেন সমস্ত মিস্ত্রিদের।

মিস্ত্রিরা হাজির হল সব। আগরওয়ালা ঘরটার মধ্যে দাঁড়িয়ে বললেন, এই তোরা একজন আমার সামনে দেওয়ালে শাবলের ঘা মারতো দেখি কী হয়?

মিস্ত্রিরা সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।

আগরওয়ালা রেগে গেলেন। কী হল, হাবাগোবার মতো তোরা সব দাঁড়িয়ে রইলি যে! এই, তুই মার তো দেখি—

—বাবু। –ছোকরা মিস্ত্রিটি ভয়ে ভয়ে বলল, বাবু বিশ্বাস করুন, এঘরে অপদেবতা বাস করে, তা না হলে এমন হয়? একজনের পা জখম হল, একজন অজ্ঞান হয়ে গেল—

—রাবিশ! —আগরওয়ালা হুংকার ছাড়লেন। বললেন, শাবলটা আমাকে দে, আমিই দেখছি।

দারোয়ান এগিয়ে এল— বাবু, শাবল আমাকে দিন। সব ভীতুর দল আছে এরা।

শাবলটা নিয়ে দারোয়ান যেই দেওয়ালে ঘা লাগিয়েছে, অমনি সেই বিস্ময়কর দুর্ঘটনা। দেওয়ালের গা থেকে শাবলটা আশ্চর্যজনকভাবে পিছলে বাঁকাভাবে এসে লাগল তাঁর হাঁটুতে। খুব চোট লাগল… কেটে রক্তারক্তি হয়ে গেল! দাঁড়িয়ে থাকতে না-পেরে হাঁটু ধরে সে বসে পড়ল সেখানেই।

আগরওয়ালা গম্ভীর মুখে নেমে গেলেন নীচে। অনিমেষ তাড়াতাড়ি ওষুধপত্র এনে দারোয়ানের হাঁটুর তদ্বির-তদারক করতে লেগে গেল।

আগরওয়ালের মুখে আর কোনো কথা নেই। মুখ বুজেই চা জলখাবার খাওয়া শেষ করলেন। তাঁর মুখভাব থমথমে।

মিস্ত্রিরা দোতলায় আবার যে-যার কাজ শুরু করে দিয়েছে। দারোয়ান পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে শুয়ে রইল নীচেতলার ঘরে।

অনেকক্ষণ পর আবার হাঁক ছাড়লেন আগরওয়ালা। —রায়! রায় কোথায় গেলে?

দোতলা থেকে অনিমেষ তাড়াতাড়ি নেমে এল নীচে।

আগরওয়ালা বললেন, তুমি মিস্ত্রিদের বলো, তারা যেন এক্ষুনি বিশ-পঁচিশ বালতি জল দোতলার ছাদের ওপর জমা করে।

—কী হবে স্যার?

—কী হবে তা দেখতে পাবে। যা বলছি ব্যবস্থা করো।

আধঘণ্টার মধ্যেই নানা পাত্রে বিশ-পঁচিশ বালতি মতো জল মিস্ত্রিরা তুলে দিল ওপরে। অতঃপর আগরওয়ালা তাঁর মোটর থেকে পেট্রোল বোঝাই টিনটা নিয়ে সদলবলে চিলেকোঠার সামনে গিয়ে হাজির হলেন। বললেন, ঘরটাকে জ্বালিয়ে দেব, পুড়িয়ে মারব শয়তানটাকে!

এই বলে তিনি সমস্ত পেট্রোলটা ঘরের মেঝেতে এবং দেওয়ালের গায়ে ছড়িয়ে দিলেন।

তারপর—

তারপর বাইরে এসে ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে দেশলাইয়ের একটা কাঠি জ্বেলে ছুড়ে দিলেন ঘরটার মধ্যে।

দপ করে সারা ঘরটাই একসঙ্গে জ্বলে উঠল।

ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে সকলে নির্নিমেষ নয়নে সেই অগ্নিকাণ্ড দেখতে লাগলো।

অল্পক্ষণের মধ্যেই দরজা ও জানালার কপাটে আগুন ধরে গেল। তখন আগরওয়ালা বললেন, জল ঢালো এবার, আগুন নেভাও। দেখব এবার ঘরের দেওয়াল খোঁড়া যায় কি না?

আগুন ভালোভাবে নিভে যাওয়ার পর আগরওয়ালা এবার নিজের হাতে চিলেকোঠার দেওয়ালে শাবলের ঘা মারলেন। নাঃ, কোনো দুর্ঘটনা ঘটল না। পর পর বেশ কয়েক বার ঘা মেরে তিনি নেমে এলেন নীচে। তাঁর মন হালকা হয়ে গেছে— তিনি নিশ্চিন্ত।

ঘণ্টা তিনেক পর।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে আগরওয়ালা বিশ্রাম নিচ্ছেন, এমন সময় একখানা মোটর এসে দাঁড়াল দরজায়। গাড়ি থেকে একজন নেমে ভেতরে ঢুকতেই অনিমেষের সঙ্গে দেখা। গাড়ির আওয়াজ পেয়ে অনিমেষ ‘কে এল’ সেই সন্ধানই নিতে আসছিল। অনিমেষকে দেখে লোকটি দ্রুতকণ্ঠে প্রশ্ন করল, বাবু কোথায় অনিমেষদা?

অনিমেষ বলল— ওই ঘরে। তা—কী খবর সুখলাল। হাঁপাচ্ছ মনে হচ্ছে? সুখলাল ততক্ষণে আগরওয়ালার ঘরে ঢুকে গেছে।

—বাবু! সুখলালের গলা কাঁপছে থরথর করে।

আগরওয়ালা বিস্মিতনেত্রে তার দিকে তাকিয়ে বললেন- তুমি এখানে?

সর্বনাশ হয়ে গেছে বাবু!

আগরওয়ালা উঠে বসলেন। তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, সর্বনাশ?

—হ্যাঁ বাবু, আপনার তিনতলার ফ্ল্যাটে হঠাৎ আগুন লেগে গেছে!

আগুন! আগরওয়ালার দু-চোখ বিস্ফারিত, ভয়ার্ত।

সুখলাল বলতে লাগল, কী করে যে আগুন লাগলো তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। একসঙ্গে চারখানা ঘরে আগুন জ্বলে ওঠে। আপনার লোকজনের কারো কোনো ক্ষতি হয়নি আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই সকলে নীচে নেমে আসতে পেরেছেন। কিন্তু জিনিসপত্র কোনো কিছুই বাঁচানো যাবে না। ওঃ, সে কী আগুন বাবু, দাউদাউ করে ঘরগুলো জ্বলছিল! দমকল আসতেই আমি মোটর নিয়ে আপনাকে খবর দিতে চলে আসি। এতক্ষণে নিশ্চয় আগুন নিভে গেছে, আপনি এক্ষুনি চলুন বাবু

আগরওয়ালা বজ্রাহতের মতো বসে রইলেন।

[ শুকতারা, চৈত্র ১৩৮৩ (মার্চ ১৯৭৭) ]