ছবি – শিশিরকুমার মজুমদার
বেশ কিছুদিন অসুখে ভোগার পর ডাক্তারবাবুর পরামর্শে চেঞ্জে যাওয়াই ঠিক করলাম। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায় তাই নিয়েই যত ভাবনা। কারণ এর আগে কখনো কলকাতার বাইরে যাইনি।
সব চিন্তার অবসান ঘটাল আমার অনেক দিনের বন্ধু সরল দত্ত। চাকুন্দিয়াতে ওদের একটা বাগান বাড়ি আছে। সে বাড়িটা খালিই পড়ে থাকে বছরের বেশিরভাগ সময়। কালেভদ্রে সরলদের কেউ ওখানে যায়। সব কথা শুনে, ও আমাকে ওখানে যেতেই পরামর্শ দিল।
জিনিসপত্র গুছিয়ে একদিন পা বাড়ালাম চাকুন্দিয়ার পথে। ট্রেন কখন যে চাকুন্দিয়া পৌঁছাবে তা জানা ছিল না। তাই ভাবনার পড়লাম। পাশের ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, পৌঁছাবে সন্ধ্যাবেলায়। শুনে বেশ ভাবনায় পড়লাম। অজানা অচেনা পাহাড়ে জায়গা, বেশ একটা ভয়ই হল।
সন্ধ্যাবেলাই চাকুন্দিয়ায় নামলাম। স্টেশন থেকে শহর বেশ দূরে, যেতে হবে টাঙ্গায়, তাই দেরি না করে তারই একটা চড়ে রওনা দিলাম সরলদের বাড়ির দিকে।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গভীর জঙ্গলে ঢাকা পাথুরে লাল পথ। সোজা গেছে শহরের দিকে। একনজরেই জায়গাটা আমার ভালো লেগে গেল। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্যের অনেক কথাই সরলের কাছে শুনেছি। তখন থেকেই মনে মনে চাকুন্দিয়াকে ভালোবেসে ফেলেছি। এবারে এসে দেখছি সরল মিথ্যা কিছু বলেনি। সত্যিই চাকুন্দিয়ার প্রাকৃতিক দৃশ্য অপূর্ব।
ছবি আঁকা আমার পেশা। এ ব্যাপারে কলকাতায় একটু নামও হয়েছে। খ্যাত- অখ্যাত অনেকেরই ছবি আঁকায় ডাক আসে আজ-কাল। আঁকিও। তবে প্রকৃতি আর পরিবেশ নিয়ে ছবি আঁকতে যে আনন্দ পাই, তার কাছে আর কোনো ছবিই ছবি না
শারীরিক অসুস্থতার জন্য কিছুকাল সবই বন্ধ ছিল। এখন রং তুলি ক্যানভাস সবই সঙ্গে এনেছি। একটু সুস্থ হলে চাকুন্দিয়ার খান কয়েক ল্যান্ডস্কেপ এঁকে নিয়ে যাব বলে।
দত্ত ভিলার গেটের সামনে টাঙ্গা এসে থামল। বোগেনভিলার সাজানো মস্ত গেটের সামনে আলো হাতে মালী দাঁড়িয়ে ছিল। টাঙ্গা থেকে নেমে পরিচয় দিতেই সে বলল, আমারই জন্য অপেক্ষা করছে। খবরটা দেরিতে পাওয়ায় স্টেশনে যেতে পারেনি। আমাকে নমস্কার জানিয়ে ও বলল, ‘তোর কোনো অসুবিধা হবে না সাহেব। আমি টেলি পেয়ে সব ব্যবস্থাই করে রেখেছি।
মালপত্র সব ও ঘরে নিয়ে গিয়ে রাখল।
চারদিক খোলামেলা। সব থেকে ভালো ঘরটাই ও আমার জন্য খুলে দিয়েছে। খাটে বিছানাও তৈরি। একটা চেয়ার টেনে বসতেই ও খবর দিল খাবার তৈরি। ক্লান্তিতে আমার শরীর তখন ভেঙে পড়ছিল। তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে সেদিনের মতো বিছানা নিলাম।
পরদিন ভোরে নাম-না-জানা পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল। উঠে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই নজরে পড়ল দূরের পাহাড়গুলো। সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একনজরে চারদিক দেখেই আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সত্যিই এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য চমৎকার!
দত্ত ভিলার লাগোয়া বাগান! দেশি-বিদেশি জানা-অজানা নানান ফুলের গাছে অজস্র ফুল ফুটে রয়েছে। এই সকালেই সেই সব ফুলে প্রজাপতির মেলা। ঠিক করলাম, আশপাশের সব বিউটিস্পটগুলোই ঘুরে দেখব, পারলে তাদের ছবি আঁকব। তবে যতদিন জোর না পাই, দত্ত ভিলার বাগানেই আটকা থাকতে হবে আমাকে।
চা-জলখাবার দিতে এসে মালী বলল, সে আর তার স্ত্রী দু-জনেই থাকে এখানে। বাগানের শেষে তাদের ঘর। সাহেবরা কেউ এলে ওরাই তাঁদের দেখাশুনা করে। আমাকেও কোনোরকম অসুবিধায় পড়তে হবে না। হাট বাজার, রান্না, সব কাজই ওরা করবে। কলকাতার মালিকের কাছ থেকে ওরা তেমন হকুমই পেয়েছে।
চা খাওয়ার পর মালী বলল, চল সাহেব তোকে এখন বাগানটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দি। এমন বাগান, এ তল্লাটে আর নেই।
বেশ কয়েক একর জমি নিয়ে দত্ত ভিলার বাগান। সামনে ফুলের বাগান, পিছনে ফলের। পিছনের বাগানের বিশাল গাছগুলো তাদের ডালপালা ছড়িয়ে জায়গায় জায়গায় আবছায়া শান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। ইটের কেয়ারির মাঝখানে লাল সুরকির পথ এঁকেবেঁকে চলে গেছে বাগানের মাঝ দিয়ে। দু-পাশে তার চোখ জুড়ানো সবুজ ঘাসের গালিচা পাতা।
ঝোপে-ঝাড়ে বুলবুলির দল শিস্ দিচ্ছে। দল বেঁধে ছাতারে পাখিরদল ঘাসের উপরে লাফাচ্ছে। পথটা এঁকেবেঁকে একটা ঘন ঝোপের সামনে গিয়ে দু-ভাগ হয়ে এগিয়ে গেছে।
সে ঝোপ পার হয়েই আমি থমকে দাঁড়ালাম। ঝোপটা বেড় দিয়ে দুটো পথই আবার এক হয়ে গিয়ে শেষ হয়েছে এক রেলিং ঘেরা কবরের সামনে। শ্বেত পাথরের কবর। দেখে মনে হল বহু দিনের পুরোনো।
মালী বলল, এটা চৌধুরী মেমসাহেবের কবর। এ বাড়ির মালিক আগে ওরাই ছিলেন। এ বাগান ওদেরই হাতে গড়া।
কবরের রেলিং-এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কবরের গায়ে খোদাই করা আছে— অঞ্জলি মেরী চৌধুরী।
জন্ম— ১৮৮৩ খ্রি, মৃত্যু— ১৯০৩ খ্রি।
মালী বলল, চৌধুরী মেমসাহেব মারা যাওয়ার পর শুনেছি, চৌধুরী সাহেবদের আর কেউই এ বাড়িতে আসেনি। মেমসাহেবের ছেলে এই তো ক-বছর আগে এ বাড়ি দত্ত সাহেবের কাছে বেচে দিয়েছেন।
ভারি সুন্দর তো এই জায়গাটা। আমার মুখ থেকে হঠাৎই যেন কথাগুলো বার হয়ে এল।
মালী বলল, দত্ত সাহেব এ বাড়ির অনেক কিছুই ভাঙচুর করেছেন, বদল করেছেন, তবে এতে হাত দেননি। আমিই এর দেখভাল করি। মাঝে মাঝে ফুল চড়াই।
মালীকে ছুটি দিয়ে বহুক্ষণ আমি কবরটার পাশে একা দাঁড়িয়ে রইলাম। সামনে ফুলের গাছ। দূরে পিছনে পাহাড়ের সারি। মাঝখানে এক শ্বেত পাথরের কবর, এগুলো নিয়ে মনে মনে আমি তখন সুন্দর একটা ছবির কম্পোজিশনের কথাই ভাবছিলাম। বেলা বাড়তে ফিরে এলাম ঘরে। মনে মনে ঠিক করলাম, এখানে আমার প্রথম ছবিখানা হবে ওই কবরকে নিয়েই।
মালীর যত্ন আর তার বউয়ের হাতের রান্না মুরগির ঝোলভাত খেয়ে ক-দিনেই আমার শরীর বেশ ফিরে গেছে।
একদিন রোদ ঝলমল সকালে রং তুলি আর ইজেল নিয়ে আমি গেলাম সেই কবরের ছবি আঁকতে। এর মধ্যে অবশ্য বহুবার ওই জায়গাটা আমি ঘুরে এসেছি। কেন জানি না ওখানে গিয়ে বসে থাকতে আমার বেশ ভালো লাগত। দুপুরে উঁচু গাছের ডালে ঘুঘুর ডাক শুনতে শুনতে আমি আমার ছবির কথা ভাবতাম।
মালী আমার মনের কথা জানতে পেরে হেসেই অস্থির। চার দিকে এত সব জিনিস থাকতে কেন যে আমি ওই কবরের ছবি আঁকব তা ওর মাথায় কিছুতেই ঢুকল না!
আমার মনেরমতো একটা কোণ বেছে নিয়ে আমি ছবি আঁকা শুরু করলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সব কিছু ভুলে একেবারে ছবির চিন্তায় ডুব দিলাম। খেয়াল হল মালীর ডাকে। তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে।
কয়েক দিন কাজ করার পর ছবিটা বেশ মনোমতো রূপ পেল। শেষের দিন ছবির সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো নিয়ে এতই তন্ময় হয়ে ছিলাম যে কোনো কিছুতেই আর খেয়াল দিল না। হঠাৎ চমকে উঠলাম, মনে হল কানের কাছে কে যেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যেন বলল, এ ছবি এঁকে লাভ কি? এ ছবি তো আর অঞ্জলি মেরী চৌধুরীর ছবি নয়।
চমকে উঠলেও বেশ হাসিই পেল আমার। এই কবরের ছবিটা নিয়ে বেশ একটু বাড়াবাড়িই করে বসেছি। এই দীর্ঘশ্বাস, এই না শোনা কথা, সবই তার ফল।
এরপর চাকুন্দিয়ার চারপাশ ঘুরে বেশ ক-টা ছবি আঁকলাম আমি। আর এই ছবি আঁকা নিয়েই আলাপ হল সিবাস্টিন সুরেশ বিশ্বাস মশাইয়ের সঙ্গে।
তাঁর কাছেই শুনলাম, বহু বছর আগে এক বিদেশি পাদরির পরামর্শে বেশ কিছু বাঙালি খ্রিস্টান পরিবার এই চাকুন্দিয়ায় তাঁদের নিজস্ব একটা কলোনি গড়ে তোলেন। এখানে এসে বসবাসও শুরু করেছিলেন তাঁরা। দেখতে দেখতে ছোটোখাটো একটা শহরের মতো হয়ে উঠেছিল জায়গাটা। কিন্তু এখানে রোজগারের কোনো ব্যবস্থা না থাকাতে একে একে সবারই উৎসাহে ভাটা পড়ছিল। তারপর সেই বিদেশি পাদরি মারা যাওয়ার পর কলোনিতে ভাঙন ধরেছিল। এখন এখানে-ওখানে কয়েকটা বাড়িতে কয়েক ঘর খ্রিস্টান পরিবার যদিও কোনোমতে টিকে আছে, কিন্তু বাদবাকি চাকুন্দিয়া আবার যেন জঙ্গলেই ঢাকা পড়ছে।
ওঁর কাছেই শুনলাম, চৌধুরী পরিবারের মিসেস চৌধুরী থাকবেন বলেই বাড়ি করেছিলেন। কিন্তু ক-দিন অসুখে প্রায় বিনা চিকিৎসাতেই মারা যান এখানে। তখন তাঁর ছেলের বয়স মাত্র এক বছর। চৌধুরী সাহেব কোনোদিনও থাকেননি এখানে। তিনি এসে ছেলেকে নিয়ে চিরদিনের মতোই কলকাতায় ফিরে যান। সেই ছেলেই বড়ো হয়ে এ বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে দত্ত সাহেবদের কাছে।
এখানকার কোনো এক পাহাড়ে কী যেন এক খনিজ ধাতুর খোঁজে এসে দত্ত সাহেব প্রথমে ওই বাড়িটা দেখেন। পছন্দ হতেই কেনেন। খনিজ ধাতুর সন্ধান পাননি তিনি। তাই তাঁরও এখানে পাকাপাকি থাকা হয়নি।
বাড়িটাকে উনি রেখেছেন যত্ন করেই। মাঝেমধ্যে ক-দিনের জন্য ছুটিতে এসে থাকেনও এখানে।
আমাকে ছবি আঁকতে দেখে বিশ্বাস মশাই বললেন, একটা অনুরোধ করব? যদি কিছু মনে না করেন, আমার বৃদ্ধা মায়ের যদি একটা ছবি এঁকে দেন তো বড়ো উপকার হয়। এটা আমার অনেক দিনের ইচ্ছা। কিন্তু এই জঙ্গলে আর শিল্পী পাব কোথায় বলুন। আপনি যখন এসেই গেছেন, দয়া করে আমার এ ইচ্ছাটা পূরণ করুন।
আমি ওকে বললাম, ছবি আঁকাই আমার পেশা।
উনি বললেন, যদিও প্রচুর কিছু আমি দিতে পারব না, তা হলেও সাধ্যমতো আপনাকে কিছু দেব।
আমি রাজি হলাম। ঠিক হল, আকাশের মেঘলা ভাবটা কেটে গেলেই একদিন উনি আমাকে ওঁর বাড়িতে নিয়ে যাবেন। সেখানেই আমি ওঁর মায়ের ছবি আঁকব।
সেদিন বিশ্বাস মশাই আমার কাছ থেকে যাওয়ার পরই আকাশের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে ঘন কালো মেঘে চারদিক ছেয়ে গেল। বেশ বুঝতে পারলাম, প্রচণ্ড বৃষ্টি আসছে। আর সে বৃষ্টি সহজে ছাড়বে না।
একটু পরেই মালী লণ্ঠন জ্বালিয়ে দিয়ে বলল, সাহেব, আজ তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে নে। যা মনে হচ্ছে ভীষণ ঝড় আসছে। চাকুন্দিয়ার সব ভালো, কিন্তু এখানে একবার ঝড়বৃষ্টি শুরু হলে তিন-চার দিনের আগে থামতে চায় না। আকাশ দেখে তেমনি হবে মনে হচ্ছে।
চাকুন্দিয়ার সব কিছুই আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখন এই ভয়ংকর ঝড়ের কথা শুনেও ভালো লাগল। এ তো এক নতুন অভিজ্ঞতা হবে। হয়তো কোনোদিন রং-তুলিতে ধরতে পারব এ ঝড়কেও। সব থেকে বেশি লাভ হল এই যে এখুনি আমাকে বিশ্বাস মশাইয়ের মায়ের ছবি আঁকতে ছুটতে হবে না। কাজটা যদিও করব বলেছি, তবুও মন আমার ওতে তেমন সায় দেয়নি।
সন্ধ্যা হতেই ঝড় এল। তার কিছু পরেই শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি। বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি এসে বন্ধ জানালার ওপরে আছড়ে পড়তে লাগল। সেইসঙ্গে শুরু হয়ে গেল বাতাসের গোঙানি।
ভেবেছিলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঝড়ের দৃশ্য দেখব। কিন্তু ঝড়ের গর্জন ঘরের মধ্যেই মাঝে মাঝে আমাকে চমকে দিতে লাগল। বেশ বুঝতে পারলাম, মালীর কথাই ঠিক, এই ঝড় বৃষ্টি দু-তিন দিনের আগে থামবে না।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে একটা বই নিয়ে কিছুক্ষণ কাটাবার চেষ্টা করলাম। সাড়ে ন-টা। বাজতেই বিরক্তি লাগতে লাগল। আলোটাকে কমিয়ে বারান্দার একপাশে রেখে আমি শুয়ে পড়লাম। তখনও বাইরে ঝড়ের গর্জন সমানে চলছে। জানালাগুলোয় জলের প্রচণ্ড ঝাপটা লেগে একটানা ছরছর শব্দ হচ্ছে। সেই শব্দ শুনতে শুনতে একসময় আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জানি না। হঠাৎ যেন ঘুম ভেঙে গেল। আধা ঘুম আধা জাগার মধ্যেই বুঝলাম, বাইরে তখনও ঝড়ের প্রলয় চলেছে। পাশ ফিরে শুতে যাব যেই তখুনি হঠাৎ কোথায় যেন গোটা দুই বিড়াল বিশ্রীভাবে ঝগড়া শুরু করল। ঝড়ের আওয়াজ ছাপিয়ে ওদের সেই বেসুরো ওঁয়াও ওঁয়াও চিৎকার চারদিক কাঁপিয়ে তুলল। কী বিভৎস ওদের চিৎকার! এ কী উপদ্রব শুরু হল আজ। শুয়ে শুয়েই ভাবলাম, এখানে তো কোনো বিড়াল দেখেছি বলে মনে হয় না। তবে কি এগুলো জংলি বিড়াল। ঝড়ের দাপটে এসে হাজির হয়েছে লোকালয়ে।
কিছু ভেবে ঠিক করার আগেই আচমকা বিড়ালের ঝগড়া থেমে গেল। মনে মনে খুশি হয়ে আবার পাশ ফিরে শুলাম। তখনি শুনতে পেলাম, কে যেন ঘরের দরজায় আস্তে একটা ধাক্কা দিল। প্রথমে ভেবেছিলাম ও হাওয়ার কাণ্ড, তাই নির্বিকার হয়ে শুয়েই ছিলাম। কিন্তু আবার ঘন ঘন ধাক্কা পড়াতে অবাক হলাম, এ তো হাওয়া নয়। এত রাতে কে এল আবার।
উঠে দরজা খুলে দিলাম। আস্তে দরজা ঠেলে তিনি ঘরে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে ভীষণ অবাক হলাম। এক বৃদ্ধা, বয়স তাঁর অনেক হয়েছে। মাথা ভরতি সাদা ধবধবে চুল। পরনে তাঁর লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে উনি বললেন, আমাকে দেখে অবাক হয়েছ মনে হচ্ছে? কিন্তু কী করব বাবা, না এসে আমার আর কোনো উপায় ছিল না। একটা অনুরোধ নিয়ে আমি এসেছি তোমার কাছে। সে অনুরোধ তোমাকে রাখতেই হবে। বলো রাখবে?
সব কৌতূহল চেপে রেখেই আমি বললাম, কী এমন আপনার অনুরোধ? যার জন্য এমন দুর্যোগের রাতেই আপনার আসার প্রয়োজন হল? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমার কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে উনি সামনের চেয়ারটায় বসলেন। আমার দিকে একবার যেন একটু অদ্ভুতভাবেই তাকালেন, বললেন, জানি, এমন অসময়ে এসেছি বলে তোমার মনে হয়তো অনেক কথাই জেগেছে। কিন্তু বাবা বিশ্বাস করো, এমন অসময়ে আসা ছাড়া আমার আর কোনো সময় নেই। ঘরের চারদিক ভালো করে দেখে ফের বললেন, আমার অনুরোধ সামান্যই, তোমাকে আমার একটা ছবি এঁকে দিতে হবে। ছবিটার বড়োই প্রয়োজন বাবা, একজনকে দিতে হবে।
ওর কথা শুনে থমকে গেলাম আমি। মনে মনে ভাবলাম, স্বপ্ন দেখছি। আবছা আলোয় ওঁর উপস্থিতি যেমনই রহস্যময়, তেমনি অদ্ভুত ওঁর অনুরোধ। আমি কি কোনো পাগলের পাল্লায় পড়লাম। নাকি ইনিই সেই বিশ্বাস মশাইয়ের মা। কিন্তু তাঁর এমনভাবে আসার কী প্রয়োজন ছিল। ছবি তো আমি এঁকে দেবই বলেছিলাম। সেকথা কি উনি জানেন না!
কেমন করে যেন বৃদ্ধা আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন, বললেন, না বাবা, না, আমি পাগল নই। তোমার কোনো ক্ষতি করতেও আসিনি। বলেছি তো বড়ো নিরুপায় আমি। তাই এখন এমনি করেই এসেছি তোমার কাছে। কিন্তু তুমি আর দেরি করো না বাবা, সময়ের দাম অনেক, নাও, আঁকতে শুরু করো।
ওঁর কথার যে কী উত্তর দেব ভেবেই পেলাম না। কেমন যেন একটা অস্বস্তি আমাকে পেয়ে বসল। বিশ্বাস মশাইয়ের মায়ের মাথায় যে গোলমাল আছে তাতে তো আর কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখন এর হাত থেকে মুক্তি পাব কেমন করে!
কিছু বলার আগেই উনি হাসলেন। সে হাসি আমার মনে কেমন যেন ভয় ধরিয়ে দিল। উনি বললেন, জানি ছবি আঁকা তোমার পেশা। আমার ছবি এঁকেও তোমার লোকসান হবে না বাবা। আমিও তোমাকে নিশ্চয়ই কিছু দেব এর পর তো তোমার কোনো আপত্তিই থাকা উচিত নয়। নাও কাজ শুরু করো। কথায় কথায় সময় নষ্ট হল অনেক।
আমি মরিয়া হয়ে বললাম, কিন্তু এই আবছা অন্ধকারে তো ছবি আঁকা যাবে না। আপনি বরং বৃষ্টি থামলে দিনের বেলায় আসবেন। কথা দিচ্ছি, ছবি এঁকে দেব।
আমার কথা শেষ হতেই কেমন যেন ছটফট করে উঠলেন বৃদ্ধা। একটা ভয়ংকর দৃষ্টি মেলে আমার দিকে তাকিয়ে একটু বিরক্তিতেই বললেন, তোমার কোনো বাহানাই আমি শুনব না। ছবি তোমাকে এখুনি আঁকতে হবে। বাইরের বারান্দা থেকে লণ্ঠনটা এনে রাখো সামনে। তারপর কাজ শুরু করো।
মনটা অস্বস্তিতে ভরে উঠল। বেশ বুঝতে পারলাম, ছবি আঁকার একটা অভিনয় না করলে এই বদ্ধ পাগলির হাত থেকে নিষ্কৃতি নেই। বাকি রাতটুকু এভাবেই জেগে কাটাতে হবে। যে ভয়ংকর দৃষ্টিতে এইমাত্র উনি আমার দিকে তাকালেন, এর পরেও যদি আপত্তি করি, তবে ফল যে কী হবে তা বেশ বুঝলাম। একবার ভাবলাম, চেঁচিয়ে মালীকে ডাকি। দু-জনে মিলে ওঁকে নিশ্চয়ই কাবু করতে পারব। কিন্তু তখুনি ওঁর মুখের দিকে নজর পড়তে ভয়ে চমকে উঠলাম। বাপরে, কী ভীষণ দৃষ্টি ওর দু-চোখে! যেন আমার মনের ভিতরেই চলে গেছে সে দৃষ্টি। আমার সব চিন্তাগুলোই তাই ওঁর পড়া হয়ে গেছে।
না আর দেরি করা ঠিক হবে না। একটা-কিছু এখনই শুরু করতে হবে। লন্ঠনটা বারান্দা থেকে এনে ঘরে রাখলাম। ইজেলটা আলোর পাশে এনে তাতে ক্যানভাস চড়ালাম। কী যে আঁকব জানি না। কিছু-একটা আঁকতেই হবে। নইলে ওর ওই ভয়ংকর দৃষ্টির সামনে আমি বোধ হয় পুড়ে ছাই হয়ে যাব।
খুশি হয়ে উনি বসলেন গুছিয়ে। বললেন, আমি বসছি বাবা, দেখো আঁকতে তোমার কোনো কষ্টই হবে না। আমি বুড়ো হয়েছি, যদি অন্যায় কিছু করেই থাকি, সেকথা ভুলে যেও বাবা। ছবি আঁকা হয়ে গেলে যখন আমার সব কথা জানবে, দেখো তখন আমার উপরে আর তোমার কোনো রাগই থাকবে না।
আমি বললাম, আঁকতে যখন হবেই আমাকে তখন একটু স্থির হয়ে বসুন। দেখি চেষ্টা করে কতটা কী করতে পারি।
সঙ্গে সঙ্গে উনি শান্ত হয়ে বসলেন। একটু হেসে বললেন, আর একটা কথা আছে বাবা, আমার যে ছবিটা তুমি আঁকবে, তা কিন্তু আমার এখনকার ছবি নয়।
চমকে উঠে আমি বললাম, তার মানে?
এই ধরো আমার বয়স যখন বছর উনিশ-কুড়ি ছিল, আমার সে বয়সেরই একখানা ছবি আঁকো বাবা। কেমন যেন কাতরভাবেই বললেন উনি!
এ কী বলছেন আপনি? এ কী করে সম্ভব? আমি ভয় পেয়ে বললাম।
একথা শুনে উনি যেন কেমন হয়ে গেলেন। কেমন যেন করুণভাবে বললেন, বাবা, তুমি শিল্পী, চেষ্টা করলে এ তুমি নিশ্চয়ই পারবে। আমার সে বয়সেরই একখানা ছবি চাই কি না।
হাতের রং-তুলি যেন হাতেই আটকে গেল। মাথার ভিতর ঝাঁ-ঝাঁ করতে লাগল। মনে হল চেঁচিয়ে মালীকে ডাক দেওয়াই উচিত। এই বৃদ্ধা পাগলির হাত থেকে নইলে আমার আর কোনোমতেই রক্ষা নেই।
কেমনভাবে যেন উনি বললেন, আরও একটা কথা বাবা, তুমি আমাকে ছুঁয়ো না কখনো। যেমন করে বসতে বলবে, আমি তেমন করেই বসবো। নাও আর দেরি না করে কাজ আরম্ভ করো। দেখতে দেখতে কাজে মন বসে যাবে তোমার।
আড় চোখে দেখলাম টেবিলে রাখা ঘড়িতে তিনটে বেজে গিয়েছে। ঘণ্টা দুই কোনোমতে এঁকে ঠেকিয়ে রাখতে পারলেই ভোর হয়ে যাবে। তখন যাহোক কিছু করা যাবে। এত রাতে এই প্রচণ্ড ঝড় জলের মাঝে তো ওঁকে আর চলে যেতে বলতে পারি না আমি।
ক্যানভাসের উপরে তুলির টান দিতে শুরু করলাম। ওঁর মুখে ভারি সুন্দর হাসি ফুটে উঠল। সেই প্রথম আমার মনে হল ভারি আভিজাত্যপূর্ণ সুন্দর চেহারা ওঁর। উনিশ-কুড়ি বছর বয়সে অপূর্ব সুন্দরীই ছিলেন উনি। সে চেহারার ছবি আঁকতে যেকোনো আর্টিস্টই আগ্রহ দেখাত। মনে মনে ভাবলাম, ওঁর বর্তমানের চেহারা দেখে আমি কি ওঁর সেই অতীত সৌন্দর্যের কল্পনা করতে পারব না? ক্ষতি কী যদি কল্পনায় সেই চেহারার ছবিই আঁকতে চেষ্টা করি। অন্তত সে চেষ্টায় এই বিরক্তিকর পরিস্থিতির কথা ভুলে থাকতে পারব।
বার বার ওঁর দিকে তাকিয়ে দেখে মন দিয়েই ছবি আঁকা শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ বাদে মনে হল সত্যিই তো এ ছবি আঁকতে আমার ভালোই লাগছে। শুধু তাই নয়, আমার তুলির প্রতিটি টানেই যেন খুব তাড়াতাড়ি এক অপূর্ব সুন্দরীর রূপ ক্রমে ক্রমে ফুটে উঠছে ক্যানভাসে। এ ছবি নিশ্চয়ই আমি এঁকে শেষ করতে পারব। আর সে ছবি হবে বৃদ্ধার উনিশ-কুড়ি বছর বয়সেরই ছবি।
বাইরে তখনও ঝড়ের গোঙানি সমানে চলেছে। চলুক, আঁকতে আর আমার খারাপ লাগছিল না।
হঠাৎ ঝড় থেমে গেল। উনি যেন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। কেন যেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন আমার দিক থেকে। আমি এগিয়ে গিয়ে আস্তে ওঁর মুখখানা
ফিরিয়ে দিলাম আমার দিকে। মুহূর্তের স্পর্শে মনে হল আঙুলগুলো যেন বরফের মতো জমে গিয়েছে! কী ঠান্ডা ওর দেহ!
আমার দিকে তাকালেন উনি। আতঙ্কে ক-পা পিছিয়ে গেলাম আমি। এ কী অসম্ভব দৃষ্টি ওঁর চোখে। কে উনি! কী সর্বনাশ করতে চান উনি আমার!
মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলেন বৃদ্ধা, বললেন, আর এক দণ্ডও আমার থাকা চলবে না।
আঁচলের গিট খুলে কী যেন সব উনি নামিয়ে রাখলেন সামনের টেবিলে। দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, চমৎকার এঁকেছ ছবিটা! ঠিক অমনিই দেখতে ছিলাম আমি। যেটুকু কাজ বাকি রইল, মন থেকেই শেষ করে ফেলো বাবা।
আর দাঁড়ালেন না উনি। বাজ পড়ল কাছেই কোথাও। দরজার বাইরে যেতেই প্রচণ্ড শব্দে ইজেল থেকে ছবিটা ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। সব শক্তি হারিয়ে আমি থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। তখুনি বাইরে কোথাও বিকট সুরে ওঁয়াও ওঁয়াও করে বিড়ালগুলো আবার চেঁচাল কিছুক্ষণ।
মালীর চিৎকারে হুঁশ এল। আলো নিয়ে ঘরে ঢুকল ও। – এ কি সাহেব, তুই ঘুমাসনি। কিছু হয়নি তো তোর? ছবিটা তুলে ও আবার ইজেলে লাগিয়ে দিল। বলল, বাজ পড়ল বাইরে, তাই দেখতে এলাম তুই কেমন আছিস। কী হয়েছে তোর? অমন করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
চূড়ান্ত ক্লান্তিতে আমার দেহ মন যেন ভেঙে পড়তে লাগল। কোনোমতে মালীকে বিদায় দিয়ে শুয়ে পড়লাম।
পরদিন বেলায় ছবিটা দেখে চমকে উঠলেন বিশ্বাস মশাই। বললেন এ ছবি আপনি আঁকলেন কেমন করে? এ তো মিসেস চৌধুরীর ছবি। নিজের রূপ সম্বন্ধে বড়ো অহংকার ছিল ওর মনে। স্বামীর সঙ্গে তাই খুব বেশি বনিবনা ছিল না। সামান্য ব্যাপারে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে ছেলেকে আর তার পোষা বিড়াল নিয়ে চলে আসেন এখানে। হয়তো বিচ্ছেদই হয়ে যেত ওদের মধ্যে। একমাত্র ছেলের জন্য তা হতে পারেনি। তবে শুনেছি, মিস্টার চৌধুরী নাকি রাগে তাঁর স্ত্রীর সব স্মৃতিচিহ্নগুলোই সরিয়ে ফেলেছিলেন তাঁর ছেলের সামনে থেকে। এমনকী সব ছবিগুলোও নষ্ট করে ফেলেছিলেন।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এত কথা আপনি ওদের সম্বন্ধে জানলেন কী করে?
মিসেস চৌধুরীকে এখানে দেখাশোনা তো আমিই করতাম। বললেন বিশ্বাস মশাই, মিসেস চৌধুরী মারা যাওয়ার এক যুগ পর তো এ বাড়ি বিক্রি হয় দত্ত সাহেবের কাছে। বিক্রির আগে এসেছিলেন মিসেস চৌধুরীর সেই ছেলে— মাইকেল। এখানকার জিনিসপত্রের একটা ব্যবস্থা করতে। আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তার মার কোনো ছবি আছে কারিনা আমার কাছে। মা যখন ওর মারা যায়, তখন ওর বয়স যে মাত্র এক বছর। আমার সঙ্গে শেষবারের মতো ওর মার সমাধিতে ফুল দিতে গিয়ে ও বলেছিল, তোমাকে না দেখার দুঃখ আমি কোনোদিনও ভুলতে পারব না মা। মৃত্যুর পর যদি আত্মা বলে কিছু থাকে তবে আমাকে একবার দেখা দিও। না দেখা দিলে তোমার মুক্তি নেই মা।
আমি শিউরে উঠে বললাম, সে কী, এ তো একরকম অভিশাপ দেওয়া! একথা বলতে পেরেছিল মাইকেল!
যাক, এ ছবিই মাইকেলের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেবে তার মাকে। বিশ্বাস মশাই শান্ত গলায় বললেন।
মালী তখনি এসে বলল, সাহেব রাতে বাজ পড়ে চৌধুরী মেমসাহেবের কবরটা ফেটে গিয়েছে।
বিশ্বাস মশাই একথা শুনে ওর বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকলেন।
আমার নজর গেল টেবিলের দিকে। অবাক হয়ে দেখলাম, সেখানে ভিক্টোরিয়ার আমলের এক মুঠো টাকার নীচে একটা কাগজ চাপা রয়েছে। সেটা নিয়ে বিশ্বাস মশাইকে দিতেই উনি পড়লেন, লেখা আছে— একজনের অন্ধ স্নেহ আমাকে এক যুগ অন্ধ করে মাটির নীচে বন্দি করে রেখেছিল। তুমি আমাকে মুক্তি দিলে। তোমার মঙ্গল হোক। সেই স্নেহঅন্ধ মানুষটিরও সময় ফুরিয়ে এসেছে। দোহাই তার মনের কামনা এখুনি পূরণ করো। নইলে হয়তো আমাকে আবার ওই ভয়ংকর অন্ধকারে চিরকালের মতো বন্দি হতে হবে।
ঘন ঘন নিজের বুকের ওপর ক্রুশ আঁকতে আঁকতে বিশ্বাস মশাই বললেন, এ ছবি এখুনি মাইকেলকে পাঠাতে হবে। তাকে চিঠি দিয়ে দেব, হঠাৎই এটা খুঁজে পেয়েছি বলে। কে জানে কী অবস্থা তার। তারও তো বয়স নেহাত কম হল না।
[ভূত কুটুমের গল্প, উদয় প্রকাশন, ১৯৮২ (প্রথম প্রকাশকাল অজ্ঞাত) ]
