Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
0/50
New Courseপেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

ছায়াবৃতা – সঞ্জীব কুমার দে

কাশীনাথবাবুর বাড়ি কাগজ দিতে গিয়ে সমীর আবিষ্কার করল, যে কাগজটি কাশীনাথবাবু নেন সেটির আর একটিও তার কাছে অবশিষ্ট নেই। অথচ আরও একটি বাড়িতে এই দৈনিক পত্রিকাটির ডেলিভারি বাকি!

এমন তো হওয়ার কথা নয়! সব বাড়িতে বিলি করার আগেই পত্রিকাটির সমস্ত কপি ফুরিয়ে গেল? নিয়মিত গ্রাহক ছাড়া বাড়তি একটি কপিও বিক্রি করে না সে। করে না— মানে, করার সময় নেই তার। সকাল সাতটার মধ্যে এই কাগজ বিলির কাজটা শেষ করে ঠিক আটটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তে হয় তাকে, বড়োবাজারের একটা দোকানের কাজে। শুধু শ’খানেক খবরের কাগজের বিক্রি থেকে পাওয়া কমিশনে এই বাজারে সংসার চলে কারও? তাও তার দ্বারা কাগজ সরাসরি বিক্রি নয়।

হাওড়া ডিস্ট্রিবিউশান সেন্টার থেকে ফণীদার কোটায় কাগজ তুলে, ফণীদার ঠিক করে দেওয়া গ্রাহকদেরই কাগজ বিলি করে সমীর। সঙ্গে কিছু সাময়িক পত্রপত্রিকাও। বিনিময়ে ফণীদার কাছ থেকে সামান্য কিছু মাসোহারা পায় সে। তাড়াহুড়ো করে কাগজ বিলি করেই তাকে দৌড়তে হয় বড়োবাজারে। এই জন্যই দৈনিক বাড়তি কাগজ বিক্রির কোনো দায়িত্ব নেয় না সে।

ফণীদা দীর্ঘদিন আছেন এই লাইনে। অনেকটা অঞ্চল বিস্তৃত তাঁর এই ব্যাবসা। তাই গ্রাহক সংখ্যাও প্রচুর। নিজে সবার কাছে পৌঁছোতে পারেন না বলে পাঁচ-পাঁচজন সহকারী নিযুক্ত করেছেন তিনি। সমীর সেই সহকারীদেরই একজন।

এই পরিস্থিতিতে পড়ে সমীর তার মোবাইল থেকে মিস কল দিল ফণীদাকে।

আধ মিনিটের মধ্যেই ফোন এল ফণীদার, ‘কী ব্যাপার রে!’

‘ভোরের খবর আমাকে ক-টা দিয়েছ?’

‘যেমন দিই! কেন রে? কী হয়েছে?’

‘এখনও দত্তবাবু বাকি। কিন্তু ভোরের খবর শেষ। কম হচ্ছে একটা।’

‘না, তা তো হবার কথা নয়। অন্য কোনো কাগজ কি বেশি গিয়েছে একটা?’

‘সেটা এখন তো বলতে পারছি না। একেবারে শেষে বুঝতে পারব।’

‘তুই এখন রানিংয়ে কারও কাছ থেকে নিয়ে কাজ চালিয়ে দে।’

‘সে চালিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু তোমাকে জানিয়ে রাখলাম।’

‘ওকে।’

ফোন কেটে আবার সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয় সমীর।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার ফণীদার ফোন। কণ্ঠে উদ্‌বেগ, ‘তুই কি রেবামাসিমার বাড়ি কাগজ দিয়েছিস সমীর?’

‘হ্যাঁ, দিয়েছি তো!’

‘ওহো! ওটাই তোকে বলতে ভুলে গেছি! ওটা বাদ দিয়ে ঠিক হিসাবেই ভোরের খবর দিয়েছি তোকে। তুই তো চারদিন ছিলিস না, তাই জানিস না। রেবামাসিমা মারা গেছেন।’

অজান্তেই হ্যান্ডেলের ব্রেকে চাপ পড়ে সাইকেল দাঁড়িয়ে যায় সমীরের। অস্ফুটে গলা থেকে বের হয়ে আসে, ‘মারা গেছেন??

‘হ্যাঁ রে, আর কে আছে ওনার বাড়িতে যে কাগজ পড়বে? বাড়ি তো সেদিন থেকেই তালাবন্ধ। একমাত্র ছেলে, সে তো এখন রাশিয়ায়। শুনেছি তার ফিরতে ফিরতে এখনও সপ্তাহখানেক। তাই মৃতদেহ এখনও দাহ হয়নি। কলকাতায় মৃতদেহ রাখার কোনো এক ঠান্ডাঘরে রেখে দিয়ে এসেছেন আত্মীয়রা।’

সমীর বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করে, ‘গেট তালাবন্ধ ছিল? আমি কি তবে খেয়াল করিনি?’ বলতে বলতেই মনে করার চেষ্টা করে— জানালা খোলা ছিল কিনা? নইলে কী করে কাগজ দিল সে?

সমীর ভাবল, সাইকেল ঘুরিয়ে একবার রেবামাসিমার বাড়ি যাবে। কিন্তু এখন সে যে দূরত্ব পেরিয়ে এসেছে সেখান থেকে যাওয়া-আসায় অনেকটাই সময় নষ্ট হবে তার। আর গিয়েই-বা কী লাভ? মানুষটাই তো নেই!

মেসোমশাইয়ের মৃত্যুটাও মনে আছে সমীরের। তারপর থেকেই রেবামাসিমা একা হয়ে যান। সবসময়ই তাঁকে মনে হত বিষণ্ণ, ম্লান। কিন্তু ভোরে, কাগজ দেওয়ার সময় মুখোমুখি হয়ে গেলে-কী সুন্দর করে হাসতেন। নবকল্লোল, শুকতারা কবে বেরোচ্ছে তার খোঁজ করতেন।

মন বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে গেল সমীরের। রেবামাসিমা তার নিজের কেউ নন। কাগজ বিলি করতে গিয়ে এই বছর আড়াই যাবৎ তাঁর সঙ্গে পরিচয়। বিজয়ার পর কাগজ দিতে গেলে সমস্ত গ্রাহকদের মধ্যে একমাত্র এই রেবামাসিমাই জোর করে দাঁড় করাতেন। একটি প্লেটে দুটো মিষ্টি আর এক গ্লাস জল তাঁর হাতের কাছেই মজুত রাখতেন। ব্যস্ততার সময়, বসার ফুরসত না থাকায় গেটে দাঁড়িয়ে একরকম প্রায় গিলে নিয়ে কয়েক চুমুক জল খেয়ে তবেই অব্যাহতি মিলত তার। সমীরও পা ছুঁয়ে প্রণাম করত রেবামাসিমাকে।

সেই রেবামাসিমা প্রয়াত!

কিছুক্ষণের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়লেও অবশিষ্ট কাগজগুলি রোজকার বাড়িগুলোতে পৌঁছোবার তাগিদে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ল সমীর।

ভোরে উঠে আবার একই ব্যস্ততা। অভ্যাসগত সেই দৌড়! অতি অল্প সময়ের মধ্যে একশো ছ-টা বাড়িতে কাগজ পৌঁছোনোর দায়িত্ব তার। একটি যে তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তা আজও মনে পড়ল না সমীরের

মনে পড়ল আরও দুটি বাড়িতে কাগজ বিলি করে ফেলার পর। রেবামাসিমার বিষয়টা মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল সমীরের। গতকাল না-হয় জানাতে ভুলে গিয়েছিলেন ফণীদা। কিন্তু আজ? আজ তো তার নিজেরই ভুল। কিন্তু আশ্চর্য। সেখানে গিয়েও কেন মনে পড়ল না তার? ফণীদা জানিয়েছেন— বাড়ি তালাবন্ধ। কেউ নেই। সে তো জানালা পথেই কাগজ দিয়ে এসেছে এতদিন। জানালা বন্ধ থাকলে তৎক্ষণাৎ ব্যাপারটা মনে পড়ে যেত। তা যখন হয়নি, তখন নিশ্চয় জানালা খোলাই আছে রেবামাসিমার।

আজ আর ব্যাপারটা এড়িয়ে গেল না সমীরের। রেবামাসিমার বাড়ি থেকে অল্প দূরত্বই অতিক্রম করে এসেছে সে। আজ সাইকেল ঘুরিয়ে রেবামাসিমার বাড়ির দিকেই ফিরে চলল সে।

রেবামাসিমার বাড়িটা খুবই নিরিবিলি জায়গায়। পাশাপাশি যে ক-টা বাড়ি— সকলেরই বেশ অনেকটা করে জমি, অনেকের আবার দেওয়াল ঘেরা। শহরের অন্য স্থানগুলোর মতো পাড়াটা ঘিঞ্জি নয়। বেশ কিছু গাছগাছড়াও আছে এদিকটায়। রেবামাসিমাদের বাড়ি সিমেন্ট-ঢালাই রাস্তার গা ঘেঁষে। বাড়ির পিছন দিকটায় বাগান।

সমীর যখন ফিরে এল- তখনও জনশূন্য গলিপথ। গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে রোদের ঝিকিমিকি দেখা দিয়েছে ঠিকই, হয়তো মানুষজনের ঘুমও ভেঙেছে, কিন্তু দোর খোলেনি তখনও কার-ও।

সমীর সাইকেল রেখে ভালো করে দেখল বাড়িটাকে। সত্যিই তালাবন্ধ সদর। যে জানালা পথে কাগজরা দিয়ে এটাকে সে, মানে যে জানালা পথে মাসিমার দেখা মিলত— সেটাও যে বন্ধ এখন। তবু সমীর হাত দিয়ে ঠেলে দেখল। নাঃ, ভেতর থেকে বন্ধ!

আশ্চর্য! আজও তো এই জানালা পথেই কাগজ দিয়েছে সে, এবং একটু আগেই! জানালার সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে গেল সমীরের। নিশ্চিত হল সে। হ্যাঁ, জানালা তখন দু-হাট করে খোলা ছিল।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সমীর। ব্যাপারটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না তার!

কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল জানে না সমীর। সম্বিত ফিরল মহিলা কণ্ঠে, ‘এখানে কি কাউকে খুঁজছ বাবা?’

কণ্ঠ অনুসরণ করে পিছন ফিরল সমীর। রেবামাসিমার বাড়ির বিপরীত বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে একজন প্রবীণা। জল ভরা একটি ছোটো বালতি হাতে। ভোরে সদর দরজায় জল ঢালতে এসে সমীরের গতিবিধি লক্ষ করে দাঁড়িয়ে গেছেন সম্ভবত।

সমীর একবার ‘হ্যাঁ’ একবার ‘না’ দিয়ে শুরু করার চেষ্টা করেও আসল কথাটা বলতে পারল না।

প্রসঙ্গ বদলালেন ভদ্রমহিলা, ‘তোমাকে তো আমি চিনি। রেবার বাড়ির কাগজ দাও তো তুমি? তুমি তো ফণীর লোক?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’ ‘ সমীর এবার কথার খেই খুঁজে পায়। ‘ঠিকই ধরেছেন।’

‘আর কাকে কাগজ দেবে বাবা! সে তো চলে গেছে সব ধরা- ছোঁয়ার বাইরে।’

‘আমি সেই সময় কয়েক দিন ছিলাম না মাসিমা। পরে এসে জেনেছি। কিন্তু জানা সত্ত্বেও ভুল করে দু-দিন কাগজ দিয়ে ফেলেছি।’

‘এমন ভুল কয়েক দিন সবারই হবে। আবার ধীরে ধীরে সবটাই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমিও তো গতকাল বিকালে গল্প করব বলে, বেরিয়ে এসে ওর দরজার তালা দেখে, কোথাও গেছে বলে ফিরে গেলাম। প্রায় আধঘণ্টা পরে কী একটা প্রসঙ্গে কথা উঠতেই মনে পড়ল— সে তো আর বেঁচে নেই! ‘

সমীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা, ওনার বাড়ির ভেতর তবে কে আছে?’

‘কে আর থাকবে? ওর মারা যাবার দিন থেকেই তালাবন্ধ। আমাদের কাছে ওর এক আত্মীয়ের ফোন নম্বর ছিল। তাকে জানাই। তিনিই অন্য আত্মীয়দের জানান। ছেলেকে খবর দেন। আত্মীয়রা অনেকেই সেদিন এসেছিলেন। তবে কেউ এই বাড়িতে রাত কাটাননি। ওর ছেলে ফিরলে হয়তো আবার সবাই আসবেন। তবে এখন তো তালাবন্ধ। চাবি অবশ্য আমাদের কাছেই।’

‘আপনারা কি একটু আগে বাড়িটার তালা খুলে ভেতরে ঢুকেছিলেন? মানে— আমি বলতে চাইছি ওই জানালাটা খুলেছিলেন?’

‘না বাবা। কে যাবে ওই বাড়ির তালা খুলতে?’ ভদ্রমহিলার কণ্ঠে আতঙ্ক প্রকাশ পায়। ‘চারদিন আগে যার মৃত্যু হয়েছে, জানো এখনও তার সৎকারই হয়নি। কলকাতার কোনো এক ঠান্ডাঘরে তাকে রাখা আছে। দেহ না হয় রাখা আছে, আত্মাকে কি নিয়ে যেতে পেরেছে বাবা? সৎকার না হলে কি আত্মা মুক্তি পায়? রেবা ওই বাড়িতেই রয়ে গেছে তবে ‘

এমন মন্তব্যের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না সমীর। সে এবারে সত্যি সত্যিই ঘাবড়ে যায়। ঘামতে থাকে।

কথাবার্তা চলতে চলতেই এ বাড়ি-সে বাড়ি থেকে একজন-দুজন করে লোক বের হতে হতে জমা হয়ে যায় প্রায় ছ-সাতজন।

নিজের মনের কথা ব্যক্ত করে পরক্ষণেই প্রশ্ন ভদ্রমহিলার, ‘জানালা খোলার কথা কী জানতে চাইছিলে বাবা?’

‘আজ একটু আগেও আমি কাগজ দিয়ে গেছি ওই জানালা দিয়ে।’ আঙুল দিয়ে জানালাটা দেখায় সমীর। ‘তখনও জানালাটা ছিল খোলা! কিছুটা গিয়েই ভুল করেছি বুঝতে পেরে আমি আবার ফিরে এসে দেখি জানালাটা বন্ধ! আমি ঠেলা দিয়েও দেখলাম, ভেতর থেকে বন্ধ। তাই জিজ্ঞাসা করছি।’

‘সে কী!’ জমায়েতে গুঞ্জন ওঠে। একে অপরের মুখের দিকে দেখতে থাকে।

‘কী বলছো তুমি হে ছোকরা?’ এবার এক বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন। ‘জানালা তখন খোলা ছিল? তুমি নিশ্চিত?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। শুধু আজ নয়, গতকাল সকালেও খোলা জানালা-পথে কাগজ দিয়ে গেছি আমি।’ সমীর জানায়।

‘অসম্ভব!’ বলে ওঠেন আরও একজন। ‘তা কী করে হয়?’

প্রথমের সেই বৃদ্ধা এবার বলে ওঠেন, ‘না না, বাড়িটা তো তবে একবার খুলে দেখতে হয়। যদি কেউ ঢুকে বসে থাকে? চুরি-টুরি হয়ে গেলে, যেহেতু চাবি আমাদের কাছে, তাই দায় তো আমাদের ওপরই বর্তাবে।’

ভদ্রমহিলার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল এক কিশোর। বছর তেরো-চোদ্দো মতো বয়স। ভদ্রমহিলা তাকে নির্দেশ করলেন, ‘যা তো। ওদের বাড়ির চাবিটা নিয়ে আয়।’

কিশোর ভেতরে যেতেই বৃদ্ধা পরিচয় দিলেন, ‘এ হল বিট্টু। আমার ছেলের ছেলে, নাতি। ওকে ভীষণ স্নেহ করত রেবা। রেবার সারাদিনের সমস্ত ফাইফরমাশ ওই খেটে দিত। রেবার মৃত্যুতে খুব কষ্ট পেয়েছে বেচারা।’

চাবি আসার পর সকলেই কিন্তু ভেতরে যেতে সম্মত হলেন না। বিট্টুও না। যাঁরা গেলেন তাঁদের সঙ্গে সামিল হল সমীরও।

বাড়ি চতুর্দিক দিয়ে বন্ধ। সব ঠিকঠাক। নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা। কোনো ত্রুটি নেই।

তবে সমীরের নির্দেশ করা জানালার সেই ঘরটিতে প্রবেশ করা গেল না। সেই দরজায় লাগানো রয়েছে একটি পৃথক তালা। যেটির চাবি এদের কাছে নেই। জানা গেল, এই ঘরটিতেই মৃত্যু হয়েছে রেবামাসিমার।

সমীরের এতক্ষণের চেষ্টা বিফলেই গেল।

এরপর কেটে গিয়েছে আরও চার-চারটে দিন। আর ভুল হয়নি সমীরের। রেবা মাসিমাদের পাড়ায় আর কোনো গ্রাহক না থাকায় ওই তল্লাটে আর পা রাখেনি সমীর। তবে প্রতিদিন সকালে সবচেয়ে নিকটস্থ গ্রাহকের বাড়ি কাগজ পৌঁছে পরের জনের বাড়ি সাইকেল ছোটানোর পথে তার বার বার ইচ্ছে হয়েছে একবার অন্তত রেবামাসিমার বাড়ি ঢু মারে। কাছে যেতে না পারে, দূর থেকে তো জানালাটাকে লক্ষ করা যেতে পারে যে সেটা আবার খুলছে কিনা?

ইচ্ছে হলেও কিন্তু সাহসে কুলোয়নি সমীরের। যদি এরপরও জানালাটা খোলা দেখে! দেখলে রহস্য তো জটিল থেকে জটিলতর-ই হয়ে উঠবে, সে রহস্যের কিনারা হবে কি?

আবার যদি জানালা বন্ধই থাকে, আর সে সামনে ঘোরাঘুরি করতে যায়, তবে তো সেদিনের সেই লোকজনেরা তাকে চেপে ধরতেও পারে যে— তোমার কাগজ বিলির পর্ব তো শেষ, এখনও তোমার এত আগ্রহ কেন হে বাছা?

এইসব নানারকম ভাবনা-চিন্তা করে রোজই শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গিয়েছে সমীর।

আজ রবিবার। কাগজ বিলিতে সপ্তাহের আর ছ-টা দিনের মতো অতটা হুটোপুটি আজ থাকে না। আস্তে-ধীরে একটু বেলা করে কাগজ দিলেও আজ কেউ অসন্তুষ্ট হন না। রবিবার বড়োবাজার বন্ধ থাকে বলে সমীরেরও আজ বিশেষ ব্যস্ততা নেই।

রবিবারের এই কাগজ বিলি পর্বের প্রায় মাঝখানেই ব্যস্ত জমজমাট বাজার এলাকার একটি চায়ের দোকানের ব্রেঞ্চে বসে পড়ে সমীর, এক ভাঁড় চা নিয়ে। উদ্দেশ্য দুটি। এক, একটু বিশ্রাম নেওয়া। দুই, রবিবার কিছু বাড়তি কাগজ বিক্রি করে কিছু নগদ পয়সা তোলা। কাগজের সাইকেল দাঁড়ানো দেখলে একটা-দুটো কাগজ বাড়তি কিনে ফেলা এখনও বহু মানুষের অভ্যাস।

চায়ের ভাঁড়ে একটা-দুটো চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ সমীরের লক্ষ পড়ল এক কিশোরের দিকে। ফুটপাথ ধরে ধীর ও সতর্ক পায়ে এগিয়ে আসছে কিশোর। চিনতে এক মুহূর্তও সময় লাগল না সমীরের— এই কিশোর সেই বিট্টু!

তাকে অতিক্রম করে বেরিয়ে যাবার সময় বিট্টুকে নাম ধরে ডেকে ফেলল সমীর।

বিট্টু থমকে দাঁড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্নকর্তাকে দেখে চিনতে পারল তৎক্ষণাৎ।

‘কেমন আছো বিট্টু?’ সমীর চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

কথার উত্তর না দিয়ে অস্ফুটে কিছু-একটা বলে বিট্টু। সমীরের বোধগম্য হয় না।

‘একা একা কোথায় যাচ্ছ এদিকে?’ ভাঁড়টা ড্রামে ছুড়ে দিয়ে সমীর সাইকেলের স্ট্যান্ড ওঠায়।

এবারও বিট্টু কী বলতে চাইল সমীর বুঝল না। বিট্টুর ঠোঁট দুটো কোনো শব্দ না তুলে যেন শুধুই কেঁপে গেল কয়েক বার।

সমীর বুঝল বিট্টু ছেলেটি নিশ্চিত কোনো সমস্যায় রয়েছে। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না তাকে।

সমীর সাইকেল নিয়ে এগোতে এগোতে বিট্টুকেও তার সঙ্গে এগোবার ইঙ্গিত করল।

দু-চার পা এগিয়ে সমীরই প্রথম কথা শুরু করে, ‘তোমরা সেদিন বিশ্বাস করলে না, কিন্তু জানো, দু-দিন ভোরেই জানালাটা খোলা ছিল। আমি নিজে ওই জানালা দিয়ে কাগজ দিয়েছি।’

‘কে বলল, বিশ্বাস করিনি?’ এবার বিট্রর উচ্চারণ স্পষ্ট। ‘আমি জানি রেবাদিদা মাঝে মাঝেই ওই জানালাটা খুলে দেন। তুমি বলার আরও আগে থেকেই আমি জানি। আমি দেখেছি।

‘মানে!’ বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সমীর। ‘তুমি দেখেছ মানে— মৃত্যুর পরে দেখেছ?’

‘হ্যাঁ।’ শক্ত গলায় উত্তর দেয় বিট্টু। ‘রেবাদিদা শুধু জানালা খুলেই দেন না, মাঝে মাঝে জানালায় এসেও দাঁড়ান।’

‘জানালায় এসে দাঁড়ান!’ সমীর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে। ‘তুমি তাকে জানালায় দাঁড়াতে দেখেছ?’

‘হ্যাঁ, রোজ দেখি। রোজ।’ বিট্টুর কণ্ঠস্বর আবার কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে। ‘খুব ভোরে একবার তিনি জানালা খুলে দাঁড়ান। তোমার জন্য। আমি জানি। ওই সময় তুমি কাগজ দাও, ম্যাগাজিন দাও। হুটোপাটি না করে নিরালায় একটু অপেক্ষা করলে তুমিও দেখতে পাবে।’

সমীর হতবাক হয়ে বিট্টুকে দেখে। এতটুকু ছেলে, কিন্তু অদ্ভুত দৃঢ়তায় কী অবিশ্বাস্য সব কথা বলছে!

বিট্টু বলে চলে, ‘একটু বেলার দিকে দাঁড়ান লতিকামাসির জন্য। দিদার রোজকার কাজের মেয়ে। এখন আসে না যে!’

একটু সময় নীরবতা। তারপর আবার বলে বিট্টু, ‘রাতের বেলায় অনেকক্ষণ দাঁড়ান রেবাদিদা, ছেলের ফোনের জন্য। খোলা জানালায় রাতের বাতাসে ভেসে কথা পরিষ্কার শোনা যায় বলে আমি এসব জানি। তাই অপেক্ষায় থাকি। দেখতে পাই।’ ..

‘তুমি ভয় পাও না?’ সমীর অবিশ্বাসী। কোনো ঘোরের প্রভাবে বিটু এসব বলছে কিনা, সে বাজিয়ে দেখতে চাইছে।

‘পাই তো! মৃত্যুর পরও একটা মানুষ থেকে গেছে ওই বাড়ির মধ্যে। ভয় তো পাওয়ারই কথা।’ প্রাপ্তবয়স্কদের মতো শুনতে লাগছে বিট্টুর কথা। সেই জন্যই তো ওই বাড়িটায় আর আমি ঢুকতে সাহস পাচ্ছি না। কিন্তু রেবাদিদার কথা ভাবো! মানুষটা কত একা! একদম একা!’

‘আর তো একা থাকবেন না তিনি। তাঁর ছেলে তো আসছেন! সমীর বলে।

‘সে তো আসছে মায়ের শেষ কাজটুকু করতে। বাবা মারা যাবার পরও এসেছিল। কাজ শেষ করে আবার কাজের জায়গায়! রাশিয়ায়। তখন?’

অকাট্য উক্তি বিট্টুর। সমীর বোঝে, বয়সের চেয়েও বাস্তব-বোধে ছেলেটি অনেক এগিয়ে। ওর কথাগুলিকে কোনোমতেই তাই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা উচিত হবে না।

সমীর আবার পুরোনো প্রসঙ্গে ফেরত যাবার চেষ্টা করে, ‘সেদিন শুনেছিলাম রেবামাসিমা তোমাকে খুব স্নেহ করেন। তাঁর সমস্ত ফাইফরমাশ খেটে দিতে তুমি। সেই তোমার জন্য কখন অপেক্ষা করে থাকেন তিনি? সেটা তো বললে না!’

‘সারাক্ষণ!’ আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে বিট্টু। ‘আমার জন্য সারাক্ষণ ছটফট করেন তিনি। ওই জানলার পাশ দিয়ে যাবার সময় আমি বুঝতে পারি। কিন্তু পাছে আমি ভয় পাই— তাই আমার জন্য তিনি সরাসরি জানালা খোলেন না। পাছে আমার স্কুলে, কোচিংয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়— এই ভেবে বন্ধ জানালার ওই পাশে তিনি অপেক্ষা করেন। আমাকে লক্ষ করেন। কিন্তু রেবাদিদা তো জানেন না যে দূর থেকে, আড়াল রেখে আমিও তাঁকে দেখি। জানালার খোলা, বন্ধেরও নজরদারি করি!

বিট্টুর সঙ্গে যত কথা বলে ততই তাকে ভালো লাগতে থাকে সমীরের। প্রসঙ্গ পালটে প্রশ্ন করে সমীর আবার, ‘এখন তুমি কোথায় চললে বিট্টুবাবু?’

‘যাচ্ছি রেবাদিদার চশমার ডেলিভারি নিতে।’

সমীর হতবাক।

বিট্টু ব্যাপারটা খোলসা করে, ‘ক-দিন আগে চোখ দেখিয়ে নতুন চশমা গড়তে দিয়েছিলেন রেবাদিদা। বলেছিলেন, কয়েক দিন পর থেকেই পুজোসংখ্যা পত্রিকাগুলি বেরুতে শুরু করবে। তার আগে চশমাটা পালটানো দরকার। দিদার সঙ্গে দোকানে এসেছিলাম আমি। পুরো পেমেন্ট করা আছে। রসিদও আমারই কাছে। গত কয়েক দিন ধরে ভেবেছি— চশমাটা নিয়ে আর কী হবে? আজ সকালে ভাবলাম- রেবাদিদার আকাঙ্ক্ষার জিনিস, ফেলে রেখে লাভ কী? নিয়েই যাই!’

‘এটা নিয়ে কী করবে তুমি?’ সমীর জানতে চায়।

‘রেবাদিদার জানালার কাছে রেখে দেব। দেখি, তিনি এটা নেন কিনা!’

সমীর রোমাঞ্চিত, ‘চশমার দোকান কতদূর?’

‘এই তো— কাছেই! এসে গেছি প্রায়!’

‘চলো, তোমার সঙ্গে তবে আমিও যাই।’

চশমা নিয়ে ফেরত আসার পথে সমীর জানতে চায়, ‘তুমি এটা কখন রেবামাসিমার জানালায় রাখবে?’

একটু ভেবে নিয়ে বিট্টু জানায়, ‘আজ সন্ধ্যায় আমার অঙ্কের কোচিং রয়েছে। ফেরার সময় বেশ অন্ধকার হয়ে যাবে। আর কালভার্ট পেরোবার পর আমাদের পাড়াটা তো গাছগাছালির ছায়ায় আরও অন্ধকার। নিঝুম কারো নজরে পড়বে না। তখনই রাখব। এই ধরো রাত সাড়ে আটটা নাগাদ।’

‘ওই সময় যদি আমি তোমার সঙ্গে থাকি, কেমন হয়?’ সমীর জানতে চায়।

‘বাঃ, তবে তো খুব ভালো হয়! আমিও সাহস পাই।’

‘ওই সময় কি রেবামাসিমাকে দেখতে পাব?’

‘পেতেও পার। তবে একটু সময় নিয়ে রেখো হাতে।’

‘বেশ। তবে আমি কোন জায়গাটায় তোমার সঙ্গে দেখা করব?’

‘আমাদের পাড়ায় ঢোকার আগে ওই যে কালভার্টটার কথা বললাম, সেখানে।’ বিট্টু জানায়। ‘তবে সিওর এসো কিন্তু। বাবা ফেরার সময় আমাকে কোচিং থেকে নিতে আসেন। তাঁকে তবে আজ আসতে নিষেধ করব। আর এরপর যদি তুমি না আসো, আমি একটু বিপদে পড়ে যাব।’

সমীর একটু থমকায়। তারপর বলে, ‘সবচেয়ে ভালো হয় যদি তোমার কোনো ফোন নম্বর আমাকে দাও! আমি না আসতে পারলে জানিয়ে দেব।

‘তবে তোমাকে সন্ধ্যা ছ-টার আগে জানাতে হবে। আমি বেরোবার আগে।’ বিট্টু জানায়। ‘মোবাইলটা কিন্তু আমার নয়। আমি সঙ্গে নিয়ে বেরোইও না।’

দুজনের ফোন নম্বর বিনিময় হয়।

কথামতো ঠিক সময়ে, ঠিক জায়গায় দুজনের সাক্ষাৎ হল। বাক্সসমেত চশমা বিট্টুর নির্দেশমতো সমীর সন্তর্পণে তুলে দিল রেবামাসিমার ঘরের সেই বন্ধ জানালার পাল্লা দুটির একটু নীচে। সিমেন্টের বিটে।

তারপর সেখান থেকে বেশ কিছুটা দূরত্বে গিয়ে একজনের উন্মুক্ত বাগানের একগুচ্ছ ঘন পল্লবিত গাছের ছায়ায় দুজনে অপেক্ষায় বসে।

মিনিট পাঁচেক কাটতে-না-কাটতেই বিট্টু উঠে পড়ে, ‘আমি বাড়িতে ঢুকে বইয়ের ব্যাগটা রেখে বুঝিয়ে আসি- আমি ফিরেছি। নইলে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে যাবে।’

শরতের শুক্লপক্ষের নির্মল আকাশে তখন অপরূপ চন্দ্রিমা। সমীর পলকহীন চেয়ে ওই বন্ধ-জানালায়।

একটু পরে ফিরে এল বিট্টু। হাতে মোবাইল। জানাল, ‘এটা আমার দিদার ফোন। বাড়িতেই থাকে। কোনো প্রয়োজন পড়লে রেবাদিদা এই নম্বরে ফোন করে ডাকতেন আমাকে।’

আবার অপেক্ষা। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে দুজনে। কই, জানালা খুলছে না তো!

হঠাৎ বিট্টুর মাথায় একটা মতলব খেলে গেল। মৃতদেহ ঠান্ডাঘরে নিয়ে যাওয়ার সময় রেবাদিদার হাতের চুড়ি, কানের রিং, গলার চেন খুলে রাখতে দেখেছে আত্মীয়াদের। মোবাইলটা কারও হাতে দেখেনি তো! নিশ্চয় সেটা ঘরের মধ্যেই কোথাও রয়ে গেছে। ফোন করে দেখলে একবার কেমন হয়?

ডায়াল করল বিট্টু। স্ক্রিনে দেখল ডায়ালিং। কিন্তু রিং হচ্ছে না। অথবা হয়তো রিং হচ্ছে, বিট্টু শুনতে পাচ্ছে না। দু-বার ডায়ালিংয়ের পুরো সময় পার হয়ে যাওয়ার পর বিট্টু চেষ্টা ছেড়ে দিল।

এইসময় হঠাৎ সমীর খামচে ধরল বিট্টুর কাঁধ। বিট্টু তার দিকে তাকাতেই সে চোখের ইশারায় বিট্টুকে কিছু লক্ষ করতে নির্দেশ দিল।

জানালার দিকে দৃষ্টি পড়ল বিট্টুর। ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে দুটি পাল্লা। গাছের পাতার ফাঁক গলে কোমল জ্যোৎস্না পাতার দোল খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুলে দুলে উঠছে জানালাপথে। ভেতর থেকে কি কোনো একটা হাত এগিয়ে এসে তুলে নিল চশমাটা? নাকি চোখে তার ভুল!

হঠাৎ টুং টুং শব্দ তুলে একটা মেসেজ ঢুকল বিট্টুর মোবাইলে। বিটু পড়ল মেসেজটা। তারপর থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সমীরের হাতে তুলে দিল মোবাইলটা। সমীর পড়ল। লেখা আছে— থ্যাঙ্ক ইউ। প্রেরক কে? লেখা রয়েছে বিট্টুর রেবাদিদার নাম।

বিস্ময়ের তখনও বাকি অনেকটাই। হালকা আলো আর আঁধারিতে খুব আবছা আবছা একটা চেহারা ফুটে উঠতে লাগল যেন ওদের চোখের সামনে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে হতে দেখা গেল রেবামাসিমার অবয়ব। জানালায় এসে তিনি যেন দেখা দিলেন বিট্টুদেরই। চোখে চশমা।

দিন পনেরো পরের এক ভোরবেলা। ধীরে ধীরে, চুপিচুপি, দুরুদুরু বুকে কালভার্ট, পেরিয়ে বিট্টুদের পাড়ায় এসে পৌঁছোল সমীর। সাইকেলের সামনে-পিছনে স্তূপাকার খবরের কাগজ। দু-পাশে হ্যান্ডেল থেকে ঝোলানো দুটি ব্যাগে সদ্য প্রকাশিত গোটা বিশেক পূজাবার্ষিকী।

রেবামাসিমার মৃতদেহের সৎকার হয়ে গেছে বারোদিন আগে। সংক্ষেপে পারলৌকিক কাজকর্ম সেরে সাতদিনের মধ্যেই রাশিয়ায় ফিরে গেছে তাঁর কর্মব্যস্ত একমাত্র ছেলে। সৎকার-পর্বে উপস্থিত ছিল সমীরও। মৃতদেহ কলকাতার ঠান্ডাঘর থেকে সরাসরি শ্মশানে না নিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য এনে রাখা হয়েছিল রেবামাসিমার সেই ঘরে। বন্ধঘরের দরজা খুলে আবিষ্কৃত হয়েছিল সমীরের ভুল করে দিয়ে যাওয়া পর পর দু-দিনের সেই খবরের কাগজ দুটি।

রেবামাসিমার বালিশের তলা থেকে পাওয়া গিয়েছিল তাঁর মোবাইল ফোনটি। চার্জহীন, বন্ধ অবস্থায়। একটা ছোট্ট টেবিলের ওপর দেখা গিয়েছিল মাসিমার নতুন চশমাটি।

বিট্টুর সঙ্গে এ ব্যাপারে সমীরের শুধু অর্থবহ দৃষ্টি বিনিময়ই হয়েছিল, অন্য কাউকে তারা এ-বিষয়ে কিছু জানাতে চায়নি।

খবরের কাগজ দুটির প্রসঙ্গও চাপা পড়ে গিয়েছিল সেদিনের শোকের আবহে। তাই এ ব্যাপারেও সমীর কোনো উচ্চবাচ্য করেনি।

বিট্টুর সঙ্গে চশমা দিতে এসে সেদিন বাগানের যে গাছতলায় রেবামাসিমাকে দেখবে বলে অপেক্ষা করছিল সে, আজ সেখানে এসে সমীর সাইকেলটা দাঁড় করায়। গতকাল সকালেই তাকে ফোনে খবর দিয়েছে বিট্টু— দীর্ঘ বিরতির পর রেবাদিদাকে আবার দেখা যাচ্ছে।

আজ তাই এখনও কোথাও কাগজ না দিয়ে, সবার প্রথমে, এত ভোরে সে এসে উপস্থিত হয়েছে এখানে।

ব্যাগ থেকে একটা পূজাসংখ্যা শুকতারা আর একটা নবকল্লোল বের করল সমীর। লোকে জানলে পাগল বলবে। বলুক। দু-কপি ম্যাগাজিন নষ্ট হল বলে ভাবতে পারে অনেকে। ভাবুক। দেব-দেবীকে পূজা নিবেদন করে কত ফুল, ফল, অন্ন, খাদ্য তো নষ্ট করে কতজন! সে-ও পরম পূজনীয়া একজনকে নয় নিবেদন করলই দু-কপি ম্যাগাজিন! পুস্তক-প্ৰেমী, সাহিত্যপ্রেমী, একনিষ্ঠ পাঠিকা রেবামাসিমা তার কাছে একান্তই পূজনীয়া। পূজাসংখ্যাগুলি পড়ার অভিলাষে তৈরি তাঁর নতুন চশমা পূজাসংখ্যা না পেলে যে বৃথাই হয়ে যায়!

খবরের কাগজ আর সাময়িক পত্রপত্রিকা বিলির কাজ না করে অন্য কাজও সকালে করতে পারত সমীর। পয়সাও হয়তো বেশি রোজগার হত তার। কিন্তু এ কাজকে সে ভালোবাসে। আর ভালোবাসে এমন কিছু মানুষের জন্যই। যাঁদের সংখ্যা কমতে থাকলে সমাজের, সংসারের অনিবার্য ক্ষয়।

ম্যাগাজিন দুটো বন্ধ জানালার নীচে সিমেন্টের বিটের ওপর রেখে আর অপেক্ষা করল না সমীর। রেবামাসিমা আছেন কিনা, আজ সেই প্রমাণ পেতে আসেনি সে। এসেছিল প্রণাম জানাতে।

সাইকেলে চড়ে দ্রুত প্যাডেল করে বেরিয়ে গেল সমীর।

[ শারদীয়া শুকতারা, ১৪২৪ (২০১৭) ]