Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
0/50
New Courseপেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

জঙ্গল বাড়ির বউরানি – প্রেমেন্দ্র মিত্র

অনেক দিন থেকে সাধ, অকূল বিশাল কোনো নদীর উপর পানসি করে কয়েকটা দিনরাত্রি খেয়ার মতো স্রোতে ভাসিয়ে কাটিয়ে দেব। অনেক দিন থেকে— মানে ‘ছিন্নপত্র’ পড়া অবধি। সেই যে কয়েকটা ছেঁড়া ছেঁড়া আলগা ছবি ছেলেবেলায় চোখের উপর ভেসে উঠেছিল, চাঁদের আলোয় স্বপ্নের মতো বিছিয়ে থাকা বালুচর, মাঝ রাতের অন্ধকার কাঁপিয়ে বুনোহাঁসের পাখার শব্দ— সে আর মন থেকে কোনো কিছুতেই মুছে যায়নি। সেসব মধুর নামগুলোও ভুলিনি! শিলাইদহ তো পৃথিবীর কোনো জায়গা বলেই মনে হয় না আমার এখনও। সে যেন কোনো রূপকথার ভৌগোলিক নাম। আমার ছিন্নপত্রের ‘পদ্মায়’, তো রেলি ব্রাদার্সের পাটের স্টিমার যায় না, সে পদ্মা সাত সমন্দুর তেরোনদীর একটি রুপো-গলানো, তার জলে ঢেউ তুলে মধুকরের সপ্তডিঙাকে বড়োজোর আমার মন ছেড়ে দিতে পারে দূর সিংহলে বাণিজ্যে যেতে।

ছেলেবেলায় সে সাধ হঠাৎ এবার পূরণ হয়ে গেল। একেবারে পুরোপুরি পূরণ হয়ে গেল, তা বলতে পারি না, কারণ নদীটা পদ্মা নয়— ধলেশ্বরী। তাতে কিন্তু এমন কিছুই এসে যায় না। সব নদীই আশ্চর্য নদী, এপার থেকে ওপার ঝাপসা দেখলেই হল, ফুলে উঠলেই হল হাওয়ায় দূরের নৌকোর পাল, আর রাতের অন্ধকারে চঞ্চল জলের স্রোতে ভেসে গেলেই হল তারার ছায়া।

বরং আসল পদ্মার দিক শিলাইদহ নামটি ধরে খোঁজ করতে গেলেই খারাপ হল। মনের ছবির সঙ্গে চোখের ছবির কেবল লাগত কাটাকাটি-মারামারি, আমার স্বপ্ন যেত ভেঙে, আর স্মৃতিও জমত না মধুর করে। আর আমার ধলেশ্বরীর-বা অভাব কীসের! ‘সেও ছোটোখাটো রণরঙ্গিনী মূর্তি ধরে বর্ষার প্লাবনে ভাঙ্গন ধরায় লোকালয়ের কূলে। তার বুকে চর জাগে স্বপ্নের মতো, চখা-চখির ডাকে তার দু- কূল কেঁদে ওঠে অন্ধকার রাত্রি।

মাঝারি সাইজের একটি পানসি ভাড়া করে নিলাম। মাঝি মাল্লা, চাকর-বাকর নিয়ে সবসুদ্ধ আমরা ছ-জন মাত্র।

এত লোকেরও বুঝি দরকার ছিল না। বিনা তাড়াহুড়োয় ধীরে-সুস্থে যেমন খুশি, ভেসে যাওয়াই ছিল আমাদের কাজ, বড়ো বড়ো গঞ্জে কি লোকালয়ে ভিড় করা ঘাটে নয়, শূন্য-নির্জন তীরে। শুধু পাখির ঝাঁক-বসা চড়ার ধারে ধারে। তার জন্যে একা চরণ মাঝি যথেষ্ট। অধিকাংশ সময়েই তো আর সবার ছুটি, একা চরণ বসে থাকে হালে কাঠের মূর্তির মতো। শুধু যখন মেঘনার মোহনায় গিয়ে পড়বার উপক্রম হল তখন স্রোতের উজান ঠেলে যেতে দাঁড়ে হাত দিতে হয় অন্য মাঝিদের।

ছিন্নপত্রের স্বপ্নের কুয়াশা মনের মধ্যে না থাকলে পানসির জীবন বেশ পানসে হয়ে উঠতে পারত? গরমিল তো কম নয়। ছিন্নপত্রের পদ্মায় কচুরিপানার কুৎসিত জঙ্গল দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তা ছাড়া রামসেবকের রান্না থেকে চরণ মাঝির চেহারা পর্যন্ত খুঁত ধরবার অনেক কিছু ছিল, কিন্তু আমি ছিলাম ও সবের প্রায় ওপরে।

প্রায় ওপরে এই জন্যে বলছি যে, চরণ মাঝির চেহারাটা সবসময়ে ঠিক স্বাভাবিকভাবে বরদাস্ত করতে পারতাম না। এক-এক সময়ে নিজের অজান্তেই বুঝি শিউরে উঠেছি। যখন মাঝ রাত্রে আর সবাই গড়িয়ে পড়েছে পানসির কোলে, আর মেঘঢাকা চাঁদের আলোয় ধলেশ্বরী থম থম করছে, তখন মিশরের মমির মতো শুধু চরণ আছে নিস্পন্দভাবে হালে। কামরা থেকে বেরিয়ে এসে হঠাৎ মনে হয়েছে, আবার সেখানেই ফিরে যাই। সেখান থেকে তবু অন্য মাঝিদের নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যায়। তাতেও যেন অনেকখানি ভরসা।

সত্যি, জ্যান্ত মানুষের এমন অদ্ভুত মরা চেহারা হতে পারে— এ আমি আগে কখনো জানতাম না। রং তার কালো বলে নয়, কালো তো সব মাঝিই, কিন্তু তার চামড়ায় যেন অপার্থিব বিবর্ণতা! যেন অনেক দিন মাটির তলায় সে চাপা পড়েছিল। এই সবেমাত্র যেন উঠে এসেছে শ্যাওলাধরা ভিজে মাটি মুছে গা থেকে!

লোকটার ধরন-ধারণাও অদ্ভুত! কথা সে খুব কমই কয়, অত্যন্ত ভারী হাঁড়ির মতো গলায়-শুধু একটু-আধটু হ্যাঁ-না ছাড়া আর কিছু বলতে শুনেছি বলে মনে পড়ে না। অন্য মাঝিদের সাথে তার মেলামেশাও নেই; তবুও সবাই যেন একটু সভয়ে তাকে সমীহ করে দূরে রেখে চলে, সে কেবল তার মরা চামড়া সত্ত্বেও দৈত্যের মতো বিশাল চেহারার জন্য।

সেদিনও মেঘে ঢাকা ভাঙা চাঁদের মরা জ্যোৎস্নায় চারদিক ছমছম করছে।

সন্ধে থেকেই মাঝিদের মধ্যে একটু ফিসফিস শুনলাম! রাত একটু হলেই তার কারণটা বোঝা গেল।

এক মাঝি সাহস করে এগিয়ে এসে কান-মাথা চুলকে, আমতা আমতা করে জানালে যে আমি যদি তাদের ছুটি দিই, তাহলে তারা একটু ভালো যাত্রা শুনে আসে।

‘যাত্রা’ কোথায় হচ্ছে হেসে জিজ্ঞাসা করে জানলাম খানিক আগে যে গঞ্জ আমরা পেরিয়ে এসেছি, সেইখানেই নাকি ভারি নামজাদা এক যাত্রা দল এসেছে। এমন যাত্রা শোনবার ভাগ্য নাকি এ-তল্লাটে সহজে মিলবে না। আমার মুখের ভাবে ভরসা পেয়ে সে আমাকেও যাওয়ার প্রস্তাব করে ফেলে এবার।

হেসে বললাম না মাঝির পো আমার অত শখ নেই, তবে তোমরা শুনে আসত পারো, ইচ্ছে হয়েছে যখন, কিন্তু গঞ্জের ঘাটে তো আমি থাকতে পারব না।

মাঝি তৎক্ষণাৎ খুশি হয়ে জানালে যে আমায় সে কষ্ট তারা দেবে না। এখান থেকে কতটুকু আর পথ, তারা পাড় দিয়ে হোঁটেই যাবে। যাত্রা ভাঙলেই ফিরে আসবে ভোরবেলায়, কিন্তু আপনার ভয় করবে-না তো?

হেসে বললাম— তা যদি একটু করে মন্দ কী!

মাঝি সাহস দিয়ে জানালে— এখানে ভয়ের অবশ্য কিছুই নেই। জলঝড়ের সময় নয়, নৌকো নোঙর বাঁধা থাকবে নিরাপদ জায়গায়।

হঠাৎ কেন জিজ্ঞাসা করলাম জানি না, চরণ মাঝি যাচ্ছে তো তোমাদের সঙ্গে?

মাঝির মুখে ‘যাচ্ছে বই কী কর্তা’ শুনে কেমন যেন আশ্চর্য বোধ করলাম বলেই একটু লজ্জিত হলাম।

মাঝিরা সব চলে যেতেই একেবারে পানসির কামরার ছাদে উঠে গিয়ে বসেছিলাম। এমন অপরূপ নির্জনতা ভোগ করার সৌভাগ্য কখনো তো হয়নি। মাঝিরা সবাই চলে গেছে, হিন্দুস্থানি ঠাকুর রাম সেবক পর্যন্ত সঙ্গে গেছে হুজুকে পড়ে। দূরে কোথাও একটা-দুটো নৌকার আলো পর্যন্ত নেই, বিশাল ধলেশ্বরীর বুকে আমি একা— একথা ভাবতেও কেমন যেন পুলকের রোমাঞ্চ হয়।

ঠিক পুলকের রোমাঞ্চ কিন্তু পরে সেটা রইল না।

রাত্রির নির্জনতায় ধ্যান করতে করতে বোধ হয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। উঠে দেখি, চারিদিকের দৃশ্য বেশ বদলে গেছে, ভাঙা চাঁদ পশ্চিমের দিগন্তে ঢলে পড়ে কেমন যেন ফ্যাকাশে হলদে হয়ে উঠেছে। সেই ফ্যাকাশে হলদে চাঁদের আলোয় কূলহীন ধলেশ্বরীর রুগ্ন মলিন চেহারাটা ভারি অস্বস্তিকর লাগল। একটা নাম-না-জানা পাখি দূর-আকাশে কীরকম আর্তনাদের মতো ডাক ছেড়ে উড়ে গেল! শিউরে উঠলাম একটু।

বুঝলাম এতক্ষণ এই খোলা জায়গায় শুয়ে ঘুমানো উচিত হয়নি। অনেকক্ষণ হিম খেয়ে শরীরটা কেমন যেন ম্যাজমেজে হয়ে উঠেছে, মনটাও সেইসঙ্গে।

ওপর থেকে নামতে যাচ্ছি, হঠাৎ থমকে গেলাম। এদিকে এতবড়ো একটা বিশাল পোড়োবাড়ি ছিল নাকি! বাড়ি না বলে তাকে প্রাসাদই অবশ্য বলা উচিত। ফাটলধরা বিশাল দেওয়ালগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়েও এখনও যেন আকাশ আড়াল করে আছে। বুঝলাম এতক্ষণে জ্যোৎস্থান সিঅস্পষ্ট আলোয় এই পোড়ো-প্রাসাদ কুয়াশায় মিশেছিল, চাঁদ এখন তার পিছনে গিয়ে পড়তেই অন্ধকারের দৈত্যর মতো জেগে উঠেছে। এই পোড়ো-প্রাসাদ সম্বন্ধে কাল মাঝিদের কাছে খোঁজ নিতে হবে ভেবে আবার নামতে গিয়েও থামতে হল।

পেছনে কী-একটা ঝনঝন করে শব্দ হল যেন। সত্যি বলছি এবার ফিরে চেয়ে গায়ে একটু কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। নিজেকে একেবারে একা বলে জানবার পর হঠাৎ পেছন ফিরে আর একটি লোককে অপ্রত্যাশিতভাবে আবিষ্কার করলে গায়ে কাঁটা দেওয়া অস্বাভাবিক বোধ হয় না।

এ কী চরণ! প্রায় ধরা গলায় বললাম— তুমি কখন ফিরলে যাত্রা দেখলে না?

সে শেকল-সমেত নোঙরটা তুলে পানসির ওপর রেখে গম্ভীর স্বরে বললে না!

কিন্তু নোঙর তুললে কেন? –অত্যন্ত অস্বস্তির সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম। তার এভাবে একলা ফিরে আসাটা আমার ভালো লাগছিল না।

সে সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললে— দেখেছেন!

দেখিনি, কিন্তু এইবার দেখলুম। সেদিন রাত্রি শেষে যে অদ্ভুত অসাধারণ সব ঘটনা একসঙ্গে ষড়যন্ত্র করে এসেছে আমার জীবনে, তখন তা ভালো করে বোধ হয় বুঝিনি।

পাড়ের ওপড় জলের একেবারে কিনারায় একটি দীর্ঘ নারী মূর্তি ব্যাকুলভাবে আমাদের হাত নেড়ে ডাকছে।

কে ও? জানো নাকি! প্রায় চিৎকার করে উঠলাম বিস্ময়ে উত্তেজনায়। হাল ঘুরিয়ে নৌকো সেই পাড়ের কাছে ভিড়াতে চরণ শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।

পাড়ে ভিড়াতে-না-ভিড়াতে মহিলাটি যেন পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে এসে পানসিতে উঠলেন। আমার কাছে এসে তারপর ভীত-ব্যাকুল স্বরে বললেন— আমায় বাঁচান! আমায় বাঁচান! দোহাই আপনার!

সে অবস্থায় যতদূর সম্ভব স্থির হয়ে বললাম— আমার যতদূর সাধ্য চেষ্টা করব, কিন্তু কী ব্যাপার, আমার একটু জানা দরকার। আপনি আমার সঙ্গে কামরায় চলুন।

আঁচল ঢাকা দিয়ে কী যেন একটা ভারী জিনিস তিনি বয়ে এনেছিলেন। কামরায় চৌকাঠের কাছে সেইটের ভারে একটু হোঁচট খেতে ভদ্রতা করে বললাম— ওটা বড্ড ভারী বোধ হয়। আমার হাতে দিতে পারেন।

তিনি একথায় এমন আঁতকে উঠে পিছু হটে দাঁড়াবেন জানলে নিশ্চয়ই ও কথা বলতাম না। তাই একটু বিমূঢ়ভাবেই নিজের কামরায় ঢুকে লণ্ঠনটা আর একটু উজ্জল করে দিলাম।

নিজের ব্যবহারে তিনিও বোধ হয় একটু লজ্জিত হয়েছিলেন। ঘরে ঢুকে আঁচলের আড়াল থেকে একটা অদ্ভুত আকারের বাক্স বের করে আমার সামনে রেখে তিনি বললেন- আমায় মাপ করবেন। আপনাকে অবিশ্বাস করা আমার উচিত হয়নি, কিন্তু ভয়ে ভয়ে এমনি হয়ে গেছি।

মহিলাটিকে কামরার আলোয় এতক্ষণে ভালো করে দেখলাম। চেহারায় তার স্পষ্ট বড়ো ঘরের ছাপ, কিন্তু কথাবার্তা ধরন-ধারণ যেমন তার অদ্ভুত, তেমনি তাঁর পোশাক! যাই হোক, তখন সেসব নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নয় তার। কী আছে ওতে?

তিনি কথা না বলে শুধু বাক্সের ভেতর, কুণ্ডলী পাকানো এক রাশ সাপের চোখ যেন জ্বলে উঠল। চমকে গেলাম। সাপ নয়— হিরা মুক্তোর জড়োয়া গয়না। তেমন গয়না আমি তো কখনো দেখিনি।

মহিলাটি মুঠো করে কয়েকটা গয়না বাক্স থেকে তুলে কামরার মেঝেয় ছড়িয়ে দিলেন। আমি নিজের অনিচ্ছাতেই একটু শিউরে সরে বসলাম। সেগুলো যেন জড় বস্তু নয়, ক্রূর সরীসৃপ!

দরজায় খুট করে একটু শব্দ হতে মুখ তুলে দেখি চরণ, কখন সেখানে নিঃশব্দে ছায়ার মতো এসে দাঁড়িয়েছে। তার কোটরে ঢোকা চোখেও যেন সাপের মতো হিংস্র লোভের ঝিলিক!

পলক ফেলতে-না-ফেলতেই সে সরে গেল। ভয় পেয়ে একটু বিরক্তির স্বরে বললাম— তুলে ফেলুন এসব বাক্সে! এসব সাংঘাতিক জিনিস নিয়ে আপনি কী বলে এই রাতে একা বেরিয়েছেন!

আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে গয়নাগুলি বাক্সে তুলতে তুলতে তিনি বললেন— বেরুব না? ওরা যে এসব ছিনিয়ে নিতে চায়।

ওরা কারা।

আমার শ্বশুর বাড়ির জ্ঞাতিরা। আমার স্বামী বিদেশে। ওদের এখন এই গয়নাগুলোর ওপর অসীম লোভ। ওরা সব করতে পারে এগুলোর জন্যে— খুন করতে পারে! কিন্তু আমি দেব না, কিছুতেই দেব না। রাত্রির অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে তাই আমি পালিয়ে এসেছি।

কিন্তু আপনি যাবেন কোথায়?

যাব বাপের বাড়ি। ওরা আমায় দিনরাত আগলে রাখে, যেতে দেয় না। দোহাই আপনার! দু-ক্রোশ মাত্র গেলে আমার বাপের বাড়ি, আমায় সেখানে পৌঁছে দিন!

আপনি ব্যস্ত হবেন না, আমি ব্যবস্থা করছি— বলে আমি কামরা থেকে চরণকে আদেশ দেওয়ার জন্যে বেরোলাম।

কিন্তু আশ্চর্য। চরণ যেন আগে থাকতেই সব জানে। সে হালে বসে আছে। নৌকা চলেছে।

বললাম— ক্রোশ-দুয়েক বাদে নৌকা থামিয়ে খবর দিও।

নিশ্চলভাবে বসে কী যেন একটা অস্পষ্ট জবাব দিলে! অত্যন্ত বিশ্রী একটা অস্বস্তি নিয়ে আবার আমি কামরার ঢুকে বসলাম আমি বাইরে যাচ্ছি, আপনি এ কামরার ভেতরে দরজা দিয়ে দিন।

তিনি ব্যাকুলভাবে বললেন— না না, সে আরও ভয় করবে। আপনি আমার সঙ্গে থাকুন।

উত্তরে কিছু বলবার আগেই টলে গিয়ে চমকে উঠলাম। এ কী নৌকা হঠাৎ ঘুরে গেল কেন? চরণ মাঝি হাল ছেড়ে দিয়েছে নাকি। পানসি নিজের খেয়ালে ঘুরছে।

টাল সামলে উঠেই বুঝলাম, আমার আশঙ্কা মিথ্যে নয়। ডুবে যাওয়া চাঁদের শেষ ক্ষীণ আলোয় দেখলাম, ঠিক যমদূতের মতো চরণ এসে কামরার দরজায় দাঁড়িয়েছে। কী হিংস্র লোভ তার অমানুষিক চোখ ও মুখে! বুকের রক্ত হিম হয়ে যায় সেদিকে তাকালে!

অপরিচিতা মহিলা আতঙ্কে চিৎকার করে বাক্স সজোরে বুকে আঁকড়ে ধরে উঠে দাঁড়ালেন। ছুটে বেরিয়ে এলেন বুঝি আমার কাছে সাহায্যের আশায়। কিন্তু বৃথা। আমি বাধা দিতে যেতেই সবল হাতের একটা মুষ্টিতে মাথা ঘুরে সজোরে পড়ে গেলাম কাঠের মেঝের ওপর। মাথায় চোট খেয়ে তখন আমার কীরকম একটা আচ্ছন্ন-অভিভূত অবস্থা। চোখের সামনে যা ঘটছে, তা দেখতে পেলেও আমার যেন উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই, গলার স্বর পর্যন্ত রুদ্ধ হয়ে গেছে।

মহিলা প্রাণপণে তাঁর মহামূল্য বাক্সটি রক্ষা করবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু স্ত্রীলোক হয়ে সে দৈত্যের সঙ্গে তিনি পারবেন কী করে!

ধীরে ধীরে বাক্সটি কায়দা করে নিয়ে চরণ তাঁকে নৌকার ধারে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, তিনি টলছেন একেবারে জলের কিনারায়। দারুণ হতাশায় শেষ শক্তি সংহত করে তিনি প্রচণ্ড একটা টান দিয়ে বাক্সসুদ্ধ জলে পড়ে গেলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দুশমনও।

এতক্ষণে একসঙ্গে গলার স্বর আর দেহের সাড়া পেয়ে আমি চিৎকার করে ছুটে গেলাম পানসির ধারে। মহামূল্য বোঝায় ভারী সেই বাক্সের টানে দু-জনেই তলিয়ে যাচ্ছে নদীর অতলে কেউ তবু ছাড়বে না তার দখল।

সাঁতার জানি না, মহিলাটির সাহায্যে ঝাঁপিয়ে পড়েও কিছু করতে পারব না। আমি আবার চিৎকার করে উঠলাম। যদি কোথাও কেউ থাকে, তার সাহায্যের আশায়।

চাঁদ ডুবে গিয়ে ভোরের প্রথম নীলচে আলোয় তখন নদীর কুয়াশা তরল হয়ে যাচ্ছে। ক-টা ইলিশ মাছের ডিঙি বুঝি কাছেই ছিল। চিৎকার শুনে তারা কাছে এসে ভিড়ল। ব্যাকুলভাবে একনিশ্বাসে তাদের যথাসম্ভব সমস্ত ঘটনা জানিয়ে যেখানে তাদের দু-জনে ডুবেছে, সে জায়গাটা দেখালাম।

তারা প্রথমে গম্ভীর হয়ে শুনে হেসে উঠল। হেসে জানাল যে এ-রকম আজগুবি ব্যাপার হতেই পারে না। যত ভারী জিনিসই হোক একেবারে গায়ে বাঁধা না থাকলে কাউকে একটানে ডুবিয়ে নিতে পারে না। তাও দু-দুটো লোককে। হাতে ধরে কাড়াকাড়ি করতে করতে ডুবলে দু-জন না হোক, একজন তো ভেসে উঠতোই। আর তা ছাড়া দু-ক্রোশ কেন এদিক-ওদিক বিশ ক্রোশের ভেতর প্রাসাদের মতো কোনো পোড়োবাড়িই নদীর ধারে নেই। দামি গয়নার বাক্সসমেত ওরকম মেয়েলোক আসবে কোথা থেকে!

আমি রেগে উঠে বললাম— তবে কি আমি মিথ্যে বলছি?

বৃদ্ধগোছের একটি মাঝি একটা ডিঙির এক কোণে বসে এতক্ষণ নীরবে তামাক খেতে খেতে আমার কথা শুনছিল। তার কিছু বলবার আগেই সে এগিয়ে এসে শান্ত স্বরে বললে- না বাবু, আপনি মিথ্যে বলেননি, আমি জানি আপনি জঙ্গল বাড়ির বউরানিকে দেখেছেন।

তার সমর্থনে একটু ভরসা পেয়ে বললাম— জঙ্গল বাড়ির বউরানি তুমি জানো তাহলে। কোথায় জঙ্গল বাড়ি বলো তো?

খানিক চুপ করে থেকে নীচে জঙ্গলের দিকে আঙুল দেখিয়ে সে হঠাৎ বললে— ওইখানে বাবু। আজ পঞ্চাশ বছর হল জঙ্গল বাড়িকে নদী টেনে নিয়েছে। তবে বউরানি তাঁর জ্বালা ভোলেননি। এখনও মাঝে মাঝে কারো পানসিতে এসে ওঠেন।

জেলেরাই আমার পানসি তারপর তীরে পৌঁছে দেয়। মাঝিমল্লারা যাত্রা থেকে ফিরে ব্যাকুল হয়ে তখন আমায় খুঁজেছে। তাদের কাছে জানলাম, চরণ মাঝি তাদের সঙ্গেই ছিল সারারাত যাত্রার আসরে।

বুঝলাম, সব না-হয় স্বপ্ন; কিন্তু আমার পানসির নোঙর কে তুললে?

পানসির ভাড়া চুকিয়ে পরের দিনই কলকাতায় ফিরেছি। কাজ নেই আমার আর পানি বিহারে। আমি ‘ছিন্নপত্র’ই পড়ব।

[ ছোটোদের অমনিবাস, ওরিয়েন্ট লংম্যান লিমিটেড, ১৯৭৪ (প্রথম প্রকাশকাল অজ্ঞাত) )