জলজ্যান্তো ভূত – হীরেন চট্টোপাধ্যায়
ভূত নেই! কোন ভূতে একথা বলে র্যা?
কথাটা বলবার সময় একবার আড়চোখে তাকিয়ে ছিল টাকুমামা, তারপর আগের মতোই নিবিষ্ট মনে ফাঁকা মাঠে খালি হাতে স্কোয়্যার কাট মারার ভঙ্গি করতে লাগলো।
সত্যি কথা বলতে কী, মাঠে নেমে খেলতে-টেলতে আমরা বিশেষ দেখিনি টাকুমামাকে; সবই ওই শ্যাডো প্র্যাকটিস! ক্রিকেটের সময় ক্রিকেট, ফুটবলের সময় ফুটবল, এমনকী ওলিম্পিক বা এশিয়াডের সময় শ্যাডো বক্সিং পর্যন্ত করতে দেখেছি মামাকে আমরা। অবশ্য খেলাধুলো যে করবে, সময় কোথায় টাকুমামার! সারাটা বছর তো চরকির মতো ঘুরছে, স্থির হয়ে বসবার সময় পায় একটা দিন!
না না, তাই বলে যদি ভাবো টাকুমামা চাকরি-বাকরি করে কী ব্যাবসা- ট্যাবসা দেখে, তাহলে কিন্তু ভুল করবে। সেসব ও কিসসু করে না, অথচ ফুরসত যে কাকে বলে সেকথাও জানে না টাকুমামা। কী করে জানবে বলো, রাজ্যের সমস্ত দায় তো টাকুমামারই ঘাড়ে! কার জমি বেহাত হয়ে যাচ্ছে, বড়ো উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, কার অসুখে একজন বড়ো ডাক্তার দরকার, কার মেয়ে কলেজে ভরতি হতে পারছে না, তার একটা ব্যবস্থা করা— সব কিছুই তো টাকুমামার মাথাব্যথা। আজ এখন আমাদের সঙ্গে গল্প-টল্প করছে বটে, কিন্তু গত সাত-আটটা দিন কি একবারও টিকি দেখা গেছে টাকুমামার! কে দু-জন বন্ধু বাঁকুড়ায় কীসব কাজকর্ম নিয়ে গিয়েছিল, সঙ্গে ওই আদি অকৃত্রিম টাকুমামা। এমন লোক আর পাবে কোথায় বলো!
কীরে, বললি না, ভূত-টুত নেই বলে কে যেন লাফাচ্ছিল!
শ্যাডো প্র্যাকটিস করতে করতেই টাকুমামা একবার আমাদের দিকে ফিরল। কথাটা সত্যি যে বলেছিল— মানে ভোটকা, সে তখন মুখ কাঁচুমাচু করে বসে আছে। পেটে একটা আচমকা খোঁচা খেয়ে মুখ দিয়ে ক্যাঁক করে আওয়াজ করে বললে, বারে! বাবা-কাকা সবাই তো বলে ভূত-টুইঙ্কের বাজে কথা, সব আমাদের চোখের ভুল!
বটে! বাজে কথা? আমাদের চোখের ভুল! তাহলে পরশুদিন যে ব্যাপারটা ঘটল সেটা কী শুনি? টাকুমামা শূন্যে ব্যাট হাঁকড়ানো ছেড়ে এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল, বাঁকুড়ায় গিয়ে যে এবার স্বচক্ষে দেখে এলুম র্যা! বল সেটাও আমার চোখের ভুল?
দুর, ছাড়ো তো ওর কথা, তাড়াতাড়ি বলে উঠল ফটিক। কারণ সত্যিই বলুক আর মিথ্যেই বলুক, টাকুমামার গল্পগুলো শুনতে কিন্তু দারুণ লাগে। সেই জন্যেই তো আমরা টাকুমামার এত ভক্ত। আসলে টাকুমামা তো আমাদের কারোরই নিজের মামা নয়, পিকুর মামা— তা পিকু তো নড়েই না পড়ার ঘর ছেড়ে। তা সত্ত্বেও আমরা সবাই মিলে যে টাকুমামাকে আমাদের মামা বানিয়ে ফেলেছি সে কি আর অমনি অমনি! কাজেই এবার তিন-চার জন প্রায় একসঙ্গে বলে ফেললাম, বলো না টাকুমামা কী দেখলে স্বচক্ষে? ভূত!
সেই রকমই তো মনে হয়েছিল! কিন্তু ভোটকা আবার যখন এসব বিশ্বাস করে না—
ছাড়ো তো ওসব! বলো মামা, কী দেখলে বলো, রসিক বললে।
আড়চোখে একবার ভোটকার মুখটা দেখে নিল টাকুমামা, তারপর পাশের ভাঙা গাছের গুঁড়িটার ওপর জমিয়ে বসতে বসতে বললে, কথাটা অবশ্যি আমি এসে থেকেই তোদের বলবো বলবো ভাবছি, কারণ ব্যাপারটা আমার মাথাতেও ভালো ঢোকেনি। যত বারই ভাবতে যাচ্ছি, সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আসলে ওখানে গিয়ে দু-দিন ধরে প্রচণ্ড ঘোরাঘুরি হয়েছিল তো, শরীরটাও ছিল বেজায় ক্লান্ত। কাজেই সত্যিই সব ঠিকঠাক দেখেছি কিনা—
আঃ! পুটে অধৈর্য হয়ে বললে, তুমি বলোই না ব্যাপারটা গোড়া থেকে।
না না, গোড়া থেকে বলবার অতো সময় নেই আমার। বাঁকুড়ায় গিয়েছিলুম দুই বন্ধুর সঙ্গে, তোরা জানিস। তো, তিন দিনের দিন প্রচণ্ড ক্লান্ত শরীরে রাত দশটা নাগাদ গিয়ে হাজির হলুম একটা হোটেলে। তখন বিশেষ কিছু খুঁটিয়ে দেখবার মতো অবস্থা ছিল না আমাদের কারোরই, তবে এটুকু মনে আছে হোটেলের চেহারাটা মোটেই সুবিধের নয়। এমনিতে অবশ্য দোতলা বাড়ি, কিন্তু একেবারে আদ্যিকালের— চুনবালি খসে পড়ছে কোথাও, কোথাও ছোপ ছোপ স্যাঁতাপড়া দাগ। কিন্তু অত বাছবার সময় তো আর ছিল না তখন। রাতও হয়েছে অনেক, তার ওপর সারাদিন ঘুরে শরীরেও আর বিশেষ কিছু নেই। তাই আমি যদিও একটু কিন্তু কিন্তু করছিলুম, বন্ধুরা বললে মরি-বাঁচি এখানেই থাকবো, এখন আর নতুন করে হোটেল খোঁজা সম্ভব নয়।
অগত্যা ওখানেই উঠতে হল। মালিক বললে, খাওয়া-দাওয়াটা আগে সেরে নিন, নইলে বুঝতেই তো পারছেন, ছোটো হোটেল—
তা খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমাদের কারোরই তখন তত উৎসাহ নেই, আমরা চাই একটু শুতে। টেনে একটা ঘুম মারতে না পারলে কি আর পরের দিন কাজের ধকল সামলাতে পারবো! তাই নীচে যাহোক দুটো পেটে পুরেই ওপরে উঠলুম লম্বা হবার জন্যে।
কিন্তু বলবো কী তোদের, ঘর দেখেই আমার মনটা কেমন খিঁচড়ে গেল। ওদের জন্যে একটা ডাবল বেডের ঘর, সেটা তবু চলে যায়, কিন্তু আমার ঘরখানা কী! এ যে একেবারে গারদখানা! একে এই গরমের দিন, তার ওপর পিনপিন করে সাবেক আমলের যে ফ্যান ঘুরছে সেটার দিকে তো ঘণ্টাখানেক তাকিয়ে থাকতে হয় ঘুরছে কিনা বুঝবার জন্যে।
বললুম সেকথা মালিককে। বললুম, এর চেয়ে একটা শতরঞ্চি দিন, দিব্যি ছাদে চলে যাই, ফুরফুরে হাওয়ায় চমৎকার ঘুম এসে যাবে।
মালিক ভাবে বুঝি ঠাট্টা করছি আমি। সেও রাজি নয়, আমিও ছাড়ব না। শেষকালে বললে, দেখুন ছাদে শোওয়ার কথাই যদি বলেন তাহলে আর একটা প্রস্তাব দিতে পারি আপনাকে। ছাদে একখানা ঘর তুলছি, সেটা সবে প্লাস্টার করা হয়েছে আজ। জানলা দরজা বসেছে, ঘরটাও বড়ো, তবে ইলেক্ট্রিকের কাজ-টাজ কিছু হয়নি। এই অবস্থায় যদি শুতে পারেন-
প্রস্তাবটা একেবারে লুফে নিয়ে আমি বললুম, আরে চলুন তো মশাই! এই গুমোট গরমে আপনার গারদঘরে পচে মরার চেয়ে তিনতলার অন্ধকার ঘর অনেক ভালো। রাত্তিরে আবার আলো কী হবে!
কথাটা যে নেহাত মিথ্যে বলিনি, ওপরে উঠেই টের পেলুম সেটা। হালকা তোশকের ওপর চাদর আর একটা সস্তামার্কা মশারি— ব্যস। গা ঠেকিয়েছি কি ঠেকাইনি, দু-চোখ জুড়ে এল একেবারে সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু সে আর কতক্ষণ! হঠাৎই ঘুমটা ভেঙে গেল আচমকা!
চুপ করলে টাকুমামা। বিকেলে খেলতে এসে টাকুমামার দেখা পেয়েছিলাম। গরমের দিন, তাও এখন সন্ধে হয়ে এসেছে— এক্ষুনি না উঠতে পারলে কপালে অনেক দুর্ভোগ আছে। তবু দেখি কারোরই ওঠার বেশি গা নেই। সন্টে বললে, সেকী টাকুমামা, ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেল কেন?
আরে সেইটাই বুঝতে পারিনি রে প্রথমে। টাকুমামা রহস্যময় হাসি হেসে বলল, মনে করছিলুম স্বপ্ন দেখছি বুঝি। এমন সময় গায়ে যেন ছপাৎ করে জল এসে পড়ল খানিকটা। বারকতক এইরকম হতেই ঘুমজড়ানো চোখে ধড়মড় করে উঠে বসতেই বোঝা গেল সেটা স্বপ্ন নয়।
কেন, কেন? মুহূর্তের অবকাশ সহ্য করতে পারেনি রসিক, কী দেখলে তুমি?
কী করে আর দেখব, আলো ছিল ওপরে! একটা মোমবাতি রেখে গিয়েছিল মালিক, সে তো শোবার সময়ই নিবিয়ে রেখে দিয়েছি। তবে দেখার অবশ্য দরকার ছিল না, ততক্ষণে বালিশ বিছানা সব একেবারে ভিজে সপসপ করছে।
সেকী! সত্যি সত্যি জল? ভোটকা থাকতে না পেরে বলে উঠেছে।
জল! শুধু বিছানা নয়, আমার গা নয়— উঠে মোমবাতি জ্বেলে দেখি ঘরের মেঝে, দেওয়াল, এমনকী ছাদে পর্যন্ত জল। জল সেখান থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে তখনও।
বৃষ্টি-ফিস্টি হয়নি তো! আমি বলে ফেলেছি।
আমিও তো সেটাই ভেবেছিলুম। জানলা-টানলা সব খোলা ছিল তো! টাকুমামা বললে, কিন্তু মোমবাতি হাতে ছাদে এসেই ভুল ভাঙল। বৃষ্টি কোথায়, আকাশে দিব্যি একেবারে তারা ফটফট করছে। আর তার চেয়েও বড়ো কথা, সমস্ত ছাদ তো শুকনো খটখটে, যত জল তো সব আমারই ঘরের মধ্যে।
ভালো করে ঘুমের ঘোর কাটেনি তখনও, ভাবলুম ঠিক দেখছি তো! নাকি এখনও সেই স্বপ্নের মধ্যেই রয়েছি! না, তাই বা কী করে হবে! ওই তো রাতের আকাশ, খোলা ছাদ, মোমবাতি হাতে আমি।
মাথার ভেতরটা কেমন ঝিমঝিম করছিল। ঘড়ি দেখলুম, বারোটা বেজে গেছে। এই সময় নীচে নেমে বন্ধুদের ডাকলে নির্ঘাত ওরা আমাকে ভীতু ভাববে। তা ভাবুক, ভূতের ভয় থাকুক আর না-ই থাকুক, জলের উপদ্রব সামলাবার জন্যে নীচে তো আমাকে যেতেই হবে। মেঝেয় এইরকম জলের সমুদ্র নিয়ে তো আর কেউ শুয়ে থাকতে পারে না!
ছাদের দরজা মালিক যাবার সময় ওদিক থেকে বন্ধ করে গিয়েছে। জানি না আওয়াজ করলে ওদের ঘুম ভাঙবে কিনা, কিন্তু চেষ্টা তো করতে হবে!
দরজায় ধাক্কা দিতে গিয়েই বুঝতে পারলুম সেটা আলগা, ঠেলতেই খুলে গেল। আর তারপরই যা দেখলুম, বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল আমার।
দরজার ঠিক পেছনটিতেই দাঁড়িয়েছিল সে! একেবারে ছায়ামূর্তির মতো, নিঃশব্দে।
না, মেয়েটার বয়স বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল না। চোখগুলো কোটরে ঢুকে গিয়েছে, রুক্ষ চুল উড়ছে মাঝে মাঝে। চোখে চোখ পড়লেই কেমন শিরশির করে ওঠে বুকের ভেতরটা।
সত্যি কথা বলতে কী, বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়েছিলুম কিছুক্ষণ ওই অবস্থাতেই। সংবিৎ ফিরতেই বন্ধুদের নাম করে চিৎকার করে ডেকে উঠলুম।
এতক্ষণ একেবারে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়েছিল মেয়েটা। আমাকে ওইভাবে এসে দাঁড়াতে দেখেও কিচ্ছু বলেনি। এবার আমি চিৎকার করার পর প্রথম ওর ঠোঁট দুটো নড়তে দেখলুম। ফিসফিস করে কথা বলছিল, কিন্তু আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলুম। ও বললে, ছাদে গিয়ে দাঁড়ান বাবু, আপনার বিছানা আমি পালটে দিচ্ছি।
মানে? গায়ে জল ঢেলেছ তাহলে তুমি?
হ্যাঁ, বাবু, আমিই ঢেলেছি।
আশ্চর্য তো! ঘরে জল, বিছানায় জল-
আপনি ভাবলেন বুঝি ভূতপেরেতের কাজ, তাই না? তা লয়, আমিই ঢেলেছি বটে। আপনি যে ঘরে ছিলেন আমি জানবো কেমন করে বলুন! মেনেজারবাবু তো বলেনি আমাকে!
তুমি হঠাৎ জলই বা ঢালতে যাবে কেন! পাগল নাকি তুমি!
পাগল হব কেনে! মেনেজারবাবু যে বলেছিল, পেলেস্টার হইছে, কামিনী, তু ভালো করে জল ছিটাই দিবি। তা কাজ সারা হতে তো রাত হয় বাবু, তাই দিলোম এখন দু-বালটি জল! এই নিন বাবু গামছা, আপনি গাটো মুছে ফেলান, আমি ঘর নিকায়ে বিছানা পালটে দিয়ে যাচ্ছি।
না, শুধু বলা নয়, পালটেও দিল। সবে গা-টা মুছেছি কি মুছিনি, ঘর একেবারে ঝকঝকে তকতকে হয়ে গেল। আর তারপর যা ঘুম একখানা হল না! বুঝলি রসকে, ভাঙল একেবারে সকাল আটটা নাগাদ।
চুপ করল টাকুমামা। তারপর যেন হঠাৎই খেয়াল হয়েছে এইভাবে বললে, দেখেছিস কাণ্ড, চল, চল, রাত হয়ে গেল যে রে! ইস, এতক্ষণ তোদের
তুমি থামো তো! গলা বেরোল ভোটকার এবার, প্রায় সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, এটা কী হল শুনি?
কোনটা?
এই গল্পটা! ভোটকার মুখে ব্যঙ্গের হাসি আমরা অন্ধকারেও দেখতে পাচ্ছি। এটা ভূতের গল্প হল?
হল না?
ছাই হল! এটা হল হাসির গল্প।
আমিও তাই ভেবেছিলুম, একটু অন্যমনস্কভাবে অন্য দিকে তাকিয়ে টাকুমামা বলল, ভুলটা ভাঙল দুপুরের খাওয়া সেরে হোটেল ছেড়ে চলে আসবার সময়।
কেন, কী হল তখন?
ম্যানেজারবাবুকে রাতের ব্যাপারটা সব খুলে বললুম, মানে একটু ধন্যবাদ জানানোর জন্যে আর কী! তখন তিনিই বললেন কথাটা।
কী কথা?
কামিনী সেই হোটেলে ঢুকেছিল তিরিশ বছর আগে, মানে হোটেলটা যখন খোলা হয় প্রথম। বছর দশেক আগেই সে মারা গেছে, গলায় ফাঁস লাগিয়ে।
[ শুকতারা, আষাঢ় ১৪০২ (জুন ১৯৯৫) ]
