তুতুলের মা – সুকুমার ভট্টাচার্য
অবনীর চাকরি হাওড়াতে। একটা নামকরা কারখানায়। আটটা-পাঁচটা ডিউটি। বাড়ি থেকে বার হয় সেই সাত সক্কালে। ফেরে বিকেল ছ’-টার তারকেশ্বর লোকালে। শ্যাওড়াফুলিতে নেমে বাড়ি পৌঁছোতে পৌঁছোতে সন্ধ্যে উতরে যায়।
স্টেশন চত্বর ছেড়ে রাস্তায় একটু হাঁটলেই পড়ে বংশীর চায়ের দোকান পাড়ারই ছেলে। লেখাপড়া করেছে। চাকরি-বাকরি তেমন না পেয়ে চায়ের দোকান দিয়েছে রাস্তার ধারে। অবনী প্রতিদিন সন্ধ্যেয় ট্রেন থেকে নেমে ঢোকে বংশীর চায়ের দোকানে। এক কাপ নিয়ে একটু বসে। এটা-ওটা কথা হয়। তারপর উঠে পড়ে।
সেদিন বংশীর দোকানে যেতেই বংশী বললে, ‘থাক, আজ আর বসতে হবে না অবনী। বাড়ি চলে যা। ছেলেটাকে নিয়ে তোর মা খুব অস্থির হয়ে পড়েছেন। তোর বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় ঘরবার করছেন দেখে এসেছি।’
‘সে কী! কী হল আবার?’ ব্যস্ত হয়ে উঠল অবনী।
‘তেমন মারাত্মক কিছু না। ব্যাপারটা সামলে গেছে। না হলে বেশ ভালোই ঝামেলা বাধতো।’
‘মানে?’
‘মানে আর কী? দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর, তোর মা ছেলেটাকে নিয়ে একটু শুয়ে ছিলেন। বুড়ো মানুষ, যাকে বলে একটু চোখ লেগে গেছিল আর কী! সেই ফাঁকে ছেলে একেবারে বিছানা ছেড়ে বাইরে। বাইরে মানে, একেবারে বাড়ির বাইরে। তোদের বাড়ির সামনে রঞ্জিতবাবুদের জমিটায় যে ফ্ল্যাট বাড়িটা উঠছে— তার ইট এসেছিল এক লরি। মাল খালাস করে মজুররা গেছিল চা খেতে। বোধহয় দুলু ঘোষের দোকানে। এর ফাঁকে তোর ছেলে গিয়ে চড়ে বসেছে লরির পেছনে। তারা তো কিছুই জানে না। বেশ কিছু দূর চলে যাবার পর দেখে, একটা বাচ্চা বসে। মহা বিপদ! কাদের ছেলে, কোথা থেকে এল, কী ঠিকানা— হাজার জিজ্ঞাসা। ছেলে কিছুই বলতে পারে না।’
‘তারপর?’ রুদ্ধশ্বাস অবনী।
‘এদিকে তোর মা চোখ খুলে দেখেন, ছেলে নেই। এঘর-ওঘর, দালানে না পেয়ে হইচই ফেলে দিলেন। নীচের ভাড়াটেদের ছেলে-বউরা গিয়ে তাঁকে সামাল দেয়। এদিকে হইচই পড়ে যায় পাড়ায়। খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে যায় চারদিকে। কোথাও না পেয়ে সবার মুখই আমসি। তুই ফিরলে, তোর মা মুখ দেখাবেন কী করে— এই ভেবে শুরু করে দিলেন কান্না। এমন সময় সেই লরি এসে হাজির। তখন দেখা গেল, তোর ছেলে সেই লরি থেকে নামছে। বলছে, এটাই আমাদের বাড়ি। পাঁচজনকে জিগ্যেস করে লরি ড্রাইভার নিশ্চিন্ত হয়ে, ছেলেকে তোর মায়ের হাতে তুলে দেয়।’
‘বলিস কী, এত কাণ্ড হয়ে গেল?’
‘হ্যাঁ। এখন যত তাড়াতাড়ি পারিস বাড়ি যা। তোকে দেখলে তোর মা হয়তো একটু সুস্থির হবেন।’
অবনী নেমে পড়ল দোকান থেকে। প্রতিদিনকার মতো হাঁটতে আর ভালো লাগল না। একটা রিকশা ধরে নিল। মনটা ভারী হয়ে উঠেছে। মাথা ঘুরতে লাগল সব কথা ভেবে। এখনও দু-মাস হয়নি বিশ্রী অঘটন ঘটে গেছে বাড়িতে। বীণা, মানে তুতুলের মা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। আবার এরই মধ্যে সবার চোখ এড়িয়ে ছেলেটা নিপাত্তা হয়ে যাবার দাখিল হয়েছিল।
অঘটনের সেই দিনটা ছিল সোমবার। আগের দিন ছিল রবিবার, অফিস ছিল না। অনেকদিন ধরেই বীণা বলে আসছিল, ‘বারান্দার আলোটা জ্বলছে না। ওটা ঠিক করে দাও।’ কিন্তু অবনীর আর সময় হয় না সারাবার। সেদিন কী মনে হল, আড্ডা দিতে না বেরিয়ে, বারান্দার গোটা ওয়ারিংটাই বদলে দিয়েছিল। অনেকদিনের কিছু পুরোনো তার ছিল, তাই দিয়েই করে দিয়েছিল। সেই তারে নিশ্চয় কোথাও কিছু গোলমাল ছিল। পরের দিন অবনী অফিস বেরিয়ে যাবার পর, বীণা চানটান সেরে ভিজে কাপড় শুকোতে দিতে গেছিল। ভিজে কাপড়ের ছোঁয়া লাগে সেই তারে। সঙ্গেসঙ্গে শক খেয়ে আছড়ে পড়ে বারান্দার রেলিং-এর ওপর।
সাবেক কালের পুরোনো বাড়ির রেলিং, বীণার শরীরের ভার নিতে পারেনি। হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। সবেগে নীচের দিকে মাথা করে বীণা গিয়ে আছড়ে পড়ে নীচের উঠোনে। অফিসে টেলিফোন পেয়ে ছুটে আসে অবনী। বাড়ি ফিরে দেখে সব শ্রেয়। বীণা আর নেই।
তারপর দিন যায়। পারলৌকিক কাজকর্মও মিটে যায় এক সময়। অবনী তার মায়ের ওপর ছেলে তুতুলের সব ভার দিয়ে, আবার অফিস করতে শুরু করে। দিন একরকম চলে যাচ্ছিল। তারপর এই এক ব্যাপার ঘটল। তুতুল যদি সত্যি সত্যিই আর না ফিরতো, তাহলে কি হত? উঃ ভাবতে পারে না অবনী!
মাকেও কোনো দোষ দেওয়া যায় না। ছেলেরা, এমনিতেই একটু বেশি মাত্রায় দস্যি হয়। আর মায়েরও যথেষ্ট বয়েস হয়েছে। তিন-চার বছরের দস্যির দস্যিপনার সামাল দেওয়া রীতিমতো কষ্টকর তাঁর পক্ষে। কী যে করা যায়!
বাড়ি পৌঁছে ক্লান্ত শ্লথ গতিতে উঠে গেল দোতলায়। একেবারে নিজের ঘরে। তাকে দেখে তুতুল হইচই করে ছুটে এল। ঝাঁপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরল। অবনী গিয়ে বসল সোফা কাম বেডটার ওপর। তুতুল কলবল করে বলল, ‘জানো বাপি, আজ কি হয়েছে?’
অবনী গম্ভীরভাবে বলল, ‘জানি। আমি কোনো কথা বলব না তোমার সঙ্গে। অনেকবার বলেছি, ঠাকুমার বয়েস হয়েছে। একা সব দিক সামলাতে পারেন না। তার ওপর তুমি যদি অমন এক একটা ঝামেলা পাকাও, তাহলে উনি কী করবেন?’
‘বাঃ রে! আমি তো ঘুমিয়েই ছিলাম।’
‘ঘুমিয়ে আর রইলে কোথায়?’
অবনীর কথার ভাব দেখে থমকে গেল তুতুল। চোখ ছল ছল করে উঠল। সোজা গিয়ে গড়িয়ে পড়ল বিছানায় বাপির ওপর অভিমানে।
অবনীর মা এসে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘শুনেছিস, আজ কী হয়েছে? অবনী ঘাড় নেড়ে বললে, ‘শুনেছি। প্রতিদিন এরকম কিছু-না-কিছু ঘটতে থাকলে, আমায় চাকরি-বাকরি ছেড়ে ঘরেই বসে থাকতে হবে।’
এ কথার আর কী জবাব আছে! চুপ অবনীর মা। চুপ অবনী। অনেক পরে মা বললেন, ‘তোকে একটা কথা বলব?’
মায়ের গলায় একরাশ কুণ্ঠা। অবনী তাকাল তাঁর দিকে। মা বললেন, ‘কথাটা বেশ ক-দিন ধরে বলব বলব করছি। বলে উঠতে পারিনি। বউমার ব্যাপারে তোর কী মনে হয়?’
অবাক অবনী। বলে, ‘বউমার ব্যাপারে।’
‘হ্যাঁ।’
‘কই তেমন কিছুই তো মনে হয় না। তুমি কী বলতে চাইছ?’
‘হাজার হলেও অপঘাতে মৃত্যু তো?’
‘হ্যাঁ, তা কী হয়েছে?’
‘না, এমন কিছু হয়নি।’ বলে একটু ইতস্তত করেন অবনীর মা। তারপর সরাসরি জিগ্যেস করেন, ‘সত্যি কথা বল তো, তুই কি কোনোদিন বউমাকে দেখেছিস? একা ঘরে ছেলেটাকে নিয়ে তো রাত কাটাস!’
সঙ্গে সঙ্গে মুখটা যেন কেমন হয়ে গেল অবনীর। মাথা নেড়ে বললে, ‘না তো! কেন, তুমি দেখেছ নাকি তাকে?
মাথা নাড়লেন মহিলা, ‘না দেখিনি, তবে—’
‘তবে কী?’
‘সারা দিন তো প্রায় একা একাই থাকি ছেলেটাকে নিয়ে। সময়ে অসময়ে কেমন যেন মনে হয়। মনে হয়, তারই মতো কেউ যেন এঘর-ওঘর করছে। অনেকদিন ধরেই লক্ষ করছি। তোকে বলব বলব করেও বলিনি।’
‘ওঃ এই কথা!’ স্বস্তি বোধ করল অবনী, ‘ও তোমার মনের ভুল। অনেক দিন তো একসঙ্গে ছিলে, তাই মনে পড়লেই মনে হচ্ছে, সে ঘরের মধ্যেই আছে।’
‘তাই কি!’ বলে ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন অবনীর মা, বললেন, ‘কিন্তু সেই গন্ধটা!’
‘গন্ধ!’ আবার চোখ বড়ো বড়ো হল অবনীর।
‘হ্যাঁ, গন্ধ। বউমা মাথায় কী যেন একটা তেল মাখত, সেই গন্ধটা। মাঝে মাঝে ঘরে ঢুকলেই, সেটা পাওয়া যায়। ঘরের বাতাস একেবারে ভারী।’
‘সে-ও একটা অভ্যাসের ব্যাপার!’ উড়িয়ে দেয় অবনী, ‘আগে পেতে গন্ধটা, তাই এখনও মনে হয় পাচ্ছো। ও কিছু নয়, মনের ভুল।’
‘ভু-ল!’ চুপ করে গেলেন অবনীর মা। রান্নাবান্না পড়ে আছে। উঠে গেলেন তিনি।
অনেক রাত্তিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে অবনী ঘরে ঢুকল। দেখল, কোলবালিশের ওপর পা তুলে দিয়ে তুতুল ঘুমোচ্ছে। আগেও ওইভাবে মায়ের গায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে ঘুমোত। অভ্যেসটা যায়নি। অপলকে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অবনী। এক সময় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার পাশে শুয়ে পড়ে। আর ঠিক সেদিনই, ‘মা মা’ করে ককিয়ে কেঁদে উঠল তুতুল।
ঘুম ভেঙে গেল অবনীর। ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। সঙ্গে সঙ্গে কে যেন চকিতে উঠে পড়ল তুতুলের পাশ থেকে। দ্রুত নেমে দাঁড়াল মেঝের ওপর। আচমকা একটা শিরশিরানি বয়ে গেল সারা শরীরে। ‘কে. আপনি?’ গোছের কিছু-একটা জিগ্যেস অারবার এক লাগেই ছায়ামূর্তির মতো অস্পষ্ট অবয়বটা মিলিয়ে গেল। সমস্ত ঘরটা তখন জুঁই ফুলের গন্ধে ম-ম করছে।
কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল অবনী। মনে হলো, সে কি কিছু ভুল দেখেছে? সত্যিই কি কেউ বসেছিল তুতুলের পাশে? যখন ভাবছে, ঠিক তখনি তার নাকে এসে পৌঁছোল একটা গন্ধ। অবনীর মনে হলো, হ্যাঁ ঠিক, এই গন্ধটাই বীণার মাথা থেকে পাওয়া যেত। কী যেন নাম, সেই তেলটার? ওই মুহূর্তে মনে এল না। কিন্তু মনে পড়ল মায়ের কথা। মা এই গন্ধটার কথাই বলেছিলেন সন্ধেবেলা।
হাসি মুখে তাকিয়ে আছে বীণা।
সে আমল দেয়নি।
বিছানা ছেড়ে নেমে পড়ল অবনী। পায়ে পায়ে বাইরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রাত শেষ হয়ে এসেছে। তবুও মাথার ওপর তারাভরা আকাশ। চারপাশের ঘরবাড়ি সব নিঝঝুম। অনেকদিন পর নতুন করে মনে পড়ল বীণাকে। কি জানি কেন, তার মনে হল, বীণা যায়নি কোথাও। সে হয়তো এখানেই আছে।
পুব আকাশ আলো করে দিবাকরের আগমন প্রকট হল। অবনী হাত-মুখ ধুতে কলতলায় নেমে গেল। চোখে-মুখে জল দেওয়ার পর সচেতন মন আবার সক্রিয় হয়ে উঠল। গত রাতের ঘটনাটাকে আর কিছুতেই বুদ্ধি দিয়ে মেনে নিতে পারে না। যে নেই, তার উপস্থিতির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ভাবনাটাকে বাড়তে দেওয়া মানেই, নিজের দুর্বলতাকে প্রকট করে তোলা।
এই ভাবনায় সকালটা প্রায় গুম হয়ে রইল সে। পরে সময় হলে চান-খাওয়া করে অফিস বেরিয়ে গেল। বেরোবার সময় শুধু বলে গেল মাকে, ‘তুতুল রইল। একটু সজাগ থেকো। আর হ্যাঁ, সেই গন্ধটন্ধ কী যেন পাও বলেছিলে, দেখো তো সে সব পাও কিনা?’
সারাটা দিন একটা উদ্বিগ্ন মন নিয়ে কেটে গেল। কোনো কাজেই তেমন মন লাগে না। ছুটির পরেই বেরিয়ে পড়ল বাড়ির দিকে। ট্রেন থেকে নেমে প্রতিদিনকার মতো ঢুকল বংশীর চায়ের দোকানে। যদি কোনো খবর থাকে, সেটা বংশীই কানে তুলে দেবে। কিন্তু না, বংশী কোনো কিছুই বলল না। নিশ্চিন্ত হল অবনী। তাহলে বলার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। চা খেয়ে নিশ্চিন্ত মনে পথে নেমে পড়ল সে।
বাড়িতে ঢোকার কিছু পরেই কিন্তু মায়ের অভিযোগ পেল। সেই একই ব্যাপার। তুতুল সেদিন দুপুরেও ঠাকুমাকে কিছু না জানিয়ে চুপি চুপি বেরিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছিল বাড়ি থেকে। খাওয়ার পর অবনীর মা তাকে নিয়ে একটু শুয়েছিলেন। যথারীতি আর চোখ লেগে গেছিল। এক সময় জেগে ওঠে তুতুল। কোনোরকম শব্দ না করে, পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে যায়। কিন্তু ভাগ্যি ভালো নীচের ভাড়াটেদের এক বউয়ের চোখে পড়ে যায়। মহিলা সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। বলেন, ‘এই ভরদুপুরে কোথায় যাচ্ছিস রে তুতুল?’
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ছেলে। বলে, ‘মার কাছে।’
বুক ধড়াস করে ওঠে মহিলার, বলেন, ‘মার কাছে! সেকী, কোথায় তোর মা?’
‘ওই তো।’ বলে ছেলে সদর দরজা দেখিয়ে দেয়।
সে বউ বড়ো বড়ো চোখ করে তাকায় সদর দরজার দিকে। কোথায় কে? দুপুরের কাঠফাটা রোদে চারদিক তখন জ্বলছে। বিস্ময় কাটিয়ে মহিলা তখন বলেন, ‘ঠিক আছে, বিকেল হোক, তখন যাস। এত রোদে কেউ বাড়ির বার হয় না।’
বলে তাকে নিয়ে গিয়ে হাজির করলেন দোতলায়। ঠাকুমার কাছে। বলেন, ‘কাকিমা, এবার তোমার দুপুরের শোয়া ছাড়ো। এই দ্যাখো, ছেলে আজও ফাঁকতালে বেরিয়ে যাচ্ছিল বাড়ি থেকে।’
শুনে গুম হয়ে গেল অবনী। একটা অসহায় ভাব ফুটে উঠল তার মুখে। ঠাকুমার পিছু পিছু এসে তুতুলও দাঁড়িয়েছিল। তাকাল তার দিকে অবনী। সরল শিশু সোজা মনে বলে দিয়েছে, মায়ের কাছে যাচ্ছিল। কিন্তু সেটা যে অসম্ভব, সে জানেই না। তবু একটা প্রশ্ন রয়েই যায়, ওর মা কি সত্যিই এসেছিল? তুতুল কি সত্যিই দেখতে পেয়েছিল তার মাকে?
এরকম হাজার প্রশ্ন মাথা চাড়া দিল অবনীর মনে। কাল রাত্তিরের ঘটনাটা নতুন করে মনকে নাড়া দিয়ে গেল। কাল রাত্তিরেও তো প্রায় অমনি ব্যাপার ঘটেছিল।-তুতুলের দেখা কিংবা বলায় হয়তো ভুল আছে, কিন্তু অবনীর দেখায় কি কিছু ভুল ছিল? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে অবনী।
রাত্তিরে খাওয়া-দাওয়ার পর শুতে গেল অবনী। এটা-ওটা কথার পর সরাসরি তুতুলকে জিগ্যেস করে, ‘হ্যাঁরে তুতুল, আজ নাকি তোর মা এসেছিল দুপুরে?’
তুতুল বলে, ‘মা তো রোজই আসে দুপুরবেলায়। ঠাকুমা যখন ঘুমোয়!’
‘তাই নাকি। তুই ঠিক দেখেছিস তো?’
‘হ্যাঁ।’
রুদ্ধশ্বাস প্রশ্ন অবনীর, ‘না কি তোকে ডেকেছিল?’
‘না।’ মাথা নাড়ে তুতুল, ‘আমিই যাই মার কাছে। কিন্তু ধরতে পারি না। মা পালিয়ে যায়।’
চুপ অবনী। তুতুলের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। হঠাৎ একটা কিছু মনে হতেই বলে, ‘হ্যাঁরে তুতুল—’
তুতুল ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু অবনীর চোখে আর ঘুম আসে না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে চোখ পড়ল দেওয়ালে। বীণার এনলার্জ করা ফটোটার ওপর একটা শুকনো মালা ঝুলছে ছবিটাতে। হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে বীণা। উঠে বসল অবনী। অনেকক্ষণ অপলকে তাকিয়ে থাকার পর অস্ফুটে একটা কথাই বার হয়ে এল তার মুখ দিয়ে- তুমি হাসছ! ভাবতে পারো আমাকে কী বিপদে ফেলেছ? তুমি কী কিছুই পারো না! যাতে আমি একটু স্বস্তিতে থাকতে পারি?’
এ কথাটা শেষ হওয়া মাত্র এক ঝলক এলোমেলো হাওয়া জানলা দিয়ে এসে আছড়ে পড়ল ঘরের ভেতর। তার পরেই সেই গন্ধ। সেই জেসমিন হেয়ার অয়েলের সুবাস। বিস্ময়ে অবনীর দেহ-মন যেন অবশ হয়ে এল। পরদিন মাকে সব কথা খুলে বলল অবনী।
‘দেখো, এসব কথা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু কি জানি কেন, আমার মনে হয় তুতুলের মায়ের ব্যাপারটা খুবই রহস্যজনক। আমার ধারণা, মানুষ মারা যাওয়ার পর তার কোনো অস্তিত্বই থাকে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা দেখছি উলটো। তুমি সেদিন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে, আমি তাকে দেখতে পাই কিনা? বলেছিলাম না, কিন্তু আজ বলছি, ওই গন্ধের ব্যাপারটা আমি টের পেয়েছি। ওই তেলটা বীণা ব্যবহার করত। জেসমিন হেয়ার অয়েল।’
শুনে গম্ভীর হলেন অবনীর মা। বললেন, ‘কি জানি, কাজকর্ম তো ভালোভাবেই করেছি। তবু কেন যে এমন হচ্ছে, কিছু মাখায় ঢোকে না।’
‘তার উদ্দেশ্যটাই বা কী? বার বার এভাবে তুতুলকে দেখা দেওয়া বা ডাকা— আমার মোটেই ভালো মনে হচ্ছে না। আর সে ছেলেও বেরিয়ে পড়ছে বাড়ি থেকে।’
মাথা নাড়লেন অবনীর মা, ‘না, আমিও এর মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না। তবে—’
অবনীর মা হঠাৎ থেমে গেলেন। অবনী তাঁর দিকে তাকাতে বললেন, ‘তবে ছেলে-মেয়ের ওপর মায়েদের একটা টান থাকে। হয়তো ছেলেটার টানেই বার বার ছুটে আসে দেখতে!
‘তাও কি সম্ভব?’
‘জানি না। কিন্তু একটা জিনিস ভেবে দেখ, মা মারা গেলে, বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা কত অসুখ-বিসুখে রাজভোগের পর সিমায়ের কথা ভেবে ভেবে হেদিয়ে পড়ে। সেদিক থেকে আমাদের ছেলে কিন্তু ভালোই আছে।’
‘হুঁ। এক পালাই পালাই ভাব ছাড়া, ও কিন্তু আমাদের অন্য কোনো অসুবিধেয় ফেলেনি।’
এর পর আর কথা হয়নি। অফিস বেরোতে হবে। উঠে পড়ে অবনী।
গতানুগতিকভাবে কটা দিন পার হয়ে গেল। এমন কিছুই ঘটেনি যা নিয়ে উৎকণ্ঠা বা ভাবনা হতে পারে। অবনী ও অবনীর মা অনেকটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন।
কিন্তু একদিন, তখন বেলা বারোটা-সাড়ে বারোটা হবে, হঠাৎ বেয়ারা এসে বলল, ‘অবনীবাবু, আপনার ফোন।’
বুকটা ধড়াস করে উঠল অবনীর। তাড়াতাড়ি গিয়ে রিসিভারটা কানে তুলতেই, পেল বংশীর গলা, ‘কে বলছেন? অবনী ঘোষকে একবার দিন না।’
‘হ্যাঁ, আমি অবনী বলছি।’
‘এই আমি বংশী বলছি। শেওড়াফুলি থেকে। তুই এখুনি বাড়ি চলে আয়। না না, বিপদ তেমন কিছু হয়নি। সামলে গেছে। কিন্তু মাসিমা, হ্যাঁ, তোর মা খুব ভেঙে পড়েছেন। তোর এখুনি বাড়ি আসা দরকার।
‘হলোটা কী?’
‘ফোনে অত কথা বলা যায় না। তুই চলে আয়, আমি দোকানে তোর জন্যে অপেক্ষা করছি।’
এমন কি হল যার জন্যে অফিসে ফোন? উদ্বেগে অস্থির হয়ে উঠল অবনী। ছুটি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু পথ তো কম নয়। যাই হোক, এক সময় গিয়ে পৌঁছোল শেওড়াফুলি। স্টেশন থেকে বেরোতেই দেখল, বংশী।
‘তোর জন্যেই অপেক্ষা করছি।’
‘বুঝতে পারছি। তা কী ব্যাপার?’ কৌতূহল আর উদ্বেগ অবনীর গলায়।
‘না, তেমন কিছু নয়। তবে হলে আর রক্ষে ছিল না। তোর বউয়ের যে দশা ঘটেছে, প্রায় তেমনি ব্যাপার। দোতলার যে জায়গাটায় সেই অঘটনটা ঘটেছিল, ঠিক সেই জায়গাটায় গিয়েই, ছেলেটা পড়ো পড়ো হয়েছিল দোতলার বারান্দা থেকে।’
‘ব-বলিস কী রে!’ চোখ বড়ো বড়ো হয়ে উঠল অবনীর, ‘তারপর?’
‘অত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। বলেছি তো, অবস্থাটা সামলে গেছে এবারের মতো। বারান্দাটার ওই ভাঙা জায়গাটা আজ পর্যন্ত সারাসনি। বাচ্চা ছেলে নিয়ে ঘর। কখনো অমন করে রাখে?’
মনে মনে ত্রুটি মেনে নেয় অবনী। পথ চলতে চলতে বংশী বলে, ‘বেলা এগারোটা নাগাদ রান্নাবান্না সেরে তোর মা তুতুলকে বলেন চান করে আসতে। কিন্তু সে ছেলে বলে, মা চান করাবে। ঠাকুমার কাছে সে চান করবে না। একেবারে জিদ ধরে বসে। তখন তিনি জোর করে জামা- প্যান্ট ছাড়িয়ে, তেল মাখিয়ে কলঘরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ছেলে কিছুতেই যাবে না। তিড়িং-বিড়িং লাফায় আর ঠাকুমা জোর করে টেনে নিয়ে যান। বারান্দার ওই ভাঙা জায়গাটার পাশ দিয়ে যাবার সময়, তুতুল ঠাকুমার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে পালাবার চেষ্টা করে। কিন্তু যাবে কোথায়? সামনেই তো সেই রেলিং-ভাঙা জায়গাটা। টাল সামলাতে না পেরে সেখানেই গিয়ে পড়ল মুখ থুবড়ে। কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত অংশটা বারান্দার বাইরে। মাথাটা নীচের দিকে। তোর মা খুব জোরে একটা পা চেপে ধরেছিলেন দু-হাত দিয়ে। শুরু করে দেন পরিত্রাহি চিৎকার। বাঁচাও, বাঁচাও!
‘আওয়াজ শুনে নীচের ঘরের মেয়ে-বউরা বেরিয়ে পড়ে। দেখে ওই অবস্থা। তারা সঙ্গে সঙ্গে দুদ্দাড়িয়ে উঠে আসে ওপরে। চেপ্-পে ধরে তুতুলের পা দুটো। তারপর আস্তে আস্তে টেনে তোলে বারান্দার ওপর! ওঃ, কী বিপত্তি হত বলতো, যদি না তোলা যেত ছেলেটাকে?
ঘটনার বিবরণ শুনে পা যেন আর চলতে চায় না। অনেক পরে কোনোরকমে জিগ্যেস করে, ‘এখন কী অবস্থা?
‘এখন আর কি, সবই ঠিক আছে। কিন্তু তোর মা খুব মুষড়ে পড়েছেন। খাওয়াদাওয়া করেননি। মুখ গুঁজে শুয়ে আছেন বিছানাতে। ছেলেটাকে অবশ্য খাইয়ে দিয়েছে নীচের ঘরের বউরা। তিনি শুধু একটা কথাই জিগ্যেস করেছেন সবার কাছে, ছেলেটা অমন অদ্ভুত বায়না ধরল কেন? মায়ের কাছে চান করব। মা-যে অনেকদিন নেই— সেটা তো সে জানেই। তা এ কথার কি উত্তর দেবে লোকে?
অবনীরও সেই একই জিজ্ঞাসা। হঠাৎ এমন বায়নায় পেয়ে বসল কেন তুতুলকে? তবে কি বীণা আবার দেখা দিয়েছিল তাকে? এ কথা বলা যায় না বংশীর কাছে। চুপ করে চলতে লাগল সে বংশীর পাশে পাশে।
বাড়ি পৌঁছোতে অনেকেই এগিয়ে এল। যে যেমনভাবে পারল, ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেল। বলতে গেলে সে এক কলরব। বিশেষ করে তারা, যারা উদ্ধারের কাজে এগিয়ে এসেছিল। অবনী চুপ করে সব শুনল। সকলকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে উঠে গেল দোতলায়। বসল গিয়ে নিজের ঘরে।
তুতুল ঘুরঘুর করছিল ঘরের ভেতরেই। এক সময় ডেকে জিগ্যেস করল, ‘হ্যাঁরে, কি ব্যাপার বল তো? তোর মা কি আজ এসেছিল? দেখেছিস তাকে?’
বেচারি এমনিতেই খুব মুষড়ে পড়েছিল। বাবাকে সামনে পেয়েও তাই চুপ করে ছিল। এখন চোখ তুলে তাকাল অবনীর দিকে। বলল, ‘এসেছিল তো। বলল, ঠাকুমা ডাকছে, যাচ্ছিস না কেন চান করতে? চল, আমি তোকে চান করিয়ে আনি।’
কথা শেষ হওয়ার পরে পরেই অবনীর মা ঘরে ঢুকলেন। হাতে চায়ের কাপ। বললেন, ‘তোকে একটা কথা না বললেই নয়। নীচের বউমারা যে যাই বলুক, তুতুলকে অমন বিপদের হাত থেকে আজ বাঁচিয়ে দিল বউমা।’
চোখ বড়ো বড়ো হয়ে উঠল অবনীর, ‘বউমা!
‘হ্যাঁ। হাজার হলেও ছেলের মা তো? নিয়তির টানে ফেলে চলে যেতে হয়েছে অসময়ে। কিন্তু আমি এখন বুঝতে পারছি, সে যায়নি কোথাও। এখানেই, এই বাড়িতেই সে আছে।
অবনীর মুখটা যেন কেমন হয়ে গেল। বললে, ‘বুঝলে কী করে?’
‘বুঝতে আমি পেরেছি। দেখ, ওই ছেলে যখন পড়ে গেল, আমি কি পারি তাকে টেনে রাখতে? আমি স্পষ্ট দেখলাম, একটা হাত, আমার হাতের পাশ দিয়ে তুতুলকে টেনে রেখেছে। নীচের বউমাদের ওপরে উঠে আসতে যে সময়টা লেগেছে, সে সময়টা বউমাই তাকে রক্ষে করেছে।’
অবনী বোকার মতো তাকিয়ে রইল তার মায়ের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে তার মুখ দিয়ে কোনো জবাব বার হল না।
[ শুকতারা, আষাঢ় ১৪১০ (জুন ২০০৩)।
