নিশির ডাক – শ্রীঅখিল নিয়োগী (স্বপন বুড়ো)
ঝন্টু যখন একেবারে ছেলেমানুষ— মানে কোলের ছেলে— তখন তার মায়ের শক্ত অসুখ করে। সেইজন্যে সে আহ্লাদী পিসির কোলে মানুষ হয়। আহ্লাদী পিসি ঝন্টুর বাবার দূর সম্পর্কের এক বোন, মাথায় একটু কেমন যেন ছিট আছে বলে শ্বশুরঘর করতে পারেনি। আবার কারণে-অকারণে এলোমেলো আহ্লাদীর মতো কথা বলে। সেইজন্যে তার নাম হয়েছে আহ্লাদী। বাড়ির ছেলেমেয়েদের সে তাই আহ্লাদী পিসি। মায়ের অসুখ থেকে সেই যে ঝন্টুকে সে কোলে তুলে নিলে, তার পরেই ছেলেটা ওর এমন ন্যাওটা হয়ে গেল যে মায়ের অসুখ ভালো হলেও আহ্লাদী পিসি আর ওকে কোল থেকে নামাতে চায়নি। ঝন্টুও আহ্লাদী পিসি বললে একেবারে অজ্ঞান। আহ্লাদী পিসি স্নান করিয়ে দেবে, খাইয়ে দেবে, জামা-কাপড় পরিয়ে দেবে আর ঘুম পাড়িয়ে দেবে। পিসিকে না হলে ঝন্টুর একমুহূর্ত চলে না। ঝন্টুর মা-ও সংসারের সাত ঝামেলায় দিবা-রাত্তির জড়িয়ে থাকেন, তাই আহ্লাদী পিসির কোলে ছেলে ফেলে দিয়ে তাঁরও সকলরকমে নিশ্চিন্দি।
আহ্লাদী পিসি মাছ খেতে বড়ো ভালোবাসে। বিশেষ করে শোল মাছ। ঝন্টু, যখন একটু বড়ো হল, সে পিসির জন্যে নানারকম মাছ ধরে নিয়ে আসে। পিসি এক গাল হেসে বলে, ‘ভাগ্যিস আমার ঝন্টু ছিল, তাই দুটো মাছ-ভাত খেয়ে বাঁচি!’
বর্ষার সময় যখন দেশের নদী-নালা ভরাট হয়ে আসে— নিজেদের পুকুরে জল পড়ে, ঝন্টু গভীর রাত্রে গিয়ে পোলো দিয়ে নানা জাতীয় মাছ ধরে নিয়ে আসে; বিশেষ করে আহ্লাদী পিসির জন্যে শোল মাছ যদি পায় তবে তার মুখে আর হাসি ধরে না।
আহ্লাদী পিসি ঝন্টুর বাবার সংসারেই থাকে বটে, তবে তার নিজেরও বেশ কিছু টাকা আছে। সেই টাকা আহ্লাদী পিসি যক্ষের মতো আগলে রাখে। শুধু ঝন্টুকে মাঝে মাঝে মিষ্টি কিনে খাওয়ায়। ঝন্টুর মা ঠাট্টা করে বলেন, ঠাকুরঝি, এমন করে তোমার টাকাগুলি নয়-ছয় করে ফেলো না।
আহ্লাদী পিসি রাগ করে উত্তর দেয়, আমার টাকা আমি যা খুশি করব, রাস্তায় ছড়িয়ে দেব, তাতে কার কী!
আসল কথা হচ্ছে, এই ব্যাপার নিয়ে বাড়ির সবাই আহ্লাদী পিসিকে ক্ষ্যাপায়!
আহ্লাদী পিসি মরলে যে ঝন্টুই গয়ায় তার পিণ্ডি দেবে— এই কথাই সে গর্বে সবাইকে বলে বেড়ায়!
এই আহ্লাদী পিসি হঠাৎ তিন দিনের জ্বরে মারা গেল।
দিব্যি শক্ত-সমর্থ আহ্লাদী পিসি… দেহে রোগ-বালাই নেই— এমনভাবে যে হঠাৎ মারা যাবে তা বাড়ির কেউ ধারণাই করতে পারেনি। দুর্দান্ত দস্যি ছেলে ঝন্টু …আহ্লাদী পিসির মৃত্যুর পর কে যেন তার মুখে বোবা-কাঠি ছুঁইয়ে দিয়েছে। কারো সঙ্গেই কথা কয় না, খায় না দায় না, উদাস চোখে একদিকে তাকিয়ে থাকে। ছেলে যেন দিন দিন শুকিয়ে যেতে লাগলো।
এই ব্যাপারে ঝন্টুর মা বিশেষ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ঝাড়-ফুঁক-তাবিজ- মাদুলি— কিছুতেই কিছু নয়! ঝন্টুর দেহের রক্ত কে যেন শুষে নিতে লাগলো। বাড়িসুদ্ধ লোক ভেবে কিছু কূলকিনারা পায় না!
রাত্তিরে ঘুমের ঘোরে ঝন্টু কখনো কখনো ধড়মড় করে উঠে বসে।
মা শুধোন, হ্যাঁরে ঝন্টু, বিছানার ওপর উঠে বসলি কেন? এখন তো অনেক রাত। ঘুমিয়ে পড়!
ঝন্টু ফ্যালফ্যাল করে এদিক-ওদিক তাকায়, তারপর ফিসফিস করে মাকে বলে, আহ্লাদী পিসিমা আমার কানের কাছে ডাকল যে!
শুনে মা শিউরে ওঠেন। ঝন্টুর গায়ে-মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে দেন। মুখে বলেন, রাম-রাম-রাম!
পাড়ার পাঁচজন বউ-ঝি বলে, অ ঝন্টুর মা, ওর দিকে বেশ কড়া নজর রেখো, পোড়ামুখী আহ্লাদী মরেও ওকে ভুলতে পারেনি। তাই বুঝি এখনও আশেপাশে ঘুরঘুর করছে!
ঝন্টুদের বাড়ির নীচে পুকুরপাড়ে একটা শ্যাওড়া গাছ; গাঁয়ের লোকেরা হাট থেকে সওদা করে ফেরবার মুখে ওই শ্যাওড়া গাছের ডালে কাকে যেন বসে থাকতে দেখেছে।
বৃন্দাবন গাঙ্গুলী একদিন নাকি একেবারে সামনাসামনি পড়ে গিয়েছিলেন। বললেন, ভাগ্যিস আমি বুদ্ধি করে পৈতেটা জড়িয়ে ধরে গায়ত্রী জপ করতে শুরু করলাম! নইলে ঝন্টুদের পুকুরের খালে আমার ঘাড় মটকে রাখত! –এইভাবে সারা গাঁয়ে একটা চাপা ফিসফিস আলোচনা! কেউ বিশ্বাস করে, কেউ হেসে উড়িয়ে দেয়!
তখন আষাঢ় মাস। আশেপাশের নদী-নালা বর্ষার জলে ভরাট হয়ে গেছে। ঘোলা জল পাক খেতে খেতে ধানের জমি ভরিয়ে, মাঠ-ঘাট ডুবিয়ে, উঁচু-নীচু গাঁয়ের পথগুলিকে পেছল করে ঝন্টুদের বাড়ির পুকুরের খালে ঢুকছে।
তখন বোধ করি দুপুররাত। এমন একটা আবছা জ্যোছনা ফুটেছে যে আশেপাশে দূরে সব কিছু নজরে পড়ে, কিন্তু ভালো করে ঠাহর করা যায় না। মনে হয় যেন একটা পাতলা কুয়াশা জ্যোছনার সঙ্গে মিশে গোটা গ্রামটাকে ঘিরে রেখেছে।
মায়ের পাশে শুয়ে ঝন্টু অকাতরে ঘুমুচ্ছে। ওদের বাড়ির রান্নাঘরের পেছন দিক দিয়ে একটা কালো বেড়াল বিকটভাবে ডেকে চলে গেল। কোথায় কোন ঝোপে বসে একটা ভূত-ভূত্তম পাখি একটানা বেসুরোভাবে ডেকে বিরক্তি জাগিয়ে তুলছে। একটা থমথমে ঝিমঝিমে ভাব…
এমনি সময় ঝন্টুর হঠাৎ মনে হল— ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আহ্লাদী পিসি ওকে ডাকছে। আহ্লাদী পিসি বলছে, ওরে ঝন্টু, শিগগির আয়— তোদের পুকুরের খালে নতুন জল এসেছে। কত মাছ উঠেছে… দেখবি আয়! তোর পোলোটা নিয়ে আসতে ভুলিসনি যেন!
আচমকা ঝন্টুর ঘুমটা ভেঙে গেল। সে বিছানার ওপর উঠে বসল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলে, সবাই অকাতরে ঘুমুচ্ছে। তার মায়ের ডান হাতটি ওর গায়ের ওপর ছিল। আস্তে আস্তে হাতটা সে সরিয়ে রাখলে।
আহ্লাদী পিসি বলেছে পোলো নিয়ে যেতে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঝন্টু পাশের ঘরে ঢুকল। ওইখানেই পোলো থাকে। বেড়ালের মতো খুব সাবধানে পা-টিপে-টিপে সে পোলো নিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
কে যেন কানের কাছে বললে, দরজাটা ভেজিয়ে দে ঝন্টু, নইলে ওরা জেগে উঠবে। ঝন্টু, বিনা প্রতিবাদে তাদের ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে হনহন করে পুকুরের খালের ধারে চলে গেল।
নিশুতি রাত… কেউ কোথাও জেগে নেই… কলকল করে বর্ষার জল ঢুকছে খালে… ঝন্টু ছপ্ ছপ্ করে পোলো ফেলছে আর রাশি রাশি মাছ ধরছে। এত শোল মাছ কোথেকে এল— ঝন্টু ভেবে কূলকিনারা পায় না। ও যে খালৈ সঙ্গে এনেছিল, সেটা মাছে ভরতি হয়ে গেল। কীসের যেন একটা পোড়া গন্ধ ক্রমাগত তার নাকে আসছিল। কার আকর্ষণে ঝন্টু সেই মাছ-ভরতি খালৈ নিয়ে এগিয়ে চলল! এ কী! এ যে সেই শ্যাওড়া গাছ!
ফিসফিস কথা কানে এল।
—আমায় শোল মাছ পোড়া খাওয়াবি ঝন্টু?
ঝন্টু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলে, শ্যাওড়া গাছের ডালে লাল শাড়ি পরে দিব্যি পা ঝুলিয়ে কে যেন বসে আছে! আহ্লাদী পিসি না? দেখতে ঠিক সেইরকম!
এতক্ষণে ঝন্টুর জ্ঞান যেন ফিরে এল। আহ্লাদী পিসি তো মরে গেছে! ও তাহলে কার ডাকে এই নিশুতি রাতে মাছ ধরতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে? ভয়ে ওর মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে উঠল। সে প্রাণপণ চেষ্টা করল পালিয়ে যেতে…. কিন্তু পা দুটো কিছুতেই উঠছে না! মনে হচ্ছে এঁটেল মাটির কাদায় যেন বসে গেছে! শেষকালে মনে জোর এনে ঝন্টু মরিয়া হয়ে ছুটতে শুরু করে দিলে। পেছন থেকে আহ্লাদী পিসির নাকি সুরে কান্না শোনা গেল, ওঁরে ঝঁন্টু, শোঁল মাঁছগুলো আঁমায় দিয়ে যা— আঁমি আর কিচ্ছু চাঁইনে—
যত আহ্লাদী পিসির কথা কানে আসে ঝন্টু তত ছোটে! হঠাৎ সে দেখলে একটা বিরাট লম্বা হাত শ্যাওড়া গাছের ওদিক থেকে এসে তার হাতের মাছের খালৈ ছিনিয়ে নিয়ে গেল!
একটা আর্তনাদ করে ঝন্টু সেইখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তার চিৎকার শুনে বাড়ি থেকে লোকজন এসে যখন পৌঁছুলো, ওর মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরুচ্ছে!
অনেক ভূত-তাড়ানো রোজা, বহু মন্তর, রাশি রাশি তাবিজ, কবচ, মাদুলি … কিছুতে কিছু না… ঝন্টু অসাড় হয়ে পড়ে থাকে— ডাকলে সাড়া দেয় না!
অবশেষে মায়ের বুকভাঙা কান্নায় তিনদিন পর ঝন্টু চোখ চেয়ে তাকালো। কিন্তু কী হয়েছিল কোনো কথাই সে মনে করে গুছিয়ে বলতে পারে না, শুধু বোকার মতো ড্যাবডেবে চোখে চেয়ে থাকে।
গাঁয়ের মাতব্বর, পাড়াপ্রতিবেশী সবাই বললে, দেখ ঝন্টুর মা, এখন থেকে ঝন্টুকে একেবারে চোখে চোখে রাখতে হবে। পেতনিরা ওইরকম করে নিশির ডাকে ভুলিয়ে জলার ধারে নিয়ে ঘাড় মটকে রাখে।
শুনে ঝন্টুর মার বুকের রক্ত শুকিয়ে যায়। সারারাত ধরে ছেলের শিয়রে বসে জেগে থাকে মা। ঘন ঘন দীর্ঘনিশ্বাস পড়তে থাকে। ভাবে আমার শান্তির সংসারে এ কী হল! কী কুক্ষণেই পরের মেয়েকে ঘরে ঠাঁই দিয়েছিলাম!
এদিকে তারপর থেকেই বাড়ির লোকে একটা অবাক কাণ্ড লক্ষ করতে লাগলো।
পাথরের মূর্তির মতো পাগলা পাগলা চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে ঝন্টু।
হঠাৎ সে বলে বসল, আমি পোড়া শোল মাছ খাব।
অমনি সঙ্গে সঙ্গে কোত্থেকে একটা পোড়া শোল মাছ ঘরের মাঝখানে এসে পড়ল! ভয়ে আঁতকে উঠল সবাই।
ব্যাপার দেখে বাড়ির লোকে ঘন ঘন রাম নাম জপ করতে লাগলো।
কিন্তু আস্তে আস্তে ব্যাপারটা সহজ হয়ে এল— যখন দেখা গেল যে, ঝন্টু যখন যা চায় কোনো অদৃশ্য হস্ত যেন সঙ্গেসঙ্গে তাই এনে হাজির করে!
সেদিন দুপুর গরমে আই ঢাই করতে করতে ক্ষীণকণ্ঠে ঝন্টু বললে, মা, এক গেলাস ঠান্ডা জল দাও না!
মুখের কথা খসাতে যতটুকু সময়!
দেখা গেল শ্বেতপাথরের সুন্দর একটি গেলাসে টলটলে পরিষ্কার জল। ঝন্টু সেই জল খেতে যাচ্ছিল— কিন্তু ওর মা হাত দিয়ে সব টুকুন মেঝেতে ফেলে দিয়ে বললেন, কক্ষনো মুখে দিসনে ঝন্টু ওসব পেতনিতে জোগাচ্ছে!
আরও একটি জিনিস লক্ষ করা গেল যে, এই জাতীয় ভৌতিক কাণ্ড রাত্তির বেলাতেই ঘটছে।
সন্ধের পর পাড়ার গিন্নিবান্নিরা দল বেঁধে আসত ঝন্টুকে দেখতে। কথায় কথায় গাঙ্গুলী গিন্নি বললেন, আমার জর্দা গিয়েছে ফুরিয়ে! কাশীর জর্দা না হলে আবার আমার মুখে রোচে না!
আপন মনে ঝন্টু বললে, তুমি কাশীর জর্দা খাবে ঠানদি? সঙ্গেসঙ্গে ঠন্ করে মেঝেতে পড়ল একটি কৌটো!
গাঙ্গুলী গিন্নি অবাক হয়ে চিৎকার করে উঠে বললেন, এই তো কাশীর জর্দা! একেবারে নতুন কৌটো! কোত্থেকে এল ঝন্টুর মা?
আর যারা আশেপাশে ছিল— ব্যাপারটা জানত— তারা উত্তর দিলে, গাঙ্গুলী গিন্নি বুঝি জানো না? সব ওই আহ্লাদী পেতনিতে জোগাচ্ছে।
জর্দার কৌটোটা গাঙ্গুলী গিন্নি হাতে তুলে নিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু যেই আহ্লাদী পেতনির কথা শুনলেন অমনি রাম রাম করতে করতে একেবারে নিজেদের বাড়ির দিকে পা চালিয়ে দিলেন।
এইভাবে নানা জাতীয় ঘটনা ঘটতে লাগলো। হঠাৎ চাঁপা ফুলের গন্ধে গোটা বাড়িটা ম-ম করতে লাগলো, তার পর মুহূর্তেই পচা মাছের গন্ধে লোকে নাকে কাপড় দিয়ে পালিয়ে যেতে পথ পায় না!
পাড়ার ছেলেরা সবাই মিলে ঘিরে রয়েছে ঝন্টুকে… কোথাও কিছু নেই …হঠাৎ রাশি রাশি ইট পাটকেল পড়তে শুরু হল। কিন্তু মজা এই যে, একটি ঢিলও ঝন্টুর গায়ে লাগলো না। যেসব ছেলেরা ঘিরে রয়েছে ওকে, তাদের মাথায় পিঠে ক্রমাগত ভাদ্রের তালের মতো এসে দমাদ্দম পড়তে থাকে! বাপ রে মা রে করে তখন যে-যেদিকে পারে পালিয়ে যায় ওরা।
যতদিন ব্যাপারটা তামাশা থাকে লোকে ভিড় জমায়… কৌতূহলী হয়ে বসে থাকে পেতনির কাণ্ড দেখতে। কিন্তু কত রাত্তির লোকে এইভাবে না ঘুমিয়ে জাগতে পারে?
কাজেই আস্তে আস্তে ভিড় পাতলা হয়ে আসতে লাগলো। গমগমে বাড়ি আবার মানুষ-জন-শূন্যি… থমথমে হয়ে এল।
কীসের যেন দুঃস্বপ্ন দেখে মাঝরাত্তিরে ঝন্টুর মায়ের ঘুম ভেঙে যায়! মা ছেলেকে বুকের কাছে প্রাণপণে টেনে নেন। বাঁশঝাড়ের পেছন দিকে যেখানে একটানা ঝিঁঝি ডেকে চলে, সেখানে নাকিসুরে কার যেন হাসির রেশ শুনতে পাওয়া যায়।
মা চমকে উঠে বসেন। ছেলের মাথায় হাত রেখে সারারাত ধরে দুর্গা নাম জপ করতে থাকেন। কেবলি মনে হয় তাঁর কোলের ছেলেকে কে যেন ছিনিয়ে নিতে আসছে।
সেদিন সন্ধে থেকেই একটানা ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে।
দূর বনে প্রহরে প্রহরে শেয়াল ডাকছে… মনে হচ্ছে যেন ওরাও খুব ভয় পেয়েছে। পাখি-পাখালিরা কখন যে গিয়ে যার যার বাসায় সেঁধিয়েছে— কেউ খবর রাখে না! গেরস্ত বাড়ির গোয়ালগুলিতে গোরুগুলো এমনভাবে হামলাচ্ছে যে, মনে হয় তারা অশুভ কোনো ইঙ্গিত পেয়েছে। মাঝে মাঝে কাল-প্যাঁচার চ্যাঁচানি কানে ভেসে আসছে।
শ্মশানের দিক থেকে একটা শোঁ শোঁ হাওয়া গাঁয়ের বুক চিরে উত্তর অঞ্চলের জলাভূমির ওপর দিয়ে বইছে! মনে হচ্ছে কোনো প্রেতিনি বুঝি নিশ্বাস ফেলছে!
গাঁয়ের পথে আজ একটিও লোক নেই। কোনো বাড়িতে একটি ছোটো ছেলেও কেঁদে উঠছে না! মনে হচ্ছে রুদ্ধ আতঙ্কে সবাই প্রহর গণনা করছে!
ঝন্টুদের বাড়িতে আজ সবাইকে কি কাল-ঘুমে পেয়েছে… কে জানে!
সন্ধেবেলা উনুনে আগুন পড়েনি। বামুনদিদি ঘুঁটে আর কয়লা সাজাতে গিয়ে সেইখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। বাইরের ঘরে বাড়ির কর্তারা সন্ধে থেকেই দাবা-পাশা খেলতে বসেন! তাঁদের চিৎকারে দশটা আশেপাশের বাড়ির লোকে ঘুমুতে পারে না। আজ আঁধার ঘনিয়ে আসবার সঙ্গে সঙ্গে দাবার ছক একপাশে সরিয়ে রেখে সবাই ফরাসের ওপর কেউ চিত, কেউ উপুড় হয়ে পড়ে অঘোরে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে!
ঝর ঝর ঝর— অবিশ্রান্ত বর্ষণ চলছে— তারই একটানা শব্দের সঙ্গে তাল বজায় রেখে খানা ডোবায় ব্যাঙেরা আসর জমিয়ে তুলেছে। আকাশের সমস্ত তারা মেঘে মেঘে ঢাকা পড়েছে। মাথার ওপর কালপুরুষ একটা সাঙ্ঘাতিক কিছু ঘটবে বলে বুঝি এক চোখে দম বন্ধ করে প্রহর গণনা করছে!
মায়ের পাশে শুয়ে অকাতরে ঘুমুচ্ছে ঝন্টু। এমন ঘুম যে দেখে মনে হয় ওর দেহে বুঝি প্রাণ নেই!
আকাশের বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া, ঝিঁঝির ডাক, ব্যাঙের শব্দ, প্যাঁচার চ্যাঁচানি আর কালপুরুষের নীরব ইঙ্গিত ওকে যেন এমনভাবে ঘুম পাড়িয়েছে যে সে ঘুম আর ভাঙবে না!
কিন্তু হঠাৎ বেড়ার পাশে কার ফিসফিসে কথা শোনা গেল।
–ঝন্টু, উঠে আয়, জলার ধারে আজ মাছ থই-থই করছে!
ঝন্টু একমুহূর্তে সচকিত হয়ে ওঠে।
আবার সেই ফিসফিসে আহ্বান ভেসে এল।
উদাস দৃষ্টিতে ঝন্টু উঠে বসল।
কার ডাক— কোথায় যেতে হবে— কিচ্ছু জানে না— তবু সে মায়ের কোল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল পাগলের মতো।
আবার সেই বাঁশবনের কানাকানির মতো কার যেন আহ্বান! – আজ আর পোলো নিসনে ঝন্টু, খ্যাপলা জালটা হাতে নিয়ে তাড়াতাড়ি আমার সঙ্গে বেরিয়ে আয় —
এই প্রহেলিকাময় নিশির ডাকে সাড়া না দিয়ে উপায় নেই!
ঝন্টু খ্যাপলা জালটা কাঁধের ওপর তুলে নিলে, তারপর দরজার হুড়কোটা খুলে ফেলে উঠোনে বেরিয়ে এল।
সঙ্গেসঙ্গে কানে-তালা-লাগানো মেঘের গর্জন— আর বাদুড়ের ডানার ঝটপটি!
কিন্তু মেঘের ডাকেও কারো ঘুম ভাঙলো না!
ছায়ামূর্তির হাতছানিতে ঝন্টু জলার দিকে এগিয়ে যায়।
পথে অন্ধকার এত জমাট বেঁধে আছে… তবু ওর পথ চলতে কোনো অসুবিধে হয় না!
ওই যে ওইখানে। কত মাছ ঘাই মারছে…! তুই দেখতে পারছিস নে ঝন্টু? এগিয়ে যা, ছুড়ে দে খ্যাপলা জাল—
অশরীরীর নির্দেশ শুনে ঝন্টু, একেবারে জলার মধ্যে পা চালিয়ে দিলে। তারপর কচুরিপানার দামের মধ্যে তার দেহটা যে কোথায় তলিয়ে গেল— সারা গাঁয়ের কেউ জানতে পারল না!
শুধু ঝন্টুদের বাড়ির কালো বেড়ালটা ওর মায়ের দরজার কাছে কেঁদে কেঁদে ফিরতে লাগলো।
মায়ের কাল-ঘুম তবু ভাঙল না!
***
পরদিন জেলেরা যখন ঝন্টুর মৃতদেহটা জালে টেনে তুললে, সারা গাঁয়ের লোক একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
গাঁয়ের একজন বর্ষীয়সী মহিলা কপাল চাপড়ে বললেন, আহ্লাদী পোড়ারমুখী পেতনি হয়েও ওকে ভুলতে পারেনি— তাইতো রাহু হয়ে ঝন্টুকে কোলে টেনে নিলে!
.
বহু বছর হয়ে গেছে, এখনও গাঁয়ের লোকেরা একটু বেশি রাত্তিরে জলার ধার দিয়ে যেতে ভয় পায়!
শেষ রাত্তিরের দিকে কে যেন ওখানে কেঁদে কেঁদে, এলো চুল উড়িয়ে বুক চাপড়িয়ে ছুটোছুটি করে!
[ পরশমণি (দেব সাহিত্য কুটীর), ১৯৫২ ]
