পেতনি রহস্য ও কিট্টু লাহিড়ি – হিমানীশ গোস্বামী
সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সীকে একবার ভূত রহস্য সমাধান করতে হয়েছিল, কে জানত কিট্টু লাহিড়িকেও তেমনই এক ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে হবে? জড়িয়েই পড়েছিল বটে, তবে ভূত ঠিক নয়; কিট্টু লাহিড়ি জড়িয়ে পড়েছিল পেতনিরহস্যে! কিট্টুর দু-তিন সপ্তাহ সময়টা তেমন ভালো কাটছিল না। দু-তিন সপ্তাহ হল বাঘা কাকাও বাড়িতে নেই, তাঁর পুরোনো এক সঙ্গীর সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিখ্যাত পাহাড়ি জায়গা শিলং-এ গেছেন। সেখানে একমাস অন্তত থাকবেন। ওখানে ওঁর বন্ধু সদানন্দ মোড়ল একটা ছোটো স্কুল খুলেছেন, সেখানে নানারকম কাজকর্ম শেখানো হয়। ওখানকার বেকার ছেলেমেয়েরা যাতে কিছু শিখে পয়সা রোজগার করতে পারে এমনই উদ্দেশ্য। এগুলির মধ্যে আছে জামা-কাপড় ধোওয়া, ইস্তিরি করা ইত্যাদি। এ ছাড়া বিদ্যুতে চলে এমন সাধারণ যন্ত্রপাতি, যেমন— জল গরম করার হিটার, দরজার ঘণ্টা, ইস্তিরি এমনকী রেডিয়ো, পাখা ইত্যাদি সারাই। সম্প্রতি সদানন্দ মোড়ল একটা রান্নার ক্লাসও খুলেছেন, সেখানে কমবয়সিরা শেখে নানারকম রান্না। পর্যটন বাড়ছে, হোটেল-রেস্তোরাঁ বাড়ছে— সেখানে অনেক লোকও নেওয়া হচ্ছে। কেমন করে রান্না করতে হয়, কেমন করে সার্ভ করতে হয়— এ-সব শিখলে আজকাল কাজের অভাব হয় না। এ ছাড়া বয়স্করা বিশেষ করে মেয়েরাও নতুন নতুন রান্না শিখছেন। এইসব শিখিয়ে বাঘা কাকার আয়ও হচ্ছে ভালোই। তবে উনি ওখানে স্থায়ীভাবে যাননি, কয়েক জনকে বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে তারা যাতে নিজেরা অন্যদের ট্রেনিং দিতে পারে এমন পরিকল্পনা করেছেন। এই সব কাজে বাঘা কাকা যখন শিলং-এ তখনই ব্যাপারটা ঘটল, তবে শিলং-এ নয়, কলকাতাতেই।
কিট্টু একা থাকলে একটা বড়ো ঝামেলা হয়, কেন না তখন তার সুপ্রিয়া পিসি তার জন্য রোজ খাবার পাঠিয়ে দেবেনই। দু-একদিন অমন খাদ্য কোনোমতে খেলেও তিনদিন পর তার মন আর পেট দুই-ই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এদিকে তার পিসতুতো ভাই মিহিরও নেই। এতদিন পরে তার কবিতা লেখার নেশা অনেকটা কেটে গেছে। আর তার বাবা তাকে একরকম জোর করেই একটা চাকরি জোগাড় করেও দিয়েছেন তাঁরই এক বন্ধুর প্রতিষ্ঠানে। জায়গাটা খুব দূরে নয়, চন্দননগরে। তবে সপ্তাহের মধ্যে পাঁচদিনই সেখানে থাকতে হয়। সেখানে যাবার আহ্বান সত্ত্বেও কিট্টু সেখানে যেতে চায় না। তার কারণ, মিহিরকে অনেকরকম কাজ করতে হয়। অনেক সময় তাকে বাড়িতেও পাওয়া যায় না। আবার এ-ও হয় যে, মিহিরের অফিসের লোকজন এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। একবার কিট্টু সেখানে গেলেও তার ভালো লাগেনি একেবারেই। তাই যখন তার পুরোনো এক বন্ধু বিনোদ গুপ্ত ভায়া যাদবপুরের মশা অধ্যুষিত এক জলার ধারে তাকে যেতে বলল তখন সে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে, সুপ্রিয়া পিসিকে ফোন করে, দরজা- জানালা বন্ধ করে, বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে বিনোদের গাড়িতে উঠে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে চলল। কোথায়? – না যাদবপুরে! কোত্থেকে?— না পার্ক সার্কাস থেকে।
বিনোদের বাড়িটি একেবারে জলার ধারে না হলেও দু-মিনিটের হাঁটা পথ। বেশ বিস্তৃত জল, জল ঘোলাটে সবুজ— মশার বাহার আছে। তবে ওই জল এমনই নোংরা যে মশারা পর্যন্ত ওই জলে ডিম পাড়ে না। যাদবপুরের মশাদের নার্সিং হোম ছোটো ছোটো গর্তের জল অথবা বাড়ির কাছাকাছি কোনো ভাঙা হাঁড়ি, ফেলে দেওয়া গাড়ির টায়ার। এ সবের মধ্যে বৃষ্টির জল জমে থাকায় এবং নিয়মিত মশা মারা বিষ না ছেটানোয় মশাদের ডিম পাড়ার খুব সুবিধা।
তবু শান্তি পেল কিটু। এ বাড়িতে বিনোদ আছে, আছে বিনোদের স্ত্রী সুদেষ্ণা এবং তাদের আট বছরের গৌরব। সুদেষ্ণা স্কুলে পড়ায়, সেই স্কুলেই পড়ে গৌরব। বাড়িতে কাজের লোক দুজন, তবে সর্বদার জন্য নয়— সেটার অনেক সুবিধে। কিন্তু সে সব কথা থাক। কিট্টু এখানে এসে শান্তি পেয়েছে। সে ঠিক করে যতদিন থাকা যায় থাকবে।
কিন্তু শান্তির দফা রফা হল সকাল আটটায়। টেলিফোনে সুপ্রিয়া পিসির সেই চাঞ্চল্যকর কণ্ঠস্বর— ওরে কিট্টু, আমাকে বাঁচা। আমার বড়ো বিপদ!!
কী হয়েছে, সুপ্রিয়া পিসি? তোমার কণ্ঠ এমন উত্তেজিত কেন?
সুপ্রিয়া পিসি প্রায় ঝংকার দিয়ে বলেন, ঝংকার দেব না তো কি? সকাল সাতটা থেকে এই এক ঘণ্টা ধরে কেবলই ভাবছি দেওয়ালে এর অবস্থান টিক টিক করে আর হাতের সাহায্যে চলে, দু-অক্ষরে — ভাবতে পারিস এমন বিপদের কথা?
সুপ্রিয়া পিসি কথামালা নামের এক ক্রস ওয়ার্ড করেন। এটা তাঁর নেশার মতো। কিট্টু এ ব্যাপারে একেবারে অসমর্থ তা নয়। সে সুপ্রিয়া পিসিকে সাহায্য করতে করতে দিব্যি পাকা হয়ে উঠেছে। সে খুব আস্তে করে বলল, ঘড়িতে এখন ক-টা?
ঘড়িতে ক-টা জেনে কী হবে? এই তো সবে আটটা হল। তারপরই চিৎকার করে বলে চলেন, তুই একটা শয়তান! উত্তরটা হবে ঘড়ি, তাই না? দু-হাত দিয়ে চলে, টিক টিক করে, দেওয়ালে থাকে। বলেই ফোনটা রেখে দেন তিনি।
কিট্টু ভাবে সুপ্রিয়া পিসিকে ফোন নম্বরটা না দিলেই ভালো হত!
কিন্তু কিট্টুর শান্তির ফের ব্যাঘাত ঘটল দুপুর নাগাদ। ওর জন্য নির্দিষ্ট করা আলাদা ঘরে প্রচুর বই যেমন ছিল তেমনই ছিল টেলিভিশনও। কিটু ক্লিক করে সেটা চালু করতেই শুনতে পেল একজন ভারি উত্তেজিত কণ্ঠে বলছেন, যাদবপুরের এক বড়ো প্রোমোটার সুরেশ্বর সুরকে তাঁর বেহালার বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। আরও অদ্ভুত ব্যাপার, তিনি যে ঘরে রাত্রে ছিলেন সে ঘর ছিল ভেতর থেকে বন্ধ। তাঁর দেহ দেখে পুলিশের অনুমান তিনি প্রবল আতঙ্কে মারা গেছেন অথবা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। যদিও ঘরে বিষের শিশি বা তেমন কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ময়না তদন্ত করলে তবেই মৃত্যুর আসল কারণটি জানা যেতে পারে। টিভির খবরে আরও জানা গেল সুর মহাশয় যাদবপুরের প্রোমোটার হলেও তাঁর বাড়ি বেহালায়। তিনি বিবাহিত হলেও তাঁর স্ত্রী সুরমা আলাদা থাকেন, তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না বলে প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন।
বিকেলে কিট্টু ঘুমিয়ে পড়েছিল বই পড়তে পড়তে। এমন সময় শোনা গেল জনাকয়েক যুবক ‘জলা বোজানো চলবে না, চলবে না’ স্লোগান দিতে দিতে ঘুরছে। কিট্টু ভাবল, এ রাজ্যে জলাভূমি আর থাকবে কি না সন্দেহ।
বিকেলে কিটু একটু পাড়ায় ঘুরে এল— একেবারে যাদবপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত। বিকেলে চমৎকার জলখাবার আর চা খেয়ে গৌরবের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করল। কিট্টু বুঝল, ছেলেটি ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে। কেন না কিটু তাকে প্রশ্ন করেছিল, তুমি কি সাঁতার কাট? উত্তরে গৌরব বলেছিল, না কাকু, আমি সুইম কাটি না।
যাই হোক, কিট্টুর দু-তিন দিন ভালোই কাটল। অবশ্য ইতিমধ্যে সুপ্রিয়া পিসি তাকে বার বার ফোন করে ক্রস ওয়ার্ডের ধাঁধার উত্তর জেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে পঞ্চম দিন সকালের খবরের কাগজ পড়ে সে একেবারে হতভম্বই হয়ে গেল। রাত্রে তিনটি খুন হয়েছে। সেই সুর যেমন খুন হয়েছিলেন প্রায় তেমনই রহস্যজনকভাবে। একজন যাদবপুরেই— নাম জয়রাম সুকুল— অবাঙালি প্রোমোটার। অন্য দুজনই লিলুয়ার। একজনের নাম মহম্মদ হালিম, অন্য একজন ললিত ভঞ্জ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল এঁরা প্রত্যেকেই যাদবপুরের বিশাল জলাভূমি ভরাট করছিলেন বে-আইনিভাবে। প্রত্যেকেই মারা গেছেন আশ্চর্য কোনো উপায়ে। কারও শরীরে বিষ পাওয়া যায়নি। আঘাতেরও চিহ্ন নেই।
কিট্টু ভাবতে লাগল। কিন্তু এর কোনো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তার মনে এল না। এই সময় বাঘা কাকা থাকলে বেশ হত। কিট্টুর অনেক জটিল সমস্যা বাঘা কাকা সমাধান করে দিয়েছেন। কিন্তু সে ভেবে আর এখন লাভ কী? সেদিন রাত্রে ডিনার-এর সময় বিনোদ কিট্টুকে বলল, তোর ঘুম কেমন হয়? কিট্টু বলল, বলতে নেই ঘুম ভালোই হয়। তবে মনে দুশ্চিন্তা থাকলে প্রায়ই জেগে উঠি, খানিক বই পড়ি, আবার ছটফট করে ঘুমিয়েও পড়ি। কেন প্রশ্ন করছিস?
এবারে সুদেষ্ণা বলল, কাল অমাবস্যা কি না, তাই একটু বলছি। প্রত্যেক অমাবস্যার রাত্রে বেশ জোরালো কণ্ঠে এখানে কিছু পেতনি হাসাহাসি করে, ঠাট্টা করে, রীতিমতো আসর বসায়। কেউ কেউ আবার গানও করে। তবে মানুষের কণ্ঠ নয় এবং সুরও যে খুব চমৎকার তাও নয়।
সে কি কথা? ভূত কি সত্যিই আছে নাকি? কিটু প্রশ্ন করে।
বিনোদ, হেসে বলে, ভূত আছে নিশ্চয়। যদি নাও থাকে তবে পেতনি যে আছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে এই পেতনি খুর কঠোর প্রকৃতির নয়। এ অঞ্চলের কোনো মানুষকে তারা এ পর্যন্ত মারেনি ধরেনি— এমনকী ভয়ও দেখায়নি। এই পেতনিদের মনে মায়াদয়াও আছে। এ অঞ্চলে এমনও হয়েছে দুরবস্থায় পড়ে কারো হয়তো খাওয়া জুটছে না, ওরা বুঝতে পেরে রাত্রে ভালো ভালো খাবার, চাল ডাল তেল এসব রেখে আসে। পেতনিদের দয়ামায়া আছে। তবে ওঝাদের ব্যাপারে ওরা খড়গহস্ত। দু-দুটো ওঝা যজ্ঞ করতে এসেছিল, ওরা তাদের উড়িয়ে নিয়ে একবার একজনকে আন্দামানে আর অন্যজনকে সুয়েজ খালের কাছে একটা মালবাহী জাহাজে ছেড়ে দিয়ে এসেছিল। সেই থেকে এই অঞ্চলে একটি ওঝাও আসেনি। কে আসবে এমন পেতনির পাল্লায় পড়তে? ওঝারা সব ভূতের মন্ত্র জানে, কিন্তু পেতিনির মন্ত্র তাদের জানা নেই। আসলে পেতনিরা হাজার হলেও ভূতদের চেয়ে অনেক বেশি নরম স্বভাবের। ভূতেরা ভয় দেখায়— সুযোগ পেলেই দেখায়। কিন্তু পেতনিরা কাউকে ভয় দেখাতে চায় না এটা ঠিক। কিন্তু হলে কী হবে, মানুষেরা ভয় পায় ওদের কথা মনে হলেই। কাছাকাছি কোনো পেতনি এলে আরও ভয় পায়। ওই ভয় পাওয়া দেখে পেতনিরা অনেক সময় মজা পেয়ে হেসে ওঠে— আর ওদের হাসি তো আর মানুষের মতো কণ্ঠে হয় না, গলাটা কেমন কর্কশ আর খনখনে শোনায়। তারা হাসলে খলখল করে হাসে— মানুষেরা হাসে খিলখিল করে। ভূত বা পেতনি কেউই চেষ্টা করলেও খিলখিল করে হাসতে পারে না, পারে না হি-হি করে বা হো-হো করে হাসতেও।
এই সব যে পেতনিদেরই কাজ সে বিষয়ে কিট্টু নিশ্চিন্ত’ হল, যদিও সে এর আগে পেতনি বা ভূত বা দানো এ-সবে বিশ্বাসই করত না। সে ভূত-পেতনি এ-সব নিয়ে পড়েও ছিল কিছু কিছু। সে জানতে পেরেছে পৃথিবীতে একমাত্র বঙ্গদেশেই পেতনিরা থাকে। ভারতবর্ষে ভূত আছে প্ৰায় সমস্ত রাজ্যেই। সব প্রায় একইরকম। কিন্তু ইউরোপের ভূতেরা আলাদা। ইংরেজ ভূতরা আসলে মুণ্ডুকাটা ভূত— তারা নিজেদের মুণ্ডু এক হাতে করে ঘোরে। মুণ্ডু স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে— নাকীসুরে নয় মোটেই। এ-দিকে ফরাসি ভূতরা অবশ্য নাকীসুরে কথা বলে। আবার জার্মানিতে পলটারজাইস্ট নামে এক ধরনের ভূত আছে— তারা গৃহস্থের ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কেলেঙ্কারি করে— কিন্তু কাজটা সাবধানে করে, একটা আসবাবও ভাঙে না।
এর মধ্যে কিট্টু ফোন করে বাঘা কাকাকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিয়েছে। উনি তো ভারি উত্তেজিত। বলেছেন, কালই এসে যাবেন— এমন সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু কী সে সুযোগ সেটা অবশ্য তিনি বলেননি।
সেটা সেই অমাবস্যার রাত। মেঘ আকাশকে ঢেকে রাখায় অন্ধকার যেন আরও ঘনীভূত। ভূতদের ভারি প্রিয় এই জমাটবাঁধা অন্ধকার। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ঘণ্টাখানেক বই পড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল— কিন্তু ঘুম আর কিছুতেই আসতে চায় না। কিটু কেবলই ছটফট করতে থাকে।
রাত তখন একটা বেজে গেছে।। হঠাৎই কিটু জেগে উঠল। একটা ঠান্ডা হাওয়া ঘরের মধ্যে বইতে লাগল। ঘরে কেউ এসেছে বলে মনে হল। কিট্টু ভয়ে চিৎকার করতে গেল কিন্তু কিছুতেই গলা থেকে একটু আওয়াজও বার করতে পারল না। গলা শুকিয়ে গিয়েছে। টেবিলে গেলাসে জল ছিল, অন্ধকারে সেটা দেখতে জকর্ম। এপিসিড বেড সুইচ জ্বালল— কিন্তু আলো জ্বলল না। আন্দাজে টেবিলের ধারে গিয়ে গেলাসে একটু জোরেই হাত লেগে গেল আর স্টিলের গেলাসটি জল-সমেত পড়ে গেল মেঝেয়। কী করবে সে বুঝতে পারছে না— এমন সময় কে যেন ঘরের মধ্যে খলখল করে হেসে উঠল। কিটু বুঝে নিল, এই হল পেতনি। তার এমনিতে অনেক সাহস। কিন্তু সে তো দিনের বেলায়, সূর্যের আলোর স্পষ্টতায়। এই অন্ধকারে তার বড়ো অসহায় লাগল। সে বলতে গেল, তোমরা কে? বলতে ঠিক পারল না- কেমন একটা গোঙানির মতো আওয়াজ হল মাত্র। এর পর তার জ্ঞান সম্পূর্ণ হারাল না বটে, কিন্তু যেটুকু রইল তা কোনো কিছু মনে রাখার মতো যথেষ্ট নয়। যেন সে স্বপ্ন দেখছে— আবার কখনো মনে হচ্ছে— স্বপ্ন নয়, সত্যই সব ঘটছে।
কিট্টু বেশ বুঝতে পারল তার ঘরে যারা এসেছে তারা কিছুতেই শরীরী নয়। এরা হচ্ছে যাদের বলা হয় তেনারা, তবে ভূত নয়— পেতনি। কিন্তু কিট্টু আচ্ছন্ন ছিল বলেই হয়তো তার আতঙ্ক হল না। সে যেন সহজভাবেই বলল, আপনারা কী চান?
এবার খলখল হাসি। তারপর একজন বেশ খোনা গলায় বলল, আমরা চাই যা তা হল আমাদের এই জলা থেকে হঠানো চলবে না। কিন্তু আমরা তোমার কাছে এসেছি তোমাকে নাচ দেখাতে। আমরা হচ্ছি— ভয় পেয়ো না— পেতনির দল। আগে ভালো মানুষের বউ ছিলাম, কেউ ভালো মানুষের মেয়েও ছিলাম। কিন্তু এখন আমাদের শরীর নেই, কেবল মন আছে। এই মনের জোরে আমরা ছায়ারূপ ধরি। দিনের বেলায় কেউ দেখতে পায় না আমাদের, আমরা যেখানে-সেখানে যাই। রাতের বেলা কেউ কেউ দেখতে পায়, কেউ কেউ পায় না। তবে একটা কথা, রাতের বেলা আমাদের ছায়ামূর্তিতে শক্তি আসে। আমরা যেকোনো জিনিস যেকোনো জায়গায় নিয়ে যেতে পারি- বিশেষ করে অমাবস্যার রাতগুলিতে। যাক সে কথা, আমরা এখানে এসেছি তোমাকে একটু নাচ দেখাব বলে। তোমার কাছে ঘুঙুর হবে?
এবার সত্যিই কিট্টু একেবারেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে জ্ঞান ফিরে পেল পরদিন সন্ধেয় বাঘা কাকা আসার পর।
কিট্টু খুবই দুর্বল বোধ করছে। ওকে নিয়ে চারিদিকে খুব উত্তেজনা হচ্ছে। খবরের কাগজ, টি. ভির লোকও অনেক এসেছে। যাদবপুরের প্রেত রহস্য নিয়ে আলোচনা চলছে প্রায় সর্বত্র।
যাই হোক, বাঘা কাকা বললেন, আসল সমস্যা হল পুনর্বাসন। পেতনিদের পুনর্বাসন। কিট্টুবাবু আরশিয়ার সব পেতনির দেখা পেয়েছেন সে সব ওঁর বিভ্রম। মনটা দুর্বল ছিল, তাই রাতে খোয়াব দেখেছেন। উনি ভালো হয়ে উঠবেন দু-একদিনের মধ্যেই। ওই যে বলছিলাম, আসল ব্যাপার হল পুনর্বাসন। যাদবপুরের এই জলাটা প্রোমোটারেরা বোজাবেই। প্রোমোটার দশজন মরলে আবার দশজন গজাবে। তাতে সমস্যা কমবে না। এখানে পেতনিরা হাজার বছর ধরে আছেন। তাঁদের জন্য আমি বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করেছি— ওঁরা সম্মানের সঙ্গে সেখানে থাকবেন।
জায়গাটা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তরে বাঘা কাকা বললেন, শিলং-এর কাছে একটা বড়ো লেক আছে— সেখানে আছে বড়ো বড়ো মাছ। সেখানে দেড় হাজার পেতনি থাকতে পারবেন। মেঘালয় সরকার ওঁদের দিয়ে ব্যাপক পরিবহণ-এর ব্যবস্থা করে দেবেন। পেতনিরা সেখানে রাতে চার-পাঁচ ঘণ্টা ডিউটি দিলেই দু-কেজি করে মাছ পাবেন। ওঁরা হাজার লক্ষ লক্ষ প্যাকেট এ ঠিকানা থেকে ও ঠিকানায়, এ রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে, এ দেশ থেকে অন্য দেশে কয়েক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে দেবেন।
বাঘা কাকা বললেন, এরকম চার-পাঁচ বছর চলার পর এই সব পেতনিদের আত্মাকে তৃপ্তি দেওয়ার জন্য একটা যজ্ঞ করা হবে, তখন ওঁরা অমৃতলোকে যাত্রা করবেন। এঁদের জায়গায় তখন অন্য পেতনিদের কাজে লাগানো হবে।
কয়েক দিন যাদবপুরে থাকার পর কিট্টু তার পার্ক সার্কাসের বাড়িতে ফিরে গেল। তার মন এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। সুপ্রিয়া পিসি তাকে দু-বার দেখে গেছেন। একদিনের ছুটি নিয়ে মিহিরও এসে ওকে সঙ্গ দিয়েছে। দু-চারদিন এরকম চলছে, সুপ্রিয়া পিসি তার জন্য রোজই নানারকম রান্না করে পাঠাচ্ছেন। বাঘা কাকার রান্নার কথা মনে পড়ে কিট্টর কান্না পাচ্ছে, কিন্তু কিছুই তার আর করার নেই, অন্তত কয়েক মাস।
[ শারদীয়া শুকতারা, ১৪১৪ (২০০৭) ]
