Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
0/50
New Courseপেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

রাঙাদিদা ও ফুলকুমারী – বিরাজ ভদ্র

ভূতের গল্প তোমরা শুনতে ভালোবাস। কত নামেই না তোমরা তাদের চেন ব্রহ্মদত্যি, মামদো ভূত, পেতনি, শাঁকচুন্নি। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এ আবার ভূতের নাচও তোমরা দেখেছ। আমি একটা মেয়ে ভূতের কথা শুনেছি ছোটোবেলায়। তার নাম সে বলেছিল ‘ফুলকুমারী’।

ভূত যদি পোড়োবাড়ি, বনেজঙ্গলে থাকে তবে থাক না। বিশেষ কিছু আসে যায় না। অমাবস্যার রাত্রে, ঘোর দুপুরে অথবা ভর সন্ধেবেলায় তেনারা তোমাদের ভয় দেখাতেও পারেন। ওইসব জায়গায় যখন-তখন না গেলেই হল।

তবে বনের ভূতের থেকে মনের ভূতকে আমরা বেশি ভয় পাই। একদিন দুপুররাত্রে চাঁদের আলোয় একটা কলাগাছকে আমার মনে হয়েছিল সাদা শাড়ি পড়া একটা ভূত যেন। এদিকে-ওদিকে হাওয়ায় আবার হেলছিল দুলছিল। ওমা! ওটা যে বাগানের চেনা কলাগাছ সেটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লেগেছিল। আর তার মধ্যেই বুকটা একবার ধক করে উঠেছিল।

লোকে বলে বিজলি-আলো আসার পর থেকে ভূতেরা কোথায় সব পালিয়ে গেছে। এখন আর ভূত দেখার বা ভূতে ধরার গল্প তেমন শোনা যায় না। কিন্তু বহু বছর আগে গ্রামে গ্রামে ভূতের বেশ দৌরাত্যা ছিল। মনে করো ষাট-সত্তর বছর আগে ভূতের রাজত্ব না থাকলেও তেনাদের খুব হম্বিতম্বি ছিল।

আমার এক দূরসম্পর্কের ঠাকুমাকে একবার ভূতে ধরেছিল। বাবা-মার কাছে সেই ঘটনা শুনেছি। সেই ঠাকুমাকে আমরা ডাকতাম ‘রাঙাদিদা’ বলে। খুব ছোটোবেলায় তাঁকে দেখেছি। বুড়ো বয়সেও তাঁর গায়ের রং ছিল রাঙা রাঙা ফর্সা। সেই রাঙাদিদাকে ভূতে ধরেছিল। তখন তাঁর বয়স কুড়ি-একুশ হবে।

আমাদের গ্রামের বাড়িটা আগে ছিল ছোটোখাটো একটা জমিদার বাড়ির মতো। অনেক লোকজন থাকত। একদিন সন্ধ্যাবেলায় রাঙাদিদার বর রাঙাদাদু এক গ্লাস জল চাইলেন। ঘরে জল নেই তাই রাঙাদিদা একটু দূরে রান্নাঘরে জল আনতে গেলেন তাড়াতাড়ি।

সেই যে গেলেন রাঙাদিদা আর আসেন না। দু-একবার ডেকে রাঙাদাদু নিজেই বাইরে এলেন। কী কাণ্ড! রাঙাদাদু দেখলেন রাঙাদিদা বকুল গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চুপচাপ। কাছে গিয়ে রাঙাদাদু বললেন, ‘কী হল এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?’

‘খবরদার! আমায় ছুঁবিনি’, খোনাগলায় রাঙাদিদা বকলেন। তারপর খিলখিল করে জোরে হাসলেন।

দাদু অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন। অনেকে ছুটে এল। রাঙাদিদা বড়োদের দেখে ঘোমটা টানলেন না। বরং শাড়ির আঁচল গাছকোমর করে বেঁধে সবাইকে শাসাতে লাগলেন, ‘কেউ আমায় ছুঁবিনি! ছুঁলে শেষ করে দেব! আমায় তোরা চিনিস না!’

যাঁরা একটু বয়স্ক ছিলেন তাঁরা যা বোঝার বুঝে গিয়েছেন। তখনকার দিনে ভূতে ধরার প্রাথমিক লক্ষণগুলি এরকমই ছিল। রাঙাদিদাকে জোর করে ধরে ঘরে নিয়ে যাওয়া হল, কিন্তু ঘরে তিনি থাকতে চাইলেন না। বার বার সকলকে সাবধান করছেন, বেরিয়ে যেতে চাইছেন। তখন তাঁকে একটা খুঁটিতে বেঁধে রাখা হল। সেসময় এত গায়ের জোর হয়েছিল রাঙাদিদার যে দু-তিন জনে হিমশিম খেয়ে গিয়েছিল তাঁকে বাঁধতে।

বাড়ির লোকেরা পরামর্শ করে ঠিক করলেন ভূত ছাড়াবার ওঝা ডাকতে হবে। সে রাত্রেই পাশের গ্রামের এক ওঝা এল। তাকে দেখে রাঙাদিদা খিলখিল করে হেসে উঠলেন।

‘তুই, তুই কেন এসেছিস? তুই কী করবি আমার? যা পালা নইলে মেরে ফেলব।’

ওঝা কিছুক্ষণ চেষ্টা করে বলল, ‘না বাবু! এ আমার কম্ম নয়। আপনারা বড়ো ওঝা ডাকুন। এটা সহজ পাত্র নয়।’

‘যা, যা। তোর গুরুকে নিয়ে আয়’- খিলখিল হাসি রাঙাদিদার।

পরদিন সকালে আরও দু-একজন ওঝা এল, তারাও হার মেনে গেল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। সারারাত ঘুম নেই বসেও নেই, সমানে বকবক করে যাচ্ছেন, তবু একটুও ক্লান্তি ছিল না রাঙাদিদার। সবসময় বাঁধন খোলার চেষ্টা করেছেন।

আমাদের গ্রাম থেকে দশ-বারো মাইল দূরে একজন বিখ্যাত ওঝা থাকত। তার নাম ছিল মহেন্দ্র শীল। তাকেও খবর দেওয়া হল। সন্ধে হতে যায়, সবাই তার অপেক্ষায় বসে রইল। কখন আসে!

আমাদের বাড়ি ছিল আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে। বাড়ি থেকে এক মিনিটের পথ নদীর ঘাট। নৌকোয় করে ওঝা আসবে। কেউ দেখেনি কখন মহেন্দ্র ওঝা নদীর ঘাটে নেমেছে। কিন্তু ঘরের মধ্যে থেকে রাঙাদিদা ঠিক চেঁচিয়ে উঠলেন— ‘ওকে কে আনলো? ওকে ফিরে যেতে বলো। ও আমার কিছুই করতে পারবে না।’

বার বার চিৎকার করছেন রাঙাদিদা। যত কাছে আসছে ওঝা তত বেশি ছটফট করছেন আর হাত-পা ছুড়ে চেঁচাচ্ছেন— ‘তুই কেন এসেছিস? তোকে মেরে ফেলবো!’

রাঙাদিদার কাণ্ডকারখানা দেখে মহেন্দ্র ওঝা এতটুকু ঘাবড়াল না। বরং গম্ভীর গলায় বলল, ‘হ্যাঁ! এলাম তুই আমায় আসতে বাধ্য করলি। দেখি, কে কাকে মারে!

এবার সব জিনিসপত্র জোগাড় হল। ওঝা মন্ত্র পড়ে রাঙাদিদার গায়ে জল ছিটিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে রাঙাদিদাও চিৎকার করে উঠলেন। সারারাত ধরে চলল ওঝা আর ভূতের ক্ষমতার লড়াই। না দেখলে, না শুনলে সেসব বিশ্বাস করা যায় না।

একসময় ওঝা রাঙাদিদার চারদিকে অদৃশ্য গণ্ডি কাটলেন মন্ত্র পড়ে। তারপর রাঙাদিদার বাঁধন খুলে দেওয়া হল। এক অদ্ভুত কাণ্ড দেখা গেল তখন। রাঙাদিদা চেঁচাচ্ছেন, শাসাচ্ছেন, কিন্তু গণ্ডির বাইরে যেতে পারছেন না।

‘তুই গণ্ডি তুলে নে! তা নইলে ঘাড় মটকাবো! আমায় যেতে দে!’

‘তুই কে? কেন এসেছিস আগে বল, তবে তোকে যেতে দেব’, ওঝা বলে।

‘না না, বলব না, তুই আমার কী করবি?’

‘দেখ না, কী করি’, ওঝা মন্ত্রপড়া জল ছিটিয়ে দিল।

‘জ্বলে গেলাম, পুড়ে গেলাম! আর দিবি না।’

‘তবে বল, কে তুই? কেন চেপেছিস মা লক্ষ্মীর ঘাড়ে? বল?’ ওঝা বলে।

‘না না, বলবো না, তুই কে রে আমায় প্রশ্ন করছিস?’

‘দেখাচ্ছি, আমি কে’, ওঝা মন্ত্রপড়ে ক্রমশ রাঙাদিদার চারদিকের অদৃশ্য গণ্ডি ছোটো করতে শুরু করল। একসময় গণ্ডি রাঙাদিদার দু-পায়ের পাতায় যতটুকু জায়গা ধরে, ততটুকু হয়ে গেল। অথচ বার বার জিজ্ঞাসা করাতেও বলছে না সে কে, কেন ভর করেছে রাঙাদিদাকে।

প্রতিবার গণ্ডি ছোটো করার সময় ওঝা প্রশ্ন করছে কিন্তু উত্তর পাচ্ছে না। কয়েক বার এরকম করার পর ওঝার চোখ জবাফুলের মতো লাল হল রাগে। সে বলল, ‘যখন বলবি না তুই কে, তখন দাঁড়া এক পায়ে দাঁড়া। দেখি কতক্ষণ থাকতে পারিস।’

রাঙাদিদা একপায়ে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন। কিছুক্ষণ এইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমি আর পারছি না! উঃ কী কষ্ট! দু-পায়ে দাঁড়াতে দে।’

‘আগে বল, তুই কে? তবে দু-পায়ে দাঁড়াতে দেব।’

‘বলছি, বলছি।’

‘তবে দাঁড়া দু-পায়ে’, ওঝা বলে।

দু-পায়ে দাঁড়িয়েই রাঙাদিদা বললেন, ‘না বলবো না।’

বার কয়েক এভাবে এক-পা থেকে দু-পায়ে দাঁড়াতে পেয়েই কিছু বলতে অস্বীকার করায় ওঝা ভয়ানক রেগে গেল।

‘অনেকক্ষণ জ্বালিয়েছিস! তুই একটা পেতনি। তোকে কী করে জব্দ করতে হয় আমার জানা আছে। দাঁড়া তুই, এবার বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুলের উপর দাঁড়াত, ওঝা বলে।

ওঝার আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা নেই। বুড়ো আঙুলের উপর দাঁড়াতে হল রাঙাদিদাকে।

সে দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। কোনো নর্তকীও বেশিক্ষণ ওভাবে দাঁড়াতে পারে না।

‘আমি আর পারছি না। আমায় ভালোভাবে দাঁড়াতে দে। সব বলছি।’

‘নে, তবে দাঁড়া এক পায়ে’, ওঝা জল ছিটিয়ে দেয়।

‘দু-পায়ে দাঁড়াতে দে।’

‘নে, দু-পায়ে দাঁড়া’, ওঝা বলে।

দু-পায়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে রাঙাদিদা বলেন, ‘আমার কী দোষ! আমি কী সাধে ওর ঘাড়ে চেপেছি। ও যখন বাপের বাড়ি গিয়েছিল এক দিন সন্ধেবেলায় এলোচুলে বাইরে ঘুরছিল, তখন থেকে ওর দিকে আমার নজর পড়েছে। ওর সঙ্গে আমি এখানে আসি রান্নাঘরের পেছনে যে চালতে গাছ আছে ওর ডালে আমি থাকি। ওকে রোজ দেখি। কাল সন্ধেবেলা আবার এলোচুলে রান্নাঘরে যাচ্ছিল। আমি তখন ওর ঘাড়ে চাপি। আমার কী দোষ।

‘তা তো বটেই, তোর দোষ কোথায়। মা লক্ষ্মীর ঘাড়ে চেপেছিস তবু দোষ হয়নি, তাই না? কিন্তু কে তুই? এখন বল।’

‘বলবো না।’

‘আবার বুড়ো আঙুলের উপর দাঁড় করাবো।’

‘না, না, না! আর না। আমি বলছি।’

‘বল, তাড়াতাড়ি বল’, ওঝা বলে।

‘আমি ফুলকুমারী। ওর বাপের বাড়ির দেশে ছিলাম।’

‘বেশ! এবার তোকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। অনেক দূরে’, ওঝা আদেশ করে।

‘না না, তা কেন যাব?’

‘তবে দাঁড়া রে পেতনি, মজা দেখাচ্ছি’, ওঝা মন্ত্রপূত জল গায়ে ছিটিয়ে দেয়।

‘মরে গেলাম, মরে গেলাম! যাব যাব! আমি যাব! আর কষ্ট দিস না!’

‘তুই এই গ্রামে থাকতে পারবি না। মা লক্ষ্মীর বাপের বাড়ির দেশেও না’, ওঝা আদেশ করে।

‘তবে কোথায় যাব?’

‘তা আমি কী করে জানবো। তবে আর যেন তোর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ না হয়। সাবধান করে দিচ্ছি।’ ওঝা বলে।

‘আমি তোকে দেখে নের। আমি কোথাও যাব না। এখানেই থাকবো।’

‘তবে রে পেতনি! বার বার ওই এককথা। মজা দেখাচ্ছি!’ ওঝা অনেকক্ষণ মন্ত্র পড়ে জল ছিটিয়ে দেয়।

‘উ! মরে গেলাম। মরে গেলাম। আমি যাব। রেহাই দে রেহাই দে। যা বলবি তাই করবো।’

‘তবে যা! দূর হয়ে যা! যাবার আগে কী প্রমাণ দিবি বল? যা, ওই চালতে গাছের মগডাল ভেঙে দিয়ে যা।’ ওঝা কঠিন আদেশ করে।

‘তাই হবে।’

ওঝা রাঙাদিদার চারদিকের গণ্ডি তুলে নিল। মন্ত্রপড়ে জল ছিটিয়ে দিল রাঙাদিদার গায়। রাঙাদিদা এক দৌড়ে ঘরের বাইরে যেতে গিয়ে দরজার বাইরে আছাড় খেয়ে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে বিরাট শব্দ করে বাইরে কোনো গাছ ভেঙে পড়ল।

রাঙাদিদাকে ধরে ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। এদিকে রাত ভোর হয়েছে। সকলে বাইরে এসে দেখল পুরোনো বিরাট চালতে গাছের মগডাল ভেঙে পড়েছে। তারপর থেকে মেয়ে ভূত ‘ফুলকুমারী’র কথা আর কেউ শোনেনি।

[ শুকতারা, শ্রাবণ ১৩৯৯ (জুলাই ১৯৯২) ]