রাতটা ছিল দুর্যোগের – সমরেশ মজুমদার
দিনটা ছিল দুর্যোগের। আকাশে আলো ছিল না একফোঁটা। ঠান্ডা বাড়ছিল হু-হু করে। পোড়া কাঠের মতো মেঘগুলো চাপ হয়ে ঝুলছিল, যেন টোকা মারলেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে। দিন ফুরোবার আগেই রাত নামল। সেইসঙ্গে দাঁতালো হাওয়ারা নেমে এল খোলা পৃথিবীতে। এখনও বৃষ্টি নামেনি, এই রক্ষে!
রাস্তায় এই আবহাওয়ায় মানুষ থাকার কথা নয় বলেই নেই। স্ট্রিট ল্যাম্পগুলো ডাইনির চোখ হয়ে জ্বলার চেষ্টা করছিল। এই অবস্থায় ভদ্রমহিলাকে দেখা গেল দ্রুত হাঁটতে। তাঁর বয়স চল্লিশের ওপরেই, একটু মোটাসোটা ভালোমানুষ গোছের চেহারা। হনহনিয়ে হাঁটছেন আর বারংবার পেছন ফিরে দেখছেন। যেন কেউ তাঁকে অনুসরণ করছে। স্ট্রিটল্যাম্পের নীচ দিয়ে তিনি যখন হেঁটে গেলেন, তখন তাঁর মুখটা চকখড়ির মতো সাদা দেখাল। সেটা ঠান্ডায় যতটা নয়, আতঙ্ক ঢের বেশি। ওঁর শরীরে শীতের পোশাক আছে। তার ওপর একটা কালো চাদরে মাথা গলা ঢেকে রেখেছেন। সম্ভবত কানে যাতে হাওয়া না ঢোকে, তাই সতর্কতা। হাতে একটা ব্যাগ। যেসব ব্যাগ নিয়ে মহিলারা অফিসে যান, সেই রকমের। পায়ে মোজা এবং পাম্প-শু গোছের জুতো।
দ্রুত চলার জন্যই ভদ্রমহিলা হাঁপাচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল তিনি যেকোনো মুহূর্তেই বসে পড়বেন। দু-পাশের বাড়িগুলোর দরজা জানলা বন্ধ। একটুও আলো চোখে পড়ছিল না। বাঁক ঘুরতেই ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে পড়লেন। সামনে একটা বাড়ির দোতলার জানলায় আলো দেখা যাচ্ছে। কাচের আড়ালে কেউ যেন দাঁড়িয়ে কথাও বলছে। ভদ্রমহিলা আর দেরি না করে ছুটে গেলেন একতলার দরজায়। প্রাণপণে বেলের বোতাম টিপে ধরলেন। সেই মুহূর্তেও তাঁর চোখ পেছন দিকে চলে গেল। দূরে কুয়াশায় কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে। ওপর থেকে গলা ভেসে এল, ‘কে?’
‘দয়া করে দরজা খুলুন। প্লিজ। আমাকে বাঁচান!’ ভদ্রমহিলা আর্তনাদ করলেন।
দরজাটা খুলে যেতেই একদঙ্গল আলো রাস্তায় ভদ্রমহিলার শরীর ভাসিয়ে লাফিয়ে নামল। একজন মধ্যবয়সি মানুষ দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি?’
ভদ্রমহিলা বললেন, ‘একটু যদি ভেতরে আসতে দেন, তা হলে বলছি।’
ভদ্রলোকের স্ত্রী পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘আসুন, নিশ্চয়ই আসবেন।’
ভদ্রমহিলা কৃতজ্ঞ ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকতেই ভদ্রলোক দরজা বন্ধ করলেন। ওঁরা ভদ্রমহিলাকে ওপরে নিয়ে এসে বসতে বললেন। সেটা খুবই প্রয়োজন ছিল ওঁর। একটা চেয়ারে বসে বড়ো বড়ো নিশ্বাস ফেললেন তিনি। ভদ্রলোকের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি অসুস্থ?’
‘অ্যাঁ? না, ঠিক, আসলে দৌড়ে আসছিলাম বলে, অভ্যেস তো নেই।’ ওঁর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল।
‘দৌড়চ্ছিলেন কেন?’
‘মনে হচ্ছিল, হচ্ছিল বলবো কেন, স্পষ্ট দেখেছি, কেউ যেন আমাকে ফলো করছিল। রাস্তায় তো আজ একটাও লোক নেই, তাই ভয়ে…’ ভদ্রমহিলা কথা
শেষ করতে না পেরে দু-হাতে মুখ ঢাকলেন।
ভদ্রলোক বললেন, ‘সে কী! এ পাড়ায় কে অমন কাজ করার সাহস পাবে?’ তিনি সোজা জানলার কাছে চলে গিয়ে রাস্তাটা দেখার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, ‘নাঃ, কেউ নেই।
‘কিন্তু ছিল!’ ভদ্রমহিলা প্রতিবাদ করলেন।
‘বেশ, থাকেও যদি, তা হলে আর আপনার ভয় নেই। আমার স্বামী সরকারি অফিসার। সবাই ওঁকে চেনেন।’ স্ত্রী পরিচয় দিতেই স্বামী এগিয়ে এলেন, ‘শোনো, আমার মনে হয় ওঁকে এককাপ গরম দুধ দিলে ভালো হয়।’
ভদ্রমহিলা আপত্তি করলেন, ‘না, না, দুধ আমি খাই না।’
ভদ্রলোক হাসলেন, ‘শৈশব থেকেই অনেকে এই বদ অভ্যেসটা করে ফেলে। বেশ, কফি চলবে?’
ভদ্রমহিলা আরও সংকুচিত হলেন, ‘না, না। আমার এসব লাগবে না। ভদ্রলোকের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, এই বিচ্ছিরি আবহাওয়ায় আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন?’
ভদ্রমহিলা মুখ নীচু করে মাথা নাড়লেন, ‘কাজে। আমি যেখানে কাজ করি, সেখানে অনুপস্থিত হলেই মাইনে কাটে। টাকার প্রয়োজন বলেই এই আবহাওয়াতেও সকালে বেরিয়েছিলাম।’
ভদ্রলোক সমব্যথীর গলায় বললেন, ‘সকালে অবশ্য আবহাওয়া এত খারাপ ছিল না।’
ওঁর স্ত্রী বললেন, ‘তা হলে আপনি চাকরি করেন। বাড়িতে আর যাঁরা আছেন…।’
‘আর কেউ নেই ভাই।’ ভদ্রমহিলা মুখ তুলছিলেন না। তিনি রুমালে চোখ মুছলেন।
ভদ্রলোক ইশারায় স্ত্রীকে নিষেধ করলেন এ বিষয়ে কথা চালাতে। স্ত্রীর সেটা ভালো লাগল না। একটু সময় যেতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার স্বামী….?’ প্রশ্নটা ইচ্ছে করেই শেষ করলেন না।
তিনি মারা গিয়েছেন অ্যাক্সিডেন্টে। এইরকম খারাপ আবহাওয়ার সন্ধে ছিল সেদিন।’
ভদ্রলোক কিছু বলার আগেই ওঁর স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারপর?’
‘উনি অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন, এই সময় একটা কালো গাড়ি এসে ওঁকে চাপা দেয়।’
‘ইস!’
‘কিন্তু আমি জানি, উনি কখনো অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তায় হাঁটতেন না।’
‘তার মানে?’
‘আমার কথা পুলিশ বিশ্বাস করেনি। কালো গাড়িটাকেও ধরতে পারেনি, কিন্তু আমি দেখেছি।’
‘দেখেছেন মানে?’
‘যখনই আমি একা একা এই রাস্তায় হেঁটে যাই, তখনই দেখি একটা কালো গাড়ি আমার পেছন পেছন আসছে। যতক্ষণ না সেটা বেরিয়ে যায়, ততক্ষণ আমি, রাস্তা পার হই না।’
‘গাড়িতে কে থাকে দেখেছেন?’
‘না। মুখ দেখতে পাইনি।
‘হ্যাঁ। প্রথমে গাড়িটাকে দেখলাম। একবার। তারপর মনে হল, কেউ যেন দরজা খুলে নেমে আমার পেছন পেছন আসতে লাগল।’
ভদ্রলোক আবার জানলায় চলে গেলেন। ভালো করে রাস্তাটা দেখে ফিরে এলেন তিনি, ‘আচ্ছা, আপনি কতদূরে থাকেন?’
‘সামনের রাস্তা ধরে মিনিট চারেক গেলে বাঁ-দিকের তিনতলা কাঠের বাড়িটায় থাকি আমি।’
‘ও। সামান্যই পথ। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি আপনাকে পৌঁছে দেব।’
‘না, না। আপনি কেন যাবেন? ছি ছি, এসেই বিব্রত করেছি, তার ওপর।’
‘মোটেই বিব্রত করেননি।’ ভদ্রলোক বড়ো গলায় বললেন, ‘প্রতিবেশীকে যদি সাহায্য না করি, অন্যের প্রয়োজনে যদি না লাগি, তা হলে মানুষ হয়ে জন্মালাম কেন?’
ওঁর স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার শরীর এখন কেমন লাগছে?’
ভদ্রমহিলার মুখের সাদা ভাব এখন অনেকটাই চলে গিয়েছে। সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘ভালো। আমি এখন যেতে পারব। শুনুন, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমি একাই যেতে পারব।’
‘তা হয় না। যে কালো গাড়ি আর তার ড্রাইভারের গল্প শোনালেন, তারপর আর আপনাকে একা ছেড়ে দিতে পারি না। হ্যাঁ, আপনাকে কথা দিচ্ছি, কয়েক দিনের মধ্যেই এই কালো গাড়ির রহস্য সমাধান হয়ে যাবে। কাল থেকেই পুলিশকে বলবো ওয়াচ করতে।
ভদ্রমহিলা মাথা নাড়লেন, ‘আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো।’
‘কর্তব্য, বুঝলেন, এসব কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।’ ভদ্রলোক উদার গলায় বললেন।
ওঁরা উঠে দাঁড়াতেই স্ত্রী স্বামীকে ডেকে নিয়ে গেলেন পাশের ঘরে, চাপা গলায় বললেন; ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে?’
স্বামী অবাক হলেন, ‘কেন? কী করেছি?’
‘তুমি ওঁকে পৌঁছে দিতে যাচ্ছ! এই আবহাওয়ায় একটা কুকুরও রাস্তায় নেই।’
ভদ্রলোক আড়চোখে বাইরের দিক দেখলেন, ‘তোমার কিস্তু মনে নেই।’
‘মানে?’
‘আমার একটা কালো গাড়ি ছিল এবং আমিও একটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছিলাম।’
‘কিন্তু তুমি তো বলেছিলে লোকটা মরেনি।’
‘করার সময় তাই মনে হয়েছিল, পরে তো দেখতে যাইনি, খবরও নিইনি।’
‘তার মানে, তোমার গাড়িতেই….?’
‘নাও হতে পারে। শুনলে তো, এখনও সেই কালো গাড়িটা ওঁকে ফলো করে।’
স্ত্রীর উত্তেজনা কমল। তিনি মনে করে বললেন, ‘তুমি তখন বলতে, গাড়িটা যেন কীরকম!’
‘হ্যাঁ। সবসময় ড্রাইভারের কথা শুনত না। তাই তো বিক্রি করে দিলাম।’ ভদ্রলোক উশখুশ করলেন, ‘চলি। উনি অনেকক্ষণ বসে আছেন।’
‘শোনো, যেজন্যে তোমাকে ডাকলাম, তুমি রিভলবারটা নিয়ে যাও।’
‘রিভলবার?’
‘হ্যাঁ। যাচ্ছই যখন, তখন সাবধান হয়ে যাওয়াই ভালো।’
‘বেশ।’ ভদ্রলোক আলমারির দিকে এগোলেন।
ভদ্রমহিলা দরজার কাছে চুপটি করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যেন এই ঘরেও তাঁর শীত লাগছে, এমন ভঙ্গি। ভদ্রলোকের স্ত্রী হাসিমুখে এগিয়ে এলেন, ‘আপনার কোনো ভয় নেই। উনি পৌঁছে দিয়ে আসবেন। আচ্ছা, আপনার বাড়ির ফোন নম্বর কত?’
‘আমার বাড়িতে তো ফোন নেই।’
‘ওঃ। বাড়ি পৌঁছে একটা ফোন করলে নিশ্চিন্ত হতাম, তাই বললাম। ওই অ্যাক্সিডেন্টটা কতদিন আগে ঘটেছিল?’ খুব সাধারণ গলায় জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোকের স্ত্রী। ‘বছর-দুই আগে।’
ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। ওঁরা নীচে নেমে গেলে ভদ্রলোকের স্ত্রী বারংবার তাড়াতাড়ি ফিরে আসার কথা বলে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
এখন রাস্তায় ঘন কুয়াশা। স্ট্রিট ল্যাম্পগুলোকে ভূতুড়ে দেখাচ্ছে। ভদ্রমহিলা লজ্জিত গলায় বললেন, ‘দেখুন তো, আমার জন্যে আপনার কী কষ্ট হচ্ছে!’
‘কষ্ট কেন বলছেন! এটা কৰ্তব্য।’
কয়েক পা হেঁটে ভদ্রমহিলা পেছন ফিরে তাকালেন। সেটা লক্ষ করে ভদ্রলোক দাঁড়ালেন। তাঁর কোটের পকেটে রিভলবারটাকে আঁকড়ে ধরে লক্ষ করলেন, কাউকে দেখতে পাওয়া যায় কি না। না পেয়ে বললেন, ‘কেউ নেই তো।’
‘পায়ের আওয়াজ শুনলাম।’
‘ঠিক আছে, আপনি এগোন, আমি একটু পিছিয়ে আপনাকে ফলো করবো। কেউ যদি কাছে এসে পড়ে, তা হলে আমার হাত থেকে ছাড়া পাবে না।’
‘না, না। তার দরকার হবে না। ওই যে জুতোর দোকানটা এসে গেছে, আমি ঠিক যেতে পারব। আপনি চলে যান।’ ভদ্রমহিলা সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে বললেন।
এই সময় গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল। তারপরেই দুটো হেডলাইটকে কুয়াশা চিরে এগিয়ে আসতে দেখলেন ওঁরা। ভদ্রলোক রিভলবার বের করে তৈরি হলেন। কিন্তু গাড়িটা দাঁড়াল না। সমান গতিতেই তাঁদের পেরিয়ে চলে গেল। দু-জনেই দেখতে পেলেন গাড়িটার রং সাদা।
ভদ্রমহিলা স্বস্তিতে বলে উঠলেন, ‘নাঃ!’
‘হ্যাঁ, আমিও…।’ ভদ্রলোক রিভলবার আর ঢোকালেন না, ‘চলুন, আপনাকে পৌঁছে না দিয়ে আমি ফিরব না।’
কয়েক পা হেঁটে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার স্বামী কী করতেন?’
‘মাস্টারমশাই ছিলেন।
‘কীরকম বয়স ছিল?’
‘এই, আপনারই বয়সি।
ভদ্রলোক ঢোক গিললেন, ‘ও। উনি কি দুর্ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ। পুলিশ তাই বলেছিল।’
কিছুদূর যাওয়ার পর ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আমি এসে গিয়েছি। আর চিন্তা নেই।’
‘ও। বাড়িটায় আলো জ্বলছে না।’
‘পুরোনো বাড়ি। দোতলায় আমি ছাড়া কেউ থাকে না। তিনতলাটা বন্ধ।
‘চলুন, আপনাকে আপনার ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়ে আসি।
‘না, না। কোনো দরকার নেই। আমি ওই সিঁড়ি ধরে দোতলায় উঠলেই ফ্ল্যাটের দরজায় পৌঁছে যাব। আর আমার কোনো ভয় নেই।’
‘বেশ। তা হলে চলি।’
‘হ্যাঁ। অনেক ধন্যবাদ।’ বলেই ভদ্রমহিলা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন। তিনি যতক্ষণ না চোখের আড়ালে না গেলেন, ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর নিশ্বাস ফেলে বাড়ির পথ ধরলেন।
কয়েক পা হাঁটার পরই মনে হল, কেউ যেন তাঁর পেছনে আসছে। স্পষ্ট পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েছেন তিনি। ঘুরে দাঁড়িয়ে লক্ষ করলেন। কুয়াশা এখন এমন ঘন হচ্ছে যে, কাউকেই দেখতে পেলেন না। রিভলবারটা উঁচিয়ে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই গাড়ির শব্দ কানে এল। একটা গাড়ি যেন আসছে, কিন্তু তার হেডলাইট নেভানো। সেটা জ্বললে তিনি দেখতে পেতেন। দ্রুত ফুটপাতের শেষপ্রান্তে চলে এলেন তিনি। গাড়িটা রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যাক, তারপর তিনি যাবেন। কিন্তু সরে আসামাত্র শব্দটা থেমে গেল। কুয়াশারা এখন পাক খাচ্ছে সর্বত্র। স্ট্রিট ল্যাম্পগুলোকেও গিলে ফেলেছে তারা। তিনি আবার পা ফেলতেই গাড়ির শব্দ শুনলেন। যেন গাড়িটা ওত পেতে ছিল একপাশে, তাঁকে চলতে দেখেই সক্রিয় হয়েছে।
ভদ্রলোকের সমস্ত শরীরে কাঁটা ফুটল। ওই ঠান্ডায় কুয়াশায় দাঁড়িয়েও হাতের মুঠোয় ধরা রিভলবারটা ভিজে উঠল। তাঁর মনে হল, এগোনোটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তিনি এক দৌড়ে পেছন দিকে চলে এলেন। ভদ্রমহিলার বাড়ির কাঠের সিঁড়িটা দেখতে পেয়ে পেছন ফিরে তাকালেন। না, কেউ নেই। তাঁর মনে হল একা ফিরে যাওয়া ঠিক হবে না। থানায় একটা ফোন করে সাহায্য চাইতে হবে। ফোন কোথায় পাওয়া যায়? ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই সাহায্য করতে পারেন। তিনি দ্রুত কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন। ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, দোতলায় উনি একা থাকেন। অতএব ওঁকে খুঁজে পেতে অসুবিধে হবে না।
দোতলায় উঠে পা বাড়াতে গিয়ে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলেন ভদ্রলোক। সিঁড়ির সামনে বারান্দা বা করিডোর বলে কিছু নেই। কাঠগুলো অনেক, অনেক আগেই খসে পড়ে গিয়েছে। ওপাশের দরজাটা ভাঙা এবং অন্ধকার।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে ভদ্রমহিলা এই শূন্য দিকে হেঁটে গিয়েছেন!
[ আনন্দমেলা, ২০ জানুয়ারি ১৯৯৩ ]
