Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
0/50
New Courseপেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

শাঁকচুন্নির কারসাজি (বাংলার লোককথা)

শাঁকচুন্নির কারসাজি

(বাংলার লোককথা)

বামাপদ কলকাতার এক মুদির দোকানে কাজ করত। লোকটা ছিল বড়ো ভালো। অতি বড়ো শত্তুরও তার প্রশংসা না-করে থাকতে পারত না।

বছরের শেষে একবার করে বামাপদ দেশে আসত। যখন সে দেশের বাড়িতে পা দিত, তখন গাঁয়ের ছোটো-বড়ো সকলেই আনন্দিত হত খুব। সকলের সঙ্গেই খুব আমোদ-আহ্লাদ করত সে। তাই সকলেই খুব ভালোবাসত তাকে

দিন কয়েক দেশে কাটিয়ে আবার সে কলকাতায় ফিরে যেত। বামাপদর মাকে একা একাই গাঁয়ে থাকতে হত। কিন্তু তবুও সে কখনো গাঁ ছেড়ে কলকাতায় যাবার কথা মুখে আনত না। স্বামীর ভিটের ওপর ছিল তাঁর এমনি টান।

সেবারও বছরের শেষে বামাপদ দেশে ফিরল।

বামাপদর মা তাকে বলল— ‘বাবা পদ, এবার শহরে যাওয়ার সময় কিন্তু বউমাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে এনে দিয়ে যেও। আমি আর একা একা এই ভিটেয় থাকতে পারছি না। আর আমার বয়সও হয়েছে অনেক। কবে আছি, কবে নেই। আর সংসারের এত কাজকর্ম্মই বা করে কে?

যাবার সময় এবার তুমি
বউকে দিয়ে যাও,
আর কতদিন বাঁচব আমি
যায় না বলা তাও।

বামাপদ বলল— ‘বেশ তো! তার জন্যে আর এত চিন্তার কি আছে? আমি কাল-পরশু নাগাদ যাচ্ছি শ্বশুরবাড়ি।’

বামাপদর বাড়ি থেকে তার শ্বশুরবাড়ি বিশ-পঁচিশ ক্রোশ। দুই-তিন দিনের পথ রেলরাস্তার ধারে নয় বলে বামাপদকে অতটা পথ হেঁটেই যেতে হবে। কিন্তু হেঁটে যেতে মন সরল না বামাপদর। সে তাই পালকি, বেহারার বন্দোবস্ত করল। বউকে আনবার জন্য একজন ঝিকে নেওয়া হল সঙ্গে। দু-দিন পরে বামাপদ শ্বশুরবাড়ি পৌঁছোল।

শশুরবাড়ি থেকে বউকে সেইদিনই সাজগোজ করিয়ে বামাপদ রওনা হল।

গরমের দিন। আম, জাম, লিচু পাকছে। ভীষণ গরমের মধ্যে পথ চলা প্রায় অসম্ভব।

সকাল সকাল তারা রওনা হয়েছিল।

কিন্তু দেখতে দেখতে দুপুর হয়ে গেল। রোদের ভীষণ তেজে পথ চলাই যায় না। সকলে হাঁপিয়ে উঠল।

গরমকালের দুপুর রোদে
আগুন যেন ধরে,
পথ চলতে সবাই যেন
ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

পালকির বেহারারা যেটুকুও বা হাঁটতে পারছিল, ঝি তো তাও পারছিল না।

সে তখন বামাপদকে বলল- ‘বাবু, একটু হুকুম দেন তো আমরা খানিকটা জিরিয়ে নিই।’

বামাপদ দেখল ঠিক কথা। সে বলল— ‘বেশ, তোমরা একটু জিরিয়ে নাও আমি বরং হাটে গিয়ে কিছু খাবার কিনে আনি।’

বেহারারা বলল- ‘বেশ বাবু, আমরা তাহলে উনুন খুঁড়ি, আপনি চাল ডাল কিনে আনুন।’

ঝি বিশ্রাম করতে লাগল নিশ্চিন্তমনে। বেহারারা উনুন খুঁড়তে লাগল একটু দূরে। বামাপদ বাজারে গেল জিনিস কিনে আনতে। নতুন বউ পালকির মধ্যেই বসে রইল।

এদিকে দারুণ গরমে বউ-এর খুব তৃষ্ণা পেয়েছিল। সে এক সময় ঝিকে বলল— ‘দূরের পুকুরটা থেকে একটু জল এনে দাও না। ভারি তেষ্টা পেয়েছে।

ওই যে দূরে পুকুর দেখি
টলটলে জল তার
জল এনে দাও, তেষ্টাতে যে
প্রাণ বাঁচে না আর।’

ভীষণ গরমে ঝি এতটা পথ হেঁটে একেবারে মরার মতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সে তাই গজগজ করতে লাগল— ‘বামাপদর মাকে সেই তখনই বলেছি, এতদূর দেশে ছেলের বিয়ে দিওনিকো। তা তখন গরিবের কথা গেরাহ্যি করল না।’

বউ দেখল, ঝির সঙ্গে তর্ক করলে আর জল খাওয়া হবে না। সে তাই বলল- ‘তুমি একটু বসো ঝি, আমি নিজেই গিয়ে জল খেয়ে আসি।’

একথা শুনে ঝি তো মহাখুশি। সে বলল- ‘তাই করো মা, তাই করো। এই তো কাছেই দীঘিটা।’

বউ আর কথা না-বলে পালকি থেকে নেমে দীঘির দিকে এগিয়ে গেল।

এদিকে সেই দীঘির ধারে ছিল বড়ো বড়ো কয়েকটা তালগাছ। সেই তালগাছগুলির কোটরে বাস করত কয়েকটি পেতনি।

সেই পেতনিদের মধ্যে একটি পেতনির ঠিক সেইসময়েই দারুণ জলতৃষ্ণা পেয়েছিল। সে জল খাবার জন্যে ঘাটের দিকে আসছে এমন সময় বউয়ের সঙ্গে লাগল তার ধাক্কা।

আর যায় কোথায়!

পেতনি তো রেগে আগুন! কী, এতবড়ো আম্পর্দ্ধা যে আমার গায়ে ধাক্কা লাগায়!

আমার গায়ে ধাক্কা লাগায়-
স্পর্দ্ধা দেখি বড়ো,
আচ্ছা মজা দেখাচ্ছি আজ,
একটু সবুর করো।

পেতনি তক্ষুনি নিজমূর্তি ধরে দাঁড়ায়।

উঃ, কী বিশাল তার চেহারা! মুলোর মতো দাঁত, তালগাছের মতো পা, লম্বা লম্বা হাত, কুলোর মতো কান।

বউ তো পেতনির মূর্তি দেখেই সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান।

আর যায় কোথায়!

পেতনি তক্ষুনি বউকে তুলে নিয়ে উড়তে উড়তে গিয়ে হাজির হল একেবারে সেই তালগাছের মাথায়।

তারপর বউকে অজ্ঞান অবস্থায় সেখানে রেখে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ল।

বউয়ের আর তালগাছ থেকে নামবার ক্ষমতা রইল না।

পেতনি তখন বউয়ের কাপড় নিয়ে নিজে সেইগুলো পরে ফেলল।

তারপর সুন্দরী বউটি সেজে সোজা গিয়ে হাজির হল সেই পালকির সামনে।

বউটি সেজে পেতনি তখন
পালকি ধারে যায়
পেতনি বলে কেউ সেখানে
চিনলো নাকো তায়।

ঝি বলল— ‘কি গো বউ, জল খাওয়া হল?’

বউ হেসে বলল- ‘হ্যাঁ।’ এই বলেই সে পালকির মধ্যে গিয়ে চুপচাপ বসে রইল। একটু পরে রান্নাবান্না খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সকলে আবার পালকি নিয়ে রওনা হল।

বউ অজ্ঞান হয়ে সেই তালগাছের কোটরের মধ্যেই পড়ে রইল। কেউ জানতে পারল না।

এদিকে সেদিনই সন্ধ্যায় পালকি এসে থামল বামাপদর বাড়িতে।

বামাপদর মা তো মনের আনন্দে বউকে বরণ করে ঘরে তুললে।

দিন যায়।

বউয়ের কাজকর্ম দেখে বামাপদর মা খুবই খুশি। এর আগে সে দেখেছিল বউ ভীষণ আলসে। কোনো কাজকর্ম করতে পারে না।

কিন্তু এবার দেখল কোনো কাজ করতে বলবার আগেই বউ সঙ্গে সঙ্গে তা করে ফেলে।

তা ছাড়া আগে বউ বড়ো গম্ভীর ধরনের ছিল। সবসময় মুখ গোমড়া করে বসে থাকত। কিন্তু এবার বউ খুব চটপটে। কিছু বলবার আগেই সে হাসতে হাসতে কাজকর্ম শেষ করে হেসে-খেলে সময় কাটায়।

বউয়ের স্বভাব বদলে গেছে—
নয় সে কুঁড়ে আর,
হেসে খেলে কাজ করে সে;
মুখ করে না ভার।

শাশুড়িও বেশ আনন্দেই দিন কাটাতে লাগল।

বামাপদও দেখল এবার বউ যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী। কী করে যে এমন হল তা সে ঠিক বুঝতে পারল না। তবে এতে সেও খুব খুশি হল।

এমনি করে দিন যায়।

দেখতে দেখতে কিছু দিন কেটে গেল।

বামাপদ একদিন মা-বউকে রেখে চলে গেল কলকাতায়। যাবার সময় মাকে

বলে গেল— ‘খুব সাবধানে থেকো।’

মা বলল— ‘তুই কাজে উন্নতি কর বাবা। আরও বেশি টাকা পেলে আমরা সকলে মিলে শহরে গিয়ে থাকব।

গাঁয়েতে আর মন বসে না-
হচ্ছে অভিলাষ
শহরেতে সবাই মিলে
করব মোরা বাস।’

বামাপদর মা ভাবল যে বামাপদ চলে গেলে বউ হয়তো একটু মনমরা হয়ে থাকবে। কিন্তু দেখা গেল ঠিক তার উলটো। কাজকর্মে বউ আরও বেশি মনোযোগী হল। কথা শেষ করবার আগেই সে কাজ করে ফেলে।

একদিন বামাপদর মা দাওয়ায় বসে মশলা বাটছে।

বউকে বলল— ‘বউ, আরও কিছু মশলা এনে দাও তো ঘর থেকে।’

বউ সেখানে দাঁড়িয়েই বিরাট লম্বা একটা হাত বের করে দিল ঘরের দিকে।

বামাপদর মা প্রথমে তা দেখতে পায়নি।

সে হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে দেখতে পেল যে বউ লম্বা এক হাত বের করে ঘরের মধ্য থেকে জিনিস আনছে।

ভয়ে বামাপদর মার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু মনের মধ্যে সেই যে ভয় ঢুকল, তারপর আর কোনো কাজ করতে পারল না সে।

বামাপদর মা দু-একজন পাড়াপড়শির কাছে চুপে চুপে কথাটা জানাল।

সে বলল-

‘আজ সকালে দেখতে আমি পেলাম অকস্মাৎ,
বউটি আমার মশলা আনে বাড়িয়ে তাহার হাত। বা
সরে সে কী লম্বা দু-হাত বাড়িয়ে দিল তার-
দৃশ্য দেখে ভয়েই আমার বুক কাঁপে বার বার।’

কিন্তু তারা বলল- ‘না না, তুমি ভুল দেখেছ। না-হয়, তোমার বায়ু চড়ে ছিল। অমন লক্ষ্মী বউ, তার নামে এমন সব কথা বলছ!’

শাশুড়ি কী আর করে, মনের ভয় মনেই চেপে রইল।

…এমনি করে আরও দিন কয়েক কেটে গেল।

একদিন বউকে রান্না করতে বলে বামাপদর মা ঘাটে গেল কাপড় কাচতে।

একটু পরে কাপড় কাচা শেষ করে রান্নাঘরে গেল বউয়ের রান্না দেখতে।

কিন্তু সেখানে গিয়ে সে যা দেখল তাতে তার চক্ষু স্থির হবার জো হল।

সে দেখল বউ উনুনের সামনে বসে। তার দুটি পা উনুনের মধ্যে ঢোকানো আছে। সেই পা দুটো থেকে দাউদাউ করে আগুন বের হচ্ছে। আর সেই আগুনে ভাত, ভাল ফুটছে টগবগ করে।

উনুনের মধ্যে কাঠ-খড় কিচ্ছু নেই।

অবাক কাণ্ড। নিশ্চয়ই এ বউ মানুষ নয়। পেতনি, না হয় শাঁকচুন্নি।

এ বউ মানুষ নয় দেখি অদ্ভুত-
মানুষের বেশে কোনো হবে প্রেত-ভূত।
কাঠ-খড় নাই কিছু, তবু কত গুণ—
পায়ের আগুনে শুধু জ্বলিছে উনুন।

কিন্তু কিছু বল্লেই বউ তো রেগে তাকেই শেষ করে ফেলবে। তাই চুপচাপ থেকে সে ছেলের কাছে চিঠি লিখে ফেলল। তারপর একজন প্রতিবেশীকে দিয়ে চিঠিটা ডাকঘরে পাঠিয়ে দিল।

চিঠি পেয়ে দু-দিনের মধ্যেই বামাপদ দেশে ফিরে এল। বউ তো এত তাড়াতাড়ি বামাপদকে ফিরতে দেখে অবাক হয়ে গেল।

বামাপদর মা সব কথা তার ছেলেকে জানাল।

বামাপদ তো এসব কথা শুনে অবাক। এ কী করে সম্ভব হতে পারে। ঠিক তার বউয়ের মতোই তো চেহারা!

বামাপদর মা বলল- ‘আচ্ছা চোখে দেখলে বিশ্বাস করবি তো?’

বামাপদ বলল- ‘হ্যাঁ, চোখে দেখলে বিশ্বাস না করবার কি কারণ আছে?’

তখন শাশুড়ি বউকে বলল— ‘বউমা, আমি এদিকের কাজে যাচ্ছি, তুমি চট করে এই কাপড়গুলি ধুয়ে আনো তো দেখি।’

বউ কাপড়গুলি নিয়ে চলে গেল।

একটু পরে বামাপদর মা গোপনে বামাপদকে ঘাটের ধারে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে তারা দেখে বিরাট দুটো লম্বা লম্বা হাত বের করে বউ দমাদম কাপড়গুলোকে আছাড় মারছে।

মায়ের সাথে বামাপদ
দেখল ঘাটের কাছে-
লম্বা বিরাট দুইটি হাতে
বউটি কাপড় কাচে।

বামাপদ কোনো কথা বলল না। সে বুঝতে পারল যে এ বউ তার আসল বউ নয়। নিশ্চয়ই এই পেতনি তার বউকে কোথাও লুকিয়ে রেখে নিজে বউ সেজে এসেছে।

মা-ছেলে দুইজনে তখন যুক্তি করে একজন ওঝাকে ডেকে আনল। ওঝা আর বামাপদ দু-জনে বাইরে বসে কথা বলছিল।

এদিকে পেতনি-বউ ঘরের মধ্যে শাশুড়িকে বলল— ‘মা, ও হতভাগা কে? তোমার ছেলের সঙ্গে গল্প করছে কেন? ওকে এক্ষুনি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দাও!

বলছি মাগো উচিত কথা
ভালোই যদি চাও,
ও লোকটারে বাড়ির থেকে
তাড়িয়ে তুমি দাও।’

মা বলল— ‘বউমা, কোথাকার কোন লোক বামাপদর সঙ্গে কথা বলছে, তাতে আমাদের কি বলো?’

বউ বলল— ‘না মা। ও লোকটিকে দেখেই মনে হচ্ছে যে ও লোকটা ভালো নয়।’

শাশুড়ি আর বউ কথাবার্তা বলছে, এমন সময় বামাপদ ওঝাকে নিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল।

বউ ওঝাকে দেখেই দূরে সরে যাচ্ছিল।

ওঝা বলল— ‘বউমা, একটু দাঁড়াতে হবে। যাচ্ছ কোথায় মা? তোমার সঙ্গে যে আমার অনেক কথা আছে।’

বউ তখন ভীষণ রেগে নিজমূর্তি ধরে বলল- ‘কেন রে হতভাগা! তোর সঙ্গে আমার কি?’

ওঝা বলল— ‘এই যে কী তাই দেখাচ্ছি! পালাবে কোথায়? পালাবার উপায় কি রেখেছি নাকি। চারিদিকে গণ্ডি দিয়ে রেখেছি। এখনও নিজের মঙ্গল চাও তো বলো তুমি কে? আর ওদের বউকে কোথায় আটকে রেখেছ?’

বউ তখন ভীষণ মূর্তি ধারণ করে ওঝার দিকে ছুটে এল।

ওঝা কতকগুলি সরষেতে কী যেন মন্ত্র পড়ে তা বউয়ের দিকে ছুড়ে মারল।

সঙ্গে সঙ্গে বউয়ের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল, সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

ওঝা তখন মন্ত্র পড়ে বউয়ের গায়ে ধুলোর বাণ মারতে লাগল।

বউ তখন প্রাণপণে চিৎকার করতে লাগল- ‘কে কোথায় আছ রক্ষা করো। আমাকে মেরে ফেলল!

দৌড়ে এসো, দৌড়ে এসো
কোথায় আছ কে,
গৃহস্থদের বউ যে আমি-
মেরে ফেল্ল যে।’

চিৎকার শুনে সারা গ্রামের লোক ছুটে এসে তাদের উঠোনে জড়ো হতে লাগল। ওঝাও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। সে বলল- ‘এখনও বলছি ওদের বউকে ছেড়ে দাও। না হলে কিছুতেই তোমার নিস্তার নেই।’

পেতনি তখন ভয়ে ভয়ে বলল- ‘ওদের বউকে আমি গাছের কোটরে রেখে এসেছি।

দীঘির ধারে তালের গাছে
তোমাদের সে বউটি আছে।

ওঝা জিজ্ঞাসা করল— ‘কতদিন?’

পেতনি বলল— ‘যেদিন বাপের বাড়ি থেকে এখানে আসছিল ঠিক সেইদিন।’

ওঝা তখন জিজ্ঞাসা করল— ‘সে কি এখনও বেঁচে আছে?’

পেতনি বলল— ‘হ্যাঁ, আমি রোজ তাকে খাবার খাইয়ে আসি।’

ওঝা এবার জোর চিৎকার করে বলল- ‘এবার তাকে এক্ষুনি এখানে এনে দাও দেখি।’

পেতনি চুপ করে ছিল। ওঝা তার গায়ে আবার ধুলোর বাণ মারতে লাগল।

এবার আর উপায় না দেখে পেতনি বলল- ‘দাঁড়াও বাবা, আমি এখনই তোমাদের বউমাকে এনে দিচ্ছি।’

ওঝা বলল— ‘বেশ, সে তো খুব ভালো কথা। কিন্তু আর এক মুহূর্তও দেরি নয়।’

পেতনি তখন সকলকে চোখ বুজতে বলল। সকলে চোখ বুজলে ‘শোঁ শোঁ’ শব্দ করতে করতে একঝলক ধোঁয়ার মতো পেতনি উড়ে চলে গেল। দেখতে দেখতে কিছুক্ষণ কেটে গেল।

আবার শোনা গেল ‘শোঁ শোঁ’ শব্দ। দেখা গেল বামাপদর আসল বউকে কোলে করে নিয়ে আসছে পেতনি। পেতনিকে দেখাচ্ছে বিরাট একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো।

বামাপদর বউ তখন অচৈতন্য।

ওঝা তখন জিজ্ঞাসা করল— ‘তুই কি এক্ষুনি এদেশ ছেড়ে চলে যাবি, না থাকবি? যদি থাকতে চাস তাহলে আবার কিন্তু তোকে বাণ মারব।’

পেতনি বলল- ‘না, আমি এদেশ ছেড়ে চলে যাব।’

ওরা বলল- ‘কিন্তু আর কখনো এদেশের দিকে আসতে পারবি না।’

পেতনি বলল- ‘আচ্ছা আমাকে এবার মুক্তি দাও।’

ওঝা বলল— ‘যাবার আগে এই বড়ো নিমগাছটা ভেঙে দিয়ে চলে যা।’

পেতনি বলল— ‘আচ্ছা।’

সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল ভীষণ একটা ঝড়ের মতো প্রচণ্ড শব্দে একঝলক বাতাস বয়ে যাচ্ছে।

সে কী ভীষণ শব্দ!

একটু পরেই মড় মড় করে বড়ো নিমগাছটা উপড়ে পড়ল। পেতনিকেও আর দেখা গেল না।

হঠাৎ যেন প্রবল ঝড়ে
নিমগাছটা উপড়ে পড়ে;
গ্রামবাসীরা দেখল সবাই,
পেতনি গেছে, আর ভয় নাই।

বউয়ের মাখায় জল ঢালতে ঢালতে তার জ্ঞান ফিরে এল।

তাকে জিজ্ঞাসা করা হল— ‘তুমি কোথায় ছিলে এতদিন?’

বউ বলল- ‘আমি দীঘিতে জল খেতে গেলাম। কিন্তু মাঝপথে জ্ঞান হারিয়ে গেল। তারপর আর কিছু মনে নেই।’

বামাপদ আর তার মা এরপর আসল বউকে নিয়ে মনের সুখে ঘর সংসার করতে লাগল।

সেই পেতনি আর কোনোদিনও তাদের ছায়া মাড়ায়নি।